এসব কবে লিখেছিলাম? 😅😅
গল্প---
সরকারি চাকরি
মিলন পুরকাইত
-"তা কি করো বাবা তুমি ? " অচিন্ত্যবাবু জিজ্ঞেস করলেন ।
-"আমি ইনফোসিস এ চাকরি করি । " নম্রভাবে উত্তর দিলো বিপ্লব ।
অচিন্ত্যবাবু মুখে "চুক" করে একটা শব্দ করে বললেন -"ও বাবা । ইনফোসিস ? ওটা তো
প্রাইভেট । "
-"হ্যা কাকু ওটা প্রাইভেট । কিন্তু মাইনে ঠিকঠাকই দেয় বেশ ।" বিপ্লব বললো ।
অচিন্ত্যবাবু -"না না সে বুঝলাম যে তুমি মাইনে ভালোই পাও । কিন্তু বাবা , ওটা তো
গভর্নমেন্ট জব নয় তাই না ? "
বিপ্লব -"কাকু একদম চিন্তা করবেন না । প্রাইভেট হলেও আপনার মেয়ে আমার সাথে বেশ
আনন্দেই থাকবে । কোনো অসুবিধা হবে না । যথেষ্ট ভালো মাইনে দেয় আমায় আমার কোম্পানি
। বিশ্বাস করুন । "
অচিন্ত্যবাবু -"আরে সব বুঝলাম বাবা তোমার সব কথাই মানলাম । কিন্তু সরকারি চাকরির
তো একটা আলাদা ব্যপার থাকে তাই না ? কোম্পানির চাকরিতে কি আছে ? আজ আছে কাল হয়তো
তোমায় ছেঁটে ফেললো । কি নিশ্চয়তা আছে যে তোমায় কাল ছেঁটে ফেলবে না ? তখন কি হবে
বলো তো আমার মেয়েটার ? "
বিপ্লব -"ওহ । তাহলে সমস্যা এখানে । তা আপনার মেয়ে কি চায় ? "
অচিন্ত্যবাবু -"সে তো আমি যা বলবো তাই করবে । আর তাছাড়া আমার এক চেনা একজন সরকারি
চাকরি করা ছেলের খোঁজও দিয়েছে । ছেলে ইঞ্জিনিয়ার রেলের । জানো তো ? "
বিপ্লব -"বেশ । তা রিমা , তুমিও সরকারি চাকরি করা ছেলেকেই বিয়ে করতে চাও তাই তো ?
দুঃখের বিষয় , তিন বছর ধরে প্রেম করার সময় এটা বলতে পারলে না । " বলে
অপমানিত, বিষন্ন হয়ে রাগে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো সে ।
বাইরে বেরিয়ে ফোন করলো বিপ্লব ।
-"হয়ে গেলো ভাই আমার প্রেম করে বিয়ে । মেয়ের বাবা সরকারি চাকরি করা ছেলের সাথে
মেয়ের বিয়ে দেবে । হায় কপাল আমার , তিন বছর ধরে মেয়েটা আমার সাথে প্রেম ভালোবাসার
নাটক করে গেলো তখন মনে ছিলোনা একবারও যে বর সরকারি চাকরি করাই লাগবে । " বলতে
বলতে কেঁদে ফেললো বিপ্লব ।
ঘটনার প্রায় এক বছর পর , রিমার বিয়ের তোড়জোড় চলছে । পাত্র ঋষভ , রেলের ইঞ্জিনিয়ার
। বিপ্লব আর ওইদিনের পর রিমার সাথে যোগাযোগ করেনি । অচিন্ত্যবাবু নিজে সরকারি
চাকরি করতেন , জানেন সরকারি চাকরিতে জীবন কতো সুন্দর হতে পারে । নিজের মেয়ের জীবন
সুরক্ষিত করতে সরকারি চাকরি করা পাত্রই তার পছন্দ ছিলো আজীবন । সে যাই হোক ,
বিপ্লবের কথা আর এই বাড়িতে ওঠে না । রিমাও ব্যস্ত নিজের বিয়ে নিয়ে । এমন সময় ঋষভ
ফোন করলো রিমাকে -"বলছি যে , আজ কোথাও কোনো রেস্তোঁরাতে দেখা করা যায় ? "
রিমা -"সামনের মাসে বিয়ে । বাবা এতো তাড়া কিসের বস ? হুহু বাওয়া । "
ঋষভ -"আরে না না আমি চাই আমরা দুই ফ্যামিলি একটু একসাথে সময় কাটাই বিয়ের আগে ।
একটু নিজেদের মধ্যে সম্পর্কটা আরো মজবুত হবে । তুমি তোমার মা বাবাকে নিয়ে তবে চলে
এসো শ্যামবাজার এর দিকে । ওই সন্ধ্যে নাগাদ । আমিও আসছি । "
অতএব সন্ধ্যে বেলায় দুই পরিবার একসাথে দেখা করলো । খাবার টেবিলে দুই পরিবারের
আড্ডা শুরু হলো । খাবার অর্ডার হলো । খাবার এলো এবং খাওয়াদাওয়া শুরু হলো । এমন
সময় যেনো টেবিলে বিষ্ফোরণ ঘটলো । ঋষভ বললো -"কাকু , কিছু বলার ছিলো আপনাকে । "
অচিন্ত্যবাবু -"হ্যা বলো না বাবা । "
ঋষভ -"আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে পারবো না । "
রিমার হাত থেকে বিরিয়ানির দানা গুলো ঝুপ করে থালায় পড়ে গেলো । অচিন্ত্যবাবু
চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে পড়লেন ঋষভ এর দিকে । জিজ্ঞেস করলেন -"মা..মা... মানে কি
বলছো বাবা ? " রিমার মা এর মুখে কোনো কথা নেই যেনো মূর্তি হয়ে বসে আছেন ।
ঋষভ উত্তর দিলো -"দেখুন কাকু , আমি করি সরকারি চাকরি । তাই না ? মানে ভাবতে
পারছেন তো ? জেনারেল কাস্ট হয়ে সরকারি চাকরি করছি মানে বুঝতেই পারছেন... আর
আপনার মেয়ে কিছুই করেনা । তো কোন দিক দিয়ে আপনার মেয়ে আমার যোগ্য বলুন তো ? না না
। আমি বাপু সরকারি চাকরিওয়ালা মেয়ে পছন্দ করি । সেই দিক থেকে দেখলে আপনার মেয়ে
প্রাইভেট চাকরিও দুর , বেকার একদম বলতে গেলে । "
রাগে চোখমুখ লাল অচিন্ত্যবাবুর ॥ চেয়ার ছেড়ে উঠে কলার চেপে ধরলো ঋষভ এর । চেঁচিয়ে
উঠলো -"একটা ফোর টোয়েন্টি ছেলে । চিটার একটা । একবছর ধরে আমাদের কথাবার্তা চলছে
আর তোর এখন মনে পড়লো আমার মেয়ের সাথে বিয়ে করা যাবেনা কারণ আমার মেয়ে চাকরি করেনা
? "
গোটা হোটেলে হইচই লেগে গেলো । আশেপাশের লোকজন নিজের খাওয়া বন্ধ করে তাকিয়ে রইলেন
তাদের দিকে । হোটেলের কর্মীরা এসে দুই পক্ষকে শান্ত করানোর জন্য এগিয়ে এলেন । এমন
সময় একটা চেনা আওয়াজ এলো ।
-"কেনো কাকু ? একবছর তো অনেক কম । কেউ কেউ তিন বছর পরে বললেও দোষ হয় নাকি ? "
চমকে উঠলো রিমা । চমকে উঠলেন অচিন্ত্যবাবু ।
-"তু..তুমি ? বিপ্লব ? "
-"হ্যা আমি । আপনার মেয়ের সরকারি চাকরি না করা প্রেমিক । তাও তিন বছরের । "
অচিন্ত্যবাবু রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন -"তারমানে তোমরা .... তোমরা বন্ধু ? তোমরা
সব প্ল্যান করে..."
ঋষভ -"কেনো ? আপনি এবং আপনার মেয়ে কোনো ছেলের ফিলিংস নিয়ে খেলতে পারেন । সেটা
অন্যায় নয় ? এতো যে সরকারি চাকরি সরকারি চাকরি করে লাফালেন , নিজেও তো সরকারি
চাকরি করেছেন , নিজের মেয়েকে সরকারি চাকরি পাওয়ার যোগ্য করে তুলতে পারলেন না কেনো
? অন্যের সরকারি চাকরি করা সন্তানের প্রতি খুব লোভ তাই না ? আপনার মতো বাবা এবং
এই যে একটা নচ্ছার মেয়ের জন্ম দিয়েছেন যার কিনা নিজের ভালোবাসাকে পরিবারের সামনে
স্বীকার করার সৎ সাহস নেই তেমন মেয়ের সাথে এমনটাই হওয়া উচিৎ । আমি এমন পরিবারের
সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে চাইনা যারা মানুষের চাকরি দেখে তাদের মূল্য ঠিক করে
। সব প্ল্যান ছিলো । বিপ্লব আমার ছোটোবেলার বন্ধু । যদিও আমাদের বন্ধুত্ব আপনার
মতো লোক বুঝবে কিভাবে ? শুনুন তবে , আমরা এখনও একসাথে বাথরুম করলে ইয়ে ধরে
কাটাকুটি খেলি এমন বন্ধুত্ব আমাদের । ছোটোবেলায় একটা ছেলে ক্লাসে ওর জলের
বোতল দিয়ে ওকেই মেরেছিলো , স্কুল থেকে বেরিয়ে ওকে এমন কেলিয়েছিলাম না , পরদিন
নিজে একটা বোতল কিনে এনে ওকে ফেরত দেয় । ভাবুন , ওই সামান্য ব্যপারে যদি আমি
অতোটা করতে পারি তো আপনাদের সাথে এতোটা করবো এটাতো স্বাভাবিক । শালা নিজের
পড়াশোনার চক্করে ওর প্রেম চলাকালীন আপনার মেয়ের সাথে দেখা হয়নি । নইলে তখনই আটকে
দিতাম । আর হ্যা , আমার বিয়ে ? হ্যা । সে তো হবেই । বিয়ে আমার হবেই । আমার
প্রেমিকার সাথে । যার সাথে আমার প্রায় আট বছরের সম্পর্ক । যে তখনও আমার সাথে ছিলো
যখন আমার কাছে কিছুই ছিলো না । আর এখন , যখন আমার কাছে অনেক কিছুই আছে তখনও সেই
আমার সাথে থাকবে । ঋতু । আমার প্রেমিকা । সে আপনার মেয়ের মতো নয় । সে চাকরি দেখে
মানুষ মাপে না । আর হ্যা আর একটা কথা শুনুন অচিন্ত্যবাবু , যেই কথাটা আমি
সেই দিন থেকে বলবো ভাবছিলাম যেদিন থেকে আপনার এসব কীর্তি শুনলাম । কথাটা হচ্ছে যে
, ভাগ বুড়ো । "
মিলন পুরকাইত

