রতনগড়ের গুপ্তধন
মিলন পুরকাইত
আস্তে আস্তে চোখ খুলল লোকটা। সকালের সূর্যের আলো চোখে এসে পড়তেই চোখটা যেন ঝলসে গেল। এক ঝটকায় আবার চোখ বন্ধ করে নিল লোকটা। তারপর আবার কষ্ট করেই চোখটা খুলল। একটা ঝোঁপের ধারে সে আবিষ্কার করল নিজেকে। ধীরে ধীরে উঠে বসল সে। মাথার পেছনে বেশ ব্যথা। ব্যথার জায়গায় হাত দিয়ে বুঝল বেশ বড়সড় একটা পিণ্ডের ঢিপলি তৈরি হয়েছে সেখানে। ধীরে ধীরে একটু চেষ্টা চরিত্র করে উঠে দাঁড়ালো সে। বেশ ভালো মিঠে রোদ উঠেছে, ঝোঁপের থেকে বেরিয়ে একটু এগিয়ে আসতেই সে বুঝল জায়গাটাও বেশ চমৎকার, কিন্তু এইটুকু ছাড়া আর কিছুই সে মনে করতে পারছে না। লোকটা দাঁড়িয়ে খানিক্ষণ ভাবল। এই যেমন নিজের নাম, বাড়িতে কে কে আছে? সে কোথাকার লোক? যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেই জায়গাটাই বা কি? কিছুই মনে পড়ল না তার। চারিদিকে একটু তাকিয়ে দেখল লোকটা। সময়টা অবশ্য সে বুঝতে পারল কিছুটা। যদিও সময় দেখার কোনও যন্ত্র তার কাছে নেই। তবে সূর্যের মিঠে নরম আলো আর পাখপাখালির কলতান শুনে সে বুঝে গেল সময়টা ভোরের দিকেই। তাই পথে রাস্তায় খুব বেশী লোক নেই। লোকটা সোজা রাস্তা ধরে সামনে এগোতে লাগল। কারও দেখা পাওয়া প্রয়োজন, তাহলে তাকে নিজের সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে কিছুটা অন্তত ধারণা তৈরি করতে পারবে সে।
জায়গাটা যে একটা গা গঞ্জ সেটাও বুঝতে পারল লোকটা। তবে ভোরের বেলায় এখনও কোনও দোকান পাট খোলেনি সেটাও দেখা যাচ্ছে। অবশ্য মানুষজন খুঁজে পেতে খুব একটা অপেক্ষা করতে হল না তাকে। রাস্তার ধারে একটা শিবমন্দিরের একদম গায়েই একটা বটগাছ দেখা যাচ্ছে। বটগাছের পেছন থেকে শুরু হয়েছে একটা খোলা মাঠ। সেই বপ্টগাছকে ঘিরে একটা বাঁধানো বেদী রয়েছে, আর সেই বেদীতে বসে রয়েছেন তিনজন অতিবয়স্ক মানুষ, যারা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায় রত। লোকটা মনে করল এদের কাছ থেকেই নিজের আর এই জায়গা সম্বন্ধে খোঁজখবর নিতে পারবে সে। সে এগিয়ে গেল বয়স্ক তিনজন লোকের দিকে।
হরিসাধন সরখেল, কুঞ্জবিহারী দাঁ আর হেমন্ত সাধুখাঁ এই গায়ের সবচেয়ে বয়জ্যেষ্ঠ তিন মানুষ। হরিসাধন সরখেলের বয়স পঁচানব্বই, কুঞ্জবিহারী দাঁ-এর চুরানব্বই আর হেমন্ত সাধুখাঁ সবে বিরানব্বইয়ে পদার্পন করেছেন। বয়স অনুযায়ী তিনজনের স্বাস্থ্য বেশ ভালোই, বাকিসব ইন্দ্রিয় বেশ সজাগ, শুধু চোখের দৃষ্টি তিনজনেরই বেশ ক্ষীণ হয়ে এসেছে, মোটা ফ্রেমের চশমার কাঁচগুলো যেন কাঁচের বোতলের তলার অংশ। তবে ভোর ভোর এই জটাশিবের মন্দিরের পাশের বটগাছের বাঁধানো বেদীতে বসে আড্ডা মারা এই তিনজন প্রায় বিগত সত্তর বছর ধরে চালিয়ে আসছেন। আগে বেলা বাড়লে যার যার কাজে চলে যেতে হত, এখন রোদ্দুরের তাপ না বাড়া পর্যন্ত আড্ডা চলে, বটগাছের ছায়া তাদের আড্ডার সময় বাড়াতেও বিশেষ সাহয্য করে। শীতকালে অবশ্য আড্ডা শুরু হয় বেলা আর একটু বাড়লে তেমনি তখন সেটা চলে সূয্যিঠাকুর মধ্যগগনে পৌছানো পর্যন্ত। তিনজনের নিজস্ব কথাবার্তার মধ্যে বাধা পড়ল, কারণ আরেক চতুর্থ ব্যক্তি এসে হাজির হল তাদের সামনে।
লোকটা হাতজোড় করে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘নমস্কার, চেনা যাচ্ছে কি?’
হরিসাধনবাবু ফোকলা হাসি হেসে বললেন, ‘না চেনার কি আছে? দিব্যি চেনা যাচ্ছে, এখনও সোজা তাকিয়ে বদনের দোকানের বোর্ডের লেখা পর্যন্ত পড়ে দিতে পারি’।
লোকটা একটু বিগলিত হেসে বলল, ‘তাহলে বলুন তো আমি কে?’
হরিসাধনবাবু বললেন, ‘চোখের দৃষ্টির টেস্ট নিচ্ছ নাকি ছোকরা, শোন তবে, তুমি হলে গিয়ে দক্ষিণ পাড়ার হারান মণ্ডলের নাতজামাই খগেন, কি ঠিক বলেছি তো?’
লোকটা কিছু বলার আগেই পাশ থেকে কুঞ্জবিহারী বলে উঠলেন, ‘হরিদা তুমি দেখছি চোখের মাথা সত্যি সত্যিই খেয়েছ, খগেন তো টেকো, বেঁটে আর কালো, এ তো দিব্যি ফর্সা, মাথায় দেখছি ঢেউ খেলানো চুলও রয়েছে, এ কি করে খগেন হয়, আরে এ ত আমাদের মানিকদাদার ছেলে ফেলু, কি হে ছোকরা, বল দেখি তুমি ফেলু কি না?’
লোকটা এমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল, তক্ষুণি নিজের চশমার ভেতর দিয়ে হাঁ করে তার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে হেমন্তবাবু বললেন, ‘হারিসাধনদা চোখের মাথা খেয়েছেন সেটা ঠিক, কিন্তু কুঞ্জদা তুমি তো মাথাটাও খেয়ে বসে আছো, আরে মানিকদাদার ছেলে ফেলুর ব্যায়াম করা চেহারা এ লোকটা তো রোগা পটকা চেহারার, যদিও বেশ ঢ্যাঙা, আর নাকটা খাঁড়া সিঙ্গারার মত, এ ত আমাদের নারাণদার বড় ছেলে টেনি গো, সেই যে কোথায় যেন একটা কাজ করতে গিয়েছিল, আবার ফিরে এসেছে, এ টেনি ছাড়া কেউ নয়, কি বল বাবা, ঠিক চিনেছি তো?’
হরিসাধনবাবু খেঁকিয়ে উঠে বললেন, ‘যতসব আবোল তাবোল কথা, নিজে দাঁড়িয়ে থেকে হারানের নাতনির বিয়ে দিয়েছি আমি, তার নাতজামাইকে আমি চিনব না? এ হ সেই নাতজামাই পলাশপুরের খগেন’।
কুঞ্জবিহারীবাবু তেড়ে উঠে বললেন, ‘ফেলুকে সেই ছোটবেলাটি থেকে কোলে পিঠে করেছি বুঝলে, এয়ারগানটানও কিনে দিয়েছি, গুলতি পটকা এগুলোও আমি দিয়েছি বুঝলে, সেই ছোকরাকে আমি চিনব না, তার বাবার চেয়েও ভালো আমি তাকে চিনতে পারি বুঝেছ’।
হেমন্তবাবু বলে উঠলেন, ‘টেনির বাড়ি আমার পাশে, তাকে জন্মাতে দেখেছি, টেনির জন্মের সময় আমিই ছিলাম নারাণদার পাশে, তাই বেশী বাজে বকতে এসো না, এ ছেলে টেনি না হয়ে যায় না’।
লোকটা কিছুই বুঝে উঠতে পারল না, দ্রুত তিন বৃদ্ধের মধ্যে একটা মস্ত গণ্ডগোল তৈরি হল, যে নিজের পরিচয় জিজ্ঞেস করেছে তাকে খুব বেশী পাত্তা তারা দিলেন না, নিজেদের মধ্যে ঝগড়াতেই মশগুল হয়ে পড়লেন। লোকটা বুঝল এখান থেকে কিছু সুবিধে হবে না, সে তাই তিন বৃদ্ধকে ছেড়ে নিজেই আবার আপন পথে হাঁটা ফেলল। মাথার ওপর সূর্যের তেজ বাড়তে শুরু করেছে, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাঁ-গঞ্জ জাগতে শুরু করেছে, রাস্তায় দু চারিটি লোককে দেখাও যাচ্ছে, পথের ধারে দোকানপাট খুলতে শুরু করেছে। লোকটা ঠিক করল আর যাকে তাকে কোনও কিছু জিজ্ঞেস না করে চোখ কান খোলা রেখে কোনও এলেমদার লোককেই জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে। নিজের কর্তব্য স্থির করে ফেলল লোকটা, আগে জানতে হবে এই জায়গাটার নাম, তারপর নিজের একটা ভালো নাম রাখতে হবে, নামধাম ছাড়া চলা বেশ কষ্টকর।
মাথার পেছনের ব্যথাটা মাঝেমাঝেই বেশ চিনচিন করে উঠছিল, তাও লোকটা দমল না। বেশ কিছুটা হেঁটে এগোনোর পর এবার সে রাস্তার পাশে আরেকটা মন্দির দেখতে পেল। জটাশিবের মন্দিরের তুলনায় এটা বেশ ঝকঝকে। এটা রাধাকৃষ্ণর মন্দির আর সেখানে একজন পুরোহিতকেও দেখা যাচ্ছে। লোকটা স্থির করল সে এই পুরোহিতকেই এই জায়গা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করবে। সে পা ফেলে এগোলো মন্দিরের দিকে।
ব্রজেন ভটচাজ সবে সকালের নিত্যপুজো সেরে রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের বাইরের দালানে এসে দাঁড়িয়েছেন। খুব ভোরে উঠে স্নান সেরে এই মন্দিরে এসে নিত্যসেবা করাই রোগাকার অভ্যেস ভটচাজ মশাইয়ের। তারপর মন্দিরের গর্ভগৃহে তালা দিয়ে বাড়ি গিয়ে সকালের উপবাস ত্যাগ করেন তিনি। বাইরে এসে চারিদিকটা তাকিয়ে দেখে রোজই ঈশ্বরকে সৃষ্টির পালন করার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে কিছুসময় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। কিন্তু আজ দালানে এসে দাঁড়াতেই দেখলেন একজন আগুন্তুক এসে হাজির। সে এসে পুরোহিত মশাইয়ের সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে বলল, ‘চেনা যাচ্ছে কি?’
লোকটাকে ভালো করে ঠাওর করে ভটচাজ মশাই বললেন, ‘না বাবা, তোমাকে ত ঠিক চিনতে পারছি না, কে তুমি?’
লোকটার মনে হল সে হয়ত এ জায়গার লোক নয়, হয়ত অন্য কোনও গ্রাম বা শহর থেকে এসেছে। সে বলল, ‘এই জায়গাটার নাম কি বলতে পারেন ঠাকুরমশাই?’
‘হৃদয়গঞ্জ, আর এই পাড়াটা হল বামুন পাড়া’, জানালেন ভটচাজমশাই।
লোকটা আবার বলল, ‘আপনি ঠিক জানেন?’
লোকটার চেহারাটা কেমন খ্যাপাটে গোছের। আরেকবার তাকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে ব্রজেন ভটচাজ বললেন, ‘নিঃসন্দেহে, এ গাঁয়ে আমাদের সাতপুরুষের বাস। কিন্তু তোমার কাকে দরকার?’
লোকটা একটু ব্যাজার হয়ে বলল, ‘নিজেকে’, তারপরেই হতবাক ঠাকুরমশাইকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘একটা জুতসই নামকরণ করে দিতে পারেন আমার ঠাকুরমশাই?’
ঠাকুরমশাই বললেন, ‘ওমার পিতৃদত্ত কোনও নাম নেই?’
লোকটা একটু চিন্তা করে মাথা চুলকে বলল, ‘ছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু আজ সকালে জ্ঞান হওয়ার পর থেকে কিছুই মনে পড়ছে না, বাপ-ঠাকুর্দার নাম তো ভুলে গেছিই, সেইসঙ্গে নিজের নামটাও একদমই মনে পড়ছে না, একটা নাম না পেলে যে আর চলছে না, পথে কেউ পরিচয় জিজ্ঞেস করলেও তো কিছু বলতে পারব না’।
কথাটা শুনে বেজায় অবাক হলেন ঠাকুরমশাই, কি ভেবে বললেন, ‘রাধাকৃষ্ণের মন্দিরের সামনে এসে নামকরণের কথা বললে, তাই বলছি নতুন এই জীবনে তোমার নাম না হয় হল কৃষ্ণজীবন, কিন্তু পদবী তো বাবা আমি কিছু বলতে পারবো না’।
লোকটা খুশি হয়ে বলল, ‘ওতেই হবে, পদবী জোগাড় করার তাড়া নেই, কৃষ্ণজীবন, বেশ একখানা বেড়ে নাম দিলেন তো, আপাতত এই দিয়েই চালিয়ে নেব’।
লোকটা চলে যেতে উদ্যত হচ্ছিল, তাকে পিছু ডেকে দাঁড় করিয়ে ভটচাজ মশাই বললেন, ‘তোমার যা অবস্থা তাতে ওমার স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে বলেই মনে হয়, কিন্তু এভাবে তুমি কোনদিকে যাবে, তার চাইতে আমার সঙ্গে চল। আমি একা মানুষ, যতক্ষণ না তোমার স্মৃতি ফিরে আসে, আমার কাছেই থাকবে, আর আমার এক বন্ধু আছেন এই গ্রামের বড়হাটতলার কাছে, তার নাম ডাক্তার ত্রিভুবন চন্দ। ত্রিভুবনে এ হেন কোনও রোগ নেই যার চিকিৎসা তিনি করতে পারেন না, তবে একটু পাগলাটে গোছের মানুষ। আমি তোমাকে একবার তার কাছে নিয়ে যাই, মনে হয় তোমার স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে তিন সাহায্য করতে পারেন’।
লোকটা যারপরনারই খুশি হয়ে ভটচাজ মশাইয়ের সঙ্গ নেওয়াই স্থির করল। ভটচাজ মশাই মন্দির কিছু সময়ের জন্য বন্ধ করে লোকটাকে সাথে নিয়ে নিজের বাড়ির দিকে চললেন। তারা এগোতেই মন্দিরের পেছনের দিকের একটা বড় অশ্বত্থ গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল একটা লোক। মিচকে ধুরন্ধর চেহারা তার, চোখ দুটো ভীষণ নিষ্ঠুর, সে তার প্যান্টের পকেট থেকে একটা মোবাইল বের করে একটা সেভ করে রাখা নাম্বারে কল করল, কেউ সে কল রিসিভ করতেই সে বলে উঠল, ‘বস, লোকতা মরেনি......হ্যাঁ বেঁচে আছে, আমরা তো তাই ভেবেছিলাম যে মরে গেছে...এখন দেখছি দিব্যি আছে......না, সঙ্গে লোক রয়েছে, একতা পুরুত, তাই এটাক করলাম না, ওদের পিছু নিচ্ছি, সুযোগ বুঝেই আবার ব্যাটাকে কব্জা করে আপনার আসল জিনিস ওর কাছ থেকে নিয়ে আসব......না না বস, আর ভুল করব না, নকল জিনিস গছিয়ে ব্যাটা খুব ঠকিয়েছে, হোক না হোক আসল জিনিসটা ওর কাছেই আছে, আমি কাজ উদ্ধার করে আপনাকে কল করছি বস’। কলটা কেটে দিয়ে যে পথে কিছু আগে ব্রজেন ভটচাজ আর তার দেওয়া নাম কৃষ্ণজীবন নিয়ে লোকটা তার সাথে যে পথে গিয়েছিল সেই পথেই নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে কিছুটা দ্রুত পায়ে এগোলো এই দ্বিতীয় লোকটা।
ডাক্তার ত্রিভুবন চন্দের ডাক্তারখানাটা সকালের দিকে রীতিমতো চিড়িয়াখানা হয়ে থাকে। হাট-বাজারের একদম পাশেই ডাক্তারখানাটা হওয়ায়, লোকে সকালে বাজার করতে এসে ডাক্তারবাবুকে একবার করে দেখিয়ে নিয়ে যায়। ডাক্তারবাবু মানুষটিও বড় ভালো, মাঝেমধ্যে একটু-আধটু বকাঝকা করেন বটে, রেগে গেলে খিটখিটও করেন, কিন্তু চিকিৎসা করতে গিয়ে টাকা পয়সার দিকে তাকান না। বাইরের বোর্ডে ভিজিট ফিজ একটা লেখা আছে বটে, তবে সবাই যে তা দেয় তা নয়, কেউ দেয়, কেউ কম দেয়, কেউ দেয়ই না, আর গরীব দুঃখী বা ভিখারি তেমন কেউ হলে ত্রিভুবন ডাক্তার টাকা তো নেনই না, উল্টে আরও নিজে ওষুধপত্র টাকা পয়সা সব দিয়ে দেন। তাই এই ব্যাপারটার ফায়দা তুলে সকালে থলে হাতে বাজারে এসে অনেকেই একবার ডাক্তারবাবুর চেম্বারটা ঘুরে যান। রোগহীন লোকেরাও মাঝেমধ্যে শরীরটা যাকে বলে একটু চেক-আপ করিয়ে নিয়ে যান। ডাক্তারবাবুর নাভিশ্বাস ওঠা ছাড়া তাতে আর কারও খুব একটা অসুবিধা হয় না’।
সেইজন্য ব্রজেন ভটচাজ কৃষ্ণজীবনকে নিয়ে ত্রিভুবন ডাক্তারের চেম্বারে এলেন একটু বেলার দিকেই। তখন রোগীদের ভিড় একেবারেই কমে এসেছে। এই চেম্বারে পুরুত ঠাকুরের অবাধ যাতায়াত, তিনি আর ত্রিভুবন ডাক্তার একেবারে শিশুবয়স থেকে অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। ব্রজেন ভটচাজ চেম্বারে ঢুকে দেখলেন আর বিশেষ রোগী বাকি নেই, তাই তিনি কৃষ্ণজীবনকে নিয়ে সরাসরি ত্রিভুবন ডাক্তারের চেম্বারের ভেতরের ঘরে যাওয়ার দরজায় টোকা দিলেন। ভেতর থেকে আওয়াজ এল ভেতরে আসুন। পুরুত ঠাকুর কাঠের পলকা দরজা খুলে পর্দা সরিয়ে নিজের মুখটা একটু দেখালেন। ত্রিভুবন তখন মনোময় সাহুর ডান পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধতে বাঁধতে তার সাথে কথা বলছিলেন। মনোময় সাহু এই হৃদয়গঞ্জের বেশ এলেমদার এক ব্যবসায়ী। ত্রিভুবন ডাক্তার নিজের কাজ থেকে মুখ তুলে ব্রজেন ভটচাজকে দেখে বললেন, ‘এসো এসো, ভেতরে এসো, আমার কম্পাউন্ডার হরনাথের মামাতো বোনের বিয়ে, সে আবার তার গ্রামে গিয়েছে, তাই সকাল থেকে আমার একেবারে নাজেহাল অবস্থা’।
ব্রজেন ভটচাজ ঘরে ঢুকে মনোময়কে পায়ে ব্যান্ডেজ অবস্থায় দেখে বললেন, ‘তোমার আবার কি হল হে মনোময়?’
মনোময় মুখে একটা যন্ত্রণার ভাব ফুটিয়ে বললেন, ‘আর বলবেন না, গতকাল ব্যবসার কাজে সদরে গিয়েছিলাম, ফেরার পথে গাড়িটা বিগড়োলো, তাই বাধ্য হয়ে চগাছার মোড় থেকে একটা মোটরভ্যানে উঠতে হল, সেটা ভজুর দোকানের কাছে একটা বড় গাড্ডায় এমন ঝাঁকুনি দিল যে ছিটকে রাস্তায় পড়লাম, অন্য কোথাও কিছু তেমন ব্যথা লাগেনি, কিন্তু ডান পায়ে বড়জোর লেগেছে, তাই ভাবলাম ডাক্তারবাবুকে দেখিয়ে নিই, তা উনি তো বলছেন বেশ কিছুটা কেটে ছড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশ ভালোমতই মচকেছেও, ওনার মত মানুষ হয় না, নিজেই ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন’।
ত্রিভুবন ডাক্তার আগে প্রেসকিপশান লিখলেন, তারপর মনোময় সাহুকে সব ওষুধপত্র বুঝিয়ে দিয়ে দিলেন, তারপর বললেন, ‘আজ যা আমি হতে পেরেছি তা সব ওই ব্রজেনের বাবার জন্য। আমার পরিবারের সাধ্য ছিল না আমাকে ডাক্তারি পড়ায়। ব্রজেনের বাবা বড়ঠাকুরমশাইয়ের বেশ কিছু জমিজমা ছিল, তার কিছুটা বিক্রি করে উনি আমার পড়ার খরচ জুগিয়েছিলেন, পুজো আচ্চার নামে কোনওদিন মানুষকে ভুল বোঝাননি। শ্রদ্ধাভক্তি তার জায়গায় আর চিকিৎসা তার নিজের জায়গায়। শুধু আমার হাত ধরে বলেছিলেন বাবা ত্রিভুবন ডাক্তার হয়ে গ্রামের লোককে ভুলে যাস না, তুই যাতে এখানকার গরীব মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে পারিস তাই তোর ডাক্তারী পড়ার জন্য জমিটা বিক্রি করে দিলাম। আজ এত বছর ধরে আমি ওনাকে দেওয়া কথাই পালন করে চলেছি’।
একটু আবেগ মোথিত হয়ে পড়েছিলেন ত্রিভুবন ডাক্তার। তখনই ব্রজেন ভটচাজ বলে উঠলেন, ‘ত্রিভুবন, একটি ছেলেকে নিয়ে এসেছি তোমার কাছে, ছেলেটির সঙ্গে আজ সকালেই আলাপ, নিজের নামধাম, পরিচয়, কিছুই মনে পড়ছে না তার, তুমি একবার একটু দেখবে?’
ত্রিভুবন ডাক্তার আবার বাস্তবে ফিরে এসে বললেন, ‘নিশ্চয়ই, কোথায় সে?’
ব্রজেন ভটচাজ, ‘কই হে কৃষ্ণজীবন, এসো হে, ভেতরে এসো, ডাক্তারবাবু ডাকছেন তোমায়’, বলে হেঁকে ডাক্তারবাবু আর মনোময়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নামহীন হলে তো আর চলে না, তাই আমিই কৃষ্ণজীবন নামটা দিয়েছি’।
কৃষ্ণজীবন ঘরে ঢুকে সবাইকে নমস্কার জানালো। তাকে দেখেই মনোময় সাহু কেমন যেন স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। ত্রিভুবন ডাক্তার তাকে গিয়ে তার পরিচয়-নিবাস, কোনও স্মৃতি কিছু মনে পড়ছে কি না, কোনও চেহারা বা কোনও ঘটনা আবছা কিছু মনে আসছে কি না, এইসব নিয়ে কিছু প্রশ্ন করলেন, কৃষ্ণজীবন কোনও প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারল না। তখন ত্রিভুবন ডাক্তার তাকে পরীক্ষা করতে শুরু করলেন, তাকে পিছন ঘুরিয়ে তার মাথা পরীক্ষা করতে গিয়েই মাথার পিছনে থাকা চোটটার হদিস পেলেন তিনি, এখনও জায়গাটা বেশ ভালোমতই ফুলে রয়েছে, ডাক্তারবাবু নিজের টেবিলে ফিরে এলেন, প্রেসকিপশানে একটা ওষুধ লিখলেন, সেটা পুরুতঠাকুরকে বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, ‘মাথার পেছনে একটা চোট আছে, চোটের ফলেই এই স্মৃতিভ্রংশ কি না জানি না, সেটা জানতে গেলে সদরে একে নিয়ে গিয়ে কিছু আধুনিক মস্তিষ্ক পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, তবে চোটের ব্যথা কমার জন্য এই ওষুধটা আপাতত খাক। তবে একটা ব্যাপার, চোটটা বেশ গুরুতর সেটা ঠিক, কিন্তু এই চোটেই এ সম্পূর্ণ স্মৃতিভ্রংশ হবে, ব্যাপারটা আমার এত বছরের ডাক্তারি বুদ্ধিতে ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না’।
মনোময় সাহু এতক্ষণ ধরে হাঁ করে কৃষ্ণজীবনের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, এবারে তিনি বললেন, ‘একে আমি কোথাও দেখেছি’।
কৃষ্ণজীবন কথাটা শুনেই আগ্রহী হয়ে বলল, ‘আপনি আমাকে চেনেন?’
মনোময় বললেন, ‘চিনি বলব না, কিন্তু দেখেছি, কোথায় দেখেছি......কোথায় দেখেছি......হ্যাঁ, হ্যাঁ মনে পড়েছে, তোমাকে রতনগড়ের রাজবাড়িতে আমি দেখেছি, গত মাসে বুড়ো রাজা ওই রতনগড় রাজবংশের শেষ বংশধর যখন মারা গেলেন, তখন অনেকের মত আমিও রাজবাড়ি গিয়েছিলাম, ওখানেই তোমাকে দেখেছি, হ্যাঁ ওখানেই তুমি ছিলে’।
কৃষ্ণজীবন আরও আগ্রহী হয়ে বলল, ‘তাহলে তো নিশ্চয়ই, আপনি আমার নাম, পরিচয় এসবও জানেন’।
মনোময় মাথা নেড়ে বললেন, ‘না সেসব তো কিছু জানি না, সেদিন সেখানে অনেক লোকই এসেছিল, তার মধ্যে তুমিও ছিলে, কিন্তু তুমি কে বা তোমার পরিচয় কি, এসব তো আলাদা করে কিছু জানি না’।
একটু মুষড়ে পড়ল কৃষ্ণজীবন।
ব্রজেন ভটচাজ বললেন, ‘রতনগড় তো হৃদয়গঞ্জ থেকে এমন কিছু দূর নয়, একসময় তো এইসব এলাকাই রতনগড়ের জমিদারীর মধ্যে পড়ত। আমরা নয় আজই গিয়ে একবার ওখানে খোঁজখবর করে আসি, কি বল ডাক্তার?’
ত্রিভুবন ডাক্তার বললেন, ‘প্রস্তাব ভালোই, বিকেলের পর আমারও আর কাজকম্ম বিশেষ নেই, আমিও যাই, এই কৃষ্ণজীবনকেও সাথে নিয়ে যাওয়া দরকার। রতঙ্গড় যদি ওর নিবাস গ্রাম হয়, তাহলে সেখানে পৌছলে, পরিচিত জায়গা দেখে ওর স্মৃতি কিছু কিছু ফিরেও আসতে পারে, রতনগড় রাজবাড়িতে গেলে এর পরিচিত বা আত্মীয় পরিজন কারও সন্ধানও মিলতে পারে’।
মনোময় বললেন, ‘তাহলে আমিও আপনাদের সঙ্গে যাই, পা টা ব্যান্ডেজ বাঁধার পর বেশ আরাম পাচ্ছি, তাছাড়া আমার জিপটাও আমার ড্রাইভার বৈরাগী ঠিক করে নিয়ে এসেছে সকালেই, তাতে করেই আমরা সবাই যেতে পারি’।
ডাক্তার ত্রিভুবন চন্দ একথায় মৃদু বাধা দিলেন, কারণ মনোময়ের পায়ের একটু বিশ্রাম প্রয়োজন। কিন্তু মনোময় সাহু দমবার পাত্র নন। তাই অগত্যা ডাক্তারবাবুকে অনুমতি দিতেই হল। ঠিক হল সবাই মনোময় সাহুর গাড়িতেই বিকেলের দিকে রতনগড়ের উদ্দেশ্যে বেরোবেন। কৃষ্ণজীবনের মনটাও বেশ ভালো, কারণ ভুলে যাওয়া সবকিছু মনে পড়বার আরেকটা সুযোগ তার কাছে আসছে।
চেম্বারের ভেতরের ঘরে যখন এসব কথাবার্তা চলছে তখন সেই দরজার ওপাশে ফাঁকা চেম্বারের করিডোরে দাঁড়িয়ে আবজানো দরজার পাশে চুপিসারে দাঁড়িয়ে সব কথাবার্তা শুনছিল আরেকজন। এই পর্যন্ত কথাবার্তা শোনার পরেই সে দ্রুত বেরিয়ে এল সেখান থেকে, কিছুটা তফাতে এসে লোকটা কল করল আরেকজনকে, কল রিসিভ হতেই সে বলল, ‘গনা, বিকেলের মধ্যে সবকিছু তৈরি রাখিস, শিকার আমাদের খাঁচাতে নিজে থেকেই আসছে, এবারে আর ভুল করা যাবে না, অবশ্য সাথে আরও কয়েকটা কাঁটা……না না বসকে এখন বিরক্ত করতে যাস না………বস নিজেই তো……’, লোকটার কথা শেষ করার আগেই হঠাত করে কলটা কেটে গেল।
মনোময় জিপটা নিয়ে ডাক্তারবাবুর বাড়ির সামনে আসতে একটু দেরি করলেন। ব্রজেন ভটচাজ আর কৃষ্ণজীবন আগে থেকেই সেখানে অপেক্ষা করছিলেন ডাক্তারবাবুর সাথে। তারা জিপে উঠতেই জিপ ছেড়ে দিল। মনোময় জানালেন জিপটা একটু স্টার্ট নিতে সমস্যা করছিল, তাই আসতে একটু দেরি হল। মনোময় সাহুর ড্রাইভার বৈরাগীর ড্রাইভিং-এর হাত বেশ ভালো, তাই এই লড়ঝড়ে জিপকেও এই কাঁচাপাকা রাস্তায় দিব্যি ভালোভাবেই চালিয়ে নিয়ে গেল। রতনগড়ের রাজবাড়ি পর্যন্ত পৌছতে আধঘন্টার বেশী সময় লাগলো না। তবে তাদের থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে যে একটা বাইক তাদেরকে অনুসরণ করে চলছিল সেটা জিপের লোকেরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায় মশগুল থাকায় কেউ আর আলাদা করে খেয়াল করলেন না।
রতনগড়ের রাজবাড়িটা মূল লোকালয় থেকে একটু বিচ্ছিন্ন। আসলে বিশাল জায়গা নিয়ে তৈরি প্রাসাদ বলেই এইরকম। রতনগড়ের বুড়ো রাজা জগদ্দুর্লভ রায় বাহাদুর কিছুসময় আগেই মারা গেছেন, বয়সও হয়েছিল অনেক, কম করেও একশোর কাছাকাছি। তার আর কোনও সন্তানাদি নেই, তবে এক ভাগ্নে আছেন। তিনিই এখন রাজবাড়ির হত্তাকর্তা হয়ে বসেছেন। লোকমুখে শোনা যায়, এই ভাগ্নে মশাই দিগ্বিজয় ভৌমিক নাকি মোটেও সুবিধের লোক নন, নানারকম অসৎ কাজকারবার তার আছে। বুড়ো রাজা নিজেও তাকে খুব একটা পছন্দ করতেন না, কিন্তু বয়সকালে তাকে এই বাড়িতে ঢুকতে বাধা দিতে পারেননি নিজেই বিছানায় শয্যাশায়ী থাকায়।
রতনগড় রাজবাড়ির বিশাল ফটকে দারোয়ান দাঁড়ানো, জিপ দেখেই সে গেট খুলে দিল, ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত লাগল ডাক্তারবাবুর, তার মনে হল এরা যেন আগে থেকেই তাদের অপেক্ষায় রয়েছে। তারা যে আসছেন এই খবর এরা পেল কি করে?’
একটু পরেই গাড়ি এসে থামল রাজমহলে প্রবেশের মূল দরজার সামনে। রাজমহন বললেও তার বেশীরভাগই এখন প্রায় ভগ্নপ্রায়। তাও সামনের মহলের কিছু অংশ মেরামত করে বসতযোগ্য করা হয়েছে। জিপগাড়িটা এসে থামতেই একজন বেরিয়ে এল দরজা দিয়ে, ঠিক তখনই খোলা ফটক দিয়ে বাইকটা এসে প্রবেশ করল ভেতরে। সবাই জিপ থেকে নামতেই সামনে থাকা লোকটি বেশ হুকুমের সুরেই সবাইকে তাকে অনুসরণ করতে বলল। ডাক্তারবাবু আর পুরোহিতঠাকুর দুজনেরই ব্যাপারটা ঠিক বোধগম্য হল না। কৃষ্ণজীবন আপন খেয়ালে রয়েছে, তবে মনোময় সাহুর মধ্যে বিশেষ হেলদোল দেখা গেল না। কৃষ্ণজীবন যাকে সামনে দেখতে তাকেই জিজ্ঞেস করছে, ‘আপনি কি আমাকে চেনেন?’ বা ‘চেনা যাচ্ছে কি?’ কিন্তু তার প্রশ্নের উত্তর কেউ দিচ্ছে না।
রাজবাড়ির একতলার একটা বিশাল হলঘরে সবাইকে আনা হল, সেখানে আরও দুজনের সঙ্গে অপেক্ষা করছেন বেশ বিশালবপু চেহারার একজন প্রৌঢ় বয়সের ভদ্রলোক। তাকেই দেখেই মনোময় বেশ নতজানু হয়ে বললেন, ‘দিগ্বিজয় সাহেব একেবারে পল্টন সহ নিয়ে এসেছি, এই যে দেখে নিন এই লোকটাই তো পালিয়েছিল গতরাতে’।
মনোময়ের ব্যবহার দেখে অবাক হলেন ডাক্তারবাবু আর ঠাকুরমশাই, তবে ডাক্তারবাবু সেইসঙ্গে এটাও বুঝতে পারলেন যে কে এদের খবর পাঠিয়েছে যে তারা আসবেন, কিন্তু মনোময় কেন এই ধূর্তবৃত্তিটা করলেন তা এখনও তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না।
বাইক আরোহী পেছন থেকে মনোময়ের কাছে এসে বললেন, ‘স্যার সময় থাকতেই আমি গনাকে জানিয়ে দিয়েছিলাম যে আপনিই শিকার নিয়ে আসছেন, তাই আর এদের ফাঁদে এনে ঢোকাতে কোনও অসুবিধে হয়নি’।
দিগ্বিজয় সিন্ধুঘোটকের মত মুখ করে, গোঁফ ঝেড়ে একজনকে কিছু একটা ঈশারা করলেন, সে গিয়ে হঠাত কৃষ্ণজীবনকে ধরে সার্চ করতে শুরু করল। লোকটার গায়ের জোর ভালোই, কৃষ্ণজীবন হতভম্ব হলেও লোকটাকে বাধা দিতে পারল, লোকটা ভালো করে তাকে সার্চ করে দিগ্বিজয় ভৌমিককে বলল, ‘না রাজাসাহেব, এর কাছে কিছু নেই’।
দিগ্বিজয়ের মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল, তার হাতে বেশ ভারী জামবাটি জাতীয় একটা জিনিস ছিল, তিনি সেটাই ক্রোধের বশে ছুঁড়ে মারলেন তার নিজের লোককেই উদ্দেশ্য করে, লোকটা সময়মত নীচু হয়ে গেল আর ঠিক সেইসময় ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে দাঁড়ালো বাইকচালককে দেখতে গেল কৃষ্ণজীবন আর ওই ভারী বাটিটা এসে লাগল তার মাথার ঠিক পিছনে, ওইরকম ভারী বাটি সজোরে ছুঁড়ে মারার পর ওর ঘা খেয়ে আর মানুষ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে ন, ফলে কৃষ্ণজীবনও এক ঘায়েই কুপোকাত হয়ে উল্টে পড়ে গিয়ে সংজ্ঞা হারালো। ওদিকে দিগ্বিজয় হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলেন, ‘এটা কি হল মনোময়? তুমি কি সেই জিনিস, সত্যিই পাওনি, নাকি আমার সঙ্গে চালাকি করার চেষ্টা করছ? সেইদিনই টেন পার্সেন্ট শুনে নাক কুঁচকেছিলে তুমি, লোভ কি বেশী হয়ে গেল নাকি?’
মনোময় সাহু হাতজোড় করে বললেন, ‘না না সাহেব, আমি সত্যি বলছি, আমার লোক সকাল থেকে এই লোকটাকে অনুসরণ করেছে, সর্বত্র চোখে চোখে রেখেছে, জিজ্ঞেস করুন একে, এই নান্টু বল না সবকথা’।
নান্টু অর্থাৎ সেই বাইক আরোহী বলে উঠল, ‘হ্যাঁ রাজা সাহেব, গতরাতেই বস আপনার কাছ থেকে নির্দেশ পেতেই, বস আমি আর গনা এই লোকটাকে হৃদয়গঞ্জের কাছেই ধরে ফেলি, গনা ওর মাথায় বাড়ি মারে, তারপরে ওর কাছ থেকে ওই কয়েনটা আমরা পেয়ে যাই, যদিও এই ধরপাকড়ের সময় বসের পড়ে গিয়ে চোট লাগে, কিন্তু আমি আর বস জিনিস্টা গনাকে দিয়ে আপনার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, ভোরের আগেই বস আবার কল করে জানালেন, সেই মুদ্রাটা নাকি নকল, আমি তখনই এই লোকটাকে খুঁজতে যাই, ভেবেছিলাম মরে ওই ঝোঁপের ধারে পড়ে রয়েছে, কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি কেউ নেই, একটু খুঁজতেই দেখি লোকটা হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে, এই ঠাকুরমশাইয়ের সাথে কথা বলছে, তখন থেকে এক মুহুর্তের জন্য একে চোখের আড়াল হতে দেইনি। আর বসতো সবাইকে নিয়েই আপনার ডেরায় হাজির হয়েছেন, আমি সেকথা কল করে গনাকে জানিয়ে দিয়েছিলাম, আপনি গনাকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, আমরা আপনার সঙ্গে বেইমানি করার কথা ভাবতেও পারি না’।
দিগ্বিজয় ভৌমিক গর্জে উঠলেন, ‘তাহলে সেই আসল মুদ্রাটা গেল কোথায়? আমার লোক স্পষ্ট দেখেছিল সেই ম্যানেজার ভোলানাথ সেই মুদ্রাটা এই গোবিন্দর হাতেই দিয়েছিল, এই গোবিন্দ লোকটা সেই ম্যানেজারের ভাইপো, সেই বুড়ো রাজার মরার দিন থেকে শুরু করে একে সারা রতনগড়ে গোরু খোঁজা করে খুঁজে বের করেছি আমি, আর আমার অপদার্থ লোকেদের চোখে ফাঁকি দিয়ে একদিনেই সে হৃদয়গঞ্জে পালিয়ে গেল, যাও বা হৃদয়গঞ্জে তাকে ধরা গেল, আসল কয়েন নকল হয়ে গেল, তারপরেও সেই আসল কয়েনের হদিশ নেই কোনও’।
ডাক্তারবাবু বুঝলেন যে কৃষ্ণজীবনের আসল নাম গোবিন্দ, নীচু স্বরে সে কথা তিনি পুরুতঠাকুরের কানে কানেও বলে দিতে গেলেন আর সেটা দেখেই মনোময় সাহু বলে উঠলেন, ‘ওই দেখুন হুজুর ডাক্তারবাবু ব্রজেন ঠাকুরের কানে কানে কিছু বলছেন, হোক না হোক আসল সেই মুদ্রাটা হয়ত গোবিন্দর কাছ থেকে এরাই আদায় করে লুকিয়ে রেখেছেন’।
দিগ্বিজয় হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলেন, ‘প্রয়োজনে এই দুটো বুড়োকে জবাইকে করেও সেই আসল মুদ্রা আমার কাছে এনে দে তোরা, যা দেখি যা, ধর লোকদুটোকে’।
নান্টু এগোতে যাচ্ছিল ডাক্তারবাবু আর পুরুতঠাকুরের দিকে, তখনই ম্যাজিকের মত হুঁশ ফিরে পেয়ে গোবিন্দ ওরফে কৃষ্ণজীবন ঝাঁপিয়ে পড়ল নান্টুর ওপর। মনোময় আর অন্য লোকেরা তাকে বাধা দিতে এগোতে যাচ্ছিল কিন্তু ঠিক সেইসময় দিগ্বিজয়ের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন ব্যক্তি হঠাত রিভলবার বের করে দিগ্বিজয়ের মাথায় ঠেকালো, দিগ্বিজয় অবাক হয়ে বললেন, ‘সুদর্শন তুমি? তুমি আমার মাথায় রিভলবার ঠেকাচ্ছ কেন?’
সুদর্শন একটা শূন্যে গুলি চালিয়ে সবাইকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলে উঠলেন, ‘কেউ নড়বে না, যে যেখানে আছো দাঁড়িয়ে থাকো। এই রাজবাড়িকে পুরো পুলিশ চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে, আর আমি পুলিশের লোক, এই দিগ্বিজয় ভৌমিককে তার পুরো গ্যাংসহ হাতেনাতে ধরব বলে এতদিন এর শাগরেদ সেজে ছিলাম। এসপি সাহেবের মেসেজ এল এইমাত্র, বাইরের সব গুণ্ডা ধরা পড়ে গেছে, এবারে ভেতরের লোকেদেরও খেল খতম’।
গুলির আওয়াজটা ছিল একটা সংকেত, সেটা হতেই বাইরে থেকে অনেক পুলিশের লোক এসে ঢুকে পড়ল ঘরের ভেতর, দিগ্বিজয়, মনোময় আর নান্টুসহ সব অপরাধীদের পুলিশ ধরে নিয়ে চলে গেল। এসপি সাহেব স্বয়ং এসে সুদর্শনকে বাহবা দিলেন। ডাক্তারবাবু আর পুরুতমশাই তখনও হতভম্ব, গোবিন্দ মেঝে থেকে উঠে পড়ে গায়ের ধুলো ঝাড়ছে। এসপি সাহেব সুদর্শনকে বললেন, ‘এনাদের মনের অন্ধকারটাও দূর করে দাও’।
সুদর্শন হেসে বলতে শুরু করল, ‘দিগ্বিজয় ভৌমিক একজন বড় ক্রিমিনাল। বুড়ো রাজার ভাগ্নে বলে তার শেষ সময়ে এখানে এসে উপস্থিত হয়। আমি অনেকদিন থেকেই তার দলে রয়েছি তার ওপর নজর রাখার জন্য। বুড়ো রাজা বুঝতে পেরেছিলেন যে দিগ্বিজয়ের এখানে আসার আসল উদ্দেশ্য হল রতনগড়ের গুপ্তধন হাসিল করা। রাজামশাই ভালো মানুষ ছিলেন, তিনি সেই টাকার অনেকটাই ব্যয় করেছিলেন এই অঞ্চলের উন্নয়নে, বাকিটাও তিনি ভালো কাজেই লাগাতে চেয়েছিলেন। তাই মৃত্যুর আগে তিনি গোপনে তার হদিশ তার বিশ্বস্ত ম্যানেজারকে দিয়ে যান। কিন্তু সেটা দিগ্বিজয়ের লোকেরা দেখে ফেলে, ফলে ম্যানেজার ভোলানাথবাবু কৌশলে তা দিয়ে যান তার আধভুলো ভাইপো গোবিন্দর হাতে। ভোলানাথবাবুকে খুন করেও কাজ হাসিল না হওয়ায় গুন্ডারা গোবিন্দর পেছনে লাগে। গোবিন্দ মাঝেমধ্যেই সবকিছু ভুলে যায়, তাই আমি তাকে আমার কাছে এক গোপন ডেরায় লুকিয়ে রেখেছিলাম, যে মুদ্রা ওই গুপ্তধন পাওয়ার চাবি, সেই মুদ্রার মত একটা হুবহু নকল তৈরি করিয়ে আমি আসলটা আমার হেফাজতে নিয়ে নিই। কিন্তু গতকালই দিগ্বিজয়ের লোকেরা গোবিন্দকে খুঁজে বের করে ফেলে, গোবিন্দ পালায় হৃদয়গঞ্জের দিকে, সেখানে দিগ্বিজয়ের এজেন্ট মনোময় আর তার লোকেরা তাকে ধরে ফেলে তাকে মারধর করে, এদিকে আমি বুঝতে পারছিলাম না গোবিন্দ্র অবস্থা, কিন্তু নান্টু যখন গনাকে কল করে গোবিন্দর খবর দেয়, তখনই আমি গনাকে ধরে ফেলে এসপি সাহেবকে গোপনে খবর দিয়ে এই পরিকল্পনা করি। গনা আগে থেকেই পুলিশের হেফাজতে আছে’।
ডাক্তার ত্রিভুবন নন্দী বললেন, ‘এইবার বুঝলাম পুরো কেস, গোবিন্দ ওরফে কৃষ্ণজীবনের একটা মাথার ব্যামো ছিলই, তার ওপরে মাথায় চোট লাগায় সে স্মৃতিভ্রংশ হয়েছিল, আবার কিছু আগে ওই জামবাটির বাড়ি ঠিক একই জায়গায় লাগায় তার স্মৃতি আবার ফিরে এসেছে’।
সুদর্শন মুদ্রাটা সবাইকে দেখালো, তারপর ভিতর মহলের এক সুড়ঙ্গের মধ্যে সবাইকে নিয়ে গিয়ে সেখানকার দেয়ালের একটা খাঁজে সেই মুদ্রা রেখে চাপ দিতেই একটা গোপন দরজা খুলে গেল আর সেই দরজার ভেতরের কুঠুরিতে দুই ঘড়া ভর্তি সোনার মোহর পাওয়া গেল। এসপি সাহেব বললেন, ‘এখন এইসবই আমরা জমা দেব সরকারি খাজানায়’।
ডাক্তারবাবু আর পুরুতঠাকুর দেখলেন গোবিন্দর মুখের সরল হাসিটি সেই একইরকম রয়েছে।
নান্টু এগোতে যাচ্ছিল ডাক্তারবাবু আর পুরুতঠাকুরের দিকে, তখনই ম্যাজিকের মত হুঁশ ফিরে পেয়ে গোবিন্দ ওরফে কৃষ্ণজীবন ঝাঁপিয়ে পড়ল নান্টুর ওপর। মনোময় আর অন্য লোকেরা তাকে বাধা দিতে এগোতে যাচ্ছিল কিন্তু ঠিক সেইসময় দিগ্বিজয়ের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন ব্যক্তি হঠাত রিভলবার বের করে দিগ্বিজয়ের মাথায় ঠেকালো, দিগ্বিজয় অবাক হয়ে বললেন, ‘সুদর্শন তুমি? তুমি আমার মাথায় রিভলবার ঠেকাচ্ছ কেন?’
সুদর্শন একটা শূন্যে গুলি চালিয়ে সবাইকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলে উঠলেন, ‘কেউ নড়বে না, যে যেখানে আছো দাঁড়িয়ে থাকো। এই রাজবাড়িকে পুরো পুলিশ চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে, আর আমি পুলিশের লোক, এই দিগ্বিজয় ভৌমিককে তার পুরো গ্যাংসহ হাতেনাতে ধরব বলে এতদিন এর শাগরেদ সেজে ছিলাম। এসপি সাহেবের মেসেজ এল এইমাত্র, বাইরের সব গুণ্ডা ধরা পড়ে গেছে, এবারে ভেতরের লোকেদেরও খেল খতম’।
গুলির আওয়াজটা ছিল একটা সংকেত, সেটা হতেই বাইরে থেকে অনেক পুলিশের লোক এসে ঢুকে পড়ল ঘরের ভেতর, দিগ্বিজয়, মনোময় আর নান্টুসহ সব অপরাধীদের পুলিশ ধরে নিয়ে চলে গেল। এসপি সাহেব স্বয়ং এসে সুদর্শনকে বাহবা দিলেন। ডাক্তারবাবু আর পুরুতমশাই তখনও হতভম্ব, গোবিন্দ মেঝে থেকে উঠে পড়ে গায়ের ধুলো ঝাড়ছে। এসপি সাহেব সুদর্শনকে বললেন, ‘এনাদের মনের অন্ধকারটাও দূর করে দাও’।
সুদর্শন হেসে বলতে শুরু করল, ‘দিগ্বিজয় ভৌমিক একজন বড় ক্রিমিনাল। বুড়ো রাজার ভাগ্নে বলে তার শেষ সময়ে এখানে এসে উপস্থিত হয়। আমি অনেকদিন থেকেই তার দলে রয়েছি তার ওপর নজর রাখার জন্য। বুড়ো রাজা বুঝতে পেরেছিলেন যে দিগ্বিজয়ের এখানে আসার আসল উদ্দেশ্য হল রতনগড়ের গুপ্তধন হাসিল করা। রাজামশাই ভালো মানুষ ছিলেন, তিনি সেই টাকার অনেকটাই ব্যয় করেছিলেন এই অঞ্চলের উন্নয়নে, বাকিটাও তিনি ভালো কাজেই লাগাতে চেয়েছিলেন। তাই মৃত্যুর আগে তিনি গোপনে তার হদিশ তার বিশ্বস্ত ম্যানেজারকে দিয়ে যান। কিন্তু সেটা দিগ্বিজয়ের লোকেরা দেখে ফেলে, ফলে ম্যানেজার ভোলানাথবাবু কৌশলে তা দিয়ে যান তার আধভুলো ভাইপো গোবিন্দর হাতে। ভোলানাথবাবুকে খুন করেও কাজ হাসিল না হওয়ায় গুন্ডারা গোবিন্দর পেছনে লাগে। গোবিন্দ মাঝেমধ্যেই সবকিছু ভুলে যায়, তাই আমি তাকে আমার কাছে এক গোপন ডেরায় লুকিয়ে রেখেছিলাম, যে মুদ্রা ওই গুপ্তধন পাওয়ার চাবি, সেই মুদ্রার মত একটা হুবহু নকল তৈরি করিয়ে আমি আসলটা আমার হেফাজতে নিয়ে নিই। কিন্তু গতকালই দিগ্বিজয়ের লোকেরা গোবিন্দকে খুঁজে বের করে ফেলে, গোবিন্দ পালায় হৃদয়গঞ্জের দিকে, সেখানে দিগ্বিজয়ের এজেন্ট মনোময় আর তার লোকেরা তাকে ধরে ফেলে তাকে মারধর করে, এদিকে আমি বুঝতে পারছিলাম না গোবিন্দ্র অবস্থা, কিন্তু নান্টু যখন গনাকে কল করে গোবিন্দর খবর দেয়, তখনই আমি গনাকে ধরে ফেলে এসপি সাহেবকে গোপনে খবর দিয়ে এই পরিকল্পনা করি। গনা আগে থেকেই পুলিশের হেফাজতে আছে’।
ডাক্তার ত্রিভুবন নন্দী বললেন, ‘এইবার বুঝলাম পুরো কেস, গোবিন্দ ওরফে কৃষ্ণজীবনের একটা মাথার ব্যামো ছিলই, তার ওপরে মাথায় চোট লাগায় সে স্মৃতিভ্রংশ হয়েছিল, আবার কিছু আগে ওই জামবাটির বাড়ি ঠিক একই জায়গায় লাগায় তার স্মৃতি আবার ফিরে এসেছে’।
সুদর্শন মুদ্রাটা সবাইকে দেখালো, তারপর ভিতর মহলের এক সুড়ঙ্গের মধ্যে সবাইকে নিয়ে গিয়ে সেখানকার দেয়ালের একটা খাঁজে সেই মুদ্রা রেখে চাপ দিতেই একটা গোপন দরজা খুলে গেল আর সেই দরজার ভেতরের কুঠুরিতে দুই ঘড়া ভর্তি সোনার মোহর পাওয়া গেল। এসপি সাহেব বললেন, ‘এখন এইসবই আমরা জমা দেব সরকারি খাজানায়’।
ডাক্তারবাবু আর পুরুতঠাকুর দেখলেন গোবিন্দর মুখের সরল হাসিটি সেই একইরকম রয়েছে।
