ধ্রুবরাজ সেনের মার্ডার
রুদ্রকান্ত রায়চৌধুরী নিজের বাড়িতেই ছিলেন যখন অমিত ধর তার সাথে দেখা করতে এল। রুদ্রকান্ত রায়চৌধুরীর সঙ্গে দীর্ঘসময়ের পরিচয়। দুজনে একই পাড়ায় থাকেন এবং একে অন্যের সম্পর্কে অনেক কিছু জানেনও। রুদ্রকান্তবাবুর বাড়িতে অমিতের আসাটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু আজ অমিতের আসার বিষয়টা যে সাধারণ নয় সেটাও রুদ্রকান্তবাবু জানেন।
রুদ্রকান্তবাবুর দাবা খেলার শখ আছে। একাই খেলেন, কোনো সঙ্গী সাথীর প্রয়োজন হয় না। কিন্তু অমিতকে দেখে তার মনে হল আজ অমিতকে দাবা খেলায় আমন্ত্রণ জানালে সেও না বলবে না।
অমিত রুদ্রকান্তবাবুর বসার ঘরে এসে উপস্থিত হতেই তিনি তার দাবাবোর্ড রাখা নীচু টেবিলের উল্টোদিকে থাকা একটা চেয়ার দেখিয়ে বললেন, ‘ওখানে বোসো, আজ দাবার একটা গেম খেলতে আপত্তি নেই আশা করি’।
অমিত মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে রুদ্রকান্তবাবুর নির্দেশ করা চেয়ারে বসে পড়ল। দুজনেই হাতেহাতে নিজেদের নিজেদের দাবার সৈন্যবাহিনী সাজিয়ে নিলেন। সাদা ঘুঁটি রুদ্রকান্তবাবু এগিয়ে দিলেন অমিতকে নিজে নিলেন কালো ঘুঁটি।
অমিত একটা সাদা বোড়ের চাল দিয়ে খেলা শুরু করে রুদ্রকান্তবাবুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘ধ্রুবরাজ সেনের খবরটা জানেন নিশ্চয়ই?’
দাবার বোর্ডের দিকে চোখ রেখে নিজের একটা কালো বোড়ের পাল্টা চাল দিয়ে রুদ্রকান্ত রায়চৌধুরী বললেন, ‘এখানে থাকি যখন খবরাখবর তো রাখতেই হয়, আর ধ্রুবরাজ সেনের মার্ডারের খবরই যে তোমাকে এখানে টেনে এনেছে আমি তাও জানি’।
অমিত রুদ্রকান্তবাবুর দিকে একঝলক তাকিয়ে নিয়ে দাবার বোর্ডে নিজের দ্বিতীয় চাল দিল। আবারও বোড়ের চাল। তারপর মুখ তুলে বলল, ‘আপনি তো গত পরশুও গিয়েছিলেন ধ্রুবরাজ সেনের ওখানে?’
রুদ্রকান্তবাবু দাবার বোর্ডেই চোখ রেখে বললেন, ‘হ্যাঁ গিয়েছিলাম, তুমি তো জানো আমার এন্টিক জিনিসের প্রতি একটা আকর্ষণ রয়েছে। ওর কাছে একটা পুরনো এন্টিক দেয়াল ঘড়ি ছিল। আমি ঘড়িটা কিনতে চেয়েছিলাম। লোকটা মওকা বুঝে দর বাড়ানোর তালে ছিল। গত পরশু আমি শেষবারের মত একটা অফার নিয়ে গিয়েছিলাম’। কথা শেষ করে নিজের চাল দিলেন রুদ্রকান্তবাবু, ঘোড়ার চাল।
অমিত আবার বলল, ‘ডিল ফাইনাল হয়েছিল?’ বলে সে নিজেই এবার ঘোড়ার চাল দিল।
‘হয়েছিল, আমি অগ্রিম টাকাও দিয়ে এসেছিলাম’, বলে আবার আগের একটা বোড়েকে এগিয়ে দিলেন রুদ্রকান্তবাবু।
সামনের বোড়ে চাল দেওয়ায় রাস্তা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল তাই গজের চাল দিয়ে রুদ্রকান্তবাবুর একটা বোড়েকে খেয়ে নেওয়ার চাল দিয়ে অমিত বলল, ‘কিন্তু ধ্রুবরাজ সেনের চাকর মন্টু নাকি পুলিশকে বলেছে যে আপনি এর আগেও ধ্রুবরাজকে টাকা দিয়েছেন আর সেদিন নাকি আপনি বলেছিলেন, ‘এনাফ ইজ এনাফ, আর আমি তোমাকে টাকা দিতে পারব না’। তখন নাকি ধ্রুবরাজও পাল্টা বলেছিল যে ছবিগুলো সেসব ভাইরাল করে দেবে। তার তাতেই রেগে গিয়ে আপনি নাকি তাকে খুনের হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন। থানার হেড কনস্টেবল প্রকাশ আমার বন্ধু তার কাছেই মন্টুর বয়ান আমি শুনেছি, আগামীকালই হয়ত তদন্তকারী অফিসার আপনার এখানে আসবেন নয়ত আপনাকে থানায় ডেকে পাঠাবেন। আপনি কি সত্যিই ধ্রুবরাজ সেনের মার্ডারের বিষয়ে কিছু জানেন না? কিসের ছবি? মন্টু পুলিশকে জানিয়েছে ধ্রুবরাজ সেনের একটা ল্যাপটপ নাকি পাওয়া যাচ্ছে না, আপনি এব্যাপারে কিছু জানেন? আপনি যদি আমাকে সবকথা খুলে বলেন তাহলে আমি চেষ্টা করতে পারি আপনাকে বাঁচানোর’।
রুদ্রকান্তবাবু মন দিয়ে সবকথা শুনলেন, তারপর নিজের চাল দিলেন, তার ঘোড়াটাকে কাজে লাগিয়ে অমিতের গজটাকে খেয়ে নিলেন তিনি। তারপর বললেন, ‘আমি জানি আসলে ওই ছবির খোঁজ নিতেই তুমি এখানে এসেছ। তুমি নিজেও জানো কিসের ছবি? যে ছবিগুলো দিয়ে আমার বিশ্বাস আমার পাশাপাশি তোমাকেও ব্ল্যাকমেল করে এসেছে ধ্রুবরাজ’।
অমিত দাবার বোর্ডে চাল দিতে গিয়েও থমকে গেল, তার হাত একটুর জন্য হলেও কেঁপে গেল। সে দাবার বোর্ড থেকে রুদ্রকান্তবাবুর দিকে চোখ তুলে বলল, ‘আপনি জানেন সব?’
রুদ্রকান্ত রায়চৌধুরীও এবার অমিতের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি আর পৌষালি যে জঘন্য ভুল করেছিলে তার খেসারত যেমন একদিকে তুমি দিচ্ছ তামনি আরেকদিকে আমি দিচ্ছি। ধ্রুবরাজ সেনের ফাঁদে পা দিয়েছিলে তোমরা, এখানকার অনেক হোটেলেই বিশেষ করে ওইরকম হোটেল যেখানে তোমরা গিয়েছিলে সেইসব জায়গায় ধ্রুবরাজের লোক ফিট করা আছে। তারা তক্কে তক্কেই থাকে এইসব অবৈধ সম্পর্কের গোপন অবস্থার ছবি ভিডিও তুলে রাখতে। আমি আগে কিছুই জানতাম না। পৌষালির বিয়ের পর ধ্রুবরাজ আমাকে তোমাদের দুজনের সেইসব মুহুর্তের ছবি পাঠায়, তার কাছে ভিডিও ক্লিপিংস পর্যন্ত ছিল। পৌষালি আমার একমাত্র ভাইঝি। দাদাবৌদি মারা যাওয়ার পর কন্যাস্নেহে আমিই ওকে বড় করেছি। একইভাবে তোমার স্ত্রী পারমিতাও আমার কন্যাসমা, তুমি যে তাকে একবার হলেও ধোকা দিয়েছ তা জানতে পারলে সে তোমাকে ক্ষমা করবে না। অন্যদিকে এসব জানাজানি হয়ে গেলে পৌষালির বিবাহিত জীবনও শেষ হয়ে যাবে। তোমরা নিজেরাই যখন নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে একে অন্যের থেকে সরে গেছ তখন তোমাদের কোনও সর্বনাশ হোক তা আমি চাইনি। তাই মুখ বুঁজে ধ্রুবরাজের সব দাবী আমি মিটিয়ে গেছি। পরে বুঝতে পারি সে শুধু আমাকেই দহন করছে না, তোমাকেও একইভাবে একই ছবি দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল করে চলেছে এবং আমি যদি ভুল না হই তাহলে তুমিও গত পরশুর আগের দিনই ধ্রুবরাজের বাড়িতে গিয়েছিলে এবং তোমার ওই কনস্টেবলের বন্ধুর নাম করে তাকে শাসানোর চেষ্টাও করেছিলে কিন্তু ধ্রুবরাজ দমেনি। আমি ধ্রুবরাজকে আর টাকা দিতে অস্বীকার করলে সে এই ঘটনার কথা ক্ষেপে গিয়ে আমাকে জানায়। এখন আমার মনেও জিজ্ঞাসা আসছে তুমি, ব্ল্যাকমেলের হাত থেকে রেহাই পেতে তুমি এই খুন করোনি তো?’
অমিত চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল তারপর বসার ঘরের একদিকের জানালার কাছে গিয়ে আবার ফিরে এল, কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, ‘আপনি ঠিকই ধরেছেন, আমি সেটাই ভেবেছিলাম। আমার ব্যবসাও ইদানীং ভালো চলছে না। বাজারে আমার অনেক ধার হয়ে গেছে, তার ওপর ধ্রুবরাজের এই ব্ল্যাকমেল আমি আর নিতে পারছিলাম, আমি অপারগ হয়ে যাই, তাই সেদিন ওকে বলেছিলাম যে আমি আর ওর দাবি মেটাতে পারব না। সে তখন আমাকে ছবি ভাইরাল করে দেওয়ার ভয় দেখায়। এই অবস্থায় আমার আর কিছু করার ছিল না। আমি...আমি স্থির করি ধ্রুবরাজকে সরিয়ে দিতে হবে পৃথিবী থেকে, না হলে আমাকেই আত্মহত্যা করতে হবে। আমি সেটা ভেবেই পরদিন ধ্রুবরাজের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলাম। কিন্তু দেখি তখন আপনি ওর ফ্ল্যাটে ঢুকছেন, আমি কিছুটা আড়ষ্ঠ হয়ে ফিরে আসি। পরদিন রাতে আমি আবার মন শক্ত করে ধ্রুবরাজের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি ওকে খুন করিনি। ওর বিল্ডিং-এ ঢুকতে গিয়েই আমার কেমন একটা হয়ে গেল। দেখি ওর চাকর রাতে নেশা করতে আর তাস খেলতে ওর অন্যান্য সঙ্গীদের সঙ্গে বাইরে যাচ্ছে। আমার কাছে সুবর্ণ সুযোগ ছিল। কারণ আমি জানতাম যে সেই মুহুর্তে ধ্রুবরাজ ফ্ল্যাটে সম্পূর্ণ একা। তখনই দেখি রাজশেখর ওই বিল্ডিং-এ ঢুকছে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম, যদি ও আমাকে চিনে ফেলে? আমি যদি ধরা পড়ে যাই, তাহলে তো আমার আরও বদনামী হবে। আ-আমি আর পারলাম না, আমার ঘাম দিতে থাকল, আমি বাড়ি ফিরে আসি। আর তারপর আজ সকালে খবর পাই ধ্রুবরাজ সেন খুন হয়েছে। আমার প্রথমেই আপনার কথা মনে হল। তাই এখানে ছুটে এলাম। সেই ছবিগুলো, সেগুলোর কি হল? ভাবলাম আপনি যদি জানেন?’
রুদ্রকান্তবাবু বললেন, ‘সেবিষয়ে আমিও চিন্তা করেছি। ধ্রুবরাজ বোকা লোক নয়, সে সেগুলোকে নিশ্চয় কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। নিশ্চয় কারও কাছে সেগুলো আছে। সেই নিয়ে আমারও চিন্তা আছে। কারণ পুলিশ সেগুলো খুঁজে পেলে তোমার ওই কনস্টেবল বন্ধু নিশ্চয়ই তোমাকে জানাত, সেটা যখন হয়নি......আচ্ছা তুমি, বললে রাজশেখর, রাজশেখরকে ওই বিল্ডিং-এ ঢুকতে দেখেছ তুমি, রাজশেখর মানে রাজশেখর দাস, মানে ওই রাজেশ্বরী নামে মেয়েটির ভাই। সপ্তাহদুয়েক আগে রাজেশ্বরীই তো আত্মহত্যা করেছিল তাই না, তুমি জানো কেন আত্মহত্যা করেছিল?’
অমিত বলল, ‘সেও ওই একই ব্যাপার, রাজেশ্বরীর কোনও অশ্লীল ফটো সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল। ওর ভাই ওর বিয়ে ঠিক করেছিল তার কিছুদিন আগেই। ওই অশ্লীল ছবিগুলো সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়ে যাওয়ার পরেই পাত্রপক্ষ বিয়ে ভেঙে দেয়। রাজশেখর দিদির বিয়ের জন্য অনেক ধারকর্য করেছিল বলে শুনেছি, ওদের তো বাবা-মা নেই, দুই অনাথ ভাইবোন অনেক কষ্ট করে বড় হয়েছে। রাজশেখর বয়সে ছোট হলে কি হবে, সেই ছিল তার দিদির একরকম অভিভাবক। একদিকে বিয়ে ভেঙে যাওয়া অন্যদিকে সামাজিক অসম্মান এসব আর নিতে পারেনি রাজেশ্বরী, সে আত্মহত্যা করে। প্রকাশের কাছেই শুনেছি রাজশেখর নাকি ক’দিন থানায় দৌড়াদৌড়িও করেছিল। রাজেশ্বরীর ওই ছবিগুলো নাকি তার বাড়ির বাথরুমের পিছনের ঝোঁপঝাড় থেকে খুব শক্তিশালী ক্যামেরায় লুকিয়ে তোলা হয়েছিল। পুলিশ রাজেশ্বরীর মোবাইলেও ধ্রুবরাজের মোবাইল নাম্বার থেকে কল আসার প্রমাণ পেয়েছিল, কিন্তু ধ্রুবরাজ কিছুই স্বীকার করেনি। ধ্রুবরাজ পয়লা নাম্বারের জুয়াড়ি লোক ছিল, সে এইভাবে মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের ব্ল্যাকমেল করে তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে জুয়ায় ওড়াতো, তারপরও তার বাজারে অনেক দেনা ছিল’।
রুদ্রকান্তবাবু বললেন, ‘সেসব আমি ভালোই জানি, কিন্তু আমার তো এখন মনে হচ্ছে ধ্রুবরাজকে রাজেশেখরই খুন করেছে তার বদলা পূরণ করার জন্য। তাহলে সেইসব ছবিও হয়ত রাজশেখরই নিয়ে গেছে। কিন্তু কি উদ্দেশ্যে সেসব সে নিয়ে গেল, সেটাই এখনও পরিষ্কার নয়, পরিস্থিতি আর অর্থনৈতিক চাপে পড়ে রাজশেখরই আবার আমাদের ব্ল্যাকমেল করতে শুরু করবে না তো?’
অমিত চিন্তিত মুখে বলল, ‘তাহলে আমরা কি একবার রাজশেখরের বাড়ি যাব, ওর সঙ্গে কথা বলতে, মানে তাতে যদি......’
অমিতের কথা শেষ হওয়ার আগেই তার মোবাইলটা তার প্যান্টের পকেটে বেজে উঠল। অমিত দ্রুত মোবাইলটা পকেট থেকে বের করল, সেখানে কনস্টেবল প্রকাশের নাম্বার ভেসে উঠেছে, অমিত কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে প্রকাশ বলে উঠল, ‘রাজশেখর দাস, তোদের পাড়ার কাছেই থাকে, চিনিস নাকি?’
অমিত আমতা আমতা করে বলল, ‘কেন? কি হয়েছে? চিনি মানে এমনিতে পরিচয় আছে, তবে ঘনিষ্ঠ নয়, হপ্তাদুয়েক আগে ওরই দিদি তো সুইসাইড করেছিল, তুই তো জানিস, তোর সঙ্গে কথা হয়েছিল......’
প্রকাশ মোবাইলের অন্য দিক থেকে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তোকে বলেছিলাম, আরে তোদের এলাকায় এত ক্রাইম ঘটছে যে আমাদের তো ভাই নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। এই রাজশেখরও ডেড। সিলিং থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় বডি পাওয়া গেছে। মনে হচ্ছে দিদির মত ভাইও সুইসাইড করেছে, আমি স্পট থেকেই কল করছি, ফরেনসিক টিম এখন কাজ করছে, আর বলিস না, রোজ রোজ তোদের এলাকায় অপঘাত মৃত্যু হতে থাকলে আমরাই বা সামলাই কি করে? শুধু তাই নয় গলায় দড়ি দেওয়ার আগে ছেলেটি একগাদা ছবি জ্বালিয়েছে, সব পুড়ে ছাই। একটা ল্যাপটপও ধ্বংস করেছে ছেলেটা। খুব বাজে ভাবে ভেঙেছে। ফরেনসিক টিম ভাঙা ল্যাপটপটা নিজেদের সাথে নিয়ে যাবে, তবে তারা একরকম বলেই দিচ্ছে যে ল্যাপটপটার যা অবস্থা তাতে ওর মধ্যে থেকে কিছু উদ্ধার করা কঠিন। ল্যাপটপের ভেতরের মালমশলা মানে যন্ত্রপাতিটাতি সব একেবারে পিন্ডি চটকে রেখে দিয়েছে। আর ছবিগুলো তো পুরো ছাই হয়ে গেছে, কিসসু পাওয়া যাবে না। বাড়ি থেকে ধোঁয়া বেরতে দেখে প্রতিবেশীরা এসে দরজা ধাক্কায়। কোনওরকম সাড়া শব্দ না পাওয়ায় তারা পুলিশে খবর দেয়, আমরা এসে দেখি এই ব্যাপার। যাই হোক বড়বাবু এদিকেই আসছেন, আমাকে ফোন করতে দেখলে আবার রাগারাগি করবেন, আমি ছাড়লাম বুঝলি, পরে কথা হবে’।
প্রকাশ কলটা কেটে দিল। অমিত মোবাইলটা আবার নিজের পকেটে ঢুকিয়ে রাখল। অমিতের মুখের ভাব দেখে উৎকণ্ঠা নিয়ে রুদ্রকান্তবাবু তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি হয়েছে? তোমাকে এরকম লাগছে কেন?’
অমিত বলল, ‘ছবিগুলো আর ধ্রুবরাজের একটা ল্যাপটপ তাকে মেরে রাজশেখরই নিয়ে গিয়েছিল। ছবিগুলো সেসব জ্বালিয়ে দিয়েছে, সেগুলো পুড়ে ছাই, ল্যাপটপটাও সে নষ্ট করে দিয়েছে। ধ্রুবরাজ বোধহয় নিজের ক্যামেরা আর মোবাইলে কিছু স্টোর করে রাখত না, সবই ছিল বোধহয় ওই ল্যাপটপে। আর নয়ত ধ্রুবরাজকে মেরে তার মোবাইল আর ক্যামেরা থেকে সব ডেটা ডিলিট করে ব্যাকআপ স্টোর থাকা ওই ল্যাপটপটাকে একদম ধ্বংস করে দিয়েছে রাজশেখর। যাতে কারও হাতেই ব্ল্যাকমেলিং-এর কোনও ছবি ভিডিও না পরে। রাজেশ্বরীর মত আর কারও জীবন যাতে ওই ছবি ভিডিওগুলোর জন্য শেষ না হয়ে যায়, আত্মহত্যা করার আগে সেই ব্যবস্থাই করে গেছে রাজশেখর’।
‘মাই গড’, বলে মাথা নাড়লেন রুদ্রকান্ত, ছেলেটা এইভাবে নিঃশব্দে আমাদের জীবন ফিরিয়ে দিয়ে গেল। অথচ আমরা ছেলেটার জন্য কিছুই করতে পারলাম না’। আবারও মাথা নাড়লেন রুদ্রকান্তবাবু।
‘তাহলে, এবার কি করা?’ জানতে চাইল অমিত।
রুদ্রকান্ত রায়চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘কিছুই আর করার নেই, যা করার সব রাজশেখরই করে গেছে, আমরা এখন অনেকটাই নিশ্চিন্ত, এখন একটাই কাজ বাকি। এই দাবার গেমটা অসম্পূর্ণ হয়ে আছে, আস যেটা শুরু করেছি সেটা শেষ করি। দাবার এই গেমটা দুজনে খেলে শেষ করি, জীবনের সমস্যাতে তো রাজশেখরই তোমাকে-আমাকে সহ আরও কতজনকেই ওই ধ্রুবরাজের বিরুদ্ধে জিতিয়ে দিয়ে গেল, এখন এই দাবা খেলায় কে জেতে সেটাই দেখার’।
অমিত আবার চেয়ারে এসে বসে নিজের আটকে থাকা দান দিল, রুদ্রকান্তবাবুও নিজের পরবর্তী দান দেওয়ার জন্য খুঁটিয়ে ঘুঁটিগুলো দেখে নিয়ে নিজের দান দিলেন। খেলা চলতে থাকল।
- Follow Facebook- @milanpurkait09

