মহাকাল মিত্রের বাড়ি | মিলন পুরকাইত

0

মহাকাল মিত্রের বাড়ি

মিলন পুরকাইত 



প্রায় একইসঙ্গে দুই ভদ্রলোক এসে উপস্থিত হলেন সৃঞ্জয় সেনগুপ্তর সঙ্গে আলাপ করতে। কলকাতার অদূরে কিন্তু বেশ শান্ত-স্নিগ্ধ এক মফঃস্বল পরিবেশে এই বাড়িটা কিনেছেন লেখক সৃঞ্জয় সেনগুপ্ত। আজ ভোরেই নিজের মালপত্র নিয়ে হাজির হয়েছেন এই বাড়িতে। সঙ্গে একমাত্র চাকর ঝন্টু। সৃঞ্জয়বাবু ব্যাচেলর মানুষ। তাই তার জিনিসপত্রও বেশী নয়। ঝন্টু একাহাতেই সেগুলো দ্রুত সামলে নিয়েছে। একটু বেলা বাড়লে ঝন্টু কাছের বাজারে গেলে সৃঞ্জয়বাবু বাড়ির একতলার বারান্দায় তার আরামকেদারায় বসে একটা বই পড়ছিলেন। ঠিক তখনই এই দুই ভদ্রলোকের একে একে আবির্ভাব। প্রথমজন নিজের পরিচয় দিলেন অবিনাশ ভট্ট। তিনি থাকেন সৃঞ্জয়বাবু যে বাড়িটি কিনেছেন ঠিক তার পাশের বাড়িতেই। দুটি বাড়ির মধ্যে একটিই পাঁচিল। অবিনাশবাবুর বাড়িটা বেশ ছোট। আর দ্বিতীয়জন হলেন স্থানীয় থানার দারোগা সুখদেব মাইতি। সুখদেববাবুও এই এলাকাতেই থাকেন। তবে তার বাড়ি সৃঞ্জয়বাবুর বাড়ি থেকে কিছুটা তফাতে। ইতিমধ্যে ঝন্টুও বাজার থেকে ফিরে আসায় সৃঞ্জয়বাবু তাকে সকলের জন্য চা তৈরি করতে বললেন। চা-জলখাবার সহযোগে তিনজন বারান্দায় বসে কথা বলছিলেন।

চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে অবিনাশবাবু সৃঞ্জয়বাবুকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘যাই বলুন মশাই, এ বাড়ি আপনি জলের দরে পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তার পেছনে কারণও আছে। বাড়িতে প্রবেশ করার আগে আপনার একটা গৃহপ্রবেশ বা যাগযজ্ঞ করে শুদ্ধিকরণ করে নেওয়া উচিত ছিল’।

‘একথা কেন বলছেন?’ জানতে চাইলেন সৃঞ্জয়বাবু।

অবিনাশবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘বলছি কি আর সাধে। এই বাড়ি আপনি যার কাছ থেকে কিনেছেন সে নিজেও তো এখানে টিকতে পারেনি। তাই বাইরের লোক পেয়ে আপনাকে গছিয়ে সে চম্পট দিয়েছে। বাড়ি কেনার আগে আপনার একটু খোঁজখবর করার উচিত ছিল’।

সৃঞ্জয়বাবু একটা মৃদু হাসি হেসে বললেন, ‘আমার বাড়িটা দেখেই বেশ পছন্দ হয়। এখানকার পরিবেশটা দারুণ। এই রকম পরিবেশে নিরিবিলিতে লেখালেখির কাজ, সাহিত্য সৃষ্টির কাজ খুব ভালো হয়। তাই বাড়িটা কেনার সময় আর দ্বিতীয়বার ভাবিনি। কিন্তু আপনি একথা কেন বলছেন বলুন তো?’

অবিনাশবাবু আবার বলতে শুরু করলেন, ‘বলার কারণ আছে। আপনাকে আগে জানলে আমি এ বাড়ি কিনতে মানা করতাম। এ বাড়ির আসল মালিক কে ছিল জানেন? মহাকাল মিত্র। একসময় এই অঞ্চলের দোর্দন্ডপ্রতাপ জমিদার ছিলেন এই মহাকাল মিত্র। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানারকম ভীমরতি দেখা দেয় ওনার। শেষ বয়সে নাকি কাপালিক হয়ে গিয়েছিলেন। নরবলি দিতেন। নিজের এই ভাইপোকেও নাকি নরবলি দেন। এই বাড়ির তলায় একটা সুড়ঙ্গ আছে। সেখানে নাকি নরবলি দেওয়া মানুষের দেহগুলো লুকিয়ে রাখতেন। ঐরকম একটা সাংঘাতিক লোক মরার পরও কি সবাইককে নিস্তার দেবে। যদিও এই নরবলির ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর এলাকার বাসিন্দারা এই বাড়ি আক্রমণ করে মহাকাল মিত্রকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। একে পিশাচসিদ্ধ তার ওপর আবার অপঘাত মৃত্যু। তাই মহাকাল মিত্র মরার পর থেকে তার অতৃপ্ত আত্মা নাকি এই বাড়িতে রয়েছে। তাই সেই আত্মাই নাকি এই বাড়িতে কাউকে টিকতে দেয় না’। 

সৃঞ্জয়বাবু আবারও একটু হেসে বললেন, ‘অবিনাশবাবু আপনার কাহিনী শুনলে সত্যি শিহরণ জাগে তবে আমি ভূতে-ভগবানে কোনও কিছুতেই বিশ্বাস করি না। তাই এইসব আত্মা-টাত্মারা আমাকে কখনও বিরক্ত করেনি। আমার এই বাড়িতে কোনও অসুবিধাই হবে না। আপনি কি বলেন সুখদেববাবু’।

দারোগা সুখদেব মাইতি এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিলেন। এবারে চা শেষ করে একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, ‘আমিও ভূত প্রেতে বিশ্বাস করি না সৃঞ্জয়বাবু। তবে এটা সত্যি এই বাড়িকে ঘিরে একটা রহস্য আছে। যাই হোক সৃঞ্জয়বাবুর যদি কোনও অসুবিধা হয় আপনি বিনা দ্বিধায় আমার কাছে আসবেন। আচ্ছা অবিনাশবাবু এই বাড়িতে একটা সুড়ঙ্গের কথা কি যেন বলছিলেন?’

অবিনাশবাবু বললেন, ‘এ বাড়িতে একটা সুড়ঙ্গ আছে। ঠাকুর্দার কাছে শুনেছিলাম এই বাড়ির নীচে গুদামঘরের মধ্যে দিয়ে কোনও একটা সুড়ঙ্গ আছে। তবে সেটা একজাকটলি কোথায় এবং কোথায় সেটা যায় সেসব আমি জানি না। তবে ঠাকুর্দার কাছে শুনেছিলাম যে সেই লুকানো সুড়ঙ্গে নাকি মহাকাল মিত্র নরবলি দেওয়া মানুষের দেহ লুকিয়ে রাখত’। 

‘হুম’ বলে একটু গুম হয়ে থাকলেন সুখদেব মাইতি। মনে হল কিছু মনে করার চেষ্টা করছেন। তারপরই হঠাত উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমি এখন চলি। একটা জরুরী কাজ আছে। থানাতেও যেতে হবে। যাইহোক সৃঞ্জয়বাবুর সঙ্গে আলাপ হয়ে ভালো লাগল। আপনার লেখার সঙ্গে আগেই পরিচিত ছিলাম এখন সামনাসামনি আলাপ হয়ে আরও ভালো লাগল’।

সুখদেববাবু সৃঞ্জয়বাবুর সঙ্গে করমর্দন করে বেরিয়ে গেলেন। অবিনাশবাবু আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা চালিয়ে তারপর উঠলেন।

সারাটা দিন বেশ ভালোই কাটল সৃঞ্জয়বাবুর। বিকেলের দিক থেকে শরীরটা একটু ক্লান্ত লাগছিল। আজ আর লেখালিখির চাপ নেবেন না স্থির করলেন। বিকেলের দিকে নতুন জায়গাটা একটু ঘুরে দেখে এলেন। সন্ধ্যের দিকে নিজেকে ডুবিয়ে রাখলেন একটি বিদেশী উপন্যাসে। একটু রাত বাড়তেই অদ্ভুত নিস্তব্ধ হয়ে এল চারপাশ। কলকাতার শহুরে হাঁকডাকের থেকে এখানকার রাত ভীষণ আলাদা। মনটা যেন প্রশান্ত হয়ে গেল সৃঞ্জয় সেনগুপ্তর। রাতে খাবারটাও যেন অন্যান্য দিনের থেকে একটু বেশিই খেলেন আর তারপর রাতে বিছানায় শোওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমটাও চলে এল দ্রুত।

সৃঞ্জয়বাবু কতক্ষণ ঘুমিয়েছেন ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না, কিন্তু একটা বিশেষ উগ্র গন্ধে আর একটা অদ্ভুত শব্দে ঘুম ভেঙে গেল তার। ঘরের মধ্যে একটা আবছা আলো টের পেলেন। সেটা কোথা থেকে আসছে বুঝতে পারলেন না। একটা হাল্কা ধোঁয়া আর কর্পূর মেশানো ধুনোর গন্ধ টের পেলেন। ব্যাপারটা কি হচ্ছে সেটা ঠাওর করার আগেই তার মনে হল কেউ যেন তার শোওয়ার ঘরে ঢুকেছে। আরেকটু ভালো করে ঠাওর করে সৃঞ্জয়বাবু বুঝলেন যে তিনি যা ভাবছেন তা ভুল নয়। ঘরের ভেতর আরেকজন মানুষের ছায়ামূর্তি দেখা গেল। সৃঞ্জয়বাবু একটু অপ্রস্তুত ভয়মিশ্রিত কন্ঠে বলে উঠলেন, ‘কে? কে ওখানে?’ 

সঙ্গে সঙ্গে একটা অদ্ভুত হাসির শব্দ আর সেই শব্দ ভেদ করে একটা মানুষ এগিয়ে এল সৃঞ্জয়বাবুর দিকে। অন্ধকারে সবটা বোঝা না গেলেও সৃঞ্জয়বাবু বুঝলেন একজন বয়স্ক মানুষ তার দিকে এগিয়ে আসছেন। লোকটা সৃঞ্জয়বাবুর বিছানার একদম কাছে এসে পড়লে সৃঞ্জয়বাবু দেখলেন এক বয়স্ক মানুষের মুখ। লোকটির মুখে ওপর অদ্ভুত একটা আলো ঠিকরে পড়ছে। সেই আলোতে বয়স্ক হলেও লোকটাকে বেশ ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে। চোখ দুটো ভাঁটার মত জ্বলছে। দুটো হাতই একটা কালো চাদরের নীচে ঢোকানো।

সৃঞ্জয়বাবু বেশ ভয়ার্ত কন্ঠে বললেন, ‘আ...আপনি কে? কি চাই?’

লোকটি বর্জ্রগম্ভীর কন্ঠস্বরে বলে উঠল, ‘আমি মহাকাল মিত্র। আমার নরবলি চাই’।

হাত পা ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল সৃঞ্জয়বাবুর। তিনি ভয়ে কাঠ হয়ে বললেন, ‘কি...কি...চাই...বললেন?’

‘নরবলি’, বলেই লোকটা নিজের চাদরের তলা থেকে তার বাঁ হাতটা বের করল, আর ঐ অল্প আলোতেও সৃঞ্জয়বাবু স্পষ্ট দেখলেন লোকটির বাঁ হাতে ধরা রয়েছে একটা মানুষের কাটা কুন্ডু। সদ্য কাটা সেই মুন্ডু থেকে তখনও টপ টপ করে রক্ত পড়ছে। সারা গায়ে বীভৎস শিহরণ খেলে গেল সৃঞ্জয়বাবুর। তার মনে হল ভয়েই তিনি জ্ঞান হারাবেন। কিন্তুীই পরিস্থিতিতে সংজ্ঞা হারালেন না দেখে নিজেই কেমন অবাক হয়ে গেলেন। আগন্তুক মহাকাল মিত্রের আত্মা তখন চাদরের তলা থেকে নিজের ডান হাতটা বের করল। সেই হাতে উদ্যত হয়ে রয়েছে একটা চকচকে খাঁড়া। সেটা উঁচিয়ে সে বলে উঠল, ‘এবারে তোর পালা’।

এবারে অবশ্যই সৃঞ্জয়বাবু অজ্ঞান হয়ে যেতেন। কিন্তু তার অজ্ঞান হওয়ার আগেই পেছন থেকে একটা আওয়াজ এল, ‘হল্ট। হ্যান্ডস আপ। নড়ার চেষ্টা করলেই গুলি করব। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই একঝাঁক লোক ঘরে ঢুকে পড়ল আর সেইসঙ্গে ঘরের বাতিগুলোও জ্বলে উঠিল।

সৃঞ্জয়বাবু অবাক হয়ে দেখলেন দারোগা সুখদেব মাইতি সম্পূর্ণ পুলিশের পোশাকে বেশ কয়েকজন কনস্টেবলকে নিয়ে ঘরে ঢুকে এসেছেন। তাদের সঙ্গে ঝন্টুও রয়েছে। সুখদেব মাইতি দ্রুত এগিয়ে এলেন মহাকাল মিত্রের আত্মার দিকে আর তারপর তার হাত থেকে খাঁড়াটে কেড়ে নিয়ে এক-এক টানে লোকটার নকল চুল দাড়ি সব টেনে খুলে ফেললেন। তার ফলে যে মুখটা বেরিয়ে পড়ল তাকে একবারের জন্য সৃঞ্জয়বাবু দেখেছেন। সকালে লোকটাকে অবিনাশবাবুর বাড়িতে ঘাস কাটতে দেখেছিলেন। অবাক হয়ে সৃঞ্জয়বাবু সুখদেব মাইতিকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন করলেন, ‘কি ব্যাপার বলুন তো? এসব কি হচ্ছে?’

সুখদেববাবু ততক্ষণে লোকটার হাত থেকে কাটামুন্ডুটা নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছেন। সেটা উঁচিয়ে সৃঞ্জয়বাবুকে দেখিয়ে বললেন, ‘এটা নকল কাটামুন্ডু। ফাইবারের তৈরি। রক্তটাও নকল। কিন্তু তৈরি হয়েছে নিপুণ হাতে। অন্ধকারে ভয় দেখাতে আসল কাটামুন্ডু বলে চালিয়ে দেওয়া সহজ। এর নাম নকুল। আগে যাত্রা করত। যাত্রা কোম্পানিতে একবার চুরি করে হাজতবাস করেছে। এখন মহাকাল মিত্রের ভূত সেজে লোককে ভয় দেখানোর কাজ করে। যাতে এই বাড়িতে কেউ বেশীদিন টিকতে না পারে’।

‘কিন্তু কেন?’ আবারও প্রশ্ন করলেন সৃঞ্জয় সেনগুপ্ত।

সুখদেব মাইতি আবার বললেন, ‘তার কারণ এই বাড়ির নীচে যে গুদামঘর রয়েছে, তার লাগোয়া একটা সুড়ঙ্গ রয়েছে। সেই ঘর আর সুড়ঙ্গ নানারকমের চোরাকারবারে ব্যবহার হয়। আর এই বাড়িতে লোক বসবাস করলে সেসব কাজ-কারবার বন্ধ হয়ে যাবে। তাই ভূতের ভয় দেখিয়ে লোক ভাগাতে পারলেই কাজ হাসিল। তবে এই নকুল একা নয়। এর আরও দুজন সাথী রয়েছে। তাদেরকেও গ্রেপ্তার করেছি। আর এদের পান্ডা কে জানেন? কার জন্যে এরা কাজ করে জানেন?’

সম্পূর্ণ ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থায় সৃঞ্জয়বাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে? কে সে?’

সুখদেব মাইতি তার এক কনস্টেবলকে চোখের ঈশারা করতেই সে ঘরের বাইরে গিয়ে আরেকজন কনস্টেবলের সাথে একটা হাতকড়া পরানো লোককে টানতে টানতে নিয়ে এসে ঘরে ঢোকালো। সৃঞ্জয়বাবু আরও অবাক হয়ে গেলেন সে লোককে দেখে। তার মুখ দিয়ে শুধু বেরোলো, ‘এ...এ...এ...এতো অবিনাশবাবু’।।

কাঁচুমাচু মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা অবিনাশবাবুর দিকে এগিয়ে গিয়ে সুখদেব মাইতি বললেন, ‘ঠিক বলেছেন। এই অবিনাশ ভট্টই এই চোরাকারবারিদের পান্ডা। ওনার ওপর আমাদের দীর্ঘদিন সন্দেহ ছিল। আমার আগে যিনি এই থানার দারোগা ছিলেন তিনি বেশ কয়েকবার অবিনাশবাবুর বাড়ি সার্চ করেও ব্যর্থ হন। কারণ পুলিশ হানা দিলে বা দেওয়ার খবর হলেই উনি ওনার বাড়ির চোরাই মাল সুড়ঙ্গ পথে এই বাড়ির গুদাম ঘরে পাচার করে দিতেন। বাড়ি খালি থাকলে ঐ সুড়ঙ্গের মাধ্যমে সেইসব জিনিস এবাড়ির গুদামে রাখতে সুবিধা হয়। কিন্তু সেটা আমাদের কারওর মাথায় আসছিল না। সকালে উনি যখন আপনাকে ভয় দেখাতে মহাকাল মিত্রের নরবলির কথাপ্রসঙ্গে ওনার ঐ সুড়ঙ্গ আর ওনার ঠাকুর্দার কথা বললেন তখনই বিষয়টা আমার মাথায় ক্র্যাক করে। আমি এই অঞ্চলের স্থানীয় লোক হওয়ায় এখানকার সব কাহিনীগুলোর সাথে আমিও পরিচিত আছি। আমার ঠাকুর্দা বলতেন মহাকাল মিত্রকে নাকি তন্ত্র সাধনা শিখিয়েছিলেন এই অবিনাশ ভট্টের পূর্বপুরুষ অনাদিনাথ ভট্ট। সেই লোকই নাকি মহাকাল মিত্রকে নরবলি দিয়ে তন্ত্রসিদ্ধ হতে বলেছিল। যদিও মহাকাল মিত্রকে এখানকার লোক আক্রমণ করার বহু আগেই অনাদি ভট্টের মৃত্যু হয় কিন্তু অবিনাশবাবুর কথা শুনে মনে হল সুড়ঙ্গের ব্যাপারটা ভট্টবাড়ির লোক বোধহয় বংশানুক্রমে জানে। কারণ তান্ত্রিকগুরুর পরামর্শে যদি মহাকাল মিত্র ওই সুড়ঙ্গ তৈরি করে থাকেন তাহলে তার একটা মুখ অবশ্যই সেই গুরুর বাড়ি অবধি যাবেই। তাই মনে হল এই বাড়ি আর অবিনাশবাবুর বাড়ির মধ্যেই নিশ্চয় সেই সুড়ঙ্গের যোগ রয়েছে। বাকিটা তখনই জলের মত পরিষ্কার হয়ে গেল। আমাদের কাছে খবর ছিল আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই একটা বড় চোরাচালানের জিনিসপত্র এখানে আসতে চলেছে। তাই আপনাকে ভূতের ভয় দেখিয়ে তাড়াতে অবিনাশবাবু দেরী করবেন না সেই বিশ্বাস ছিল। তাই দুপুর থেকেই আমার হুকুমে পুলিশের লোক আড়াল থেকে নজর রাখছিল এই দুই বাড়ির ওপর। আমার হাঞ্চ দেখলাম একদম ঠিক। তাই আজ রাতেই বমাল সমেত অবিনাশবাবু আর তার শাগরেদদের শ্রীঘরে নিয়ে যাবার বন্দোবস্ত করতে পারলাম’।

সুখদেব মাইতির কথা শেষ হতেই পুলিশকর্মীরা অবিনাশবাবু, নকুল তার তাদের বাকি শাকরেদদের নিয়ে সৃঞ্জয়বাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাড়ির বাইরে অপেক্ষারত পুলিশ ভ্যানে তুলল। সৃঞ্জয়বাবুর কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হওয়ায় তার হতভম্ব ভাবটা কেটে গেছে। দারোগা সুখদেব মাইতির দিকে করমর্দনের হাত বাড়িয়ে দিয়ে সৃঞ্জয় সেনগুপ্ত বললেন, ‘আপনি যা ভেলকি দেখালেন তা গল্প-উপন্যাসকেও হার মানায়। এই বাড়িতে প্রথম রাতেই এমন একটা অভিজ্ঞতা হবে এটা কল্পনার অতীত ছিল। যাই হোক আমি তো লেখক মানুষ, তাই এই ঘটনাটা নিয়ে একটা কাহিনী লেখার প্লট মাথায় আসছে। তাই বলছি এই ঘটনাটা নিয়ে একটা কাহিনী লিখলে, অবশ্যই নামধাম বদলে, আপনি নিশ্চই আপত্তি করবেন না। অবশ্য প্রকাশককে আমি জানিয়ে দেব যে কৃতজ্ঞতায় সবার ওপরে আপনার নামটি যেন ছাপা হয়। কি বলেন?’

সৃঞ্জয়বাবুর বাড়িয়ে দেওয়া হাতে করমর্দন করে সুখদেব মাইতি বললেন, ‘আপত্তি করার প্রশ্নই ওঠে না। আপনার মত লেখক এই ঘটনা নিয়ে কাহিনী লিখছেন এবং আমাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এটা আমারও কল্পনার অতীত। ইটস মাই প্লেজার। চলি তাহলে’।

অপরাধীদের ভ্যানসহ নিজের পুলিশ জিপ নিয়ে ভোর রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে এগিয়ে চললেন দারোগা সুখদেব মাইতি ও অন্যান্য পুলিশকর্মীরা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)