মিথ্যে বলো না
মিলন পুরকাইত ভাগ্নি তার মনের মানুষের সঙ্গে পালিয়ে গেছে হঠাৎ। যার সঙ্গে গেছে, সে নাকি কলেজ বন্ধু ছিল। একসঙ্গে পড়তো।
খবরটা পাওয়ার পর মনটা খুশিতে নেচে উঠলো। আমিও পালানোর তালে ছিলাম। গার্লফ্রেন্ড বিগড়ে গেলো বলে হলো না। একবার তো একজন বাড়ি এসে হাজির পর্যন্ত হয়েছিল!
বোঝা গেল ভাগ্নির এলেম আমার থেকে বেশি। ও সফল আমি বিফল। ও কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছেছে আমি ব্যর্থ হয়েছি। সুতরাং ওর সঙ্গে দেখা করে বাহবা জানিয়ে আসতে হবে আর খানিক সাহস ধার করে আনতে হবে।
কিন্তু সমস্যা হল দিদি জামাইবাবু। কিছুতেই মানতে পারছে না এ বিয়ে। ওদের বংশেরও কেউ মেনে নেয়নি। ছেলেকে ধরতে পারলে খুন খারাপি হয়ে যাবে বলেও হুমকি দিয়েছে। অপহরণ কেসও করেছে।
আমি গেলে আমার কি হবে জানিনা। তবে দিদি জামাইবাবু আমায় খুন করবে না নিশ্চিত। সবচেয়ে বড় কথা আমরা যাচ্ছি গোপনে। জানতেই পারবে না।
ঠিক করলাম এক রবিবার ভাগ্নির নতুন শশুর বাড়ি যাবো। আমার সহকর্মী কাম মেস পার্টনার পরিতোষকে পটিয়ে পাটিয়ে সঙ্গে নিলাম। ও ছোড়া কোথাও যেতে চায় না হ্যান্ডিক্যাপ বলে। সামান্য পা খুঁড়িয়ে চলে। সম্ভবত একটা হীনমন্যতা কাজ করে ভেতরে ভেতরে।
হাজারদুয়ারি এক্সপ্রেসে বেথুয়া এসে নামলাম সকাল নটায়। অকারণ একটু টেনশন হচ্ছে। লুকিয়ে চুরিয়ে কেউ না দেখে ফেলে!
স্টেশনের নীচে পূর্ব দিকে পরোটার দোকান দেখে পরিতোষ বলল, 'দাদা খাব। খিদে পেয়েছে'।
দুজনাই লাফিয়ে নামলাম। দর্মার বেড়া ত্রিপলের ছাউনি দেয়া ছোট্ট দোকান। নড়বড়ে দু-তিনটি কাঠের বেঞ্চ পাতা এলোমেলো। আয়েশ করে বসে পরোটা খেতে খেতে দোকানের ছেলেটির সঙ্গে পরিচয় হলো। অমায়িক ছেলে। অদ্ভুত তার চুলের ছাঁট। দাঁড়ি কটি যেন পালতোলা নৌকা।
অটোতে যেতে যেতে কাহিনী আদ্যোপান্ত বলে বাড়িটির ঠিকানা ড্রাইভার কে জিজ্ঞেস করলাম। দেখলাম অটো ড্রাইভার সব জানে। ছেলেটি হেসে বললো, হরি নারায়নপুর স্কুল ছাড়িয়ে খালপাড় দিয়ে একটু গেলেই পাবেন। চিন্তা করবেন না। ঠিক নাবিয়ে দেবো।
স্কুলের সঙ্গেই ছোট্ট একটু বাজার। কয়েকটি এলোমেলো দোকান। আজ সম্ভবত হাটবার। হাটের সময় এখনো হয়নি, তবুও কেউ কেউ বস্তায় সবজি রেখে গেছে দেখলেই বোঝা যায়।
আমরা বাজারটিতে নেবে গেলাম। মিষ্টির দোকান থেকে বড় বড় সাইজের রসগোল্লা কিনে পরিতোষের হাতে দিয়ে বললাম, আবোল তাবোল কিছু জিজ্ঞেস করিস নে। ঘন্টাখানেক থেকেই ফিরে যাব। ফিরতি হাজারদুয়ারি ধরবো।
অল্প খুঁজেই বাড়িটি পেয়ে গেলাম এবং ঢোকার মুখেই দেখলাম কয়েকটি ছোট বাচ্চাকে জুটিয়ে ভাগ্নি আমার জিন্সের প্যান্ট পড়ে কিৎ কিৎ খেলছে রাস্তার উপরে। আশ্চর্য! দেখলে বোঝাই যায় না বিয়ে হয়েছে। হাতে শাঁখা কপালে সিঁদুর নেই।
বাড়ির লোকজন কি হাবা নাকি! নতুন বউকে জিন্সের প্যান্ট পরিয়ে রেখেছে! শাঁখা সিঁদুর পড়ায়নি। গ্রামের লোক কিছু বলেনা! তারা এসব মানবে? ছি ছি করবে না!
আমায় দেখে ভাগ্নির ভাবের কোন পরিবর্তন হলো না, যেমন খেলছিল খেলতে লাগলো। দিদির বাড়িতে গেলে যেখানেই থাক দৌড়ে আসত, কি এনেছ মামা! বলে দেখতে চাইতো। তেমনটি এলো না। দৌড়ে এসে দেখতেও চাইল না। ভারি অবাক হলাম। তবে কি আমার ওপর গোঁসা হয়েছে! বাবা মায়ের উপর রাগ আমার ওপর ঝাড়বে না তো!
বড় কোন পন্ডিত না হলেও কেমন যেন একটু আতে লাগলো। রাগও হলো। কাছে গিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে বললাম, কিরে ময়ূরী! আমায় দেখতে পাসনি?
খেলা না থামিয়েই ময়ূরী বলল, পেয়েছি।
কিছু বলছিস না যে!
কি বলবো! ভেতরে যাও!
তোর শাশুড়ি বাড়ি আছে?
এবার ময়ূরী খেলা বন্ধ রেখে অত্যন্ত উগ্র মূর্তি ধারণ করে চোখ মুখ পাকিয়ে আমার কাছে এসে বলল, শাশুড়ি মানে? কার শাশুড়ি? কিসের শাশুড়ি? তোমরা কি ধরেই নিয়েছো পালিয়ে এসেছি মানে বিয়ে করেছি? পালিয়ে আসা মানে বিয়ে করা? অন্য কিছু ভাবতে পারোনি? সবকটা একরকম!
একেবারে ফিউজ হয়ে গেলাম। বলে কি! বিয়ে করেনি! তবে যে শুনলাম, পালিয়ে বিয়ে করেছে! সংসার করছে! দিদি তো কান্নাকাটি করে কত কথা বলল! জামাইবাবু হুমকি দিল। তবে কি সবাই মিলে আমাকেই ধোঁকা দিচ্ছে!
অবাক চোখে তাকিয়ে বললাম, তোর মা যে বলল বিয়ে করেছিস?
আমাদের কথা শুনে বাড়ির ভেতর থেকে একটি ২৪-২৫ বছরের যুবক বেরিয়ে এলো। পিছে পিছে এলেন একজন ভদ্রমহিলা। সম্ভবত ছেলেটির মা। আমাদের দেখে কিছু একটা অনুমান করে ভদ্রমহিলা বললেন, 'বাবা সকল ভেতরে আসো'।
আমরা ভেতরে গেলে ভদ্রমহিলা টিনের ঘরের বারান্দায় বসতে দিয়ে বললেন, ময়ূরী তোমাদের কি হয়?
সত্যি কথা বললাম।
ভদ্রমহিলা এবার খানিকটা চড়া গলায় বললেন, তোমরা কেমন মানুষ! এইটুকু একটা মেয়েকে দোজবরে ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিচ্ছিলে। যত বড় চাকরিই করুক। ময়ূরীর থেকে সে ১৮ বছরের বড়। আট বছরের একটি ছেলে আছে। মেয়ে বলে তার মতামত না নিয়ে যার তার সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে? কেমন দিদি জামাইবাবু তোমার!
এরকম একটা ব্যাপার শুনেছিলাম বটে। তখন বিরোধিতা ও করেছিলাম। কিন্তু তলে তলে দিদি যে এতটা এগিয়ে গেছে জানতাম না। ফলে আরেকবার ফিউজ হলাম। এবার লজ্জিত হয়ে বললাম, এত ঘটনা আমি জানতাম না। সত্যিই জানতাম না।
ময়ূরী কখন যেন আমাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। সে এবার কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, মামা, আমাকে একটা রিক্সাওয়ালার সঙ্গে বিয়ে দাও, কিন্তু ওখানে দিও না। সে পরিতোষ কে দেখিয়ে বলল, ইনি যদি রিক্সাওয়ালাও হতেন ওনাকে বিয়ে করতেও আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু যার আট বছরের ছেলে আছে তাকে বিয়ে করতে বলো না।
সর্বনাশ! পরিতোষ কিছু মনে করল না তো! এমনিতেই খোঁড়া মানুষ। খুব খুঁতখুঁতে। এই কারণে কোথাও যেতে চায় না। ওর মনে আঘাত লাগল কিনা কি জানি!
ম্যানেজ করার জন্য বললাম, আরে না না তোকে যেখানে সেখানে বিয়ে করতে বলব কেন! আমাকে পাগল ভেবেছিস নাকি! পরে পরিতোষ কে দেখিয়ে বললাম,ও খুব ভালো ছেলে। চাকরি করে। ভালো মাউথ অর্গান বাজায়।
এখন সমস্ত ব্যাপারটা জলের মতো পরিষ্কার হলো। দুপুরে ভাত খেতে খেতে শুনলাম, ভদ্রমহিলার ছেলে ময়ূরীর কলেজ ফ্রেন্ড। ওর নাম রিপন। ফোন পেয়ে গোপনে এনে বাড়িতে তুলেছে। দোজবোরে বিয়েটা ভেচতে গেলে আবার ফেরত দিয়ে আসবে।
হরিনারায়নপুর এসে এমন একটা ফ্যামিলি দেখতে পাব এমন নিখাদ বন্ধুত্ব দেখতে পাবো ভাবতে পারিনি।
ফেরার পথে ওনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে দিদি বাড়ি গিয়ে অথবা ফোনে সমস্ত বলব বলে সন্ধ্যের আগে বেরোবো, এমন সময় পাশের একটি ছোট্ট ঘর থেকে সদ্যোজাত কোলে একটি মেয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। ভালো করে দেখে অবাক হয়ে গেলাম। এতো সুতপা! আশ্চর্য! ও এখানে এলো কি করে? ওদের বাড়ি নাকি এটা!
সুতপা এসে আমার সামনে দাঁড়ালো, তারপর ভদ্রমহিলাকে উদ্দেশ্য করে বলল, মা, এ সুখরঞ্জন। কলেজে একসঙ্গে পড়তাম। তোমরা আমায় জোর করে বিয়ে দিতে চাইলে ওর কাছে গিয়ে উঠেছিলাম। ও আমায় সাহায্য করেছিল। খুব সাহায্য করেছিল।
হয়তো আরো কিছু বলতো সুতপা। কিন্তু কোলে সদ্যোজাত সন্তান বলে আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে আবার দ্রুত সেই ঘরে ফিরে গেল।
আগত গোধূলিতে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টির স্রোত যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাবে এবার। যেন নরকের জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছি একা! চারিদিক শূন্যতা! অন্ধকার!
আমিতো জানি ও আমার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল। হেল্প চেয়েছিল। সেদিন হাত বাড়াইনি। তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। অসহায় একটি মেয়েকে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম বাড়ি থেকে। অপদার্থের মত। স্বার্থপরের মত। কেউ না জানুক আমি জানি। আমি পাষণ্ড, নীচ, হীন।
সুতপা আমি তোমায় সাহায্য করিনি। মিথ্যে বলো না সুতপা। মিথ্যে বলো না।।
বোঝা গেল ভাগ্নির এলেম আমার থেকে বেশি। ও সফল আমি বিফল। ও কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছেছে আমি ব্যর্থ হয়েছি। সুতরাং ওর সঙ্গে দেখা করে বাহবা জানিয়ে আসতে হবে আর খানিক সাহস ধার করে আনতে হবে।
কিন্তু সমস্যা হল দিদি জামাইবাবু। কিছুতেই মানতে পারছে না এ বিয়ে। ওদের বংশেরও কেউ মেনে নেয়নি। ছেলেকে ধরতে পারলে খুন খারাপি হয়ে যাবে বলেও হুমকি দিয়েছে। অপহরণ কেসও করেছে।
আমি গেলে আমার কি হবে জানিনা। তবে দিদি জামাইবাবু আমায় খুন করবে না নিশ্চিত। সবচেয়ে বড় কথা আমরা যাচ্ছি গোপনে। জানতেই পারবে না।
ঠিক করলাম এক রবিবার ভাগ্নির নতুন শশুর বাড়ি যাবো। আমার সহকর্মী কাম মেস পার্টনার পরিতোষকে পটিয়ে পাটিয়ে সঙ্গে নিলাম। ও ছোড়া কোথাও যেতে চায় না হ্যান্ডিক্যাপ বলে। সামান্য পা খুঁড়িয়ে চলে। সম্ভবত একটা হীনমন্যতা কাজ করে ভেতরে ভেতরে।
হাজারদুয়ারি এক্সপ্রেসে বেথুয়া এসে নামলাম সকাল নটায়। অকারণ একটু টেনশন হচ্ছে। লুকিয়ে চুরিয়ে কেউ না দেখে ফেলে!
স্টেশনের নীচে পূর্ব দিকে পরোটার দোকান দেখে পরিতোষ বলল, 'দাদা খাব। খিদে পেয়েছে'।
দুজনাই লাফিয়ে নামলাম। দর্মার বেড়া ত্রিপলের ছাউনি দেয়া ছোট্ট দোকান। নড়বড়ে দু-তিনটি কাঠের বেঞ্চ পাতা এলোমেলো। আয়েশ করে বসে পরোটা খেতে খেতে দোকানের ছেলেটির সঙ্গে পরিচয় হলো। অমায়িক ছেলে। অদ্ভুত তার চুলের ছাঁট। দাঁড়ি কটি যেন পালতোলা নৌকা।
অটোতে যেতে যেতে কাহিনী আদ্যোপান্ত বলে বাড়িটির ঠিকানা ড্রাইভার কে জিজ্ঞেস করলাম। দেখলাম অটো ড্রাইভার সব জানে। ছেলেটি হেসে বললো, হরি নারায়নপুর স্কুল ছাড়িয়ে খালপাড় দিয়ে একটু গেলেই পাবেন। চিন্তা করবেন না। ঠিক নাবিয়ে দেবো।
স্কুলের সঙ্গেই ছোট্ট একটু বাজার। কয়েকটি এলোমেলো দোকান। আজ সম্ভবত হাটবার। হাটের সময় এখনো হয়নি, তবুও কেউ কেউ বস্তায় সবজি রেখে গেছে দেখলেই বোঝা যায়।
আমরা বাজারটিতে নেবে গেলাম। মিষ্টির দোকান থেকে বড় বড় সাইজের রসগোল্লা কিনে পরিতোষের হাতে দিয়ে বললাম, আবোল তাবোল কিছু জিজ্ঞেস করিস নে। ঘন্টাখানেক থেকেই ফিরে যাব। ফিরতি হাজারদুয়ারি ধরবো।
অল্প খুঁজেই বাড়িটি পেয়ে গেলাম এবং ঢোকার মুখেই দেখলাম কয়েকটি ছোট বাচ্চাকে জুটিয়ে ভাগ্নি আমার জিন্সের প্যান্ট পড়ে কিৎ কিৎ খেলছে রাস্তার উপরে। আশ্চর্য! দেখলে বোঝাই যায় না বিয়ে হয়েছে। হাতে শাঁখা কপালে সিঁদুর নেই।
বাড়ির লোকজন কি হাবা নাকি! নতুন বউকে জিন্সের প্যান্ট পরিয়ে রেখেছে! শাঁখা সিঁদুর পড়ায়নি। গ্রামের লোক কিছু বলেনা! তারা এসব মানবে? ছি ছি করবে না!
আমায় দেখে ভাগ্নির ভাবের কোন পরিবর্তন হলো না, যেমন খেলছিল খেলতে লাগলো। দিদির বাড়িতে গেলে যেখানেই থাক দৌড়ে আসত, কি এনেছ মামা! বলে দেখতে চাইতো। তেমনটি এলো না। দৌড়ে এসে দেখতেও চাইল না। ভারি অবাক হলাম। তবে কি আমার ওপর গোঁসা হয়েছে! বাবা মায়ের উপর রাগ আমার ওপর ঝাড়বে না তো!
বড় কোন পন্ডিত না হলেও কেমন যেন একটু আতে লাগলো। রাগও হলো। কাছে গিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে বললাম, কিরে ময়ূরী! আমায় দেখতে পাসনি?
খেলা না থামিয়েই ময়ূরী বলল, পেয়েছি।
কিছু বলছিস না যে!
কি বলবো! ভেতরে যাও!
তোর শাশুড়ি বাড়ি আছে?
এবার ময়ূরী খেলা বন্ধ রেখে অত্যন্ত উগ্র মূর্তি ধারণ করে চোখ মুখ পাকিয়ে আমার কাছে এসে বলল, শাশুড়ি মানে? কার শাশুড়ি? কিসের শাশুড়ি? তোমরা কি ধরেই নিয়েছো পালিয়ে এসেছি মানে বিয়ে করেছি? পালিয়ে আসা মানে বিয়ে করা? অন্য কিছু ভাবতে পারোনি? সবকটা একরকম!
একেবারে ফিউজ হয়ে গেলাম। বলে কি! বিয়ে করেনি! তবে যে শুনলাম, পালিয়ে বিয়ে করেছে! সংসার করছে! দিদি তো কান্নাকাটি করে কত কথা বলল! জামাইবাবু হুমকি দিল। তবে কি সবাই মিলে আমাকেই ধোঁকা দিচ্ছে!
অবাক চোখে তাকিয়ে বললাম, তোর মা যে বলল বিয়ে করেছিস?
আমাদের কথা শুনে বাড়ির ভেতর থেকে একটি ২৪-২৫ বছরের যুবক বেরিয়ে এলো। পিছে পিছে এলেন একজন ভদ্রমহিলা। সম্ভবত ছেলেটির মা। আমাদের দেখে কিছু একটা অনুমান করে ভদ্রমহিলা বললেন, 'বাবা সকল ভেতরে আসো'।
আমরা ভেতরে গেলে ভদ্রমহিলা টিনের ঘরের বারান্দায় বসতে দিয়ে বললেন, ময়ূরী তোমাদের কি হয়?
সত্যি কথা বললাম।
ভদ্রমহিলা এবার খানিকটা চড়া গলায় বললেন, তোমরা কেমন মানুষ! এইটুকু একটা মেয়েকে দোজবরে ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিচ্ছিলে। যত বড় চাকরিই করুক। ময়ূরীর থেকে সে ১৮ বছরের বড়। আট বছরের একটি ছেলে আছে। মেয়ে বলে তার মতামত না নিয়ে যার তার সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে? কেমন দিদি জামাইবাবু তোমার!
এরকম একটা ব্যাপার শুনেছিলাম বটে। তখন বিরোধিতা ও করেছিলাম। কিন্তু তলে তলে দিদি যে এতটা এগিয়ে গেছে জানতাম না। ফলে আরেকবার ফিউজ হলাম। এবার লজ্জিত হয়ে বললাম, এত ঘটনা আমি জানতাম না। সত্যিই জানতাম না।
ময়ূরী কখন যেন আমাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। সে এবার কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, মামা, আমাকে একটা রিক্সাওয়ালার সঙ্গে বিয়ে দাও, কিন্তু ওখানে দিও না। সে পরিতোষ কে দেখিয়ে বলল, ইনি যদি রিক্সাওয়ালাও হতেন ওনাকে বিয়ে করতেও আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু যার আট বছরের ছেলে আছে তাকে বিয়ে করতে বলো না।
সর্বনাশ! পরিতোষ কিছু মনে করল না তো! এমনিতেই খোঁড়া মানুষ। খুব খুঁতখুঁতে। এই কারণে কোথাও যেতে চায় না। ওর মনে আঘাত লাগল কিনা কি জানি!
ম্যানেজ করার জন্য বললাম, আরে না না তোকে যেখানে সেখানে বিয়ে করতে বলব কেন! আমাকে পাগল ভেবেছিস নাকি! পরে পরিতোষ কে দেখিয়ে বললাম,ও খুব ভালো ছেলে। চাকরি করে। ভালো মাউথ অর্গান বাজায়।
এখন সমস্ত ব্যাপারটা জলের মতো পরিষ্কার হলো। দুপুরে ভাত খেতে খেতে শুনলাম, ভদ্রমহিলার ছেলে ময়ূরীর কলেজ ফ্রেন্ড। ওর নাম রিপন। ফোন পেয়ে গোপনে এনে বাড়িতে তুলেছে। দোজবোরে বিয়েটা ভেচতে গেলে আবার ফেরত দিয়ে আসবে।
হরিনারায়নপুর এসে এমন একটা ফ্যামিলি দেখতে পাব এমন নিখাদ বন্ধুত্ব দেখতে পাবো ভাবতে পারিনি।
ফেরার পথে ওনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে দিদি বাড়ি গিয়ে অথবা ফোনে সমস্ত বলব বলে সন্ধ্যের আগে বেরোবো, এমন সময় পাশের একটি ছোট্ট ঘর থেকে সদ্যোজাত কোলে একটি মেয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। ভালো করে দেখে অবাক হয়ে গেলাম। এতো সুতপা! আশ্চর্য! ও এখানে এলো কি করে? ওদের বাড়ি নাকি এটা!
সুতপা এসে আমার সামনে দাঁড়ালো, তারপর ভদ্রমহিলাকে উদ্দেশ্য করে বলল, মা, এ সুখরঞ্জন। কলেজে একসঙ্গে পড়তাম। তোমরা আমায় জোর করে বিয়ে দিতে চাইলে ওর কাছে গিয়ে উঠেছিলাম। ও আমায় সাহায্য করেছিল। খুব সাহায্য করেছিল।
হয়তো আরো কিছু বলতো সুতপা। কিন্তু কোলে সদ্যোজাত সন্তান বলে আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে আবার দ্রুত সেই ঘরে ফিরে গেল।
আগত গোধূলিতে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টির স্রোত যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাবে এবার। যেন নরকের জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছি একা! চারিদিক শূন্যতা! অন্ধকার!
আমিতো জানি ও আমার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল। হেল্প চেয়েছিল। সেদিন হাত বাড়াইনি। তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। অসহায় একটি মেয়েকে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম বাড়ি থেকে। অপদার্থের মত। স্বার্থপরের মত। কেউ না জানুক আমি জানি। আমি পাষণ্ড, নীচ, হীন।
সুতপা আমি তোমায় সাহায্য করিনি। মিথ্যে বলো না সুতপা। মিথ্যে বলো না।।

