নজর
মিলন পুরকাইত
খুব ছোট থেকে একটা ব্যাপার খেয়াল করতাম, আমি যখনই একা কোথাও বসে খেলছি সেখানে হয়তো তেমন কিছুই নেই ব্যাথা পাবার মতো কিন্তু বাসায় আসলেই মা দেখতেন আমার শরীরে নখের আঁচড়। তাও গলার দিকে। আর দুপুরের আযানের পর আমি প্রায়ই অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতাম। অনেক ডাক্তার, অনেক ঝাড়ফুঁক... কিন্তু কিছুই কাজ করে নি। তবে এটা এক সময় বন্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু ইদানিং আমি নামাজ পড়ার সময় প্রায়ই টিকটিকির টিকটিক শুনতে পাই। বারবার শব্দ করে যায়। আবার সেই টিকটিকি আমাকে দেখলে এদিক থেকে ওদিক লেজ নাড়িয়ে হেটে যায়। এত নাদুসনুদুস যে, দেখে গুইসাপের মতোই লাগে। আবার মাঝে মাঝে কেমন যেনো ছায়াও দেখতে পাই রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে। ছায়াটা ফ্লোর থেকে সিলিং ফ্যান অব্দি। যখনই ঘুম ভেঙে যায়, ফোন হাতে নিয়ে দেখি দুটো থেকে তিনটা বাজে। এমন হলে সেদিন আর ঘুমই আসে না।
এদুটো ঘটনা বেশ পুরোনো। গতমাস থেকে দেখি আমার রুমের দরজা রাতে বন্ধ করে রাখলে কেউ একজন জোরে ধাক্কা দিয়ে যায় বেশ কয়েকবার। এত জোরে ধাক্কা দেয় যে বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। অথচ আমার দরজা ভিতরের দিকে, এখানে কোন মানুষের পক্ষেই ধাক্কা দেয়া সম্ভব হবে না। কারণ, দরজায় ধাক্কা দিতে আসলে আমার বেলকনির গ্রিল কেটে তারপর বেলকনিতে আসতে হবে।
ব্যাপারগুলো খুব একটা পাত্তা দিচ্ছিলাম না। বিপত্তি হলো পরশু রাতে। সারাদিন কাজ করে খুব ক্লান্ত ছিলাম। রাতে বিছানায় যেতেই ঘুমে চোখ লেগে আসছিলো। হঠাৎ কয়েক মিনিটের ভিতর ঘুম ভেঙে গেলো ধস্তাধস্তিতে। কেউ আমার গলা টিপে ধরেছে। ভীষণ নরম তুলতুলে হাত এবং ঘন আর লম্বা লোম দিয়ে আবৃত। আমি যখন কোন ভাবে আল্লাহ আকবর বললাম। সেই হাত আমার গলা ছেড়ে দিলেও, ফিসফিসিয়ে বলে গেলো, "আবার আসবো!"
এই ঘটনার পর দৌড়ে বাবা-মা'র ঘরে চলে গেলাম। অনেক ক্ষণ নক করার পর মা এসে দরজা খুলে দিলেন। আর স্বভাবতই প্রশ্ন করলেন,
- কি রে, কি হয়েছে?
- মা, আমাকে তোমার বুকে একটু ঘুমাতে দাও। আমার খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।
- ও মা, কেনো?
- তা জানি না।
এর মাঝে বাবা উঠে গেলেন। উনি বালিশ নিয়ে ফ্লোরে শুয়ে, আমাকে বুকে নিয়ে মা'কে ঘুমাতে বললেন। রাতে আমার খুব ভালো ঘুম হলো। সকালে উঠে দেখি বাবা-মা ডাইনিংএ বসে গম্ভীরমুখে কি নিয়ে যেন আলোচনা করছেন। আমাকে দেখে বাবা জিজ্ঞেস করলেন,
- ঘুম কেমন হলো?
- আলহামদুলিল্লাহ, অনেকদিন পরে খুব ঘুমালাম। এত গভীর ঘুম যে ফজরের নামাজ পড়তে পারলাম না। আল্লাহ মাফ করুন। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।
আমাকে বাবা কি যেনো বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আমি রুমের দিকে চলে আসলাম। আমি আমার রুমে যেতেই চোখ আঁটকে গেলো আমার রুমের দেয়ালগুলোর দিকে। চার দেয়ালেই লাল আর কালো রঙের নকশায় কি সব আরবি লেখা। বিছানার চাদর ছেড়া। চমকে উঠে মা'কে ডাকলাম।
- মা, মা!
মা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
- ফজরের নামাজ পড়তে উঠে, আমি দেখি তোর রুমে ফ্যান চলছে। তাই অফ করতে এসে দেখি দেয়ালের এই অবস্থা।
- এগুলো কি মা?
- তোর বাবাকেও দেখালাম। আসরের পর মসজিদের বড় হুজুর বাসায় এসে দেখে যাবেন সমস্যাটা আসলে কি!
আমি আমার গামছা, টুথব্রাশ আর ফেসওয়াস নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলাম। সারাদিন আর রুমে আসি নি। কিন্তু হাতমুখ ধুয়ে মুখ মুছতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম আমার গামছার এক কোণা কাটা। অজানা ভয়ে বুকের ভিতর কেঁপে উঠলো। সারাদিন বাবা-মা'র রুমেই ছিলাম। এদিকে একটু পর পর এক কাক এসে আমার বেলকনিতে কা কা করেই যাচ্ছে। কি যে তীব্র সেই শব্দ। কিন্তু মা বেলকনিতে গেলেই দেখে কাক নেই কোথাও।
দুপুরের খাবারে মা শাক, বেগুন ভাজা, বাইম মাছ চরচরি, আর পাতলা করে ডাল রান্না করেছেন। কিন্তু আমাদের বাসায় মা'র কাজে সাহায্য করার জন্য একজন সাহয্যকর্মী আছে। ওর নাম লিপি। বয়স ষোল বা সতেরো। আমার জন্য লিপি একটা ডিম ভেজে নিয়ে এসেছে। আমি খাবো না। তবু এক রকম জোর করেই খাওয়ালো। ডিম খেয়ে কেমন যেনো অস্বস্তি লাগছে।
এদিকে আসরের নামাজের পর মসজিদের বড় হুজুর আসলেন। বড় হুজুর যখন আমাদের বাসায় এসে বাবা-মা'র সাথে কথা বলছিলেন তখন আমি নামাজ পড়ছিলাম। নামাজ শেষে আমি বসার ঘরে গেলাম। বড় হুজুরকে দেখে সালাম দিলাম।
- আসসালামু আলাইকুম হুজুর।
- ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছেন আম্মাজান?
- আলহামদুলিল্লাহ, ভালো।
- আপনার রুমে কি সব না কি সমস্যা শুনলাম?
- জি, হুজুর।
- আপনার অনুমতি পেলে রুমটা একবার দেখার অনুমতি চাই।
- অবশ্যই হুজুর।
বড়ো হুজুর বাবাকে সাথে নিয়ে আমার রুমে গেলেন। রুম দেখলেন। তারপর আবার বসার ঘরে আসলেন। এদিকে মা লিপিকে নিয়ে বড়ো হুজুরের জন্য নাশতার ব্যবস্থা করছিলেন, তখনই লিপির হাত থেকে পানির গ্লাস পরে ভেঙে গেলো। হুজুর তখন বলে উঠলেন,
- উনি কে আপা?
- আমার টুকটাক কাজে সাহায্য করে।
- এইখানেই থাকেন উনি?
- জি, হুজুর। দক্ষিণের রুমে ও থাকে।
- আচ্ছা।
এবার নাশতা দিতে দিতে আমরা হুজুরের সাথে কথা বলছিলাম। প্রথমেই বাবা বললেন,
- হুজুর, কি বুঝলেন?
- আম্মাজান এখন কিসে পড়ে?
- অনার্স।
- আহা, ভাইজান! আপনে না, আম্মাজানরে বলতে দেন।
- হুজুর, আমি অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি।
- আপনার সাথে কি কোন ধরণের অদ্ভুত কোন ঘটনা ঘটে?
- জি, প্রায়ই আমার সাথে অদ্ভুত কিছু না কিছু ঘটে।
- আপনার রুমের নকশাগুলা কে করসে?
- আমি জানি না। রাতে খুব অদ্ভুত লোমশ এক প্রাণী আমার গলা টিপে ধরে। আমি ভয়ে বাবা-মা'র রুমে গিয়ে আশ্রয় নেই।
- আগে কখনো এমন হয় নাই?
- না হুজুর।
এর মাঝে মাগরিবের আযান দিয়ে দিলো। হুজুর আমাদের বাসায়ই নামাজ আদায় করতে চাইলেন।
আমরাও নামাজ পড়ে নিলাম। হুজুর নামাজ শেষে আমাদের নিয়ে আবার বসলেন।
- আম্মাজান আপনার নাম যেন কি?
- আমার নাম তরী।
- বাহ, সুন্দর নাম।
বড়ো হুজুর বাবাকে বেশ কিছু গোলাপফুল জোগাড় করতে বললেন। বাবা তাড়াহুড়ো করে বাইরে চলে গেলেন। হুজুর পাঞ্জাবীর পকেট থেকে একটা তাবিজ বের করে আমার হাতে নিয়ে মুঠোয় ভরে নিতে বললেন। আমি তাবিজটা হাতের মুঠোয় নিতেই জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। যখন জ্ঞান ফিরলো, তখন দেখি বাবা-মা আমার পাশেই আছেন। হুজুর একটা কাঁচের গ্লাস আর স্বচ্ছ পানি চাইলেন। লিপি আনতে গিয়ে আবার গ্লাস ভাঙলো। তারপর মা গ্লাস আর পানি এনে দিলেন।
হুজুর গ্লাসের পানি বেশ খানিকটা ফেলে দিলেন। আর তাতে গোলাপগুলো ডুবিয়ে দিলেন। বিরবির করে কি যেনো বলতে লাগলেন। কয়েক মিনিটের ভিতর স্বচ্ছ পানি কাদাপানিতে পরিণত হলো। ফুলগুলো তুলে আনতেই বেশ কয়েকটা তাবিজ উঠে আসলো।
তাবিজগুলো হুজুর খুলে দিলেন, প্রতিটাতেই কিছু না কিছু আমার ব্যবহারের কাপড়ের অংশ, চুল, নখ, সুই, বরশী, সাদা কাগজে লাল কালির নকশা আর আমার ছবি এঁকে তাতে গলায় সুই বিধিয়ে দেয়া।
আমরা সবাই খুব অবাক হয়েছি। সেই সাথে হুজুরও বেশ অবাক হলেন। আমার রুমে যেতে চাইলেন আবার। বাবাকে নিয়ে হুজুর আমার রুমে গেলেন। রুমে গিয়ে হাত চালান করে বালিশ এবং বিছানার নিচ থেকে আরও কিছু নকশা করা কাগজ উদ্ধার করলেন।
- দেখেন ভাইজান, আমি প্রথমে যে তাবিজগুলা তদবিরে হাজির করলাম। তা আপনার ঘরে ছিলো না। কিন্তু এখন যেগুলা হাত চালানের পর আসলো তা আপনার ঘরের কোন মানুষই এইখানে রাখসে। তারপর এই যে রুমের চার দেয়ালে নকশা, তা জ্বীন-ভূত করে নাই। ঘরেরই কোন মানুষ করসে।
- কি বলেন হুজুর?
- জি, এটাই সত্যি। বাসায় কে কে থাকেন?
- বাসায় আমরা চারজনই থাকি।
- তার মানে হইতাসে এগুলো লিপির কাজ। উনারে বাসা থেকে বিদায় করেন।
- জি হুজুর। তা না হয় করলাম। কিন্তু ও কেনো এমন কাজ করবে?
- ভাইজান, শয়তানের কাজই হইলো শয়তানি করা।
আমি কাল আসরের পর আসবো একবার। এই রুমের দেয়ালের নকশাগুলা কাইটা দিয়া যাবো। আর আম্মাজানরে কিছু আমল দিয়া যাবো।
- হুজুর, আপনার হাদিয়া?
- আমি তো হাদিয়া নেই না ভাইজান। আপনি কিছু এতিম বাচ্চাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন।
হুজুর চলে গেলেন। বাবা খুব ভালো ভাবে লিপিকে কাল গ্রামে পাঠিয়ে দিতে চাইলেন। আরও বললেন লিপির বিয়ের সব খরচ বাবা দিবেন।
আমি আজও বাবা-মা'র ঘরেই ঘুমালাম। ফজরের নামাজের সময় ঘুম ভাঙলো মায়ের চিৎকারে। আমি আর বাবা গিয়ে দেখি, মা লিপির রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আর লিপির শরীর সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলছে। লাইট জ্বালানোই ছিলো। রুমের দেয়ালের এক পাশে বড়ো করে কালো রঙে লেখা ছিলো, "আমার নজর সবসময়ই তোমার উপর থাকবে।"
