অভিনয় | মিলন পুরকাইত

0

অভিনয়

মিলন পুরকাইত 



সন্ধ্যের দিকে বসার ঘরে বসে একা টেলিভিশনে খবরের চ্যানেল দেখছিলেন হিতেন বসাক। এমন সময় ডোরবেল বেজে উঠল। হিতেনবাবুর চাকর শান্তিরাম গিয়ে দরজা খুলে দিল। স্থানীয় থানার ওসি শিবশঙ্কর পাইক তখন বাইরে দাঁড়িয়ে। শিবশঙ্কর পাইকের সঙ্গে হিতেনবাবুর ভালোই খাতির রয়েছে। শিবশঙ্কর পাইকের এই বাড়িতে আগে থেকেই যাতায়াত রয়েছে। তাই শান্তিরাম দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে শিবশঙ্করকে ঘরে ঢোকার সুযোগ করে দিল। শিবশঙ্কর পুলিশের উর্দিতেই এসেছেন, তিনি ঘরে ঢুকেই শান্তিরামকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হিতেনবাবু কোথায়?’

শান্তিরাম উত্তর দিল, ‘বাবু ওই বসার ঘরে বসে টিভি দেখছেন। আপনি আসুন আমার সঙ্গে’।

শান্তিরাম অফিসার শিবশঙ্কর পাইককে নিয়ে বসার ঘরে এলেন, শিবশঙ্করকে দেখেই হিতেনবাবু টিভিটা হাতের রিমোট টিপে অফ করে দিয়ে তাকে আপ্যায়ন করে বললেন, ‘আরে শিবশঙ্কর যে, এসো এসো, অনেকদিন পর এলে, তা আজ কি পথ ভুলে না কি?’

শান্তিরাম শিবশঙ্করকে বসার চেয়ার দেখিয়ে দিয়ে নিজে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। শিবশঙ্কর হাতল দেওয়া বেতের গোল চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, ‘কাজের চাপে আর আসা হয়ে ওঠে না, তবে আজও কিন্তু একটা বিশেষ দরকারেই আমি আপনার কাছে এসেছি’।

হিতেন বসাক নিজের চেয়ারে ভালো করে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বলো’।

শিবশঙ্কর পাইক বললেন, ‘খবরটা শুনেছেন নিশ্চয়ই’।

‘কোন খবর?’ বেশ অবাক হলেন হিতেন বসাক।

শিবশঙ্কর পাইক আর ভনিতা করলেন না, সরাসরি বললেন, ‘বটুকেশ্বর মন্ডল গতরাতে মারা গেছেন, অবশ্য মারা গেছেন না বলে খুন হয়েছেন বলাই ভালো’।

হিতেন বসাক সোজা হয়ে বসে বললেন, ‘সে কি? এই খবরটা তো জানতাম না। অবশ্য আজ সারাদিন আমি খবরের কাগজ দেখিনি। একটু আগেই নিউজ চ্যানেল চালিয়েছিলাম। রাহ্যের খবর দেখাতে দেখাতেই তুমি এসে পড়লে, স্থানীয় খবর আর দেখা হয়নি। কিভাবে খুন হয়েছে? খুনি কে?’

শিবশঙ্কর পাইক একটু হাল্কা হাসি হেসে বলল, ‘আজ সকালেই খবর পেয়ে অকুস্থলে যাই, এই কেসের তদন্ত আমি নিজেই করছি, আর সেইজন্যই আপনার কাছে আসা’।

হিতেন বসাক আরও অবাক হয়ে বললেন, ‘বটুকেশ্বর মন্ডল যে খুন হয়েছে আই জানতাম না, তা আমি কিভাবে তোমাকে এই কেসে সাহায্য করতে পারি?’

কথার মাঝেই শান্তিরাম ঘরে এসে একটা ট্রেতে করে দু’কাপ চা আর বিস্কুট ঘরের মাঝে থাকা একটা টি টেবিলে রাখল। দুজনেই চায়ের কাপ ট্রে থেকে তুলে নিলেন, তবে শিবশঙ্কর বিস্কুট নিলেন না।

শিবশঙ্কর বললেন, ‘খুনটা করা হয়েছে বেশ নৃশংসভাবেই। লাশটা পড়ে ছিল পালেদের পুকুরের পাশে যে কাঁটা ঝোঁপ রয়েছে তার মাঝে। বডির সর্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত, সেটা বোধহয় কাঁটাঝোপের মধ্যে দেহটা পড়ায় হয়েছে, তবে মৃত্যুটা হয়েছে কোনও ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলার নলিটা কেটে দেওয়ায়। এই একটু আগেই প্রাইমারি পোস্টমর্টেম রিপোর্ট একটা পেলাম, আনুমানিক রাত বারোটা বা তার কিছু পড়ে খুনটা করা হয়েছে’।

‘হুমমম’, মুখ দিয়ে আওয়াজ বের করলেন হিতেন বিশ্বাস।

শিবশঙ্কর পাইক এবার সরাসরি প্রশ্নে এসে গেলেন, ‘গতকাল রাতে আপনি কোথায় ছিলেন?’

হিতেন বসাক চায়ের কাপে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে কিছুটা আড়চোখে শিবশঙ্করের দিকে তাকালেন, তারপর বললেন, ‘রাতে রিহার্সাল থেকে ফিরতে একটু দেরী হয়ে গিয়েছিল। আগামী সপ্তাহে আমাদের ইচ্ছেপূরণ নাট্যগোষ্ঠীর একটা বড় শো আছে, অনেকদিন পর একটা সামাজিক অপরাধমূলক নাটক মঞ্চস্থ করতে চলেছি, তাই রিহার্সাল এখন বেশ তোড়েজোরেই চলছে। রিহার্সাল শেষ হয় প্রায় রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ আর আমি বাড়ি ঢুকি প্রায় সোয়া বারোটা নাগাদ’।

শিবশঙ্কর নিজের চা’টা শেষ করে চায়ের কাপ টেবিলে নামিয়ে রেখে বললেন, ‘আপনাদের রিহার্সাল তো মণিমেলার ক্লাবঘরে হয়, তা ওখান থেকে বাড়ি আসতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট লেগে গেল? অথচ পথ তো পনেরো মিনিটের বেশী হাঁটা পথ নয়’।

হিতেন বসাক আবার হেসে বললেন, ‘আরে মহড়া শেষ হলেই কি সঙ্গে সঙ্গে বেরনো যায়? তাছাড়া অনেকের অনেক রকম প্রশ্ন থাকে, কাউকে কাউকে বোঝাতে হয় কিভাবে আরও ভালো পারফর্ম করতে হয়, অনেক এরেঞ্জমেন্টের ব্যাপার থাকে। ক্লাবঘর বন্ধ করার পরও মণিমেলার মাঠে অনেকরকমের কথাবার্তা শেষ করে তারপর বেরোতে হয়। তাই রাত সাড়ে এগারোটাতে রিহার্সাল শেষ হলেও বেরোতে বেরোতে প্রায় বারোটাই বেজে গিয়েছিল’।

শিবশঙ্কর পাইক এবার হিতেন বসাকের চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘কিন্তু রিক্সাওয়ালা চরণ যে বলছে সে রাত বারোটার আশেপাশে আপনাকে পালেদের পুকুরের কাছে পূরবী বিল্ডিং-এর সামনে গতরাতে হেঁটে বাড়ির দিকে আসতে দেখেছে?’

হিতেন বসাক একটু শরীর কাঁপিয়ে হেসে উঠে বললেন, ‘চরণকে আমিও দেখেছি। ব্যাটা স্টেশনের দিকে যে দেশী মদের ঠেক আছে সেখানে রোজরাতে নেশা করে, গতরাতেও নেশা করে রিক্সা টানছিল। তবে চরণের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে বারোটা বেজে দশ মিনিট নাগাদ। আমি মণিমেলার মাঠ থেকে যখন বেরোই তখন বারোটা বেজে গেছে আর পূরবী বিল্ডিং-এর সামনে যখন পৌছাই তখন বাজে রাত বারোটা বেজে দশ মিনিট। আমাদের রিহার্সালের গোটা গ্রুপ রাত বারোটা পর্যন্ত মণিমেলার মাঠেই ছিল। তুমি আমাদের ইচ্ছেপূরণ নাট্যগোষ্ঠীর যে কাউকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারো। চরণ কি বলবে? সে তখন নিজেই নেশায় বুঁদ হয়ে রয়েছে। আচ্ছা তুমি আমাকে এত প্রশ্ন করছ কেন বল তো? তুমি কি আমাকে বটুকের খুনি বলে সন্দেহ করছ? কিন্তু আমি শুধুশুধু বটুকেশ্বর মন্ডলকে খুন করতে যাবো কেন?’

শিবশঙ্কর একইভাবে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘আমাদের কাজই সন্দেহ করা, সেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের উর্দ্ধে উঠতে হয়। আপনি বলেই আমি আপনার বাড়ি এসে জিজ্ঞাসাবাদ করছি, আপনার জায়গায় অন্য কেউ হলে থানায় ডেকে পাঠাতাম। এনিওয়ে, আপনি হয়ত ভুলে গেছেন কয়েকমাস আগে জীবানন্দ হলে আপনাদের একটা শো-এর পর আপনার সাথে বটুকেশ্বর মন্ডলের ঝগড়াও হয়েছিল এমনকি আপনি তাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দিয়েছিলেন প্রকাশ্যেই’।

হিতেন বসাক ঘটনাটা মনে করার চেষ্টা করলেন, তারপর বললেন, ‘ও ইয়েস মনে পড়েছে, বিচ্ছিরি কান্ড। বটুকেশ্বর মন্ডল লোকটা যে কত জঘন্য সেটা সেইদিনই প্রথম বুঝি। আমাদের গ্রুপে তিয়াস নামে একটি মেয়ে রয়েছে। ভালোই অভিনয় করে। মেয়েটি কলেজ স্টুডেন্ট। বটুক মন্ডল বয়সে হাঁটুর বয়সী সেই মেয়েটিকে উত্যক্ত করছিল সেসময়। এমনকি সবার সামনে মেয়েটিকে ফিজিক্যালি টাচ করে......বিচ্ছিরি ব্যাপার। প্রচন্ড রেগে গিয়েছিলাম। তখনই বটুকেশ্বরের সঙ্গে আমার বচসা বাধে, রাগের মাথায় অনেক কিছুই বলেছি, সব মনেও নেই। তবে সেসব রাগের কথা, তুমি বললে বলে মনে পড়ল, নইলে ভুলেও গিয়েছিলাম’।

শিবশঙ্কর মাথাটা নাড়লেন। ঠিক সেই সময়েই আবার ডোরবেল বেজে উঠল। শান্তিরাম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দরজা খুলতে গেল। একটু পরেই শান্তিরামের পেছন পেছন দুটো অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে হিতেন বসাকের বসার ঘরে এসে ঢুকল। তারা শিবশঙ্কর পাইককে বসে থাকতে দেখে অবাক তো হলই কিছুটা যেন ঘাবড়েও গেল। হিতেন বসাক তাদের দিকে হাত তুলে দুটো চেয়ার দেখিয়ে তাদের বসতে বলে বললেন, ‘এস সৌরভ, এস তিয়াস, বোসো, এই যে আমাদের লোকাল থানার ইনচার্জ অফিসার শিবশঙ্কর পাইক। আমার সঙ্গে অনেকদিনের পরিচয়। আচ্ছা তোমরা কি কেউ জানো যে সেই বাজে লোকটা, সেই যে বটুকেশ্বর মন্ডল, সে নাকি গতকাল খুন হয়েছে, আমি তো শিবশঙ্করের মুখেই প্রথম শুনলাম’।

সৌরভ আর তিয়াস দুজনেই মাথা নেড়ে জানালো তারা এবিষয়ে কিছু জানে না।

হিতেন বসাক আবার বললেন, ‘শিবশঙ্কর সন্দেহ করছে আমি হয়ত বা বটুকেশ্বর মন্ডলকে খুন করে থাকতে পারি। তিয়াস এই লোকটাই তো সেবার জীবানন্দ হলে তোমাকে বিরক্ত করেছিল? আমার সঙ্গে তখনই ঝগড়া হয়। তা তোমরা ওসি সাহেবকে জানাও যে আমরা কাল কখন মণিমেলার মাঠ থেকে ফাইনালি বেরিয়েছিলাম’।

সৌরভ বলল, ‘রিহার্সাল শেষ হয়ে গিয়েছিল সাড়ে এগারোটা নাগাদ, কিন্তু সবকিছু গুটিয়ে ফাইনালি আমরা রাত বারোটা নাগাদ ওখান থেকে রওনা দিই’।

শিবশঙ্কর এবার তিয়াসের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমাকে বিরক্ত করত বটুকেশ্বর মন্ডল?’

তিয়াস মাথা নীচু করে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো।

‘পুলিশে জানাওনি কেন?’ জানতে চাইলেন শিবশঙ্কর।

তিয়াস ঈষৎ মাথাটা তুলে বলল, ‘আমাকে শাসিয়েছিল, আমি বা আমার বাড়ির কেউ যদি এই নিয়ে থানা পুলিশ করি, তাহলে ও আমাকে আর আমার ছোট বোনকে......’

কথা শেষ করতে পারল না তিয়াস। তার চোখে জল এল, গলা কান্নায় ভিজে এল’।

‘কখনও মনে হয়নি এমন একটা লোককে যদি দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়...’ আবারও প্রশ্ন করলেন শিবশঙ্কর।

তিয়াস উত্তর দিতে পারল না, হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল।

হিতেন বসাক বললেন, ‘ওকে দেখছ তো? এই মেয়ে কখনও খুন খারাপি করতে পারে? দেখ শিবশঙ্কর, আমি একটা কথা বলি, বটুকেশ্বর মন্ডলের টাকা ছিল, রাজনৈতিক শক্তি ছিল, এসবের জেরে সে যা ইচ্ছে তাই করে বেরাতে পারে বলে মনে করত। এর ফলে ওই লোক কম শত্রু তৈরি করেনি। তাছাড়া তোমরা হয়ত ভালোই জানো যে তার কাজ-কারবার সব সাদা বা সৎ পথের ছিল না। এখন এসব ক্ষেত্রে কোনও খুনি গুন্ডার সঙ্গে শত্রুতা করে হয়ত সে নিজেই নিজের মরার ফাঁদ তৈরি করে ফেলেছিল। দেখ আমরা সাধারণ মানুষ। রাগের মাথায় অনেক কথা বলে ফেলি, কিন্তু খুন করা একটা বিরাট কঠিন কাজ। ওসব আমরা একমাত্র মঞ্চেই করতে পারি, অভিনয়ে, বাস্তবে খুনটুন করা আমাদের কম্ম নয়। দেখ যে কোনও পেশাদার খুনিই হয়ত কাজটা করেছে’।

শিবশঙ্কর তাও একবার তিয়াসের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি থাকো কোথায়?’

তিয়াস জবাব দিল, ‘পালপাড়ায়’।

শিবশঙ্কর বললেন, ‘তার মানে তুমিও গতরাতে পূরবী এপার্টমেন্টের সামনে দিয়েই ফিরেছিলে?’

তিয়াস কিছু বলার আগেই সৌরভ বলল, ‘স্যার আমিও ওদিকেই থাকি, তিয়াসের মা আমাকে বলে দিয়েছেন যে রিহার্সালে রাত হয়ে গেলে আমি যেন তিয়াসকে বাড়ি পৌছে দিই। আমি তিয়াসকে বাড়ি পৌছে দিয়েই তারপর নিজে বাড়ি ফিরেছি’।

শিবশঙ্কর বললেন, ‘তাহলে তোমরা একই পথে ফেরা সত্ত্বেও হিতেনবাবুর সাথে একসাথে ফিরলে না কেন?’

এবারে হিতেন বিশ্বাস আবার বললেন, ‘মণিমেলার মাঠ থেকে আমরা একসাথেই বেরিয়েছিলাম। আমাদের সঙ্গে একটা ব্যানার ছিল। ওটা রেপ্লিকা করার জন্য আজ সকালেই আমাদের গ্রুপের আরেক সদস্য প্রকাশের দোকানে নিয়ে যাবার কথা ছিল। তাই মণিমেলার মাঠের কাছেই প্রকাশের বাড়িতে আমি ব্যানারটা রেখে ওকে বিষয়টা বুঝিয়ে আসতে গিয়েছিলাম। প্রকাশ গতকাল রিহার্সালে আসেনি, ও এক আত্মীয়ের বিয়েতে গিয়েছিল, ফিরতে রাত হবে বলে আর রিহার্সলে আসেনি। আমি প্রকাশের বাড়ি গিয়ে ব্যানারটা ওকে দিয়েই বেরিয়ে আসি কিন্তু তার আগে সৌরভ আর তিয়াসকে বলেছিলাম যে রাত হয়ে যাচ্ছে ওরা যেন এগিয়ে যায়, কারণ তিয়াসের মা ওর জন্য খুব চিন্তা করেন’।

শিবশঙ্কর তাও সৌরভ আর তিয়াসের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমরা আজ এখানে এসেছ কেন?’

সৌরভ বলল, ‘হিতেন স্যারই আমাদের ডেকেছেন। স্ক্রিপ্ট-এ কয়েক জায়গায় একটু অদল-বদল হবে, প্রকাশেরও আসার কথা আছে ব্যানার নিয়ে, আমাদের গ্রুপের আরও কয়েকজনও আসবে, সামনের শো-এর ব্যাপারে কিছু আলোচনা আছে’। সৌরভ কথা শেষ করতেই আবার ডোরবেল বেজে উঠল। শান্তিরাম গিয়ে দরজা খুলতেই একটু পরেই তার পেছন পেছন বেশ মোটাসোটা চেহারার একটি অল্পবয়সী ছেলে একটা পাকানো ব্যানার নিয়ে হিতেন বসাকের বসার ঘরে এসে ঢুকল। তাকে দেখেই সৌরভ বলে উঠল, ‘ওই যে স্যার প্রকাশ এসে গেছে ব্যানার নিয়ে’।

প্রকাশ ঘরে ঢুকে পুলিশ দেখে একটু থমকে গেল। শিবশঙ্কর হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘দেখি ব্যানারটা’। প্রকাশ পাকানো ব্যানারটা এগিয়ে দিল শিবশঙ্কর পাইকের দিকে। শিবশঙ্কর ব্যানারটা খুলে ভালো করে দেখলেন, তারপর বললেন, ‘বাঃ, বেশ হয়েছে’। তারপরই ঘরে উপস্থিত সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বললেন, ‘সবকিছুই একদম পারফেক্ট। যে যে সন্দেহ আর যে যে প্রশ্ন নিয়ে আমি এখানে এসেছিলাম তার সবকটারই সদ্যুত্তর যেন আগে থেকেই তৈরি করাই ছিল। ইটস টু পারফেক্ট। যাইহোক, আইন চলে প্রমাণের পথে। প্রমাণ যতক্ষণ না পাওয়া যাচ্ছে ততক্ষণ কেউ দোষী নয়, আর প্রমাণ পাওয়া গেলে অপরাধী আর নির্দোষ থাকতে পারে না। বটুকেশ্বর মন্ডল যে নেহাত বাজে লোক তাতে সন্দেহ নেই। আমি নিজেও বেশ কয়েকবার বেশ কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে লোকটাকে ধরতে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছি। কারণ তার বিরুদ্ধে কিছু প্রমাণ করতে পারিনি। তাই সে নির্দোষ সাব্যস্ত থেকে গেছে দোষ করেও। তাই প্রমাণ না থাকলে তার খুনিও কোনওদিন দোষী সাব্যস্ত হবে না। আর আমার মনে হচ্ছে সেরকম কোনও প্রমাণ হয়ত পাওয়া যাবে না। যাইহোক ইউ অল টেক কেয়ার, আমি তাহলে এখন আসি’।

শিবশঙ্কর পাইকের অর্থপূর্ণ হাসির দিকে তাকিয়ে হিতেন বিশ্বাসও একটা পাল্টা অর্থপূর্ণ হাসি হেসে বললেন, ‘আই এম ইন ডিড এ পারফেকসনিস্ট অফিসার’।

‘গুড নাইট’, বলে শিবশঙ্কর পাইক ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

হিতেন বসাক চেয়ার ছেড়ে উঠে সৌরভকে পাশের ঘরে আসতে বললেন। হিতেন বসাকের পেছন পেছন সৌরভ পাশের ঘরে এল। হিতেন বসাক ঘরের দরজা বন্ধ করতেই সৌরভ ছুটে এসে তাকে প্রণাম করে বলল, ‘পুলিশ দেখে আমি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম স্যার। কিন্তু আপনি এত স্বাভাবিক কিভাবে থাকলেন?’

হিতেন বসাক একটু হেসে বললেন, ‘সেটাই তো আসল অভিনয়। বাস্তব জীবনেও অভিনয়টাকে নিখুঁত করে তোলা যায়। তবে কাজটা তুমি ভালো করনি সৌরভ। তোমার উচিত ছিল আমাকে জানানো’।

সৌরভ বলল, ‘স্যার, আপনি তো জানেনই তিয়াস আমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ওই লোকটা ওর জীবনটাকে নরক বানিয়ে তুলেছিল স্যার। বলেছিল ওকে জোর করে তুলে নিয়ে যাবে, ওর বোনকেও তুলে নিয়ে গিয়ে আরব দেশের কোনও শেখের কাছে বেচে দেবে। আপনি লক্ষ্য করেননি স্যার, তিয়াস হাসতে ভুলে গিয়েছিল। আমি ওর আর ওর মায়ের চিন্তিত মুখের দিকে আর তাকাতে পারছিলাম না স্যার। পুলিশ-প্রশাসন কেউ কিছু করতে পারেনি স্যার। তিয়াস আমাকে বলেছিল ওই নোংরা লোকটার শয্যাসঙ্গিনী হওয়ার থেকে ও গলায় দড়ি দেবে। আমার কাছে এরপর আর কোনও পথ ছিল না স্যার। তাই গতকাল রিহার্সালের মধ্যেই তিয়াসের মোবাইল থেকে আমি ওই লোকটাকে মেসেজ পাঠিয়েছিলাম রাত বারোটার সময় ওই পালপুকুরের ওখানে আসতে। জায়গাটা নির্জন থাকে। আমি জানতাম তিয়াস যদি ওকে একা আসতে বলে তাহলে শয়তানটা একাই আসবে। তিয়াসকে তাই ওর বাড়ি পৌছে দিয়ে আমি ওখানে যাই। দেখি লোকটা এসে গেছে। আমার দিকে পিছন ফিরে ছিল বলে আমার সুবিধে হয়। গ্লাভস পরা হাতে পেছন থেকে লোকটাকে জাপটে ধরে ওর গলার নলিটা কেটে দিই আর ঠিক তখনই আপনি ওখানে আমাকে দেখে ফেলেন’।

হিতেন বসাক বললেন, ‘ভাগ্যিস দেখেছিলাম। মহড়ার সময়েই তোমার হাতে আমি তিয়াসের মোবাইল দেখেছিলাম। তারপর ক্লাবঘর থেকে বেরনোর সময় তোমার ব্যাগে থাকা গ্লাভস আর ছুরিও আমি দেখে ফেলেছিলাম। পূরবী বিল্ডিং পেরোবার সময় দেখি চরণ তার রিক্সা নিয়ে আসছে। নেশাগ্রস্ত অবস্থায়, সে রিক্সা নিয়ে কোনদিকে যায় দেখতে পিছন ফিরতেই দেখি তুমি তিয়াসদের বাড়ির গলি থেকে বেরিয়ে পুকুরের দিকে যাচ্ছ। আমি তখনই তোমার পিছু নেই, কিন্তু অকুস্থলে পৌছতে আমার দেরী হয়ে যায়। ততক্ষণে তুমি বটুকেশ্বরকে মেরে ফেলেছ। আমি আগে পৌছালে এ কাজ তোমায় করতে দিতাম না। যেহেতু তিয়াসের মত সরল নিষ্পাপ মেয়েকে রক্ষা করার জন্যই তুমি এ কাজ করেছ তাই আমি তোমার কোনও ক্ষতি হতে দেব না। সেইজন্যই ওই মার্ডার ওয়েপন ছুরি আর বটুকেশ্বরের মোবাইল আমি এমনভাবে সরিয়ে দিয়েছি যে পুলিশ আর তার নাগাল পাবে না, আশা করি তুমিও তিয়াসের মোবাইল থেকে তোমার বটুককে করা মেসেজটা ডিলিট করে দিয়েছ। তাতে তোমার ওপর যাতে পুলিশের সন্দেহ না যায় সেই ব্যবস্থা করা গেছে। তাই পুলিশকে ধোকা দেওয়া গেল। কাজে লাগল সেই অভিনয়ই। আমার কাছে আইনের ওপর মানবিকতা। তবে ভবিষ্যতে আর কোনও অপরাধ তুমি কোরও না সৌরভ। অপরাধ মানুষকে অমানুষ করে তোলে’।

হিতেন বসাককে আবারও প্রণাম করে সজল চোখে সৌরভ বলল, ‘আর এমন হবে না স্যার’।

হিতেন বসাক সৌরভকে বুকে টেনে নিলেন। একটু পরে দুজনেই ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এসে দেখলেন তিয়াস আর প্রকাশ গল্প করছে। তিয়াসের মুখের সরল হাসিটা ফিরে আসতে দেখে সৌরভ মনে অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করল, আর সৌরভের প্রশান্ত স্নিগ্ধ মুখটা দেখে হিতেন্ন বসাকও অন্তরের শান্তি অনুভব করলেন।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)