পাহাড়ী স্মৃতি
মিলন পুরকাইত
আনন্দী তাকিয়েছিল দূরের পাহাড়টার দিকে, কত কত বছর পর সে পাহাড়ে এসেছে আবার, কিন্তু মনে মনে যে সে রোজই রাতে পাহাড়ের এই আনাচে কানাচে ঘুরে বেরিয়েছে, সে খবর এক সে নিজে ছাড়া আর কে জানে! ঐ যে দূরে পাহাড়টা দেখা যাচ্ছে, আর দু'মিনিট পরে হয়তো আর দেখা যাবে না, হালকা মেঘ কুয়াশার চাদর মেখে ঢেকে দেবে পাহাড়টাকে। প্রকৃতির এই লুকোচুরি খেলা চলতেই থাকবে, তারপর আরেকটু বেলায় হয়ত রোদ উঠবে, কিম্বা হালকা বৃষ্টি! পাহাড়ের মেজাজ খামখেয়ালি রাজার মতো, আগে থেকে নিরূপণ করে কার সাধ্যি। ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না আনন্দী, প্রকৃতিতে বিশ্বাস করে। তবে এইসব মুহূর্তে তার মনে হয়, ঈশ্বর বলে যদি ঐ মেঘের ওপারে কেউ সত্যিই থেকে থাকেন, তাহলে তিনি নিশ্চয় এক বিরাট আর্টিস্ট। এই পৃথিবীটা যেন তাঁর মস্ত এক প্যালেট। তিনি আপনমনে কেবলি রঙ মিশিয়ে চলেছেন। এই যে তারা যে হোমস্টেটায় উঠেছে, তার সামনেই বয়ে চলেছে এক পাহাড়ী নদী, পাহাড়ের কোন খাঁজ থেকে ঝর্ণা হয়ে বেরিয়ে এসে এখানে নদী হয়ে বয়ে চলেছে। সেই নদীর ধারে কত শত নাম-না-জানা পাহাড়ী ফুল। ভালো করে নিরীক্ষণ করলে বোঝা যায়, প্রতিটা ফুলই একটা আরেকটার থেকে আলাদা। অথচ তারা একই গাছে ফুটেছে। আপাতদৃষ্টিতে একরকম - একই ডিজাইন, একই রঙ, অথচ কী ভীষণ ভিন্ন, আপন স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল। দেখার চোখ না থাকলে এ জিনিস দেখা যায় না। অথচ ক'জনই বা এগিয়ে এসে এত মন দিয়ে দেখছে! তবু ফুল ফুটে চলেছে কোন ঝোপের আড়ালে। কিসের জন্য, তা কেউ জানে না। কোনোদিন যদি ফুলগুলো না ফোটে, তাহলে তাদের গুরুত্ব বোঝা যাবে, সেদিন এই পাহাড়গুলোকে খুব ন্যাড়া দেখাবে। ঐ একটা একটা ফুলও এই সমষ্টিগত সৌন্দর্যসৃষ্টির অংশীদার। ঠিক যেমন একটা সুন্দর ছবির মেইন অবজেক্টটার উপরেই সবার ফোকাস থাকে, কিন্তু, একমাত্র শিল্পী জানেন এই মেইন অবজেক্টটাকে ফোকাসে রাখার জন্য ঐ পিছনের প্রতিটা ছোট, ছোট তুলির আঁচড়ও কতটা প্রয়োজনীয়; যেগুলো না থাকলে ছবির মূল বিষয়বস্তুটাই ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফ্যাকাশে, বিবর্ণ হয়ে যাবে।
এসব ভাবতে ভাবতে কেমন তন্ময় হয়ে গেছিল সে। চমক ভাঙল, মলিনার বাজখাঁই গলায়, পারেও বটে মেয়েটা! কই কলেজে তো এমন ছিল না, দিব্যি রোগাসোগা, সাত চড়ে রা না কাটা গোছের মেয়ে ছিল; নিজের কানে না শুনলে আনন্দী কখনো বিশ্বাসই করত না, মলিনা এখন এমনভাবে চেঁচাতে পারে!
মলিনা আর স্বপ্না এসে বসে পড়ল খুব ক্লান্ত ভঙ্গিতে, মলিনা হাফাতে হাফাতে বলল,"বাবারে বাবা! পাহাড়ে এসে হাঁটুটা গেল, বারণ করলাম তখন, বললাম, সমুদ্রে চল, ক'দিন সমুদ্রের পাড়ে হাওয়া খেয়ে আসি, তা না, এই আনন্দী পাহাড় ছাড়া নড়বেই না! এই যে নবাবনন্দিনী! সকাল থেকে উঠে পাহাড়ের দিকে বিরহিনী রাধার মতো চেয়ে আছিস, বলি, খাওয়া-দাওয়ার কি ব্যবস্থা হবে সে খেয়াল আছে!"
আনন্দী হাসতে হাসতে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল, "ক'দিন ঘুরতে এসে রাঁধতে আমার বয়ে গেছে! তোরা রাঁধ গে, না খেতে দিলেও চলবে। বিস্কুট খেয়ে কাটিয়ে দেব। তবু রান্নার ধারপাশ নৈব নৈব চ।"
হতাশ হয়ে উঠে পড়ল মলিনা, "নাওহ! এই পঞ্চাশ বছরে এসে কচি খুকীর মতো করছে দ্যাখ! আমার তো বাপু রান্না করতে ভালোই লাগে। রান্না ছাড়া এই জীবনে আর শিখলামই বা কী! সেই কুড়ি থেকে রান্না করে করে করে এখন পঞ্চাশ জনের রান্না এক হাতে কুটে বেটে করে ফেলতে পারি। এমন মাংস খাওয়াব তোকে আজ হাত চাটতে থাকবি খেয়ে! দেখিস এখন!"
আনন্দী বলে,"তোদের এই রান্না করে খাওয়ার আইডিয়াটা একদম বাজে! হ্যাঁরে, তোদের ছুটি লাগে না! এত ভালোবাসিস রাঁধতে যে এখানেও রান্না করার জন্য ছটফট করছিস!"
মলিনা হাসল,"সকালে উঠে রান্না না বসালে বুকের মধ্যে কেমন করে, মনে হয়, খালি খালি। এখন আর রান্নাকে কাজ মনে হয় না,জীবনের অঙ্গ হয়ে গেছে কখন! আর সারাদিন বসে থাকতে আমার ভালোই লাগে না! এমন কি বয়স হয়েছে বল, যে এখনি ছুটি নিয়ে নিতে হবে!"
স্বপ্না বলে,"না বাবা, তোকে ছুটি নিতে হবে না, সকালে উঠে দেখি একা একা বসে রসুন ছাড়াচ্ছে, আর সবাই ঘুমোচ্ছে। তখন সবে সাড়ে ছটা, বলে, এত বেলা অবধি ঘুম নাকি ওর সহ্য হবে না! বলে তুই শো, আমি একাই সবার রান্না করে ফেলব হোটেলের ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে। তুই বল আনন্দী, তা কখনো হয়! ও একা রান্না করবে, আর আমরা বসে বসে খাব!"
আনন্দী হাসল,"না ভাই, আমাকে তোদের দলে টানিস না। আমি এই বেশ আছি। আগামীকাল গাড়িকে বলে দিয়েছি, সকালে আশেপাশে ঘুরতে যাব, কাল আবার মলিনা যেন রাঁধতে বসে যাস না।"
মলিনা বলল,"চল রে! গ্যাসে ভাত বসিয়ে এসেছি, এতক্ষণে হয়ত ফুটেও গেল।" স্বপ্না আর মলিনা চলে গেল।
আনন্দী বালিশের পাশ থেকে ডায়েরিটা তুলে নিল, জানলা দিয়ে রোদ এসে পড়েছে বিছানায়। জানলার কাচ দিয়ে কাছের পাহাড়গুলো ছাড়িয়ে সাদা ধবধবে বরফের চূড়াগুলোর উপর রোদ পড়েছে দেখা যাচ্ছে। আনন্দী আরাম করে আধশোয়া হয়ে পায়ের কাছে লুটিয়ে থাকা ব্ল্যাঙ্কেটটা টেনে নিয়ে কাল রাতের অসমাপ্ত লেখাটা শেষ করতে লাগল।
ওরা এসেছে উত্তরবঙ্গে, পাহাড়ের কোলে একটা ছোট্ট অনামী গ্রামে, সাকুল্যে এখানে একটা মাত্র হোমস্টে; চাইলে ওরা রান্না করে দেয় আবার কেউ ইচ্ছা করলে নিজেরাও রান্না করে খেতে পারে। হোমস্টের মালিকের অনেকগুলো ছোট ছোট বাচ্চা আছে, যাদের একস্ট্রা টাকা দিলে ওরা বাজার করে দেয়। বাজার বলতে মুরগী; সবজি এখানে কেউ প্রায় কিনে খায় না, পাহাড়ের গায়ে জায়গার অভাব নেই। ধাপ কেটে চাষ করে নিলেই হল। এখানে সবচেয়ে বেশী লোকে খায় স্কোয়াশের তরকারী, অনেকটা এখানকার পেঁপের মতো খেতে,তবে ভালো করে রান্না করলে খেতে খারাপ লাগে না। এখানে এখন যারা একসাথে এসেছে তারা পরস্পরের আত্মীয় নয়, এদের নিজেদের মধ্যে বহু বহু বছর কোনো যোগাযোগও ছিল না, তবু এরা পরস্পর একটা অদৃশ্য গ্রন্থি দিয়ে জুড়ে ছিল। এরা সবাই অনেক অনেক বছর আগে কখনো একসাথে স্কুলে পড়েছিল। তারপর মেয়েদের জীবন যেমন হয়, স্কুল পাশ করতে না করতেই অনেকেই পাড়ি দিয়েছিল অনির্দেশ্যের পথে। কেউ কেউ বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ার মতো সুযোগ পেয়েছিল কলেজে পড়ার, যদিও তাদের মধ্যে অনেককেই মাঝপথে পড়া ছেড়ে সেই একই গন্তব্যে পাড়ি দিতে হয়েছিল। তারপর সংসার, সন্তান সব দায়িত্ব যখন মোটামুটি শেষের পথে, তখন এদের জীবনে এসেছিল এক অত্যাশ্চার্য আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের মতো মহার্ঘ বস্তু - মোবাইল, আর তারওপর এসেছিল ইন্টারনেট, আর তার সাথে সাথে ফেসবুক। ছেলে-মেয়েরা যখন মোটামুটিভাবে নিজেদের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে, সারাজীবনে নিজের শরীরের উপর করা হাজারও অত্যাচারের ফলস্বরূপ যখন হাত-পা-ঘাড়-পিঠ জানান দিচ্ছে, বিশ্রাম চাইছে শরীরের কলকব্জাগুলো, সংসারের খরচের মধ্যে মাসকাবারি ওষুধের খরচটাও যখন ধরতে হচ্ছে নিয়ম করে, তখনই অবসর সময়ের সঙ্গী হিসাবে ফেসবুকের প্রয়োজনীয়তা পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল ওদের জীবনে। আর এরকমই একটা সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে বহু বহু বছর পর যোগাযোগ হয়েছিল ওদের, যাদের শেষ দেখা হয়েছিল কৈশোরে বা যৌবনের প্রারম্ভে। একটা গ্রুপমিটে ওরা এসেছিল। অনেককে দেখতেই প্রায় না চিনতে পারার মতোই, কারো কারো মুখের আদলে হয়তো কখনো মুহূর্তের জন্য উঁকি দিয়ে যায় সেই পুরনো 'হাসি', কিম্বা 'চোখের চাহনি'; কিন্তু, মোটের উপর সেদিনের সেই পনের ষোল বছরের কিশোরীরা এখন প্রৌঢ়ত্বের মাঝখানে। সেই স্কুল ছাড়ার পর সবার জীবনই বয়ে গেছে নিজ নিজ ভিন্নখাতে কিন্তু, একটা বিষয় এদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই খাটে, যেমন, এদের সবার চোখেই এখন কৈশোরের দুরন্ত ঝিলিকের বদলে অভিজ্ঞ, নিস্পৃহ দৃষ্টি, চুলে রূপোলী রেখা, পায়ে বাত আর দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় অরুচি।
তাই এদের মধ্যে আনন্দী যখন প্রথম তুলেছিল বন্ধুরা মিলে বেড়াতে যাওয়ার কথা, ওরা প্রায় সবাই এককথায় রাজী হয়ে গেছিল। সারাদিনের শেষে ওদের এখন বেশকিছুক্ষন সময় কাটে বন্ধুরা মিলে কনফারেন্সে কথা বলে। মলিনা সেদিন বলেছিল,"এইবয়সে আর আমাদের নিয়ে বরেদের 'ভয়' নেই, কি বল? জানে তো, এক যম ছাড়া আর কেউ তাকাবে না বউয়ের দিকে, আর বৌ পালানোর ভয় নেই। এই যদি অল্পবয়সে হত...এখন তো একটু হাঁটলেই হাঁফ ধরে, পাহাড়ে পারব?"
"খুব পারবি! যাওয়ার আগে একবার যে ডক্টরকে দেখাস তাঁকে দেখিয়ে কনসাল্ট করে নিস।", স্বপ্না বলেছিল।
সুনন্দা বলেছিল,"আমার হাতে এখন অনন্ত সময়, ছেলে পড়ার জন্য বাইরে আর মেয়ে চাকরীসূত্রে। যেদিন বলবি, বেরিয়ে পড়ব।"
শ্রীতমা বলেছিল,"যাওয়া সত্যিই হবে কি না কে জানে, তবে প্ল্যানটা যে হচ্ছে, এতেই ভারি আনন্দ হচ্ছে। ত্রিশ বছর ধরে সংসার, সংসার করে জীবনটা একেবারে... কিছুই দেখলাম না, শিখলাম না, করলাম না...হয়ত, এভাবেই মরে যাব কোনদিন!"
আনন্দী বলেছিল,"জানিস, বহু বহু বছর আমি পাহাড়ে যাই না...এবার যাবই, দেখিস!"
হ্যাঁ, আনন্দীর কথাই সত্যি হয়েছিল, এক শরতের সকালে ওদের ট্রেন থেমেছিল নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে। ওরা, মানে আনন্দী, মলিনা, শ্রীতমা, সুনন্দা, স্বপ্না আর আলপনা, এদের সবাই মিশন গার্লস হাই স্কুলের ৮৪ র মাধ্যমিক ব্যাচ, এমনকি একই সেকশনে পড়ত ওরা। আরেকজন ছিল, মধুরা, এই গ্রুপের অন্যতম সদস্য, কিন্তু ওর বড্ড তাড়া ছিল, ফেরার টিকেট কেটে সে বহুদিন হল না ফেরার দেশে।
এদের মধ্যে স্বপ্না আর মলিনার মধ্যে তবু একটু আধটু যোগাযোগ ছিল, কারণ ওরা স্কুলের প্রাক্তনী সংসদের মেম্বার ছিল, কখনো সখনো পুনর্মিলন উৎসব হলে ওরা কয়েকবার গেছেও। কিন্তু, বাকিদের সাথে আর স্কুল ছাড়ার পর দেখা হয় নি বললেই চলে। অগত্যা হালের ভিডিওকলই ভরসা। তবে, শিয়ালদা স্টেশনে এত বছর পর সেই প্রায় অস্পষ্ট মুখগুলোকে সামনে দেখে ওরা জড়িয়ে ধরেছিল পরস্পরকে, সেই মুহূর্তটায় খুব আবেগহীন মানুষেরও চোখে জল আসতে বাধ্য।
সবাইকেই ট্রেনে তুলতে মোটামুটি কেউ না কেউ এসেছিল, এক সুনন্দা ছাড়া। সেই মুহূর্তে তারা প্রায় চিত্রার্পিতের মতো দেখেছিল, তাদের এতদিনের 'স্ত্রী' বা 'মা'য়ের পরিচয়ে বেঁচে থাকা মানুষটারও একটা পূর্ব জীবন ছিল আর সেই জীবনে অনেক অনেকটা রঙ ছিল, যা তারা স্বেচ্ছায় ছেড়ে এসেছিল সংসারকে ভালোবেসে, তাদেরকে ভালোবেসে।
প্রথম পুনর্মিলনের প্রাথমিক উচ্ছ্বাসটা স্তিমিত হলে ওরা ট্রেনে চড়ে বসেছিল, স্বামী-সন্তানের হাত ধরে অভ্যস্ত ঘোরার বাইরে বেরিয়ে ওরা একটু অন্যভাবে ঘুরতে চেয়েছিল, অন্য চোখে দেখতে চেয়েছিল জগৎটা , এক অন্য অভিজ্ঞতার আস্বাদ নিতে বেরিয়েছিল ওরা, জীবনে প্রথম।
ওদের গল্প শেষ হচ্ছিল না, নিজেরাই আগে থেকে প্ল্যান করে রাতের খাবার রান্না করে টিফিনকৌটোয় ভরে নিয়ে এসেছিল। ট্রেনে উঠে সেই ছোটবেলার মতো ভাগাভাগি, কাড়াকাড়ি করে খেয়ে অতগুলো টিফিনবক্স ফাঁকা হতে সময় লাগল না। আর তার সঙ্গে সমানতালে চলছিল স্মৃতি রোমন্থন আর উচ্চস্বরে হাসি। ওদের বার্থগুলোও বেশ কাছাকাছিই পড়েছিল। রাতের খাওয়ার পরেও ওদের হইহল্লা কামরার বাকি যাত্রীদের অসুবিধারই কারণ ঘটাচ্ছিল। এমনকি আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ার পরও পাশাপাশি বার্থে চলছিল ফিসফিস, গুঞ্জন, চাপা হাসি।
অবশেষে ওরা পৌঁছেছিল ওদের আগে থেকে বুক করে রাখা হোমস্টেতে। যেক'দিন ওরা ঘুরবে তার জন্য একটা গাড়িরও ব্যবস্থা ওরা কলকাতা থেকেই করে এসেছিল। প্রৌঢ়ত্বের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মহিলা তাই গত তিনমাস ধরে শুধু প্ল্যান করেছে আর ক্যান্সেল করেছে। অবশেষে অনেক আটঘাট বেঁধে আসা, এ তো আর তারা বাচ্চা মেয়ে নয় যে অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়ে পড়বে!
আজকাল যায় অনেকে, যাচ্ছে। তাদের সময়ে এসব কেউ ভাবতেও পারত না। আজকাল কিছু ফেসবুক গ্রুপে অ্যাড হয়েছে আনন্দী। সেখানে দেখে কত বাচ্চা বাচ্চা মেয়ে, সদ্য চাকরী করছে ,বেরিয়ে পড়ছে গ্রুপ করে। পাহাড়ে যাচ্ছে, সমুদ্রে যাচ্ছে, ছবি দিচ্ছে। দেখে কেমন মনটা ভরে ওঠে আনন্দীর। তারা পারে নি, চায়ও নি পারতে, কলেজ পাশ করতে না করতে বিয়ে দিয়েছিল সবাই মিলে। এরা ত্রিশেও বলছে, সঠিক মানুষকে পেলে তবে বিয়ের কথা ভাববে। এদের বাবা-মায়েরা জোর করছে না, মেয়েরা চাকরি করছে, নিজের উপার্জনের টাকায় ঘুরতে যাচ্ছে, জীবনটা বাঁচছে, যেভাবে তারা চায়।
সেদিন তাদের হয় নি, তবে এ জীবনে তো হল! মনে মনে একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে আনন্দী।
চা-পকোড়া খেতে গল্প করছিল ওরা, জীবনের গল্প। ওদের প্রত্যেকের আলাদা।
আনন্দী বরাবর চুপচাপ,আগেও ছিল। এখন আরও বেশী। অনেকে অনেক কথা বললে মাঝে মাঝে দু-একটা কথার উত্তর দেয় সে। সবাই যার যার সংসার, সন্তানের কথাই বলছিল বেশিরভাগ, মধ্যে মধ্যে দু-এক টুকরো আক্ষেপ, 'দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না' ইত্যাদি ইত্যাদি। আনন্দী তাকিয়েছিল দূরে, যেখানে সূর্যাস্তের কমলা আভায় রঙিন থেকে ধীরে ধীরে ধূসর হয়ে আসছে আকাশটা, হঠাৎ বলল,"কেউই তোরা দু-দিনের জন্যও নিজের সংসারটাকে ছেড়ে আসতে পারিস নি!"
বাকিরা একটু থমকে গেল, সত্যিই! প্রকৃতির এমন অপরূপ শোভা রোজ রোজ তারা দেখে না, এমনকি আর কয়েকদিন পর আবারও দেখতে পাবে না, তা সত্ত্বেও ওরা কেউ দেখছিল না। ওরা ভাবছিল, কাজের মাসি ঠিক সময়ে আসছে কি না, বরের শরীর ঠিক আছে কি না, ছেলেটা বা মেয়েটা টিফিনে কী খাচ্ছে, না জানি তারা নেই বলে ওদের কত অসুবিধা হচ্ছে, এসবই তো ওদের আলোচনার বিষয়, অথচ, এই যে মধুরা ওর মেয়েটা কত ছোট থাকতে মারা গেল, কিছুই কী আটকালো সংসারে? দিব্যি সংসারের চাকা গড়গড় করে গড়িয়ে মধুরার মেয়েটাও কত বড় হয়ে গেল। ওর বর আর বিয়েও করে নি, সবাই বলেছিল, করেনি। সামলে তো ঠিক নিল! আসলে কেউই পৃথিবীতে অপ্রতিস্থাপনযোগ্য নয়, তবু 'সংসার' ওদের রক্তে, শিরায়-উপশিরায় এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে আমৃত্যু এ থেকে ওদের আর পরিত্রাণ নেই।
সুনন্দা বলল,"সে তবু ভালো রে, এত বছর পর যখন দেখছি, আমার অপেক্ষায় আর কেউ নেই, নিজেকে বড় অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। নিজের জন্য খাওয়া, নিজের জন্য পরা, নিজের জন্য বাঁচা এসব অভ্যেস নতুন করে কি আর এই বয়সে হওয়া সম্ভব?"
এদের মধ্যে সুনন্দার বিয়েই সবচেয়ে আগে হয়েছিল মাধ্যমিক দিয়েই। এরা সবাই গেছিল সুনন্দার কনেযাত্রী, সেই প্রথম বাবা-মাকে ছাড়া দূরে কোথাও যাওয়া। কি-ই যে আনন্দ হয়েছিল। এখনো চোখ বুজলে সব দেখতে পায় ওরা। সুনন্দার বিয়ে হয়েছিল সেই সুন্দরবন। সুনন্দার বর ব্যাঙ্কে চাকরী করতেন। সেই সুবাদে সুনন্দা বরের সাথে ঘুরেছে খুব। সেই ওদের প্রথম বন্ধুবিচ্ছেদ। কলেজে ভর্তির আগেই। খুব কেঁদেছিল ওরা, বিশেষ করে মধুরা। সুনন্দার বরকে বেশ মনে আছে ওদের। দারুন সুপুরুষ, যাকে বলে, টল, ডার্ক, হ্যাণ্ডসাম। খুব মজলিশি লোক ছিলেন। সুনন্দার বাসরে খুব মজা হয়েছিল, এতগুলো অবিবাহিত শালি, ভদ্রলোক সবার সাথে এমনভাবে মজা করছিলেন যেন ওরা সুনন্দার নয়, সুনন্দার বরের বান্ধবী। আর সুনন্দা সেই যে মুখে কুলুপ এঁটেছিল...
ভদ্রলোক অকালেই চলে গেলেন। সুনন্দারা তখন জামশেদপুরে ছিল। স্বামী মারা যাবার পর সুনন্দা ওখানকার পাট উঠিয়ে কলকাতা চলে এসেছে, ছোট একটা ফ্ল্যাট নিয়েছে। তারপর তো মেয়ে চাকরী পেয়ে ব্যাঙ্গালোর, ছেলে পড়তে দিল্লী। এখন মেয়েটা একেবারেই একা হয়ে গেছে।
আলপনা বলল,"সবই নদীর এপার ওপারের গল্প, আমার তো বাবা তোকে বেশ হিংসাই হয়, কেমন ঝাড়া হাত পা!"
মলিনা বলল,"কেন রে, তোর জীবনে আবার কিসের আক্ষেপ? আমাদের মধ্যে এক তুই-ই তো গ্র্যাজুয়েশন করে, চাকরি করে তারপর বিয়ে করলি! সারাজীবন যেমনটা চাস, তেমনভাবে চললি! হতিস আমাদের মতো হুকুমের চাকর, তো বুঝতে পারতিস!"
আলপনা হাসল,"দূর থেকে তেমনটাই মনে হয় বটে, শখের চাকরি করিনি, আমাকে চাকরি করতেই হয়েছিল। আমাকে তোদের মতো কেউ 'বিয়ে করে নে' বলে নি, বাবার ক্ষমতা ছিল না যে আমাদের তিন বোনের বিয়ে দেবে। আমরা প্রত্যেকেই চাকরি করে তারপরেই বিয়ে করতে পেরেছি। আর জীবনের সেই সব দিনগুলো খুব সুখের ছিল না। তারপরও যে কি-ই সুখে ছিলাম! সংসার করে, স্বামী-সন্তান সবার আমার প্রতি এক্সপেক্টেশনস, সমস্ত নিডস ফুলফিল করে, চাকরির দায়িত্ব সামলে নিজের নিডগুলোর দিকে আর তাকানোই হল না, আর তুই বলছিস আমার কোনো আক্ষেপ নেই!"
আলপনা এদের মধ্যে খুব সাধারণই ছিল। পড়াশোনায় সবচেয়ে ভালো ছিল মলিনা, যে এখন সবচেয়ে বেশী সংসারী। মলিনাকে দেখে বোঝাই যায় না, দুদিকে দুটো বিনুনী করে কখনো প্রাইজ নিতে উঠত সে স্টেজে। যেমন পড়াশোনায় ছিল, তেমনই খেলাধূলায়, তেমনি সেলাই-ফোঁড়াই, হাতের কাজে। সবদিক দিয়ে চৌখশ মেয়েটা এখন বাতের সমস্যায় ভোগে, শরীরের ওজন লাগামছাড়া। সেদিনের কেউ আর অন্তত মলিনাকে দেখলে চিনতে পারবে না। আলপনা সাধারণ ছিল। কি পড়াশোনায়, কি দেখতে - একেবারেই চোখে পড়ার মতো নয়। ওরা খুব গরীব ছিল, প্রায় দিন টিফিন আনতে পারত না। টিফিনের সময় স্কুলের টিউবকল থেকে বোতল ভরে ঢকঢক করে জল খেত। যখন ওদের সবার বিয়ে হয়ে গেল, আলপনা তখন কলেজ শেষ করে চাকরির ফর্ম ফিল আপ করত। টিউশনি করে পরীক্ষার ফর্মের টাকা ভরত। চাকরিটা খুব কষ্ট করেই পেয়েছিল আলপনা। তারপর সব দায়িত্ব সামলে অনেক দেরিতেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিল সে। যদিও সে মুখ ফুটে কিছু বলে নি, তবে বিয়েটাও ওর যে খুব সুখের হয়েছিল তা দেখে মনে হয় না। একটা মেয়ে আলপনার। এখন ক্লাস টেন। চাকরি করেছে বটে সে, পয়সাও রোজগার করেছে, কিন্তু, সবার 'প্রয়োজন'এর ঝুলি ভরতে ভরতে কখন তা শেষ হয়ে গেছে। চাকরি করেছে বলে আলাদা কোনো প্রিভিলেজ তো পায়ই নি, বরং দাঁড়িপাল্লার তুল্যমূল্য বিচার করলে বরং অন্যদের চেয়ে অনেক বেশী কঠিন জীবনযাপন করেছে সে। চাকরি করলেই সে মেয়ে খুব স্বাধীন, আপাতভাবে যে কথাটা প্রচলিত, তা যে সবসময়েই স্বতঃসিদ্ধ নয় আলপনা তার প্রমাণ।
মলিনা বলল,"আক্ষেপ বোধহয় সবারই থাকে, না রে? আমি ভাবি, একা আমারই বুঝি জীবনটা আক্ষেপে ভর্তি। সেই যে পড়তে পড়তে বাবা-মা ঘাড় ধরে বিয়ে দিয়ে দিল...সেই যে জোয়াল কাঁধে নিয়েছি, আর নামাতে পারলাম কই! মাঝেমাঝে ভাবতাম, ছেলেটা আরেকটু বড় হোক, তারপর মেয়েটা আরেকটু বড় হোক, তারপর শ্বশুর-শ্বাশুড়ি অসুস্থ, সবকটা ধাপ যখন উৎরোলাম, দেখলাম আমার শরীরটাই ভেঙ্গে পড়েছে, মনেও আর জোর নাই। ব্যস! ফুরিয়ে গেল! এখন মেয়েকে বলি, পড়! আমার মতো হোস না।"
এদের গ্রুপে স্বপ্না গান গাইত। রীতিমতো মাস্টার রেখে স্বপ্নার মা মেয়েকে গানে তালিম দিয়েছিলেন। স্বপ্নার গলাটাও চমৎকার ছিল। সন্ধ্যে নামছিল ওদের চারপাশে। বেশ শীত শীত করছিল ওদের। মলিনা বলল,"এই ঠান্ডায় বসলেই আর দেখতে হবে না!" আনন্দী বলল,"হোটেলের ছেলেটা দুপুরে অনেক কাঠ, গাছের পাতা, ডাল নিয়ে এসেছে। একটু আগুন জ্বালাতে বলি, দাঁড়া।"
আনন্দী চলে গেল। সবাই বলল,"এই পরিবেশে এবার একটা গান দরকার। স্বপ্না, একটা গান ধর তো দেখি!"
স্বপ্না বলল,"আর গান! কবে যে শেষ গান গেয়েছিলাম, এখন গলা দিয়ে মেশিন গানের আওয়াজ বেরোয়, ছেলের পিছনে চেঁচাতে চেঁচাতে।"
হোটেলের ছেলেটা সামনের লনে ওদের বনফায়ারের ব্যবস্থা করে দিল। শ্রীতমা বলল,"এই সময়ে এক কাপ কড়া করে কফিটা না হলে ঠিক জমছে না।"
অগত্যা কফি এল আরেক রাউন্ড পেঁয়াজী নিয়ে। সুনন্দার কাছে মুড়ি ছিল। একটা বড় গামলায় ঢেলে মুড়ি পিঁয়াজি খেতে খেতে সমবেত আবদারে স্বপ্না অনেকদিন পর গান গাইল, আমার মুক্তি আলোয় আলোয়। চর্চা না থাকলেও যে একবার সুরের সাধনা করেছে, সে আর হাজার চেষ্টা করলেও খারাপ গাইতে পারবেই না।
খোলা আকাশের নীচে পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে স্বপ্নার গলা যেন ফিরে ফিরে আসছিল। একবার জড়তা কেটে গেলে আর বলতে হয় না, এরকম পরিবেশে নিজেকে উজাড় করে দিতে ইচ্ছা করে। স্বপ্না এবার নিজেই দ্বিতীয় গানটা শুরু করল, "জগতের আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ..."
সবাই গলা মেলাচ্ছিল, হঠাৎ স্বপ্না গান থামিয়ে জিজ্ঞেস করল,"শ্রীতমা, মণিদাকে তোর মনে পড়ে?"
শ্রীতমা সবার কাপে আরেক রাউন্ড কফি ঢেলে দিচ্ছিল, হঠাৎ বহুদিনের অশ্রুত নামটা মনে পড়তেই হাতটা কেঁপে একটু চা কি চলকে টেবিলে পড়ে গেল, নাকি তা নেহাতই কাকতালীয়! সবাই থেমে গেল। একলহমায় স্বপ্না যেন সবাইকে উড়িয়ে নিয়ে চলে গেল ঐ দিনগুলোয়। মণিদাকে এরা সবাই চিনত, স্বপ্নার পিসতুতো দাদা ছিল মণিদা, প্রতি পরীক্ষার পর মণিদা আসত মামারবাড়িতে। খুব লম্বা ছিল, দোহারা গড়ন ছিল। একবার স্বপ্নার জন্মদিন পড়েছিল, স্বপ্নার মা ওদের যেতে বলেছিলেন। সেবার খুব ব্যাডমিন্টন খেলা হয়েছিল স্বপ্নাদের বাড়ির উঠোনে। মণিদা ব্যাডমিন্টনের চ্যাম্পিয়ন লোক ছিল। সারাদিন কি-ই যে আনন্দ হয়েছিল, খাওয়াদাওয়া, খেলাধূলো, নাচ-গান, আড্ডা। বাড়ি ফিরতে সবার সেদিন দেরি হয়েছিল, বাড়িতে বকুনিও জুটেছিল সবার খুব। মণিদা সবাইকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল। শ্রীতমার বাড়ি সবচেয়ে দূরে ছিল। শেষ বাড়ি পৌঁছেছিল শ্রীতমা। তারপর কী হল কে জানে, মণিদার মামারবাড়ি আসার ধূম বেড়ে গেল। আর মামারবাড়ি এলেই স্বপ্নাকে স্কুল থেকে নিতে আসত সাইকেলে করে। ওদের সবাইকে যেতে বলত। কেউ প্রথমে বোঝে নি কিছু, তারপর একদিন কে যেন দেখেছিল ওদের একসাথে, না না কোনো ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে নয়, ওসব তখন ওরা ভাবতেই পারত না। হয়ত ওদের মধ্যে কোনো গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠছিল, হঠাৎই সমূলে কুঠারাঘাত। ওরা সবটা জানে না, শুনেছিল মণিদার বাবা-মা এসেছিলেন, শ্রীতমার বাবা-মাও গেছিল স্বপ্নাদের বাড়ী। তারপর কীসব গণ্ডগোল হল। মণিদার বাবা-মা ছেলেকে নিয়ে চলে গেলেন পরেরদিনই। শ্রীতমার ও বাড়ি থেকে বেরনো বন্ধ হয়ে গেল। তারপর তো শ্রীতমার বিয়ে দিয়ে দিল ওর বাবা-মা। মণিদাও আর মামারবাড়ি আসে নি।
সত্যিই মানুষের স্মৃতি সত্যিই দুর্বল। মণিদার কথা ওদের স্মৃতি থেকে প্রায় মুছেই গেছিল। মুখটাও কেমন যেন আর মনে নেই, শুধু অবয়বটা মনে আছে। শ্রীতমার মনে আছে কি?
শ্রীতমা বলল,"মণিদা কেমন আছে, রে?"
স্বপ্না বলল,"ভালো আছে রে, স্টেটস এ আছে এখন। সেদিন ফোন করেছিল, বললাম, বন্ধুরা মিলে বেড়াতে যাচ্ছি, জিজ্ঞেস করল, শ্রীতমা যাচ্ছে?"
"তুই কী বললি?"
"বললাম, যাচ্ছে, তখন তোর কথা জিজ্ঞেস করছিল।"
শ্রীতমা হাসল, বলল,"মাঝেমাঝে তোর প্রোফাইলে দেখতে পাই। আমার ফ্রেন্ডে নেই। কেমন চুল টুল পেকে বুড়োটে হয়ে গেছে। তবে ওর হাসিটা ওর ছেলে পেয়েছে, অবিকল!"
স্বপ্না হাসার চেষ্টা করে বলল,"যা হয়, বোধহয় ভালোর জন্যই হয়!"
শ্রীতমা উঠে পড়ল, পায়ের দিকের কুঁচিটা আরেকবার গুছিয়ে নিতে নিতে বলল,"হ্যাঁ, সেটাই ভেবে নিতে হবে, আর কি!" অন্ধকারে মিলিয়ে গেল শ্রীতমা, বোধহয় ঘরের দিকেই গেল। ওদের যা বয়স, তাতে অনেককিছুই বয়সোচিত নয়। বিশেষ করে দুই সন্তানের মা, সফল ডাক্তারের গৃহিণীর সবসময়ে একটা 'সুখী' গৃহিণীর এপ্রন পরে থাকতে হয়। মা শিখিয়েছিলেন, 'সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে।' ত্রিশবছর ধরে মায়ের কথা সে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছে, আজও তার অন্যথা হবে না।
আজই এই ট্রিপে ওদের শেষ দিন। আজ ওরা বেরিয়েছে, একটা গাড়ী নিয়ে আশেপাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছিল, যেখানে ইচ্ছা হচ্ছিল, নামছিল, সেলফি তুলছিল, ছবি তুলছিল; এখানে নেটওয়র্ক দুর্বল, ছবি মোটে আপলোডই হতে চাইছে না, বাড়ি ফিরেই প্রথম কাজ হবে ছেলে মেয়েকে দিয়ে ছবি এডিট করিয়ে সোশ্যাল নেটওয়র্কিং সাইটে সেগুলো আপলোড করা। এখানে ওরা ঝর্ণার সাথে তাল মিলিয়ে হাসছিল। এত হাসি যে ওদের মধ্যে জমেছিল কে জানত! উপযুক্ত সময় আর সমমনস্ক সঙ্গী পেলে অনেক কিছুই ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে, মনের যে কুঠুরিগুলো ধুলো জমে জমে বন্ধ হয়ে গেছিল, সেগুলো হঠাৎ খুলে গিয়ে বন্যাধারার মতো কথা বেরিয়ে আসে, জীবনের কথা, উপলব্ধির কথা, ভালোবাসার কথা - যে কথাগুলো একদিন সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে বলবে ভেবে রেখেছিল তুলে, কিন্তু, ত্রিশ বছর সংসারের পরও যেগুলো বলা হল না, সেগুলো হঠাৎ এদের সামনে কিভাবে যে হুড়মুড় করে বেরিয়ে পড়ছিল! এতদিনের সংসারে কেউ কখনো জিজ্ঞেসই করল না, তার কোনটা পছন্দ!
মলিনার হাঁটুতে বাত, সে বেশী হাঁটতে পারছিল না, বসে পড়ছিল; সবাই ঘুরছিল এদিকওদিক - সবার মোবাইল বাজছিল ইতিউতি, সবারই এখন দরকার তাদের। ঘুরতে আসার আগে আনন্দী যখন বলল, ওরা বন্ধুরা মিলে পাহাড়ে বেড়াতে যাবে ঠিক করেছে, ওর ছেলে বা স্বামী কেউ প্রথমে ওকে সিরিয়াসলি নেয়ই নি। ভেবেছিল, সারাজীবন ধরে আনন্দীর এরকম অনেক খেয়াল চেপেছে, আবার খেয়ালের ভূত নেমেও গেছে। আনন্দী যেদিন খাবার টেবিলে বসে টিকেটটা মোবাইলে ওদের দেখিয়েছিল ডিনারটেবিলে সেদিন ছোটখাটো ঝড়ই বয়ে গেছিল। অনিন্দ্য বলেছিল,"আমাদের সুবিধা-অসুবিধা , রকির কলেজ এসব তুমি একবারও ভাববে না?" রকি বলেছিল,"দিনে দিনে তুমি বড্ড স্বার্থপর হয়ে উঠছ মা!" আনন্দী বলেছিল,"তোমাদের সুবিধামতো ডেটই ফিক্স করতে চেয়েছিলাম। তোমরাই তখন কিছু বল নি, তাই আমাদের সুবিধামতো ডেটই ফিক্স করলাম। ক'দিন চালিয়ে নিতে তোমরা ঠিকই পার, আমি যখন আগে বাপেরবাড়ি যেতাম, তখন তো তোমরা ভালোই চালাতে। মাঝেমাঝে তো রকিও যেত না আমার সাথে, একাই যেতাম। রকি তখন আরও ছোট ছিল, তখন যদি পারে, এখন পারবে না কেন?"
সবার গল্পই যে খুব আলাদা তা নয়। ফেরার একদিন আগে তাই ফোনের ফ্রিকোয়েন্সিও বেড়েছে, এত মিস বোধহয় ওদের আগে কেউ কক্ষনো করে নি। কারোর ছেলে বলছে,"মা কখন ট্রেন ঢুকবে? আমি আনতে যাব?" কারোর মেয়ে বলছে,"মা ওষুধগুলো ঠিক করে খাচ্ছ?" কারোর বর বলছে,"বল, কী খাবে, আমি ছুটি নিয়ে বানিয়ে রাখব!" বেশ মজাই লাগছে ওদের। এত মিস করার মতো দূরত্বে ওরা কখনো থাকে নি। তাই হয়ত এই পরিবর্তন, হয়তো ক্ষণিকের; তবু সাময়িক স্বস্তিদায়ক!
সুনন্দার অত ফোন আসে না। সে ঘুরে ঘুরে ছোট ছোট বাহারি রঙিন ফুলের ছবি তুলছিল। এত সুন্দর থোকা থোকা হয়ে ফুটে রয়েছে, যেন কেউ যত্ন করে বসিয়েছে ওদের। এসব জায়গায় এলে মনে হয় প্রকৃতির চেয়ে বড় কেউ নেই, কিচ্ছু নেই।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে আসছিল, ওদের ড্রাইভার এবার একটা মন্দিরের সামনে ওদের দাঁড় করাল। মন্দিরটা একটু উঁচুতে, উঠে গিয়ে দেখে নেমে আসতে হবে। মন্দিরটা শিব-পার্বতীর মন্দির। ওদের যে বয়স মন্দিরের প্রতি ওদের আকর্ষণ বেশী হওয়ারই কথা। মলিনাও মন্দিরের কথা শুনে হাঁটুর ব্যথা নিয়ে ওপরে উঠতে লাগল। সবাই গেল, এক আনন্দী ছাড়া। আনন্দী পাথরের মূর্তিতে ঈশ্বরের অধিষ্ঠান বিশ্বাস করে না। কোনো মন্দির দেখার প্রতি সে টানও অনুভব করে না। বিয়ের পর সে দেখেছিল, তার শ্বশুরবাড়ি ভারি ধার্মিক; আনন্দীর শ্বাশুড়ী প্রতিবছর তীর্থে বেরোতেন। আনন্দীও গেছে কতবার! একটা সময়ে অত্যাচারই মনে হত তার। প্রতিবার পাহাড়, সমুদ্রের জায়গায় শুধু মন্দির আর মন্দির! কতজায়গায় যে প্রণাম ঠুকতেন শ্বাশুড়ি, তার ইয়ত্তা নেই; ওকেও দেখাদেখি তাই করতে হত। ভক্তিহীন পূজা অর্থহীন হয়, শুধু শারীরিক কষ্ট বাড়ায়। ফিরেই কোনো না কোনো অসুখে পড়ত আনন্দী। বাড়িতেও কখনো বলতে পারে নি, এমনকি স্বামীকেও নয়। ঘরের পুজোআচ্চাও করতে হয়েছে তাকে, সবাইকে যেমন করতে হয়। কিন্তু, মন থেকে কখনোই বিশ্বাস করে উঠতে পারে নি সে। আজ প্রথম কোনো মন্দিরে সে স্বেচ্ছায় গেল না। মন্দিরের রাস্তার সামনে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের কোলে অস্তমান সূর্যের দিকে নমস্কার করল সে। ঈশ্বর যদি কেউ থাকেন তবে এই-ই; পাথরের মূর্তি প্রতীক বৈ তো নয়! মন্দির তার ভালো লাগে না তা নয়, তবে তা শুধু তার ভাস্কর্যগুলোর জন্য। আগে আগে, মন্দিরে গেলে হাঁ করে সে ওগুলোই দেখত, শ্বাশুড়ি মুখ ঝামটা দিতেন, কেউ বুঝলই না কখনো, অথচ যার বোঝার কথা ছিল...নিজের প্রতি বিরক্তিতে নিজেই মুখ ফেরায় সে, সে তো সব সম্পর্কের দায়বদ্ধতা ভুলে এখানে ছুটি উপভোগ করতে এসেছিল! কেন যে একেবারে বাদ দিতে পারে না তারা, মেয়েরা! বারবার ঘুরেফিরে একই কথা, একই মুখ, একই কন্ঠস্বর!
সবাই নেমে এল মন্দির থেকে। স্বপ্না ফুল ছোঁয়াল ওর মাথায়, প্রসাদ দিল। বেড়াতে এসে একটাও মন্দির দর্শন না হলে ওদের ভালো লাগে না, এই মন্দিরটা দিয়ে ওদের এবারের মতো বেড়ানো শেষ হল, তৃপ্ত ওরা।
উত্তরবঙ্গে আজই ওদের শেষ রাত, ওরা অনেক রাত অবধি হোমস্টের সামনের লনটায় বসেছিল। ঘুম আসছিল না ওদের কারোরই। বেড়াতে আসার আগে আগে ব্যাগ গোছাতে গোছাতে কখনো হয়ত মনে হয়েছিল, ক'দিনের জন্য হলেও সংসারে ওদের অনুপস্থিতি অসুবিধাতেই ফেলবে বাড়ির লোকেদের, কখনো আনমনে মনে হয়েছিল, না গেলেই হয়তো হত ভালো, একটু একটু মনের কোণে খচখচ যে করছিল না তা নয়; কিন্তু, এখানে এসে এই ক'টা দিন কাটিয়ে ফেরার পালা যখন এল, তখন মনটা অকারণেই কেমন বিবশ হয়ে যাচ্ছে; মুখে না বললেও বেশ বোঝা যাচ্ছে মন খারাপের বোঝা চেপে বসছে সবার মনেই। সবার সন্তানই এখন বড়, মায়ের উপর অতিরক্ত নির্ভরশীলতা আর কারোরই নেই। সবার জগত ভিন্ন, মায়ের থেকে অনেকটা দূরে। মায়ের কি নিজের জগৎ থাকতে নেই?
পাহাড়ে সন্ধ্যে তাড়াতাড়ি ঘনায়, রাত ন'টাতেই মনে হয় নিশুতি রাত, এখন প্রায় রাত এগারোটা। চারিদিকে মানুষজনের আওয়াজ যখন স্তিমিত হয়ে আসে, তখন প্রকৃতির নিজস্ব আওয়াজ কান পাতলে শোনা যায়। রাতের আকাশে তারার চাঁদোয়ার তলায় বসে পাহাড়ী নদীর দুরন্ত আওয়াজ ওরা একসাথে বসে আবার কবে শুনতে পাবে কে জানে!
স্বপ্নাই প্রথম নীরবতা ভঙ্গ করল,"আজ বোধহয় পূর্ণিমা, না?"
শ্রীতমা শুনেই চেঁচিয়ে উঠল,"এই যাহ্! আজ পেঁয়াজ খেয়ে ফেললাম!"
মলিনা বলল,"তাই-ই হবে, পায়ের ব্যথাটা যা ভোগাচ্ছে!"
আনন্দী হাসল,"আমরা সত্যিই বুড়ী হয়ে গেছি রে! পূর্ণিমার আলোয় চারদিকটা যে ভেসে যাচ্ছে, সেটাই কেউ বলল না!"
আলপনা শব্দ করে হাসল,"শুনেছি, প্রকৃতির কাছাকাছি এলে মানুষের মালিন্য দূর হয়, মন প্রসারিত হয়; আমরা এতটাই বদ্ধ হয়ে গেছি, যে পাহাড়ও ফেইল করে যাচ্ছে। এখন ভাবতেও কেমন লাগে, আমরা কিরকম ছিলাম আর কিরকম হয়েছি! এখানে বসেও মনে হচ্ছে, পরশু ফিরে জয়েন করতে পারব না আবার সিএল যাবে!"
সুনন্দা বলল,"অনেক বছর আগে পাহাড়ে এসেছিলাম, তোদের জামাইবাবুর সঙ্গে; এই বেড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে মনে পড়েছে খুব। আসলে কোনো মানুষ যখন একেবারে 'নেই' হয়ে যায়, তার প্রতি অভিযোগের তীরগুলো আর ধারালো থাকে না; অভাব-অনুযেগ তো ছিলই, ওঁরও হয়তো আমাকে নিয়ে অনেক অভিযোগ ছিল,অথচ সেইদিকটা কোনোদিন ভেবেই দেখা হল না আমার, শোনাও হল না যে আমার কী কী খামতি ছিল!"
এরপর আর কিছু বলার থাকে না, ওরা চুপচাপ প্রকৃতির দিকে চেয়ে বসেছিল, কারোর চোখই আর এই শেষবেলায় শুকনো ছিল না।
এই বয়সে ছেলেমানুষি মানায় না, তাই সারা রাত জাগবার প্ল্যান থাকলেও সেটা এক্সিকিউট করা গেল না। কাল ট্রেন ধরা আছে, এর মধ্যে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লেই চিত্তির! তাই যখন রাত বারোটার ঘর ছুঁল, আর কেউ রিস্ক নিতে রাজি হল না। সবাই হাই তুলতে তুলতে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। অনেক রাতেও আনন্দীর ঘুম আসছিল না। ওর ঘরে ও, আলপনা আর স্বপ্না। তাকিয়ে দেখল, ওরা ঘুমিয়ে কাদা। ওঘর থেকে মলিনার নাক ডাকার আওয়াজ আসছে। মলিনাটা কী হয়ে গেছে! মোটা, বাতের রুগী, শরীরে নানান অসুখ। অথচ...কী ভীষণ ব্রাইট ছিল! এই যে তাদের ব্যাচের সবার মধ্যেই কমবেশী সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু, অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেল, তার দায় কি শুধু তাদের একার না সমাজেরও?
আনন্দী সন্তর্পণে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। দেখল, সে একা নয়, সুনন্দাও বসে রয়েছে একা। পায়ের আওয়াজ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, আনন্দীকে দেখে সুনন্দা বলল,"ঘুমোস নি?"
"না, আসছিল না ঘুম, তুই ঘুমোস নি কেন?"
"আমার অভ্যেস আছে, অনেকসময়েই অনেক রাত একা জেগে বসে থাকি। আমার রাত ভালো লাগে।"
আনন্দী বলল,"তাহলে কি তোর নিভৃতযাপনে ব্যাঘাত ঘটালাম?"
সুনন্দা হাসল,"এত ফর্মাল কবে হয়ে গেলি বল তো? বোস তো! আড্ডা দিই খানিক!"
আনন্দী বসল,"কাল এই সময়ে ট্রেনে থাকব আর পরশু বাড়ি, মনটা কেমন খারাপ হয়ে যাচ্ছে, বল!"
সুনন্দা বলল,"আমার এত সহজে কোথাও আর মায়া পড়ে না, এত জায়গা ঘুরেছি, প্রথম প্রথম যে কোনো জায়গা ছেড়ে আসতে কষ্ট হত খুব, তারপর পরিবর্তনটাই জীবন হয়ে গেল। মনে আছে, বিয়ের পর যখন প্রথম বরের সাথে বাবা-মা, বাড়ি-ঘর, চেনা জায়গা, তোরা সব ছেড়ে চলে যেতে হল, বুকের মধ্যে মুচড়ে উঠত যন্ত্রণায়। কত রাত শুধু কেঁদেছি ওখানে গিয়ে। কেউ ফিরিয়ে নিয়ে আসে নি, কেউ বলে নি, আহা! কষ্ট হচ্ছে, এত ছোট মেয়ে! মাধ্যমিক দিতে না দিতে বিয়ে, ষোলও পূর্ণ হয় নি তখন। মনে হত, তোদের কারোকে তো এখনি চলে যেতে হল না, তোরা পড়ছিস, নতুন কলেজে ভর্তি হয়েছিস, আর আমার কপালে...আস্তে আস্তে সবই সয়ে যায় আসলে। সেই বুকচেরা যন্ত্রণাটা যখন সয়ে এল, তখন ক্ষতটা রয়েই গেল, একটু আঘাতেই রক্তপাত হত। মধুরাকে মনে পড়ে তোর? মধুরা আমার কত বন্ধু ছিল, আমার বেস্টফ্রেন্ড। চলে গেল। একবার আসতেও পারলাম না। আমাদের মেয়েদের আবার জীবন!"
আনন্দী দীর্ঘশ্বাস ফেলল,"সত্যি মধুরা থাকলে ও-ও আজ আসত। ও নেই বটে, কিন্তু, পুরো ট্রিপটা জুড়ে ও এমন নিঃশব্দে ছিল, আমরা সবাই অনুভব করেছি। আসলে আমরা ছ'জন কখনোই ছিলাম না, সপ্তম জন মিসিং, বড্ড বেশী অনুভব করেছি আমরা।"
সুনন্দা বলল,"আর কখনো আসা হবে কি না কে জানে! আর আসা হলেও পরের বার গ্রুপটায় আর ছয়জনই থাকবে কি না, তা-ই বা নিশ্চয়তা কী? নিশ্চিত বলেই কি কিছু হয়? এই হয়তো আজ আছি, কাল ফুরিয়ে গেলাম। বেঁচে থাকাটাই কি আশ্চর্য নয়?"
আনন্দী বলল,"না মারা গেলেও কেউ অসুস্থ হতে পারে, আরও অনেক কিছুই হতে পারে। আমরা কি আর কচি আছি? বয়স হয়েছে, শরীরের কলকব্জাও বিগড়েছে অনেক। আমি পুরো চেটেপুটে উপভোগ করে নিয়েছি। এই জীবনে কত কিছু না-করার মাঝে একটাতে তো টিকমার্ক পড়ল! তাই বা কম কী?"
সুনন্দা বলল,"তুই এখনো লেখার অভ্যেসটা রেখেছিস, এটা বেশ ভালো লাগল। আমরা যে কী পারতাম নিজেরাই ভুলে গিয়েছি।"
আনন্দী হাসল,"লেখা কিছু নয়, এখানেই যা দেখলাম, লিখে রাখছিলাম টুকটাক। পরে আসতে না পারলেও পড়তে তো পারব। তখন মানসভ্রমণ করব!"
রাত বাড়ছিল।
সুনন্দা বলল,"বেশ ঠান্ডা লাগছে নারে! আগুনটাও নিভে এসেছে। চল শুয়ে পড়ি। আর রাত জাগা ঠিক হবে না।"
আনন্দী বলল,"কাল সারারাত রয়েছে তো ঘুমের জন্য। শুধু মনে হচ্ছে, নবমী নিশির মতো আজকের রাতটাও না পোহাক।"
সুনন্দা হাসল।
ওরা বসেছিল চুপচাপ। ওদের শীত করছিল। তাও ওরা বসেছিল। হঠাৎ আনন্দী বলল,"আমাদের ব্যাচের একটা ছবি তোলা হয়েছিল, সেই মাধ্যমিকের আগে, স্কুলড্রেস পরা। ছবিটা তারপর আমি অনেক খুঁজেছি। আমার কপিটাও যে কোথায় গেল! তোর কাছে আছে রে?"
সুনন্দা বলল,"তাই তো! তুই বললি বলে মনে পড়ল। আমি বিয়ের পর থেকে ছবিটা আর দেখিই নি। কিন্তু, এখন দেখছি স্পষ্ট মনে আছে, লম্বা ছিলাম বলে একেবারে পিছনের সারির কোণে আমার জায়গা হয়েছিল। এবার ভাইদের ওখানে গেলে একবার খুঁজে দেখব।"
আনন্দী বলল,"এই শেষ রাতে এসে মনে হচ্ছে, কত কথাই বলব ভেবেছিলাম, কত কথাই বাকি রয়ে গেল!"
সুনন্দা বলল,"মাধ্যমিক দেওয়ার আগে, যেদিন আমাদের অ্যাডমিট দেওয়া হল, আমরা কত কেঁদেছিলাম, স্কুল ছেড়ে দিতে হবে, এই ভেবে! আমরা ঠিক করেছিলাম, আমরা একই কলেজে ভর্তি হব। তখন কি জানতাম, ভগবান অন্য কিছুই লিখে রেখেছেন!"
আনন্দী বলল,"এমন কত কথা দেওয়া, কত প্রতিশ্রুতি...কোথায় যে ভেসে গেল। আর জীবনের ভেলায় ভাসতে ভাসতে আমরা যে কোথায় গিয়ে ঠেকলাম! এই ফেসবুকের দৌলতে আজ আমরা এখানে। নাহলে তো এজীবনে হয়ত আর দেখাও হত না।"
সুনন্দা বলল,"জানিস আনন্দী, মাধ্যমিকের আগে আমি আর মধুরা ঠিক করেছিলাম, যা-ই হয়ে যাক বিয়ে করব না কখনো। মধুরা সায়েন্স পড়তে চেয়েছিল। আমিও।"
আনন্দী দেখছিল সুনন্দাকে। সুনন্দার চোখের কোল চিকচিক করছে। আকাশে একঝাঁক মেঘ এসে গোল থালার মতো চাঁদটার সাথে লুকোচুরি খেলছে। আলো আঁধারি খেলায় সুনন্দার মুখের রঙও ঘনঘন পরিবর্তন হচ্ছে প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে। সুনন্দার মনের প্রতিচ্ছবি আর মুখের রংবদলের সাথে প্রকৃতিও কখন একসুরে গাঁথা হয়ে যাচ্ছে...
©মিলন পুরকাইত

