জজ ম্যাজিস্ট্রেট
মিলন পুরকাইত
আজ যেকথা তোমাদের আমি বলব, সে ঘটনা এখন থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগের। তাই এই
গল্পের কিছু কথা শুনে তোমাদের মনে হতেই পারে এটা কেউ কীভাবে করতে পারে, কিন্তু
বিশ্বাস করো, তখন এই সকল ঘটনা ভীষণ স্বাভাবিক বলেই গণ্য করা হত। তোমরা যদি
বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে এইসব কান্ডের মিল খুঁজতে যাও তবে তা কিন্তু পাবে না। এই
সতর্কবার্তা জারি করে আমি গল্প শুরু করলাম।
ডানপিটে শব্দের সমার্থক শব্দ হিসেবে কিছুদিন পরে সৌমিত্রের নাম ডিকশনারিতে তোলা হবে এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। যেভাবে তার দৌরাত্ম্য বেড়ে চলেছে তাতে তাকে এপাড়ার উঠতি গুন্ডা বললেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই। তার দুষ্টামিতে মোটামুটি পাড়ার অর্ধেকের বেশি বাড়ির লোক অসন্তুষ্ট। কিন্তু মুশকিল হল যে, এই অবধি ব্যাপারটি থেমে থাকেনি। সৌমিত্রের সব কার্যকলাপের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ কানে গিয়েছিল সৌমিত্রের বাবারও।
সৌমিত্রের বাবা ওরফে মৈনাকবাবু রেলের ড্রাইভার। এ পাড়ায় তাঁর বেশ নাম ডাক। মৈনাকবাবু আর তাঁর সহধর্মিণী মালাদেবীর চারটি সন্তান। বড় ছেলে সৌমিত্র, বড় মেয়ে শ্যামলী, ছোট মেয়ে বৃষ্টি ও সবার ছোট রাঘব। শ্যামলী, বৃষ্টি দুজনেই ভীষণ শান্ত স্বভাবের, আর রাঘবও ছেলে হওয়া সত্ত্বেও হাতে পায়ে চঞ্চল কোনোদিনই ছিল না। এদের মধ্যে কিভাবে সৌমিত্র দলছুট হল কে জানে!
প্রতিদিনই স্কুল থেকে ডাক পড়ে মালাদেবীর। কারণ, একমাত্র সৌমিত্র। সে কোনদিন কোন ছেলেকে পিটিয়েছে, কোনদিন স্কুলের কোন স্যারের ক্লাস থেকে পালিয়েছে, বা অন্য কারোর টিফিন চুরি করে খেয়েছে ইত্যাদি আরো নানান বাঁদরামি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মালা দেবী গিয়ে সামাল দেন। প্রতিবার বলা হয় স্কুলের প্রিন্সিপালকে যে আর সে এমন করবে না; তাই হয়ও কিন্তু দুষ্টামির নতুন ফন্দি আঁটতে সৌমিত্রর খুব বেশি সময়ও লাগে না। তাই এত বছরে একই কান্ডের জন্যে তাকে শাস্তি পেতে দেখা যায়নি। এ তো গেল স্কুলের ঘটনা। পাড়ার ঘটনাবলি আরও ভয়ানক। এই ক্ষেত্রে সব থেকে উল্লেখ্য ঘটনাটাই তোমাদের বলি। একবার পাড়ার এক কাকু মৈনাকবাবুকে ডেকে বুঝিয়েছিলেন সৌমিত্র সারাক্ষণ খেলে বেড়ায়, তাকে যেন বোঝানো হয় একটু পড়ায় মন বসাতে। মৈনাকবাবু সেই কথা শুনে বাড়ি এসে সৌমিত্রর ঘর থেকে বেরোনো তিনদিনের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তিনদিন কাটলে, ছাড়া পাওয়ার পরে সৌমিত্র সোজা সেই কাকুর বাড়ি গিয়ে বলেছিল, "সেদিন আমার বাবাকে আমার খেলাধুলো নিয়ে নালিশ করেছেন ঠিক আছে, কিন্তু পরের বার বললে থান ইট ছুড়ে মারব।" সেই কথা শুনে ভদ্রলোকের কি হাল হয়েছিল জানা নেই কিন্তু সৌমিত্রের পিঠে চাবুকের ঘা পড়েছিল এ কথা সত্যি।
এত গৌরচন্দ্রিকা করার কারণ আমাদের নায়ক শ্রী সৌমিত্র সেন আজ আবার এক গোল বাঁধিয়েছেন। তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছো এ আর নতুন কী! কিন্তু নতুনত্ব আছে এইবারে। সেটা হল, এই অভিযোগ এসেছে স্কুল থেকে তার বাবার কাছে। এতদিন মালাদেবী জানতে দেননি যে স্কুল থেকেও সৌমিত্র দু থেকে তিনবার সাসপেন্ডেড হয়েছে। বেশিরভাগ সময় মৈনাকবাবু ডিউটি করতে চলে যাবার দরুণ চাপা দিতে সমস্যা হয়নি কিন্তু আজ যখন উনি ডিউটি যাননি তখন টেলিফোন আসে স্কুল থেকে, দুর্ভাগ্যবশত ফোন তোলেন সৌমিত্রের বাবা।
বাড়ি থেকে গম্ভীর মুখে বেরিয়ে গেলেন মৈনাকবাবু। প্রিন্সিপাল ফোন রেখে বললেন, "তোমার বাবা আসছেন।" এই প্রথমবার সৌমিত্রকে ভয় পেতে দেখলেন স্কুলের ম্যাডাম। বাবা আসবে এই কথা শোনার জন্যে সে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। অ্যাডমিশনের পরে এই নিয়ে দ্বিতীয় বার তার বাবা স্কুলে আসছেন। এ জগতে একমাত্র বাবাকেই যমের মত ভয় পায় সৌমিত্র। সে জানে আজ তার কপালে শনি নাচছে। আধ ঘন্টার মধ্যেই মৈনাকবাবু প্রিন্সিপালের চেম্বারে হাজির। একবার কড়া নজরে সৌমিত্রকে দেখে বললেন,
"কী করছে আমার ছেলে?"
প্রিন্সিপাল বললেন, " দেখুন ওকে নিয়ে আমরা নাজেহাল। নানান ধরণের বাঁদরামি তো আছেই, তবে এতদিন পড়াশুনোটুকু সে করত। কিন্তু আজ ক্লাসরুমে সে পড়ার বইয়ের ফাঁকে কমিক্স পড়তে গিয়ে ধরা পড়েছে। এই দেখুন..." বলে, শুকতারার সংখ্যাটা এগিয়ে দিলেন ম্যাডাম।
মৈনাকবাবু আবার একবার দেখলেন সৌমিত্রকে। সৌমিত্র, তার বাবা প্রিন্সিপালের ঘরে ঢোকার পর থেকে একটিবারের জন্যও মাথা তোলেনি।
মৈনাকবাবু বললেন, "আমি কথা দিচ্ছি ও আর কমিক্স পড়বে না।"
এইবার সৌমিত্র মুখ তুলে তাকাল। সে সব থেকে বেশি ভালোবাসে গল্পের বই আর কমিক্স পড়তে। সেটা পড়া বন্ধ হয়ে যাবে শুনে, তার অজান্তেই চোখ থেকে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
"আজ তাহলে আসি। অনেক ধন্যবাদ ম্যাডাম। নমস্কার।" এই বলে মৈনাকবাবু উঠে সৌমিত্রর হাত ধরে টানতে টানতে বেরিয়ে গেলেন।
স্কুল থেকে বাড়ির রাস্তা অল্পই কিন্তু আজ সৌমিত্রের মনে হল যেন আরও দ্রুত শেষ হয়ে গেল। বাড়ি গিয়ে কী হবে ভেবেই তার বুক শুকিয়ে গেছে। বাড়ি ঢুকতেই তার গালে চড় বসিয়ে দিলেন মৈনাকবাবু। সাথে চিৎকার করতে করতে বললেন,
-"এই কারণে তোকে পয়সা দিই যে তুই স্কুলে গিয়ে পড়ার বইয়ের বদলে কমিক্স পড়বি!"
মালাদেবী ছুটে এলেন। বললেন, "তুমি শান্ত হও একটু, খোকা আর অমন করবে না।"
"তাই নাকি আর করবে না!" এই বলে আরো দুইখানা চড় থাপ্পড় মেরে দিলেন সৌমিত্রের গালে। চড়ের ঠেলায় সৌমিত্রের মুখ লাল হয়ে উঠেছে। তবু সেইখান থেকে তার পালাবার জো নেই। আরো কিছু এলোপাথাড়ি চড় মেরে মৈনাকবাবু খান্ত দিলেন।
তারপর দম নিয়ে বললেন, "আজকেই বাজার করতে যাবার সময় দেখলাম, চক্রবর্তী বাবুর দুই ছেলে বারান্দায় বসে পড়ছে। ওরা sure জজ ম্যাজিস্ট্রেট হবে। আর এটা আমাদের নাক কেটে জেলে যাবে। সেন বাড়ির নাম ডোবাবে।"
এতক্ষণ, মার খেয়েও সৌমিত্রর চিন্তা হচ্ছিল বইগুলো কীভাবে বাবার হাত থেকে বাঁচানো যায় কিন্তু চক্রবর্তী বাবুর দুই ছেলের কথা শুনেই তার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল।
আগেই বলে রাখি, চক্রবর্তী বাবুর দুই ছেলে সৌমিত্রের স্কুলেই পড়ে। তারা ওর চেয়ে দুই চার বছরের সিনিওর। এখন ছোটটি মানে অরুণ, মাধ্যমিক দেবে আর বড়জন বরুণ, উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছে। তাই তাদের ছুটি চলছে। তারা বরাবরই টিচারদের গুড বুকে থাকার মত ছেলে। শান্ত, ভদ্র, পড়াশুনো করা ছেলে। খেলাধূলার দিকে তাদের কোনোদিনই দেখা যায়নি।
সৌমিত্রের তাদের উপর বেজায় রাগ। ছোট থেকে তাদের সাথে তুলনা শুনতে শুনতে তার মেজাজ গরম হয়ে যায়। কিন্তু বাবার মুখের উপরে কথা বলার সাহস পায় না বলেই চুপচাপ সব কথা হজম করতে হয়।
আজকেও সেই এক তুলনা! অথচ এখন অপরাধীর মত দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করবার উপায় নেই। তার খুব বলতে ইচ্ছে করছিল, "দাঁড়াও, আমিও দেখব কে জজ- ম্যাজিস্ট্রেট হচ্ছে! জানা আছে সব। আমি একদিন এমন চাকরি করব না! দেখে নিও।" কথা গুলো মনের ভিতরেই উত্তাল করে চলেছে কিন্তু মুখে আসার সুযোগ পায়না। সেইবার, মালাদেবী কমিক্স আর গল্পের বইগুলোকে বাঁচিয়েছিলেন। ছেলে কথা দিয়েছিল সে পড়াশুনো করবে।
সৌমিত্র কথা রেখেছিল, পড়াশুনো করেছিল মন দিয়ে। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে ভালোই ফল করেছিল সে। কলেজের পড়া শেষ করেছে মোটামুটি নম্বরে। কিন্তু তার দৌরাত্ম্য কিন্তু এক ফোঁটা কমেনি সেই ঘটনার পরে।
এরপর দশ বছর কেটে গেছে। গঙ্গা দিয়েও অনেক জল গড়িয়েছে।
আজ দুই বছর হল, সৌমিত্র এয়ার ফোর্সে চাকরি নিয়ে দিল্লিতে আছে। কিছুদিনের ছুটিতে বাড়ি ফিরছে সে। মৈনাকবাবু নিতে এসেছেন স্টেশনে। বাবা খুব খুশি ছেলের উন্নতিতে। হেসে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে, অনেকদিন পরে তিনি তাঁর ছেলেকে দেখছেন। সৌমিত্র ও তার বাবাকে প্রণাম করে হাঁটা দিল বাড়ির উদ্দেশ্যে। বাড়ি ফেরার পথে বাজার পড়ে, সৌমিত্র কিছু পছন্দের সবজি কিনল। ছোট থেকে বাবাকে বাজার করতে দেখেছে আজ সে নিজের পয়সাতে বাজার করে গর্ব অনুভব করছে। দাম মিটিয়ে ফেরার সময় সৌমিত্র দেখল চক্রবর্তী বাবুর বড়ো ছেলে বরুণকে দেখল একটি মুদি দোকানে বসে আছে আর ছোটটি তারই পাশে একটি মিষ্টির দোকানে মিষ্টি বিক্রি করছে। দেখে মনে মনে হাসি পেল সৌমিত্রের।
বাড়ি ফিরে সবার সাথে অনেক গল্প করল সৌমিত্র। শ্যামলী এখন একটি স্কুলে চাকরি করছে আর বৃষ্টি মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হয়েছে। রাঘব গানের স্কুলে মাস্টারি করে। সবাই আজ কাজ থেকে তাড়াতাড়ি এসেছে দাদার সাথে গল্প করতে। চা চপ মুড়ি সহযোগে আড্ডা জমে উঠেছে। এই প্রথম সৌমিত্র বাড়ি ছেড়ে থাকছে, তাই তার মা টুকটাক রান্নার উপায় বাতলে দিচ্ছেন। মৈনাকবাবু সন্ধ্যে বেলায় হাঁটতে বেরোন। ফিরে এসে উনিও যোগ দিলেন আড্ডায়। সৌমিত্র তক্কে তক্কে ছিল কখন সে তার বাবাকে উচিৎ জবাব দেবে। সে হঠাৎ বলে উঠল - "বাবা, আজ তোমার জজ কে দেখলাম ডাল চাল বিক্রি করছে আর ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব মিষ্টি বেচছে।"
মৈনাকবাবু গম্ভীর মুখে আড্ডা ছেড়ে উঠে গেলেন নিজের ঘরে।
মা বললেন -"তুই আর শুধরাবি না!"
মায়ের কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
ডানপিটে শব্দের সমার্থক শব্দ হিসেবে কিছুদিন পরে সৌমিত্রের নাম ডিকশনারিতে তোলা হবে এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। যেভাবে তার দৌরাত্ম্য বেড়ে চলেছে তাতে তাকে এপাড়ার উঠতি গুন্ডা বললেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই। তার দুষ্টামিতে মোটামুটি পাড়ার অর্ধেকের বেশি বাড়ির লোক অসন্তুষ্ট। কিন্তু মুশকিল হল যে, এই অবধি ব্যাপারটি থেমে থাকেনি। সৌমিত্রের সব কার্যকলাপের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ কানে গিয়েছিল সৌমিত্রের বাবারও।
সৌমিত্রের বাবা ওরফে মৈনাকবাবু রেলের ড্রাইভার। এ পাড়ায় তাঁর বেশ নাম ডাক। মৈনাকবাবু আর তাঁর সহধর্মিণী মালাদেবীর চারটি সন্তান। বড় ছেলে সৌমিত্র, বড় মেয়ে শ্যামলী, ছোট মেয়ে বৃষ্টি ও সবার ছোট রাঘব। শ্যামলী, বৃষ্টি দুজনেই ভীষণ শান্ত স্বভাবের, আর রাঘবও ছেলে হওয়া সত্ত্বেও হাতে পায়ে চঞ্চল কোনোদিনই ছিল না। এদের মধ্যে কিভাবে সৌমিত্র দলছুট হল কে জানে!
প্রতিদিনই স্কুল থেকে ডাক পড়ে মালাদেবীর। কারণ, একমাত্র সৌমিত্র। সে কোনদিন কোন ছেলেকে পিটিয়েছে, কোনদিন স্কুলের কোন স্যারের ক্লাস থেকে পালিয়েছে, বা অন্য কারোর টিফিন চুরি করে খেয়েছে ইত্যাদি আরো নানান বাঁদরামি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মালা দেবী গিয়ে সামাল দেন। প্রতিবার বলা হয় স্কুলের প্রিন্সিপালকে যে আর সে এমন করবে না; তাই হয়ও কিন্তু দুষ্টামির নতুন ফন্দি আঁটতে সৌমিত্রর খুব বেশি সময়ও লাগে না। তাই এত বছরে একই কান্ডের জন্যে তাকে শাস্তি পেতে দেখা যায়নি। এ তো গেল স্কুলের ঘটনা। পাড়ার ঘটনাবলি আরও ভয়ানক। এই ক্ষেত্রে সব থেকে উল্লেখ্য ঘটনাটাই তোমাদের বলি। একবার পাড়ার এক কাকু মৈনাকবাবুকে ডেকে বুঝিয়েছিলেন সৌমিত্র সারাক্ষণ খেলে বেড়ায়, তাকে যেন বোঝানো হয় একটু পড়ায় মন বসাতে। মৈনাকবাবু সেই কথা শুনে বাড়ি এসে সৌমিত্রর ঘর থেকে বেরোনো তিনদিনের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তিনদিন কাটলে, ছাড়া পাওয়ার পরে সৌমিত্র সোজা সেই কাকুর বাড়ি গিয়ে বলেছিল, "সেদিন আমার বাবাকে আমার খেলাধুলো নিয়ে নালিশ করেছেন ঠিক আছে, কিন্তু পরের বার বললে থান ইট ছুড়ে মারব।" সেই কথা শুনে ভদ্রলোকের কি হাল হয়েছিল জানা নেই কিন্তু সৌমিত্রের পিঠে চাবুকের ঘা পড়েছিল এ কথা সত্যি।
এত গৌরচন্দ্রিকা করার কারণ আমাদের নায়ক শ্রী সৌমিত্র সেন আজ আবার এক গোল বাঁধিয়েছেন। তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছো এ আর নতুন কী! কিন্তু নতুনত্ব আছে এইবারে। সেটা হল, এই অভিযোগ এসেছে স্কুল থেকে তার বাবার কাছে। এতদিন মালাদেবী জানতে দেননি যে স্কুল থেকেও সৌমিত্র দু থেকে তিনবার সাসপেন্ডেড হয়েছে। বেশিরভাগ সময় মৈনাকবাবু ডিউটি করতে চলে যাবার দরুণ চাপা দিতে সমস্যা হয়নি কিন্তু আজ যখন উনি ডিউটি যাননি তখন টেলিফোন আসে স্কুল থেকে, দুর্ভাগ্যবশত ফোন তোলেন সৌমিত্রের বাবা।
বাড়ি থেকে গম্ভীর মুখে বেরিয়ে গেলেন মৈনাকবাবু। প্রিন্সিপাল ফোন রেখে বললেন, "তোমার বাবা আসছেন।" এই প্রথমবার সৌমিত্রকে ভয় পেতে দেখলেন স্কুলের ম্যাডাম। বাবা আসবে এই কথা শোনার জন্যে সে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। অ্যাডমিশনের পরে এই নিয়ে দ্বিতীয় বার তার বাবা স্কুলে আসছেন। এ জগতে একমাত্র বাবাকেই যমের মত ভয় পায় সৌমিত্র। সে জানে আজ তার কপালে শনি নাচছে। আধ ঘন্টার মধ্যেই মৈনাকবাবু প্রিন্সিপালের চেম্বারে হাজির। একবার কড়া নজরে সৌমিত্রকে দেখে বললেন,
প্রিন্সিপাল বললেন, " দেখুন ওকে নিয়ে আমরা নাজেহাল। নানান ধরণের বাঁদরামি তো আছেই, তবে এতদিন পড়াশুনোটুকু সে করত। কিন্তু আজ ক্লাসরুমে সে পড়ার বইয়ের ফাঁকে কমিক্স পড়তে গিয়ে ধরা পড়েছে। এই দেখুন..." বলে, শুকতারার সংখ্যাটা এগিয়ে দিলেন ম্যাডাম।
মৈনাকবাবু আবার একবার দেখলেন সৌমিত্রকে। সৌমিত্র, তার বাবা প্রিন্সিপালের ঘরে ঢোকার পর থেকে একটিবারের জন্যও মাথা তোলেনি।
মৈনাকবাবু বললেন, "আমি কথা দিচ্ছি ও আর কমিক্স পড়বে না।"
এইবার সৌমিত্র মুখ তুলে তাকাল। সে সব থেকে বেশি ভালোবাসে গল্পের বই আর কমিক্স পড়তে। সেটা পড়া বন্ধ হয়ে যাবে শুনে, তার অজান্তেই চোখ থেকে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
"আজ তাহলে আসি। অনেক ধন্যবাদ ম্যাডাম। নমস্কার।" এই বলে মৈনাকবাবু উঠে সৌমিত্রর হাত ধরে টানতে টানতে বেরিয়ে গেলেন।
স্কুল থেকে বাড়ির রাস্তা অল্পই কিন্তু আজ সৌমিত্রের মনে হল যেন আরও দ্রুত শেষ হয়ে গেল। বাড়ি গিয়ে কী হবে ভেবেই তার বুক শুকিয়ে গেছে। বাড়ি ঢুকতেই তার গালে চড় বসিয়ে দিলেন মৈনাকবাবু। সাথে চিৎকার করতে করতে বললেন,
-"এই কারণে তোকে পয়সা দিই যে তুই স্কুলে গিয়ে পড়ার বইয়ের বদলে কমিক্স পড়বি!"
মালাদেবী ছুটে এলেন। বললেন, "তুমি শান্ত হও একটু, খোকা আর অমন করবে না।"
"তাই নাকি আর করবে না!" এই বলে আরো দুইখানা চড় থাপ্পড় মেরে দিলেন সৌমিত্রের গালে। চড়ের ঠেলায় সৌমিত্রের মুখ লাল হয়ে উঠেছে। তবু সেইখান থেকে তার পালাবার জো নেই। আরো কিছু এলোপাথাড়ি চড় মেরে মৈনাকবাবু খান্ত দিলেন।
তারপর দম নিয়ে বললেন, "আজকেই বাজার করতে যাবার সময় দেখলাম, চক্রবর্তী বাবুর দুই ছেলে বারান্দায় বসে পড়ছে। ওরা sure জজ ম্যাজিস্ট্রেট হবে। আর এটা আমাদের নাক কেটে জেলে যাবে। সেন বাড়ির নাম ডোবাবে।"
এতক্ষণ, মার খেয়েও সৌমিত্রর চিন্তা হচ্ছিল বইগুলো কীভাবে বাবার হাত থেকে বাঁচানো যায় কিন্তু চক্রবর্তী বাবুর দুই ছেলের কথা শুনেই তার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল।
আগেই বলে রাখি, চক্রবর্তী বাবুর দুই ছেলে সৌমিত্রের স্কুলেই পড়ে। তারা ওর চেয়ে দুই চার বছরের সিনিওর। এখন ছোটটি মানে অরুণ, মাধ্যমিক দেবে আর বড়জন বরুণ, উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছে। তাই তাদের ছুটি চলছে। তারা বরাবরই টিচারদের গুড বুকে থাকার মত ছেলে। শান্ত, ভদ্র, পড়াশুনো করা ছেলে। খেলাধূলার দিকে তাদের কোনোদিনই দেখা যায়নি।
সৌমিত্রের তাদের উপর বেজায় রাগ। ছোট থেকে তাদের সাথে তুলনা শুনতে শুনতে তার মেজাজ গরম হয়ে যায়। কিন্তু বাবার মুখের উপরে কথা বলার সাহস পায় না বলেই চুপচাপ সব কথা হজম করতে হয়।
আজকেও সেই এক তুলনা! অথচ এখন অপরাধীর মত দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করবার উপায় নেই। তার খুব বলতে ইচ্ছে করছিল, "দাঁড়াও, আমিও দেখব কে জজ- ম্যাজিস্ট্রেট হচ্ছে! জানা আছে সব। আমি একদিন এমন চাকরি করব না! দেখে নিও।" কথা গুলো মনের ভিতরেই উত্তাল করে চলেছে কিন্তু মুখে আসার সুযোগ পায়না। সেইবার, মালাদেবী কমিক্স আর গল্পের বইগুলোকে বাঁচিয়েছিলেন। ছেলে কথা দিয়েছিল সে পড়াশুনো করবে।
সৌমিত্র কথা রেখেছিল, পড়াশুনো করেছিল মন দিয়ে। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে ভালোই ফল করেছিল সে। কলেজের পড়া শেষ করেছে মোটামুটি নম্বরে। কিন্তু তার দৌরাত্ম্য কিন্তু এক ফোঁটা কমেনি সেই ঘটনার পরে।
এরপর দশ বছর কেটে গেছে। গঙ্গা দিয়েও অনেক জল গড়িয়েছে।
আজ দুই বছর হল, সৌমিত্র এয়ার ফোর্সে চাকরি নিয়ে দিল্লিতে আছে। কিছুদিনের ছুটিতে বাড়ি ফিরছে সে। মৈনাকবাবু নিতে এসেছেন স্টেশনে। বাবা খুব খুশি ছেলের উন্নতিতে। হেসে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে, অনেকদিন পরে তিনি তাঁর ছেলেকে দেখছেন। সৌমিত্র ও তার বাবাকে প্রণাম করে হাঁটা দিল বাড়ির উদ্দেশ্যে। বাড়ি ফেরার পথে বাজার পড়ে, সৌমিত্র কিছু পছন্দের সবজি কিনল। ছোট থেকে বাবাকে বাজার করতে দেখেছে আজ সে নিজের পয়সাতে বাজার করে গর্ব অনুভব করছে। দাম মিটিয়ে ফেরার সময় সৌমিত্র দেখল চক্রবর্তী বাবুর বড়ো ছেলে বরুণকে দেখল একটি মুদি দোকানে বসে আছে আর ছোটটি তারই পাশে একটি মিষ্টির দোকানে মিষ্টি বিক্রি করছে। দেখে মনে মনে হাসি পেল সৌমিত্রের।
বাড়ি ফিরে সবার সাথে অনেক গল্প করল সৌমিত্র। শ্যামলী এখন একটি স্কুলে চাকরি করছে আর বৃষ্টি মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হয়েছে। রাঘব গানের স্কুলে মাস্টারি করে। সবাই আজ কাজ থেকে তাড়াতাড়ি এসেছে দাদার সাথে গল্প করতে। চা চপ মুড়ি সহযোগে আড্ডা জমে উঠেছে। এই প্রথম সৌমিত্র বাড়ি ছেড়ে থাকছে, তাই তার মা টুকটাক রান্নার উপায় বাতলে দিচ্ছেন। মৈনাকবাবু সন্ধ্যে বেলায় হাঁটতে বেরোন। ফিরে এসে উনিও যোগ দিলেন আড্ডায়। সৌমিত্র তক্কে তক্কে ছিল কখন সে তার বাবাকে উচিৎ জবাব দেবে। সে হঠাৎ বলে উঠল - "বাবা, আজ তোমার জজ কে দেখলাম ডাল চাল বিক্রি করছে আর ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব মিষ্টি বেচছে।"
মৈনাকবাবু গম্ভীর মুখে আড্ডা ছেড়ে উঠে গেলেন নিজের ঘরে।
মা বললেন -"তুই আর শুধরাবি না!"
মায়ের কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
Follow Facebook: https://www.facebook.com/milanpurkait09

