ধূসর বিকেল | মিলন পুরকাইত 

0

 ধূসর বিকেল

মিলন পুরকাইত 

         সোমা যখন হসপিটালের ওয়েটিং জোনে এসে বসল, তখন দুপুরের রোদ পড়ে এসেছে প্রায়। হেমন্তের বিকেলের একটা ঠান্ডা ঠান্ডা হিমেল ভাব গ্রাস করছে চরাচর, যদিও হসপিটালের শীততাপনিয়ন্ত্রিত ওয়েটিং জোনে যারা বসে রয়েছে তারা এর আঁচ পাচ্ছে না এতটুকুও। কড়া ওষুধের গন্ধ, যন্ত্রনিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম শীতলতা, ডাক্তার-নার্সদের ব্যস্ত ছোটাছুটি, অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ আর কিছু মানুষের উদ্বিগ্ন, অসহায় মুখ হাসপাতালের মধ্যে কোনো ঋতুকে পরিবর্তন হতে দেয় না, এখানে একটাই ঋতু - শীতঋতু। এখানে সেন্ট্রাল এসিতে সর্বদাই বেশ কড়া ঠান্ডা থাকে। সোমা ওর গায়ে চাদরটা একটু টেনে নিল। হেমন্তকালের সন্ধ্যে থেকে রাত গড়ালেই শহরের রাস্তায় হিম পড়ে। বাড়ি ফেরার সময়ে ঠান্ডা লেগে যাওয়ার ভয় থাকে। প্রচণ্ড শীতে ঠান্ডা লাগে না, ঠান্ডা লাগে এই ওয়েদার চেঞ্জের সময়টাতেই। সোমা তাই রোজ বাড়ি থেকে বেরনোর সময়েই হালকা চাদর, কানচাপা প্রভৃতি নিয়ে বেরোয়। রাতে ডাক্তারের সাথে কথা বলে ফিরতে হয় তাকে। ভালোই রাত হয় ফিরতে তার। এইসময়ে সচেতনভাবে তাকে সুস্থ রাখতে হবে নিজেকে, সামান্য শরীর খারাপের বিলাসিতাও তার চলবে না। 

এই হসপিটালে গত সাতদিন ধরে ডঃ সুদর্শন চক্রবর্তী ভর্তি আছেন, সোমার বাবা। আশি বছর বয়স, এই বয়সেও সমানতালে ডিসিপ্লিন মেনে চেম্বার করতেন রোজ। একা থাকেন, সঙ্গী বলতে একটা সারাদিনের কাজের মেয়ে। 

গত শুক্রবারও উনি রোজকার মতোই চেম্বারে রোগী দেখছিলেন, হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রথমে মাথার মধ্যে প্রবল কষ্ট, তারপর অসহ্য যন্ত্রণায় হাত, পা, মুখ বেঁকে যাওয়া। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চেম্বারের লোকেরা তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করে।  সেরিব্রাল অ্যাটাক, এবং অভিঘাতটা বেশ তীব্র। বেশ কয়েকদিন প্রায় জ্ঞান ছিল না, মাথায় রক্ত জমাট বেঁধে গেছিল, ডাক্তাররা প্রাণপন চেষ্টা করছিলেন সেই রক্তকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে। একটা সেমি-কোমা স্টেজ; যমে মানুষে লড়াই চলেছিল বেশ কয়েকদিন। 

খবর পেয়ে ডাক্তারবাবুর সর্বক্ষণের কাজের মেয়ে ছুটে এসেছিল। ডাক্তারবাবু বিপত্নীক; তবে নিজেই এত বেশী আত্মনির্ভর ছিলেন, যে চট করে কারো থেকে কোনো সাহায্য চাইতেন না। কোনো আত্মীয়-স্বজনকেও সে এ'কছরে কখনো আসতে দেখে নি। ডাক্তারবাবুর কি তাহলে কেউই নেই? কিন্তু, এই রোগের যে বিশাল খরচ সেই টাকা তুলতেও তো চেকে সই লাগবে। রাধা এসব জানে না। সে কখনো ডাক্তারবাবুর টাকা-পয়সায় হাত দেয় নি। আলমারির চাবি, ব্যাঙ্কের কাগজপত্র সে কিছুই জানে না। ডাক্তারবাবু তো অজ্ঞান, এই বিশাল অঙ্কের টাকা সে তুলবে কেমন করে?

এই ক'বছরে ডাক্তারবাবুর এই কম্পাউণ্ডারদাদাকেই সে চেনে, জানে। ডাক্তারবাবুর স্ট্রোকের সময়ে সে-ই ছিল সামনে। নাওয়া-খাওয়া ভুলে ছেলেটা শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে ছিল আইসিইউ এর সামনে। রাধা উপায়ন্তর না দেখে  আস্তে আস্তে কম্পাউডারদাদার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ছেলেটার অল্প বয়স, খুবই ভালো, কাজের ছেলে। মুখে চোখে উদ্বিগ্নতার ছাপ স্পষ্ট। রাধা জানে তার আর এই ছেলেটার কাছে ডাক্তারবাবু কি! ওনার কিছু হয়ে গেলে...ভাবতেই বুকটা হিম হয়ে আসে তার, এতদিনের আশ্রয়টা একটা অভ্যসের মতো হয়ে গেছে তার, আবার নতুন করে নামতে হবে রাস্তায়, নতুন কাজের খোঁজে। হয়তো এই ছেলেটাকেও..তারমতো সে-ও কি এই কথাই চিন্তা করছে! হঠাৎ এই কথা মনে হতেই নিজের কাছে নিজেরই লজ্জা লাগে তার। ডাক্তারবাবু মারা যান নি, ভিতরে রয়েছেন। আর সে কি না এখনই...মাথা নিচু হয়ে আসে। আসলে রাস্তায় নামার যে কি জ্বালা সে তা ভালোই জানে। আজ থেকে তো সে এই কাজ করছে না! অনেক জায়গায় অনেকরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে তবে সে এই ডাক্তারবাবুর বাড়িতে এসে পড়েছে!  তবে এই ডাক্তারবাবু ভগবান...কখনো কিছু নিয়ে ভাবতে হয় নি তাকে এতদিন, নির্ধারিত মাইনের বাইরে যখন যা প্রয়োজন হয়েছে বিনা প্রশ্নে দিয়ে দিয়েছেন। এই নিশ্চিন্ততার আশ্রয় তাকে প্রায় ভুলিয়েই দিয়েছিল যে ডাক্তারবাবুর বাড়িটা তার স্থায়ী ঠিকানা নয়। আবার সেই গনগনে রৌদ্রের আঁচে পুড়তে হবে তাকে, হয়তো এই ছেলেটাকেও! ভিতরে ডাক্তারবাবু কেমন আছেন কে জানে? একটা নিরাপত্তাহীনতার চোরা ভয় তাকে গ্রাস করতে থাকে। পাদুটো অবশ হয়ে আসে, পায়ের তলায় মাটিটা হঠাৎ কেমন আলগা মনে হতে থাকে তার।

ঠিক এমনসময়েই একজন অচেনা মহিলা এসে দাঁড়ান ওদের সামনে। ঠিক ওদের সামনেই রিসেপশানে জিজ্ঞেস করলেন, ডাক্তারবাবুর কথা, উনি কোন কেবিনে আছেন, কেমন আছেন, কত টাকা পেমেন্ট হয়েছে ইত্যাদি। রাধা আর কম্পাউন্ডার ছেলেটি পরস্পর পরস্পরের মুখের দিকে তাকায় জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে। তারা দুজনেই ডাক্তারবাবুর কাছে এতদিন কাজ করছে, এই মহিলাকে দেখে নি তো কখনো। ওদের দুজনের মনেই একই প্রশ্ন, এমন আপনজনের মতো প্রশ্ন করছে, এই মহিলা কে?

তারা এগিয়ে যায়। মহিলার বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি, চুলে হালকা পাক,চোখে চশমা, সাদা শাড়ি; দেখলে ডাক্তারবাবুর মতোই বেশ সম্ভ্রান্ত ঘরেরই মনে হয়, তবে কি উনি ডাক্তারবাবুর কোনো আত্মীয়?

মহিলা একটা ফর্মের লেখায় চোখ বোলাচ্ছিলেন,  রাধা এগিয়ে গিয়ে সামান্য ইতস্তত করে বলল,"আমরা ডাক্তারবাবুর কাছে কাজ করি।"

মহিলা ওদের দিকে তাকালেন;  কিছু কিছু মানুষের মুখাবয়ব, দৃষ্টি এগুলোর মধ্যেই এমন একটা গভীর শান্তি থাকে, যে তাঁদের দেখলে মনটা অকারণেই ভালো হয়ে যায়, মনে হয় পৃথিবীটা সুন্দর, চারিদিকটা স্নিগ্ধ, আনন্দময়; এই মহিলার শান্ত, দীঘল চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে রাধার তেমনই মনে হল। ডাক্তারবাবুর চোখদুটোও এমন। দেখলেই কেমন রোগীগুলো ভালো হয়ে যায়। 

এমনসময়ে ডাক্তারবাবুর বন্ধু আদিত্যবাবু এসে ওনাকে দেখতে পেয়েই হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলেন,"তুই এসেছিস মা? আর আমার কোনো চিন্তা নেই। বাবা কেমন আছেন?"

"বাবা?" ওরা যেন অবাক হতেও ভুলে যায়, কে বাবা? কার বাবা?

আদিত্যবাবুকে ওরা দেখেছে কয়েকবার, ডাক্তারবাবুর বন্ধু, মাঝে মাঝে আসেন ডাক্তারবাবুর সঙ্গে দেখা করতে। উনি এলে ডাক্তারবাবু সেদিন চায়ে মিষ্টি দিতে বলেন রাধাকে। ডাক্তারবাবুর সুগার আছে, রাধা ডাক্তারবাবুর  চায়ে মিষ্টি দেয় না; কিন্তু আদিত্যবাবু এলে ডাক্তারবাবু অন্য মানুষ হয়ে যান, ওঁর মতো গম্ভীর মানুষও বন্ধুর দেখা পেয়ে গোঁফের ফাঁকে মুচকি হাসেন। আর আদিত্যবাবু রাধাকে দরাজ গলায় বলেন, "ভালো করে দুধ দিয়ে ফোটাবি, আর দু'চামচ চিনি..."

দুই বন্ধু চা খেয়ে হাঁটতে বেরোন। সেদিন ডাক্তারবাবু চেম্বার যান না। 

আদিত্যবাবুর মুখের দিকে ওরা অবাক হয়ে চেয়ে আছে দেখে আদিত্যবাবু নিজেই বলে ওঠেন, "একে তোমরা চেন না, এ আমাদের খুকু মা, তোদের ডাক্তারবাবুর মেয়ে।"

সত্যিই! ডাক্তারবাবুর যে কেউ কোত্থাও আছে, তাই তো তারা জানত না। ডাক্তারবাবু একা থাকতে ভালোবাসতেন বটে, তবু মেয়ে হয়ে এতবছরে একটা বারও...

রাধার হিসাব মেলে না। 


সোমা বুঝতে পারে, ওরা কী ভাবছে! যেটা স্বাভাবিক, সেটাই ভাবছে; এতবছরে ওরা যাকে কোনোদিন আসতে দেখে নি, ভাবছে, হঠাৎ করে ডাক্তারবাবুর একটা মেয়ে জুটল কোত্থেকে। ভাবাটা অস্বাভাবিক নয়, বাবা তো গত পঁচিশ বছরে একবারও কারও কাছে নিজের মেয়ে বলে তার পরিচয় দেন নি। তাঁর যে পৃথিবীর কোনো প্রান্তে একটি আত্মজাও আছে, তা তিনি পুরো পৃথিবীর কাছে একেবারেই অস্বীকার করে গেছেন। 


তখন তার চুল মেঘের মতো ঘন ছিল, মুখে ছিল সদ্য যৌবনের প্রাণময়তা। নতুন কলেজ যেতে শুরু করেছে। ফার্স্ট ডিভিশনে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে সে তখন সকলের প্রশংসার পাত্র। মা-মরা-মেয়েকে ডঃ সুদর্শন চক্রবর্তী বুকে করে রাখতেন, মেয়ের কোনো আবদার মুখ থেকে পড়তে না পড়তেই এনে হাজির করতেন। এতটুকু কোনো বায়নার অবকাশ ছিল না তার ছোট থেকেই, সবাই বলত, সুদর্শনের মেয়ে যদি সুদর্শনকে আকাশের চাঁদও পেরে দিতে বলে সে বোধহয় তখনি তা আনতে ছুটবে।

মেয়েও তেমনি ছিল, বাবা অন্তপ্রাণ; বাবা ছাড়া অত আপনার আর তো কেউ ছিল না জীবনে - পড়াশোনা, গান-বাজনা, আঁকা-আবৃত্তি সবেতে চৌখশ হয়ে উঠছিল সে ধীরে ধীরে। নতুন কিছু শিখেই ছুটত আগে বাবাকে দেখাবে - বাবার মতো অমন পজিটিভ ক্রিটিসিজম আর কারোর কাছে সে পেত না যে! হাজারো ব্যস্ততার মধ্যেও বাবা মন দিয়ে শুনতেন মেয়ের গান, ছবি আঁকলে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। মেয়ে ছোট হতে পারে, কিন্তু, তার ঐটুকু বয়সের জীবন সম্পর্কে যে বোধ, তা মুগ্ধ করত বাবাকে। তিনি  অকুন্ঠ প্রশংসা করতেন না, বরং উৎসাহ দিতেন, সুচিন্তিত মতামত দিতেন, বলতেন 'ভালোর কোনো শেষ নেই; যে মুহূর্তে সন্তুষ্টি আসবে মনে, শিল্পীসত্তার মৃত্যু তখনি!'

সেই সময়েই ডঃ সুদর্শন চক্রবর্তীর শহরে যথেষ্ট নামডাক ছিল, সরকারি হাসপাতাল ছাড়াও অনেক প্রাইভেট নার্সিংহোম, হেলথ ক্লিনিকে বসতেন নিয়মিত - সবাই বলত ডঃ সুদর্শন চক্রবর্তীর ডায়াগনোসিস একেবারে অব্যর্থ! সেই যুবা বয়স থেকে এই আশি বছর বয়স পর্যন্ত নিয়মিত - কত কী জীবনে ঘটেছে, গেছে কত ঝড়ঝাপটা, তবু ডাক্তারিতে বিরতি নেন নি কখনো, অসুস্থ হলেও না। আশিবছর বয়সে মানুষের যখন  শারীরিক, মানসিক বিশ্রামের প্রয়োজন, হেলায় তুচ্ছ করেছেন সে সব - কোনো আরামকে কখনো প্রশ্রয় দেন নি; সেদিনও না, যেদিন রোগী দেখতে দেখতে বাবা পড়ে গেলেন! 

সোমার সম্বিৎ ফিরল। নার্সিংহোমের রিসেপশন থেকে অ্যানাউন্স হচ্ছে ডঃ সুদর্শন চক্রবর্তীর বেড নাম্বার। দেখা করতে বলছে রোগীর রিলেটিভকে। সোমা দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেল রিসেপশানের দিকে। 

রিসেপশানের অল্পবয়সী মেয়েটি যান্ত্রিক গলায় বলল,"আইসিইউ বেড নাম্বার ৩৬ এর বাড়ির লোককে ডাক্তারবাবু ডাকছেন।"


সোমা কাঁপা কাঁপা পায়ে আইসিইউ এর কাঁচের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। হাসপাতালের আইসিইউ এর সার সার দেওয়া বেডে সবাইকে কেমন যেন একইরকম দেখতে লাগে। সারাশরীরে বিভিন্নরকম নল লাগানো, পাশে বড় বড় যন্ত্রের দৈত্যাকার স্ক্রিনে অনবরত নানারকম রিডিং ফুটে উঠছে। সোমা বুঝতে পারছিল না এতগুলো বেডের মধ্যে কোনজন তার বাবা। বেডনাম্বার মিলিয়ে ৩৬ নম্বর বেডটা জানলা থেকে দু-তিনটে বেড দূরে। সে দূর থেকে দেখছিল, এতবছরে প্রায় অচেনা হয়ে যাওয়া মানুষটাকে... ঘষা, অস্পষ্ট কাচ দিয়ে যেটুকু দেখা যায়...


দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজটা সশব্দে কানে এসে লাগে। সে বেরোতে চেয়েছিল, বাবা নামক নিষ্ঠুর, মায়ামমতাহীন মানুষটা তাকে ঘরের মধ্যে বন্ধ করে রেখেছিলেন তিনদিন। সে বোবা হয়ে গেছিল এটা ভেবে যে তার বাবা একটাবারের জন্যও জানতে চাইলেন না, যে মানুষটাকে সে ভালোবেসেছে সেই মানুষটা আসলে কেমন। কোনো প্রশ্ন করেন নি, শুধু ভালোবেসে বিয়ে করতে চাওয়া এতবড় অপরাধ? তার জানা ছিল না। সে উচ্চমাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করে কলেজে ভর্তি হয়েছিল। বাবা বলেছিলেন, ইংরাজীসাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করতে। সে প্রশ্ন করেনি কোনো। উচ্চমাধ্যমিকে সব সাবজেক্টে লেটার পাওয়ায় কোনো সাবজেক্টেই অনার্স পাওয়া তার পক্ষে কঠিন হয় নি। কয়েকটি নামী কলেজে ইংরাজীসাহিত্যেই শুধু ফর্ম তুলেছিল সে, আর বলাবাহুল্য সবকটিতেই চান্সও পেয়ে গেছিল। বাবা বলেছিলেন, 'নির্দ্বিধায় প্রেসিডেন্সীতে ভর্তি হয়ে যাও।' তাই-ই করেছিল সে। ক্লাসও শুরু করে দিয়েছিল নির্দিষ্ট দিনে। শুধু বাবাকে না বলে কোনো একটা কলেজে সে বাংলা অনার্সের ফর্মও তুলেছিল। সেটা যে কোথায় রেখেছিল সে, নিজেও জানত না। ফর্ম পূরণ করে জমা দেওয়ার কথা স্বপ্নেও আসে নি।   একদিন ইংরাজী অনার্সের পড়ার চাপে জর্জরিত সে কলেজের ব্যাগ পরিষ্কার করতে গিয়ে কুঁচকানো, দুমড়ানো ফর্মটা হাতে পেয়েছিল আবার, যখন সেটার আর কোনো মূল্যই নেই। মনে আছে, ফর্মটা প্রাণে ধরে ফেলতে পারে নি সে, কুঁচকানো, দুমড়ানো ফর্মটা যতটা সম্ভব সোজা করে ঢুকিয়ে দিয়েছিল ব্যাগের ভিতরের কোনো গোপন চেইনে, তার না-পূরণ-হওয়া-স্বপ্নের একমাত্র সাক্ষী হিসাবে। 


তাই তো! হঠাৎই এসব ভাবছে কেন সে? বুড়ো হয়ে চুলে রূপোলী পাক ধরে গেল, এখনো সে...কাউকে কখনোই বলা হয় নি এর আগে এই কথাটা, কেন যে এখনই মনে এল! তারপর আর কোনোদিন ফর্মটা খুলেও দেখে নি সে, ভুলেই গেছিল। মন এক জটিল সুড়ঙ্গপথ, তার কোন কুঠুরিতে কী-ই যে কতদিন ধরে জমা হয়ে থাকে আর কখন যে তা আপনখেয়ালে আত্মপ্রকাশ করে, মনের মালিক সত্যিই তার হদিশ জানে না। 


সে এগিয়ে গেল ডাক্তারের কেবিনের দিকে। চলতে চলতে সে খেয়াল করল, তার পা একটু একটু কাঁপছে। বরাবরই ভয়ে তার পা কাঁপে। যখন সামনে কী আছে অনিশ্চিত থাকে তার সামনে, ঠিক তখনই তার পা কাঁপে। আগে আগে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময়ে কাঁপত। শেষবার কেঁপেছিল, যখন রুদ্র হাসপাতালে...


সে এগিয়ে গিয়ে পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢোকে। ডাক্তারবাবু তাঁরই অপেক্ষায় ছিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, আইসিইউ বেড ৩৬? সে মাথা নেড়ে 'হ্যাঁ' বলল। ডাক্তারবাবু বললেন,"আপনি পেশেন্টের কে হন?"

অনেকবছরের জড়তা কাটিয়ে সে বলল,"মেয়ে।" নিজের কন্ঠস্বর নিজের কানেই অচেনা লাগে, কত বছর পর সে কারোকে তার বাবার 'মেয়ে' বলে পরিচয় দিচ্ছে জনসমক্ষে! অথচ, মনে মনে রোজ কতবার...কি দুর্বহ ভার সে বহন করে চলেছে সে এতগুলো দিন ধরে!


"বাবাকে একটু চোখে চোখে রাখতে হবে এবার থেকে। এই বয়সে সেরিব্রাল তো!" 

বাবাকে সে চোখে চোখে রাখতে পারবে কি না সে জানে না। বাবার সাথে দেখা সাক্ষাৎই নেই তার কত বছর! তবু ঘাড় নাড়ে সে, বলে,"বাবা সুস্থ হয়ে যাবেন তো?"

"নিশ্চয়ই হয়ে যাবেন। আপাতত উনি বিপদমুক্ত, তবে এই বয়সে হাণ্ড্রেড পারসেন্ট শিয়োর করে কিছু বলা যায় না, যেকোনো সময়ে শরীরের কন্ডিশন হঠাৎ হঠাৎ করে চেঞ্জ হয়। তবে উনি চিকিৎসায় রেসপণ্ড করছেন, এটাই সবচেয়ে আশার কথা।" ডাক্তারের মুখে সামান্য ভরসাবাক্যই রোগী বা রোগীর বাড়ির লোকের জন্য যথেষ্ট হয়। মনোবল পায় তারা। সোমাও পেল। এতক্ষণ কেমন যেন ঘোরের মধ্যে ছিল সে, মনে হচ্ছিল, আর বোধহয় বাবার সাথে একটাও কথা বলা হবে না তার, ঠিক যেমন হয়েছিল রুদ্রর বেলায়...

যারা হঠাৎ করে একঝটকায় চলে যায়, তারা চলে তো যায়, কিন্তু, যারা থেকে যায়, তাদের সবকিছু একনিমেষে ওলোটপালট হয়ে যায়। সেবার ওরা তখন আসামে; একটা হার্ট অ্যাটাক আর  দু-তিনদিনের অসম লড়াই - আর সবশেষে পরাজয়। সোমার সংসারটা হঠাৎ করে 'নেই' হয়ে গেছিল। এখনো ভাবলে কেমন শিউড়ে ওঠে সে, কতদিন বিশ্বাস করতে পারে নি সে, রুদ্র চলে গেছে। 

মনে হচ্ছিল, বাবার বেলাতেও হয়ত একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে! ডাক্তারবাবুর চেম্বার থেকে বেরিয়ে বুক থেকে একটা পাষাণভার নেমে যাচ্ছিল তার।

রুদ্র চলে গেছে, বাবা হয়ত, হয়ত কেন নিশ্চিতই জানেন না। তবু, রুদ্রকে নিয়ে বাবার সাথে বিচ্ছেদটা আজও অব্যহত। কারণটাই নেই, তবু ফলাফলের জের আজও টেনে চলেছে সে। রুদ্রর সাথে ওর বিয়ে সামাজিকভাবে হয় নি। 'স্পেশ্যাল ম্যারেজ অ্যাক্ট'এ রেজিস্ট্রি হয়েছিল ওদের। সোমার বাড়ির কেউই ছিল না, কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব নিয়েই বিয়ে হয়েছিল ওদের, যদিও রুদ্রর বাড়ী থেকে পরে অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিয়েটা মেনে নিয়েছিল। সোমা বিয়ের পরে বেশকিছুদিন রুদ্রর বাড়িতে থেকে সংসারও করেছিল। বরের বাড়ির লোকজন সোমাকে খুব ভালোভাবে মেনে না নিলেও কখনো খারাপ ব্যবহার করে নি। তারপর তো রুদ্র ব্যবসার কাজে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে থাকতে শুরু করল। সোমাও রুদ্রর সাথে পাড়ি জমাল এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। এতে অবশ্য সোমার বেশ একটু সুবিধাই হয়েছিল। কিছুদিন রুদ্রর বাড়িতে থেকে সংসার করতে গিয়েই সোমা বুঝতে পেরেছিল, তার মতো মেয়ের মানসিকতার সাথে রুদ্রর বাড়ির লোকের খুব একটা মিলবে না। একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে তারা যেন কোন আদিকাল থেকে টাইমমেশিনে চড়ে হঠাতই চলে এসেছে বলে মনে হত সোমার, যদিও সে জানত, ভারতবর্ষে এমন পিছিয়ে পড়া মানসিকতার মানুষের খুব একটা অভাব নেই। তবু জানা এক, আর সঙ্গে থেকে ঘর করা আর এক। সোমা অচিরেই বুঝতে পারছিল, তার দমটা বন্ধ হয়ে আসছে। 

রুদ্রও হয়তো বুঝেছিল খানিক। আর তারপরেই রুদ্র বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র যাওয়া মনস্থ করল। 

তারপর সারাজীবন আর এতটুকু থিতু হতে পারে নি সে, এ জায়গা থেকে সে জায়গা, সে জায়গা থেকে আবার অন্য জায়গা - ছুটে চলেছে তারা। কোথায় না কোথায় থেকেছে, কত কম ভাড়ায়,কত কষ্ট করে; তবু দিনশেষে স্বস্তি ছিল ওদের - বিশেষ করে তার। একটা 'নিজস্ব' সংসার -  সে যেমনই হোক, তবু নিজের! অপটু হাতে গড়া ওদের প্রথম সংসার ছিল ভাদোদরাতে। কত স্বপ্ন, কত যত্ন, কত আন্তরিকতা - আজও চোখ বুজলে সোমা দেখতে পায়, মনে হয় এই তো সেদিন!  তারপর যখন পেশার তাগিদে ভাদোদরা ছাড়তে হল, ওর নিজের হাতে সাজানো সংসার, সামনে একচিলতে বাগান! ছেড়ে আসতে চোখে জল এসেছিল।

তারপর থেকে শুধু ছোটা আর ছোটা - বুঝে গেছিল সে, কোনো জায়গাই 'স্থায়ী' নয় তার; তবু যতদিন 'তার', ততদিনই সে পরম মমতায় প্রতিবার তিল-তিল করে সাজিয়ে তুলত , তারপর হঠাতই একদিন সব ছেড়ে আবার অন্য কোথাও পাড়ি জমাত । আস্তে আস্তে অভ্যেস হয়ে গেছিল সোমার। প্রতি সংসারই যেন তার কাছে এক-একটা জীবন; কিছুই 'তার' নয়, তা জেনেও আঁকড়ে থাকা, জড়িয়ে থাকা -  ছেড়ে যেতে হবে জেনেও সংসার সাজানো। 

শুধু তার জীবনের এতবড় একটা পরিবর্তনে বাবা ছিলেন না কোথাও। অন্য ধর্মে বিয়েতে সম্মতি ছিল না তাঁর, বলেছিলেন রুদ্রকে ছেড়ে আবার নতুনভাবে সবকিছু শুরু করতে। অন্য ধর্মের ছেলেকে ভালোবাসার অপরাধে বাবা আর মেয়ের মুখ দেখতে চান নি। লাঞ্ছনা,ভর্ৎসোনা, তিরস্কার জুটেছিল কপালে। ঘরে বন্ধ থাকতে হয়েছিল কতদিন! তবু কিছুতে বোঝাতে পারে নি সে, কিছুতেই বাবাকে রাজি করাতে পারে নি একবার, শুধু একবার রুদ্রর সাথে সাক্ষাৎ করতে! রুদ্র ভালো কি মন্দ সেটুকু বিচার করতেও চান নি বাবা। বাবার সেই রূপ দেখে হতবাক হয়েছিল সে। তার বাবা গোঁড়া নন, সাম্প্রদায়িক নন, শিক্ষিত, ডাক্তার; মুসলিম বা অন্য ধর্মবিদ্বেষী কোনো কথা বা আলোচনা কোনোদিন শোনে নি সে বাবার মুখে - বরং সব ধর্মের মানুষকেই সমানভাবে চিকিৎসা করতে দেখেছে সে বাবাকে। ছোটবেলা থেকে এই শিক্ষাতেই বড় হয়ে মানুষে মানুষে প্রভেদ করতে শেখেনি কখনো। সেই বাবাই অন্য ধর্মে ভালোবাসাকে এত বড় 'অপরাধে'র তকমা দিয়ে দিলেন! বাইরে চরম অসাম্প্রদায়িক মানুষটা এক লহমায় বদলে গেলেন, যখন নিজের মেয়ে অন্য ধর্মে বিয়ে করতে চাইল, একমূহুর্তে সব শিক্ষা, সৌজন্যবোধ উবে গিয়ে পড়ে রইল শুধু একরাশ বিদ্বেষ, সীমাহীন ঘৃণা! 'ভালোবাসা' অপরাধ না 'অন্য ধর্মের মানুষকে ভালোবাসা' অপরাধ, বুঝতে পারে নি সে! নিজের বাবাকে চোখের সামনে বদলে যেতে দেখে, নিজের বাবাকে জন্ম ইস্তক দেখেও সঠিক চিনে উঠতে না পারার অক্ষমতায়, সিদ্ধান্তহীনতায় তলিয়ে যাচ্ছিল সে! বুঝতে পারছিল না, রুদ্রকেও সে ঠিক চিনতে পেরেছে কি না!

রুদ্র বলেছিল,"তোমার সিদ্ধান্তই শেষ সিদ্ধান্ত; তুমি চাইলে ফিরে যেতে পার, আবার চাইলে আমার হাত ধরে ভেসে পড়তে পার নিরুদ্দেশের ঠিকানায় - ভয় নেই, সেক্ষেত্রে হাত ছাড়ব না কখনো!"

আর ভাবে নি সে। পিছু ফিরে তাকায় নি। অনির্দেশ্যের পথে পাড়ি দিয়েছিল শুধু 'ভালোবাসা' আর 'বিশ্বাস'কে মূলধন করে। ঠকে নি সে।  

কখনো কখনো ক্লান্ত লেগেছে, কোনো দুর্বল মুহূর্তে মনের মধ্যে ঝড় উঠেছে, দ্বন্দ্বে ভুগেছে সে-ও। মনে হয়েছে সে হয়তো জীবনের চরম ভুলটাই করে ফেলেছে। শৈশবে মা-হারা তাকে কোলে পিঠে করে যে বাবা মানুষ করলেন, তাঁর আশীর্বাদ ছাড়া সম্পূর্ণ নিজের মতে এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়া তার উচিত হয় নি। ভালোবাসার মানুষের হাত ধরা থাকলেও মাঝে মাঝে ঢেউ এসে খুলে দিতে চেয়েছে ধরে থাকা হাতের মুঠি। কখনো কখনো রাগ হয়েছে; একটা মানুষের সবটুকু নিয়ে যখন চলতে হয়েছে, তখন ভালোর সাথে সাথে তার 'মন্দ'গুলোকেও নিতে হয়েছে। দৈনন্দিনতার ঘষা লেগে রোম্যান্সের স্বপ্নে চিড় ধরেছে, বিয়ের আগের রূপকথা পরিণত হয়েছে  সাদামাটা একটা রোজনামচার গদ্যে, যেখানে জীবনের ওঠাপড়া, স্ট্রাগল, দারিদ্র, অভাব সব ছিল, অনেক বেশী বেশীই ছিল। দুজনে দুজনের মতো করে নিজেদের সঙ্গে আর বাইরের সঙ্গে লড়তে লড়তে ওরা ভুলেই গেছিল পরস্পর পরস্পরের কাঁধটা ধরলে, দুজন দুজনের বোঝাটা একটু যত্নে নামিয়ে রাখলে দুজনেরই একটু হালকা লাগে। হয় নি, শুধু ভুল বোঝাবুঝি আর দুরত্বই বেড়েছিল। এমনভাবে কত বছর যে জীবনের নষ্ট হয়েছিল ওদের, কত প্রতিশ্রুতিই যে ভেঙ্গেছিল! 

মানসিকভাবে ভিতরে ভিতরে ফুটিফাটা আর সামনে সবটুকু বজায় রাখতে রাখতে যখন ওর নিজের অস্তিত্বেই ঘুণ ধরছিল, তখন ও প্রথম অনুভব করল ওর শরীরে একটা নতুন প্রাণের স্পন্দন। খুব ঘেঁটে থাকা অবস্থায় ওদের দুজনের সংসারে হঠাৎই না-বলে-কয়ে পামেলা এল, ওদের কন্যাসন্তান। সবাই বলল, এই মেয়েই এবার ওদের সবটা ঠিক করে দেবে। প্রথমে ওরা সত্যিই বুঝতে পারছিল না, এরকম জীবনের টালমাটাল অবস্থায় ওরা কিভাবে আর একজন তৃতীয় মানুষকে আনবে! তবু, সবার পরামর্শে ওরা পামেলাকে পৃথিবীতে এনেছিল। তারপর, খুব একা হয়ে যেতে যেতে হঠাৎ করে সে যেন একজন সঙ্গী পেয়ে গেল, একজন ভবিষ্যতের সহযোদ্ধা যেন এল ওর কাছে; পামেলা আসার পর ও নতুনভাবে ওর দায়িত্ব অনুভব করল - যে এসেছে, তাকে ঠিকঠাক ভাবে তৈরী করা, প্রস্তুত করা। মা হওয়ার পর সে প্রথম অনুভব করল মাতৃত্বের অর্থ। এতদিন যা সবকিছুই যেন ছেলেখেলা ছিল, পামেলা আসার পরই যেন তাদের সত্যিকার সংসার শুরু হল। জীবনের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গী এল। রুদ্রও হঠাৎ করে খুব সিরিয়াস হয়ে গেল জীবন সম্পর্কে। ও-ও হয়ত নিজের মধ্যে অনুভব করেছিল পিতৃত্বকে। পামেলা এসে ওরা তখন বেঁচে গেল। ওদের সংসারের নৌকো যেন হঠাৎই একটা দিশা খুঁজে পেল। ভাঙ্গা খড়কুটোকে যেমন ডুবন্ত মানুষ আঁকড়ে ধরে, তেমনই ওরা পামেলাকে আঁকড়ে ধরল। ওদের নিজেদের মধ্যেকার টানাপোড়েন গৌণ হয়ে গেল একটা ছোট্ট মানুষের আবির্ভাবে। রুদ্রর উপর ওর যত অভিযোগ ছিল, এক মুহূর্তে গৌণ হয়ে গেল। পামেলার মুখটা 'রুদ্র' বসান হয়েছিল। এতেই সব না-পাওয়া ধুয়ে গেছিল। বহুদিনপর ওরা আবার পরস্পরের জন্য ভালোবাসা অনুভব করেছিল। 

পামেলার জন্মের পর বাবাকে একটা চিঠি দিয়েছিল সে, রুদ্রকে না জানিয়ে। তখন ওরা লক্ষ্ণৌ। উত্তর এসেছিল, "তোমার মেয়ে সুস্থভাবে জন্মেছে শুনে খুশি হলাম। কিন্তু, তোমার মেয়ে সুদর্শন চক্রবর্তীর নাতনী হতে পারে না। সুখে জীবন অতিবাহিত কর। আমি ভালো আছি। বাকি জীবনটাও তোমাদের ছাড়াই ভালোই কাটিয়ে দিতে পারব।"

সেই শেষ। আর কখনো যোগাযোগ করে নি সে। কন্যাসন্তান হয়েছে বলে রুদ্রর বাড়িতে খুব একটা খুশি হয় নি কেউ। রুদ্রর মা বলেছিলেন, আবার পুত্রসন্তানের জন্য চেষ্টা করতে। রুদ্র রেগে গিয়েছিল। পামেলা ওর প্রাণ ছিল। ওদের বাড়িতে মেয়েদের পড়াশোনার বেশী চল ছিল না। পামেলা জন্মানোর পর রুদ্র আর খুব বেশী নিজের বাড়িতে যেত না। পামেলাকে পড়াশোনা শিখিয়ে বড় করবে,যা ওদের পরিবারে কেউ কখনো করে নি, পামেলা করবে!

ডাক্তার সুদর্শন চক্রবর্তী স্বীকার করেন নি পামেলাকে তাঁর নাতনী হিসাবে, তবু কিছু কিছু সত্য স্বীকৃতি অস্বীকৃতির ধার ধারে না। পামেলা উচ্চমাধ্যমিকের পর সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় ডাক্তারি পড়ল। তারপর বিদেশে গেল হায়ার স্টাডিজের জন্য। 

আবার একা হয়ে গেল সে। জীবন তাকে প্রতি মোড়ে একা করে দিয়েছে বারবার। রুদ্রকে বোঝাতে পারে নি অনেককিছু, বাবা মুখ ফিরিয়েছেন কবেই, কাছের আত্মীয়-স্বজন যোগাযোগ রাখে নি কেউ, বন্ধুরা হারিয়ে গিয়েছে। তারপর দীর্ঘ তেইশ-চব্বিশ বছর পামেলাকে নিয়ে ভুলে ছিল সে। আবার প্রৌঢ়ত্বের দোরগোড়ায় এসে একা হয়ে গেছিল সে। 

কয়েকদিন পর সে নির্দিষ্ট সময়ে নার্সিংহোমে ঢুকছিল। ডাঃ সুদর্শন চক্রবর্তী আজ একটু ভালো। কাল সে আসতে পারে নি। ফোন করেছিল। দীর্ঘ বাইশদিন পর তিনি উঠে বসেছিলেন। রাইসটিউবের বদলে নিজে হাতে খেতে পেরেছিলেন। সেরিব্রাল এ্যাটাকে যেটা সবচেয়ে ভয় থাকে, স্মৃতি নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় - সেটাও খুব একটা ওঁকে ছুঁতে পারে নি। জ্ঞান আসার পর কয়েকদিন একটু ভাঙ্গা ভাঙ্গা অসংলগ্ন কথা বললেও তারপর নিজে থেকেই রিকভার করেছেন বেশ তাড়াতাড়িই। আজকাল শরীর আস্তে আস্তে সারলেও সারাক্ষণ মন খারাপ থাকে ওঁর। এতদিন একটানা শুয়ে থাকার কথা তিনি কখনো স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না। সেই তাঁকেই...

সোমা আস্তে আস্তে ঢুকল ঘরের মধ্যে। সেই দাপুটে মানুষটার সারা শরীরে নল, ইঞ্জেকশনের চ্যানেল। দেখে কেমন যেন কান্না পায় তার। আগে মনে হত এই মানুষটা যখন অশক্ত হবে তখন তো তার উপরেই নির্ভরশীল হতে হবে, তখন এত তেজ কোথায় যাবে সে দেখবে - এই ভেবে একসময়ে সে ভারি তৃপ্তি অনুভব করত। এখন এই অবস্থায় কেমন যেন অসহায় লাগছে বাবাকে, মানাচ্ছে না যেন একেবারেই! 

নার্স তাকে ইশারায় চেয়ারটা দেখাল, সে বসল। বসার সময়ে একটু আওয়াজ হল চেয়ারে, ডঃ সুদর্শন চক্রবর্তী তাকালেন। তাকালেন ওর দিকে।    

এক'দিন সে বাইরে থেকে ডাক্তারের সাথে কথা বলেই চলে যাচ্ছিল, আজ ডাক্তারবাবু নিজেই বললেন,"এতদিন আসছেন, একবার দেখা করবেন না বাবার সাথে?" 

ভয় করছিল তার কিরকম। কাল রাতে পামেলার সাথে কথা হয়েছে। সে বলতে পারে নি। বলতে পারে নি সে কারোকেই। পামেলা তার দাদুকে চেনে না। কি করে চিনবে? পামেলা আহসান তো আর কিছুতেই সুদর্শন চক্রবর্তীর নাতনী হতে পারে না!

তবু সে এসেছে। রক্তের টান অস্বীকার কিছুতেই করা যায় না। হাজার বছর আলাদা, যোগাযোগবিহীন বিচ্ছিন্ন থাকার পরও কি যেন একটা থেকে যায়...

কিছুতেই স্বস্তি হয় না, রাতে ঘুম আসে না, মনে হয় হাসপাতালের বেডে মানুষটা...

ডঃ সুদর্শন চক্রবর্তী চিনতে পেরেছেন। এত বছরের অদর্শনেও নিজের রক্তকে চিনতে ভুল হয় না। একইরকম জেদী, আপোষবিহীন মুখ তাঁর মেয়ের; আর মুখের সবটুকু বদলালেও এগুলো বদলায় না কক্ষনো, বরং এগুলোই শনাক্ত করে কারোকে কারোকে।

সোমা বুঝতে পারল, উনি ডাকছেন। সে এগিয়ে গিয়ে হাতটা ধরল। অনেকগুলো হাত তার জীবনে পিছলে গেছে। পামেলা আমেরিকা চলে যাওয়ার পর ওরা তখন অনেকদিন পর একটু সাংসারিক চাপমুক্ত। সে বলেছিল রুদ্রকে, মেয়েটা দাঁড়িয়ে গেছে, আর ওর এত খাটবার দরকার নেই। এবার সে একটু বিশ্রাম নিক। 

রুদ্রও আস্তে আস্তে কাজ কমাচ্ছিল। অনেকবছর পর আবার ওদের মধ্যে একটু একটু করে বন্ধুত্ব গড়ে উঠছিল। পুরনো দিনের স্মৃতি, শারীরিক সম্পর্ক ম্লান হয়ে গিয়েছিল কবেই। জীবনের চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে একটা সঙ্গীর প্রয়োজন হয়েছিল। তারপরই হঠাৎ একলহমায় সবটা ওলটপালট হয়ে গেল। হাতটা শক্ত করে ধরতে চেয়েও কিভাবে যেন পিছলে গেল। 

পামেলা শেষপর্যন্ত বিদেশেই সেটল করে গেল। ওর বাবার সাথে সখ্য ছিল বেশী। সেই বাবা-ই যখন চলে গেল ও তখন বিদেশে। ফিরলে ও ওর বাবার জন্যই ফিরত। আর ফিরবে না। 

সে-ও কখনো বলে নি। রুদ্র চলে যাওয়ার পর খুব একা লাগত। কিন্তু, আপাতকাঠিন্যের খোলস ছাড়িয়ে কখনোই নিজের মেয়েকে বলে উঠতে পারেন নি, 'তুই দেশে ফিরে আয়। আমারও একা লাগে!'  

পামেলা ফেরে নি। সে-ও নিজের একার জীবনেই অভ্যস্ত হয়ে গেছিল। 

হঠাৎই আদিত্যকাকুর একটা ফোন ওর নিস্তরঙ্গ জীবনটাকে হঠাৎ...মুহূর্তের মধ্যে সব ভুলে ছুটে এসেছিল সে। মনে হয়েছিল, রুদ্রর মতো এবারও...

চমক ভাঙ্গে তার। বাবা ওর হাতে আস্তে আস্তে চাপ দিচ্ছেন, সে নিজের মুখটা বাবার কাছে নিয়ে গিয়ে বলল,"কিছু বলবে বাবা?" 

ডঃ সুদর্শন চক্রবর্তী মাথা নাড়েন, চোখ দিয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে মাথার বালিশে গিয়ে পড়ে। 

সে মুখটা বাবার আরও কাছে  নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলে,"আমি ভালো আছি বাবা, তুমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো।" 

একজন নার্স এসে ওঁকে ইঞ্জেকশান দিয়ে গেল। তারপরেই ডঃ সুদর্শন চক্রবর্তী ঘুমিয়ে পড়লেন। 

সোমা বসে রইল আইসিইউ এর ঠান্ডা ঘরে। অনুভব করল, ঘুমের মধ্যেও তার হাতটা শক্ত করে ধরে রয়েছেন বাবা। 

©মিলন পুরকাইত 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)