আত্মতৃপ্তি
মিলন পুরকাইত
অপারেশন শেষে রুমে ফিরে দেখি নয়টা মিসড কল। মৃন্ময়ীর! আমার এক্স ওয়াইফ। একবছর তিনমাস হলো ওর আর আমার ডিভোর্স হয়েছে। সে তো বলেছিল আমার নাম্বার ওর ব্লকলিস্টে। প্রথম ছয়মাস প্রায় প্রতি রাতেই অসংখ্যবার ট্রাই করেছি। প্রতিবার শরীরে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে ওর ফোনে আমার নাম্বার না ঢুকে। তাহলে আজ আমাকে ফোন করা কেন?
মৃণ্ময়ী!আমার সাথে যার প্রেম ছিল তিনবছর। আর যার সাথে বিবাহিত জীবন কাটিয়েছি তিনবছর। বিয়ের প্রথম থেকেই আম্মা বাচ্চা চাই,বাচ্চা চাই করে আমাকে আর মৃন্ময়ীকে পাগল করে দিয়েছিল একেবারে। এর কারণ হলো আমার জন্ম হয়েছিল আব্বা আম্মার বিয়ের এগারো বছর পর। আমি বুঝতাম আম্মার ভয়ের জায়গাটা। কিন্তু এটাও বুঝতাম মৃণ্ময়ী তখনই বাচ্চা নেওয়ার মতো মানসিক অবস্থায় ছিল না। বিয়ের পর একবছর আমরা শুধু উড়ে বেরিয়েছি। মৃণ্ময়ী আর আমি ক্লাসমেট ছিলাম। একই মেডিকেলে পড়তে গিয়ে ভালবেসেছি দুজন দুজনকে।
হুট করেই বহুবছর আগে ফিরে গেলাম আমি। মৃণ্ময়ী প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা একজন। সারাদিন হৈ হুল্লোর আর আড্ডা দিয়ে বেড়ানো মেয়ে। আর আমি পুরো বিপরীত। বরাবরই আমি একটু চুপচাপ প্রকৃতির। ওর চঞ্চলতা আমাকে মুগ্ধ করতো। পরীক্ষা এলেই মৃণ্ময়ী ঊধাও। দুর্দান্ত মেধাবী। এতো ঘুরেফিরেও প্রতিটা পরীক্ষায় ও টপ করতো। প্রচুর পড়তো। আমার সাথে সাহিত্যের যোগসূ্ত্রই মৃণ্ময়ী। আম্মা কখনোই আমাকে পড়ার বই ছাড়া অন্য বই পড়তে দেয়নি। আমাকে জীবনানন্দ শোনায় মৃণ্ময়ী। ওর বাবা ছিলেন বাংলার প্রফেসর। সে নিজে ছিল বাংলা আর ইংরেজি সাহিত্যের পোকা।
আমি নিজে যেচে কখনো কারো সাথে কথা বলতাম না। মাঝে মাঝে সবার সাথে দল বেঁধে ঘুরার সময় মৃণ্ময়ী এসে আমাকে জোর করতো। আমি আসলে যেতে চাইতাম কিন্তু নিজে থেকে আগ্রহ প্রকাশ করতাম না। ওর হৈ চৈ, আনন্দ সবকিছুতেই আমি অদ্ভুত আনন্দ পেতাম। মৃণ্ময়ীকে পাওয়া যেতো আড্ডায়,পাওয়া যেতো প্রতিটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে,পাওয়া যেতো রক্ত দিতে,পাওয়া যেতো যেকোন বন্ধুর কঠিন সময়ে,পাওয়া যেতো দলনেতা হিসেবে আবার পাওয়া যেতো স্বেচ্ছাসেবক হিসেবেও।
আমি শুধুই মুগ্ধ হতাম। ওর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উজ্জ্বলতায় কত জন যে মুগ্ধ ছিল আমি জানিও না। আমার বন্ধু কল্যাণ আমাকে একদিন বললো-" তুই জানা মৃণ্ময়ীকে দ্যাট ইউ আর ইন ড্যামন লাভ উইদ হার।" আমি হাসি। কারণ আমি জানি মৃণ্ময়ীর আমার সাথে যায়না। ওকে প্রপোজ করা মাত্র ও হেসে উড়িয়ে দিবে। আমি বাসায় ফিরে ওর আওড়ানো কবিতা পড়ি।
একবার চরম বন্যা হলো উত্তরবঙ্গে। আমাদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে পাঠিয়ে দেয়া হলো বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায়। একজন করে ডাক্তার আর সাথে আমরা সাত-আটজন করে স্টুডেন্ট। তখন মেডিকেল থার্ড ইয়ার। আমার আর মৃণ্ময়ীর একই টিম। একটা স্কুলে আমরা ক্যাম্প করে আছি। বন্যা শেষের পরের কথা। চারদিকে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব। হাসপাতালে আমরা রোগী নিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। আমি নাওয়াখাওয়া ভুলে কাজ করছি। কাজের ব্যাপারে আমি বরাবরই বেশ সিরিয়াস। হুট করে একদিন সন্ধ্যায় একটা ভাংগা বাঁশে লেগে আমার ডানহাতের অনেকটা অংশ কেটে যায়। বেশ অনেকটা। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। তাড়াতাড়ি এক বন্ধু হাত ব্যান্ডেজ করে দেয়। রাতে একসাথে খেতে বসে আমি খেতে পারছিলাম না। চামচ দিয়ে দু'একবার ট্রাই করে উঠে গেলাম। আমি তখনো জানতাম না হাত কেটে যাওয়াটা আমার জন্য শাপে বর হবে।
রাত প্রায় এগারোটা হবে মৃণ্ময়ী এসে বাইরে ডাকলো আমায়। গিয়ে দেখি প্লেটে করে ভাত নিয়ে বসে আছে। পাশে বসলে বললো-" আয়, খাইয়ে দি। তখন খেতে পারিসনি। আমরা বন্ধু। এতোটুকু না করলে হয়না। নাকি তুই আবার আমার হাতে খেতে লজ্জাটজ্জা পাবি?" আমি কিচ্ছু বলিনি। খেয়েছিলাম। আমি খুব আদরে মানুষ হয়েছি। আম্মা বরাবর আমায় বাচ্চা করে রেখেছে। সেদিন রাতে আমার কি হয়েছিল আমি জানিনা। খাওয়া শেষে যখন মৃণ্ময়ী উঠে যাচ্ছিল। আমি ওর হাত ধরেছিলাম আরর বলেছিলাম- "আমায় বিয়ে করবি মৃণ্ময়ী?" ও হেসেছিল। বলেছিল- "কেন? সারাজীবন আমার হাতে ভাত খাবি?" সেদিন আমি জেনে গিয়েছিলাম যে আমি জিতে গেছি। মৃণ্ময়ী আমায় ভালবাসে।
তারপর যেনো আমরা দুজনই জানতাম যে আমরা সৃষ্টি হয়েছি দুজন দুজনের জন্য। আমাদের প্রেম নিয়ে বন্ধুদের বিস্ময় ছিল আকাশ সমান। দুই মেরুর দুই বাসিন্দার প্রেম। পড়া শেষে আম্মা যখন মেয়ে খুজঁতে শুরু করলেন আমি মৃণ্ময়ীর কথা জানালাম। আমি আম্মার একমাত্র সন্তান। আম্মা যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারলেন না আমি ভালবেসে বিয়ে করতে পারি। আম্মা চেয়েছিলেন উনার পছন্দে আমি বিয়ে করি। আব্বু এক্ষেত্রে এগিয়ে এসে আম্মাকে রাজি করায় আর দুই পরিবারের ইচ্ছেতেই আমাদের বিয়ে হয়।
সমস্যা শুরু হয় বিয়ের পরদিন থেকেই। মৃণ্ময়ীর হাসি আম্মার পছন্দ নয়। আমি আসলে কোন পক্ষকে খুশি করবো বেশিরভাগ সময় বুঝতাম না। মৃণ্ময়ী আম্মাকে খুশি করার জন্য বাইরে বের হওয়া কমায়, শব্দ করে হাসি কমায়, গান করা-আবৃত্তি করা বন্ধ করে। আমি কেমন করে যেনো ভুলে যাই আমি আনন্দিত,উচ্ছ্বসিত মৃণ্ময়ীকে ভালবেসেছিলাম। ও যে তিলে তিলে শেষ হচ্ছে আমি বুঝতে যাইনি আসলে। আম্মা ভালো আছে মানেই আমি ভালো আছি। বিয়ের একবছর পর থেকে আম্মার ইচ্ছায় আমরা বাচ্চা নেওয়ার ট্রাই করি। কিন্তু তিনবছর পার হয়ে গেলেও আমাদের বাচ্চা হচ্ছিল না। এর মধ্যেই আমাদের দুজনের বি.সি.এস হয়ে যায়। আমি আলাদা চেম্বার করে বসলেও আমার চেয়ে ভালো ডাক্তার হয়েও মৃণ্ময়ী শুধু হসপিটালে যেতো কিন্তু চেম্বারে বসতো না। ও আম্মার সাথেই সময় কাটাতো।
তারপর সেই দিনটা এলো যখন দুজনের শারীরিক পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে জানা গেলো মৃণ্ময়ীর কিছুটা সমস্যা আছে। চিকিৎসাও আছে তবে সেটা দীর্ঘমেয়াদী। আম্মার সাথে ওর কি হতো আমি জানিনা। ও বলতো না। তবে এটা বুঝেছিলাম আম্মা ওকে কিছু বলে। ওর আচরণে বেশ পরিবর্তন এসেছিল। আমার সাথে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে বিশাল ঝামেলা করতে লাগলো। আমি সারাদিন বাইরে থেকে,রোগীদের বিভিন্ন ক্রিটিক্যাল অবস্থা দেখেশুনে বাসায় এসে ওর কথা,আবদার শোনার ধৈর্য পেতাম না।
আম্মা আমাকে প্রতিদিনই ওর সম্বন্ধে এটাসেটা অভিযোগ দিতো। আর প্রতিদিনই ওকে ছেড়ে অন্য একটা বিয়ে করে বাচ্চার জন্য কান্নাকাটি করতো। আমি প্রথম প্রথম আম্মার কথায় অবাক হতাম,পরে বিরক্ত। ছোটবেলা থেকেই শান্ত আমি আম্মার সাথে রোজ কথা কাটাকাটি করতাম। রুমে এসে দেখতাম পাথর হয়ে বসে আছে মৃণ্ময়ী। প্রতিদিন একই ঘটনা।
একদিন বাসায় ফিরে মৃণ্ময়ী কে পেলাম না। ও চলে গেছে। ফোনে কিছু জানায়নি। চিঠি লিখে গেছে-কখনো যেনো যোগাযোগ না করি। আমাকে মুক্তি দিয়ে গেছে। আম্মা যা চায় তাই যেনো করি। ও ডিভোর্স চায়। পুরো ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগে আমার কাছে। অসহ্য লাগে। আম্মা আর মৃণ্ময়ী কি চায়! আমি আম্মার কাছে গিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন তিনিও চান মৃণ্ময়ী আমাকে তালাক দিক। আমি এইপ্রথম আম্মার সাথে চরম বাজে ব্যবহার করলাম। একটা প্রাণবন্ত মেয়েকে মেরে ফেলেছে আম্মা। আমি সেই রাতেই মৃণ্ময়ীদের বাসায় গেলাম। না, সে ছিল না। সে তখন সিলেট। ট্রান্সফারের চেষ্টা করছে। পার্মানেন্টলি সিলেটে চলে যাবে। মৃণ্ময়ীর মা আমাকে বললেন-" মেয়েটাকে আর কষ্ট দিয়োনা। তোমার মা ওকে প্রথম থেকেই মানতে পারেনি। ওর বাচ্চা হওয়া তো ওর হাতে নেই। তুমি বিয়ে করো। প্রচুর কষ্ট নিয়েও ও টিকে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু আর পারছিল না। তুমি বাবা ওকে আর বিরক্ত করোনা।"
আমি তারপরও চেষ্টা করেছি। ও আমার সাথে দেখা করেনি। কথা বলেনি। চরম অবহেলা করেছে। একটা সময় আমার মনে হয়েছে ওর প্রচন্ড ইগো সমস্যা। আমাকে ওর প্রয়োজন নেই। আমিও সরে এসেছি। একবছর আগেই সরে এসেছি। আম্মা আমার জন্য মেয়ে দেখেছে। আমি হ্যা বলেছি। যাকে বিয়ে করতে চলেছি ওর নাম অবন্তী। মাস্টার্স করেছে। ঘরকন্না করবে। মায়ের কথা মতো চলবে। ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা নেই বলেই আম্মা খুশি।
অবন্তীর সাথে আমার দুবার দেখা হয়েছে। দুইবারই তার কথাবার্তা শুনে বুঝেছি ও আমার জন্য জন্মায়নি। আমার মায়ের জন্যই জন্মেছে।
আমি চিন্তার জগত থেকে বেরিয়ে এলাম। চেয়ারে বসেই বেল টিপে রাশেদকে ডাকলাম-
" এককাপ কফি করে দাও। " মৃণ্ময়ী এতোদিন পর ফোন করেছে কেন? ওকে ইচ্ছেমতো অপমান করতে পারলেই আমার শান্তি হবে। দিবো একটা ফোন? অনেক ভেবে আসলে লাভ নেই। ওর ফোন এভয়েড করা আমার সহ্য হবেনা! ডায়াল করলাম। রিং হচ্ছে। আমার বুকের শব্দ আমি নিজেই শুনতে পাচ্ছি। একটা পুরুষ কন্ঠ হ্যালো বললো। আমি শুধু হুম বলতে পারলাম। লোকটি বললো- "যার মোবাইল এটা উনি কি আপনার স্ত্রী?"
আমি কিছু বলার আগেই লোকটি আবার বললো- "ঢাকা সিলেট মহাসড়কে একটা বাস দূর্ঘটনায় উনি আহত হয়েছেন। অনেকেই স্পটডেড। উনারটা বোঝা যাচ্ছেনা। সেন্স হারানোর আগে তামিম... তামিম করছিলেন। তাই মোবাইল সার্চ করে আপনাকে ফোন দিলাম।"
আমার পুরো পৃথিবী দুলে উঠলো। কোথায় দূর্ঘটনা ঘটেছে জেনে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমার সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপছিল। আম্মার কাছ থেকে পারিনি, মৃত্যুর কাছ থেকে বাঁচাতে পারবো তো মৃণ্ময়ীকে? আমি ওখানে পৌঁছানোর আগেই ওরা ওকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। আমি পৌঁছে দেখলাম ওর অবস্থা ভালো না। আমি সাময়িক ব্যবস্থা করে ওকে নিয়ে ঢাকায় ফিরলাম। দু'মাস মৃণ্ময়ী হসপিটালে ছিল। আমি এই দুইমাস সব কাজ থেকে ছুটি নিয়ে দিনরাত ওর পাশে ছিলাম। প্রথমদিকে যখনই ও সেন্স ফিরে পেতো তখনই চোখ খুলে আমাকে দেখতে পেতো। আমি ওর চোখে জীবন দেখতে পেতাম!
অবন্তী এসেছিল। আমি তাকে বলেছি সে ভালো কোন মানুষ ডিজার্ভ করে। আমি জন্মেছি শুধু মৃণ্ময়ীকে ভালবাসার জন্য। হয়তো সাময়িক একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল কিন্তু সেটা শুধুই ভুল বুঝাবুঝি। বসে থেকে থেকে একসময় সে চলে গেছে। আম্মা গত তিনমাসে বুঝেছে তার ছেলে বাচ্চার জন্য কাতর নয়। নিজেকে হয়তো বুঝিয়ে নিয়েছে। এখন মনেপ্রাণে চাইছে মৃণ্ময়ীর সুস্থতা।
দুইমাস পর এখন মৃণ্ময়ী প্রায় সুস্থ। আজ দুপুরে আমি আর মৃণ্ময়ী দুজনই আছি। অন্য সময় কেউ না কেউ থাকে। আমি ভাত মেখে মেখে খাইয়ে দিচ্ছি। মৃণ্ময়ী কাঁদছে। সকালেই চুলে দুইবেণী করে দিয়েছি আমি। ওকে অভিমানী কিশোরী লাগছে।
-"কি হলো? কাঁদছো কেন?"
-"তুমি কেমন ভাত মেখে খাওয়ানোর দায়িত্বটা নিয়ে নিলে কেড়ে আমার কাছ থেকে!"
আমি হাসলাম- "একটা কথা বলবো?"
মৃন্ময়ী বললো- "উমম। বলো।"
আমি বললাম-" বিয়েতে লাল বেনারসি পরোনি বলে আফসোস ছিল। এবার তবে লালটাই হোক।"
মৃণ্ময়ী লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। সেই আহ্লাদী, উচ্ছ্বল, ক্যারিয়ার সচেতন মেয়েটাকে আমি নতুন করে পেলাম। আর কিছুতেই,কখনোই ওর চোখ থেকে এই প্রাণচাঞ্চল্য আমি সরতে দিবো না!
