দোল অভিসার
মিলন পুরকাইত
খাওয়ার টেবিলে অনেক টা রাত হয়ে গেলো আজ। আসলে সারা দিনের সব গল্প খবর আলোচনা এই রাতের খাওয়ার সময়ই হয়। তাছাড়া সারা দিনে আর কারো সেভাবে বিশেষ সময় হয়না। ছেলে বৌমা দুজনেই চাকরি করে, সকালে বেরিয়ে ফিরতে ফিরতে সেই সন্ধ্যে। নাতনি তিন্নী ও এখন স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। ছুটির দিন ছাড়া সবাইকে দিনভর একসাথে ঘরে পাওয়া দুষ্কর। আগামী কাল অবশ্য ছুটির ই দিন, দোল পূর্ণিমা বলে কথা, লোকের কতো আনন্দ কত উৎসব ! ফ্ল্যাটে কিসব পার্টির আয়োজন করেছে, তাতে অবশ্য আমার কি আর আসে যায়! এই বুড়ো বয়সে আর আমোদ আহ্লাদ করতে মন চায়না। আজকাল কার বাঙালিরা দোলপূর্ণিমাকে তো অবাঙালি দের হোলি উৎসব বানিয়ে ফেলেছে। আমাদের সময় গ্রামে তখন পাড়ায় পাড়ায় অনুষ্ঠান হতো, কচিকাঁচা রা কতরকম নাচ গানে অংশ নিতো, বড়ো রাস্তায় স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চারা আবির ছড়াতে ছড়াতে শোভা যাত্রায় বেরোতো, সন্ধ্যে পর্যন্ত সবাইকে রঙ মেখে ভুত হয়ে ঘুরে বেড়াতো দেখেছি। এখনো আর আগের মতো সব আছে নাকি কি জানি !! আর এই কংক্রিটের জঙ্গলে আর সেসব কোথায়!! অনুষ্ঠানের জন্য এখানে না আছে উপযুক্ত জায়গা, আর না আছে ইচ্ছে। ওই ঘরের ভিতরে ভিতরেই সব আবির মেখে নিয়ে খানিক্ষণের মধ্যে বাথরুমে গিয়ে সব সাফা!
আসলে, নীলা চলে যাওয়ার পর থেকে বিগত পঁচিশ বছরে আর রঙ নিয়ে মাতামাতি করতে ইচ্ছে করেনা। বরং এই দিনটা আসলে আমার কাছে সেই পুরনো দিন গুলোই চোখের সামনে ছবির মত ভেসে ওঠে। গ্রামের বাড়ি ছেড়ে এসেছি ছেলের কাজের সূত্রে, সেই বাড়ি, যেখানে আমার আর নীলার সংসারের সব থেকে রঙিন দিন গুলো কেটেছিল। প্রতি বছর দোল পূর্ণিমায় সকাল বেলা স্নান সেরে পূজো করে ঠাকুরের পায়ে আবির দিয়ে আমার কাছে আসতো, আমি হাজার বারণ সত্ত্বেও আমার পায়ে আবির ছুঁইয়ে প্রণাম করতো, আমিও রাধা মাধবের মন্দির থেকে আনা লাল আবির তার গালে কপালে মাথায় মাখিয়ে দিতাম। নীলা হলুদ আবির বড়ো ভালোবাসতো। আমাকে হলদে ভুত বানাতে ও কি মজাটাই না পেত! আমি যখন কপট রাগ দেখিয়ে "তবে রে, হচ্ছে তোমার!" বলে ওকে ধাওয়া করতাম, ও ছুট্টে আমার মায়ের পিছনে লুকিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে নিতো। মাও আমাদের কান্ড দেখে না হেসে পারতো না। সেসব দিন আর কি ফিরে পাওয়া যায় !! নীলার মৃত্যুর পর মাও বেশিদিন আর থাকেনি। বাড়ি ছেড়েছি, অথচ আমার মা, নীলা আর আমার সব রঙ, যেনো ওখানেই রয়ে গেছে..!!
চশমাটা খুলে রেখে পাঞ্জাবির খুঁটে চোখ দুটো মুছে নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। এ বিছানায় নীলা আর আসেনা! ওই বাড়িতে আসতো। সকলকে ছেড়ে যাওয়ার পরও আমার কাছে আসতো। রোজ রাতে ওর কাছে একই অভিযোগ করতাম, "কেনো কেবলমাত্র রাতের অতিথি হয়েই আসো!! " ও কিন্তু কোনও কথা বলতো না। যেন আমার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আমাকে ভোলানোর চেষ্টা করতো। যেদিন বেশিই উতলা হয়ে পড়তাম, সেদিন রাতে ওর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গি তে বুকে টেনে নিতো আমায়। ঘুম ভাঙ্গার পর কোনোদিন ওকে পেতাম না। লোকে হয়তো পাগল বলবে আমায়, কিন্তু আমি বুঝেছিলাম, আমার নীলা সবাইকে ছেড়ে যেতে পারলেও আমাকে ছেড়ে যেতে পারেনা। তাইই তো সে সবার চোখ এড়িয়ে কেবল রাত্রি বেলায় কেবলমাত্র আমার কাছেই সে ধরা দিতো।
ওই বাড়ি ছেড়ে আসার পর আমার এই বিশ্বাস ভেঙে যায়। আমার নীলা তার সংসার ফেলে অন্য জায়গায় অন্য বাড়িতে আর আসেনি আমার কাছে, হাজার ডাকেও সাড়া দেয়নি। আমাদের একমাত্র ছেলের বিয়েটাও ওখান থেকে দিতে পারিনি, শেষ বয়সে ওর কাঁধে মাথা রেখে ওই ভিটে তেই দিন কাটাবার কথা ছিলো আমাদের। হয়তো এই নানান কারণে অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে !! তবু রোজ রাতের মতো তাকে আকুল ভাবে ডেকে আজও তার জন্য বিছানায় জায়গা ছেড়ে শুই....!
সকালে ঘুম ভাঙলো তিন্নির ডাকে, "দাদু, দেখো বাবা মা কতো ভোরবেলা উঠিয়ে দিলো, কোথায় যাবে বলছে।" আমি ঘুম চোখে ঘড়ি দেখি ছ' টা বাজে। কি ব্যাপার, কোথায় যাওয়ার কথা, কিছুই তো জানিনা, বাবান তো কিছু জানায়নি। ভাবতে ভাবতেই বাবান এসে বললো, "তোমার শরীর ভালো আছে তো বাবা? আসলে কাল রাতে শোয়ার পরে হঠাৎ রিয়ার সাথে কথা বলতে বলতে ঠিক হলো, আজকের দিনে একবার গ্রামের বাড়ি যাওয়া গেলে বেশ ভালো হতো, কতো দিন যাওয়া হয়নি ওখানে, মন খারাপ করলেও উপায় হয়নি,যোগাযোগের ব্যবস্থা বড়ো অদ্ভুত যে ! যাই হোক, যেটা বলছিলাম, এখন নিজস্ব গাড়ি রয়েছে,অসুবিধা হবেনা,দুদিন ছুটি রয়েছে, চলো না দুদিন থেকে আসি ওখানে.....কি বলো বাবা? যাবে?"
হঠাৎ ছেলের কাছে এমন অনভিপ্রেত প্রস্তাবে বুক টা উথালপাথাল করে গেল। অরাজি হওয়ার তো কোনো প্রশ্নই ওঠেনা। আমি হেসে সম্মতি জানাতে বাবান আরো উৎসাহী হয়ে পড়ল। "আমি হরি কাকা কে বলে দিচ্ছি ভিতরের ঘর গুলো যেনো একটু পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখে। তুমি তোমার কিছু জামা কাপড় বের করে দাও রিয়া ব্যাগে নিয়ে নেবে।" বলে সে চলে গেলো।
কতগুলো বছর মাঝে পেরিয়ে গেছে। মাঝে যখনই গেছি ওই ঘন্টাখানেক থেকে ফিরে গেছি। হরি আর তার বউই আছে দেখাশোনা করে, ঘর গুলো পরিষ্কার করে রাখে। পাকাপাকি ভাবে চলে আসার পর আর একটা দিনও রাত কাটাইনি ও বাড়িতে। আজ দুদিন থাকার কথা বলছে বাবান! আমার নীলা কি ওখানে আজও আসে!! আর আমার মা! মা কি পেরেছে আমাকে ক্ষমা করতে, তার স্বামীর তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নের বাড়িতে পরিত্যক্ত করে দেওয়ার অপরাধে?! হঠাৎ কেনো জানিনা একটা অচেনা ভয় চেপে বসলো, মনে হতে লাগলো, পরিত্যাগের গ্লানি নিয়ে ও বাড়িতে ওদের সম্মুখীন হতে পারবো আমি!
বাড়ি থেকে বেরিয়েছি প্রায় সাড়ে সাত টা, এখন বাজে পুরো দশ টা, বিষ্ণুপুর শহর পেরিয়ে এবার আমাদের গ্রামের রাস্তায় ঢুকেছে গাড়ি, দুটো গ্রাম পেরোলেই এবার আমাদের গ্রাম। রাস্তা টা ঢুকতেই বুক টা হুহু করে উঠলো ! সেইই চেনা রাস্তা, রাধা মাধবের মন্দিরের সামনে দিয়ে বাম দিকে ঢুকছে, কতো কি বদলে গেছে, শেষ এসেছিলাম তিন্নির অন্নপ্রাশনের কিছু কার্ড দিতে কয়েকজনকে, তখনই দেখেছি, উন্নতির ছোঁয়া থেকে আমাদের প্রিয় রামসাগর গ্রাম রেহাই পায়নি। আজ দোলের দিনে রাস্তা গুলোও যেনো রঙিন হয়ে উঠেছে। হাইস্কুল টার সামনে দিয়ে পেরোনোর সময় তিন্নী কে আঙ্গুল দিয়ে দেখালাম, "ওই দেখো দিদিভাই, ওইটা আমাদের ইস্কুল, আমি ঐখানেই পড়াশোনা করেছি।" তিন্নী ভীষণ উৎসাহে গাড়ির জানলার বাইরে মুখ বাড়িয়ে দেখতে লাগলো, বললো "দাদু এটা তোমার স্কুল? তাহলে তো কত্ত পুরোনো!!" রিয়াও একটু আগ্রহ ভরে তাকালো। বাবান আমার বলার আগেই গাড়ি স্লো করে দিয়েছে.....খোলা গেটের ভিতর দিয়ে দেখা গেলো ভিতরে বসন্ত উৎসবের অনুষ্ঠানের জন্য সুন্দর ভাবে সেজে উঠেছে পুরো স্কুল চত্বর। এক কালে নিজেও এই পরিসজ্জার ভূমিকায় ভাগীদার হয়েছি, সব রকমের অনুষ্ঠানে প্যান্ডেল তৈরি তে আমাদের ব্যাচ সবার আগে। বাঁশ বাঁধা থেকে শুরু করে ত্রিপল টাঙানো, সব কিছু তে আমরাই। রাকেশ, সঞ্জীব, সুকান্ত, বিপিন....কে যে কোথায় আজ !! আমার কথাও কি তারা মনে করে এভাবে !? মনে পড়ে তাদের, "শুভঙ্কর কেমন আছে এখন!?", কি জানি!! সেই ইতিহাস এর সুকুমার স্যার, স্কুলের এমনি দিনে সবাই যাকে যমের মতো ভয় করতো, অথচ এইসব কাজের দিনে ওনাকে দেখে স্যার বলেই মনে হতো না! সেই ভূগোলের অমল বাবু, ইংরেজির শিল্পী ম্যাম সুশীল স্যার, তারপর সেই সাইকেল স্ট্যান্ডের আব্দুল কাকা__ কবেকার মানুষ সবাই_কবে কিভাবে যে চলে গেছেন, কোনো ধারণাই নেই। স্কুল ছেড়েছি আজ কম করেও পঁয়তাল্লিশ বছর হবে, তবু অদ্ভুত ভাবে কয়েকজনের নাম কিভাবে যেনো গেঁথে রয়ে গেছে। আজ প্রায় দশ বারো বছর পর স্কুলের ভিতর টা নজরে পড়ায় এত কিছু একসাথে মনে পড়ছে । দিন গুলোও ভারী অদ্ভুত ছিলো, সঙ্গী সাথীদের সাথে ঝগড়া গুলোও ছিলো সরল । তখন তো স্কুলে প্লাস্টার ও হয়নি, কিন্তু প্রতিটা ইঁটের গাঁথনির সাথে আমাদের অনুভূতি মিশেছিল, এখনো রয়েছে, কেবল উপরে নতুনত্বের পলেস্তারা পড়েছে। বুঝলাম, কিছু ধারা কোনদিন বদলায় না, কারিগর বদল হয়, কারখানা বদলায়না, ধাপে ধাপে উন্নীত হয় মাত্র।
প্রায় সাড়ে দশটা নাগাদ আমাদের উঠোনের খোলা দরজার সামনে গাড়ি থামলো। হরি উঠোনে বসে মুড়ি খাচ্ছিল, আমাদের নামতে দেখে তাড়াতাড়ি টিউবওয়েলে হাত ধুয়ে এসে আগে আমাকে একখান প্রণাম ঠুকে দিলো, হাসি মুখে বললো "কত্তদিন পর এলেন কাকাবাবু, সব ভালো তো?" আমি হেসে বললাম, "হ্যাঁরে, আর এই শেষ বয়সে কেমন আর থাকবো, এতদিন পর ছেলের যেই একটু সময় হয়েছে আর অমনি বুড়ো বাপ টা কে ভিটের দর্শন করাতে নিয়ে চলে এসেছে। তবে এইবার আর বুড়িছোঁয়া করে চলে যেতে আসিনি কিন্ত। দুদিন তোদের খুব জ্বালাবো। সে একমুখ হাসি নিয়েই বললে, "কি যে বলেন কাকাবাবু, আপনাদেরই তো সব কিছু, আমরা তো খালি আগলাতে রয়েছি। শিউলির মা সব ঘর ধুয়ে মুছে সাফা করে দিছে কাকাবাবু, আপনাদের কোনো অসুবিধা হবেক নাই। রান্নাও দুদিন আপনাদের বৌমাই করে দিবেক। কেবল দাদাবাবু একটু গ্যাসের ব্যবস্থা টা করে দিবেন, এই সামনেই লোক রয়েছে, আপনি গিয়ে বললেই হবে, আমিও সঙ্গে যাবো নাহয়।" আমরা সম্মতি দিয়ে ব্যাগ নিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। হরির বউ ঘরদোর সত্যিই বেশ ভালই পরিষ্কার করে রাখে , মনেই হচ্ছেনা এখানে কেউ থাকে না, আসবাব পত্রও বেশ চোখে পড়ার মতো গোছানো। ঠিক যেমনটা ঘরের গৃহিণী সাজিয়ে রাখে..!! বাবান হরির সাথে বাজারে গেছে, রিয়া তিন্নিকে নিয়ে বাগান দেখাতে নিয়ে গেছে, আমি স্নান সেরে রাধা মাধবের মন্দির এলাম। প্রতি বছর দোল পূর্ণিমায় রাধা মাধবের মূর্তি কে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়, তারপর মূর্তির পায়ে আবির দিয়ে ভোগ আরতি হয়, আজও তার অন্যথা হয়নি, নাটশালা টা সাদা পরিষ্কার মার্বেল দিয়ে বাঁধানো হয়েছে, সেখানে আমার মতই অনেক ভক্ত এসে হাজির হয়েছেন ভোগ আরতি দেখবে বলে, মধ্যবয়স্ক বয়স্ক অনেকেই রয়েছে, কেউ চেনা থাকলেও চেনার মত আর স্মৃতির জোর নেই। আমি এক মনে আরতি দেখছি, এই মন্দির চত্বরে অদ্ভুত এক প্রশান্তি অনুভূত হয় বরাবর__ কেনো জানিনা ছোট থেকেই জায়গা টা ভীষণ আপন বোধ হয়, মা বা নীলা কে পূজো দিতে নিয়ে আসা ছাড়াও একাও বহুবার এখানে এসে বসে থাকতাম। এখানকার বাতাসেই এক প্রশান্ত স্নিগ্ধতা, রাধা মাধবের এই অপরূপ মূর্তির দিকে তাকালে যে কোনো নাস্তিকেরও হাত জোড়া জড়ো হয়ে আসবে। ভোগ আরতি শেষ, প্রসাদ বিতরণ ঘণ্টাখানেক পর হবে, পুরোহিত মশাই মূর্তির পায়ে ছোঁয়ানো আবির ভক্ত দের বিলি করতে এলেন, আমিও ছোট কাগজে মুড়ে অল্প একটু লাল আবির নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে বাড়ি নিয়ে এলাম__প্রতি বারের মত, অভ্যাসবশে, কিন্তু ছোঁয়ানোর মানুষ গুলো টা আজ কোথায় পাই...!!
মাঝের ঘরে মাটি তে বসে দুপুরের খাওয়া দাওয়া সারলাম। হরির বউ ভালোই রান্না করেছিলো, নিরামিষ আহার বেশ তৃপ্তি করে সেরে আমাদের শোয়ার ঘর টায় এসে বসলাম। বিছানার চাদর টাও টান টান করে পাতা। এই সেই ঘর, কতো হাসি কতো কান্না, কতো ভালোবাসা কতো আবদার কতো নালিশ....হাজার স্মৃতি সব একসাথে একজোট হয়ে যেনো বুকে কড়া নাড়তে লাগলো। কিন্তু অদ্ভূত ব্যাপার হলো, এতগুলো দিন পর এসেও ঘর টা কে এতো জীবন্ত লাগবে, ভাবতেও পারিনি। ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায় শো কেসের ভিতর গুলোও পরিষ্কার। ঠিক যেনো কেউ বা কারা রোজ ব্যবহার করে! ঈশান কোণের জানলাটা খুলতেই একটা দমকা হাওয়া বাইরে থেকে এসে আমার বুক অব্দি বয়ে গেলো। দেওয়ালে নীলার সেই প্রিয় কড়ি দিয়ে ঘেরা আয়না টায় দাঁড়াতেই ষাটোর্ধ্ব এই বৃদ্ধের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠলো। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হলো, নস্টালজিক হবো কি! একি ঘোরের মধ্যে আবিষ্ট হয়ে পড়ছি ....সামনের প্রতিচ্ছবিটা ধীরে_ ধীরে যেনো একটা একটা করে বছর পিছিয়ে যাচ্ছে, বার্ধক্য পেরিয়ে প্রৌঢ়, প্রৌঢ় থেকে যৌবন.... এ কার মুখ দেখছি আমি !! একটা অদ্ভুত গন্ধ বাতাসের সাথে নাকে আসছে......খুব খুব চেনা গন্ধ, কিন্তু বহু পুরোনো.... ঠিক যেনো সেই সুগন্ধি মিশ্রিত ভেজা চুলের গন্ধ, গন্ধটা ধীরে ধীরে যেনো আমার সারা গা ছুঁয়ে যাচ্ছে... ঘাড়ের কাছে একটা ঠান্ডা স্পর্শ অনুভব করছি, জলের ফোঁটা? নাকি...কারো আঙুল এর ডগা !? অস্ফুটস্বরে অজান্তেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো অপার বিস্ময় মিশ্রিত ডাক, "নীলা____!!"
"মা কে মনে পড়ছে বলো বাবা?" , বাবানের ডাকে সম্বিত ফিরল। মুহূর্তের মধ্যে কাঁচের মত যেনো সেই ঘোর টা ভেঙে গেলো। আমি চমকে ঘরের দরজার দিকে তাকালাম, বাবান কখন দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করিনি। ছেলে টা হঠাৎ কাছে এসে আমার বুকে মাথা গুঁজে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। "এক এক সময় নিজেকে খুব অপরাধী লাগে জানো বাবা, মনে হয় স্বার্থপরের মতো তোমাকে তোমার ভিটে থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে খাঁচাবন্দি করে রেখেছি, কিন্তু তোমায় একা রাখার কথা তো দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারিনা বলো !" আমি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললাম," ধুর খ্যাপা ছেলে,আমি কি আর বুঝিনা রে!?" সে বললো, "মাকে কতো টুকুই বা পেয়েছি, তবু এক এক সময় আমারও মনে হয় জানো, আজ যদি মা থাকতো, তাহলে জীবন টা অন্যরকম হতে পারতো।" আমি মনে মনে বললাম, দেখছো তো নীলা, তোমার ফেলে যাওয়া আট বছরের ছেলে টাকে কেমন হঠাৎ করে বড়ো হয়ে উঠতে হয়েছে। এই সংসারের গুরুদায়িত্ব আমার একার কাঁধে ফেলে কেনো চলে গেলে তুমি নীলা ! এক আমার মা পিতৃহীন বালক কে মানুষ করেছে হাজার রকম প্রতিকূলতা কাটিয়ে, আর এই এক আমি, কেবলমাত্র মা হারা এই ছেলে টার মুখ চেয়ে এতগুলো বছর তোমায় ছাড়া পার করে দিলাম। ভাবা যায় !! দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ তুলে পাশে আয়না টার দিকে তাকিয়ে দেখি, আমার প্রতিচ্ছবি খানা তার বার্ধক্য ফিরে পেয়েছে, সাথে এখন তার বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরে আর এক যুবক শিশু।
দুপুরে আর বিশ্রাম নেওয়া হলোনা। আদরের নাতনি কে নিজের ছেলেবেলার গল্প শোনাতে শোনাতে দুপুর গড়িয়ে সূর্য ডোবার সময় হয়ে এলো। তিন্নী কে রিয়ার কাছে রেখে এসে ভাবলাম একবার ছাদে যাই। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে বেশ বেগ পোহাতে হলো, হাত পায়ের জোড় গুলোয় ভালোই জং ধরেছে । উঠে এসে দেখি, রক্তিম সূর্য খানা যেনো আমারই অপেক্ষায় আজ এখনও পশ্চিম আকাশে উপস্থিতি বজায় রেখেছে। এই বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পরে ভুলেই গেছি আমার জীবনে একটা দুপুর গড়িয়ে বিকেল ছিল, যেখানে নিয়ম করে রোজ বিকেলের ঘাড় বেয়ে বুক অব্দি সূর্যের নেমে আসা ছিলো। এগিয়ে গিয়ে বসার জায়গা টায় দেখি শ্যাওলা জমেছে। অথচ, ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, একেবারে ডান পাশ টার একটা নির্দিষ্ট জায়গায় কিন্তু সময় ছাড়া অন্য কোনও শ্যাওলা জমাট বাঁধেনি.... নাকি জমতে পারেনি !? ঠিক যেনো কেউ রোজ এসে বসে এক অলিখিত প্রতিশ্রতি আজও পালন করে চলেছে। আমি ওই জায়গা টা ছেড়ে তার ঠিক পাশটায় ঘেঁষে বসলাম। কয়েক মুহূর্ত পরই আমি স্পষ্ট অনুভব করলাম আবার একটা দমকা ঠান্ডা হাওয়া ঠিক আমার কাছ টা তে এসেই থেমে গেলো। সকালের সেই চেনা গন্ধ টা কি আবার নাকে আসছে !! হ্যাঁ, ওইটাই তো, তবে সেই ভেজা ভাবটা এখন আর নেই, এখন এক অন্য মাদকতায় তার গায়ের গন্ধটা আমাকে আবার আবিষ্ট করে তুলছে.......হ্যাঁ, আমি স্পষ্ট বুঝলাম গন্ধটা ঠিক আমার ডান পাশ টা থেকেই আসছে। আর আমি নিজেকে সোজা রাখতে পারছি না....আবেশে মাথা টা ডান দিকেই এলিয়ে দিলাম__কিন্তু গড়িয়ে গেলাম নাহ্..... একটা পরিচিত ভরসার কাঁধ আমাকে সামলে নেওয়ার জন্য সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলো। চোখের জলে চারদিক টা ঝাপসা হয়ে আসার আগে লক্ষ্য করলাম, সূর্য টা এতক্ষনে তার দায়িত্ব সেরে নিশ্চিন্তে অস্ত গেলো।
কতক্ষন ওভাবে ছিলাম জানিনা, হঠাৎ মনে হলো কেউ গুনগুন করে কিছু একটা সুর ধরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসছে। আমি সোজা হয়ে বসে খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে দেখি হাতে জলের ঘটি নিয়ে কেউ একজন মাথায় ঘোমটা টেনে আটপৌরে শাড়ি পরে উঠে এসে ছাদের দরজায় আর ছাদের এক পাশটায় আমাদের ঠাকুর ঘরের দরজায় জল ছিটাতে লাগলো। তার গলার সুর টা এখন আরো স্পষ্ট, এই সুর, এই স্বর আমার ভীষণ চেনা...... ছেলের বৌমা আনার পরও আমার মা ঠাকুর ঘরের দায়িত্ব তার উপর ছাড়তে পারেনি কোনোদিন। রোজ সন্ধেয় মা ঠাকুরের গানের সুর গুনগুন করতে করতে প্রতিটা ঘরের দরজায় জল দিয়ে উপরে এসে এখানে সন্ধ্যা জ্বালত। আমি পাথরের মূর্তির মতো অপার বিস্ময়ে ওই অবয়বের দিকে তাকিয়ে আছি। এবাড়ির নিয়ম অনুযায়ী,রোজ সন্ধ্যেপ্রদীপ জ্বালার সময় আমার আর নীলার ঠাকুর ঘরে বসা বাধ্যতামূলক ছিলো। আমি লক্ষ্য করলাম ঠাকুর ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার সময় সে আমার দিকে তাকিয়ে সে বললো, "কিরে আসবিনা?" ..... এ কার গলা শুনছি আমি !! এ কোন সময়ে রয়েছি আমি !! আদৌ কি এতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে !! নাকি সময়ের চাকা এই বাড়ির ভিতর দিয়ে কোনোদিন পেরোয়ইনি !! ওই ডাক উপেক্ষা করার সাধ্যি আমার নেই। আমি বাধ্য ছেলের মতো তার পিছনে গিয়ে ঠাকুর ঘরের ভিতরে গিয়ে বসলাম। শাঁখ টা ধুয়ে রেখে সে এবার প্রদীপ জ্বালার আয়োজন করছে। চারপাশে অন্ধকার নেমে আসছে, আলো আঁধারি তে ভালো করে মুখ টা এখনও ঝাপসা। প্রদীপের সলতেয় তেল দিয়ে এবার সে দেশলাই কাঠি জ্বালালো। আমি বিস্ফারিত চোখে দেখলাম, সেই সারল্য ভরা স্মিত হাসি ভরা মুখ খানা...কুঁচকে যাওয়া গালের নিচে সেই জরুল খানা.... কত্ত দিন পর আবার এতো কাছ থেকে আমার মা কে দেখছি....পাগলের মত ছুটে গিয়ে একবার তাকে জড়িয়ে বুকে আগলে ধরতে ইচ্ছে করছে...গোটা শরীর আমার থরথর করে কাঁপছে , বুজে আসা গলায় ঢোঁক গিলে কোনো রকমে আকুল ভাবে আমার গলা দিয়ে বেরিয়ে এলো, "মা গো !!"
হঠাৎ সিঁড়ির আলোটা জ্বেলে উঠলো, "বাবা আপনি এখানে?" তাকিয়ে দেখি রিয়া উঠে আসছে ,তার পিছন থেকে এসে তিন্নী আমার কাছে এসে বললো, "দাদু, আজ আমি মোমবাতি জ্বালাবো ! আমাকে দেশলাই জ্বালানো শিখিয়ে দেবে? মা খালি বারণ করে!" রিয়া তাড়াতাড়ি বলে উঠলো,"খবরদার না, এখন তুমি অনেক ছোট, এসব করতে নেই!" আমার চারপাশ টা এতক্ষনে ধীরে ধীরে যেনো স্বাভাবিক হচ্ছে, সিংহাসনের সামনে তাকিয়ে আর কাওকে দেখতে পেলাম না। রিয়া গিয়ে সেখানটায় বসলো যেখানে একটু আগে আমি আমার মা কে দেখছিলাম.....! রিয়া এ যুগের মেয়ে হলেও ভীষণ সংসারী। মোমবাতি আর ধূপের জোগাড় নিজেই করেছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ওই শাঁখ আর প্রদীপ খানা আর চোখে পড়লো নাহ্ !!
দোল পূর্ণিমা উপলক্ষ্যে আজ রাধা মাধবের মন্দিরে হরিনাম সংকীর্তন আর খিচুড়ি ভোগ হয়। চার জনে মিলে তাই এখানেই এসেছি। একেবারে খিচুড়ি ভোগ খেয়েই যাবো। তিন্নী এসব কোনোদিন দেখেনি। তাই সব কিছুই তার কাছে ভীষণ আগ্রহজনক। ভোগের খিচুড়ি খেয়ে সে তো বেজায় খুশি, তার আনন্দ দেখে আমার ছোট বেলার কথা মনে পড়ে গেলো। তখন রাস্তার দু ধারেই বসে শাল পাতায় করে খিচুড়ি খাওয়া হতো। ভোগের খিচুড়ির কি যে এক অপূর্ব স্বাদ, বাড়িতে হাজার চেষ্টা করেও সেই স্বাদ আনা যায়না। আজ দীর্ঘদিন পর মন টা এতো ভালো লাগছে। এসব ছেড়ে কি আর সেই শহুরে খাঁচাবন্দি জীবনে ফিরে যেতে মন করে !!
বাড়ি ফিরে মুখ হাত ধুয়ে বারান্দায় একটু পায়চারি করছিলাম। বাবান এসে বললো, "শুয়ে পড়বে চলো বাবা, রিয়া বিছানা করে দিয়েছে তোমার।" তিন্নী পাশ থেকে এসে আমার কোমর জড়িয়ে বললো, "বাবা, আজ আমি দাদুর কাছে শুই?" সাধারণত নাতনির এমন আবদারে আমি খুশিই হই, কিন্তু আজ রাত্রিটা আর অন্য কাওকে আমার ঘরে আর চাইছিলাম না আমি। আমার মুখ দেখে বাবান কিছু আন্দাজ করলো হয়তো, সে তিন্নির মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, "আজ থাক সোনা মা, এখানে দাদু কে একটু একা আরাম করতে দাও" । তিন্নী আর জেদ করলোনা। আমি তার গালে একটা চুমু খেয়ে তাকে আদর করে তার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিলাম। জানিনা কেনো, বেচারির করুণ মুখ টা দেখে বুকের ভিতর টা এক অজানা কষ্টে চিন চিন করে গেলো।
রাত প্রায় সাড়ে দশটা। শোয়ার ঘরে ঢুকে আমি দরজায় ছিটকিনি তুলে দিলাম। বহুক্ষণ অপেক্ষা করছি এই রাত টার, অসংখ্য রাত্রির না পাওয়া গুলো জমে রয়েছে, জানিনা আমার অপেক্ষা আমার ডাক আজ সার্থক হবে কিনা। জানলা টা খুলে দিলাম। পূর্ণিমার চাঁদ টা জ্বলজ্বল করছে। মায়াবী জোছনায় গোটা ঘর ভরে গেলো। কিন্তু ঘরের গুমোট ভাব টা এখনও কাটলো না কেনো! আমি জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলাম, সেই চেনা গন্ধের আশায়, কিন্তু কই !! কেউ তো এলোনা এখনও! আমার ব্যস্ততা ক্রমে বেড়ে গেলো। নিজের মনেই বিড় বিড় করে ডেকে চলেছি "নীলা__নীলা__!"..... কেউ সাড়া দিলো না । আমি আর থাকতে পারলাম না। জানলার গ্রিল ধরে অঝোরে কেঁদে ফেললাম। একে একে মনের মধ্যে স্মৃতির পাতা উল্টে উল্টে দিন গুলো রাত গুলো সামনে ছায়াছবির মতো ভেসে উঠে আমার সহ্যের সব বাঁধ যেনো ভেঙে দিতে চাইছে। আমার সাথে লুকোচুরি খেলেও ও কী তাহলে আসবেনা আর ! এক সময় ক্লান্ত হয়ে হাঁফিয়ে উঠে থেমে গেলাম। গায়ে হাতে পায়ে অসহ্য যন্ত্রণা করছে। গলার কাছটা শুকিয়ে গেছে। আসতে আসতে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম।
হয়তো চোখ লেগেই গেছিলো, হঠাৎ কপালে এক ঠান্ডা হাতের কোমল স্পর্শের অনুভূতি হলো। আমার বুকের ভিতর টা তোলপাড় করে উঠলো, ও কি তাহলে শেষমেশ এসেছে !! চোখ খুলতেও সাহস হচ্ছেনা, পাছে সে পালিয়ে যায় !! ধীরে ধীরে আবার সেই গন্ধ টা_ আমার কাছে , খুব কাছে এসে থেমেছে। আমার মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছে সে, সঙ্গে নোয়া শাঁখা পলার ঠুং ঠাং শব্দ। এবার কানের কাছে ঠান্ডা শ্বাস সহ শুনতে পেলাম সেইই বহুদিনের চেনা স্বর, "শুভ....!" আমি চোখ মেলে চেয়ে দেখি, আমার মাথা টা কোলে নিয়ে নীলা বিছানায় বসে রয়েছে। হ্যাঁ...আমার নীলা। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখলাম তাকে.....ছাব্বিশ বছর পর !! সেই তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ, ডাগর ডাগর চোখে যেনো হাজার বছরের কথা জমে আছে, গোলাপের পাপড়ির মত ঠোঁট টা হালকা বঙ্কিম হয়ে আছে। সিঁথি ভর্তি চওড়া করে আমার নামের সিঁদুর। আজ তার পরনে লাল পাড় আকাশী রঙের শাড়ি, তার যাওয়ার দিন তাকে এই বেশেই তো দেখেছিলাম.....! আজ এতদিন পর এতো কাছে তাকে দেখেও ছুঁয়ে দেখার কথা মনে হলো না... ঘরটা যেনো চাঁদের জোৎস্না কে উপেক্ষা করে তারই মায়ায় মেখে রয়েছে ... ঠিক সেই প্রথম দিনের মতোই অপার মুগ্ধতায় তার দিকে চেয়ে রইলাম কতক্ষন হিসেব নেই। নিস্তব্ধতা ভেঙে সেই বলে উঠলো ,"শুভ.... এতদিন পর এলে তুমি!" আমি আর থাকতে না পেরে উঠে বসে ব্যাকুল ভাবে তার হাত হাত দুখানি ধরে বলে উঠলাম, "আমাকে ক্ষমা কোরো নীলা, আমি পারিনি এইবাড়িতে তোমার সংসার টা টিকিয়ে রাখতে..... আমি আর কোথাও যাবোনা তোমায় ছেড়ে, জীবনের শেষ দিন গুলো আমি তোমার আশ্রয়ে কাটাতে চাই নীলা, তুমিও আর চলে যেওনা আমাকে একা করে...." সে আমার দিকে কিছুক্ষন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো, জানিনা কি ভাবলো, তারপর হঠাৎ আমার খুব কাছে মুখ নিয়ে এসে বললো, "আমাকে রঙ লাগাবেনা আজ?" - "লাগাবো তো !" বলে পাঞ্জাবির পকেট থেকে রাধা মাধবের মন্দির থেকে আনা লাল আবির বের করে তার গালে কপালে মাখিয়ে দিলাম। আহা....কি অপরূপ সৌন্দর্য্য তার .... ঠিক যেন রাঙা পলাশ প্রতিটা বসন্ত কে এক আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছে। চোখের তৃপ্তি বুক অব্দি ঠান্ডা করে দিলো.... "আমিও তোমার জন্য হলুদ আবির এনেছি..." বলে সে কোথা থেকে কি জানি মুঠো ভর্তি হলুদ আবির আমার গোটা মুখে দিয়ে সে খিলখিলিয়ে হেসে গড়িয়ে গেলো। আমি হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। বুঝলাম আমি আবার নতুন করে হ্যাংলার মত ওর প্রেমে পড়লাম__ছাব্বিশ বছর পর। ও আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "কিগো, অমন ভ্যাবলার মত কি দেখছো?" আমি ঠিক সেই প্রথম দিনের মতো লজ্জা পেয়ে মাথাটা নামিয়ে দিলাম। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখি, কুঁচকানো চামড়া গুলো হঠাৎ করে যেনো আবার সতেজ হয়ে উঠেছে। আর কোনো কথা না বলে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম.... নীলাও ওর বাহুবন্ধনে আমাকে আবদ্ধ করে নিল ! বিগত বছর গুলোর সমস্ত না পাওয়া_অভিযোগ_আর বেদনা গুলো ধীরে ধীরে একে অপরের বুকে ছড়িয়ে যেতে লাগলো। আজ সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে, সমস্ত জাগতিক চাওয়া পাওয়ার উর্ধ্বে গিয়ে অবশেষে দুটো আত্মার পুনর্মিলন ঘটলো .....!!
***পরদিন সকালে দরজা না খুলতে দেখে ঘরের সবাই আর কয়েকজন লোক মিলে দরজা ভাঙতে বাধ্য হলো। সবাই দেখলো, সারা বিছানায় আর মেঝে তে হলুদ আর লাল আবির ছড়িয়ে রয়েছে....! বৃদ্ধ শুভঙ্কর রায় এর নিথর দেহ খানা বিছানায় পড়ে রয়েছে। তবু হলুদ রঙে তাঁর মুখ খানা অপ্রত্যাশিত ভাবে উজ্জ্বল .... !!***

