ভালোবাসার খামে | মিলন পুরকাইত

0

 ভালোবাসার খামে

মিলন পুরকাইত 

ভালোবাসার খামে

নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ।শরৎ বিদায় নিয়ে হেমন্তের আগমন ঘটেছে।ভোরবেলা সদ্য ফুটে ওঠা ফুলের পাপড়ির চারপাশে হালকা শিশির বিন্দু ছুঁয়ে গেছে।গ্রামের দিকে সকালটা হয় অনেকটা তাড়াতাড়ি।ভোরবেলার এই পরিবেশটা খুব ভালো লাগে শিউলির।বেশ শান্ত ,স্নিগ্ধ আর চারিদিক চুপচাপ এই সময়টা চা খেতে খেতে বেশ সুন্দর উপভোগ করা যায়।পাশেই বাবার ঘর থেকে প্রভাতী সঙ্গীত ভেসে আসছে।এইসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠল শিউলি।ছটা বাজতে আর বেশি দেরী নেই। কলেজে ফার্স্ট ক্লাস দশটায়।সকাল সাতটা কুড়ির রানাঘাট লোকাল না পেলে ফার্স্ট ক্লাস মিস হয়ে যাবে।বাড়ি থেকে স্টেশন অটোতে কুড়ি মিনিট লাগে।সাড়ে ছটার মধ্যে রেডি হয়ে বেরোতে হবে।তাই সমস্ত ভাবনা চিন্তা সরিয়ে দিয়ে চায়ের কাপটা রেখে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো রেডি হতে।


সকাল সাতটা কুড়ির রানাঘাট লোকাল ধরতে ছুটতে হচ্ছে শিউলিকে।ফার্স্ট লেডিস কম্পার্টমেন্টে উঠে হাফ ছাড়লো শিউলি।এই ট্রেনটা মিস হয়ে গেলে কলেজে পৌঁছাতে ভীষণ দেরী হয়ে যেত।যাইহোক ট্রেনটা মিস হয়নি এতেই শান্তি।পরের স্টেশন থেকে পরপর সব বন্ধুরা উঠবে।তবে শিউলির সবথেকে কাছের বন্ধু হল অন্তরা।অন্তরার বাড়ি কল্যাণী।সবাই মিলে একসাথে গল্প করতে করতে কখন যে ট্রেনটা স্টেশনে পৌঁছে যায় বোঝাই যায় না। আজও তার ব্যাতিক্রম হলো না।অন্তরা আর শিউলি গল্প করতে করতে কলেজে পৌঁছে গেলো।অন্তরা শিউলিকে বললো -" কিরে...?তোর ব্যাপারটা কি...?কি হয়েছে...?কিছুদিন ধরে দেখছি তুই কেমন যেন চুপ করে আছিস...?কথা বলছিস না ভালো করে। কি হয়েছে?" শিউলি একটু হেসে বললো -"ধুর, কি হবে আমার...? কিচ্ছু হয়নি।আমি ঠিক আছি।আসলে বেশ কিছুদিন ধরে বাবার শরীরটা তেমন ভালো নেই।তুই জানিসতো সবই।তাই আর কি!যাকগে ছাড়, তাড়াতাড়ি চল ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।"এই বলে শিউলি ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে গেল।অন্তরা আর কিছু না বলে শিউলির পিছন পিছন ক্লাসরুমে ঢুকে গেল।


শিউলি আর অন্তরা দুজনের সেকেন্ড ইয়ার চলছে।ওদের বন্ধুত্ব কলেজের প্রথম দিন থেকে।বাংলা অনার্স নিয়ে পড়ছে দুজনে।অন্তরা সবই জানে শিউলির সমন্ধে।আজ দুবছর ধরে শিউলির বাবা বিছানায় শয্যাশায়ী। শিউলি আর ওর মা দুজনে মিলে অনেক কষ্ট করে বাবার চিকিৎসা করাচ্ছে। শিউলির বাবা প্রাইমারী স্কুল টিচার ছিলেন।তিনজন মিলে বেশ ভালোই ছিলো ওরা কিন্তু একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে একটা বাইক এসে ওর বাবাকে পেছন থেকে ধাক্কা মারে।তখন শিউলি ক্লাস ইলেভেনে পড়ে।খবর পাওয়ার পরই হাসপাতালে গিয়ে বাবাকে ওইভাবে বেডে পড়ে থাকতে দেখে কেমন যেন স্থির হয়ে গেছিলো শিউলি। স্কুলে আসার আগে মানুষটার সাথে কত কথা বলে এলো আর এখন এইভাবে হসপিটালের বেডে নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে।না আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারল না মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল।ডাক্তার যখন জানালো বাবার পাদুটো আর আগের মতো কখনো ঠিক হবে না তবে নিয়মিত ফিজিওথেরাপি আর ডাক্তারের চেকাপ করালে হয়তো আগের থেকে কিছুটা ঠিক হবে।সেই থেকে শুরু হলো ওদের জীবনযুদ্ধ।প্রতিটি মুহূর্তে লড়ছে শিউলি আর ওর মা।বাবা একদিন ঠিক সুস্থ হয়ে যাবে এই আশায়।বাবার অ্যাক্সিডেন্টের পর যা জমানো টাকা ছিল সেটা প্রায় সবই শেষ। আর আত্মীয়রা সবাই সান্ত্বনা দিয়ে যে যার মতো সরে পড়েছে।শিউলি টিউশানি করে আর ওর মা খুব ভালো সেলাই করে তাই যা অর্ডার আসে তাতে ওদের কোনমতে চলছে।এইসব ভাবতে ভাবতেই ক্লাস শুরু হয়ে গেল আর শিউলি এইসব ভাবনা সরিয়ে পড়ায় মন দিল।


ক্লাস শেষে ক্যান্টিনে বসে আড্ডা দিচ্ছে সবাই। শিউলি আর অন্তরাও বসে আছে।এমন সময় থার্ড ইয়ারের একটা গ্রুপ ঢুকলো।অন্তরা মুচকি হেসে শিউলির দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলল -"দেখ তোর মনের মানুষ চলে এসেছে।"শিউলি একটু লজ্জা পেয়ে মুচকি হাসলো।অন্তরা শিউলিকে দেখে হেসে বললো -" আর লজ্জা না পেয়ে এবার মনের কথাটা বলে দে,আর মাত্র কয়েকমাস পর ওরা কলেজ থেকে পাসআউট হয়ে যাবে।"শিউলি কিছু না বলে চুপ করে থাকে।আর কেউ না জানুক অন্তরা জানে শিউলি অভিককে ভালোবাসে। অভিকের দিকটা স্পষ্ট না হলেও শিউলির দিক থেকে স্পষ্ট সেটা বোঝা যায়। যাই হোক, অন্তরা আর বেশি কিছু না ভেবে অন্যদের সাথে আড্ডা দিতে লাগলো।


রাত্রিবেলা খাওয়াদাওয়ার পর শিউলি পড়ার টেবিলে চুপ করে বসে আছে।সামনে বই খোলা থাকলেও একটা অক্ষরও পড়েনি। আজ অভিককে দেখার পর থেকে বারবার কারণে অকারণে ওর কথা মনে পড়ছে।সেই প্রথম দিন অভিককে সামনে থেকে দেখা তারপর কথা বলা এইভাবে আস্তে আস্তে ওদের বন্ধুত্বের শুরু।সেই দিনটা আজও মনে আছে শিউলির। শিউলি তখন সদ্য কলেজে ভর্তি হয়েছে।প্রথম দিন দুরু দুরু বুকে কলেজে ঢোকার পর রুম নাম্বার দেখে সোজা নিজের ক্লাসরুমে ঢুকে বসল।শিউলি বরাবরই স্বল্পভাষী,তারপর বাস্তবতা ওকে আরো বেশি করে চুপ করিয়ে দিয়েছে।তাই মেয়েটা প্রয়োজনের থেকেও একটু কম কথা বলে।অন্তরা শিউলিকে চুপ করে এককোনায় বসে থাকতে দেখে ওর কাছে এসে বলে-"কিরে...?তুই এখানে একা একা চুপ করে বসে আছিস কেন...?চল আমাদের সাথে বসবি সামনের বেঞ্চে।"শিউলি একটু হেসে বলল -"না না,আমি এখানেই ঠিক আছি।"অন্তরা আর কিছু না বলে নিজের ব্যাগটা নিয়ে এসে ওর পাশে বসে পড়ল।শিউলি একটু অবাক হয়ে অন্তরার দিকে তাকাতে অন্তরা হেসে বলল -"আরে ওখানে অনেকে আছে তুই এখানে একা,তাই তোর কাছে এসে বসলাম।"শিউলি অন্তরার কথা শুনে হেসে ফেলল।অন্তরা শিউলিকে বলল - "আমি অন্তরা।কল্যাণীতে থাকি।তুই...?"শিউলি হেসে বলল -"আমি শিউলি। রানাঘাটে থাকি।"এইসব নানা কথার মাঝেই হঠাৎ স্যার প্রবেশ করায় ওদের কথা ওখানেই থেমে যায়।ক্লাস শেষে বেশ কিছু ছেলে মেয়ে ওদের ক্লাসরুমে ঢোকে।এরা প্রত্যেকে সেকেন্ড আর থার্ড ইয়ারের ছাত্রছাত্রী।ক্লাসের প্রত্যেকটি ছেলেমেয়েকে ইন্ট্রোডাকশন দিতে বলে।শিউলির তো ভয়ে হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।কিন্তু তাও দুরু দুরু বুকে বলতে শুরু করে।নিজের নাম বলার সময় সিনিয়রদের মধ্যে একটি ছেলে বলে ওঠে -"তোমার নাম শিউলি ফুল...!বাহ্ বেশ নাম তো।"শিউলি অবাক হয়ে ছেলেটার মুখের দিকে তাকাতেই ওর চোখ দুটো স্থির হয়ে যায়।অদ্ভুত একটা স্নিগ্ধ ভাব আছে ছেলেটার মুখের মধ্যে।যাইহোক,আর বেশি কিছু না ভেবে শিউলি বসে পড়ে।মাঝে কেটে গেছে বেশ কিছুদিন।একদিন লাইব্রেরীতে বসে নোটস লিখছিল শিউলি।হঠাৎ কেউ বলে ওঠে -"আরে শিউলি ফুল না! কেমন আছো...?"হঠাৎ একটা ছেলের মুখে নিজের নাম শুনে চমকে ওঠে শিউলি।অবাক হয়ে ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল ও। "এতো সেই ছেলেটা সেদিন ওদের ক্লাসরুমে এসেছিল" - মনে মনে ভাবতে থাকে শিউলি।শিউলির থেকে কোন উত্তর না পেয়ে ছেলেটা শিউলির সামনে বসে বলে -"আমি অভিক।সেকেন্ড ইয়ার,কেমিস্ট্রি অনার্স নিয়ে পড়ছি।শিউলি কিছুটা ধাতস্ত হয়ে বলল -"আচ্ছা"।অভিক বেশ কিছুক্ষন শিউলির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল -"আচ্ছা তুমি এত চুপচাপ কেন...?একটু হাসলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যাবে তোমার...?একটা অচেনা ছেলের মুখে এমন কথা শুনে শিউলি অবাক হয়ে বলল -"শুধু শুধু হাসবো কেন আমি...?আর আমি একটু কম কথা বলি।"অভিক হেসে বলল -"সেতো আমি বুঝতেই পারছি শিউলি ফুল।কিন্তু তোমাকে হাসলে বেশ মিষ্টি দেখায়। যাই হোক,তুমি লেখো আমি আসি। পরে কথা হবে।"অভিক চলে যাওয়ার পর শিউলি অভিকের কথাগুলো ভেবে নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল। দূর থেকে সবটা লক্ষ্য করছিল অন্তরা।শিউলিকে প্রাণখুলে হাসতে দেখে ওর নিজের খুব ভালো লাগছিল।মেয়েটা একটু বেশি চুপচাপ থাকে।তাই এইভাবে প্রাণখুলে হাসতে দেখে অন্তরাও হেসে ফেলে।এরপর মাঝে মাঝেই অভিক শিউলির সাথে দেখা হলেই কথা বলত। এখন আর আগের মতন শিউলির সেই জড়তা ভাবটা নেই। শিউলিও বেশ ভালোভাবেই কথা বলে অভিকের সাথে।অন্তরা এইসব দেখে শিউলিকে খুব খ্যাপায়।এইভাবে দেখতে দেখতে একটা বছর শেষ হয়ে যায়।সেদিনটা ছিল ২৫শে বৈশাখ,রবি ঠাকুরের জন্মদিন।কলেজে তাই ছোট্ট একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।সব বন্ধুরা আসলেও শিউলি আসতে পারবে কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ ছিল কারণ সেইদিন ওর বাবাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার ছিল।কিন্তু তাও শিউলি এসেছিল তবে একটু দেরি হয়ে গেছিল।অনুষ্ঠান আগেই শুরু হয়ে গেছিল।কিন্তু যখন অভিকের নামটা অ্যানাউন্স করা হয় শিউলি অবাক হয়ে গেল।অভিক স্টেজে এসে রবি ঠাকুরের "শেষ বসন্ত" কবিতাটি পাঠ করল।লাল পাঞ্জাবিতে অভিককে ভীষণরকম উজ্জ্বল লাগছিল।শিউলি মুগ্ধ হয়ে অভিকের আবৃত্তি শুনছিল।ও জানতোই না যে অভিক এত সুন্দর আবৃত্তি পাঠ করতে পারে।একটা অন্যরকম ভালোলাগা ঘিরে ধরছিল শিউলিকে।সবার হাততালির আওয়াজে ও বাস্তবে ফিরে এলো।অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার সময় কলেজের গেটের সামনে অভিককে দেখে ওর কাছে গিয়ে বলল -"তুমি ভীষণ সুন্দর আবৃত্তি পাঠ করো।খুব ভালো লেগেছে।"শিউলির মুখে নিজের প্রশংসা শুনে অভিক হেসে বলল -"ধন্যবাদ শিউলি ফুল।কাল কলেজে আসছো তো।কাল কথা হবে।"শিউলি হেসে বলল -"ঠিক আছে,আসছি।কাল কথা হবে।"রাতে বাড়ি ফেরার পর বারবার অভিকের মুখটা ভেসে উঠছিল শিউলির সামনে।অভিককে ওর ভালোলাগে কিন্তু ওর মনের সবটা জুড়ে যে অভিক রয়েছে সেটা ও আজ প্রথম উপলব্ধি করল।প্রাণচ্ছল ছেলেটা যে ওর মনে ওর হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে সেটা বুঝতেই পারেনি শিউলি। হঠাৎ মোবাইল ফোনটা বেজে ওঠায় ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এলো শিউলি।ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো অন্তরা ফোন করেছে।বেশ কিছুক্ষন কথা বলে ফোনটা রাখার পর ক্যান্টিনে বসে অন্তরার কথাগুলো বারবার মনে পড়তে লাগল। সত্যি তো অভিক আর মাত্র কয়েকটা মাস আছে কলেজে।এরপর ওরা পাসআউট হয়ে যাবে।তারপর কি আদৌ আর কোনোদিন অভিকের সাথে কথা হবে ওর...?কি করবে ও...?অভিককে কি ওর মনের কথাটা বলবে নাকি মনেই রয়ে যাবে কথাটা। নাহ্ আর কিছু ভাবতে পারল না ও।জানলার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল শিউলি।


মাঝখানে কেটে গেছে পাঁচটা মাস।আর কয়েকদিন পর পরীক্ষা শুরু হবে।এই পাঁচমাসে অন্তরার সাথে শিউলির অভিকের বিষয়ে কথা হয়েছে।অন্তরা ওকে অনেক বুঝিয়েছে,বারবার বলেছে যাতে ও মনের কথাটা অভিককে বলে।শেষে শিউলি সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওর মনের কথাটা অভিককে বলবে।কিন্তু তারপর যদি অভিক না বলে তখন কি করবে ও...?ও কি পারবে অভিককে ছেড়ে থাকতে...? নাহ্ এতকিছু ভাবলে ও আর বলতেই পারবে না অভিককে।তাই যা হয় হবে এটা মনে করে শিউলি অভিকের কাছে এগিয়ে গেল। অভিককে একটা চিরকুট দিয়ে বলল -"এতে আমার কিছু কথা লেখা আছে।তুমি পড়ে আমাকে এর উত্তরটা দিয়ো।আমি তোমার উত্তরের অপেক্ষায় থাকবো।"অভিক কিছু বলার আগেই শিউলি চলে গেল।শিউলিকে এইভাবে পালিয়ে যেতে দেখে অভিক অবাক হয়ে চিরকুটটা খুলে পড়তে শুরু করল।


"দিনগুলি যায় দিনের মতোই

কিছু মুহূর্তগুলি স্মৃতি গড়ে,

আগলে রাখি গল্পগুলো

মনের খাতায় নক্সা তুলে।।"


ভালোবাসি তোমাকে।যদি আমার প্রতি তোমার মনে কোনো অনুভূতি থাকে আমাকে জানিও।তাড়াহুড়ো নেই ,পরীক্ষার শেষ দিনে আমি কলেজের বাইরে গাছতলায় তোমার অপেক্ষায় থাকবো।তোমার উত্তর যাই হোক না কেন সেটা তুমি আমাকে জানিও।


                                     শিউলি


অভিক চিরকুটটা পড়ে জামার পকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে রেখে আবার পড়ায় মন দিলো।


এরপর কেটে গেছে একটা মাস।শিউলি অভিক যে যার পড়া নিয়ে ব্যস্ত ছিল এতদিন।মাঝের এই কটা দিনে শিউলি আর অভিক একে ওপরের মুখোমুখি হয়নি। কিন্তু আজকে সেই দিন। অভিকের আজ লাস্ট পরীক্ষা ছিল।শিউলি কলেজের বাইরে গাছতলায় দাঁড়িয়ে অভিকের জন্য অপেক্ষা করছে। অসম্ভব রকমের টেনশন হচ্ছে শিউলির। অভিকের উত্তর কি হবে সেটা জানে না ও।তবে উত্তর যাই হোক সেটা ও জানতে চায়।পরীক্ষা শেষে সবাই বেরোচ্ছে আস্তে আস্তে।কিন্তু অভিক কোথায়...?অভিক এখনো বেরোচ্ছে না কেন....?বেশ কিছুক্ষন অপেক্ষায় পর শিউলি কলেজের ভেতর ঢুকলো কিন্তু কোথাও খুঁজে পেলো না অভিককে।শিউলি আবারো কলেজের বাইরে গাছতলায় এসে দাঁড়ালো।প্রায় চার ঘণ্টা কেটে গেছে এখন বাজে বিকেল পাঁচটা।না অভিক আসেনি।শিউলি বৃথাই এতক্ষন অপেক্ষায় ছিলো অভিকের।অভিককে ও বলেছিল উত্তর যাই হোক না কেন সেটা যেন জানায় কিন্তু অভিক যে আসবেই না ,ওকে এইভাবে উপেক্ষা করবে সেটা ভাবতে পারেনি।শিউলি চাইলেও ভুলতে পারবে না অভিককে কিন্তু আজকের এই ব্যবহারের জন্য ওকে কোনোদিন ক্ষমাও করতে পারবে না।চোখের জলটা মুছে ক্লান্ত অবসন্ন মন নিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়ালো শিউলি।


মাঝখানে কেটে গেছে চারটে বছর।চারটে বছরে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে।সময়ের সাথে সাথে মানুষের জীবনেও পরিবর্তন হয়।সেইদিনের পর শিউলি অসম্ভব রকমের গম্ভীর হয়ে গিয়েছে।গ্র্যাজুয়েশনের পর মাস্টার্স করতে করতে হঠাৎ করেই শিউলির বাবা মারা যান।বাবা ছিল ওর সবথেকে কাছের বন্ধু।প্রথমে অভিকের দেওয়া আঘাত তারপর বাবার মৃত্যু এই সবকিছু ভুলে থাকার জন্য রানাঘাটের বাড়িটা বিক্রি করে মাকে নিয়ে পাকাপাকিভাবে শান্তিনিকেতনে চলে আসে শিউলি।এখানে ও একটা স্কুলে বাংলার টিচার হিসাবে জয়েন করেছে।তবুও দিনের শেষে অতীতের কথাগুলো ভেবে বুকের ভেতরটা ব্যাথা করে ওঠে ওর। চাইলেই কি সব ভুলে থাকা যায়...??শুধুমাত্র ভুলে থাকার চেষ্টা করা যায়।এইসব নানা ভাবনার মাঝে হঠাৎ করেই স্কুলের দারোয়ান এসে খবর দেয় ওর সাথে কেউ দেখা করতে এসেছে।শিউলি অবাক হয়ে ভাবে - "ওর সাথে এখানে কে দেখা করতে আসবে...?অন্তরা ছাড়া তো আর কেউ ওর এখানকার ঠিকানা জানে না!"শিউলি কিছু না বলে চুপচাপ বেরিয়ে এসে দেখে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।ছেলেটিকে চিনতে না পেরে শিউলি অবাক হয়ে বলে -"আপনি কে...?আর আমার সাথে আপনার কি দরকার...?আমিতো আপনাকে কোনোদিন দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।তাহলে...?"ছেলেটি হেসে বলে -"আপনি আমাকে চিনবেন না।আমি সৌভিক।আমি আপনাকে দেখিনি তবে একজনের মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি।তবে আজ আমি আপনার সাথে আলাপ করতে আসিনি।আপনার একটা জিনিস আমার কাছে গচ্ছিত ছিল সেটা আজ আপনাকে দিতে এসেছি।"শিউলি আরো অবাক হয়ে বলল -"আমার জিনিস...?আমার কোন জিনিস আপনার কাছে থাকবে...?"সৌভিক একটু হেসে একটা চিঠি শিউলির হাতে দিয়ে বলল -"এই চিঠিটা আপনার,দাদাভাই এটা আমাকে আপনার কাছে পৌঁছে দিতে বলেছিল।অভিককে নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে।অভিক আমার দাদা। আমি আমার দাদাভাইকে দেওয়া কথা রেখেছি।আমার দায়িত্ব এখানেই শেষ।"শিউলি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।ওর মাথায় কিছুই ঢুকছে না।শিউলি বলে ওঠে -"অভিক কোথায়...?"সৌভিক একটু চুপ করে থেকে বলল -"দাদাভাই নেই।আজ থেকে দুবছর আগে আমাদের সবাইকে ছেড়ে ও চলে গেছে।ব্লাড ক্যান্সার হয়েছিল।লাস্ট স্টেজ ছিল। কিচ্ছু করতে পারিনি আমরা।ও মারা যাওয়ার আগে আমাকে এই চিঠিটা দিয়ে বলেছিল আমি যেন এই চিঠিটা আপনার কাছে পৌঁছে দি।দাদাভাই মারা যাওয়ার পর আমি আপনার রানাঘাটের বাড়িতে গেছিলাম কিন্তু ওখানে গিয়ে শুনলাম আপনারা বাড়ি বিক্রি করে চলে গেছেন,কোথায় গেছেন কেউ জানে না।তারপর একদিন হঠাৎ করেই আপনার বন্ধু অন্তরাদির সাথে দেখা।উনি আমাকে আপনার এখানকার ঠিকানা দিলেন।আমি আসি,ভালো থাকবেন।"শিউলি সৌভিকের কথাগুলো শুনে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।মনে হচ্ছে এবার ও মাথা ঘুরে পড়ে যাবে।বারবার করে সৌভিকের কথাগুলো কানে বাজছে।অভিক আর নেই।ও সবাইকে ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছে।না এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না শিউলির।আজ আর ও ক্লাস নিতে পারবে না।সেই মানসিক শক্তি আর নেই।তাই কোনরকমে প্রিন্সিপাল ম্যামের কাছে ছুটি নিয়ে স্কুল থেকে বাড়ির পথে পা বাড়ালো শিউলি।


ঘড়িতে প্রায় রাত এগারোটা বাজে।স্কুল থেকে ফিরে বাড়িতে ঢোকার পর আর ঘর থেকে বেরোয়নি শিউলি।ওর কোলের ওপরে অভিকের চিঠিটা পড়ে আছে।বারবার করে চিঠির লেখাগুলো ওপর হাত বোলাচ্ছে।এতদিন ও এটা ভেবে মনকে সান্ত্বনা দিত যে অভিক যেখানেই আছে ভালো আছে কিন্তু মানুষটা যে আর এই পৃথিবীতেই নেই আর ও চাইলেও অভিককে দেখতে পারবে না।এটা মনে করতেই আবার কেঁদে উঠলো শিউলি।লেখাগুলোর ওপর হাত বুলিয়ে অভিককে ফিল করতে চাইছে ও।চোখের জলটা মুছে আবার ও চিঠিটা পড়া শুরু করল।


শিউলি ফুল


              কেমন আছো....?তুমি যখন আমার এই চিঠিটা হাতে পাবে তখন আমি তোমার থেকে এই পৃথিবী থেকে অনেক দূরে চলে যাবো।তাই আমি আমার মনের কিছু কথা তোমাকে বলে যেতে চাই।আমি জানি তুমি সেদিনের ব্যাবহারে অনেক কষ্ট পেয়েছো।বিশ্বাস করো আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি কিন্তু আমার তখন কিছু করার ছিল না।তুমি আমাকে ভালোবাসো এই কথাটা জানার পর আমার কতটা আনন্দ হয়েছিল তুমি জানো না।সেই প্রথমদিন ক্লাসরুমে যে মেয়েটার ভিতু ভিতু মুখটা দেখে আমি প্রেমে পড়েছিলাম সেই মেয়েটা যে আমাকে ভালোবাসে সেটা জানার পর আমার মনটা আনন্দে ভরে উঠেছিল।তুমি জানো শিউলি ফুল আমি সবসময় বাহানা খুঁজতাম তোমার সাথে কথা বলার জন্য তাই তোমাকে একা পেলেই বিরক্ত করতাম। জানো আমি তোমার সব কথা সৌভিককে বলতাম।ও বলতো আমাকে তোমাকে সব জানিয়ে দিতে।যখন ভাবলাম তোমাকে আমার মনের কথাটা বলব তখন আমি একদিন হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়লাম।আগে মাঝে মাঝেই আমার জ্বর আসতো কিন্তু সেইবার খুব বাড়াবাড়ি হয়ে যায়।তখন সব টেস্ট করে জানতে পারি আমার ব্লাডক্যান্সার হয়েছে।বিশ্বাস করো সেইদিন সারারাত আমি খুব কেঁদেছিলাম।আমি কি করে থাকবো মা,বাবা,ভাই, তোমাকে ছাড়া...।হ্যাঁ,শিউলি ফুল আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম।আর সবার মতন করে বাঁচতে চেয়েছিলাম।কিন্তু ভগবান অন্য কিছু চেয়েছিলেন ।তাইতো আমাকে অল্প দিনের অতিথি করে পাঠিয়েছিল।তুমি যখন আমাকে তোমার মনের কথাটা জানালে আমি তখন আমার ইমোশনকে কন্ট্রোল করে নিয়েছিলাম।তাই লাস্ট পরীক্ষার দিন তুমি আসার আগেই আমি কলেজ থেকে বেরিয়ে গেছিলাম।পালিয়ে গেছিলাম আমি তোমার কাছ থেকে অনেক দূরে।আমি এখন ব্যাঙ্গালোরে একটা নার্সিংহোমে ভর্তি।আমি চাইনি আসতে কিন্তু মা, বাবা, ভাই জোর করে এখানে নিয়ে এলো।তোমার কথা খুব মনে পড়ে শিউলি ফুল।আমাদের দুজনের একটা সুন্দর ছোট্ট জগৎ হতে পারতো।কিন্তু হলো না। জানো এই নার্সিংহোমের বেডে শুয়ে শুয়ে আমি বাইরের জানালা দিয়ে আকাশ দেখি।কিছুদিন পর ওটাই তো আমার ঠিকানা হবে।শিউলি ফুল তুমি কাঁদছো না...???একদম কাঁদবে না বুঝেছো।আমি তোমার চোখের জল একদম সহ্য করতে পারি না।আমার শিউলি ফুল খুব শক্ত মনের মেয়ে আমি জানি।আমরাতো দুজন-দুজনকে নিঃশব্দে ভালোবেসেছি।আমি সবসময় তোমার পাশে আছি।আমাকে তুমি সবসময় ফিল করতে পারবে।সামনের জন্মে আমরা দুজনে এক হবো।কথা দিলাম তোমাকে।আমাদের দুজনের নিজেদের একটা ছোট্ট জগৎ হবে।তখন আমরা দুজনে একসাথে বলবো - 


"দুজনে মিলে হেঁটে যাবো,

কোনো এক বসন্তে

ঘাসের শিশিরে ছোঁবো মোরা দুজন,

ভুলবো না কভু এই আমাদের ভুবন।।"


ভালো থেকো।মনকে শক্ত করে সামনের দিকে এগিয়ে যাও।


                         তোমার অভীক


চিঠিটা পড়ে শিউলি আবার কেঁদে উঠলো।জানলার কাছে এসে আকাশের দিকে তাকিয়ে শিউলি বলল - "তুমি খুব স্বার্থপর অভীক।তোমার শিউলি ফুলকে একা ফেলে কিভাবে চলে যেতে পারলে...??? কেন অভীক...???কেন...???শিউলি মাথাটা জানলার গ্রিলে ঠেকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো।ওদের গল্পটা অসমাপ্ত থেকে গেল।দুজন মানুষ একে অপরকে ভালোবেসেও নিয়তির করুণ পরিহাসে আজ একে অপরের থেকে আলাদা। চাইলেও তারা এই জীবনে আর কখনো এক হতে পারবে না।ওদের ভালোবাসার নিঃশব্দ কান্নার সাক্ষী হয়ে রইল আকাশের উজ্জ্বল চাঁদটা।।


                    

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)