আগমনি |  মিলন পুরকাইত 

0

 আগমনি 

মিলন পুরকাইত 




   উফফ্ আজ একদম কাজে মন বসছে না। মনটা ভারী হয়ে আছে। মেলের পর মেল আসছে, কতো প্রোজেক্ট ওয়ার্ক বাকি, কিন্তু মন ভালো না থাকলে কি কাজ করা যায় নাকি। রেশমির স্তব্ধতা, মুনিয়ার ওই মুখ খানা বারবার ভেসে আসছে চোখের সামনে। 


নাহ্ আজ আর কাজে মন বসবে না। সব কিছু গুছিয়ে আজ তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লো অনির্বাণ। বাইক নিয়ে স্পিডে বেরিয়ে গেলো,একদম এসে থামলো সেই লেকের ধারের পার্কটায়। আস্তে আস্তে গিয়ে বসলো একদম পার্কের কোণের বেঞ্চে, যেখানে রেশমি আর অনির্বাণ প্রত‍্যেকদিন অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময়ে বসতো। কতো ভালো ছিলো দিনগুলো, কেমন যেনো ওলটপালট হয়ে গেলো। 


অফিসেই প্রথম পরিচয় হয়েছিলো রেশমির সাথে। অনির্বাণ সিনিয়র ছিলো, ওদের একটা গ্ৰুপ ছিলো। নতুন জয়েন করেই রেশমি কিকরে যেনো ওদের গ্ৰুপে জয়েন করে গেলো‌। তারপর নিজেরাই নিজেদের অজান্তে কখন তাদের মন দেওয়া নেওয়া করে ফেলেছিলো নিজেরাই বুঝতে পারেনি। রেশমি খুব চঞ্চল প্রকৃতির আর খুব মিশুকে ছিলো। কিকরে যেনো অনির মনের সব কথা পড়ে নিতো। অনির খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছিলো। লাজুক শান্ত কম কথা বলা অনির্বাণ ধীরে ধীরে কেমন বদলে যাচ্ছিলো। ছেলের এই বদল অনির মায়ের ও চোখে পড়ে। কিন্তু ছেলে কিছুতেই মুখ ফুটে মাকে মনের কথা বলতে পারে না।


সেদিন অনির মুড অফ ছিলো। রেশমির শরীর ভালো না থাকায় আজ অফিস আসতে পারেনি। রেশমির সাথে একদিন না দেখা হলে অনির কিছুই ভালোলাগেনা। সেদিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরে চমকে ওঠে সে। দেখে মা আর রেশমি দুজনে বসে গল্প করছে। উচ্ছ্বল নদীর মতো কলকল করে কথা বলছে তার রেশমি, আর মাও সমান তালে যোগ দিয়েছে। অনি কে দেখেই রেশমি দৌড়ে এসে বলে, এই যে মিস্টার এতো লাজুক হলে চলে! কাকিমা কতো ফ্রেন্ডলি, তাও আমাদের কথাটা জানাতে পারলে না। কাকিমা কেই কতো কষ্ট করে আমাকে খুঁজে আনতে হলো বলোতো। কেমন লাগলো এই সারপ্রাইজ বলো। অনি লজ্জা পেয়ে বলে ওঠে, ওফফ্ মা তুমিও না সত্যি!


তারপর আর দেরী হয়নি। অনি আর রেশমির চার হাত এক হয়ে যায় দুই বাড়ির সম্মতিতে। দিনগুলো খুব ভালো কাটছিলো। বিয়ের দুবছর পরে ওদের ঘর আলো করে আসে মুনিয়া, ওদের মেয়ে। মা হওয়ার পর রেশমি কেমন বদলে যায়, ওর চঞ্চলতা কেমন যেনো উধাও হয়ে যায়। পরম স্নেহে মেয়েকে আগলে রাখে সবসময়। রেশমির এই মাতৃ রূপ দেখে অনি যেনো ওকে আরো আরো বেশি ভালোবেসে ফেলে। 


মুনিয়া যখন প্রথম হাঁটতে শেখে ওফফ্ রেশমির সে কি আনন্দ। মুনিয়া টলমল পায়ে এগিয়ে এসে রেশমি কে জড়িয়ে ধরতো, মা মেয়ে দুজনেই একসাথে হেসে উঠতো। রেশমি বলতো, এই অনি মুনিয়া কবে আমায় মা বলে ডাকবে গো। আমি যে আর অপেক্ষা করতে পারছি না। আমার মুনিয়া দেখবে আগে মা বলবে, তারপর বাবা বলে ডাকবে। 


কিন্তু বিধাতা মনে হয় অন্য কিছু ভেবে রেখেছিলেন। হায় রে কপাল, রেশমির আর মা ডাক শোনা হলো না। ছোট্ট মুনিয়া হঠাৎই মাত্র তিনদিনের জ্বরে ওদের ছেড়ে চলে গেলো সারাজীবনের মতো। সেই থেকে আজ ছমাস হয়ে গেলো, রেশমি আর একটাও কথা বলেনি। ডাক্তার বলেছেন, রেশমির কথা বলার ইচ্ছেটাই নেই। 

ও নিজে না চাইলে কেউ ওকে কথা বলাতে পারবে না।এই আঘাত ওর ভেতরের বাঁচার ইচ্ছে টাকেই মেরে দিয়েছে। এক জীবন্ত লাশ হয়ে গেছে ওর রেশমি।


হঠাৎ গায়ে ঠ‍্যালা লাগায় হুঁশ ফিরলো অনির। দেখলো তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার ছোটবেলার প্রিয় বন্ধু ঋত্বিক ও তার বাগদত্তা হেনা। "কি রে অনি কি হয়েছে তোর, এখানে এভাবে একা বসে আছিস। চোখ মুখের এই অবস্থা কেনো। রেশমি কেমন আছে বল। সব ঠিক তো!"

 ওদের দেখে আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলো না অনি। ডুকরে কেঁদে উঠে বললো, কিছু ঠিক নেই রে কিছু না। এক নিশ্বাসে সব কথা বলে চললো অনি। ঋত্বিক আর হেনার চোখেও জল। অনি বলে ওঠে, তোরা ছিলিস না, তাই তোদের কিছু জানানো হয়নি রে।  ভগবান এতো শাস্তি দিলেন কেনো বলতো। আগের রেশমিকে কি আর কখনো ফিরে পাবেও না বল।। আজ ভ‍্যালেন্টাইনস ডে। সবাই কতো খুশি, শুধু তাদের জীবন থেকেই যেনো সব আনন্দ চীরতরে হারিয়ে গেছে। 


হেনা বলে, অনিদা সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি বলছি, কাল শুধু রেশমি দিকে নিয়ে তোমায় এক জায়গায় যেতে হবে। আমরাও যাবো তোমার সাথে। কাল সকালে আমরা গাড়ি নিয়ে আসবো তোমার বাড়িতে। তৈরী করে রেখো। এখন বাড়ি যাও। অনেক দেরী হয়ে গেছে। সব ডিটেইলস তোমাকে আমি মেসেজ করে জানিয়ে দেবো।


পরদিন কথা মতো, হেনা আর ঋত্বিক হাজির সঠিক সময়ে। অনি মায়ের সাথে সব কথা বলেই রেখেছিলো, মায়ের কোনো অমত নেই। রেশমি কে নিয়ে গাড়িতে উঠলো অনি। রেশমি ওদের দিকে একবার ও দেখলো না। সারা রাস্তা সবাই চুপচাপ। রেশমির অবস্থা দেখে হেনার চোখেও জল। এক সন্তানহারা মায়ের কষ্ট সে সহ‍্য করতে পারছে না। গাড়ি এসে থামলো এক সবুজ গাছ-গাছালি তে ভরা ছোট ছোট বাচ্চাদের কলকাকলিতে ভরা এক আশ্রমের সামনে। এক গাছের তলায় রেশমি কে নিয়ে গিয়ে বসালো অনি। চোখের সামনে কতো গুলো বাচ্চা কে খেলতে দেখে রেশমি একটু যেনো কেঁপে উঠলো। 


হেনা আর ঋত্বিক এক বছর পাঁচেকের বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে এলো রেশমির সামনে। বাচ্চা মেয়েটি রেশমির হাত ধরে বলে উঠলো, মামনি তুমি আমায় নিতে এসেছো। ও মামনি কথা বলো, এতো কেনো দেরি করলে বললো। আমায় এখানে একা রেখে কোথায় চলে গেছিলে বলো। আমার বুঝি তোমায় ছেড়ে থাকতে কষ্ট হয় না। মামনি.. মামনি.. কেনো কিছু বলছো না, আমায় ভুলে গেলে তুমি। এই আকুল মায়াভরা ডাক শুনে রেশমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা। মেয়ে টিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে, বলে ওঠে, সোনা এই তো আমি এসে গেছি। আর তোমায় একা থাকতে হবে না। আমার সাথে বাড়ি যাবে তো এবার। এই দৃশ্য দেখে কেউ চোখের জল ধরে রাখতে পারেনা। এক মা তার সন্তান পেলো। আর এক।সর্বহারা সন্তান পেলো তার মা, তার নতুন ঠিকানা।


হেনা রেশমির পাশে বসে বলে, কেনো নিজেকে এতো কষ্ট দিলে। একবার অনি দার দিকে তাকিয়ে দেখো। অনি দা কতো কষ্ট পেয়েছে বলো। কাল ভাগ‍্যিস আমাদের সাথে অনি দার দেখা হলো। এই আশ্রম আমার কাকুর। এই তোমার সোনা মা, বাচ্চা মেয়েটির বাবা ওর এক বছরের মাথায় মারা যায়। তারপর ছমাস আগে এক অ্যাক্সিডেন্টে ওর মাও চলে যায়। তারপর থেকে ও এখানেই আছে। সারাক্ষণ মামনি মামনি বলে কেঁদে ওঠে। নিয়তি দেখো, তোমার কথা শোনার পর ওর কথাই প্রথম মাথায় আসে। তুমি ওকে আগলে রেখো রেশমি দি, ও যে আজ তোমায় মা ডাক শোনালো। ও তো "আগমনি"। আগমনির আগমনে তোমাদের জীবন আবার আগের মতো হয়ে যাবে দেখো। ভগবান যেমন কিছু নেন, বিনিময়ে ফিরিয়েও দেন। তোমরাও পেলে তোমাদের আগমনি কে।


সমাপ্ত..

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)