সামাজিক গল্প :- ভিটে-মাটি | মিলন পুরকাইত

0

 ভিটে-মাটি

মিলন পুরকাইত 

     গ্রামের বাড়ি থেকে ছেলের সাথে আসার সময় দিবাকর বাবু একটা পুটলি হাতে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোলেন। ছেলে দীপক নিজেই  সব ব্যাগ গুছিয়ে গাড়িতে তুলেছে তবুও দিবাকর বাবু ওটা নিজের হাতেই রেখেছেন। ছেলের অনেক জোরাজুরিতেও ছেলেকে জানালেন না এটার ব্যাপারে। নিজের তৈরি এতবড় বাড়ি, শখের বাগান সব ছেড়ে দিবাকর বাবু ছেলের সাথে কলকাতাতেই পাকাপাকি ভাবে থাকবেন এখন থেকে। এখানে একা করে থাকবেনই বা কি ভাবে, তাঁর স্ত্রী গত হলেন কয়েকদিন হল। পরলৌকিক কার্যাদিও করা হয়ে গেছে। বেশ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ছেলের সাথে গাড়িতে উঠলেন। পুটলিটা যথারীতি নিজের কব্জাতেই রেখেছেন। ছেলে অনেক চেষ্টার পরও কোন মতে জানতে পারলেন না পুটলির ভেতরে কি আছে।


  পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ছেলের ফ্ল্যাটে কোন কিছুই অভাব নেই। বৌমার আদর যত্নের তো তারিফ করে পারা যায় না। নাতি স্কুল আর পড়া ছাড়া সবসময় দাদুর কাছে কাছেই। কদিন আগেই দিবাকর বাবুর সামান্য জ্বর হতেই ছেলে বৌমা ডাক্তার ডেকে সারারাত তাঁর কাছে বসে সেবা-শুশ্রূষা করেছে। তবু জানলার সামনে দাঁড়ালেই দিবাকর বাবুর মনটা কেমন চঞ্চল হয়ে যায়। কিছুক্ষন থম হয়ে যান। ঘরে গিয়ে নিজের আলমারির ভেতর পুটলিটা দেখে আসেন।


 বেশ কয়েকবছর পর দিবাকর বাবুর ছেলের বদলি হয়ে অন্য জায়গায়। এবার এই ফ্ল্যাট ছেড়েও যেতে হবে তাদের। দীপক তাই জিনিসপত্র গোছানো শুরু করেছে। এমন সময় বাবার অবর্তমানে ওই পুটলিটা হাতে পায়। চুপচাপ দীপক পুটলিটা খুলতে থাকে। অনেক গাঁট, অনেক ভাঁজ খুলে দীপক যা দেখলো টা প্রায় হাস্যকর। পুটলির ভেতর একটা পলিথিন ভর্তি কিছুটা মাটি আর কয়েকটা আম পাতা ও একটা জবাফুল। পাতা ও ফুলটা যথারীতি শুকনো হয়ে গেছে এতদিনে। দীপক তা দেখেই তার বাবাকে ডাকলো আর বললো- 'এসব কি বাবা? মাটি পাতা কেউ এভাবে রাখে। পাগলের মতো যত কাজ করো। আমি এগুলো বাইরে ফেলে দিচ্ছি।' ছেলের কথা শুনে দিবাকর বাবু আমতা আমতা করে কিছু বলার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু ভয় হোক বা লজ্জা, যে কোন কারণে চুপ করে গেলেন। ছেলে জানলা দিয়ে ওই পুটলি টা ফেলে দিল। দিবাকর বাবু নিস্পলক দৃষ্টিতে শুধু তাকিয়ে রইলেন।


তারপর দিন সকাল থেকেই দিবাকর বাবুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়িতে, ছাদে, নীচে কোথাও পাওয়া গেল না। দীপক অবশেষে পুলিশে খবর দিল। পুলিশ ফ্ল্যাট বাড়ির চারিদিকে তল্লাশি করতেই দিবাকর বাবুকে দেখতে পাওয়া গেল। যে জানলা দিয়ে দিপক ওই পুটলিটা ফেলে ছিল ওর নিচেই দিবাকর বাবু মৃত অবস্থায় শুয়ে রয়েছেন। পাশে পুটলিটা খোলা অবস্থায় ছড়িয়ে পড়ে আছে। বুকের ওপর পাতা আর ফুলটা ধরা আছে। মাথার কাছে একটা খাতা। তাতে লেখা - 'খোকা আমি চললাম। তার জন্য তোদের কোন দোষ নেই। তোরা আমাকে কোনদিন কোন অভাব রাখিসনি। আমার ইচ্ছে ছিল আমার প্রিয় আম গাছ, প্রিয় ফুল বুকে নিয়ে আমার ভিটে মাটির ওপর আমি মরবো। আমি আজ তাই করলাম। এরপর হয়তো আর সুযোগ পেতাম না। এই লোভ অনেক চেষ্টার পরও সামলাতে পারলাম না। এর জন্য তোকে অনেক ঝামেলা হয়তো পোহাতে হবে হয়তো, তার জন্য ক্ষমা করে দিস।' লেখাটা পড়ে দীপকের চোখ থেকে ঠস ঠস জল পড়ছে। বাবার শরীরের নিচের ওই মাটিটা বের করে নিজের মাথার ওপর রাখলো।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)