অফিসের কাজে কলকাতার বাইরে যেতে হয়েছিল প্রভাস সেনাপতিকে। ইচ্ছা ছিল কাজ শেষ করে সন্ধ্যের মধ্যেই বাড়ি ফিরে আসবে। তার নিজের গাড়িতে দমদম ফিরতে বড়োজোর ঘন্টা দুয়েক লাগবে। কিন্তু বাদ সাধল প্রকৃতি। ফেরার পথে এত জোরে বৃষ্টি শুরু হল যে গাড়ি চালানোই দায়। কিছুদূর আসার পর গাড়িটাও সমস্যা করতে শুরু করল। শেষে হেতমপুর পেরনোর পরই গাড়ি জবাব দিয়ে দিল। কোনওমতে গাড়িটাকে পথের ধারে সাইড করতে পারল প্রভাস। গাড়ি থেকে নেমে কি হয়েছে দেখতে গিয়েই সম্পূর্ণ ভিজে গেল সে। চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখল। ঘুরঘুরটি অন্ধকার। রাস্তায় আলো নেই। আশেপাশে কতটা জনবসতি রয়েছে সেটাও এই বৃষ্টির তোড়ে আর অন্ধকারে ভালো করে ঠাওর করা যাচ্ছে না। গাড়িতে বসে একটু অপেক্ষা করল প্রভাস। বৃষ্টি যেন একটু কমল। কিন্তু অন্য কোনও গাড়ির দেখা নেই। বৃষ্টির জন্য গাড়ি চলছে কম। সাহায্য চাইবার মতো কোনও উপায় দেখা যাচ্ছে না। নিজের মোবাইলটা দেখল প্রভাস। কোনও টাওয়ার দেখাচ্ছে না। উপরন্তু চার্জও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এমন সময় প্রভাসের মনে হল ডানদিকে একটা গলি মতো কিছু আছে, আর একটা খুব হাল্কা আলোর রেখা সেখান থেকে যেন দেখা যাচ্ছে। প্রভাস গাড়ি থেকে নেমে গাড়িটা ভালো করে লক করল। বৃষ্টি আগের থেকে একটু কমেছে। তবে এখনও বেশ ভালো জোরেই হচ্ছে। আলোটা লক্ষ্য করে একটু এগোতেই প্রভাস বুঝল গলির মুখেই একটা বাড়ি থেকে সেটা আসছে। বাড়িটা লক্ষ্য করে সে একটু একটু করে এগোলো, যদি কোনও সাহায্য পাওয়া যায় এই আসায়। কাছাকাছি পৌছে দেখল একটা একতলা বাড়ি। সামনে বারান্দা। বাড়ির সামনে একটা শেড রয়েছে ফলে বারান্দায় বৃষ্টির জলের ছাঁট পৌছচ্ছে না। বারান্দার ওপরেই বাড়িতে ঢোকার প্রধান দরজা, দরজার পাশেই একটা বক্স জানালা, আলোটা সেই জানালা দিয়েই বাইরে আসছে। জানালার কাঁচ বন্ধ থাকায় আলোটা আসছেও খুব ক্ষীণ হয়ে। প্রভাস বারান্দা দিয়ে উঠে দরজার কাছে পৌছলো। অন্ধকারে ভালোমতো কলিংবেলটা কোথায় ঠাওর করতে পারল না। শেষে দরজাতেই বেশ জোরে কয়েকবার ধাক্কা দিল। ভেতরে যেন কারও একটা আওয়াজ পাওয়া গেল। একটু বাদেই দরজা খুলে এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। প্রভাস দেখল ভদ্রলোক প্রায় তারই বয়সী। মাঝারি গড়নের স্বাস্থ্য তবে বেশ লম্বা হাইটে। মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাঁড়ি।
‘ইয়েস?’ প্রভাসকে উদ্দেশ্য করে বললেন ভদ্রলোক।
‘আমি একটু বিপদে পড়েছি, তাই আপনাকে একটু বিরক্ত করছি, আমি দমদমে ফিরছিলাম। পথে এখানে আমার গাড়িটা খারাপ হয়ে গেছে। আমার মোবাইলও কাজ করছে না। একটু যদি আমাকে ঢুকতে দেন আপনার বাড়িতে আর একটা যদি ফোন করতে পারি তো খুব উপকার হয়’।
‘আসুন’, একটু ভেবে বললেন ভদ্রলোক।
‘ধন্যবাদ’, বলে প্রভাস ভেতরে ঢুকল। যে ঘরে প্রভাস ঢুকল সেটা বাড়ির ড্রয়িংরুম বলেই মনে হল। একটা বেশ জোরালো ইমারজেন্সি লাইট জ্বলছে ঘরে। ঘরে একটা ছোট সোফা, একটা টি-টেবিল আর গদি লাগানো দুটো চেয়ার রয়েছে। ঘরটা এমন কিছু বড় নয়, কিন্তু বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।
‘এখানে ঝড়-বৃষ্টি হলেই কারেন্ট চলে যায়। এখন সেই অবস্থা। কখন যে আসবে বলা যায় না। আপনি বসুন’, প্রভাসকে বসতে বলে নিজে একটা চেয়ারে বসলেন ভদ্রলোক।
‘একটা ফোন যদি একটু করা যায়?’ প্রভাস অন্য চেয়ারটায় বসতে বসতে অনুরোধ করল ভদ্রলোককে।
‘ও শিওর’, বলেই ভদ্রলোক তার মোবাইলটা এগিয়ে দিলেন প্রভাসের দিকে, ‘আমার এখানে কোনও ল্যান্ডলাইন নেই’। কথা বলতে বলতেই ভদ্রলোক প্রভাসের মুখের দিকে তাকালেন। প্রভাস লক্ষ্য করল ভদ্রলোকের মুখের ভাবটা কেমন যেন বদলে গেছে। খুব মনোযোগ দিয়ে ভদ্রলোক প্রভাসের মুখটা যেন দেখছেন, না ঠিক মুখ নয় ভদ্রলোক তাকিয়ে আছেন, প্রভাসের কপালের দিকে, কপালের বাঁদিকে, যেখানে একটা চোটের গভীর ক্ষত এখনও রয়েছে। ভদ্রলোক প্রভাসের চোটটা এত খুঁটিয়ে দেখছেন কেন? প্রভাস কিছু বুঝে উঠতে পারল না।
প্রভাস মোবাইলে প্রথমে একটা নম্বর ডায়াল করল, সেটা পাওয়া গেল না, ‘বলছে নট রিচেবল’, দ্বিতীয় আরেকটা নম্বর ডায়াল করল সে, এটা তার স্ত্রী সুনয়নার নম্বর। কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর সুনয়না ফোন ধরল। প্রভাস তাকে সংক্ষেপে পথের বিপদের কথা জানিয়ে দিল, সেই সঙ্গে এও জানিয়ে দিল তার মোবাইলের অবস্থা, অতএব বাড়ির সবাই যেন চিন্তা না করে, সে এক বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে, অবস্থা ঠিক হলেই রওনা দেবে। কাজেই তার দেরি হবে ফিরতে। ফোনটা শেষ করে ধন্যবাদের সঙ্গে মোবাইলটা ভদ্রলোককে ফেরত দিতে গিয়ে প্রভাস দেখল যে বাড়ির মালিক এখনও তার কপালের ওই চোটটার দিকেই তাকিয়ে আছেন।
প্রভাসের কথায় ভদ্রলোকের যেন চেতনা ফিরে এল। মোবাইলটা ফেরত নিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওয়াইফ?’
‘হ্যাঁ, বলে দিলাম এই অবস্থার কথা, নইলে চিন্তা-ভাবনা করবে?’ জানালো প্রভাস।
‘আপনি থাকেন কোথায়?’ জানতে চাইলেন ভদ্রলোক।
‘দমদমে। মানে দমদম জংশনের দিকে’।
‘আমি একটা সময় বেলগাছিয়ায় থাকতাম’, বললেন ভদ্রলোক।
প্রভাস লক্ষ্য করছিল কথার মাঝেও ভদ্রলোক লক্ষ্য করে যাচ্ছেন তার কপালের পুরনো চোটটাকে। একটা অস্বস্তি হওয়া শুরু হল প্রভাসের। এদিকে এই অবস্থায় সে বেরোতেও পারছে না। তাই প্রসঙ্গ বদল করার চেষ্টা করল, ‘আপনি এই বাড়িতে একাই থাকেন?’।
‘আপাতত একাই, মিসেস গেছেন তার বাপের বাড়ি। দু’দিন পর ফিরবেন, আর কেউ নেই’।
এবার বোধহয় ভদ্রলোক নিজেই আর থাকতে পারলেন না, জিজ্ঞেস করে ফেললেন, ‘আপনার কপালে একটা আঘাতের চিহ্ন দেখছি। পুরনো। কিভাবে লেগেছিল?’
‘ক্রিকেট খেলতে গিয়ে’। জানালো প্রভাস।
‘দমদম এসআর মেমোরিয়াল স্কুল কি?’ এবার জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক।
যারপরনারই অবাক হল প্রভাস, ‘কিন্তু আপনি কি করে...?’।
‘নামটা বোধহয়...প্রভাস...তাই তো?’ আবারও বললেন ভদ্রলোক।
আরও অবাক হওয়ার পালা প্রভাসের, ‘আপনি আমাকে চেনেন? কিন্তু কি করে?’ হতভম্ব লাগল প্রভাসকে।
‘সে’কথা পরে হবে’, ভদ্রলোকের চোখমুখে একটা নতুন এনার্জি যেন এসে গেছে, ‘এর মধ্যে ফিরবে কি করে? তোমার গাড়ি তো খারাপ বললে? দাঁড়াও দেখছি’।
প্রভাস লক্ষ্য করল ভদ্রলোক একঝটকায় আপনি থেকে তুমি সম্বোধনে এসে গিয়েছেন।
নিজের মোবাইলটা নিয়ে ভদ্রলোক একটা নম্বর ডায়াল করলেন, ওপাশ থেকে কেউ ধরল, তার কথা শুনতে পেল না প্রভাস। শুধু এই ভদ্রলোকের কথাই সে শুনতে পেল, ‘কে রাজীব? হ্যাঁ দাদা বলছি...শোনো না একটু ফেভার চাই ভাই...একজন মেকানিককে তোমার গ্যারেজ থেকে পাঠাতে পারো......খুব আর্জেন্ট ভাই...জানি তো বৃষ্টি। হ্যাঁ। আমার বাড়িতে একজন অতিথি এসেছেন...তার গাড়ি...ওনাকে ফিরতে হবে আজ...সেই জন্যই তো বলছি আর্জেন্ট...একটু করে দাও...ঠিক আছে পাঠাচ্ছো তো...আধঘন্টা, ঠিক আছে...ওকে’, বলে ফোন কেটে দিলেন ভদ্রলোক, এবার প্রভাসের দিকে ফিরে বললেন, ‘একটু ওয়েট করো, আধঘন্টার মধ্যেই মেকানিক এসে যাবে’।
‘কিন্তু আপনি এখনও আমার প্রশ্নের উত্তর দেননি, আপনি আমাকে চেনেন কিভাবে?’ আবারও জানতে চাইল প্রভাস।
এবারে সোফায় বসে নিজের দেহটাকে এলিয়ে দিলেন ভদ্রলোক, ‘১৯৯৭, ১১ই ডিসেম্বর, স্কুলের একাদশ আর দ্বাদশ শ্রেণীর মধ্যে বার্ষিক ক্রিকেট ম্যাচ। মনে পড়ে?’
এই খেলাটিকে কি করে ভুলবে প্রভাস। তার ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন শেষ হয়ে গিয়েছিল এই ম্যাচে। প্রভাস তখন একাদশ শ্রেণীর ছাত্র। অনুর্দ্ধ উনিশ বেঙ্গল ট্রায়ালে ডাক পেয়েছে। ট্রায়ালের কিছুদিন আগেই ছিল এই ম্যাচ। সেদিন দারুণ খেলছিল প্রভাস। সেঞ্চুরি করেও আউট হচ্ছিল না সে। ওভার কনফিডেন্সে মাথার হেলমেটও খুলে ফেলেছিল। আর তখনই দ্বাদশ শ্রেণীর এক ফাস্ট বোলারের বল আচমকা এসে কপালে লাগে। বলটা ছিল বিমার। সোজাসুজি এসেছিল প্রভাসের কপাল লক্ষ্য করে। কপাল ফেটে একাকার। হাসপাতালে ভর্তি করার পর অনেকগুলি সেলাই পড়েছিল। মাথায় ক্ষতির প্রভূত সম্ভাবনা ছিল। প্রভাসের সেরে উঠতে লেগেছিল অনেক সময়। তারপর তার বাবা তাকে আর ক্রিকেট খেলতে দেননি। এতবছর বাদে হঠাত করে সেই দুঃসহ স্মৃতিটা মনে পড়ে গেল প্রভাসের। ‘বোলার যেন কে ছিল?’ না...কিছুতেই নামটা মনে করতে পারল না প্রভাস।
‘বিক্রমজিত দত্ত’, যেন প্রভাসের মনের কথাটা বুঝতে পেরে বলে উঠলেন ভদ্রলোক। আর ঠিক সেই সময়েই কারেন্ট এল। সুইচ আগে থেকেই দেওয়া ছিল, কারেন্ট আসামাত্রই আলো জ্বলে উঠল, পাখা চলা শুরু করল।
‘সেদিন তোমার মাথা লক্ষ্য করে যে বল ছুঁড়েছিল তার নাম বিক্রমজিত দত্ত’, এমারজেন্সি লাইটটা অফ করতে করতে বললেন ভদ্রলোক। আর তার পরেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তাকালেন প্রভাসের দিকে।
প্রভাস বড় টিউবের আলোয় এবার স্পষ্ট দেখতে পেল ভদ্রলোকের মুখ। মুখের আদলটা এবার স্পষ্ট হয়ে উঠল। তার সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং বিক্রমজিত দত্ত।
‘বলটা তোমার মাথা লক্ষ্য করে আমি ইচ্ছা করেই ছুঁড়েছিলাম’, জানালো বিক্রমজিত, ‘কি করব? খুব রাগ হচ্ছিল তোমার ওপর। তুমি এমন মার মারছিলে সেদিন আমার বলে। মাথাটা ভীষণ গরম হয়ে গিয়েছিল, রাগের মাথায় তোমার মাথা লক্ষ্য করে বিমার দিই আমি। কিন্তু বিশ্বাস কর তোমার যে এভাবে চোট লাগবে বুঝতে পারিনি। তারপর তোমাকে দেখতে হাসপাতালেও যাই আমি। তখনও তোমার জ্ঞান ফেরেনি। তোমার বাবা আমাকে যাচ্ছেতাইভাবে কথা শুনিয়েছিলেন। ওনার দোষ দিই না। তোমার জায়গায় আমি থাকলে আমার বাবাও হয়তো এভাবেই রিয়াক্ট করতেন। যাই হোক আমি খবর পেয়েছিলাম তুমি সুস্থ হয়ে উঠেছ, কিন্তু খেলা ছেড়ে দিয়েছ। আমাদেরো উচ্চমাধ্যমিক এসে গিয়েছিল, তাই স্কুল যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম। তবে তুমি বিশ্বাস করবে কি না জানি না, ঐ দিনের পর আমিও আর ক্রিকেট খেলিনি। ক্রিকেট বল দেখলেই তোমার রক্তাক্ত মুখটা মনে পরত, আর একটা অদ্ভুত অনুশোচনা হত মনে মনে। এত বছর পরে এভাবে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে ভাবিনি। এখানকার সরকারি হাসপাতালে আমি এখন একজন ডাক্তার। আশা করি এবার তুমি আমাকে ক্ষমা করে দেবে?’ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল বিক্রমজিত।
এতদিন মনে মনে এই মানুষটাকে ঘৃণা করে এসেছে প্রভাস। নামটা মনে না থাকলেও সেদিনের সেই বোলারের হিংস্র মুখটা মনে ছিল প্রভাসের। কিন্তু আজকের এই মানুষটা অন্য কেউ। আর ওই পুরনো হিংসাটা বজায় রাখার কোনও মানে হয় না। এমনিও সময় সে আঘাতে অনেকটাই প্রলেপ লাগিয়ে দিয়েছে।
তাদের কথার মাঝেই এসে গেল মেকানিক। বৃষ্টিও বেশ কিছুক্ষণ হল থেমে গেছে। বিক্রমজিত আর প্রভাস এখন অনেক স্বাভাবিকভাবেই স্কুলের পুরনো দিনগুলোর কথা বলছে। গাড়ি ঠিক হতে আরও আধঘন্টা মতো সময় লাগলো। মেকানিকের ফি কিছুতেই প্রভাসকে দিতে দিল না বিক্রমজিত। বিল মেটালো সে নিজেই। আরও কিছু কথা বলে বিক্রমজিতের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রভাস যখন আবার গাড়ি নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল তখন রাত ন’টা বেজে গেছে। কিছুদূর আসার পর প্রভাসের মনে হল বিক্রমজিতের মোবাইল নাম্বারটা নিয়ে নেওয়া উচিত ছিল। পরক্ষণেই মনে পড়ল, সুনয়নাকে সে বিক্রমজিতদার মোবাইল থেকেই ফোন করেছিল। বাড়ি ফিরে সুনয়নার মোবাইল থেকে বিক্রমজিতের নাম্বারটা নিয়ে তাকে ফোন করে নিজের মোবাইল নাম্বারটা দিয়ে দিলেই হবে।


অনেক সুন্দর দাদা 🙏
উত্তরমুছুন