প্রকৃত শিক্ষা
মিলন পুরকাইত
বহু কষ্টেশিষ্টে বিধবা কমলা দেবী তাঁর ছেলেকে উচ্চ শিক্ষিত করে তুলেছেন।আজ যদি সে ইন্টারভিউতে বসে স্কুল শিক্ষকের চাকরিটা ঘরে ফেরবার আগে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারে, তবেই তাঁর এত দিনের পরিশ্রমী চোখ মুখটা থেকে কষ্টের ঘামটুকু মুছবে।
ইন্টারভিউ দিতে বেরোনোর সময় কমলা দেবীর চরণে হাত রেখে ছেলে অরিন্দম যখন আশীর্বাদ চেয়ে নিচ্ছে মায়ের কাছে।মা তাকে বলল-
-'আমার সবটুকু আশীর্বাদ,ভালোবাসা তোর জন্য রইলো।তুই নিশ্চই আজ সফল হবি।'
তারপর তার কপালে দইয়ের ফোঁটা লাগিয়ে দিয়ে মাথায় কুলদেবীর পুষ্প ছুঁইয়ে দিলো।
অরিন্দম তখন ইন্টারভিউতে চলে গেছে।কমলা দেবী পেথে নিয়ে বঁটিতে আনাচ কুটতে বসেছে।ঠিক এমন সময় বাড়িতে দুজন স্বামী স্ত্রী এসে উপস্থিত হলো।
তাদের চোখে মুখ দেখে কমলাদেবীর মনে হলো যে এইমাত্র বড় কোনো বিপদের আশঙ্কা থেকে তারা উদ্ধার পেয়েছে।তারা দুজন কমলা দেবীকে জিজ্ঞেস করলো-
-'আপনি কী অরিন্দন বাবুর মা?'
কমলা দেবী একটু কিন্তু কিন্তু বোধ করে বললেন-
-'হ্যাঁ..আপনারা?..মানে ঠিক চিনলাম না..।'
সেই মুহুর্তে সেই স্বামী স্ত্রী দ্বয়ে কমলা দেবীর চরণে মাথানত করে প্রণাম করে একসঙ্গে বলে উঠল-
-'আপনি সাক্ষাৎ দেবী,মা।আজ আপনার ছেলের জন্য আমাদের ছোট্টুকে আমরা ফিরে পেয়েছি।'
কমলা দেবী অস্বস্তির মধ্যে পড়ে তাদের বললেন-
-'আরে করছেন কী...উঠুন উঠুন।কী হয়েছে বলুন?'
তারা বলল-
-'আমাদের পাঁচ বছরের ছেলেটার এক্সিডেন্ট হয়েছিলো।ঠিক সময়ে আপনার ছেলে যদি আমাদের ছোট্টুকে রাস্তা থেকে তুলে হসপিটালে নিয়ে না যেত তাহলে হয়তো...'
তাদের দুজনের চোখ দিয়ে কান্না নেমে এলো।কমলা দেবী তাদের জন্য ভেতর থেকে ঘটি করে জল এনে দিয়ে বললেন-
-'এনিন..চোখে মুখে দিয়ে শান্ত হোন..এখন আপনাদের ছেলে সুস্থ আছে তো?'
তারা চোখে মুখে জল দিয়ে কিছুটা করে পান করে বলল-
-'হ্যাঁ।আপনার ছেলের সৌজন্যতায় ও এখন বিপদের বাইরে।'
কমলা দেবী বললেন-
-'না,না..সবই ইশ্বরের কৃপা।ওকে হয়তো আপনাদের ছেলের জন্যই দূত রূপে পাঠিয়েছিলেন ইশ্বর।'
তারা দুজনে-
-'আপনার ছেলের অনেক মঙ্গল করবেন ঈশ্বর।'
বলে তারা ফের একবার কমলা দেবীর কাছে তাদের কৃতজ্ঞতা জাহির করে চলে গেলো।
ওদিকে অরিন্দমের পোশাকআসাকে সেই পাঁচ বছরের বাচ্চাটির রক্ত ইত্যদির দাগ লেগে থাকায় ইন্টারভিউতে তার চাকরি হলোনা।যারা ইন্টারভিউ নিচ্ছিলেন তারা বিশ্বাসই করলোনা অরিন্দমের কথাগুলোর সত্যতা।তারা ভাবলো অরিন্দম তাঁদের গল্প শোনাচ্ছে।
মাথা নীচু করে অরিন্দম যখন বাড়ি ফিরে এসে তার মায়ের সামনে দাঁড়ালো, অরিন্দমের মা,ছেলের মুখ দেখেই বুঝলো, ছেলের চাকরি হয়নি।তিনি তাঁর ছেলেকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন-
-'তোর জন্য সত্যি আজ আমার গর্ব হচ্ছে।চাকরি এবার হয়নি তো পরের বারে হবে।কিন্তু,যে শিক্ষায় তুই শিক্ষিত হয়েছিস এ শিক্ষা সবাই পায়না রে...।'
তারপর তিনি তাঁর ছেলের মুখটা হাতে করে তুলে বললেন-
-'ভালো কাজের জন্য কখনও মাথা নীচু করতে নেই।মেরুদন্ড আরও শক্ত করে তুলে ধরতে হয় বুঝলি।'

