মোটিভ
মিলন পুরকাইত
বিখ্যাত ক্রিমিনাল সাইকোলজিস্ট ডঃ হিমাদ্রিশেখর দত্ত একটা বিশেষ সেলের মধ্যে অপেক্ষা করছিলেন। তার পরামর্শ অনুযায়ী এই সেলের পরিবেশ, আলো সব তৈরি করা হয়েছে। একটা টেবিল চারটে চেয়ার, ঘরের ডানদিকে একটা লাল বাল্ব, বাঁদিকে দরজার কাছে একটা হাল্কা নীলাভ বাল্বের আলো আর মাঝখানের টেবিলের ওপর একটা জোরালো লাইট যেটা শুধুমাত্র টেবিলটাকেই আলোকিত করেছে। ঘরের কোণাগুলোতে একটা অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
আসলে এই ঘরটাকে একটা বিশেষ ইন্টারোগেশন রুমে পরিণত করা হয়েছে। কিছুদিন আগে শহরের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনাল সাইকোলজি বিভাগের অত্যন্ত কৃতী ছাত এবং গবেষক সার্থক সেন খুন হয়েছে। সেই খুনের দায়ে পুলিশ কিছু কিছু সারকামশিয়াল এভিডেন্সের ভিত্তিকে সার্থকের সতীর্থ এবং হোস্টেলের রুম পার্টনার যুগল সিনহা কে গ্রেপ্তার করেছে। খুনটা করা হয়েছে সার্থককে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে তারপর তাকে শ্বাসরোধ করে। এমনভাবে যে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছিল যে হঠাত ঘুমের মধ্যেই শ্বাসের সমস্যা হওয়াতে সার্থকের মৃত্যু হয়েছে। এমনিতেও সার্থকের হাঁপানির সমস্যা ছিল। সেইভাবে হঠাত কার্ডিয়াক এরেস্ট হতেই পারত, কিন্তু বিস্তারিত ফরেনসিক তদন্ত এবং ডিটেল পোস্টমর্টেমের পর প্রমাণ হয়েছে সার্থককে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে তারপর তার শ্বাসরোধ করা হয়েছে। যদিও সার্থকের দেহে কারও ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যায়নি, তবে সেটা আশ্চর্য কিছু না। খুনি গ্লাভসজাতীয় কিছু হাতে পড়ে ফিঙ্গারপ্রিন্টের ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু সার্থকের মৃত্যুর সময় যেটা পোস্ট মর্টেমে উঠে এসেছে সেই রাত একটার কাছাকাছি সেইসময় তার ঘরে একমাত্র যুগল, তার রুমমেটই উপস্থিত ছিল এবং খুনের সুযোগও ছিল একমাত্র যুগলের কাছেই। যে বিষয়ের কথা তদন্তকারী অফিসার জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন তার রিপোর্টে। কিন্তু যুগল এ বিষয়ে কিছুতেই কিছু স্বীকার করছে না। ধমকি, থার্ড ডিগ্রি, লাই-ডিটেক্টর টেস্ট প্রভৃতি সবকিছুতেই সে উতরে গেছে। কোনওভাবেই তাকে দিয়ে কিছু স্বীকার করানো যাচ্ছে না। আর সবচেয়ে বড় বিষয় পুলিশ এখনও খুনের মোটিভটা সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেনি। ফলে এই অবস্থায় যুগলকে আদালতে তোলার আগে তার বিরুদ্ধে জোরালো চার্জশিট তৈরি করা যাচ্ছে না। সেই কারণেই পুলিশ বিভাগ থেকে বিহেভিওরাল ক্রিমিনাল সাইকোলজির বিশেষজ্ঞ ডঃ হিমাদ্রিশেখর দত্ত’র স্মরণাপন্ন হয়েছে পুলিশ। এর আগেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে ডঃ দত্ত পুলিশভাগকে বিভিন্ন কেসে সাহায্য করেছেন। তাই এক্ষেত্রেও তাকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সেলের একদিকের ভারী লোহার দরজা খুলে গেল। হাতকড়া পরানো অবস্থায় একটি অল্পবয়সী ছেলেকে নিয়ে দুজন পুলিশ অফিসার সেলের মধ্যে প্রবেশ করলেন। ডঃ দত্ত আগেভাগেই এই কেসের বিস্তারিত বিবরণ পুলিশ ফাইলস থেকে পড়ে নিয়েছেন। সেইমতো তিনি ইন্টারোগেশন রুমের পরিবেশ তৈরি করেছেন, পরিকল্পনা করেছেন এবং পুলিশ বিভাগকেও সেইমতো নির্দেশ দিয়েছেন। হিমাদ্রিবাবুর পরিকল্পনা অনুযায়ী ইন্টারোগেশন সেলে যে দু’জন পুলিশ অফিসার উপস্থিত থাকবেন তাদের একজন হলেন এই কেসের তদন্তকারী অফিসার অজিত ভদ্র এবং অন্যজন পুলিশ বিভাগ থেকে মনোনীত অফিসার সিরাজুল শেখ। তবে আসামীর সঙ্গে কথাবার্তা ডঃ দত্তই বলবেন। দুই পুলিশ অফিসার হিমাদ্রিবাবুর অনুমতি ছাড়া ইন্টারোগেশন চলাকালীন কোনও কিছু বলবেন বা করবেন না। একমাত্র হিমাদ্রিবাবু নিজের দায়িত্বে তাদেরকে কিছু বলতে বা করতে বললে তারা সেই অনুযায়ী পদক্ষেপে গ্রহণ করবেন। যুগলের আইনজীবী এবং পুলিশের আইনজীবী দুজনেই এই প্রেমিসেসে উপস্থিত আছেন তবে তারা ইন্টারোগেশন রুমের ভিতরে প্রবেশ করবেন না। পুলিশের তরফে একজন ডাক্তারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে তবে তিনিও দুই আইনজীবীর সঙ্গে ইন্টারোগেশন সেলেন বাইরে রয়েছেন। পুলিশ বিভাগ থেকে এই মর্মে আদালতের বিশেষ অনুমতি নেওয়া হয়েছে।
ডঃ হিমাদ্রিশেখর দত্ত আগে থেকেই নিজের জন্য বাছাই করা চেয়ারটাতে বসে ছিলেন। দুই পুলিশ অফিসার যুগলকে নিয়ে এসে হিমাদ্রিবাবুর ঠিক উল্টোদিকের চেয়ারে বসিয়ে নিজেরা টেবলের দুই পাশের দুই চেয়ারে বসলেন। হিমাদ্রিবাবু ভালো করে কিছুক্ষণ যুগলকে পরখ করতে লাগলেন। যুগলও সোজা চেয়ে রইলও হিমাদ্রিশেখরবাবুর দিকে। হিমাদ্রিবাবু লক্ষ্য করলেন যুগলের চেহারা আপাত নিরীখ। উল্লেখযোগ্য কিছু নেই তার চেহারায়। সবদিক থেকেই সাধারণ। টেবিলের ওপর ঝুলতে থাকা জোরালো কভার দেওয়া বাল্বের আলোটিকে একটু সরিয়ে নিয়ে যুগলের মুখের ওপর ফেললেন হিমাদ্রবাবু। যুগল একবার একটু চোখ কুঁচকে নিয়েই আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। হিমাদ্রিবাবু সেদিকে তাকিয়ে থাকলেন। গভীর চোখের মণি যুগলের। ঘন কালো এবং সেই চোখে অনেককিছু যেন চলছে। যদিও ওপরসা মুখের ভাবপ্রকাশে সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন যুগল। হিমাদ্রিবাবু কিছুক্ষণ স্থিরভাবে চেয়ে রইলেন যুগলের দুইচোখের দিকে। তার মনে হল যুগলও একইভাবে তাকিয়ে রয়েছে তার চোখের দিকে। অর্থাৎ নিজের মধ্যে কোনও অপরাধবোধ নেই যুগলের। সেই কারণেই সে লাই-ডিটেক্টর টেস্ট উতরে গেছে। অপরাধবোধ থাকলে এভাবে সে হিমাদ্রিবাবুর চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকত পারত না। হিমাদ্রিবাবু আরেকটু সামনে ঝুঁকে পড়লেন যুগলের দিকে। তিনি কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলেন যুগলকে কিন্তু তার আগে ছন্দপতন ঘটিয়ে যুগলই তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি আপনার অনেক নাম শুনেছি স্যার। আপনার লেখা বইও পড়েছি। ভেবেছিলাম আমার থিসিসের বিষয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করব। কিন্তু এখানে এভাবে যে আপনার সঙ্গে দেখা হবে সেটা ভাবিনি কোনওদিন’।
একটু অবাক হলেন হিমাদ্রিবাবু, যুগলের এই ব্যবহার বলছে যে সে মনের দিক থেকে নিজেকে নির্দোষ মনে করে। তাই এত সহজে এই কথাটা বলতে পারল সে। কিন্তু যুগলের চোখের দিকে তাকিয়ে আবারও একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করলেন হিমাদ্রিবাবু, কেমন যেন একটা আদিম হিংস্রতা রয়েছে যুগলের চোখে। তাও তিনি সহজভাবেই বললেন, ‘তাই বুঝি, তা তোমার গবেষণার বিষয় কি?’
একটা যেন হাল্কা হাসির ঝলক দেখা গেল যুগলের মুখে। সে বলল, ‘দি মেথডস ওব আলটিমেট রেজিসস্টেনস প্রসেস ওফ এ ক্রিমিনাল মাইন্ড’।
বেশ অবাক হলেন হিমাদ্রিবাবু। বেশ সাংঘাতিক বিষয়। একজন অপরাধী যে মানসিক বিষয়গুলোকে কাজে লাগিয়ে তার অপরাধের বিষয়টি প্রকাশ হওয়া থেকে গুপ্ত রাখে অর্থাৎ নিজের অপরাধকে লুকিয়ে রাখতে সক্ষম হয় সেই বিষয়গুলোর ওপর বিস্তারিত গবেষণাই যুগলের থিসিসের বিষয়। পুলিশ যে একে দিয়ে স্বীকারোক্তি উগরে নিতে পারেনি তাতে কোনও আশ্চর্য নেই। হিমাদ্রিবাবু এটাও বুঝলেন যে একে সহজে ভাঙা যাবে না। তাও তিনি হাল্কা চালেই কথাবার্তা শুরু করলেন, ‘সার্থক সেন তোমার সহপাঠী ছিল?’
যুগলও সহজভাবেই উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, তবে শুধু সহপাঠী নয় বলতে পারেন আমার খুন কাছের বন্ধু ছিল। আয়নার প্রতিবম্বের মত ছিলাম আমরা। কলেজ জীবন থেকেই এইসাথে পড়াশুনা করছি। হোস্টেলে একই রুমে দীর্ঘসময় ধরে থেকেছি। ওর অভাবটা খুব উপলব্ধি করছি’।
ভীষণ স্ট্রেট ফরোয়ার্ড কথাবার্তা যুগলের। কিন্তু কথার মধ্যে কোথাও শোকের ছাপ নেই। ভীষণ রুক্ষ। হিমাদ্রিবাবু আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার আর সার্থকের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না?’
যুগল বলল, ‘শুধু সার্থক কেন, আমার প্রত্যেক সহপাঠীর সঙ্গে আমার প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। আমি অলওয়েজ ওয়ান্টেড টু বি দ্য বেস্ট’।
‘কিন্তু এমনও তো হতে পারে সার্থক কোনওবিষয়ে তোমাকে ছাপিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি। মানে পরীক্ষার নম্বরে বা প্রোফেসরদের দৃষ্টি আকর্ষণের ক্ষেত্রে বা একাডেমিকালি অন্য কোনও বিষয়ে সে তোমার চেয়েও ভালো পারফর্ম করছিল, এমন কিছু?’ বেশ স্বাভাবিক গলায় জানতে চাইলেন হিমাদ্রিবাবু।
যুগল এবারেও ঠান্ডা গলায় বলল, ‘আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন স্যার। সার্থক মেধাবী হলেও আই হ্যাভ স্কোরড অলওয়েজ বেটার। আমি গবেষণার রেজিস্ট্রেশনও পেয়েছিলাম ওর আগেই। মাধ্যমিক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কোনও পরীক্ষায় সার্থক আমার থেকে বেশী নম্বর পায়নি স্যার। ইউ ক্যান চেক আওয়ার মার্কশিটস স্যার। অতএব এই বিষয়ে কোনও হীনমন্যতা আমার ছিল না’।
হিমাদ্রি দত্ত আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘বেশ, কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে, খেলাধূলা, সাজ-পোশাক বা তোমাদের জেনারেশনের যে বিষয়ে খুব ক্রেজ রয়েছে যেমন ধর প্রেম বা গার্লফ্রেন্ড, এইসব বিষয় নিয়েও তো প্রতিযোগিতা ঘটে, আর্থিক অবস্থান নিয়ে প্রতিযোগিতা ঘটে। তার থেকে মনোমালিন্য, ফ্রাস্ট্রেশন আসে আর তার থেকেই অপরাধবোধ। এসব কিছু ছিল না তোমার আর সার্থকের মধ্যে?’
যুগল আবার একটা হাল্কা হাসি হেসে বলল, ‘নো স্যার, নাথিং। আমাদের দুজনের পারিবারিক অবস্থা বিশেষ করে অর্থনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড প্রায় একইরকম। গার্লফ্রেন্ড আমাদের দুজনেরই আছে এবং তাদের প্রতি আমরা দুজনেই যথেষ্ঠ লয়াল। অতএব সেই নিয়ে কোনও মনোমালিন্যের প্রশ্নই ওঠে না। খেলাধূলাতেও আমিই চিরকাল এগিয়ে স্যার। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। সেদিক থেকে দেখলে সার্থকের আমার প্রতি কোনও আক্রোশ বা অভিমান থাকলেও আমার দিক থেকে কোনওভাবেই সেসব কিছু থাকার কথা নয়’।
হিমাদ্রিবাবু যুগলের ঠান্ডা মাথা দেখে ক্রমশ অবাক হয়ে যাচ্ছেন। তিনি প্রশ্নের পর উত্তর পাওয়ার সময় স্থিরভাবে তাকিয়ে থাকছেন যুগলের মুখের দিকে। যুগলও উত্তরগুলো দিচ্ছে তার চোখের দিকে তাকিয়েই। অর্থাৎ সে মিথ্যে বলছে না। তাও একবার অফিসার অজিত ভদ্রের দিকে চোখের ঈশারা বিনিময় করে নিলেন হিমাদ্রি দত্ত। অজিতবাবুও এই নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত করেছেন তিনিও ইশারায় সম্মতি জানালেন যে এই ছেলেটা মিথ্যে বলছে না।
হিমাদ্রিবাবু এবার সরাসরি আঘাত হানার চেষ্টা করলেন, ‘তাহলে তুমি সার্থককে ক্ষুন করলে কেন?’
পাল্টা উত্তর দিল যুগল, ‘কি প্রমাণ আছে?’
হিমাদ্রিবাবু বললেন, ‘রাত একটা নাগাদ হোস্টেলের বন্ধ ঘরে তুমি ছাড়া আর কেউ ছিল না। তোমাদের ঘরে যে জলের জগ পাওয়া গেছে তাতেই ঘুমের ওষুধ মেশানো হয়েছিল। এই কাজ তুমি ছাড়া আর কে করবে?’
যুগল এবার মুচকি হেসে বলল, ‘কিন্তু প্রত্যক্ষ প্রমাণ কোথায় স্যার। জলের জগে অন্য যে কেউ ঘুমের ওষুধ মেশাতে পারে। রাতে হোস্টেলের কর্মচারী বিশু ওই জলের জগ রেখে গিয়েছিল সেও ওষুধ মিশিয়ে থাকতে পারে? সেক্ষেত্রে ওই জল খেয়ে আমারও অবচেতন অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়ার কথা। সেক্ষেত্রে আমাদের রুমের খোলা স্কাইলাইট দিয়ে কেউ ভেতরে ঢুকে কিছু করতে পারে’।
হিমাদ্রিবাবু বললেন, ‘পুলিশ রিপোর্ট বলছে স্কাইলাইট দিয়ে ঘরে ঢোকা প্রায় অসম্ভব। তার সামনেই চলন্ত পাখা। তাছাড়া ওখানে উঠে ওখান দিয়ে ঘরে নামা খুব রিস্কি। অলমোস্ট টু ইমপসিবল’।
যুগল এবারেও হাসি বজায় রেখে বলল, ‘প্রায় অসম্ভব স্যার। সম্পূর্ণ অসম্ভব নয়। প্রায় আর সম্পূর্ণ শব্দদুটোর পার্থক্য আশা করি আমাকে আলাদা করে বুঝিয়ে বলতে হবে না’।
হিমাদ্রিবাবু এবার অন্যপথে চেষ্টা করলেন, ‘তুমি বললে সার্থকের মৃত্যুর পর তুমি সার্থকের অভাব অনুভব করছ। কিন্তু তুমি তো আমার সঙ্গে বেশ হেসে হেসে কথা বলছ যুগল। তোমার কথাবার্তায় কোনও শোকের ছায়া তো দেখছি না। সার্থককের সঙ্গে যদি তোমার এতই ভালো সম্পর্ক হবে তাহলে তুমি তার মৃত্যুতে একটু বিচলিত নও কেন? কই, আমি তো তোমার মধ্যে শোকের কোনও ছায়াই দেখতে পাচ্ছি না?’
যুগল এবার একটু শান্তভাবে জবাব দিল, ‘সার্থক্যের মৃত্যুতে আমার যথেষ্ঠ আফশোস আছে স্যার। কিন্তু সাইকোলজির ভাষাতেই বলে শোক অত্যন্ত সাময়িক একটা জিনিস স্যার। এটা নিশ্চয় আপনি আমার চেয়েও ভালো জানেন। তাই সার্থকের মৃত্যুর পর পুলিশ আমাকে খুনি বলে চিহ্নিত করে আমাকে বিভিন্নভাবে জেরা করে চলেছে। সেই বিষয়টা ক্রমাগত ফেস করতে করতে আপেক্ষিক শোকের ব্যাপারটা আমার মন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে স্যার। এখন আমার কাছে দিন মানেই নতুন জেরার সম্মুখীন হওয়া, তাই আমার মাইন্ডও সেভাবেই প্রস্তুত হয়ে যাচ্ছে’।
কথাটা নিরেট সত্য। এ ছেলে বিষয়টাকে দারুণভাবে থিওরিটিক্যালি ব্যাখ্যা করেছে। তাও হাল ছাড়লেন না হিমাদ্রিবাবু। আরও নানাভাবে তিনি যুগলকে বাজিয়ে দেখতে লাগলেন। প্রায় ঘন্টা দেড়েক এই জেরার ব্যাপারটা চলার পর হিমাদ্রিবাবুর নিজের মাথাটাই কেমন যেন করতে লাগল। তিনি মিনিট পনেরোর একটা ব্রেক নিয়ে ইন্টারোগেশন সেলের বাইরে এসে একটা সিগারেট ধরালেন। তার পিছন পিছন অফিসার অজিত ভদ্রও বেরিয়ে এলেন। যুগলকে পাহারা দিতে সেলের ভেতরে রয়ে গেলেন অফিসার সিরাজুল। এর মধ্যে সুযোগ পেয়ে যুগলের আইনজীবী একবার ভিতরে গিয়ে যুগলের সঙ্গে কথা বলে সে ঠিক আছে কি না দেখে এলেন। হিমাদ্রিবাবুর অনুমতি নিয়ে ডাক্তারও একবার যুগলকে চেক-আপ করে নিলেন। তিনি বেরিয়ে আসতেই হিমাদ্রিবাবু তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি বুঝলেন?’
ডাক্তারবাবু বললেন, ‘একদম নর্মাল। হার্ট-বিট পুরোপুরি নর্মাল, সামান্য কোনওরকম উত্তেজনা বা টেনশনেরও আভাসও নেই’।
অফিসার অজিত ভদ্র দাঁড়িয়েছিলেন ডঃ দত্তর ঠিক পিছনেই। তিনি গলায় একটু উদ্বিগ্নভাব এনে বললেন, ‘স্যার, আমি বলছি স্যার এই ছেলেটিই খুনি। কিন্তু একে যদি বাগে না আনা যায় তাহলে তো আদালতে বেকসুর খালাস পেয়ে যাবে স্যার?’
সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে হিমাদ্রিবাবু বললেন, ‘আপনি একদম ঠিক বলেছেন। কিন্তু ছেলেটা ক্রিমিনাল সাইকোলজির ছাত্র এবং গবেষক। আর পাঁচটা সাধারণ অপরাধীর মত ওর মনস্বত্ব নয়। আসল জায়গাটাই উদ্ধার করতে পারছি না। কোথায় ঘা দিলে ও ভাঙবে, সেটা পেয়ে গেলেই আসল সত্যিটা বেরিয়ে আসবে। এই যে ও এত স্বাভাবিক রয়েছে, সেটাই ওর অস্বাভাবিকত্ব। নিরপরাধ মানুষও কিন্তু জেরার সামনে উত্তেজনা অনুভব করবে। ভুল ডিটেকশান না হয়ে যায় সেই চিন্তা থাকবে। কিন্তু এই ছেলেটি একদম ঠান্ডা। তার মানে ওর মনস্তত্ত্বকে ও নিয়ন্ত্রণ করছে। মিথ্যে বলছে না, কিন্তু সত্যিটাকে ঘুরিয়ে বলছে। আপনি হয়ত লক্ষ্য করেছেন যে ও একবারও কিন্তু বলেনি যে ও খুন করেনি। সেটা বললে ওর এক্সপ্রেশনে যে সূক্ষ্ম পরিবর্তন আসবে সেটা আমি ধরে ফেলব। তাই ও সেটা করছে না। ও বারবারই চাপ দিচ্ছে যে ওকে খুনি প্রমাণ করা যাবে না। বিকল্প সম্ভাবনার কথাগুলো বলছে। তাই সত্যিটাকে নিয়ে ও খেলছে। একে কাবু করা খুব কঠিন। তবে উপায় অবশ্যই আছে। একটা দুর্বল জায়গা, সেটা পেলেই ওর মনোবলকে ভেঙে ফেলা যাবে। বাই দি ওয়ে , এই ইন্টারোগেশন রেকর্ড হচ্ছে তো?’
অজিত ভদ্র বললেন, ‘ডেফিনিটলি স্যার। ঘরের ঐ অন্ধকার কোণে আলোছায়া ব্যবহার করে দেয়ালে হিডেন ক্যামেরা আর রেকর্ডার রাখা আছে। মনিটর রুমে সব অডিও ভিডিও রেকর্ড হচ্ছে। আপনি চাইলে গিয়ে দেখে আসতে পারেন।
‘ঠিক আছে, পরে দেখব, এখন আরেকটা সেশন করে দেখি, কোনওভাবে যুগলকে বাগে আনতে পারা যায় কি না?’ কথা শেষ করে হিমাদ্রিবাবু স্পেশাল রুমের দিকে এগোচ্ছিলেন নিজের সিগারেটটা নিঃশ্বেষ অবস্থায় ডাস্টবিনে ফেলে। ঠিক তখনই একজন পরিচিত ব্যক্তিকে তাদের দিকেই এগিয়ে আসতে দেখলেন। হিমাদ্রিবাবু একগাল হেসে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে উঠলেন, ‘আরে প্রোফেসর বোধিসত্ত্ব ব্যানার্জী, আপনি এখানে?’
প্রোফেসর ব্যানার্জীও হিমাদ্রিবাবুর দিকে এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে করমর্দন করে বললেন, ‘আপনার কাছেই এসেছি। শুনেছিলাম আজ আপনি এখানে সার্থকের খুনের ব্যাপারে পুলিশের সাহায্যের জন্য যুগলকে জেরা করবেন। ভাবলাম কয়েকটা কথা আপনাকে একটু জানিয়ে যাই। কারণ দুজনেই আমার ছাত্র। ওদের দুজনেরই থিসিসের সুপারভাইজার আমি। আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ করে আসতে একটু দেরী হয়ে গেল’।
হিমাদ্রিবাবু বললেন, ‘তাহলে তো খুব ভালোই হয়। হয়ত আপনিই আমার অন্ধকারটা একটু দূর করতে পারবেন। বলুন কি বলতে চান’।
প্রোফেসর বোধিসত্ত্ব ব্যানার্জী বললেন, ‘যুগল আর সার্থক দুজনেই খুব ভালো ছাত্র। তবে সার্থকের চেয়েও যুগল আরও বেশী মেধাবী। যুগলের চিন্তাভাবনাগুলো এমন দিকে যায় যেটা আমরা সচরাচর ভাবতেও পারি না। তবে সার্থকের মধ্যে একটা সহজ মানসিকতা ছিল, উল্টোদিকে যুগল ভীষণ জটিল। যেন দুজনে একে অন্যের বিপরীত প্রতিবিম্ব। আমি গতকাল রাতেই দুজনের থিসিস পেপার যতটা ওরা কাজ করেছে ততটা দেখছিলাম। সার্থকের এপ্রোচ যেভাবে পজিটিভ যুগলের হাইপোথিসিসের আঙ্গিক ততটাই নেগেটিভ। অথচ আমি জানি যুগল যেভাবে বিষয়টা ভেবেছে আর কেউ সেটা ভাবতে পারবে না, কিন্তু এপ্রোচটার মধ্যেই একটা নেগেটিভিটি আছে। এটা যুগলের স্বভাবসিদ্ধ। অথচ গবেষণা নিয়ে ওর মত প্যাশনেট আমি কাউকে থাকতে দেখেনি। ওর কাছে ওর গবেষণা ওর সন্তানতুল্য। নিজেই বলে যতক্ষণ না গবেষণার কাজে রীতিমতো প্রসব বেদনাসম যন্ত্রণা অনুভব না করা যায় ততক্ষণ সার্থক সফল গবেষণা প্রসব করা যায় না। সার্থক অত জটিলতার মধ্যে না গেলেও ওর বিষয়ে ও যেভাবে এগোচ্ছিল তাতে ওর রিসার্চ যুগলের গবেষণার এন্টিথিসিস হয়ে যেত। যুগলের গবেষণার গভীরত্ব বেশী হওয়া স্বত্বেও ওর নেগেটিভিটির কারণে সার্থকের গবেষণা অনেক বেশী সমাজে একসেপটেবল হত, এটাও ভীষণ সত্যি’।
হিমাদ্রিবাবু আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলেন, ‘যুগলের গবেষণার বিষয়টা ওর মুখেই শুনেছি, সার্থকের গবেষণার বিষয় কি ছিল?’
প্রোফেসর ব্যানার্জী বললেন, ‘ডিকোডিফিকেশন প্রসেস অফ ক্রিমিনাল মাইন্ড’।
বিষয়টা শুনেই মাথায় বিদ্যুতের আলো জ্বলে উঠল হিমাদিশেখর দত্ত’র, একদম পুরো যুগলের থিসিসের সাইকোলকিল্যাল এন্টিথিসিস। ক্রিমিনাল মস্তিষ্কের উন্মুক্তকরণের উপায়। তিনি প্রোফেসর ব্যানার্জীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তার সঙ্গে করমর্দন করে দ্রুত অফিসার অজিত ভদ্রকে নিয়ে ফিরে এলেন ইন্টারোগেশন রুমে। যুগল শান্তভাবে ঘাড় কাত করে বসে আছে। সিরাজুল শেখ তার দিকে কড়া নজর দিয়ে বসে আছেন। ডঃ দত্ত যুগলকে কোনওকিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজে বলে উঠলেন, ‘প্রোফেসর বোধিস্বত্ত্ব ব্যানার্জী এসেছিলেন, তোমার আর সার্থকের সুপারভাইজার। ওনার সঙ্গে কথা হল। উনি কিন্তু বললেন তোমার গবেষণার ভিত্তি ভীষণ নেগেটিভ। ওটার কোনও ফিউচারিস্টিক এপ্রোচ নেই। তুলনায় সার্থকের গবেষণার এপ্রোচ অনেক বেশী সমাজ অনুসারী ছিল, পজিটিভ এবং ভবিষ্যতের পক্ষে উপকারী। ওর গবেষণা প্রকাশ ফেলে তোমার গবেষণার কোনও দাম থাকত না। তোমারটা পুরোপুরি ওয়ার্থলেস’।
মুহুর্তে চোখমুখ বদলে গেল যুগলের, তার চোখ কাঁপতে লাগল। হাতকড়া পরানো হাতদুটো কেমন যেন নিশপিশ করতে লাগল যুগলের। সেদিকে লক্ষ্য করে হিমাদ্রিবাবু আবার বললেন, ‘তোমার গবেষণার টপিকটা শুনে আমারও খুব নেগেটিভ লেগেছিল। এত মেন্টাল নেগেটিভিটি দিয়ে গবেষণা করা যায়? এইভাবে কোনও ভালো কাজ হয় না’।
হিমাদ্রিবাবু লক্ষ্য করলেন চোখ নামিয়ে নিয়ে দাঁত কিড়মিড় করছে যুগল। তিনি আবারও বললেন, ‘তোমার গবেষণা ইজ টোটালি ওয়ার্থলেস যুগল। টোটালি ওয়ার্থলেস’।
এবারে একটা বিস্ফোরণের মত ফেটে পড়ল যুগল, ‘আ-আমার গবেষণা ওয়ার্থলেস? একথা আপনি বলতে পারলেন? প্রোফেসর ব্যানার্জী আমাকে আমার বিষয় বদলাতে বলেছিলেন, বলেছিলেন ওই বিষয়ের নেগেটিভিটির কথা। কিন্তু আমি চ্যালেঞ্জ একসেপ্ট করেছিলাম। সার্থকের হিম্মত ছিল ওই চ্যালেঞ্জ একসেপ্ট করার। প্রোফেসর ব্যানার্জীর বলে দেওয়া টপিকে ওনার মত করে কাজ করছিল সার্থক। আর আমি আমার নিজের মেথডলজি নিজে তৈরি করেছিলাম। সন্তানের মত করে তৈরি করছিলাম আমার থিসিস পেপার। সেদিন সন্ধ্যেয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পর সার্থক আমায় বলল ওর থিসিস ব্যানার্জী স্যার বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাবেন। কারণ সেটা নাকি সমাজের পক্ষে পজিটিভ। ড্যাম দি সোসাইটি। আমার গবেষণা, আমার খোঁজ অনেক বেশী মৌলিক। অথচ আমার সন্তান, আমার গবেষণা পড়ে থাকবে অন্ধকারে? মেনে নিতে পারিনি আমি মেনে নিতে পারিনি। বেশ কিছুদিন ধরে রাত জেগে কাজ করেছিলাম। তারপর থেকে রাতে আর ঘুম আসত না। তাই ডাক্তার দেখিয়ে ঘুমের ওষুধ আমার কাছে আনাই ছিল। সেরাতে হোস্টেলের ডাইনিং রুমে দ্রুত ডিনার করে আমি আগে আমার রুমে এসে যাই। সার্থক আসার আগেই অনেকগুলো ঘুমের বড়ি জলের জগে মিশিয়ে রাখি। কিন্তু বড়িগুলো খুব কম পাওয়ারের। ওতে কারও মৃত্যু হয় না। সার্থক ওই জগের জল খেয়ে গভীর ঘুমে চলে গেলে আমি ওর গলায় ফাঁস দিয়ে সহজেই ওকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলি। ঘুমের ওষুধের প্রভাব ওকে জেগে উঠতে দেয়নি। তারপর ওই জগের জল কিছুটা খেয়ে আমিও ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে আমরা দুজনেই উঠছি না ডেকে হোস্টেলের সবাই দরজার বাইরে ডাকাডাকি-হল্লা শুরু করে দেয়। তারপর প্রবল হল্লায় আমার যখন ঘুম ভাঙে তখন আমি দরজা খুললে সবাই ভেতরে এসে সার্থককেও ডাকাডাকি করাতে বোঝে যে সে আর বেঁচে নেই। আমার থিসিসের এন্টিথিসিসকেই আমি সরিয়ে দিলাম। এবার আমার থিসিসকে কাটার ধৃষ্টতা আর কেউ করবে না’। বলেই ঘর কাঁপিয়ে একটা পৈশাচিক হাসি হেসে উঠল যুগল আর তার পরমুহুর্তেই সম্ভবত সে কি বলে ফেলেছে উত্তেজনার বশে সেটা বুঝতে পেরেই ডুকরে কেঁদে উঠল যুগল। তারপর কাঁদতে কাঁদতে মাথা চাপড়াতে চাপড়াতে বসে পড়ল সে’।
যুগলের কাঁধে একটা হাত রেখে তারপর ইন্টারোগেশন রুম থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন হিমাদ্রিবাবু। পুলিশ অফিসার দুজন যুগলকে ঘর থেকে বার করে নিয়ে গেলেন। তাকে আবার তার সেলে ফেরানো হবে। যুগলের কনফেশন রেকর্ড হয়েছে। সার্থককে খুনের মোটিভও বেরিয়ে এসেছে। হিমাদ্রিবাবু বাইরে এসে দেখলেন প্রোফেসর ব্যানার্জী বসে রয়েছেন বাইরের বারান্দার বেঞ্চে। তার সামনে দিয়েই বিধ্বস্ত অবস্থায় যুগলকে নিয়ে গেছেন পুলিশকর্মীরা। তিনি একটা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে এগিয়ে এলেন হিমাদ্রিবাবুর দিকে।
হিমাদ্রিবাবু প্রোফেসর ব্যানার্জীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নেগেটিভ চিন্তাধারা মানুষের মধ্যে অপরাধবোধের জন্ম দেয়। কিন্তু যে মানুষ নেগেটিভ ভাবছে সে বোঝে না যে সে খারাপ কিছুকে প্রলুব্ধ করছে। সে ভাবে সেই ঠিক। নেগেটিভ চিন্তাধারার সবচেয়ে বড় সমস্যাই এখানে। তাই যুগলের মত ব্রিলিয়ান্ট গবেষক তার মনের অন্ধকার দিকটা দ্বারা এতটাই প্রভাবিত হয়ে গিয়েছিল যে সার্থককে খুন করাটা যে অপরাধ সেই উপলব্ধিটাই করতে পারে না। বেশীরভাগ অপরাধীর ক্ষেত্রে সেটাই হয়। তাই অপরাধ করার পর কোনও পশ্চাতাপ থাকে না। যুগলেরও সেই বোধ ছিল না। এই কেসটা ডিল করতে বুঝলাম এখনও অপরাধ মনস্ত্বত্ত্বের একজন একনিষ্ঠ ছাত্রই রয়ে গিয়েছি। এখনও অনেক কিছু শেখার আছে আমার-আপনার, আমাদের সবার’।
ডঃ হিমাদ্রিশেখর দত্ত’র কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন প্রোফেসর বোধিস্বত্ত্ব ব্যানার্জী।

