কাঁকিনগরের রাজবাড়ির রহস্য
মিলন পুরকাইত
১
ঘড়িতে রাত একটা বাজে। কিন্তু চোখে ঘুম নেই নন্দিনীর। নন্দিনী সিংহ রায় ওরফে মিষ্টি, এই বিশাল বড় একান্নবর্তী পরিবারের ছোট ছেলে নীলাংশু সিংহ রায়ের মেয়ে। আজকে মিষ্টির চোখে ঘুম নেই একটা বিশেষ কারণে।
বাড়ির নিয়ম মেনেই ওরা সবাই রাত এগারোটার মধ্যে যে যার ঘরে ঢুকে পড়ে। সময় মতো ঘুমিয়েও যায়। আর আজকে সারাদিন মিষ্টির অনেক পরিশ্রম হয়েছিল বলে, নিজের ঘরে এসে না এসেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। এমনকি ঈশানকে ‘শুভরাত্রি’- টুকুও জানায়নি। ঈশান ওর ছোটবেলার বন্ধু। আর এখন সে ওর মনের মানুষ। শুভরাত্রি না বলার কারনে সে হঠাৎ করেই বারোটা নাগাদ ফোন করে বসে। তারপর এক কথায় দু’ কথায় ওদের সেই কথোপকথন চলে বেশ অনেকক্ষণ। কিন্তু সেই যে ঘুমটা ভেঙে গেছে তারপর ফোন কেটে গেলেও ওর আর ঘুম আসছিল না। জল খেতে গিয়ে দেখে, কথা বলতে বলতে কখন যে বোতলের জলটা একদম শেষ হয়ে গেছে, সেটা ও খেয়ালই করেনি। বাধ্যগত সেই বোতলটাই ভরার জন্য রান্না ঘরে গিয়েছিল। তখন খেয়াল করেনি। কিন্তু ফিরে আসার সময় খেয়াল করে, ওর বাবা মায়ের ঘরের আলো জ্বলছে। কিন্তু কেন সেটা দেখতে গিয়ে শোনে ওর বাবা আর মায়ের চাপা স্বরে ঝগড়া চলছে। যাতে সেই ঝগড়ার বাইরে না যায়, তাই দরজা জানালা সব কিছু বন্ধ করা রয়েছে। আগেকার দিনের জানালা হওয়ার জন্য, বেশকিছু ফাঁক রয়েছে। সেখান থেকেই ওই ঘরের আলোটা দেখতে পায় ও। এই রকম ঝগড়া ওর বাবা-মায়ের মধ্যে আগে কখনো দেখেনি। একটু মান-অভিমান দেখেছে ঠিক কথাই। কিন্তু এইরকম ভাবে ঝগড়া,তাও আবার এত রাতে? কারণটা কি? সবাই তো ঘুমিয়ে যায়। তাহলে…?
ওর এই ভাবনার মধ্যেই ও শুনতে পায় ওর মা পরিণীতা বলছে— “না নীল না এটা হয় না। আমি মাত্র আঠারো বছর বয়সে মিষ্টির বিয়ে কিছুতেই হতে দেবো না।”
এটা কি শুনল ও? ওর বাবা-মা এত রাত্রেবেলা ওর বিয়ে নিয়ে ঝগড়া করছে? তাও আবার এত অল্প বয়সে? অসম্ভব। এই বয়সে তো ও কিছুতেই বিয়ে করতে পারবে না।
এমন সময় ওর বাবা নীলাংশুর গলা শুনতে পায়। সে একটু অনুনয়ের সুরেই বলছে— “এমন করোনা পরী। তুমি আমাদের বাড়ির নিয়ম জানো। মেয়েদের ওই নির্দিষ্ট সময়েই বিয়ে হয়। মিষ্টির দুই জ্যাঠতুতো দিদিরও কিন্তু আঠারো বছর শেষ হওয়ার দশ দিনের মধ্যেই বিয়ে হয়েছে। তারা ভাল আছে। আমার দিদি বোন কিন্তু সেই একই বয়সে বিয়ে করেছে। আমাদের পিসিরাও তাই। আর মিষ্টি থেকে ছোট যারা, সেই মেয়েগুলোরও আঠারো শেষ হওয়ার দশ দিনের মধ্যেই বিয়ে হবে। হতেই হবে। এটাই নিয়ম। তুমি এখন এরকম করলে বললে তো চলবে না।”
“না নীল, আমি তোমার এই কথা শুনতে পারব না। যে যার মত যে বয়সে নিজের মেয়ের বিয়ে দিতে চায় দিক। আমি আমার মেয়ের বিয়ে এত তাড়াতাড়ি কিছুতেই হতে দেব না... ব্যস।”
এবারে নীলাংশু বেশি রাগতো কন্ঠে বলে— “ছিঃ পরী ছিঃ তুমি এই পরিবারের বউ হয়ে এমন একটা কথা বলতে পারো না। এটা একটা একান্নবর্তী পরিবার। এখানে আমার তোমার হয় না। সেখানে তুমি বলছ যে, যার মেয়ের বিয়ে যখন দেয় দিক। তুমি তোমার মেয়ের বিয়ে এখন দেবে না।
মনে রেখো, মিষ্টির উপরে তোমার আমার যেমন অধিকার, বাকি অন্যান্য সদস্যদেরও ঠিক তেমনই অধিকার রয়েছে। তুমি তোমার মেয়ের ভালোবাসা অন্ধ হয়ে এমন কোন কিছু করতে বা বলতে পারো না। একান্নবর্তী পরিবার তো তুমি এতো ভালোবাসো। তাহলে আজকে হঠাৎ করে এইরকম কথা কেন?”
“তোমার বলা প্রত্যেকটা কথা আমি জানি বুঝি নীল। তাই তো আমি যেমন এই পরিবারকে ভালোবাসি, এই পরিবারও আমাকে তেমন ভালোবাসে। আমি এতদিন পরে এই পরিবারের প্রতি আমার ভালোবাসা কি, আমি এই পরিবারকে কি মনে করি, তার প্রমান দেবো না। আমি শুধু জানি, মিষ্টির বিয়ে এত তাড়াতাড়ি কিছুতেই হতে দেব না।”
নীলাংশুর গলায় এবার জেদটা স্পষ্ট বোঝা গেল। বলল— “বিয়ে তো হবেই। আর তিন মাস বাকি মিষ্টির আঠারো বছর হতে। আর তারপর দশদিনের মধ্যে একটা সু-পাত্রের হাতে মিষ্টিকে তুলে দেবো। তারপর পড়াশোনা চাকরি যা করার করবে। যদি আমাদের দেশের নিয়মে এটা না লেখা থাকতো যে, মেয়েদের বিয়ের জন্য আঠারো বছর বয়স হওয়াটা জরুরী, তাহলে আমি হয়তো এখনই ওর বিয়ে দিয়ে দিতাম। এই নিয়ে আর কোন কথা হবে না। এটাই ফাইনাল। এখন অনেক রাত হয়েছে ঘুমিয়ে পড়ো। আমি আলোটা নিভিয়ে আসছি।”
এতটা কথোপকথন শুনে মিষ্টি নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়ে। এখনও ও ভাবতে পারছে না যে, ওর বিয়ে হবে তিন মাসের মধ্যে। তাও আবার একটা অন্য ছেলের সঙ্গে। ও ঈশানকে ছাড়া আর কাউকে নিজের পাশে দেখতে পারবে না। সেই ঈশানকেও ও এখন বিয়ে করতে পারবে না। ও চায় ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করতে। ওদের এই এত বছরের পুরনো বাড়ি...... না না ওর মামদিদা বলে, এটা ওদের সেই পুরনো রাজবাড়ীর আদলে তৈরি আরেকটা রাজবাড়ী। তবে বেশ কিছু অমিল রয়েছে। তবুও এটা রাজবাড়ী তুলনায় কোন অংশেই কম নয়। মামদিদা মানে হল, ওর বাবার ঠাম্মি আর ওর বড়মা। কিন্তু ওরা সবাই ভাইবোনেরা মামদিদা বলেই ডাকে।
আসলে ওরা রাজপরিবার। অনেক বছর আগে কি একটা কারণে ওদেরকে ওদের আসল রাজবাড়ী ত্যাগ করতে হয়। তারপর পুরো পরিবার উঠে আসে এই নতুন বাড়ি তৈরি করার পরে। রাজবাড়ীর আদলে হলেও হুবহু এক নয়। ও অনেকবার চেয়েছে রাজবাড়ীর লোকেদের কি কারনে আসল রাজবাড়ী ত্যাগ করতে হয়েছে, সেটা জানতে। কিন্তু কেউ সে কাহিনী ওকে বলেনি। সবাই বলেছে, তারা জানে কিন্তু বলবে না। ওর সবথেকে প্রিয় পাত্রী ওর মামদিদা, সেও ওকে কিছু বলেনি। প্রত্যেকেই একইকথা বলেছে। মিষ্টির নাকি বয়স হয়নি সেই কাহিনী শোনার। তবে একবার মামদিদা বলেছিল যে, এই কাহিনী নাকি বিয়ে না হলে শোনা যাবে না। হাজার চেষ্টা করেও ও জানতে পারেনি কিছুই।
আজকে সেই কাহিনী শোনার জন্য ওর মন ছটফট করছে। কারণ, এই কাহিনীর জন্যই তো আজ এমন একটা পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হচ্ছে ওকে। কিন্তু এর থেকে বেরোবে কেমন করে? ওর বাবার কথা শুনে ও নিশ্চিত যে, এর থেকে বেরোনো ওর জন্য ঠিক কতটা কঠিন হতে চলেছে। আদৌ কি পারবে বেরোতে? আর এইসব কিছু চিন্তা করার জন্যই ওর চোখে ঘুম নেই।
কিন্তু এর থেকে বেরোতে তো ওকে হবেই। নানা রকম ভাবে মনে মনে পরিকল্পনা করতে থাকে। আর এর মাঝেই কখন ঘুমিয়ে পড়ে ও বুঝতে পারে না।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে ঘরের পরিবেশ বেশ থমথমে। বুঝতে পারল, গতরাতে যে ঘটনা চার দেওয়ালের মধ্যে ছিল, তা সকালের মধ্যেই সবার কাছে পৌঁছে গেছে। এক পাশে ওর মা গুম হয়ে বসে রয়েছে। আর ওর দুই ঠাম্মি মিলে ওর মাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, এই নির্দিষ্ট সময়ে মিষ্টির বিয়ে দেওয়াটা ঠিক কতটা জরুরি।
অন্যদিকে ওই সময়েই ওর বাবা অফিসের জন্য তৈরি হয়ে বেরোতে গিয়ে চিৎকার করে ওর বড় জেঠিমার উদ্দেশ্যে বলল— “বড় বৌদি পরীকে বোঝাও। সবসময় জেদ করা উচিত নয়। ওর অনেক জেদ আমি মেনে নিয়েছি। তার কারণ ও এই পরিবারকে ভালোবাসে। এই পরিবারের জন্য অনেক কিছু করেছে। আমি নিজেও ওকে খুব ভালোবাসি। সেই কারণেই ওর সমস্ত জেদ আমি পূরণ করার চেষ্টা করি। কিন্তু এই ক্ষেত্রে ওর জেদ মানা একেবারেই সম্ভব নয়।” আর তারপরেই অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়।
মিষ্টি ধীর পায়ে ওর বড় জেঠিমার সামনে গিয়ে বলে— “বড় জেম্মা আমি বিয়ে করতে চাই না। মানে এখন এই মুহূর্তে বিয়ে করতে চাই না। তুমি তো সবই জানো, আমি কি চাই।”
“হুম জানি সবই জানি। কিন্তু এটাই যে এই বাড়ির মেয়েদের ভাগ্য। তুই মেয়ে হয়ে জন্মেই তো ভুল করেছিস। ছেলে হয়ে জন্মাতে পারতিস। কিন্তু মেয়ে যখন হয়েছিস, তখন সেই ভাগ্য থেকে তুই পালিয়ে বাঁচবি কেমন করে?আর তাছাড়া এই বাড়ির মেয়েদের ভাগ্য এখন তো লেখা হয়নি। অনেক বছর আগেই লেখা হয়ে গিয়েছিল।”
“তাই যদি হয় তাহলে বড় জেম্মা, তাহলে আমি জানতে চাই কেন এই বাড়ির মেয়েদের বয়স আঠারো বছর হতে না হতেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়।”
“নির্দিষ্ট সময়টা বল আঠারো বছর হওয়ার দশ দিনের মধ্যে। আগে তো আরও আগে বিয়ে দেওয়া হতো। এখন আইন আছে বলে আঠারো অব্দি অপেক্ষা করতেই হয়। কিন্তু ওই তারপর দশ দিন পেরোনো যাবে না।”
“হ্যাঁ, কিন্তু কেন? আমি সেটাই জানতে চাই। আমি অতীত জানতে চাই। আমাদের অতীত আমাদের রাজবাড়ীর অতীত।”
“কিন্তু বিয়ের আগে সে কাহিনী তো তোকে বলা যাবে না মা।”
“কেন?”
“কেন সেটা তোর মামদিদা জানে। আজ পর্যন্ত আমরা তো সেটা জানার চেষ্টা করিনি। ছাড় সেই সব কথা। স্কুলে যাবি তো?”
“হুম” বলে মিষ্টি সেই ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে চলে যায়।
নির্দিষ্ট সময়ে ও স্কুলে যায়। কিন্তু আজকে ওর একদম স্কুলে যেতে ইচ্ছে করছিল না। বাড়ির অবস্থা খুবই খারাপ। এদিকে এই গুমোট পরিবেশে থাকাটাও ওর পক্ষে সম্ভব ছিল না। যাইহোক... স্কুলে গিয়ে ও সোজা চলে যায় ঈশানের সামনে। তারপর ওর হাতটা ধরে টেনে একটা ফাঁকা ঘরে নিয়ে যায়।
সেই ঘরেই সমস্ত কিছু খুলে বলে ও। সব শোনার পরে ঈশান বলে— “কি বলছিস কি নন্দিনী তুই? দেখ, তোর কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছে তোর বাড়ির লোকেরা তোর এই সময়ে বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে যথেষ্ট সিরিয়াস। কিন্তু সত্যি বলতে, এতে আমার কিছু করার নেই। আমি তোকে খুব ভালোবাসি এটা যেমন সত্যি, ঠিক তেমনই আমি যে এখন এই মুহূর্তে কিছুতেই বিয়ে করতে পারবনা, সেটাও তো সত্যি। তুই নিশ্চয়ই আমাকে ভুল বুঝবি না। দেখ এরপর যা করার তোকেই করতে হবে। যদি আমার কোনো সাহায্য লাগে আমি সেই সাহায্য অবশ্যই করব। কিন্তু.........”
ঈশান পুরো কথাটা শেষ করার আগেই মিষ্টি বলে— “আমি সব জানি রে। তোকে আমি ভালোবাসি। তুই এইরকম ভাবে আমাকে বলবি, তবে আমি বুঝতে পারব, বল? আমি সেই জন্য তোকে বলিনি যে, তুই আমাকে এক্ষুনি বিয়ে কর। আমি তোকে বলেছি যে, আমাকে কিছু বুদ্ধি দিয়ে সাহায্য কর। আমার মাথায় কিছু আসছে না। কি করে কি করবো কিছু বুঝতে পারছি না।”
ঈশান কিছুই বলতে পারে না। কি বলবে? ওর মাথাতেও যে কোনও বুদ্ধি আসছে না। দুজনে বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে আবার ক্লাস করার জন্য শ্রেণিকক্ষে গিয়ে বসে।
এরপরের দিন গুলো এক প্রকার ঝড়ের বেগে বেরিয়ে যেতে থাকে। বিয়ে না করার জন্য নানারকম ফন্দি ও আঁটতে থাকে। আর সেই কারণেই তো যতবার নীলাংশু নানারকম ছেলেদেরকে নিয়ে এসেছে, ততবারই ও কিছু না কিছু বলে সেই সম্বন্ধ ভেস্তে দিয়েছে।
এরই মাঝখানে ওর উচ্চমাধ্যমিকের পরীক্ষা হয়। সেখানে ও খুব ভালো ফলাফল করে। আর ওর ইচ্ছেমতো কলেজে ইতিহাসে অনার্স নিয়ে ভর্তিও হয়ে যায়। আসলে ওর বাবার আনা প্রত্যেকটা ছেলেকে ও প্রত্যাখ্যান করেছিল বলে, মনের মধ্যে কোথাও একটা আশা ছিল যে, হয়তো আঠারো বছর দশ দিনের মধ্যে ওর বিয়ে হবে না।
আর এই সবকিছুর মধ্যেই চলে আসে ওর জন্মদিন। মানে ওর আঠারো বছর পূর্ণ হওয়ার দিন। আর কোনমতে দশটা দিন পের করে দিতে পারলেই, বাড়ির তৈরি করা নিয়মের বাইরে বেরিয়ে যাবে ও।
জন্মদিনের দিন সকালবেলা উঠে ও দেখে, ওদের এই বাড়ি কি সুন্দর ভাবে সেজে উঠেছে। ওর বাবাকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারে, ওর জন্মদিনের উপলক্ষে এই সাজ-সরঞ্জাম। মানে...! এটা ওর সারপ্রাইজ? ও তো বাবা মায়ের কাছ থেকে সারপ্রাইজ পেয়েছে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। ওর বন্ধুদেরকে আমন্ত্রণ করতে গিয়ে দেখে, ইতিমধ্যেই নীলাংশু ওদের সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু সন্ধ্যাবেলা ঘটে বিপত্তি। এতদিন ধরে ও এমন ভাবখানা দেখিয়েছে, যাতে সবার মনে হয়, ওর বিয়ে করার খুব ইচ্ছে। কিন্তু কোনও ছেলেকে পছন্দ হচ্ছে না, তাই বিয়ে করছে না। ওর এই পরিকল্পনা সফল হতে গিয়েও হয় না। তার কারণ মিষ্টি কি আর ওর বাবার বুদ্ধির সঙ্গে পারে? যদিও ওর পরিকল্পনা সফল হতে পারে না, তার জন্য দোষটা ওর নিজেরই।
আসলে ও যখন দেখল যে, আঠারো বছর পূর্ণ হতে গেল, অথচ এখনও ওর বাবা ওর জন্যে কোন ছেলে ঠিক করতে পারেনি, তখন নিজের পরিকল্পনাটা কথা ফলাও করে ও ঈশানকে বলছিল। আর সেটাই বাইরে থেকে শুনে ফেলে নীলাংশু। মিষ্টি ভেবেছিলো, প্রায় আঠারো বছর পূর্ণ হয়ে গেছে মানে, আর কিছু করতে পারবে না। কিন্তু দশটা দিন সময় যে হাতে ছিল, আর সেই দশ দিনে যে অনেক কিছু করা সম্ভব, সেটা ও বুঝতে পারেনি।
এইদিকে মিষ্টির হাসিমুখ দেখে নিলাংশুর মতো পরিণীতাও বুঝতে পারেনি ওর মনের কথা। মেয়ের হাসি মুখ দেখে ও ভেবেছিল যে, যে মেয়ে কিনা পড়াশোনা ছেড়ে বিয়ে করতে চাইছে, সেই মেয়ের সঙ্গে কথা বলাই উচিৎ নয়। আর সেই মতো কথা বলাও বন্ধ করে দেয়। কিন্তু সব কিছু বোঝার পরেও মিষ্টি ওর মাকে কিছু বলেনি। ভেবেছিল, কাজে করে দেখাবে। তারপর ওর মাকে বলবে যে, আসলে ও কি পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু সবই বিফলে গেল।
আসলে হয়েছে কি, নীলাংশু মেয়ের পরিকল্পনার কথা যখন জানতে পারে, তখন ও নিজেও একটা পরিকল্পনা করে। জন্মদিনের দিন যে বিশাল আয়োজন ও করেছিল, আর মিষ্টিকে বলেছিল যে, ওর জন্মদিনের অনুষ্ঠান এটা। সেটা আদতে ছিল, মিষ্টির আশীর্বাদের অনুষ্ঠান। মিষ্টি যেমন অভিনয় করেছিল, নীলাংশুও তেমন সব জানতে পেরে, অভিনয় করেছে। শেষ মুহূর্তে বাবার মুখে ওর আশীর্বাদের কথা শুনে ক্ষোভে ফেটে পড়ে মিষ্টি। চিৎকার করে ওঠে। আর সেই চিৎকারে পরিণীতা নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়।
আসলে যখন কেউ ওর কথা শোনেনি, তখন ও নিজেকে একপ্রকার গৃহবন্দি করে রেখেছিল। কিন্তু মেয়ের চিৎকারে বাইরে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়।
মিষ্টি চিৎকার করে নিলাংশুর উদ্দেশ্যে বলে— “তুমি আমার বাবা।আর বাবা হয়ে নিজের মেয়ের সঙ্গে প্রতারণা করতে তোমার বিবেকে বাঁধল না? আমার সব স্বপ্ন, সব সত্যিটা জানা সত্ত্বেও তুমি কেমন করে এটা করতে পারো?”
এবারে নীলাংশু বেশ জোর গলায় বলে— “যে নিজেই নিজের বাবার সঙ্গে প্রতারণা করে, সে এইভাবে তার বাবাকে প্রতারণার কথা বলতে পারে না। আজকে তোমার আশীর্বাদ।আজ থেকে সাত দিন পরে তোমার বিয়ে। আর বিয়ে না হওয়া অব্দি তুমি ঘরের বাইরে পা রাখবে না। আর সেই ব্যাপারটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমার।”
হাজার চেষ্টা করেও নিজের বাবাকে মিষ্টি কিছুতেই বোঝাতে পারে না।আশীর্বাদ হয়েই যায়। আর নীলাংশুও তার ঠিক পরক্ষণেই ওকে গৃহবন্দী করে ফেলে। পরিণীতা এই বিয়েতে অংশগ্রহণ না করলেও বাড়ির বাকিরা সবাই বিয়ের জোগাড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।সাত দিনের মধ্যে সিংহ রায় বাড়ি সুসজ্জিত হয়ে ওঠে বিয়ের সাজে।অবশ্য এই সাতদিনে কেঁদে কেঁদে মিষ্টি প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে।
বিয়ের দিন উপস্থিত। সকাল থেকেই সবাই খুব ব্যস্ত।একদিকে ফুল দিয়ে কনে বসার মন্ডপ তৈরি হচ্ছে।আরেক দিকে একটু আড়াল করে তৈরি হচ্ছে বর বসার মন্ডপ। আরেকদিকে ওর বড় জেঠু দেখাচ্ছে, ঠিক কেমন করে কী কী হবে। নান্দীমুখের আয়োজন করছে ওর এক জেঠিমা। শ্রী গড়ায় ব্যস্ত একজন। বাড়ির আরও নানারকম কাজে ব্যস্ত রয়েছে বাকিরা। আর এইসব দেখে ভিতরে ভিতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে মিষ্টি। না চাইতেও ওকে সব নিয়ম পালন করতে হচ্ছে; বা বলা ভাল পালন করতে বাধ্য করা হচ্ছে। সেই দধিমঙ্গল থেকে শুরু করে এখন নান্দীমুখ, সবকিছুতেই ওকে অংশগ্রহণ করতে হচ্ছে। অংশগ্রহণ তো করতেই হবে।ওর বিয়ে বলে কথা। নীলাংশু নিজের দায়িত্বে সমস্ত কিছু ওকে দিয়ে পালন করাচ্ছে।
বেলা বারোটার দিকে ছেলের বাড়ি থেকে গায়ে হলুদের তত্ত্ব এসে যায়।শঙ্খধ্বনি উলুর ধ্বনি মধ্য দিয়ে ওর যখন গায়ে হলুদের পর্ব চলছিল, ঘৃণায় তখন ওর গা গুলিয়ে উঠছিল। কারণ অন্য একটা মানুষের গায়ের হলুদ ওর গায়ে লাগছে। এমন একটা মানুষের গায়ের হলুদ, যাকে ও ভালোবাসা তো দূরে থাক, পছন্দ অব্দি করে না।কারণ, ওই মানুষটার জন্যই তো ওর সব স্বপ্ন ভেঙে যেতে বসেছে। বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করলেও পালাতে পারছে না। সবাই ওর উপরে নজর রেখেছে। আর তাছাড়া পালাবেও বা কোথায়? বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে রেখেছে।যখন যার দরকার তখন সে ভেতরে ঢুকে। তারপর বেরিয়ে গিয়ে আবার সেই আগের মতোই দরজাটা বন্ধ করে দিচ্ছে। কতদিন ঈশানের সঙ্গে কথা হয় না।আর ছেলেটাকে রাতে ‘গুডনাইট’ না জানালে সে ঘুমাতো না।আর আর এত দিন হয়ে গেল মিষ্টি ওর ভালবাসার মানুষটার থেকে দূরে রয়েছে।চোখের দেখা তো দূরে থাক, গলাটা অব্দি শোনেনি।
সকাল থেকে না খেয়ে রয়েছ ও। এখন বেলা তিনটে বাজে। কিন্তু তাও ওর খিদে পায়নি।অবশ্য এই একটু আগেই জল আর দুটো মিষ্টি ও খেয়েছে।ওতো শুধু জল খেতে চেয়েছিল। কিন্তু ওর বড় জেঠিমা জোর করে দুটো মিষ্টি ওকে খাইয়ে দিয়েছে। এর মধ্যেই পার্লার থেকে লোক চলে আসে ওকে সাজানোর জন্য। যেই দিন থেকে বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে, সেইদিন থেকে আজ অব্দি কেঁদে কেঁদে চোখের মুখের যে বারোটা বেজে গিয়েছিল, তা এই পার্লারের লোকগুলো মেকআপ দিয়ে ঠিক করে দেয়। আর তাতেই ওকে খুব সুন্দর দেখতে লাগছে।এখন তো চোখ দিয়ে জলও বেরোচ্ছে না। মনে হচ্ছে চোখের সব জল যেন শুকিয়ে গেছে। নাঃ পালাবার আর কোনও পথ নেই।তাই নিজের মনকে বারবার বোঝাতে থাকে যে, ঈশান নয়, এবার থেকে ওর মন প্রাণ সঁপে দিতে হবে অন্য একজনের কাছে।
এই একটু আগে অব্দি ও ভেবেছিল, হয়তো কিছু মিরাকেল ঘটবে। ভগবান হয়তো ওকে কোন না কোন দিক থেকে কিছু সাহায্য করবে। কিন্তু না...! সেইরকম কিছুই হয়নি।এইসব চিন্তা ভাবনার মধ্যেই মিষ্টি শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনির সঙ্গে বেশ কিছু গলার আওয়াজ শুনতে পায়। সেই আওয়াজে ওর কানে ভেসে আসে, সবাই মিলে বেশ উত্তেজনা সঙ্গে বলছে ‘বর এসেছে এই বর এসেছে।চলো চলো দেখব চলো।’ কথাগুলো কানে আসতেই দেওয়াল ঘড়িটার দিকে চোখ চলে যায় ওর।ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে রাত আটটা বেজে গেছে।আর ঠিক দু'ঘণ্টা পাঁচ মিনিট পরে ওর বিয়ের লগ্ন। তার আগে হবে রেজিস্ট্রি।
শেষবারের মতো নিজের মায়ের উদ্দেশ্যে মনে মনে একবার বলে ওঠে— “মা তুমি কোথায়? তুমি এই বিয়েটা মেনে নাও নি। তাই এর থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছ।আমাকে ভুল বুঝেছ। সবই তো মেনে নিলাম।কিন্তু তাই বলে বিয়েটা আটকানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা তুমি করবে না? কেন মা কেন? তুমি কি নিজের মেয়েকে এইটুকুও চিনতে পারোনি?”
এমন সময় দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে এলো একজন, যাকে দেখে ওর সেই চোখে আবার জল নেমে এল।
২
ভেতরে এলো পরিণীতা। মিষ্টির মা... অবাক হয়ে যায় ও।মনে মনে নিজের মাকে স্মরণ করল, আর ওর মা এসে গেল। এটাই কি তবে মা আর মেয়ের নাড়ির টান?
পরিণীতা ঘরে ঢুকেই বলল— “পরে কাঁদবি। এখন এই ট্রলিব্যাগটা থেকে শাড়ি গুলো বের করে, নিজের জামা কুর্তি প্যান্ট যা পারবি নিয়ে নে। চার দিনের মতো।তারপর তোমার বয়স আঠারো বছর দশ দিন হয়ে পেরিয়ে যাবে।তখন তুই এই বাড়ীতে ফিরে এলে ওদের আর কোনও লাভ হবে না।তাড়াতাড়ি কর।”
“কি বলছ কি মা...! কোথায় যাব? কেমন করে যাব?” বেশ অবাক হয় মিষ্টি।
“কি নাম যেন... হ্যাঁ ঈশান, ওকে ফোন করে আমি সব ঠিক করে রেখেছি।”
ঈশানের নামটা শুনে আবারও চমকে ওঠে মিষ্টি। ওর মা ঈশানকে চিনল কেমন করে? এইদিকে ওকে এইরকম চমকে যেতে দেখে পরিণীতা বলল— “চমকে গেলি তো।তাহলে বলি শোন, তোর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার দু’ দিন আগে রাত এগারোটার দিকে তুই কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলি। আমি দেখতে পেয়ে তোকে বকে তোর কাছ থেকে ফোনটা নিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে যাই। সেই কথাটা আশা করি তোর মনে আছে।কিন্তু তুই সেই দিন আমার ভয়ে গুডনাইট না বলে আচমকা ফোনটা কেটে দিয়েছিলি বলে ঈশান ঘুরে আবার ফোন করে। আমি ফোনটা ধরতে, ও তুই ভেবে বেশ কয়েকটা কথা বলে ফেলে। তারপর আমি আমার পরিচয় দিতে, সে তো প্রায় এক প্রকার কেঁদেই ফেলে এমন অবস্থা আর কি।
কিন্তু আমি ওকে শান্ত করে বলি, মেয়ে প্রেম করে এতে আমার আপত্তি নেই।কিন্তু ঈশানকে আর তোকে আগে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।তবে আমি বিয়েটা দেব। তো ও সেইদিন আমার কথায় রাজি হয়ে যায়। আমি ওকে বলেছিলাম, ও যেন আমার আর ওর কথা তোকে না বলে। ছেলেটা আমাকে দেওয়া দুটো কথাই রেখেছে। ভালো পড়াশোনা করে ভালো রেজাল্ট করেছে। আর তোকেও আমাদের কথাগুলো বলেনি।
কিন্তু এই বাড়ির মানুষগুলোর জন্য ঈশানকে দেওয়া কথা আমি রাখতে ব্যর্থ হচ্ছিলাম। তোর বিয়ে ওরা এখনই দেবে, সেটা ঠিক করেই নিয়েছিল। আমার একার প্রতিবাদে যখন কিছু করা যাচ্ছিল না, তখন আমি ঈশানকে ফোন করি। আর বিয়ে থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে ওর সঙ্গে একটা প্ল্যান করি। সেই প্ল্যান মতো তুই আজকে পিছন দরজা দিয়ে পালিয়ে গিয়ে একটা গাড়িতে উঠবি। ওই গাড়িতে আগে থেকেই থাকবে ঈশান আর মৌমিতা। তোরা তিনজনই চলে যাবি ঈশানের মামাবাড়িতে।ওখানে তোকে রেখে ওরা আবার চলে আসবে বিয়েতে। ওরা দু’জনই একবার হলেও তখন নিজেদের মুখ বিয়ের জন্য ভাড়া করা ক্যামেরায় দেখাবে।তাহলে সন্দেহের তীর ওদের দিকে যাবে না। চারদিনের দিন তুই ফিরে আসবি।আসলে আমি চাই না, আমাদের জন্য ওই দুটো ছেলেমেয়ে কোনও রকম কোনও ঝামেলায় জড়াক। এইদিকে যা ঝামেলা তখন হবে, সব আমি সামলে নেব।”
“মা তুমি এত কিছু করেছ শুধুমাত্র আমার স্বপ্নকে সত্যি করতে? আর আমি মনে মনে শুধু ভেবে চলেছি যে, মা কেন আমার জন্য কিছু করছে না। আচ্ছা আমি যে তিন চারদিন ঈশানের মামা বাড়িতে থাকব, ওদের কোনও সমস্যা হবে না? মানে ওর বোন ওর মামা-মামী কারোর।”
“না... কোন অসুবিধা হবে না। আমি সব ঠিক করে রেখেছি।তুই আর বেশি কথা না বলে বেরিয়ে পড়। বাইরে সবাই বর এসেছে বলে ওই দিকেই ব্যস্ত।তোর দিকে কারোর নজর নেই। আমি সেই সুযোগেই তোর কাছে এলাম।আমি জানতাম এই সুযোগটা আসবেই আসবে।”
কথা বলতে বলতে ব্যাগ গোছানো হয়ে যায়। একটা জিনস আর টি-শার্ট ইতিমধ্যেই মিষ্টি পরে নিয়েছে। “আসছি” বলে সামনের দিকে পা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিণীতা বলল— “আমি সব সামলে নেব।তুই একদম চিন্তা করবি না। আর হ্যাঁ, তোর ফোনটা সুইচ অফ করে রাখিস। সময় সুযোগ হলে আমি ওর মামা অথবা মামীর ফোনে ফোন করে তোর সঙ্গে কথা বলে নেব। তুই নিজে থেকে আমাকে ফোন করবি না।তার কারণ, ঈশানের মামা বাড়ি এখান থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরত্বে। ফোন খোলা রাখলে ওরা খুব সহজেই ট্র্যাক করে তোকে পেয়ে যাবে। তার কারণ বাড়ি থেকে পালিয়ে যাচ্ছিস, এটা তো আর ওরা খুব সহজভাবে নেবে না। তবে হ্যাঁ, অত কিছু ভাবিস না।আমি যখন রয়েছি তখন তোর কোন ক্ষতি আমি হতে দেবো না।আমি সব সময় তোর পাশে থাকব।”
আর কোন কথা না বলে শুধু মাথাটা নেড়ে বেরিয়ে গেল মিষ্টি।কিছুদূর এগিয়ে যেতেই ও ওর মায়ের পরিকল্পনা মতো সেই গাড়িটা দেখতে পায়।তাড়াতাড়ি করে এসে উঠে বসে। ঈশান ওকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে একটু মুচকি হেসে ফেলে।তারপর ওইখান থেকে গাড়িটা বেরিয়ে যায়।
পরিণীতা কিছুক্ষণ মেয়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।তারপর ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে ভাবতে থাকে, ঠিক কিভাবে ওর পরিবারের করা প্রশ্নবাণ থেকে নিজেকে বাঁচাবে। এক বিশাল ঝড়ের সম্মুখীন ও যে হবে, সেটা তো জানেই।কিন্তু সেখান থেকে বাঁচার উপায় এখনও অব্দি ওর জানা নেই।
বেশিক্ষণ ভাবার সময় পায় না। এর মধ্যেই দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ পাওয়া যায়। বাইরে থেকে ওর মেজো জা বলছে— “মিষ্টি দরজা খোল। এখন আর এইসব নাটক করে লাভ নেই।এই বিয়েটা তোকে করতেই হবে। আর তোর ঘরের দরজাটা বাইরে থেকে কে খুলল? বন্ধ করা ছিল তো।কিরে কথা বলছিস না কেন? মিষ্টি এই মিষ্টি...”
এই মেজ জা হলো, এক বস্তা ভালো আলুর মাঝখানে একটা পচা আলু। সব সময় সবাইকে খোঁচা মেরে কথা বলে।বাপের বাড়ি বড়লোক বলে কথায় কথায় রাগ করে সেখানে চলে যায়।আর বাড়ির লজ্জার কথা ভেবে বারবার ফিরিয়ে আনা হয়।অন্যের কষ্টের ও একটু বেশি আনন্দ পায়। তাই মিষ্টি আর পরিণীতা এই বিয়েতে আপত্তি করেছিল বলে, ও এই বিয়েতে বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।পরিণীতাকে বাড়ির সবাই ভালবাসে। আর সেটাই ওর পরিণীতাকে অপছন্দ করার একটা কারণ। বিয়েতে ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করলে, ওরা কষ্ট পাবে আর তাতেই ওর আনন্দ।
এদিকে ও এত বেশি চেঁচামেচি করছিল যে, বাড়ির সবাই ওইখানে চলে আসে।পরিণীতা বুঝল এইভাবে দরজা বন্ধ করে বেশিক্ষণ থাকা সম্ভব নয়।নীলাংশু দু-একবার ডাকার পরে দরজা ভাঙার জন্য একদম তৈরী হয়ে যায়।আর ঠিক সেই সময়ে পরিণীতা দরজা খুলে দেয়। ওকে দেখে নীলাংশু বলে— “তুমি এখানে...! মিষ্টি কোথায়?”
“মিষ্টি পালিয়ে গেছে। এই যে তার চিঠি।”
নীলাংশু দেখল তাতে সংক্ষেপে লেখা-----
“এই বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আমি চললাম।ইতি মিষ্টি।”
চিঠিটা পরিণীতাই লিখিয়ে নিয়েছিল মিষ্টিকে দিয়ে। এতে করে ওরা যেইটুকু সময় এই চিঠি পিছনে খরচ করবে, সেই সময়টুকুর মধ্যে ওদের পরিকল্পনা মতো সমস্ত কাজ শেষ করে মৌমিতা আর ঈশান আবার বিয়েতে ফিরে আসতে পারবে। কিন্তু ওর সব চেষ্টাই জলে গেল। এত তাড়াতাড়ি যে, সবটা ওদের সামনে এসে যাবে, সেটা ও বুঝতে পারল না।তার কারণ, নীলাংশু বলল— “কি ভেবেছিলে এই চিঠি দেখিয়ে তুমি আমাদেরকে আটকে রাখবে।আর সেই সময়ে তোমার মেয়ে যতটা দূরে পালানো সম্ভব, পালিয়ে যাবে। এই চিঠিটা অত্যন্ত পরিকল্পনা করে লেখা। আর আমি খুব বুঝতে পারছি, এটা তোমার বুদ্ধি পরী, মিষ্টির নয়। মেয়েকে ঘর থেকে বের করে পালাতে যখন সাহায্য করেছিলে, পরিকল্পনা যখন এতটাই নিখুঁত করার চেষ্টা করেছিলে, তখন আমাদের কাছে সেই ব্যাপারটা কেমন ভাবে পরিবেশন করবে, সেটাও তো তোমার একটু ভেবে নেওয়া উচিত ছিল। তোমার মত একটা বুদ্ধিমতী মেয়ে যে, এতটা বাজে পরিকল্পনা করবে, বুঝতে পারিনি।যাইহোক... যা করেছো ভালো করেছো। এবার তাড়াতাড়ি বলে ফেলো মিষ্টি কোথায়। ধরা যখন পরেই গেছো তাই লুকিয়ে রেখে আর লাভ নেই। তাড়াতাড়ি বলো।”
এবারে নীলাংশু বেশ জোর গলায় বলে— “যে নিজেই নিজের বাবার সঙ্গে প্রতারণা করে, সে এইভাবে তার বাবাকে প্রতারণার কথা বলতে পারে না। আজকে তোমার আশীর্বাদ।আজ থেকে সাত দিন পরে তোমার বিয়ে। আর বিয়ে না হওয়া অব্দি তুমি ঘরের বাইরে পা রাখবে না। আর সেই ব্যাপারটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমার।”
হাজার চেষ্টা করেও নিজের বাবাকে মিষ্টি কিছুতেই বোঝাতে পারে না।আশীর্বাদ হয়েই যায়। আর নীলাংশুও তার ঠিক পরক্ষণেই ওকে গৃহবন্দী করে ফেলে। পরিণীতা এই বিয়েতে অংশগ্রহণ না করলেও বাড়ির বাকিরা সবাই বিয়ের জোগাড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।সাত দিনের মধ্যে সিংহ রায় বাড়ি সুসজ্জিত হয়ে ওঠে বিয়ের সাজে।অবশ্য এই সাতদিনে কেঁদে কেঁদে মিষ্টি প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে।
বিয়ের দিন উপস্থিত। সকাল থেকেই সবাই খুব ব্যস্ত।একদিকে ফুল দিয়ে কনে বসার মন্ডপ তৈরি হচ্ছে।আরেক দিকে একটু আড়াল করে তৈরি হচ্ছে বর বসার মন্ডপ। আরেকদিকে ওর বড় জেঠু দেখাচ্ছে, ঠিক কেমন করে কী কী হবে। নান্দীমুখের আয়োজন করছে ওর এক জেঠিমা। শ্রী গড়ায় ব্যস্ত একজন। বাড়ির আরও নানারকম কাজে ব্যস্ত রয়েছে বাকিরা। আর এইসব দেখে ভিতরে ভিতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে মিষ্টি। না চাইতেও ওকে সব নিয়ম পালন করতে হচ্ছে; বা বলা ভাল পালন করতে বাধ্য করা হচ্ছে। সেই দধিমঙ্গল থেকে শুরু করে এখন নান্দীমুখ, সবকিছুতেই ওকে অংশগ্রহণ করতে হচ্ছে। অংশগ্রহণ তো করতেই হবে।ওর বিয়ে বলে কথা। নীলাংশু নিজের দায়িত্বে সমস্ত কিছু ওকে দিয়ে পালন করাচ্ছে।
বেলা বারোটার দিকে ছেলের বাড়ি থেকে গায়ে হলুদের তত্ত্ব এসে যায়।শঙ্খধ্বনি উলুর ধ্বনি মধ্য দিয়ে ওর যখন গায়ে হলুদের পর্ব চলছিল, ঘৃণায় তখন ওর গা গুলিয়ে উঠছিল। কারণ অন্য একটা মানুষের গায়ের হলুদ ওর গায়ে লাগছে। এমন একটা মানুষের গায়ের হলুদ, যাকে ও ভালোবাসা তো দূরে থাক, পছন্দ অব্দি করে না।কারণ, ওই মানুষটার জন্যই তো ওর সব স্বপ্ন ভেঙে যেতে বসেছে। বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করলেও পালাতে পারছে না। সবাই ওর উপরে নজর রেখেছে। আর তাছাড়া পালাবেও বা কোথায়? বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে রেখেছে।যখন যার দরকার তখন সে ভেতরে ঢুকে। তারপর বেরিয়ে গিয়ে আবার সেই আগের মতোই দরজাটা বন্ধ করে দিচ্ছে। কতদিন ঈশানের সঙ্গে কথা হয় না।আর ছেলেটাকে রাতে ‘গুডনাইট’ না জানালে সে ঘুমাতো না।আর আর এত দিন হয়ে গেল মিষ্টি ওর ভালবাসার মানুষটার থেকে দূরে রয়েছে।চোখের দেখা তো দূরে থাক, গলাটা অব্দি শোনেনি।
সকাল থেকে না খেয়ে রয়েছ ও। এখন বেলা তিনটে বাজে। কিন্তু তাও ওর খিদে পায়নি।অবশ্য এই একটু আগেই জল আর দুটো মিষ্টি ও খেয়েছে।ওতো শুধু জল খেতে চেয়েছিল। কিন্তু ওর বড় জেঠিমা জোর করে দুটো মিষ্টি ওকে খাইয়ে দিয়েছে। এর মধ্যেই পার্লার থেকে লোক চলে আসে ওকে সাজানোর জন্য। যেই দিন থেকে বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে, সেইদিন থেকে আজ অব্দি কেঁদে কেঁদে চোখের মুখের যে বারোটা বেজে গিয়েছিল, তা এই পার্লারের লোকগুলো মেকআপ দিয়ে ঠিক করে দেয়। আর তাতেই ওকে খুব সুন্দর দেখতে লাগছে।এখন তো চোখ দিয়ে জলও বেরোচ্ছে না। মনে হচ্ছে চোখের সব জল যেন শুকিয়ে গেছে। নাঃ পালাবার আর কোনও পথ নেই।তাই নিজের মনকে বারবার বোঝাতে থাকে যে, ঈশান নয়, এবার থেকে ওর মন প্রাণ সঁপে দিতে হবে অন্য একজনের কাছে।
এই একটু আগে অব্দি ও ভেবেছিল, হয়তো কিছু মিরাকেল ঘটবে। ভগবান হয়তো ওকে কোন না কোন দিক থেকে কিছু সাহায্য করবে। কিন্তু না...! সেইরকম কিছুই হয়নি।এইসব চিন্তা ভাবনার মধ্যেই মিষ্টি শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনির সঙ্গে বেশ কিছু গলার আওয়াজ শুনতে পায়। সেই আওয়াজে ওর কানে ভেসে আসে, সবাই মিলে বেশ উত্তেজনা সঙ্গে বলছে ‘বর এসেছে এই বর এসেছে।চলো চলো দেখব চলো।’ কথাগুলো কানে আসতেই দেওয়াল ঘড়িটার দিকে চোখ চলে যায় ওর।ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে রাত আটটা বেজে গেছে।আর ঠিক দু'ঘণ্টা পাঁচ মিনিট পরে ওর বিয়ের লগ্ন। তার আগে হবে রেজিস্ট্রি।
শেষবারের মতো নিজের মায়ের উদ্দেশ্যে মনে মনে একবার বলে ওঠে— “মা তুমি কোথায়? তুমি এই বিয়েটা মেনে নাও নি। তাই এর থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছ।আমাকে ভুল বুঝেছ। সবই তো মেনে নিলাম।কিন্তু তাই বলে বিয়েটা আটকানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা তুমি করবে না? কেন মা কেন? তুমি কি নিজের মেয়েকে এইটুকুও চিনতে পারোনি?”
এমন সময় দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে এলো একজন, যাকে দেখে ওর সেই চোখে আবার জল নেমে এল।
২
ভেতরে এলো পরিণীতা। মিষ্টির মা... অবাক হয়ে যায় ও।মনে মনে নিজের মাকে স্মরণ করল, আর ওর মা এসে গেল। এটাই কি তবে মা আর মেয়ের নাড়ির টান?
পরিণীতা ঘরে ঢুকেই বলল— “পরে কাঁদবি। এখন এই ট্রলিব্যাগটা থেকে শাড়ি গুলো বের করে, নিজের জামা কুর্তি প্যান্ট যা পারবি নিয়ে নে। চার দিনের মতো।তারপর তোমার বয়স আঠারো বছর দশ দিন হয়ে পেরিয়ে যাবে।তখন তুই এই বাড়ীতে ফিরে এলে ওদের আর কোনও লাভ হবে না।তাড়াতাড়ি কর।”
“কি বলছ কি মা...! কোথায় যাব? কেমন করে যাব?” বেশ অবাক হয় মিষ্টি।
“কি নাম যেন... হ্যাঁ ঈশান, ওকে ফোন করে আমি সব ঠিক করে রেখেছি।”
ঈশানের নামটা শুনে আবারও চমকে ওঠে মিষ্টি। ওর মা ঈশানকে চিনল কেমন করে? এইদিকে ওকে এইরকম চমকে যেতে দেখে পরিণীতা বলল— “চমকে গেলি তো।তাহলে বলি শোন, তোর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার দু’ দিন আগে রাত এগারোটার দিকে তুই কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলি। আমি দেখতে পেয়ে তোকে বকে তোর কাছ থেকে ফোনটা নিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে যাই। সেই কথাটা আশা করি তোর মনে আছে।কিন্তু তুই সেই দিন আমার ভয়ে গুডনাইট না বলে আচমকা ফোনটা কেটে দিয়েছিলি বলে ঈশান ঘুরে আবার ফোন করে। আমি ফোনটা ধরতে, ও তুই ভেবে বেশ কয়েকটা কথা বলে ফেলে। তারপর আমি আমার পরিচয় দিতে, সে তো প্রায় এক প্রকার কেঁদেই ফেলে এমন অবস্থা আর কি।
কিন্তু আমি ওকে শান্ত করে বলি, মেয়ে প্রেম করে এতে আমার আপত্তি নেই।কিন্তু ঈশানকে আর তোকে আগে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।তবে আমি বিয়েটা দেব। তো ও সেইদিন আমার কথায় রাজি হয়ে যায়। আমি ওকে বলেছিলাম, ও যেন আমার আর ওর কথা তোকে না বলে। ছেলেটা আমাকে দেওয়া দুটো কথাই রেখেছে। ভালো পড়াশোনা করে ভালো রেজাল্ট করেছে। আর তোকেও আমাদের কথাগুলো বলেনি।
কিন্তু এই বাড়ির মানুষগুলোর জন্য ঈশানকে দেওয়া কথা আমি রাখতে ব্যর্থ হচ্ছিলাম। তোর বিয়ে ওরা এখনই দেবে, সেটা ঠিক করেই নিয়েছিল। আমার একার প্রতিবাদে যখন কিছু করা যাচ্ছিল না, তখন আমি ঈশানকে ফোন করি। আর বিয়ে থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে ওর সঙ্গে একটা প্ল্যান করি। সেই প্ল্যান মতো তুই আজকে পিছন দরজা দিয়ে পালিয়ে গিয়ে একটা গাড়িতে উঠবি। ওই গাড়িতে আগে থেকেই থাকবে ঈশান আর মৌমিতা। তোরা তিনজনই চলে যাবি ঈশানের মামাবাড়িতে।ওখানে তোকে রেখে ওরা আবার চলে আসবে বিয়েতে। ওরা দু’জনই একবার হলেও তখন নিজেদের মুখ বিয়ের জন্য ভাড়া করা ক্যামেরায় দেখাবে।তাহলে সন্দেহের তীর ওদের দিকে যাবে না। চারদিনের দিন তুই ফিরে আসবি।আসলে আমি চাই না, আমাদের জন্য ওই দুটো ছেলেমেয়ে কোনও রকম কোনও ঝামেলায় জড়াক। এইদিকে যা ঝামেলা তখন হবে, সব আমি সামলে নেব।”
“মা তুমি এত কিছু করেছ শুধুমাত্র আমার স্বপ্নকে সত্যি করতে? আর আমি মনে মনে শুধু ভেবে চলেছি যে, মা কেন আমার জন্য কিছু করছে না। আচ্ছা আমি যে তিন চারদিন ঈশানের মামা বাড়িতে থাকব, ওদের কোনও সমস্যা হবে না? মানে ওর বোন ওর মামা-মামী কারোর।”
“না... কোন অসুবিধা হবে না। আমি সব ঠিক করে রেখেছি।তুই আর বেশি কথা না বলে বেরিয়ে পড়। বাইরে সবাই বর এসেছে বলে ওই দিকেই ব্যস্ত।তোর দিকে কারোর নজর নেই। আমি সেই সুযোগেই তোর কাছে এলাম।আমি জানতাম এই সুযোগটা আসবেই আসবে।”
কথা বলতে বলতে ব্যাগ গোছানো হয়ে যায়। একটা জিনস আর টি-শার্ট ইতিমধ্যেই মিষ্টি পরে নিয়েছে। “আসছি” বলে সামনের দিকে পা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিণীতা বলল— “আমি সব সামলে নেব।তুই একদম চিন্তা করবি না। আর হ্যাঁ, তোর ফোনটা সুইচ অফ করে রাখিস। সময় সুযোগ হলে আমি ওর মামা অথবা মামীর ফোনে ফোন করে তোর সঙ্গে কথা বলে নেব। তুই নিজে থেকে আমাকে ফোন করবি না।তার কারণ, ঈশানের মামা বাড়ি এখান থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরত্বে। ফোন খোলা রাখলে ওরা খুব সহজেই ট্র্যাক করে তোকে পেয়ে যাবে। তার কারণ বাড়ি থেকে পালিয়ে যাচ্ছিস, এটা তো আর ওরা খুব সহজভাবে নেবে না। তবে হ্যাঁ, অত কিছু ভাবিস না।আমি যখন রয়েছি তখন তোর কোন ক্ষতি আমি হতে দেবো না।আমি সব সময় তোর পাশে থাকব।”
আর কোন কথা না বলে শুধু মাথাটা নেড়ে বেরিয়ে গেল মিষ্টি।কিছুদূর এগিয়ে যেতেই ও ওর মায়ের পরিকল্পনা মতো সেই গাড়িটা দেখতে পায়।তাড়াতাড়ি করে এসে উঠে বসে। ঈশান ওকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে একটু মুচকি হেসে ফেলে।তারপর ওইখান থেকে গাড়িটা বেরিয়ে যায়।
পরিণীতা কিছুক্ষণ মেয়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।তারপর ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে ভাবতে থাকে, ঠিক কিভাবে ওর পরিবারের করা প্রশ্নবাণ থেকে নিজেকে বাঁচাবে। এক বিশাল ঝড়ের সম্মুখীন ও যে হবে, সেটা তো জানেই।কিন্তু সেখান থেকে বাঁচার উপায় এখনও অব্দি ওর জানা নেই।
বেশিক্ষণ ভাবার সময় পায় না। এর মধ্যেই দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ পাওয়া যায়। বাইরে থেকে ওর মেজো জা বলছে— “মিষ্টি দরজা খোল। এখন আর এইসব নাটক করে লাভ নেই।এই বিয়েটা তোকে করতেই হবে। আর তোর ঘরের দরজাটা বাইরে থেকে কে খুলল? বন্ধ করা ছিল তো।কিরে কথা বলছিস না কেন? মিষ্টি এই মিষ্টি...”
এই মেজ জা হলো, এক বস্তা ভালো আলুর মাঝখানে একটা পচা আলু। সব সময় সবাইকে খোঁচা মেরে কথা বলে।বাপের বাড়ি বড়লোক বলে কথায় কথায় রাগ করে সেখানে চলে যায়।আর বাড়ির লজ্জার কথা ভেবে বারবার ফিরিয়ে আনা হয়।অন্যের কষ্টের ও একটু বেশি আনন্দ পায়। তাই মিষ্টি আর পরিণীতা এই বিয়েতে আপত্তি করেছিল বলে, ও এই বিয়েতে বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।পরিণীতাকে বাড়ির সবাই ভালবাসে। আর সেটাই ওর পরিণীতাকে অপছন্দ করার একটা কারণ। বিয়েতে ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করলে, ওরা কষ্ট পাবে আর তাতেই ওর আনন্দ।
এদিকে ও এত বেশি চেঁচামেচি করছিল যে, বাড়ির সবাই ওইখানে চলে আসে।পরিণীতা বুঝল এইভাবে দরজা বন্ধ করে বেশিক্ষণ থাকা সম্ভব নয়।নীলাংশু দু-একবার ডাকার পরে দরজা ভাঙার জন্য একদম তৈরী হয়ে যায়।আর ঠিক সেই সময়ে পরিণীতা দরজা খুলে দেয়। ওকে দেখে নীলাংশু বলে— “তুমি এখানে...! মিষ্টি কোথায়?”
“মিষ্টি পালিয়ে গেছে। এই যে তার চিঠি।”
নীলাংশু দেখল তাতে সংক্ষেপে লেখা-----
“এই বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আমি চললাম।ইতি মিষ্টি।”
চিঠিটা পরিণীতাই লিখিয়ে নিয়েছিল মিষ্টিকে দিয়ে। এতে করে ওরা যেইটুকু সময় এই চিঠি পিছনে খরচ করবে, সেই সময়টুকুর মধ্যে ওদের পরিকল্পনা মতো সমস্ত কাজ শেষ করে মৌমিতা আর ঈশান আবার বিয়েতে ফিরে আসতে পারবে। কিন্তু ওর সব চেষ্টাই জলে গেল। এত তাড়াতাড়ি যে, সবটা ওদের সামনে এসে যাবে, সেটা ও বুঝতে পারল না।তার কারণ, নীলাংশু বলল— “কি ভেবেছিলে এই চিঠি দেখিয়ে তুমি আমাদেরকে আটকে রাখবে।আর সেই সময়ে তোমার মেয়ে যতটা দূরে পালানো সম্ভব, পালিয়ে যাবে। এই চিঠিটা অত্যন্ত পরিকল্পনা করে লেখা। আর আমি খুব বুঝতে পারছি, এটা তোমার বুদ্ধি পরী, মিষ্টির নয়। মেয়েকে ঘর থেকে বের করে পালাতে যখন সাহায্য করেছিলে, পরিকল্পনা যখন এতটাই নিখুঁত করার চেষ্টা করেছিলে, তখন আমাদের কাছে সেই ব্যাপারটা কেমন ভাবে পরিবেশন করবে, সেটাও তো তোমার একটু ভেবে নেওয়া উচিত ছিল। তোমার মত একটা বুদ্ধিমতী মেয়ে যে, এতটা বাজে পরিকল্পনা করবে, বুঝতে পারিনি।যাইহোক... যা করেছো ভালো করেছো। এবার তাড়াতাড়ি বলে ফেলো মিষ্টি কোথায়। ধরা যখন পরেই গেছো তাই লুকিয়ে রেখে আর লাভ নেই। তাড়াতাড়ি বলো।”
নীলাংশুর এরকম কথাবার্তায় পরিণীতার খারাপ লাগে। কিন্তু ও জানে যে, নীলাংশু যা যা বলছে সমস্ত কিছুই সত্যি। কিন্তু তবুও কিছু তো বলা দরকার। তাই কিছু বলতে যাবে, সেই সময় ওর বড় জা বলল— “ছোট ঠাকুরপো, পরীকে এইরকম ভাবে দোষ দিচ্ছ কিসের জন্য? মিষ্টি লেখা চিঠিই তো প্রমাণ করছে যে, পরী কিছুই জানে না। তবুও তুমি বারবার কেন বলছো যে, ও সব জানে ও সব জানে।”
নীলাংশু আগের মতই সেই রেগে রেগে বলল— “বড় বৌদি, তুমি খুব সহজ-সরল। চোখের সামনে যেটা দেখছো, সেটাই বিশ্বাস করছো। আমি তোমাকে ভালো করে আরও একবার পুরো ঘটনাটা বুঝিয়ে বলছি। মিষ্টিকে আমরা বাইরে থেকে আটকে রেখেছিলাম। তার মানে ওর দরজার কেউ খুলে দিয়েছে। সেটা তো তুমি বুঝতে পারছ? এবারে কথা হল যে, কে খুলে দিয়েছে। যে খুলে দিয়েছে, সে পরী ছাড়া আর কেউ হতে পারে কি? তোমার কি মনে হয়? পরীই দরজাটা খুলে দিয়ে মিষ্টিকে পালাতে সাহায্য করেছে। মিষ্টি ওর চোখের সামনে দিয়েই পালিয়েছে। আর তোমার কি মনে হয়, মা ও মেয়ের কাছে এটা জানতে চাইবে না যে, মেয়ে কোথায় যাচ্ছে? হয় পরী ওকে পালানোর জায়গা ঠিক করে দিয়েছে, নয়তো মিষ্টি ওকে এমন একটা জায়গায় যাওয়ার কথা বলেছে, যেটা শুনে পরীর মনে হয়েছে যে, ওখানে মিষ্টি গেলে ওর কোন ক্ষতি হবে না। আমাদের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যই ওই চিঠি লেখানো হয়েছে। হুম লেখানো হয়েছে। কারণ বুদ্ধিটা পরীর মাথা থেকেই এসেছে। কি পরী আমি যা যা বললাম সমস্ত কিছু ঠিক তো?
বাকিটা বলি, এরপর মিষ্টি ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, আর পরী ওকে ঘরের দরজা বন্ধ করে ভিতরে বসে থাকে। যাতে আমরা এটা দূর থেকে বুঝতে না পারি যে, মিষ্টি ওর ঘরে নেই। এতটা ছল না করলেও পারতে পরী, না করলেও পারতে। তুমি কার সঙ্গে ছল করলে? নিজের পরিবারের সঙ্গে.........?”
এবার পরিণীতা বেশ রেগে বলল— “হুম ছল করেছি... ভালো করেছি। তোমরা সবাই আমার মেয়ের সর্বনাশ করবে আর আমি মা হয়ে চুপচাপ সবটা মেনে নেব? অসম্ভব... মিষ্টি যে ছেলেটাকে পছন্দই করে না, তার সঙ্গে ও সারা জীবন কাটাবে কেমন করে?”
এবার পরিণীতার শ্বশুর-শাশুড়ি প্রায় চিৎকার করে একসঙ্গে বলে ওঠে— “বৌমা তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?”
শাশুড়ি আবারও বলে— “অন্যান্য সব বউদের থেকে তোমাকে আমরা সবাই বেশি বেশি করে ভালবেসেছি। সবসময় তোমার কি ভালো লাগবে সেটা ভেবেছি। আর তুমি কি করলে? এইভাবে আমাদের মুখ ডোবালে? আর একটু পরেই সবাই জানতে পারবে যে, বিয়ের কনে পালিয়ে গেছে। তখন আমাদের বংশের বদনাম হবে। এই জিনিসটা একবার ভেবে দেখেছো? আমাদের ভালোবাসার এই প্রতিদান দিলে? যদি তোমার মেয়েকে বাড়ি থেকে পালানোর হতো, তাহলে অন্ততপক্ষে সকালে বের করে দিতে পারতে। এইরকম বিয়ের কিছুক্ষণ আগে এই ঘটনাটা ঘটানোর কি দরকার ছিল? যদিও এই ঘটনাটা ঘটিয়ে তুমি শুধুমাত্র যে আমাদের বিপদ বাড়ালে তা নয়, তোমার নিজের মেয়েরও বিপদ বাড়ালে। মানে আমাদের মুখ ডোবানোর কথা যদি নাও ধরি আর কি। সেইসব ঘটনা তো আর তুমি জানো না।”
কিন্তু পরিণীতা কিছু বলার আগেই ওর মেজো জা বলে ওঠে— “আগেই বলেছিলাম এত ভালোবাসা না দিতে। ওর মতিগতি যে ঠিক নয়, আমি অনেকদিন আগেই বুঝে ছিলাম। তোমরা ওর অভিনয়ে গলে গেলেও আমি কিন্তু......”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই পরিণীতা বলল— “বাহ মেজ দিভাই বাহ... আমি অভিনয় করছিলাম, তাও দীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে? একটা মানুষ এত বছর ধরে অভিনয় করতে পারে বুঝি? তা তুমি অভিনয়টা করলে না কেন? ঠিক আছে তুমি না হয় করোনি। তুমি খুব ভালো মানুষ। কিন্তু তোমাদের সবার মতে আমি তো খারাপ। মানে আমি খুবই খারাপ। আমাকে ভালোবেসে তোমরা ভুল করেছো। তা আমি যখন এতই খারাপ, তখন আমি এই বাড়ি চলে আজকেই চলে যাচ্ছি।”
এমন সময় মামদিদার গলা শোনা যায়— “তোমরা সবাই চুপ করো, আর আমার সঙ্গে এক্ষুণি এই মুহূর্তে বিয়ের মন্ডপের চলো।”
কেউ আর কোনও কথা বলার সাহস করে না। মামদিদার বয়স হলে গেলেও কেউ তার কথা অমান্য করতে পারে না।
মামদিদা সবার প্রথমে পাত্রপক্ষের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিজেদের সমস্যাটা খুলে বলে। স্বাভাবিক ভাবেই বিভিন্ন রকম তীর্যক মন্তব্য ওদের দিকে ধেয়ে আসতে থাকে। কিন্তু মামদিদার নির্দেশ ছিল বলে কেউ কিছু বলতে পারে না।
এদিকে ওদের দিকে কোনও রকম কোনও প্রতিবাদ না আসায় ধীরে ধীরে সবাই ওই বিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়। নিমন্ত্রিত অতিথিরাও কেউ নেই। লগ্ন বেশ অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কনে কেন মণ্ডপে আসছে না, তা দেখার জন্য দু-একজন রয়ে গিয়েছিল। আসলে কিছু মানুষ থাকে যারা মজা লুটতে ভালোবাসে। অবশ্য বরযাত্রীদের পক্ষ থেকে সেই রকম কোনো বাধা আসেনি। তার কারণ, কোথাও গিয়ে ওদের মনেও ছিল যে, মিষ্টির অমতে এই বিয়ে হচ্ছে। তাই যে কোনও সময় যা কিছু হতে পারে। ওরা যেন এক প্রকার প্রস্তুত ছিল এইরকম একটা পরিস্থিতির জন্য। আর তাছাড়া পাত্রের বাবা নীলাংশুর বন্ধু। সেই কারণেই আরও বেশি করে ওর সমস্যাটা বুঝতে পেরেছিল মনে হয়।
যাইহোক... পুরো বিয়ের মন্ডপ ফাঁকা হয়ে যায়। খাঁ খাঁ করছে চারিদিক। এই কিছুক্ষণ আগেও জমজমাট হয়েছিল এই বিয়ের মন্ডপটা।
মামদিদা সবার উদ্দেশ্যে বলল— “তোমরা সবাই রাতের খাওয়া সেরে বসার ঘরের জমা হও। আজ আমি ছোট নাতবউকে কিছু কথা বলব। আর আমি চাই তোমরা সেইসময় ওইখানে উপস্থিত থাকো। প্রত্যেকে মনে রেখো, এটা আমার অনুরোধ নয়, আদেশ। আর ছোটরা নিজের নিজের ঘরে চলে যেও। বড় বউ, আমি এখন বললাম যা যা বললাম, তা যেন যথাযথভাবে পালন হয়, সেটা দেখার দায়িত্ব তোমার।”
ইচ্ছা না থাকলেও মামদিদার আদেশের জন্য সবাই খাবারের থালা হাতে তুলে নেয়। কিন্তু ভালোভাবে কেউই খেতে পারে না। মামদিদাকে খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। একে একে সবাই এসে বসার ঘরের হাজির হল। আর ছোটরা চলে গেল দোতালায় যে যার ঘরে।
৩
সবাই নিজ নিজ আসন গ্রহণ করার পরে মামদিদা বলল— “আজ এখন আমি ছোট নাত বউকে এই বাড়ির ইতিহাস বলব। এখানে উপস্থিত প্রত্যেকের সেই ইতিহাস জানলেও আমি চাই আরও একবার তোমরা সেই কাহিনী শোনো। সেই কাহিনী যে কতটা ভয়ংকর সেটা আবারও উপলব্ধি করো। আর আমি যদি কোন ভুল করে ফেলি, তাহলে সেটা ধরিয়ে দিও। আসলে বয়সের ভারে এখন অনেক কিছু ভুলে যাচ্ছি। যদিও এই কাহিনী ভুলে যাওয়ার মতো নয়। কিন্তু তবুও বলা তো যায় না। আর যদি তোমরা কিছু ভুল শুনেছ বা ভুল বুঝে থাকেছ, সেটাও আমাকে প্রশ্ন করে জেনে নিতে পারবে।
এবার তোকে একটা কথা বলি ছোট নাত বউ। এতদিন তুই অন্ধবিশ্বাস কুসংস্কার এইসব বলে আমাদের এই রাজবাড়ির কাহিনী শুনতে চাসনি। আমিও তোকে জোর করে শোনাতে চাইনি। কিন্তু তুই যে তার বিনিময়ে আমাদের প্রত্যেকের জীবনে এমন একটা মৃত্যুবাণ ডেকে আনবি, সেটা আমি বুঝতে পারিনি। আমার আর কি বল। বয়স হয়েছে। আজ না হয় কাল ঠিক চলে যাব। কিন্তু চলে যাওয়ার আগে যে, নিজের পরিবারের ধ্বংস নিশ্চিত সেটা জেনে যাব, আশা করিনি সেটা। কিন্তু যে ভুল আমি করেছি, তার প্রায়শ্চিত্ত আমিই করব। আমি তোকে ভালোবেসে তোর উপরে কোন জোর খাটাতে চাইনি। কিন্তু আজকে খাটাব। আমার মনে হয়েছে তুই যদি আমাদের পরিবারের কাহিনী নাও শুনিস, তবুও আমাদের পরিবারে প্রত্যেকটা নিয়ম যথাযথভাবে পালন করবি। কিন্তু না…! তুই আজকে তোর মেয়েকে পালাতে সাহায্য করে আমার এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছিস। সেই কারণেই আমি তোর উপরে আজকের জোর খাটাব। আমি তোকে জানিয়ে যাব যে, কেমন করে তুই এই রাজপরিবারের ধ্বংসের কারণ হলি।
এই পরিবার একটু একটু করে ধ্বংস হবে। আর তুই তা দেখবি আর অনুতপ্ত হবি যে, আজকের এই মারাত্মক ভুলটা তুই কেন করলি। এটাই হবে আজকে করা তোর অন্যায়ের শাস্তি। আমি বেঁচে থাকতে এই বাড়ি থানা পুলিশের মুখ দেখবে না।তাই...... তা না হলে এই মুহুর্তে আমি পুলিশে খবর দিতাম। যাই হোক......
আমি তোকে বারবার বলছি যে, আমাদের পরিবার ধ্বংস হবে। কিন্তু কাহিনী শুনলে বুঝতে পারবি, যে ভুলটা তুই আজকে করলি, সেটা শুধুমাত্র আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করে ক্ষান্ত হবে, তার নিশ্চিত ভাবে কেউ বলতে পারবে না। কাহিনী শোনার পরে তুইও বলতে পারবি না।”
নিলাংশু বলে- "এতো কথা না বলে পুলিশকে ডাকলে তো ঝামেলা মিটে যায়।"
-"না একদম না। কাহিনী শোনার পরে ছোট নাত বউয়ের যদি মনে হয় যে মেয়েকে সে ডেকে আনতে, তাহলে আনবে। নয়তো সব ধ্বংস হবে। কিন্তু পুলিশ আসবে না। পুলিশ বাড়িতে ঢোকার থেকে আমাদের সবার মৃত্যুই ভালো।"
মামদিদার এমন কড়া কড়া কথা শুনে ঘরের ভিতরে এক চরম নিস্তব্ধতা নেমে আসে। যেন একটা পিন পড়লেও আওয়াজ হবে। সবার ভিতর মৃত্যুভয় চেপে বসে। কারণ সবাই জানে যে, পরিণীতা নিজে যেটা ঠিক বলে মনে করে, তার জন্য সে কি কি করতে পারে। যদিও ওর এই জেদের জন্য কোনদিনও কারোর ক্ষতি হয়নি। কিন্তু আজকে...... কেউ কোনো কথা বলার ভাষা খুঁজে পায় না। পরিণীতা একবার বলে— “ঠাম এটা তুমি......”
কিন্তু ওকে শেষ করতে না দিয়েই মামদিদা বলে ওঠে— “চুপ একদম চুপ। এতদিন তুই তোর ঠামের ভালোবাসা দেখেছিস। আর এখন দেখবি শাসন। যাইহোক এখন এসব কথা ছাড়। আমি আমার কাহিনী শুরু করছি। তবে আরও একটা কথা, এই কাহিনী শেষ না হওয়া অব্দি কেউ নিজের জায়গা ছেড়ে উঠবে না। কেউ ঘুমোবে না। মনে থাকে যেন।"
মামদিদা শুরু করলেন------
------ আজ থেকে অনেক অনেক বছর আগে একটা জায়গা ছিল। যার নাম ছিল কাঁকিনগর। এখন সেই জায়গার কেশিয়াপুর নাম হয়েছে। এখান থেকে কেশিয়াপুরের দূরত্ব প্রায় আশি নব্বই কিলোমিটার। আমি আমার কাহিনীতে কেশিয়াপুরকে কাঁকিনগর বলেই সম্বোধন করব। এতে কাহিনীর ধারা বজায় থাকবে।
যে সময়ের কাহিনী বলছি, সেই সময়ে কাঁকিনগরের রাজ সিংহাসনে বিরাজমান ছিলেন রাজা বৃজেন্দ্র সিংহ রায় আর তারা রানী ছিলেন হৈমন্তী।
রাজা বৃজেন্দ্র রানী হৈমন্তীকে বিয়ে করেছিলেন ভালোবেসে। এই ভালোবাসা কিন্তু যে সে ভালোবাসা নয়। এই ভালোবাসা ছিল আদি অনন্ত। রাজা বৃজেন্দ্র তার রানীর জন্য প্রাণ দিতে পারতেন, প্রাণ নিতে পারতেন। পাগলের মত ভালোবাসতেন রানীকে।
আর রাজার এই ভালবাসার ফায়দা নিয়েছিল মহামন্ত্রী। রাজা বৃজেন্দ্র ওনার রানীকে ভালবেসে রাজপাট থেকে নিজের মনোনিবেশ তুলে নিয়েছিলেন। সেই সুযোগে মহামন্ত্রী নিজেকে রাজা ভাবতে শুরু করেছিল। অবশ্য রাজা বৃজেন্দ্রই সমস্ত দায়িত্ব মহামন্ত্রীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ভাবতে পারেনি যে, যাকে বিশ্বাস করে তিনি সমস্ত দায়িত্ব দিলেন, সেই ওনাকে ধোঁকা দেবে।
মহামন্ত্রী রাজার বানানোর সব নিয়ম বদলে দিয়ে নিজের ইচ্ছা খুশিমতো রাজ্য শাসন করতে থাকে। প্রজাদের উপর অত্যাচার করে, রাজার নির্ধারিত করের থেকে দ্বিগুন কখনও তিনগুণ কর আদায় করতে থাকে। আর এই দ্বিগুণ-তিনগুণ কর আদায়ের জন্য ওদের যা যা করতে ইচ্ছা হতো তাই তাই করত। প্রজাদের চিৎকার রাজার রানীর প্রতি যে ভালোবাসা, সেটা ভেদ করে রাজার কান অব্দি পৌঁছাত না।
কিন্তু একদিন রাজমাতার সামনে সবকিছু চলে আসে। আসলে রাজমাতার মনে মধ্যে একটা সন্দেহ অনেকদিন ধরেই তৈরি হয়েছিল। আর সেই সন্দেহ থেকেই তিনি নিজের কিছু বিশ্বস্ত লোককে গোপনে সব খোঁজখবর নেওয়ার জন্য লাগিয়েছিলেন। আর সেখান থেকেই তিনি সমস্ত কিছু জানতে পেরে জান।
এইদিকে হাজার চেষ্টা করেও তিনি নিজের ছেলেকে আবার সেই আগের মত রাজকাজে মনোনিবেশ করাতে পারছিলেন না। রাজ্যে যেন হাহাকার পড়ে গিয়েছিল। এমন প্রেম রাজমাতা তার এত বছর বয়সে কখনও দেখেননি। কিন্তু তাহলে উপায়?
রাজমাতা যে তাঁর ছেলের বউয়ের প্রতি যে ভালবাসা, তা দেখে হিংসা করবেন, এমন মানুষ তো তিনি নন। কিন্তু ওই ভালোবাসাই যখন এমন বিপদ হিসেবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তখন তিনি আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। বউ যা ভাবার ভাববে ভেবে তিনি একটা সুযোগ বুঝে উপস্থিত হন রানী হৈমন্তীর সামনে।
তারপর বলেন— ‘মা রে একটা সুযোগ পেয়েই আমি তোর কাছে এসেছি। আমি যখন তোকে কথাগুলো বলব, তোর মনে হবে আমি তোর ভালো সহ্য করতে পারছি না। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমাকে আমার প্রজার স্বার্থে এই কথাগুলো বলতেই হচ্ছে। আমাকে নিজের শত্রু ভাবিস না।’
রানী হৈমন্তী এই কথাগুলো শুনে বেশ অবাক হন। প্রায় ছয় মাস হলো ওনাদের বিয়ে হয়েছে। বিশেষ কিছুই জানেন না। জানার সুযোগও পাননি। তার কারণ, তিনি নিজেও স্বামীর প্রেমে মশগুল থেকেছেন। তাই বিস্ময়ের সুরেই বললেন—‘এটা আপনি কি বলছেন, আমি কিছু বুঝতে পারছি না…!’
রাজমাতা, রাজা বৃজেন্দ্রর নিজের রাজকার্যের অনীহা আর সেই সুযোগে দুষ্টুলোকের মাথা চাড়া দেওয়া, সবকিছুই বিস্তারিত ভাবে বলেন। এবং সবশেষে এটা বলেন যে, রানী হৈমন্তীকে তার বাবা রাজা বৃজেন্দ্রর সঙ্গে এই জন্যই বিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি একজন দক্ষ ও সৎ রাজা। তাঁর রাজ্যে প্রজারা সুখে রয়েছে। কিন্তু তিনি যদি জানতে পারেন যে, ওনার জামাইয়ের এমন অবনতি হয়েছে, তাহলে তিনি কি গর্ববোধ করবেন? রানী হৈমন্তীর কি মুখ উজ্জ্বল হবে?
সবকিছু শোনার পরে রানী হৈমন্তী জানতে চান যে, তিনি কেমন করে রাজা বৃজেন্দ্রকে রাজি করাবেন আবার সেই আগের মত সবকিছু করতে? রাজমাতা এই ব্যপারে যা কিছু ঠিক করেছিলেন, সেই সমস্ত কিছুই রানী হৈমন্তীকে বলে সেখান থেকে চলে যান।
সব শুনে রানী হৈমন্তী দু'দিন সময় চেয়ে নেন রাজমাতার থেকে। আর দু’দিন পরে রাজা বৃজেন্দ্র যথারীতি একটুক্ষণ রাজসভায় থেকে আবার চলে যান হৈমন্তীর কক্ষে।
এখানে বলে রাখি, রাজা রানী, স্বামী-স্ত্রী হলেও ওনাদের কক্ষ কিন্তু আলাদা আলাদা থাকত। আসলে তখনকার দিনে একজন রাজা চাইলে একের অধিক বিবাহ করতে পারত। তারপর যখন যেই রানীর সঙ্গে সময় কাটাতে ইচ্ছে হতো, তখন রানীর কক্ষে উপস্থিত হত। কিন্তু রাজা বৃজেন্দ্র হৈমন্তীর প্রেমে এতো মশগুল ছিলেন যে, ওনার পক্ষে আবার বিবাহ করা হয়তো সম্ভব ছিল না। কিন্তু নিয়মানুসারে রানী হৈমন্তীর কক্ষ আলাদা ছিল।
নীলাংশু আগের মতই সেই রেগে রেগে বলল— “বড় বৌদি, তুমি খুব সহজ-সরল। চোখের সামনে যেটা দেখছো, সেটাই বিশ্বাস করছো। আমি তোমাকে ভালো করে আরও একবার পুরো ঘটনাটা বুঝিয়ে বলছি। মিষ্টিকে আমরা বাইরে থেকে আটকে রেখেছিলাম। তার মানে ওর দরজার কেউ খুলে দিয়েছে। সেটা তো তুমি বুঝতে পারছ? এবারে কথা হল যে, কে খুলে দিয়েছে। যে খুলে দিয়েছে, সে পরী ছাড়া আর কেউ হতে পারে কি? তোমার কি মনে হয়? পরীই দরজাটা খুলে দিয়ে মিষ্টিকে পালাতে সাহায্য করেছে। মিষ্টি ওর চোখের সামনে দিয়েই পালিয়েছে। আর তোমার কি মনে হয়, মা ও মেয়ের কাছে এটা জানতে চাইবে না যে, মেয়ে কোথায় যাচ্ছে? হয় পরী ওকে পালানোর জায়গা ঠিক করে দিয়েছে, নয়তো মিষ্টি ওকে এমন একটা জায়গায় যাওয়ার কথা বলেছে, যেটা শুনে পরীর মনে হয়েছে যে, ওখানে মিষ্টি গেলে ওর কোন ক্ষতি হবে না। আমাদের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যই ওই চিঠি লেখানো হয়েছে। হুম লেখানো হয়েছে। কারণ বুদ্ধিটা পরীর মাথা থেকেই এসেছে। কি পরী আমি যা যা বললাম সমস্ত কিছু ঠিক তো?
বাকিটা বলি, এরপর মিষ্টি ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, আর পরী ওকে ঘরের দরজা বন্ধ করে ভিতরে বসে থাকে। যাতে আমরা এটা দূর থেকে বুঝতে না পারি যে, মিষ্টি ওর ঘরে নেই। এতটা ছল না করলেও পারতে পরী, না করলেও পারতে। তুমি কার সঙ্গে ছল করলে? নিজের পরিবারের সঙ্গে.........?”
এবার পরিণীতা বেশ রেগে বলল— “হুম ছল করেছি... ভালো করেছি। তোমরা সবাই আমার মেয়ের সর্বনাশ করবে আর আমি মা হয়ে চুপচাপ সবটা মেনে নেব? অসম্ভব... মিষ্টি যে ছেলেটাকে পছন্দই করে না, তার সঙ্গে ও সারা জীবন কাটাবে কেমন করে?”
এবার পরিণীতার শ্বশুর-শাশুড়ি প্রায় চিৎকার করে একসঙ্গে বলে ওঠে— “বৌমা তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?”
শাশুড়ি আবারও বলে— “অন্যান্য সব বউদের থেকে তোমাকে আমরা সবাই বেশি বেশি করে ভালবেসেছি। সবসময় তোমার কি ভালো লাগবে সেটা ভেবেছি। আর তুমি কি করলে? এইভাবে আমাদের মুখ ডোবালে? আর একটু পরেই সবাই জানতে পারবে যে, বিয়ের কনে পালিয়ে গেছে। তখন আমাদের বংশের বদনাম হবে। এই জিনিসটা একবার ভেবে দেখেছো? আমাদের ভালোবাসার এই প্রতিদান দিলে? যদি তোমার মেয়েকে বাড়ি থেকে পালানোর হতো, তাহলে অন্ততপক্ষে সকালে বের করে দিতে পারতে। এইরকম বিয়ের কিছুক্ষণ আগে এই ঘটনাটা ঘটানোর কি দরকার ছিল? যদিও এই ঘটনাটা ঘটিয়ে তুমি শুধুমাত্র যে আমাদের বিপদ বাড়ালে তা নয়, তোমার নিজের মেয়েরও বিপদ বাড়ালে। মানে আমাদের মুখ ডোবানোর কথা যদি নাও ধরি আর কি। সেইসব ঘটনা তো আর তুমি জানো না।”
কিন্তু পরিণীতা কিছু বলার আগেই ওর মেজো জা বলে ওঠে— “আগেই বলেছিলাম এত ভালোবাসা না দিতে। ওর মতিগতি যে ঠিক নয়, আমি অনেকদিন আগেই বুঝে ছিলাম। তোমরা ওর অভিনয়ে গলে গেলেও আমি কিন্তু......”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই পরিণীতা বলল— “বাহ মেজ দিভাই বাহ... আমি অভিনয় করছিলাম, তাও দীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে? একটা মানুষ এত বছর ধরে অভিনয় করতে পারে বুঝি? তা তুমি অভিনয়টা করলে না কেন? ঠিক আছে তুমি না হয় করোনি। তুমি খুব ভালো মানুষ। কিন্তু তোমাদের সবার মতে আমি তো খারাপ। মানে আমি খুবই খারাপ। আমাকে ভালোবেসে তোমরা ভুল করেছো। তা আমি যখন এতই খারাপ, তখন আমি এই বাড়ি চলে আজকেই চলে যাচ্ছি।”
এমন সময় মামদিদার গলা শোনা যায়— “তোমরা সবাই চুপ করো, আর আমার সঙ্গে এক্ষুণি এই মুহূর্তে বিয়ের মন্ডপের চলো।”
কেউ আর কোনও কথা বলার সাহস করে না। মামদিদার বয়স হলে গেলেও কেউ তার কথা অমান্য করতে পারে না।
মামদিদা সবার প্রথমে পাত্রপক্ষের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিজেদের সমস্যাটা খুলে বলে। স্বাভাবিক ভাবেই বিভিন্ন রকম তীর্যক মন্তব্য ওদের দিকে ধেয়ে আসতে থাকে। কিন্তু মামদিদার নির্দেশ ছিল বলে কেউ কিছু বলতে পারে না।
এদিকে ওদের দিকে কোনও রকম কোনও প্রতিবাদ না আসায় ধীরে ধীরে সবাই ওই বিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়। নিমন্ত্রিত অতিথিরাও কেউ নেই। লগ্ন বেশ অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কনে কেন মণ্ডপে আসছে না, তা দেখার জন্য দু-একজন রয়ে গিয়েছিল। আসলে কিছু মানুষ থাকে যারা মজা লুটতে ভালোবাসে। অবশ্য বরযাত্রীদের পক্ষ থেকে সেই রকম কোনো বাধা আসেনি। তার কারণ, কোথাও গিয়ে ওদের মনেও ছিল যে, মিষ্টির অমতে এই বিয়ে হচ্ছে। তাই যে কোনও সময় যা কিছু হতে পারে। ওরা যেন এক প্রকার প্রস্তুত ছিল এইরকম একটা পরিস্থিতির জন্য। আর তাছাড়া পাত্রের বাবা নীলাংশুর বন্ধু। সেই কারণেই আরও বেশি করে ওর সমস্যাটা বুঝতে পেরেছিল মনে হয়।
যাইহোক... পুরো বিয়ের মন্ডপ ফাঁকা হয়ে যায়। খাঁ খাঁ করছে চারিদিক। এই কিছুক্ষণ আগেও জমজমাট হয়েছিল এই বিয়ের মন্ডপটা।
মামদিদা সবার উদ্দেশ্যে বলল— “তোমরা সবাই রাতের খাওয়া সেরে বসার ঘরের জমা হও। আজ আমি ছোট নাতবউকে কিছু কথা বলব। আর আমি চাই তোমরা সেইসময় ওইখানে উপস্থিত থাকো। প্রত্যেকে মনে রেখো, এটা আমার অনুরোধ নয়, আদেশ। আর ছোটরা নিজের নিজের ঘরে চলে যেও। বড় বউ, আমি এখন বললাম যা যা বললাম, তা যেন যথাযথভাবে পালন হয়, সেটা দেখার দায়িত্ব তোমার।”
ইচ্ছা না থাকলেও মামদিদার আদেশের জন্য সবাই খাবারের থালা হাতে তুলে নেয়। কিন্তু ভালোভাবে কেউই খেতে পারে না। মামদিদাকে খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। একে একে সবাই এসে বসার ঘরের হাজির হল। আর ছোটরা চলে গেল দোতালায় যে যার ঘরে।
৩
সবাই নিজ নিজ আসন গ্রহণ করার পরে মামদিদা বলল— “আজ এখন আমি ছোট নাত বউকে এই বাড়ির ইতিহাস বলব। এখানে উপস্থিত প্রত্যেকের সেই ইতিহাস জানলেও আমি চাই আরও একবার তোমরা সেই কাহিনী শোনো। সেই কাহিনী যে কতটা ভয়ংকর সেটা আবারও উপলব্ধি করো। আর আমি যদি কোন ভুল করে ফেলি, তাহলে সেটা ধরিয়ে দিও। আসলে বয়সের ভারে এখন অনেক কিছু ভুলে যাচ্ছি। যদিও এই কাহিনী ভুলে যাওয়ার মতো নয়। কিন্তু তবুও বলা তো যায় না। আর যদি তোমরা কিছু ভুল শুনেছ বা ভুল বুঝে থাকেছ, সেটাও আমাকে প্রশ্ন করে জেনে নিতে পারবে।
এবার তোকে একটা কথা বলি ছোট নাত বউ। এতদিন তুই অন্ধবিশ্বাস কুসংস্কার এইসব বলে আমাদের এই রাজবাড়ির কাহিনী শুনতে চাসনি। আমিও তোকে জোর করে শোনাতে চাইনি। কিন্তু তুই যে তার বিনিময়ে আমাদের প্রত্যেকের জীবনে এমন একটা মৃত্যুবাণ ডেকে আনবি, সেটা আমি বুঝতে পারিনি। আমার আর কি বল। বয়স হয়েছে। আজ না হয় কাল ঠিক চলে যাব। কিন্তু চলে যাওয়ার আগে যে, নিজের পরিবারের ধ্বংস নিশ্চিত সেটা জেনে যাব, আশা করিনি সেটা। কিন্তু যে ভুল আমি করেছি, তার প্রায়শ্চিত্ত আমিই করব। আমি তোকে ভালোবেসে তোর উপরে কোন জোর খাটাতে চাইনি। কিন্তু আজকে খাটাব। আমার মনে হয়েছে তুই যদি আমাদের পরিবারের কাহিনী নাও শুনিস, তবুও আমাদের পরিবারে প্রত্যেকটা নিয়ম যথাযথভাবে পালন করবি। কিন্তু না…! তুই আজকে তোর মেয়েকে পালাতে সাহায্য করে আমার এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছিস। সেই কারণেই আমি তোর উপরে আজকের জোর খাটাব। আমি তোকে জানিয়ে যাব যে, কেমন করে তুই এই রাজপরিবারের ধ্বংসের কারণ হলি।
এই পরিবার একটু একটু করে ধ্বংস হবে। আর তুই তা দেখবি আর অনুতপ্ত হবি যে, আজকের এই মারাত্মক ভুলটা তুই কেন করলি। এটাই হবে আজকে করা তোর অন্যায়ের শাস্তি। আমি বেঁচে থাকতে এই বাড়ি থানা পুলিশের মুখ দেখবে না।তাই...... তা না হলে এই মুহুর্তে আমি পুলিশে খবর দিতাম। যাই হোক......
আমি তোকে বারবার বলছি যে, আমাদের পরিবার ধ্বংস হবে। কিন্তু কাহিনী শুনলে বুঝতে পারবি, যে ভুলটা তুই আজকে করলি, সেটা শুধুমাত্র আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করে ক্ষান্ত হবে, তার নিশ্চিত ভাবে কেউ বলতে পারবে না। কাহিনী শোনার পরে তুইও বলতে পারবি না।”
নিলাংশু বলে- "এতো কথা না বলে পুলিশকে ডাকলে তো ঝামেলা মিটে যায়।"
-"না একদম না। কাহিনী শোনার পরে ছোট নাত বউয়ের যদি মনে হয় যে মেয়েকে সে ডেকে আনতে, তাহলে আনবে। নয়তো সব ধ্বংস হবে। কিন্তু পুলিশ আসবে না। পুলিশ বাড়িতে ঢোকার থেকে আমাদের সবার মৃত্যুই ভালো।"
মামদিদার এমন কড়া কড়া কথা শুনে ঘরের ভিতরে এক চরম নিস্তব্ধতা নেমে আসে। যেন একটা পিন পড়লেও আওয়াজ হবে। সবার ভিতর মৃত্যুভয় চেপে বসে। কারণ সবাই জানে যে, পরিণীতা নিজে যেটা ঠিক বলে মনে করে, তার জন্য সে কি কি করতে পারে। যদিও ওর এই জেদের জন্য কোনদিনও কারোর ক্ষতি হয়নি। কিন্তু আজকে...... কেউ কোনো কথা বলার ভাষা খুঁজে পায় না। পরিণীতা একবার বলে— “ঠাম এটা তুমি......”
কিন্তু ওকে শেষ করতে না দিয়েই মামদিদা বলে ওঠে— “চুপ একদম চুপ। এতদিন তুই তোর ঠামের ভালোবাসা দেখেছিস। আর এখন দেখবি শাসন। যাইহোক এখন এসব কথা ছাড়। আমি আমার কাহিনী শুরু করছি। তবে আরও একটা কথা, এই কাহিনী শেষ না হওয়া অব্দি কেউ নিজের জায়গা ছেড়ে উঠবে না। কেউ ঘুমোবে না। মনে থাকে যেন।"
মামদিদা শুরু করলেন------
------ আজ থেকে অনেক অনেক বছর আগে একটা জায়গা ছিল। যার নাম ছিল কাঁকিনগর। এখন সেই জায়গার কেশিয়াপুর নাম হয়েছে। এখান থেকে কেশিয়াপুরের দূরত্ব প্রায় আশি নব্বই কিলোমিটার। আমি আমার কাহিনীতে কেশিয়াপুরকে কাঁকিনগর বলেই সম্বোধন করব। এতে কাহিনীর ধারা বজায় থাকবে।
যে সময়ের কাহিনী বলছি, সেই সময়ে কাঁকিনগরের রাজ সিংহাসনে বিরাজমান ছিলেন রাজা বৃজেন্দ্র সিংহ রায় আর তারা রানী ছিলেন হৈমন্তী।
রাজা বৃজেন্দ্র রানী হৈমন্তীকে বিয়ে করেছিলেন ভালোবেসে। এই ভালোবাসা কিন্তু যে সে ভালোবাসা নয়। এই ভালোবাসা ছিল আদি অনন্ত। রাজা বৃজেন্দ্র তার রানীর জন্য প্রাণ দিতে পারতেন, প্রাণ নিতে পারতেন। পাগলের মত ভালোবাসতেন রানীকে।
আর রাজার এই ভালবাসার ফায়দা নিয়েছিল মহামন্ত্রী। রাজা বৃজেন্দ্র ওনার রানীকে ভালবেসে রাজপাট থেকে নিজের মনোনিবেশ তুলে নিয়েছিলেন। সেই সুযোগে মহামন্ত্রী নিজেকে রাজা ভাবতে শুরু করেছিল। অবশ্য রাজা বৃজেন্দ্রই সমস্ত দায়িত্ব মহামন্ত্রীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ভাবতে পারেনি যে, যাকে বিশ্বাস করে তিনি সমস্ত দায়িত্ব দিলেন, সেই ওনাকে ধোঁকা দেবে।
মহামন্ত্রী রাজার বানানোর সব নিয়ম বদলে দিয়ে নিজের ইচ্ছা খুশিমতো রাজ্য শাসন করতে থাকে। প্রজাদের উপর অত্যাচার করে, রাজার নির্ধারিত করের থেকে দ্বিগুন কখনও তিনগুণ কর আদায় করতে থাকে। আর এই দ্বিগুণ-তিনগুণ কর আদায়ের জন্য ওদের যা যা করতে ইচ্ছা হতো তাই তাই করত। প্রজাদের চিৎকার রাজার রানীর প্রতি যে ভালোবাসা, সেটা ভেদ করে রাজার কান অব্দি পৌঁছাত না।
কিন্তু একদিন রাজমাতার সামনে সবকিছু চলে আসে। আসলে রাজমাতার মনে মধ্যে একটা সন্দেহ অনেকদিন ধরেই তৈরি হয়েছিল। আর সেই সন্দেহ থেকেই তিনি নিজের কিছু বিশ্বস্ত লোককে গোপনে সব খোঁজখবর নেওয়ার জন্য লাগিয়েছিলেন। আর সেখান থেকেই তিনি সমস্ত কিছু জানতে পেরে জান।
এইদিকে হাজার চেষ্টা করেও তিনি নিজের ছেলেকে আবার সেই আগের মত রাজকাজে মনোনিবেশ করাতে পারছিলেন না। রাজ্যে যেন হাহাকার পড়ে গিয়েছিল। এমন প্রেম রাজমাতা তার এত বছর বয়সে কখনও দেখেননি। কিন্তু তাহলে উপায়?
রাজমাতা যে তাঁর ছেলের বউয়ের প্রতি যে ভালবাসা, তা দেখে হিংসা করবেন, এমন মানুষ তো তিনি নন। কিন্তু ওই ভালোবাসাই যখন এমন বিপদ হিসেবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তখন তিনি আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। বউ যা ভাবার ভাববে ভেবে তিনি একটা সুযোগ বুঝে উপস্থিত হন রানী হৈমন্তীর সামনে।
তারপর বলেন— ‘মা রে একটা সুযোগ পেয়েই আমি তোর কাছে এসেছি। আমি যখন তোকে কথাগুলো বলব, তোর মনে হবে আমি তোর ভালো সহ্য করতে পারছি না। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমাকে আমার প্রজার স্বার্থে এই কথাগুলো বলতেই হচ্ছে। আমাকে নিজের শত্রু ভাবিস না।’
রানী হৈমন্তী এই কথাগুলো শুনে বেশ অবাক হন। প্রায় ছয় মাস হলো ওনাদের বিয়ে হয়েছে। বিশেষ কিছুই জানেন না। জানার সুযোগও পাননি। তার কারণ, তিনি নিজেও স্বামীর প্রেমে মশগুল থেকেছেন। তাই বিস্ময়ের সুরেই বললেন—‘এটা আপনি কি বলছেন, আমি কিছু বুঝতে পারছি না…!’
রাজমাতা, রাজা বৃজেন্দ্রর নিজের রাজকার্যের অনীহা আর সেই সুযোগে দুষ্টুলোকের মাথা চাড়া দেওয়া, সবকিছুই বিস্তারিত ভাবে বলেন। এবং সবশেষে এটা বলেন যে, রানী হৈমন্তীকে তার বাবা রাজা বৃজেন্দ্রর সঙ্গে এই জন্যই বিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি একজন দক্ষ ও সৎ রাজা। তাঁর রাজ্যে প্রজারা সুখে রয়েছে। কিন্তু তিনি যদি জানতে পারেন যে, ওনার জামাইয়ের এমন অবনতি হয়েছে, তাহলে তিনি কি গর্ববোধ করবেন? রানী হৈমন্তীর কি মুখ উজ্জ্বল হবে?
সবকিছু শোনার পরে রানী হৈমন্তী জানতে চান যে, তিনি কেমন করে রাজা বৃজেন্দ্রকে রাজি করাবেন আবার সেই আগের মত সবকিছু করতে? রাজমাতা এই ব্যপারে যা কিছু ঠিক করেছিলেন, সেই সমস্ত কিছুই রানী হৈমন্তীকে বলে সেখান থেকে চলে যান।
সব শুনে রানী হৈমন্তী দু'দিন সময় চেয়ে নেন রাজমাতার থেকে। আর দু’দিন পরে রাজা বৃজেন্দ্র যথারীতি একটুক্ষণ রাজসভায় থেকে আবার চলে যান হৈমন্তীর কক্ষে।
এখানে বলে রাখি, রাজা রানী, স্বামী-স্ত্রী হলেও ওনাদের কক্ষ কিন্তু আলাদা আলাদা থাকত। আসলে তখনকার দিনে একজন রাজা চাইলে একের অধিক বিবাহ করতে পারত। তারপর যখন যেই রানীর সঙ্গে সময় কাটাতে ইচ্ছে হতো, তখন রানীর কক্ষে উপস্থিত হত। কিন্তু রাজা বৃজেন্দ্র হৈমন্তীর প্রেমে এতো মশগুল ছিলেন যে, ওনার পক্ষে আবার বিবাহ করা হয়তো সম্ভব ছিল না। কিন্তু নিয়মানুসারে রানী হৈমন্তীর কক্ষ আলাদা ছিল।
ঐদিন রাজা বৃজেন্দ্র রানী হৈমন্তীর কক্ষে গেলে, তিনি আর আগের মতো নিজের স্বামীকে বাহুডোরে নিজেকে আবদ্ধ করেন না। উল্টে একটু দূরত্ব বজায় রাখেন। আর তা দেখে রাজা বৃজেন্দ্র একটু অবাক হন। অভিমান হয়েছে ভেবে তিনি জোর করে রানী হৈমন্তীকে ধরতে গেলে, তিনি প্রচণ্ড রেগে যান। একটু জোরেই বলে ওঠেন— “ছোঁবেন না আপনি আমাকে রাজামশাই......”
অবাক হয়ে যান রাজা বিরেন্দ্র। বললেন— “কেন কি হয়েছে হৈম?”
আগের মত একই রকমভাবে রানী বললেন— “যে রাজ্যের রাজা নিজের ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য নিজের প্রজাদেরকে অবহেলা করে, তাদের কষ্টকে দেখেও না দেখার ভান করে, সেই রাজাকে ভালোবাসা তো দূর, আমার স্বামী বলে মানতেও কষ্ট হচ্ছে। আপনি যা শুরু করছেন তাতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আপনার এই ভালোবাসা আমার চাই না। প্রজাদের চোখের জলের বিনিময়ে আমি আমার স্বামীর ভালোবাসা নিয়ে ভালো থাকতে পারব না। যদি আপনি আবার আগের মত কর্তব্যপরায়ন রাজা হয়ে দেখাতে পারেন, তবেই আপনি আমাকে পাবেন, নয়তো আমি স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করব। এই কথাগুলো আমি বলার জন্য বলছি না, করে দেখাব।”
এই কথাগুলো শুনে রাজা বৃজেন্দ্র খুব আঘাত পান। কিন্তু যত যাই হয়ে যাক না কেন, কোন কিছুর বিনিময়ে তিনি তার স্ত্রীকে খাওয়াতে পারবেন না। তবে রানীর ওই কড়া কড়া কথায় ওনার চোখের সামনে থেকে যে প্রেমের পর্দাটা ছিল, সেটা সরে যায়।
আসলে যতই হোক পুরুষ মানুষ তো, তায় আবার রাজা। তাহলে তোমার নিজের রানী তথা এক জন নারীর কাছে অপমানিত হয়েছেন। সেটা মানতে ওনার কষ্ট হচ্ছিল। আর সেই কারণেই মুহূর্তের মধ্যেই প্রেম নামক বস্তুটা চোখের সামনে থেকে সরে যায়।
আবার এই কথাটাও ঠিক যে, তিনি রানী হৈমন্তীকে মন থেকে প্রচন্ড ভালোবাসেন। আর সেই রানী মৃত্যুবরণ করবেন, আর সেটা তিনি মেনে নেবেন, তা তো হতে পারে না।
তাই মুখে বললেন— “আজ আমি তোমার থেকে অনেক বড় আঘাত পেলাম। জানি না তোমাকে সেই আগের মত ভালবাসতে পারব কিনা। কিন্তু হ্যাঁ, তোমাকে হারাতেও পারব না। তাই কথা দিচ্ছি, এক মাসের মধ্যে আমি আমার রাজ্যকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাব। দোষীদের শাস্তি দেব। তুমি আজকে এই ব্যবহারটা করে প্রজাদের ভালো করলে। কিন্তু.........” আর কিছু না বলে তিনি বাইরে বেরিয়ে যান। কিন্তু পুরোপুরি বাইরে বেরোতে গিয়েও দাঁড়িয়ে যান। পিছন ঘুরে আবারও বললেন— “এই একমাস তুমি আমার মুখ দর্শন অব্দি করবে না। আর হ্যাঁ, এটা তোমার স্বামী নয়, একজন রাজার আদেশ। তারপর সেখান থেকে চলে যান।
আড়াল থেকে এই সমস্ত কথা শুনে ফেলে রাজার সৎ মায়ের এক বিশ্বস্ত দাসী। ঝড়ের বেগে রাজবাড়ির অন্দরমহলে রাজা ও রানীর এই কথোপকথন ছড়িয়ে পড়ে। আর স্বাভাবিক ভাবেই রাজমাতার কানেও সেই খবর গিয়ে পৌঁছায়। এইসব শোনার পরে তিনি তৎক্ষণাৎ ছুটে যান রানী হৈমন্তীর কাছে। কারণ, রাজাকে রানী হৈমন্তী যে খুব ভালবাসেন, সেটা রাজমাতা খুব ভাল করেই জানেন। সেখানে সেই ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে এমন ভাবে কথা বলতে হয়েছে মানে, তিনি যে স্বাভাবিক অবস্থায় থাকবেন না, সেটা রাজমাতা খুব ভালোমতো বুঝতে পেরেছিলেন।
তাড়াতাড়ি করে গিয়ে পৌঁছান রানী হৈমন্তীর কক্ষে। দেখেন আলুথালু ভাবে তিনি ওনার ঘরে রাখা ভগবানের মূর্তির সামনে বসে কাঁদছেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই যে রানী হৈমন্তীর এই রকম অবস্থা হতে পারে, তা চোখে না দেখলে কেউ সহজে বিশ্বাস করবে না। আর রানী হৈমন্তী এই সমস্ত কিছু করেছেন রাজমাতার পরামর্শ মতই। তাই সেই মুহূর্তে রাজমাতার নিজেকে বড্ড অপরাধী বলে মনে হল। তিনি রানী হৈমন্তীর পাশে বসে ওনার কাছ থেকে ক্ষমা ভিক্ষা চান। কিন্তু রানী হৈমন্তী জানান যে, উনি রাজমাতার নির্দেশ মতো নয়, সেই সময় উনি যা যা বলেছেন সবটাই মন থেকে বলেছেন। উল্টে তিনি রাজমাতার কাছে ক্ষমা চেয়ে বলেন যে, উনি রাজমাতার থেকে দুইদিন সময় চেয়েছেন এটা দেখার জন্য যে, রাজমাতা যা যা কথা ওনাকে বলেছিলেন, তা সমস্ত সত্যি কথা কিনা। রাজমাতাকে সন্দেহ করার জন্য তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।
কিন্তু রাজমাতা এই সমস্ত কথাবার্তাতে একটুও রাগ না করে বলেন যে, এটা তিনি একজন যোগ্য রানীর মত কাজ করেছেন। একজন রাজা বা রানীর কখনোই যেকোনো কারোর মুখের কথা বিশ্বাস করা উচিত নয়। যতই সেই কথা রাজমাতা নিজেই বলুক না কেন।
এরপর আরও নানা রকম কথাবার্তা বলে রানী হৈমন্তীকে কিছুটা শান্ত করে রাজমাতার নিজের ঘরে ফিরে যান। কিন্তু মনের ভিতর একটু শান্তি পান না। আসলে নিজের স্বার্থে রানী হৈমন্তীকে দিয়ে নিজের ছেলেকে আবার সেই আগের মত কর্তব্য পরায়ন রাজায় পরিণত করার চেষ্টা করলেও, ওনার এই পরিকল্পনার জন্যই যে ছেলে আর ছেলের বউয়ের এই মনোমালিন্য হয়েছে, সেটা তো আর অস্বীকার করা যায় না। রানী হৈমন্তী হয়তো সমস্ত কথা মন থেকে বলেছিলেন। কিন্তু উনি রাজ্যের এই অবস্থার কথা জানতে পেরেছিলেন তো রাজমাতার কাছ থেকেই।
এইদিকে রাজা বৃজেন্দ্র নিজের কক্ষে এসে রাগে ফুঁসতে থাকেন। তিনি আর ভালো রাজা নন, এত বড় কথাটা রানী হৈমন্তি কেমন করে বলতে পারলেন? ওনার এই রাগের মাঝখানে রাজমাতা সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন। তিনি রাজা বৃজেন্দ্রকে একবারের জন্যও এটা বুঝতে দেন না যে, তিনি প্রথম হৈমন্তীকে এইসব কথা বলেছিলেন। তার কারণ, তিনি চেয়েছিলেন এই রাগের বশে ছেলে যেন দেখতে পায় যে রাজার নাম করে কারা এই দুষ্কর্ম করে যাচ্ছে।
নিজের মাকে দেখতে পেয়ে রাজা বৃজেন্দ্র নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু রাজমাতা চান না যে তিনি শান্ত হয়ে যান। তাই তিনি বললেন— “তুই এতটা শান্ত কেমন করে আছিস? হৈমন্তী তোর উপরে যে অপবাদটা দিয়েছে, সেটা মোছার চেষ্টা করবি না? যদি সেই চেষ্টা করতে চাস তো আমাকে বলিস। আমার কাছে কিছু উপায় রয়েছে, যেটা তোকে দিলে আশা করি তুই সফল হবি।”
সঙ্গে সঙ্গে রাজা বৃজেন্দ্র নিজের সমস্ত কথা উজাড় করে নিজের মায়ের কাছে বলে দেন। রাজমাতা ওনাকে ছদ্মবেশে একবার রাজ্য পরিদর্শনে বেরোতে বলেন। তার কারণ রাজার বেশে বেরোলে সবাই তো বুঝে যাবে যে এই রাজা। আর তখন কেউ মন খুলে কথা বলতে পারবে না। কিন্তু ছদ্মবেশে বেরোলে আর পাঁচটা মানুষের মতোই ভেবে সবাই ওনার সঙ্গে কথা বলবে। আর সত্যিটা সামনে চলে আসবে। রাজমাতার পরামর্শ মতই একজন ভবঘুরের ছদ্দবেশ নিয়ে তিনি নিজের কক্ষের গোপন রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে যান। রাজমাতা ছাড়া আর কেউ জানতে পারে না সে কথা।
রাজা বৃজেন্দ্র নিজের রাজমহলের কাছের বাজারে সবার প্রথমে যান। সেখানে গিয়ে একটা দোকানে তিনি কিছু অর্থ সাহায্য চান। এখন উনি একজন ভবঘুরে, যার কাছে নিজের দিন গুজরান করার মতো অর্থটুকু নেই। দোকানের সামনে গিয়ে তিনি বললেন— “ভাই কিছু সাহায্য করতে পারবে? তাহলে একটু খাবার খেতে পারব।”
দোকানদার একটু যেন বিরক্তি হয় বলে— “এই যে চলে এসেছে আরও একজন। যা জিনিস বিক্রি হয়, তার বেশ কিছু অংশ তো তোমাদেরকে দিতেই শেষ হয়ে যায়। অবশ্য তোমাদেরই আর দোষ কি। এমন রাজার রাজ্যে ভিখারী থাকবে না তো আর কি থাকবে? দু’দিন পরে হয়ত আমরাও ভিখারীতে পরিণত হব।”
দোকানদারের মুখে এমন কথা শুনে চমকে ওঠেন রাজা বৃজেন্দ্র। যে রাজ্য আর রাজ্যবাসীকে তিনি সন্তান স্নেহের প্রতিদান করে এসেছেন, সেই রাজ্যবাসী আজকে ওনার সম্বন্ধে এমন কথা বলছে? কিন্তু কেন? তাহলে কি রানী হৈমন্তী যা যা বলেছিলেন, সমস্ত কিছুই সত্যি? এই কয়েক মাসে কি এমন হল যে, রাজ্যবাসীদের কাছে ওনার এমন একটা প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়েছে। এর আগে কোনদিনও তোর নিজের সম্বন্ধে তিনি এমন অপবাদ শোনেননি। সেই কারণে সমস্ত কিছু বিস্তারিত ভাবে জানার উদ্দেশ্যে বললেন— “আমি ভিখারী নই। সাথে কিছু পয়সা কড়ি ছিল। কিন্তু পথে ডাকাতি হয়ে যায়। তাই...... কিন্তু আমি তো শুনেছি এখানকার রাজা খুব ভালো। আর প্রজারাও ভীষণ ভালো। তাহলে আপনি এইরকম ভাবে বলছেন কেন?”
--“ও তাহলে তুমি হয়তো চার-পাঁচ মাস আগের কথা বলছ। তখন রাজা ভাল ছিল। কিন্তু তারপর.........” দোকানদার আরও কিছু কথা বলার আগেই ছদ্দবেশী রাজা বৃজেন্দ্র দেখেন, প্রায় সাত আটজনকে বেশ কয়েকজন সৈনিক দড়ি দিয়ে বেঁধে চাবুক দিয়ে মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছে। এটা দেখার পরে নিজের অজান্তেই রাজা বৃজেন্দ্রর চোখ থেকে জল বেরিয়ে আসে। ওনার রাজ্যে প্রজারা মার খাচ্ছে? এতটা অবনতি কবে হল?
সেই দোকানদার ওনার চোখের জল দেখে বলল— “একি ভাইয়া চোখে জল কেন? অবশ্য প্রথম প্রথম এইসব দেখে আমাদেরও খুব খারাপ লাগত। এখন প্রতিদিন দেখার কারণে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই আর খারাপ লাগে না।”
রাজা জানতে চান— “কিন্তু কিসের শাস্তি পাচ্ছে এরা?”
-“তোমার দেখছি ভীষণ জানার আগ্রহ। তাহলে বলছি শোনো---- এই বছর ভালো ফসল হয়নি। তাই প্রজাদের উপার্জিত অর্থও বেশ কম। কিন্তু আমাদের রাজার তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। তিনি তার নিজের নির্ধারিত করের দ্বিগুণ অর্থ কর হিসেবে আদায় করে নিচ্ছেন। প্রতিবাদ করলেই চলে মারধর। আর শুল্ক দিতে না পারলে রাজদরবারে নিয়ে গিয়ে তাদের শাস্তি ঘোষণা করা হয়। এখনও তোপের মুখে বসিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়। কখনও কয়েদি বানিয়ে রাখা হয়। অথচ আজ থেকে চার-পাঁচ মাস আগে এই রাজাই প্রজাদের দুঃখে দুঃখী হতেন। আসলে এখন তিনি অনেক বড় আর শক্তিশালী রাজ্যের জামাই বলেই হয়তো অহংকারে আমাদের রাজার এই অবনতি হয়েছে।”
সঙ্গে সঙ্গে রাজা বৃজেন্দ্র বললেন— “কিন্তু আমি তো এমন কিছুই.........” তৎক্ষণাৎ ওনার মনে পড়ে যায় যে, এখন তো তিনি আর রাজার বেশে নেই। তাই আর কিছু না বলে সেই গোপন পথেই নিজের কক্ষে ফিরে যান। নিজের চোখে দেখা সত্ত্বেও তিনি নিজের রাজ্যের এই অবনতি মানতে পারছিলেন না। তার মানে, ওনার রানী ওনাকে ঠিক কথাই বলেছিলেন। আর তিনি এইসব কিছু তো করেননি। তাহলে কে করছে? নাঃ এমনভাবে তিনি আর চলতে দেবেন না।
এই সমস্ত কিছু ঠিক করার উদ্দেশ্যে টানা একটা সপ্তাহ রাজা বৃজেন্দ্র ছদ্মবেশে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেরিয়ে দেখতে থাকলেন, ওনার স্বপ্ন রাজ্যের পতন। এমন কোনও অন্যায় নেই, যেটা ওনার রাজ্যে ওনার লোকের দ্বারা হচ্ছে না। শিশুহত্যা, নারী অপহরণ, নারীর সম্মান হানি, বিনা দোষে শাস্তি, দাসপ্রথা, আরও ভয়ানক ভয়ানক সব অন্যায়।
ওনার সৈনিকরা এই সমস্ত অন্যায় করছে দেখে, উনি ছদ্দবেশেই প্রতিবাদ করেছেন। আর যখনই বলেছেন যে, এইসব কথা তিনি রাজাকে জানাবেন, তখনই সেইসব অত্যাচারী সৈনিকরা ওনাকে রাজ সীলমোহর দেওয়া ফরমান দেখিয়ে বলেছে যে, তারা রাজার আদেশ পালন করছে। আর এইসব দেখার পরে তিনি বুঝতে পারেন যে, তিনি তো এমন কোনও প্রমান দেননি, এমন কোনও ফরমান জারি করার কথা ভাবতেও পারেন না। তাহলে এই ফরমান জারি করেছে কে? এমন কেউ একজন করেছে, যার কাছে রাজ সিলমোহর রয়েছে। কিন্তু কে বা কারা এইসব করছে? এই সমস্ত কিছুই ভাবতে ভাবতে তিনি রাজমহলের দিকে ফিরছিলেন। তার কারণ অনেক প্রমাণ তিনি চোখের সামনে পেয়ে গেছেন। এবার এর একটা বিহিত করা দরকার।
রাজমহলে ফেরার সময় রাত হয়ে যাওয়ায় একটা বাড়িতে তিনি আশ্রয় নেন। সেই রাতেই রাজার সৈনিকরা ওই গ্রামে লুটপাট চালাতে আসে। রাজা বৃজেন্দ্র একাই লড়াই করে গ্রামবাসীদের লুটপাটের হাত থেকে কোন রকমে বাঁচাতে পারলেও, এক সদ্যোজাতকে বাঁচাতে পারলেন না সেই লড়াইয়ে ওই সদ্যোজাতের প্রাণ যায়। যদিও রাজার হাতে এই বাচ্চাটার মৃত্যু হয় না। হয় তারই সৈনিকদের হাতে।
এইদিকে যার বাচ্চা মারা যায়, সে অনেক সাধ্য সাধনার পরে মা হতে পেরেছিল। হয়তো আর কোনদিন মা হতে পারবে না। সে তার সন্তানকে হারিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই পাগলের মত আচরণ করতে থাকে। তার গগনবিদারী চিৎকারে কাঁকিনগরের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে গেল।
একসময় সেই মায়ের কান্না থেমে যায়। চুল উস্কোখুস্কো চোখ দুটো লাল আলুথালু বেশ। সেই অবস্থায় সে তার মৃত সন্তানকে কোলে তুলে নেয়। তারপর চিৎকার করে বলে— “যে রাজার করা নিয়মে, যে রাজার নির্দেশে, আজ আমি সন্তান হারা হলাম, সেই রাজা কোন দিনও সন্তান সুখ পাবে না। কোনদিনও তার রানীর গর্ভে সন্তান হবে না। এটা একটা মায়ের অভিশাপ। এটা চলবে...”
আশেপাশের সবাই এই অভিশাপ শুনে চমকে ওঠে। আর রাজা বৃজেন্দ্র চিৎকার করে বলে ওঠেন— “না......আ...... একদম না। মিথ্যে সব অভিশাপ মিথ্যে। এমন কিছু করিনি আমি। আমি কিছু করিনি।” তারপর সেখান থেকে ছুটে পালিয়ে যান। ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে চলেন নিজের রাজমহলের দিকে। কোন বিশ্রাম না নিয়ে টানা দু'দিন ঘোড়া ছুটিয়ে গিয়ে পৌঁছান রাজমহলে। আর এতটা পরিশ্রম একসঙ্গে করার জন্য তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিন্তু এতকিছুর মধ্যেও তিনি এক মুহূর্তের জন্য সেই অভিশাপের কথা ভুলতে পারেননি।
অবাক হয়ে যান রাজা বিরেন্দ্র। বললেন— “কেন কি হয়েছে হৈম?”
আগের মত একই রকমভাবে রানী বললেন— “যে রাজ্যের রাজা নিজের ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য নিজের প্রজাদেরকে অবহেলা করে, তাদের কষ্টকে দেখেও না দেখার ভান করে, সেই রাজাকে ভালোবাসা তো দূর, আমার স্বামী বলে মানতেও কষ্ট হচ্ছে। আপনি যা শুরু করছেন তাতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আপনার এই ভালোবাসা আমার চাই না। প্রজাদের চোখের জলের বিনিময়ে আমি আমার স্বামীর ভালোবাসা নিয়ে ভালো থাকতে পারব না। যদি আপনি আবার আগের মত কর্তব্যপরায়ন রাজা হয়ে দেখাতে পারেন, তবেই আপনি আমাকে পাবেন, নয়তো আমি স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করব। এই কথাগুলো আমি বলার জন্য বলছি না, করে দেখাব।”
এই কথাগুলো শুনে রাজা বৃজেন্দ্র খুব আঘাত পান। কিন্তু যত যাই হয়ে যাক না কেন, কোন কিছুর বিনিময়ে তিনি তার স্ত্রীকে খাওয়াতে পারবেন না। তবে রানীর ওই কড়া কড়া কথায় ওনার চোখের সামনে থেকে যে প্রেমের পর্দাটা ছিল, সেটা সরে যায়।
আসলে যতই হোক পুরুষ মানুষ তো, তায় আবার রাজা। তাহলে তোমার নিজের রানী তথা এক জন নারীর কাছে অপমানিত হয়েছেন। সেটা মানতে ওনার কষ্ট হচ্ছিল। আর সেই কারণেই মুহূর্তের মধ্যেই প্রেম নামক বস্তুটা চোখের সামনে থেকে সরে যায়।
আবার এই কথাটাও ঠিক যে, তিনি রানী হৈমন্তীকে মন থেকে প্রচন্ড ভালোবাসেন। আর সেই রানী মৃত্যুবরণ করবেন, আর সেটা তিনি মেনে নেবেন, তা তো হতে পারে না।
তাই মুখে বললেন— “আজ আমি তোমার থেকে অনেক বড় আঘাত পেলাম। জানি না তোমাকে সেই আগের মত ভালবাসতে পারব কিনা। কিন্তু হ্যাঁ, তোমাকে হারাতেও পারব না। তাই কথা দিচ্ছি, এক মাসের মধ্যে আমি আমার রাজ্যকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাব। দোষীদের শাস্তি দেব। তুমি আজকে এই ব্যবহারটা করে প্রজাদের ভালো করলে। কিন্তু.........” আর কিছু না বলে তিনি বাইরে বেরিয়ে যান। কিন্তু পুরোপুরি বাইরে বেরোতে গিয়েও দাঁড়িয়ে যান। পিছন ঘুরে আবারও বললেন— “এই একমাস তুমি আমার মুখ দর্শন অব্দি করবে না। আর হ্যাঁ, এটা তোমার স্বামী নয়, একজন রাজার আদেশ। তারপর সেখান থেকে চলে যান।
আড়াল থেকে এই সমস্ত কথা শুনে ফেলে রাজার সৎ মায়ের এক বিশ্বস্ত দাসী। ঝড়ের বেগে রাজবাড়ির অন্দরমহলে রাজা ও রানীর এই কথোপকথন ছড়িয়ে পড়ে। আর স্বাভাবিক ভাবেই রাজমাতার কানেও সেই খবর গিয়ে পৌঁছায়। এইসব শোনার পরে তিনি তৎক্ষণাৎ ছুটে যান রানী হৈমন্তীর কাছে। কারণ, রাজাকে রানী হৈমন্তী যে খুব ভালবাসেন, সেটা রাজমাতা খুব ভাল করেই জানেন। সেখানে সেই ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে এমন ভাবে কথা বলতে হয়েছে মানে, তিনি যে স্বাভাবিক অবস্থায় থাকবেন না, সেটা রাজমাতা খুব ভালোমতো বুঝতে পেরেছিলেন।
তাড়াতাড়ি করে গিয়ে পৌঁছান রানী হৈমন্তীর কক্ষে। দেখেন আলুথালু ভাবে তিনি ওনার ঘরে রাখা ভগবানের মূর্তির সামনে বসে কাঁদছেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই যে রানী হৈমন্তীর এই রকম অবস্থা হতে পারে, তা চোখে না দেখলে কেউ সহজে বিশ্বাস করবে না। আর রানী হৈমন্তী এই সমস্ত কিছু করেছেন রাজমাতার পরামর্শ মতই। তাই সেই মুহূর্তে রাজমাতার নিজেকে বড্ড অপরাধী বলে মনে হল। তিনি রানী হৈমন্তীর পাশে বসে ওনার কাছ থেকে ক্ষমা ভিক্ষা চান। কিন্তু রানী হৈমন্তী জানান যে, উনি রাজমাতার নির্দেশ মতো নয়, সেই সময় উনি যা যা বলেছেন সবটাই মন থেকে বলেছেন। উল্টে তিনি রাজমাতার কাছে ক্ষমা চেয়ে বলেন যে, উনি রাজমাতার থেকে দুইদিন সময় চেয়েছেন এটা দেখার জন্য যে, রাজমাতা যা যা কথা ওনাকে বলেছিলেন, তা সমস্ত সত্যি কথা কিনা। রাজমাতাকে সন্দেহ করার জন্য তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।
কিন্তু রাজমাতা এই সমস্ত কথাবার্তাতে একটুও রাগ না করে বলেন যে, এটা তিনি একজন যোগ্য রানীর মত কাজ করেছেন। একজন রাজা বা রানীর কখনোই যেকোনো কারোর মুখের কথা বিশ্বাস করা উচিত নয়। যতই সেই কথা রাজমাতা নিজেই বলুক না কেন।
এরপর আরও নানা রকম কথাবার্তা বলে রানী হৈমন্তীকে কিছুটা শান্ত করে রাজমাতার নিজের ঘরে ফিরে যান। কিন্তু মনের ভিতর একটু শান্তি পান না। আসলে নিজের স্বার্থে রানী হৈমন্তীকে দিয়ে নিজের ছেলেকে আবার সেই আগের মত কর্তব্য পরায়ন রাজায় পরিণত করার চেষ্টা করলেও, ওনার এই পরিকল্পনার জন্যই যে ছেলে আর ছেলের বউয়ের এই মনোমালিন্য হয়েছে, সেটা তো আর অস্বীকার করা যায় না। রানী হৈমন্তী হয়তো সমস্ত কথা মন থেকে বলেছিলেন। কিন্তু উনি রাজ্যের এই অবস্থার কথা জানতে পেরেছিলেন তো রাজমাতার কাছ থেকেই।
এইদিকে রাজা বৃজেন্দ্র নিজের কক্ষে এসে রাগে ফুঁসতে থাকেন। তিনি আর ভালো রাজা নন, এত বড় কথাটা রানী হৈমন্তি কেমন করে বলতে পারলেন? ওনার এই রাগের মাঝখানে রাজমাতা সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন। তিনি রাজা বৃজেন্দ্রকে একবারের জন্যও এটা বুঝতে দেন না যে, তিনি প্রথম হৈমন্তীকে এইসব কথা বলেছিলেন। তার কারণ, তিনি চেয়েছিলেন এই রাগের বশে ছেলে যেন দেখতে পায় যে রাজার নাম করে কারা এই দুষ্কর্ম করে যাচ্ছে।
নিজের মাকে দেখতে পেয়ে রাজা বৃজেন্দ্র নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু রাজমাতা চান না যে তিনি শান্ত হয়ে যান। তাই তিনি বললেন— “তুই এতটা শান্ত কেমন করে আছিস? হৈমন্তী তোর উপরে যে অপবাদটা দিয়েছে, সেটা মোছার চেষ্টা করবি না? যদি সেই চেষ্টা করতে চাস তো আমাকে বলিস। আমার কাছে কিছু উপায় রয়েছে, যেটা তোকে দিলে আশা করি তুই সফল হবি।”
সঙ্গে সঙ্গে রাজা বৃজেন্দ্র নিজের সমস্ত কথা উজাড় করে নিজের মায়ের কাছে বলে দেন। রাজমাতা ওনাকে ছদ্মবেশে একবার রাজ্য পরিদর্শনে বেরোতে বলেন। তার কারণ রাজার বেশে বেরোলে সবাই তো বুঝে যাবে যে এই রাজা। আর তখন কেউ মন খুলে কথা বলতে পারবে না। কিন্তু ছদ্মবেশে বেরোলে আর পাঁচটা মানুষের মতোই ভেবে সবাই ওনার সঙ্গে কথা বলবে। আর সত্যিটা সামনে চলে আসবে। রাজমাতার পরামর্শ মতই একজন ভবঘুরের ছদ্দবেশ নিয়ে তিনি নিজের কক্ষের গোপন রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে যান। রাজমাতা ছাড়া আর কেউ জানতে পারে না সে কথা।
রাজা বৃজেন্দ্র নিজের রাজমহলের কাছের বাজারে সবার প্রথমে যান। সেখানে গিয়ে একটা দোকানে তিনি কিছু অর্থ সাহায্য চান। এখন উনি একজন ভবঘুরে, যার কাছে নিজের দিন গুজরান করার মতো অর্থটুকু নেই। দোকানের সামনে গিয়ে তিনি বললেন— “ভাই কিছু সাহায্য করতে পারবে? তাহলে একটু খাবার খেতে পারব।”
দোকানদার একটু যেন বিরক্তি হয় বলে— “এই যে চলে এসেছে আরও একজন। যা জিনিস বিক্রি হয়, তার বেশ কিছু অংশ তো তোমাদেরকে দিতেই শেষ হয়ে যায়। অবশ্য তোমাদেরই আর দোষ কি। এমন রাজার রাজ্যে ভিখারী থাকবে না তো আর কি থাকবে? দু’দিন পরে হয়ত আমরাও ভিখারীতে পরিণত হব।”
দোকানদারের মুখে এমন কথা শুনে চমকে ওঠেন রাজা বৃজেন্দ্র। যে রাজ্য আর রাজ্যবাসীকে তিনি সন্তান স্নেহের প্রতিদান করে এসেছেন, সেই রাজ্যবাসী আজকে ওনার সম্বন্ধে এমন কথা বলছে? কিন্তু কেন? তাহলে কি রানী হৈমন্তী যা যা বলেছিলেন, সমস্ত কিছুই সত্যি? এই কয়েক মাসে কি এমন হল যে, রাজ্যবাসীদের কাছে ওনার এমন একটা প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়েছে। এর আগে কোনদিনও তোর নিজের সম্বন্ধে তিনি এমন অপবাদ শোনেননি। সেই কারণে সমস্ত কিছু বিস্তারিত ভাবে জানার উদ্দেশ্যে বললেন— “আমি ভিখারী নই। সাথে কিছু পয়সা কড়ি ছিল। কিন্তু পথে ডাকাতি হয়ে যায়। তাই...... কিন্তু আমি তো শুনেছি এখানকার রাজা খুব ভালো। আর প্রজারাও ভীষণ ভালো। তাহলে আপনি এইরকম ভাবে বলছেন কেন?”
--“ও তাহলে তুমি হয়তো চার-পাঁচ মাস আগের কথা বলছ। তখন রাজা ভাল ছিল। কিন্তু তারপর.........” দোকানদার আরও কিছু কথা বলার আগেই ছদ্দবেশী রাজা বৃজেন্দ্র দেখেন, প্রায় সাত আটজনকে বেশ কয়েকজন সৈনিক দড়ি দিয়ে বেঁধে চাবুক দিয়ে মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছে। এটা দেখার পরে নিজের অজান্তেই রাজা বৃজেন্দ্রর চোখ থেকে জল বেরিয়ে আসে। ওনার রাজ্যে প্রজারা মার খাচ্ছে? এতটা অবনতি কবে হল?
সেই দোকানদার ওনার চোখের জল দেখে বলল— “একি ভাইয়া চোখে জল কেন? অবশ্য প্রথম প্রথম এইসব দেখে আমাদেরও খুব খারাপ লাগত। এখন প্রতিদিন দেখার কারণে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই আর খারাপ লাগে না।”
রাজা জানতে চান— “কিন্তু কিসের শাস্তি পাচ্ছে এরা?”
-“তোমার দেখছি ভীষণ জানার আগ্রহ। তাহলে বলছি শোনো---- এই বছর ভালো ফসল হয়নি। তাই প্রজাদের উপার্জিত অর্থও বেশ কম। কিন্তু আমাদের রাজার তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। তিনি তার নিজের নির্ধারিত করের দ্বিগুণ অর্থ কর হিসেবে আদায় করে নিচ্ছেন। প্রতিবাদ করলেই চলে মারধর। আর শুল্ক দিতে না পারলে রাজদরবারে নিয়ে গিয়ে তাদের শাস্তি ঘোষণা করা হয়। এখনও তোপের মুখে বসিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়। কখনও কয়েদি বানিয়ে রাখা হয়। অথচ আজ থেকে চার-পাঁচ মাস আগে এই রাজাই প্রজাদের দুঃখে দুঃখী হতেন। আসলে এখন তিনি অনেক বড় আর শক্তিশালী রাজ্যের জামাই বলেই হয়তো অহংকারে আমাদের রাজার এই অবনতি হয়েছে।”
সঙ্গে সঙ্গে রাজা বৃজেন্দ্র বললেন— “কিন্তু আমি তো এমন কিছুই.........” তৎক্ষণাৎ ওনার মনে পড়ে যায় যে, এখন তো তিনি আর রাজার বেশে নেই। তাই আর কিছু না বলে সেই গোপন পথেই নিজের কক্ষে ফিরে যান। নিজের চোখে দেখা সত্ত্বেও তিনি নিজের রাজ্যের এই অবনতি মানতে পারছিলেন না। তার মানে, ওনার রানী ওনাকে ঠিক কথাই বলেছিলেন। আর তিনি এইসব কিছু তো করেননি। তাহলে কে করছে? নাঃ এমনভাবে তিনি আর চলতে দেবেন না।
এই সমস্ত কিছু ঠিক করার উদ্দেশ্যে টানা একটা সপ্তাহ রাজা বৃজেন্দ্র ছদ্মবেশে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেরিয়ে দেখতে থাকলেন, ওনার স্বপ্ন রাজ্যের পতন। এমন কোনও অন্যায় নেই, যেটা ওনার রাজ্যে ওনার লোকের দ্বারা হচ্ছে না। শিশুহত্যা, নারী অপহরণ, নারীর সম্মান হানি, বিনা দোষে শাস্তি, দাসপ্রথা, আরও ভয়ানক ভয়ানক সব অন্যায়।
ওনার সৈনিকরা এই সমস্ত অন্যায় করছে দেখে, উনি ছদ্দবেশেই প্রতিবাদ করেছেন। আর যখনই বলেছেন যে, এইসব কথা তিনি রাজাকে জানাবেন, তখনই সেইসব অত্যাচারী সৈনিকরা ওনাকে রাজ সীলমোহর দেওয়া ফরমান দেখিয়ে বলেছে যে, তারা রাজার আদেশ পালন করছে। আর এইসব দেখার পরে তিনি বুঝতে পারেন যে, তিনি তো এমন কোনও প্রমান দেননি, এমন কোনও ফরমান জারি করার কথা ভাবতেও পারেন না। তাহলে এই ফরমান জারি করেছে কে? এমন কেউ একজন করেছে, যার কাছে রাজ সিলমোহর রয়েছে। কিন্তু কে বা কারা এইসব করছে? এই সমস্ত কিছুই ভাবতে ভাবতে তিনি রাজমহলের দিকে ফিরছিলেন। তার কারণ অনেক প্রমাণ তিনি চোখের সামনে পেয়ে গেছেন। এবার এর একটা বিহিত করা দরকার।
রাজমহলে ফেরার সময় রাত হয়ে যাওয়ায় একটা বাড়িতে তিনি আশ্রয় নেন। সেই রাতেই রাজার সৈনিকরা ওই গ্রামে লুটপাট চালাতে আসে। রাজা বৃজেন্দ্র একাই লড়াই করে গ্রামবাসীদের লুটপাটের হাত থেকে কোন রকমে বাঁচাতে পারলেও, এক সদ্যোজাতকে বাঁচাতে পারলেন না সেই লড়াইয়ে ওই সদ্যোজাতের প্রাণ যায়। যদিও রাজার হাতে এই বাচ্চাটার মৃত্যু হয় না। হয় তারই সৈনিকদের হাতে।
এইদিকে যার বাচ্চা মারা যায়, সে অনেক সাধ্য সাধনার পরে মা হতে পেরেছিল। হয়তো আর কোনদিন মা হতে পারবে না। সে তার সন্তানকে হারিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই পাগলের মত আচরণ করতে থাকে। তার গগনবিদারী চিৎকারে কাঁকিনগরের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে গেল।
একসময় সেই মায়ের কান্না থেমে যায়। চুল উস্কোখুস্কো চোখ দুটো লাল আলুথালু বেশ। সেই অবস্থায় সে তার মৃত সন্তানকে কোলে তুলে নেয়। তারপর চিৎকার করে বলে— “যে রাজার করা নিয়মে, যে রাজার নির্দেশে, আজ আমি সন্তান হারা হলাম, সেই রাজা কোন দিনও সন্তান সুখ পাবে না। কোনদিনও তার রানীর গর্ভে সন্তান হবে না। এটা একটা মায়ের অভিশাপ। এটা চলবে...”
আশেপাশের সবাই এই অভিশাপ শুনে চমকে ওঠে। আর রাজা বৃজেন্দ্র চিৎকার করে বলে ওঠেন— “না......আ...... একদম না। মিথ্যে সব অভিশাপ মিথ্যে। এমন কিছু করিনি আমি। আমি কিছু করিনি।” তারপর সেখান থেকে ছুটে পালিয়ে যান। ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে চলেন নিজের রাজমহলের দিকে। কোন বিশ্রাম না নিয়ে টানা দু'দিন ঘোড়া ছুটিয়ে গিয়ে পৌঁছান রাজমহলে। আর এতটা পরিশ্রম একসঙ্গে করার জন্য তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিন্তু এতকিছুর মধ্যেও তিনি এক মুহূর্তের জন্য সেই অভিশাপের কথা ভুলতে পারেননি।
পাঁচ দিনের মাথায় রাজা বৃজেন্দ্র একটু সুস্থ বোধ করলে, তিনি ওনার সবথেকে বিশ্বস্ত ব্যক্তি সেইসঙ্গে বন্ধু আমির আলী খাঁ-কে দায়িত্ব দেন এটা খুঁজে বের করার যে, কে রাজ শীলমোহরের প্রয়োগ করে রাজার আদেশ অমান্য করে, নিজের খুশিমতো নিয়ম বানিয়ে প্রজাদের নির্যাতন করছে। আর সেই সঙ্গে এটাও বলে দেন যে, যা করার তা অত্যন্ত গোপনে করতে হবে।
গোপনে এই তল্লাশি চালানোর একটাই কারণ। সেই কারণটা হলো, একমাত্র রাজার নিকট লোকেরা মানে রাজদরবারের খাস দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকেদের কাছেই রাজ শীলমোহর থাকত। সাধারণ মানুষের কাছে সেই শীলমোহর তো থাকতেই পারে না।
আমির আলী গোপনে তল্লাশি চালিয়ে আসল অপরাধীকে শনাক্ত করে রাজাকে খবর দেয়। তারপর দু’জনে ছদ্মবেশে ওইসব অত্যাচারিত প্রজাদের দলে শামিল হয়ে যান। যথারীতি সৈনিকরা না জেনেই ছদ্দবেশী রাজা আর তার বন্ধুকে নিয়ে হাজির হয় সেই ব্যক্তির কাছে, যে কিনা এতদিন ধরে এই সমস্ত কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে।
কিন্তু ওখানে গিয়ে ওনারা দেখেন, ওই দুষ্কর্মে তিনজন শামিল রয়েছে। আর যে তিনজন শামিল রয়েছে, তারা হল, রাজা বৃজেন্দ্র অত্যন্ত প্রিয় পাত্র। এই তিনজনের একজন রাজ মহামন্ত্রী, একজন রাজার সৎ ভাই আর একজন ওনার খুড়তুতো ভাই। এদেরকে তিনি খুব বিশ্বাস করতেন, ভালোবাসতেন। নিজে রানীর প্রেমে ডুবে থাকলেও তিনি এটা বিশ্বাস করতেন যে, ওনার এই আপনজনেরা ঠিক রাজ্যটাকে সামলে নেবে। কিন্তু রক্ষকই যে ভক্ষক হয়ে দেখা দেবে, তা তিনি মনের স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি।
ওই তিনজন যখন ওই নির্দোষ প্রজাদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে, তখন রাজা বৃজেন্দ্র আর চুপ করে থাকতে পারেন না। মুহূর্তের মধ্যেই ওনারা দুজনেই মুষ্টিমেয় সৈনিকদের হারিয়ে ওই তিনজনকে বন্দি করে নেন।
সেই রাতেই আবার বসে রাজসভা।
কিন্তু দোষীদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করতে পারলেন না তিনি। এতজন নির্দোষ মানুষের উপরে অন্যায় করলেও, তিনি নিজে এতটা নির্দয় হতে পারলেন না। তাই শাস্তি স্বরূপ ওই তিনজনের সমস্ত অধিকার কেড়ে নেন। ওদের সমস্ত সম্পত্তি নিজের দখলে নিয়ে নেন। তারপর ওদের উদ্দেশ্যে বলেন, ভোরের আলো ফোটার আগে ওরা যেন কাঁকিনগরের সীমানা অতিক্রম করে চলে যায়। যদি পরেরদিন সূর্যোদয়ের পরে ওদেরকে এই রাজ্যে দেখা যায়, তাহলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। এটা একটা সুযোগ মাত্র।
ওনার মুখে এই শাস্তি শুনে যথারিতি ওরা অনেক ক্ষমা ভিক্ষা করে। আর কোনদিনও এমন অপরাধ করবে না বলে প্রতিশ্রুতিও দেয়। রাজার অনুগত হয়ে থাকার কথা বলে। কিন্তু কোন কিছুর বিনিময়েই রাজা বৃজেন্দ্র সিংহ রায়ের মন গলাতে পারে না।
যখন কোন কিছু করে কোন লাভ হয় না, শাস্তিটা ঘোষণা হয়েই যায়, তখন মহামন্ত্রী হিংস্র ভাব দেখিয়ে বলে— ‘বৃজেন্দ্র সিংহ রায়, আপনি আমাকে এখনো চেনেন না। আপনি আমার সঙ্গে যেটা করলেন তার প্রতিশোধ আমি নিয়েই ছাড়ব। আজকে আমি চলে যাচ্ছি। কিন্তু ফিরব আবার ফিরব আমি। এই কাঁকিনগরের ধ্বংসের কারণ হব আমি। এই আজ আপনাকে কথা দিয়ে গেলাম।’
এইসব কথা শুনে রাজা বৃজেন্দ্র ততোধিক জোরে চিৎকার করে বলেন— ‘তোমার যা করার করে নাও। কিন্তু একটা জিনিস মাথার মধ্যে রেখে দাও। যদি তুমি এই রাজ্যে ফিরে আসো, তাহলে সেই দিনই হবে তোমার জীবনের শেষ দিন। আর হ্যাঁ, নিজের ভালো চাইলে এখন এই মুহূর্তে আর কোন কথা বলো না। এই স্থান পরিত্যাগ করাই তোমার জন্য সব থেকে ভালো হবে। তার কারণ, তুমি যদি আর একটা কথাও এখানে বলো, তাহলে এক্ষুনি তোমার শিরশ্ছেদের আদেশ আমি দেব।’
রাজার সেই হুমকিতে ওরা যেন একটু গুটিয়ে গেল। তারপর কোন কথা না বলে সেই স্থান ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু রাজমাতা সেই সময় ওদের চোখে এমন কিছু দেখেছিলেন, যে ওনাকে পুরোপুরি শান্তি দিলো না। তবে তিনি এটা ভেবে খুশি হলেন যে, ওনার ছেলে আবার সেই আগের অবতারে ফিরে এসেছে। রাজ্যে আবার শান্তি ফিরে আসবে। প্রজারা আবার হাসি খুশি থাকবে। প্রজাদের কাছ থেকে আবার রাজা আশীর্বাদ পাবে।
এই ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যে কাঁকিনগর আবার তার নিজস্ব রূপ ফিরে পায়। সমস্ত সত্যিটা সব প্রজাদের সামনে চলে আসে। তাই অভিশাপ দেওয়া সেই মা এসে হাত জোড় করে প্রণাম জানিয়ে নিজের অভিশাপ ফিরিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু এতসব কিছু হওয়ার মধ্যেও রাজা বৃজেন্দ্রর মনে শান্তি ফিরে আসে না। সেই মা যতই অভিশাপ ফিরিয়ে নিক না কেন, তার অভিশাপ দেওয়ার দিনটা তিনি ভুলতে পারেন না। কারণ, তিনি ছোটবেলা থেকে অনেকের কাছে শুনেছেন যে, একবার কেউ অভিশাপ দিলে, সেটা ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। তাই এই অভিশাপ আদৌ ফিরিয়ে নেওয়া গেছে কিনা, সেটা জেনে বুঝতে পারছেন না। তবে তিনি চেষ্টা করতে থাকেন নিজেকে শান্ত রাখার।
এরমধ্যেই একটা মাস হয়ে যায়।
রানী হৈমন্তী এই একটা মাস একটা বছরের মতো করে কাটিয়েছেন। এক একটা দিন তিনি রাজাকে না দেখে, না স্পর্শ করে, কেমন করে কাটিয়েছেন, তা তিনিই জানেন। হয়তো রাজা বৃজেন্দ্ররও খারাপ লেগেছে। তবে তিনি ওনার স্বামীর প্রতিটা পদক্ষেপে খবর রেখেছিলেন। আর যখন তিনি দেখলেন যে, ওনার স্বামী ওনাকে দেওয়া কথা রেখেছেন, তখন গর্ভে ওনার যেন আর মাটিতে পা-ই পড়ছিল না। স্বামীর আদেশ মেনে এই একমাস তিনি রাজার সামনে যাননি। কিন্তু একমাস পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন রাজার সামনে যেতে পারবেন। আর সেটা ভেবেই আনন্দে ওনার মন ভরে ওঠে।
দাসীকে ডেকে নববধূর সাজে সজ্জিত হয়ে তিনি এগিয়ে যান রাজার কক্ষের দিকে। যেদিন প্রথম তিনি নিজেকে রাজা বৃজেন্দ্রর বাহুডোরে নিজেকে পেয়েছিলেন, সেই দিন ঠিক যেইরকম অনুভূতি হয়েছিল, এই দিনও ঠিক সেই রকমই অনুভূতি হয় ওনার। কিন্তু সমস্ত আশায় জল পড়ে যায়, যখন তিনি জানতে পারেন যে রাজা মশাই তার নিজের কক্ষে নেই। তিনি কোথায় তা প্রহরীদের কেউ বলতে পারে না। বাধ্য করে নিজের কক্ষে ফিরে যান। আর সেখানেই সারারাত রাজার অপেক্ষায় বসে থাকেন। রাত পেরিয়ে যায়। কিন্তু রাজার আর দেখা মেলে না। রাজার সঙ্গে দেখা হয় না রানী হৈমন্তীর।
পরেরদিন রাজমাতা রানী হৈমন্তীর কাছে গিয়ে সবটা জানতে পারেন। সমস্ত কিছু শোনার পরে তিনি ঠিক করেন এবার ছেলে আর তার বউয়ের মধ্যে সমস্ত কিছু ঠিক করতে হবে। আর সেটা ওনার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। রানী হৈমন্তীর কক্ষ থেকে বেরিয়ে রাজমাতা নিজের ছেলের কাছে যান। সেখানে গিয়ে ছেলের সমস্ত কথা শুনে তিনি বুঝতে পারেন যে, আসলে রাজা বৃজেন্দ্রর মন থেকে অভিমানটা তখনও কাটেনি। আসলে কেউ যখন তার সব থেকে ভালবাসার মানুষের কাছে আঘাত পায়, তখন সেই অভিমানটাও মনে হয় সেই ভালবাসার মতই তীব্র হয়। কিন্তু রাজমাতা অত্যন্ত বুদ্ধিমতী একজন মহিলা। তাই তিনি নিজের বুদ্ধির দ্বারা নিজের ছেলে আর ছেলের বউয়ের মিল করাতে সমর্থ হন। আসলে কোথাও একটা ওনার মনে এটা ছিল যে, ছেলে আর ছেলের বউয়ের এই দূরত্বের কারণ তো কিছুটা হলেও তিনি নিজেই। তাদের মিল করাতে পেরে ওনার মনে বেশ অদ্ভুত ভালো লাগা বয়ে যায়।
পরের দিন গুলো সুন্দর কাটছিল। সুখ শান্তি বিরাজ করছিল চারিদিকে। কোনও রকম কোনও অশান্তির কোন আঁচ এসে পড়েনি। এর মধ্যেই রাজবৈদ্য জানান যে, রানী হৈমন্তী গর্ভবতী। পুরো রাজবাড়িতে উৎসব লেগে যায়। চারিদিকে সাজসাজ রব। প্রজারা এই খবরের আনন্দে মেতে ওঠে, তাদের পরবর্তী রাজাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। নিজেদের মধ্যেই উৎসব শুরু হয়ে যায়।
প্রসঙ্গত, তখন কিন্তু গর্ভবতী হলেই মানুষ ধরে নিতো ছেলেই হবে। আর যদি সে কোনও রানী হয়, তাহলে তো আরো বেশি করে ছেলে কামনা করা হতো। তার কারণ, সিংহাসনে তো রাজার ছেলেই বসতো।
এই খবরের রাজা বৃজেন্দ্র প্রচন্ড খুশিতে আনন্দে মেতে ওঠেন। সবথেকে ভালো ভালো বাছাই করা দাসীদের রানীর আশেপাশের শামিল করে দেন। তাদের কাজ শুধুই রানীর সেবা করা। কিন্তু হায়রে নিয়তি...... রানীর তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক ভয়ঙ্কর ঘটনায। রাতে ঘুমের মধ্যেই রানী হৈমন্তীর গর্ভপাত হয়ে যায়।”
এই কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আঁতকে ওঠে পরিণীতা। গর্ভস্থ সন্তানের এমন মৃত্যু যে ওর-ও হয়েছে। সেই ক্ষত আজও ওর মনের মধ্যে রয়ে গেছে। কত আশা করে সেই সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে চেয়েছিল ও। ওর প্রথম সন্তান ছিল সে। কিন্তু তাকে ও রাখতে পারেনি। পেটের মধ্যে থাকা অবস্থাতেই তাকে বিদায় জানাতে হয়েছিল। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল পরিণীতার।
কিন্তু মামদিদা থামলেন না। ওর দিকে একবার তাকিয়েই আবার বলতে থাকেন— "রানীর গর্ভপাতে রাজমহল শুধু নয়, পুরো কাঁকিনগরে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাজা বৃজেন্দ্রর এক ঝটকায় আবার পুরনো কথা মনে পড়ে যায়। সেই সঙ্গে এটাও মনে পড়ে যায় যে, একবার অভিশাপ দিলে তা আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। সেদিন একটা মা পুরো মনের গভীর থেকে রাজাকে অভিশাপ দিয়েছিল। তা কি এতো সহজে খন্ডন করা সম্ভব? আর ওনার মনের সেই ভয়টাই সত্যি হল। রাজা বৃজেন্দ্রর সন্তান জন্মের আগেই মারা গেল। সন্তানহারা হলেন রাজা বৃজেন্দ্র।
রাজমাতা নিজের দ্বারা যতটা সম্ভব ছেলেকে ছেলের বউকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু রাজা বৃজেন্দ্রকে কেউ কোনভাবেই শান্ত করতে পারে না। কিন্তু বলে না; সময়ের সব থেকে বড় মলম। বড় বড় আঘাত এই সময়ই ভুলিয়ে দিতে পারে।
রাজা বৃজেন্দ্র ক্ষেত্রেও তাই হল। আবার এক মাস মতো পরে রানী হৈমন্তী গর্ভবতী হন। আবারও সেই আগের মতো সাজ সাজ রব ওঠে চারিদিকে। কিন্তু নিয়তি আবার নিজের খেলা খেলে যায়। সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। তিন মাসের মাথায় ঘুমের ঘোরে রানী হৈমন্তীর গর্ভপাত হয়ে যায়। আবারও বিষাদ নেমে আসে সর্বত্র। রাজা-রানী দুজনেই মনের দিক থেকে ভেঙে পড়েন আবারও।
এমন করেই একের পর এক রানীর পাঁচ-পাঁচটা গর্ভস্থ সন্তান শেষ হয়ে যায়। আর প্রত্যেকবারই সেই তিন মাসের মধ্যেই সব শেষ।”
এবার পরিণীতা আর নিজের মুখ বন্ধ রাখতে পারে না। বারবার এমন সন্তান মৃত্যুর কথা ও আর শুনতে পারছিল না। বলে উঠল— “চুপ করো ঠাম চুপ করো। আমি আর নিতে পারছি না।”
এবারে মামদিদা আর ওর কথাটা এড়িয়ে গেলেন না। বললেন— “তুই পার আর নাই পার, শুনতে তো তোকে হবেই। এতদিন কই তোকে তো আমি জোর করিনি। কিন্তু আজ তুই যা করেছিস, তাতে তোকে এই কাহিনী শুনতেই হবে। যে পরিবারের তুই বউ, সেই পরিবারের অতীত সেই পরিবারের সমস্ত রকম নিয়ম কোন কিছুর দাম তোর কাছে নেই? অবশ্য তা তুই তোর কাজ দিয়েই প্রমাণ করে দিয়েছিস। তাহলে এখন এই কাহিনী শুনতে কষ্ট হচ্ছে। কেন ভেবে নে যে, এই কাহিনী একটা কুসংস্কার একটা অন্ধ বিশ্বাস।”
মামদিদার কথাগুলো ওর বুকে শেলের মত বিঁধল। ও ভাবতেই পারে না যে, ওর প্রিয় মানুষটা ওর সঙ্গে এরকম ভাবে কথা বলতে পারে। ওর কষ্ট ভরা মুখটা দেখে মামদিদার কষ্ট হল। কিন্তু আজকে তিনি নিরুপায়। পরিণীতাকে ওর ভুলটা বোঝানোর দায়িত্ব-কর্তব্য ওনার নিজের। তাই বললেন— “তোর একবার গর্ভপাতে যদি এতটা কষ্ট হয়, তাহলে ওই অত বছর আগে............ মানে এখন তুই দুই সন্তানের মা তাও সেই ক্ষত এখনো সারেনি। তাহলে সেই সময়ে রানী হৈমন্তী আর রাজা বৃজেন্দ্র মনের অবস্থা কি হয়েছিল আশা করি কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারছিস। এইবার বাকিটা শোন--------
পাঁচবার একই জিনিস দেখে রাজা বৃজেন্দ্র একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হন যে,শুধুমাত্র অভিশাপের জন্যই এটা হতে পারে না। এতদিন রাজমাতা বারবার সেই কথা বলা সত্ত্বেও তিনি সে কথা মানেন না। আসলে সেই অভিশাপের কথাগুলো ওনার মনে এতটা প্রভাব ফেলেছিল যে, আসল কথাটা মাথাতে ঢুকছিল না। কিন্তু এবার আর সব বারের মতো ভুল করলেন না তিনি।
হ্যাঁ ঠিকই বুঝেছিস তুই। রানীর হৈমন্তী আবার গর্ভবতী হন। আর এবারে রাজা বৃজেন্দ্র কাউকে সেই কথা জানতে দিলেন না। এমনকি রাজবৈদ্যকেও নিষেধ করে দেওয়া হল। এই কথা যেন কেউ জানতে না পারে। কাক-পক্ষীতেও যেন টের না পায়। রানী হৈমন্তীর গর্ভবতী হওয়ার খবর জানলেন শুধু মাত্র চারজন। রাজমাতা, রাজবৈদ্য, রানীর খাস দাসী সেইসঙ্গে বন্ধু আর রাজা নিজে।
আর সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় হল, রানীর গর্ভস্থ সন্তান কিন্তু তিন মাসের মধ্যে আর শেষ হলো না। অন্য বাচ্চাগুলো যে তিন মাসের মধ্যে মারা যাচ্ছিল, এক্ষেত্রে তা হলো না। আর সেটা দেখে রাজা বৃজেন্দ্র খুব খুশি হয়ে যান। আর কয়েকটা মাস সাবধানে রাখতে হবে। কিন্তু ভাগ্যের লিখন খণ্ডাবে কে? ভাগ্য নাকি অন্য কিছু.........!
রানী যখন ছয় মাসের গর্ভবতী। হঠাৎ করে রাজদরবারের ছুটে আসে রানীর সেই খাস দাসী। তাকে দেখে রাজা রাজি হয়ে যান তার সঙ্গে যেতে। বুঝতে পারেন মারাত্মক কিছু হয়েছে। নিজের সব কাজ সবকিছু ফেলে তিনি ছুটে যান রানীর কক্ষে। আর ওখানে গিয়ে তিনি যা দেখলেন তাতে তিনি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়লেন। চিৎকার করে প্রহরীদের ডেকে বললেন— “বাইরে যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হোক। কেউ যেন পালাতে না পারে।”
গোপনে এই তল্লাশি চালানোর একটাই কারণ। সেই কারণটা হলো, একমাত্র রাজার নিকট লোকেরা মানে রাজদরবারের খাস দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকেদের কাছেই রাজ শীলমোহর থাকত। সাধারণ মানুষের কাছে সেই শীলমোহর তো থাকতেই পারে না।
আমির আলী গোপনে তল্লাশি চালিয়ে আসল অপরাধীকে শনাক্ত করে রাজাকে খবর দেয়। তারপর দু’জনে ছদ্মবেশে ওইসব অত্যাচারিত প্রজাদের দলে শামিল হয়ে যান। যথারীতি সৈনিকরা না জেনেই ছদ্দবেশী রাজা আর তার বন্ধুকে নিয়ে হাজির হয় সেই ব্যক্তির কাছে, যে কিনা এতদিন ধরে এই সমস্ত কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে।
কিন্তু ওখানে গিয়ে ওনারা দেখেন, ওই দুষ্কর্মে তিনজন শামিল রয়েছে। আর যে তিনজন শামিল রয়েছে, তারা হল, রাজা বৃজেন্দ্র অত্যন্ত প্রিয় পাত্র। এই তিনজনের একজন রাজ মহামন্ত্রী, একজন রাজার সৎ ভাই আর একজন ওনার খুড়তুতো ভাই। এদেরকে তিনি খুব বিশ্বাস করতেন, ভালোবাসতেন। নিজে রানীর প্রেমে ডুবে থাকলেও তিনি এটা বিশ্বাস করতেন যে, ওনার এই আপনজনেরা ঠিক রাজ্যটাকে সামলে নেবে। কিন্তু রক্ষকই যে ভক্ষক হয়ে দেখা দেবে, তা তিনি মনের স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি।
ওই তিনজন যখন ওই নির্দোষ প্রজাদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে, তখন রাজা বৃজেন্দ্র আর চুপ করে থাকতে পারেন না। মুহূর্তের মধ্যেই ওনারা দুজনেই মুষ্টিমেয় সৈনিকদের হারিয়ে ওই তিনজনকে বন্দি করে নেন।
সেই রাতেই আবার বসে রাজসভা।
কিন্তু দোষীদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করতে পারলেন না তিনি। এতজন নির্দোষ মানুষের উপরে অন্যায় করলেও, তিনি নিজে এতটা নির্দয় হতে পারলেন না। তাই শাস্তি স্বরূপ ওই তিনজনের সমস্ত অধিকার কেড়ে নেন। ওদের সমস্ত সম্পত্তি নিজের দখলে নিয়ে নেন। তারপর ওদের উদ্দেশ্যে বলেন, ভোরের আলো ফোটার আগে ওরা যেন কাঁকিনগরের সীমানা অতিক্রম করে চলে যায়। যদি পরেরদিন সূর্যোদয়ের পরে ওদেরকে এই রাজ্যে দেখা যায়, তাহলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। এটা একটা সুযোগ মাত্র।
ওনার মুখে এই শাস্তি শুনে যথারিতি ওরা অনেক ক্ষমা ভিক্ষা করে। আর কোনদিনও এমন অপরাধ করবে না বলে প্রতিশ্রুতিও দেয়। রাজার অনুগত হয়ে থাকার কথা বলে। কিন্তু কোন কিছুর বিনিময়েই রাজা বৃজেন্দ্র সিংহ রায়ের মন গলাতে পারে না।
যখন কোন কিছু করে কোন লাভ হয় না, শাস্তিটা ঘোষণা হয়েই যায়, তখন মহামন্ত্রী হিংস্র ভাব দেখিয়ে বলে— ‘বৃজেন্দ্র সিংহ রায়, আপনি আমাকে এখনো চেনেন না। আপনি আমার সঙ্গে যেটা করলেন তার প্রতিশোধ আমি নিয়েই ছাড়ব। আজকে আমি চলে যাচ্ছি। কিন্তু ফিরব আবার ফিরব আমি। এই কাঁকিনগরের ধ্বংসের কারণ হব আমি। এই আজ আপনাকে কথা দিয়ে গেলাম।’
এইসব কথা শুনে রাজা বৃজেন্দ্র ততোধিক জোরে চিৎকার করে বলেন— ‘তোমার যা করার করে নাও। কিন্তু একটা জিনিস মাথার মধ্যে রেখে দাও। যদি তুমি এই রাজ্যে ফিরে আসো, তাহলে সেই দিনই হবে তোমার জীবনের শেষ দিন। আর হ্যাঁ, নিজের ভালো চাইলে এখন এই মুহূর্তে আর কোন কথা বলো না। এই স্থান পরিত্যাগ করাই তোমার জন্য সব থেকে ভালো হবে। তার কারণ, তুমি যদি আর একটা কথাও এখানে বলো, তাহলে এক্ষুনি তোমার শিরশ্ছেদের আদেশ আমি দেব।’
রাজার সেই হুমকিতে ওরা যেন একটু গুটিয়ে গেল। তারপর কোন কথা না বলে সেই স্থান ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু রাজমাতা সেই সময় ওদের চোখে এমন কিছু দেখেছিলেন, যে ওনাকে পুরোপুরি শান্তি দিলো না। তবে তিনি এটা ভেবে খুশি হলেন যে, ওনার ছেলে আবার সেই আগের অবতারে ফিরে এসেছে। রাজ্যে আবার শান্তি ফিরে আসবে। প্রজারা আবার হাসি খুশি থাকবে। প্রজাদের কাছ থেকে আবার রাজা আশীর্বাদ পাবে।
এই ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যে কাঁকিনগর আবার তার নিজস্ব রূপ ফিরে পায়। সমস্ত সত্যিটা সব প্রজাদের সামনে চলে আসে। তাই অভিশাপ দেওয়া সেই মা এসে হাত জোড় করে প্রণাম জানিয়ে নিজের অভিশাপ ফিরিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু এতসব কিছু হওয়ার মধ্যেও রাজা বৃজেন্দ্রর মনে শান্তি ফিরে আসে না। সেই মা যতই অভিশাপ ফিরিয়ে নিক না কেন, তার অভিশাপ দেওয়ার দিনটা তিনি ভুলতে পারেন না। কারণ, তিনি ছোটবেলা থেকে অনেকের কাছে শুনেছেন যে, একবার কেউ অভিশাপ দিলে, সেটা ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। তাই এই অভিশাপ আদৌ ফিরিয়ে নেওয়া গেছে কিনা, সেটা জেনে বুঝতে পারছেন না। তবে তিনি চেষ্টা করতে থাকেন নিজেকে শান্ত রাখার।
এরমধ্যেই একটা মাস হয়ে যায়।
রানী হৈমন্তী এই একটা মাস একটা বছরের মতো করে কাটিয়েছেন। এক একটা দিন তিনি রাজাকে না দেখে, না স্পর্শ করে, কেমন করে কাটিয়েছেন, তা তিনিই জানেন। হয়তো রাজা বৃজেন্দ্ররও খারাপ লেগেছে। তবে তিনি ওনার স্বামীর প্রতিটা পদক্ষেপে খবর রেখেছিলেন। আর যখন তিনি দেখলেন যে, ওনার স্বামী ওনাকে দেওয়া কথা রেখেছেন, তখন গর্ভে ওনার যেন আর মাটিতে পা-ই পড়ছিল না। স্বামীর আদেশ মেনে এই একমাস তিনি রাজার সামনে যাননি। কিন্তু একমাস পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন রাজার সামনে যেতে পারবেন। আর সেটা ভেবেই আনন্দে ওনার মন ভরে ওঠে।
দাসীকে ডেকে নববধূর সাজে সজ্জিত হয়ে তিনি এগিয়ে যান রাজার কক্ষের দিকে। যেদিন প্রথম তিনি নিজেকে রাজা বৃজেন্দ্রর বাহুডোরে নিজেকে পেয়েছিলেন, সেই দিন ঠিক যেইরকম অনুভূতি হয়েছিল, এই দিনও ঠিক সেই রকমই অনুভূতি হয় ওনার। কিন্তু সমস্ত আশায় জল পড়ে যায়, যখন তিনি জানতে পারেন যে রাজা মশাই তার নিজের কক্ষে নেই। তিনি কোথায় তা প্রহরীদের কেউ বলতে পারে না। বাধ্য করে নিজের কক্ষে ফিরে যান। আর সেখানেই সারারাত রাজার অপেক্ষায় বসে থাকেন। রাত পেরিয়ে যায়। কিন্তু রাজার আর দেখা মেলে না। রাজার সঙ্গে দেখা হয় না রানী হৈমন্তীর।
পরেরদিন রাজমাতা রানী হৈমন্তীর কাছে গিয়ে সবটা জানতে পারেন। সমস্ত কিছু শোনার পরে তিনি ঠিক করেন এবার ছেলে আর তার বউয়ের মধ্যে সমস্ত কিছু ঠিক করতে হবে। আর সেটা ওনার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। রানী হৈমন্তীর কক্ষ থেকে বেরিয়ে রাজমাতা নিজের ছেলের কাছে যান। সেখানে গিয়ে ছেলের সমস্ত কথা শুনে তিনি বুঝতে পারেন যে, আসলে রাজা বৃজেন্দ্রর মন থেকে অভিমানটা তখনও কাটেনি। আসলে কেউ যখন তার সব থেকে ভালবাসার মানুষের কাছে আঘাত পায়, তখন সেই অভিমানটাও মনে হয় সেই ভালবাসার মতই তীব্র হয়। কিন্তু রাজমাতা অত্যন্ত বুদ্ধিমতী একজন মহিলা। তাই তিনি নিজের বুদ্ধির দ্বারা নিজের ছেলে আর ছেলের বউয়ের মিল করাতে সমর্থ হন। আসলে কোথাও একটা ওনার মনে এটা ছিল যে, ছেলে আর ছেলের বউয়ের এই দূরত্বের কারণ তো কিছুটা হলেও তিনি নিজেই। তাদের মিল করাতে পেরে ওনার মনে বেশ অদ্ভুত ভালো লাগা বয়ে যায়।
পরের দিন গুলো সুন্দর কাটছিল। সুখ শান্তি বিরাজ করছিল চারিদিকে। কোনও রকম কোনও অশান্তির কোন আঁচ এসে পড়েনি। এর মধ্যেই রাজবৈদ্য জানান যে, রানী হৈমন্তী গর্ভবতী। পুরো রাজবাড়িতে উৎসব লেগে যায়। চারিদিকে সাজসাজ রব। প্রজারা এই খবরের আনন্দে মেতে ওঠে, তাদের পরবর্তী রাজাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। নিজেদের মধ্যেই উৎসব শুরু হয়ে যায়।
প্রসঙ্গত, তখন কিন্তু গর্ভবতী হলেই মানুষ ধরে নিতো ছেলেই হবে। আর যদি সে কোনও রানী হয়, তাহলে তো আরো বেশি করে ছেলে কামনা করা হতো। তার কারণ, সিংহাসনে তো রাজার ছেলেই বসতো।
এই খবরের রাজা বৃজেন্দ্র প্রচন্ড খুশিতে আনন্দে মেতে ওঠেন। সবথেকে ভালো ভালো বাছাই করা দাসীদের রানীর আশেপাশের শামিল করে দেন। তাদের কাজ শুধুই রানীর সেবা করা। কিন্তু হায়রে নিয়তি...... রানীর তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক ভয়ঙ্কর ঘটনায। রাতে ঘুমের মধ্যেই রানী হৈমন্তীর গর্ভপাত হয়ে যায়।”
এই কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আঁতকে ওঠে পরিণীতা। গর্ভস্থ সন্তানের এমন মৃত্যু যে ওর-ও হয়েছে। সেই ক্ষত আজও ওর মনের মধ্যে রয়ে গেছে। কত আশা করে সেই সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে চেয়েছিল ও। ওর প্রথম সন্তান ছিল সে। কিন্তু তাকে ও রাখতে পারেনি। পেটের মধ্যে থাকা অবস্থাতেই তাকে বিদায় জানাতে হয়েছিল। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল পরিণীতার।
কিন্তু মামদিদা থামলেন না। ওর দিকে একবার তাকিয়েই আবার বলতে থাকেন— "রানীর গর্ভপাতে রাজমহল শুধু নয়, পুরো কাঁকিনগরে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাজা বৃজেন্দ্রর এক ঝটকায় আবার পুরনো কথা মনে পড়ে যায়। সেই সঙ্গে এটাও মনে পড়ে যায় যে, একবার অভিশাপ দিলে তা আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। সেদিন একটা মা পুরো মনের গভীর থেকে রাজাকে অভিশাপ দিয়েছিল। তা কি এতো সহজে খন্ডন করা সম্ভব? আর ওনার মনের সেই ভয়টাই সত্যি হল। রাজা বৃজেন্দ্রর সন্তান জন্মের আগেই মারা গেল। সন্তানহারা হলেন রাজা বৃজেন্দ্র।
রাজমাতা নিজের দ্বারা যতটা সম্ভব ছেলেকে ছেলের বউকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু রাজা বৃজেন্দ্রকে কেউ কোনভাবেই শান্ত করতে পারে না। কিন্তু বলে না; সময়ের সব থেকে বড় মলম। বড় বড় আঘাত এই সময়ই ভুলিয়ে দিতে পারে।
রাজা বৃজেন্দ্র ক্ষেত্রেও তাই হল। আবার এক মাস মতো পরে রানী হৈমন্তী গর্ভবতী হন। আবারও সেই আগের মতো সাজ সাজ রব ওঠে চারিদিকে। কিন্তু নিয়তি আবার নিজের খেলা খেলে যায়। সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। তিন মাসের মাথায় ঘুমের ঘোরে রানী হৈমন্তীর গর্ভপাত হয়ে যায়। আবারও বিষাদ নেমে আসে সর্বত্র। রাজা-রানী দুজনেই মনের দিক থেকে ভেঙে পড়েন আবারও।
এমন করেই একের পর এক রানীর পাঁচ-পাঁচটা গর্ভস্থ সন্তান শেষ হয়ে যায়। আর প্রত্যেকবারই সেই তিন মাসের মধ্যেই সব শেষ।”
এবার পরিণীতা আর নিজের মুখ বন্ধ রাখতে পারে না। বারবার এমন সন্তান মৃত্যুর কথা ও আর শুনতে পারছিল না। বলে উঠল— “চুপ করো ঠাম চুপ করো। আমি আর নিতে পারছি না।”
এবারে মামদিদা আর ওর কথাটা এড়িয়ে গেলেন না। বললেন— “তুই পার আর নাই পার, শুনতে তো তোকে হবেই। এতদিন কই তোকে তো আমি জোর করিনি। কিন্তু আজ তুই যা করেছিস, তাতে তোকে এই কাহিনী শুনতেই হবে। যে পরিবারের তুই বউ, সেই পরিবারের অতীত সেই পরিবারের সমস্ত রকম নিয়ম কোন কিছুর দাম তোর কাছে নেই? অবশ্য তা তুই তোর কাজ দিয়েই প্রমাণ করে দিয়েছিস। তাহলে এখন এই কাহিনী শুনতে কষ্ট হচ্ছে। কেন ভেবে নে যে, এই কাহিনী একটা কুসংস্কার একটা অন্ধ বিশ্বাস।”
মামদিদার কথাগুলো ওর বুকে শেলের মত বিঁধল। ও ভাবতেই পারে না যে, ওর প্রিয় মানুষটা ওর সঙ্গে এরকম ভাবে কথা বলতে পারে। ওর কষ্ট ভরা মুখটা দেখে মামদিদার কষ্ট হল। কিন্তু আজকে তিনি নিরুপায়। পরিণীতাকে ওর ভুলটা বোঝানোর দায়িত্ব-কর্তব্য ওনার নিজের। তাই বললেন— “তোর একবার গর্ভপাতে যদি এতটা কষ্ট হয়, তাহলে ওই অত বছর আগে............ মানে এখন তুই দুই সন্তানের মা তাও সেই ক্ষত এখনো সারেনি। তাহলে সেই সময়ে রানী হৈমন্তী আর রাজা বৃজেন্দ্র মনের অবস্থা কি হয়েছিল আশা করি কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারছিস। এইবার বাকিটা শোন--------
পাঁচবার একই জিনিস দেখে রাজা বৃজেন্দ্র একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হন যে,শুধুমাত্র অভিশাপের জন্যই এটা হতে পারে না। এতদিন রাজমাতা বারবার সেই কথা বলা সত্ত্বেও তিনি সে কথা মানেন না। আসলে সেই অভিশাপের কথাগুলো ওনার মনে এতটা প্রভাব ফেলেছিল যে, আসল কথাটা মাথাতে ঢুকছিল না। কিন্তু এবার আর সব বারের মতো ভুল করলেন না তিনি।
হ্যাঁ ঠিকই বুঝেছিস তুই। রানীর হৈমন্তী আবার গর্ভবতী হন। আর এবারে রাজা বৃজেন্দ্র কাউকে সেই কথা জানতে দিলেন না। এমনকি রাজবৈদ্যকেও নিষেধ করে দেওয়া হল। এই কথা যেন কেউ জানতে না পারে। কাক-পক্ষীতেও যেন টের না পায়। রানী হৈমন্তীর গর্ভবতী হওয়ার খবর জানলেন শুধু মাত্র চারজন। রাজমাতা, রাজবৈদ্য, রানীর খাস দাসী সেইসঙ্গে বন্ধু আর রাজা নিজে।
আর সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় হল, রানীর গর্ভস্থ সন্তান কিন্তু তিন মাসের মধ্যে আর শেষ হলো না। অন্য বাচ্চাগুলো যে তিন মাসের মধ্যে মারা যাচ্ছিল, এক্ষেত্রে তা হলো না। আর সেটা দেখে রাজা বৃজেন্দ্র খুব খুশি হয়ে যান। আর কয়েকটা মাস সাবধানে রাখতে হবে। কিন্তু ভাগ্যের লিখন খণ্ডাবে কে? ভাগ্য নাকি অন্য কিছু.........!
রানী যখন ছয় মাসের গর্ভবতী। হঠাৎ করে রাজদরবারের ছুটে আসে রানীর সেই খাস দাসী। তাকে দেখে রাজা রাজি হয়ে যান তার সঙ্গে যেতে। বুঝতে পারেন মারাত্মক কিছু হয়েছে। নিজের সব কাজ সবকিছু ফেলে তিনি ছুটে যান রানীর কক্ষে। আর ওখানে গিয়ে তিনি যা দেখলেন তাতে তিনি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়লেন। চিৎকার করে প্রহরীদের ডেকে বললেন— “বাইরে যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হোক। কেউ যেন পালাতে না পারে।”
রানী হৈমন্তীর গোটা বিছানা রক্তে ভেসে গেছে। ওনার নিজেরও প্রাণ সংকটে। রাজবৈদ্য রাজাকে আড়ালে ডেকে বললেন যে, ‘এক মারাত্মক বিষ দেওয়া হয়েছে রানী হৈমন্তীকে। বাচ্চার সঙ্গে সঙ্গে রানীর পেটের ভিতরে বেশ কিছু অংশ জ্বলে গেছে। আগামী চার প্রহর খুব কঠিন। এই চার প্রহরে যদি রানীর জ্ঞান ফিরে আসে, তাহলে প্রাণে বেঁচে যাবেন। কিন্তু প্রাণে বেঁচে গেলেও কোনদিনও তিনি আর মা হতে পারবেন না। আর যদি জ্ঞান না ফেরে, তাহলে রানীকেও বাঁচানো সম্ভব নয়। আমি যা করার করে দিয়েছি। অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।’
নিজের দাসীদেরকে রানী হৈমন্তীর সেবায় লাগিয়ে রাজমাতা ঠাকুরের সামনে বসে পড়েন তার প্রাণভিক্ষা চাইতে। এদিকে রাজা বৃজ্রন্দ্র সবার সামনে প্রতিজ্ঞা করেন, ‘রানী হৈমন্তীর জ্ঞান ফিরে এলে সে তার নিজের দোষীকে চোখের সামনে দেখবে। আর যদি আমার রানীর কোনও বড় ক্ষতি হয়ে যায়, তাহলে সেই দোষীর চিতা এই রাজবাড়ীতে আগে জ্বলবে।’
তিনি রাজবৈদ্যের কাছ থেকে জানতে পারেন যে, এই বিষ খুব সন্তর্পনে খাবারে মেশানো হয়েছে। আর যে এই বিষ খাবারে মিশিয়েছে, তার হাত জ্বলে যাবে এই বিষের ছোঁয়ায়। অবশ্য যদি সে কোন দস্তানা পরে এই কাজ করে, তাহলে সেই সম্ভাবনা কম। কিন্তু তবুও এই একটা সূত্র ধরে কিছুটা দূর এগোনো যেতে পারে।
এই কথা শুনে রাজা বৃজেন্দ্র যা হুকুম দেন সেই মতো রাজমহলের সমস্ত দাস-দাসী প্রহরী এমনকি রাজার নিকট আত্মীয়দেরও এক জায়গায় এনে দাঁড় করানো হয়। একে একে সবাইকে একটা কক্ষে নিয়ে গিয়ে খুব ভালোভাবে পরীক্ষা করা হয়। আর তাদের পরীক্ষা করেন রাজবৈদ্য স্বয়ং।
অবশ্য এখানে একটা কথা বলে রাখি, রাজমহলে মহিলাদের চিকিৎসা করার জন্য মহিলা বৈদ্য থাকত। আর পুরুষদের জন্য পুরুষ বৈদ্য। আমি সবাইকে রাজবৈদ্য হিসেবেই সম্বোধন করছি। এবার আবার মূল কাহিনীতে ফিরে যাচ্ছি।
এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময়ে রাজা বৃজেন্দ্র আর রাজবৈদ্য ছাড়া, কেউ জানত না যে ওখানে ঠিক কি পরীক্ষা হচ্ছে। কিন্তু দেখা গেল যে, ওখানে এমন কেউ নেই যার হাত বা হাতের কোন একটা অংশ বিষের ছোঁয়ায় জ্বলে গেছে।
সঙ্গে সঙ্গে রাজা বৃজেন্দ্র বললেন— ‘আপনাদের কিছু ভুল হলো কি...! -নাকি এই উপায়ে কোন কিছু করা সম্ভব নয়। আমাদের অন্য কিছু ভাবতে হবে?’
অমনি রানীর দেখাশোনা করছিলেন যে রাজবৈদ্য, তিনি বললেন— ‘আমি এমন বিষ নিয়ে অনেক চর্চা করেছি। অনেক কিছু জানি এই বিষয়ে, এই ব্যাপারে। তাই আমি জানি, আমি যা বলছি ঠিক বলছি। কারোর হাত জ্বলেনি মানে এই নয় যে, আমি ভুল। আমি প্রথমে বলেছিলাম যে, দস্তানা পরে এই কাজ কেউ করে থাকতে পারে। আবার এটাও হতে পারে বিষের ডিবে থেকে চামচে করে সেই বিষ মেশানো হয়েছে। তবে আপনাদেরকে না বলেই আমি কিন্তু সবার পোশাকের উপরেও নজর রেখেছিলাম। আর আমি একটা জিনিস দেখেলাম। আমি দেখলাম, একজনের পোশাক ওই বিষের ছিটে গিয়ে ছোট ছোট ছিদ্র হয়ে গেছে। এখন সেই পোশাকের একটা ছোট্ট পরীক্ষা করলেই বুঝতে পারব একই বিষ নাকি অন্য কোনও কারণে এই রকম ছোট ছোট ছিদ্র হয়েছে।’
রাজা বৃজেন্দ্র অত্যন্ত অবাক হয়ে বললেন— ‘কে সে?’
‘আপনার সৎ-মা…’
সঙ্গে সঙ্গে রাজা বৃজেন্দ্র চিৎকার করে বললেন— ‘অসম্ভব...! আমার মা কখনোই এ কাজ করতে পারে না। সে আমার সৎ-মা হলেও আমি তাকে সৎ-মা বলে মনে করি না।’
‘আমি খুব ভালো মতোই জানি রাজামশাই, আপনি আপনার সৎ-মাকে ভীষন ভালবাসেন। কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, আমার সন্দেহ যদি ঠিক হয় তাহলে উনিই এই কাজ করেছেন। আমাকে ওনার পরনের শাড়িটা যদি এনে দিতে পারেন, তাহলে পরীক্ষা করে দেখতে পারি। সত্যিটা তখনই সামনে চলে আসবে। তবে আমি প্রায় নিশ্চিত যে, ওনার পোশাকের ওই ছিদ্রগুলো অন্য কোনও কারণে হয়নি।’
এই কথা শুনে রাজা বৃজেন্দ্র বললেন— ‘আচ্ছা বেশ। আমি ওনার পোশাক এনে দেব। কিন্তু যদি আপনার পরীক্ষায় দেখা যায় যে, আপনি ভুল তাহলে কিন্তু আপনাকে গর্দান দেওয়া হবে।’
সঙ্গে সঙ্গে রাজবৈদ্য বললেন— ‘আমি একবারের জন্যও আপনাকে এটা বলিনি যে, নিশ্চিত রূপে আপনার সৎ-মা-ই এই কাজ করেছেন। তবে হ্যাঁ, পরীক্ষার পরে কিন্তু আমি বলে দিতে পারব। তখন যদি দেখেন যে, আমি ভুল কিছু বলেছি, তাহলে আমার গর্দান তখন দেবেন। কিন্তু আগে আমাকে পরীক্ষাটা করতে দিন দয়া করে।’
রাজবৈদ্যের এই কথায় রাজা বৃজেন্দ্র অত্যন্ত চালাকির দ্বারা ওনার সৎ মায়ের সেই পোশাক নিজের দখলে নিয়ে নেন। আর তারপর সেটা তুলে দেন রাজবৈদ্যের হাতে। যথারীতি সেই পোশাক পরীক্ষা করে রাজবৈদ্য জানতে পারেন যে, তিনি যা ভেবেছিলেন সেটাই ঠিক। এদিকে চার প্রহর শেষ হওয়ার আগেই রানী হৈমন্তীর জ্ঞান ফিরে আসে। রাজ পরিবারের সবাই সেখানে ছিলেন। রাজা বৃজেন্দ্র কিন্তু কাউকে তখনও এটা জানাননি যে, তিনি আসল দোষীকে পেয়ে গেছেন। কাউকে কিছু না বলেই ওনার প্রতিজ্ঞা সফল হয়ে যায়। রানীর জ্ঞান ফেরার আগেই অপরাধী ওনার সামনে প্রস্তুত।
এদিকে রাজমাতা ভাবছেন যে, রাজা বৃজেন্দ্র এত বড় একটা কথা সবার সামনে দিয়েছেন। অথচ যে অপরাধী তার কোনও খবর এখনও কারোর কাছে নেই। তাহলে কি রাজা হয়ে ওনার ছেলে কথার দাম রাখতে পারলেন না? রাজমাতার এই ভাবনার মধ্যেই ঘটে পরের ঘটনা।
রানী হৈমন্তী একটু সুস্থ বোধ করতে, ওনার সামনেই রাজা বৃজেন্দ্র নিজের সৎ-মায়ের উদ্দেশ্যে বললেন— ‘আপনি আমার মা নন। কিন্তু আমি কোনদিনও আপনাকে নিজের মায়ের থেকে কম কিছু ভাবেনি। আপনিও আমাকে ছেলের মতোই ভালোবেসেছেন। অন্তত আমার তাই মনে হতো। তাহলে আজকে সেই ছেলেকে এতবার সন্তানহারা করতে আপনার বিবেকে বাঁধল না? কেমন করে এটা করতে পারলেন আপনি? আপনি নিজে তো একজন মা। আর একজন মা হয়ে আর একটা মায়ের কোল খালি করতে আপনার বুকটা কেঁপে উঠল না একবারের জন্যও?’
যথারীতি ওনার সৎ-মা প্রথমে সমস্ত কিছু অস্বীকার করে। কিন্তু রাজা বৃজেন্দ্র ক্রমাগত একই প্রশ্ন করাতে তিনি একসময় নিজের সংযম হারিয়ে ফেলেন। চিৎকার করে বলে ওঠেন— ‘বেশ করেছি... যা করেছি বেশ করেছি। আমি কোনদিনই তোমাকে নিজের ছেলের মতো ভালোবাসিনি। শুধু ভালোবাসার নাটক করে গিয়েছি মাত্র। আমি রাজার প্রথম স্ত্রী ছিলাম। আমাকে তিনি খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু তারপরে হঠাৎ একদিন তিনি তোমার মাকে বিয়ে করে নিয়ে আসেন। ঠিক তখন থেকেই সমস্ত কিছু বদলে যায়। আমাকে ভুলে তিনি তোমার মায়ের সঙ্গে সময় ব্যয় করতে থাকেন। ফল যা হওয়ার তাই হল। আমি ছেলে সন্তানের মা হওয়ার আগে তোমার মা, মা হয়ে গেল। আর তোমার জন্ম হলো। আমার মেয়ে তোমার থেকে বড়। কিন্তু ছেলে ছিল না। আমি অনেকবার রাজামশাইকে বলেছিলাম যে, চিরাচরিত নিয়ম মেনে কেন সবসময় একটা ছেলেকেই রাজ্যের দায়ভার দেওয়া হবে?আমার মেয়ে সবদিক থেকে পারদর্শী। তাহলে কেন সে এই রাজ্যের ভার সামলাতে পারবে না? কিন্তু রাজামশাই আমার একটাও কথা শোনেননি। তোমার মা গর্ভবতী হওয়ার পরে মাঝে মাঝে তিনি আমার ঘরে আসতেন। আর তারই ফলস্বরূপ আমি আবারও গর্ভবতী হই। তখন আমি ছেলে সন্তানের জন্ম দিই ঠিক কথা। কিন্তু তার আগেই তোমার জন্ম হয়ে যায়। আজকে আমার বলতে আর কোন দ্বিধা নেই, আমি তোমাকে মেরে ফেলার অনেক ষড়যন্ত্র করেছি। কিন্তু কখনই সফল হইনি। তোমার মায়ের পেটেও তোমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছি। তাও সম্ভব হয়নি। আমার ছেলের জায়গায় তুমি রাজা হয়ে গেলে। তারপর আমার ছেলেকে তুমি রাজ্য ছাড়াও করলে। যেইদিন তুমি তাকে রাজ্য ছাড়া করলে, সেই দিনই আমি ঠিক করে দিয়েছিলাম তোমাকে মারতে না পারলেও আমার সন্তানদের আমি মারব। মারবই মারব। কিন্তু আমাকে অত কষ্ট করতে হলো না। রানী হৈমন্তীর গর্ভস্থ সন্তানরা এমনি এমনিই মারা যেতে থাকল। খুব আনন্দ পেয়েছিলাম যে, ভগবান হয়তো আমার কথা শুনেছে। কিন্তু নাঃ এবারে দেখলাম ও ওর নিজের গর্ভকে ঠিক বাঁচিয়ে নিয়েছে। বাধ্যগত আমাকে হাত নোংরা করতেই হল। রানীর গর্ভস্থ সন্তানকে আমারই মারতে হল।’
এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে রাজা বৃজেন্দ্র প্রহরীকে হুকুম দিলেন নিজের মাতৃসম সৎ-মাকে বন্দী করতে। প্রহরীরা রাজার হুকুম পালন করার পরে রাজা ভাবলেন, যদি সৎ-মার কথামতো এটা হয় যে, এইবারের বাচ্চাটাকে দিয়ে শুধু মেরেছেন। তাহলে আগের বাকি বাচ্চাগুলোকে মারল কে? প্রশ্ন তো ছিল, কিন্তু কোনও উত্তর ছিল না।
এই ঘটনার পরে একমাস কেটে যায়। রানী হৈমন্তী তখন পুরোটাই সুস্থ। এইদিকে রাজবৈদ্যরা নানা রকম ভাবে পরীক্ষা চালিয়ে রাজাকে কোন আশার বাণী শোনাতে পারেন না। ওনারা সরাসরি জানিয়ে দেন যে, রানী হৈমন্তী কখনই রাজার উত্তরাধিকারীকে জন্ম দিতে পারবেন না। তাহলে এখন একটাই রাস্তা খোলা ছিল। সেটা হল, রাজার দ্বিতীয় বিবাহ। সেই দ্বিতীয় রানী থেকেই তিনি পারবেন উত্তরাধিকারীকে পৃথিবীতে আনতে। কিন্তু রাজা বৃজেন্দ্র সিংহ রায় জানিয়ে দেন যে, তিনি রানী হৈমন্তীকে বড্ড বেশি ভালবাসেন। তাই স্বার্থপরের মতো তিনি আবার একটা বিবাহ করে নিজের ভালোবাসাকে ঠকাতে পারবেন না।
রাজবৈদ্যদের দ্বারা যখন কিছুই করা সম্ভব হল না, তখন তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে নামকরা বৈদ্যদের আমন্ত্রণ জানাতে থাকেন। একে একে সবাই আসে। কিন্তু কেউ আশার বাণী শোনাতে পারেন না। সবার মুখে শুধু একটাই কথা। কোন কিছুর দ্বারাই রানীর মা হওয়া সম্ভব নয়। তবে শেষের জন এরসঙ্গে আরো একটা কথা বলে যায়। সে বলে যে, যদি কোনদিনও রানী গর্ভবতী হন,তাহলে সেটা একমাত্র ভগবানের এক চমৎকার হবে। যদিও সে সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। চারিদিক থেকে শুধু নিরাশাই প্রাপ্ত হয়।
প্রায় বছরখানেক হয়ে যায়।
এবার রানী হৈমন্তীও মনের দিক থেকে একদম ভেঙে পড়েন। মুখে কিছু না বললেও রাজা বৃজেন্দ্র খুব বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন। আসলে তিনি বড্ড বেশি বাচ্চা ভালোবাসতেন। তাই ভাবতেই পারেনি যে, ভাগ্য ওনার সঙ্গে এমন পরিহাস করবে।
রাজমাতা নানা রকম ভাবে ওনাকে বলে থাকেন দ্বিতীয় বিবাহ করার জন্য। তিনি এটাও বলেন যে, দ্বিতীয় বউকে ভালোবাসার দরকার নেই। শুধুমাত্র উত্তরাধিকারী আনার জন্যই বিয়েটা হোক। কিন্তু রাজার মন সায় দেয় না। তিনি যে রানীকে ছাড়া আর কাউকে স্পর্শ করতে পারবেন না।
হাজার চেষ্টা করেও যখন রাজমাতা নিজের ছেলেকে বোঝাতে পারেন না, তখন আবারও স্বার্থপরের মতো তিনি গিয়ে হাজির হন রানী হৈমন্তীর কাছে। সেই একই কথা তিনি রানীকেও বলেন। আর তারপর ওনার উপরেই দায়িত্ব দেন রাজাকে বোঝানোর; যে রাজ্যের উত্তরাধিকারীর জন্ম নেওয়া ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
রাজমাতা ঐখান থেকে চলে গেলেন। রানী হৈমন্তী হতভম্ব হয়ে বসে থাকেন। নিজের ভাগ্যের ওপরে ওনার নিজেরই রাগ হয়। কেন এত কষ্ট ভগবান দিল? নিজের স্বামীর ভালোবাসার ভাগ কেউ ছাড়তে চায় না। কিন্তু রানী হৈমন্তী পারলেন না এতটা স্বার্থপর হতে। আর সেই কারণেই রাজা বৃজেন্দ্র ওনার কক্ষে গেলে উনি রাজাকে অনুরোধ করেন আবার বিয়ে করার জন্য। কিন্তু যথারীতি রাজা বৃজেন্দ্র রাজি হন না।
ফলস্বরূপ দুজনের মধ্যে এই নিয়ে খুবই বাকবিতণ্ডা হয়। একসময় রাগ করে রাজা বৃজ্রন্দ্র ঘোড়া ছুটিয়ে রাজমহল থেকে বেরিয়ে যান। ওনার মুখ দেখে প্রহরীরা ওনাকে আটকানোর সাহস দেখায় না। দূর থেকে সমস্ত কিছু লক্ষ্য করছিলেন রাজমাতা। তিনি সঙ্গে সঙ্গে মহামন্ত্রীকে আদেশ দেন রাজার পিছু করার জন্য। রাজমাতার আদেশমত মহামন্ত্রী একটা ছোট দল নিয়ে রাজার পিছু করতে গিয়ে দেখে, রাজা বৃজেন্দ্র ওদের নাগালের বাইরে। কোথাও দেখা নেই ওনার। কিন্তু তাও ওরা এদিক ওদিক খুঁজতে থাকে।
এদিকে রাজা বৃজেন্দ্র নিজের ঘোড়া ছুটিয়েই চলেছেন, তাও উদ্দেশ্যহীন ভাবে। মনের মধ্যে তখন ওনার ঝড় বইছে। কোনটা বেছে নেবেন তিনি, রাজ্যের ভবিষ্যৎ নাকি নিজের ভালোবাসাকে...!
রাজমাতা রানী হৈমন্তী সবাই একটাই কথা বলছে যে, ওনাকে রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে। তা না হলে নাকি ভীষণ স্বার্থপর দেখাচ্ছে ওনাকে। একজন রাজার এতটা স্বার্থপর হওয়া উচিত নয়। এতদিনে একটা বারের জন্যও কিন্তু ওনার মনে দ্বিতীয় বিবাহ নিয়ে এই রকম কোনও চিন্তাভাবনা আসেনি। বাবা হতে তিনিও চান। কিন্তু ওনার সন্তান অন্য কারোর গর্ভ থেকে জন্ম নেবে, তা তিনি একদমই চান না। অথচ আজকে ওনার রানী ওনাকে সেই একই কথা বললেন।
এই চিন্তা ভাবনার মধ্যেই হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করেন, সামনে আর কোন পথ নেই। বিশাল ঘন জঙ্গল রয়েছে। ঘোড়া দাঁড়িয়ে পড়েছে। তিনি ঘোড়াটাকে ঘুরিয়ে অন্যদিকে না নিয়ে গিয়ে ওইখানেই ঘোড়া থেকে নেমে পড়েন। সামনে একটা জলাশয় দেখে, ওখানে গিয়ে চোখে মুখে জল দিয়ে একটা গাছের তলায় বসে পড়েন। এই প্রথম রাজা হওয়ার জন্য ওনার আফসোস হতে থাকে। এতদিন অনেক শত্রুর মোকাবিলা করেছেন। নিজের আপন ভাইদেরকে ওনার শত্রু হতেও দেখেছেন। কিন্তু কোনও কিছুর বিনিময়েই ওনার মনোবল ভেঙে যায়নি। তবে আজকে তিনি একটা অন্য বিপদে পড়েছেন। আজ যদি তিনি রাজা না হতেন, তাহলে তো ওনাকে দ্বিতীয় বিবাহ করার কথা কেউ বলত না। নানা কথা ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত শরীরে তন্দ্রা নেমে আসে। আচমকা একটা গড়ড়ড়......ড়......ড় আওয়াজে ওনার ঘুম ভেঙে যায়। সামনে একটা বাঘ ওনার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। যেকোনও মুহূর্তে ওনার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করবেন, কি সেই সময় একটা তীর এসে বাঘের গলায় বিঁধে যায়। আর সঙ্গে সঙ্গে সেটা নেতিয়ে পড়ে।
তুমি চট করে মাথা ঘুরিয়ে দেখেন, একটা মেয়ে। অত্যন্ত সাধারণ পোশাক হলেও দেখতে অপরুপ সুন্দরী। মেয়েকে ওনার কাছে এসে ক্ষমা চেয়ে নেয়। সে জানায় তার নাম বৈভবী। এই জঙ্গলের পাশেই তার ছোট্ট কুটির রয়েছে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। সে আরও বলল— ‘এই সময় এই জঙ্গল অতিক্রম করা খুবই বিপদজনক। আপনি আমার সঙ্গে আমার কুটিরে চলুন। কাল না হয়......’
এই কথা শুনে রাজা বৃজেন্দ্র প্রথমে রাজি না হলেও পরে যেতে সম্মত হন। কিন্তু ওই রাজি হওয়াটাই কাল হল।
ওনাকে নিজের কুঠিরে নিয়ে গিয়ে বৈভবী বিড়বিড় করে কিছু একটা বলে ওনাকে এক গ্লাস শরবতের মত কিছু একটা পান করতে দেয়। আর সেটা পান পরে রাজার আর কোনও হুঁশ থাকে না। পরের দিন ঘুম ভেঙে তিনি নিজেকে বিবস্ত্র অবস্থান পান। পাশে তাকিয়ে দেখেন, বৈভবীও বিবস্ত্র অবস্থায় ওনার পাশে শুয়ে রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে উঠে তিনি নিচে পড়ে থাকা নিজের পোশাকটা কোনরকমে পরে ওখান থেকে বেরিয়ে যান।
এইদিকে সারারাত কেউ রাজা বৃজেন্দ্রর খোঁজ পায়নি বলে, রাজমহলের সবাই চিন্তায় ছিল। কিন্তু রাজা বৃজেন্দ্রকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসতে দেখে সবাই নিশ্চিন্তে হয়। আবার আগের মতো সবকিছু চলতে থাকে। কিন্তু রাজার উপরে দ্বিতীয় বিবাহের চাপ উত্তরোত্তর বাড়তেই থাকে। আর এইদিকে হাজার চেষ্টা করেও বৃজেন্দ্র সেই রাতে ঠিক কি হয়েছে সেটা মনে করতে পারেন না। মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত অস্বস্তিভাবের সৃষ্টি হয়। অন্য কারোর সঙ্গে সেই কথাটা বলে নিজের মন হালকা করতে পারছিলেন না। সেই মুহূর্তে ওনাদের দুজনের যেইরকম অবস্থা ছিল, তা থেকে তিনি কিছুটা আন্দাজ করতে পারছেন যে, কি হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু আবার পরমুহূর্তে এটা মনে হচ্ছে যে, যা তিনি ভাবছেন, সেটা তো নাও হতে পারে।
রানী হৈমন্তী কিন্তু নিজের স্বামীকে খুব ভালোমতো চিনতেন। তাই তিনি এটা বুঝতে পারতেন যে, রাজা বৃজেন্দ্র কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু সেটা কি তা বুঝতে পারতেন না। কখনও জিজ্ঞাসাও করেননি। কারণ তিনি অপেক্ষা করছিলেন যে, সময় হলে রাজা বৃজেন্দ্র ঠিক ওনাকে সবটা বলবে।
নিজের দাসীদেরকে রানী হৈমন্তীর সেবায় লাগিয়ে রাজমাতা ঠাকুরের সামনে বসে পড়েন তার প্রাণভিক্ষা চাইতে। এদিকে রাজা বৃজ্রন্দ্র সবার সামনে প্রতিজ্ঞা করেন, ‘রানী হৈমন্তীর জ্ঞান ফিরে এলে সে তার নিজের দোষীকে চোখের সামনে দেখবে। আর যদি আমার রানীর কোনও বড় ক্ষতি হয়ে যায়, তাহলে সেই দোষীর চিতা এই রাজবাড়ীতে আগে জ্বলবে।’
তিনি রাজবৈদ্যের কাছ থেকে জানতে পারেন যে, এই বিষ খুব সন্তর্পনে খাবারে মেশানো হয়েছে। আর যে এই বিষ খাবারে মিশিয়েছে, তার হাত জ্বলে যাবে এই বিষের ছোঁয়ায়। অবশ্য যদি সে কোন দস্তানা পরে এই কাজ করে, তাহলে সেই সম্ভাবনা কম। কিন্তু তবুও এই একটা সূত্র ধরে কিছুটা দূর এগোনো যেতে পারে।
এই কথা শুনে রাজা বৃজেন্দ্র যা হুকুম দেন সেই মতো রাজমহলের সমস্ত দাস-দাসী প্রহরী এমনকি রাজার নিকট আত্মীয়দেরও এক জায়গায় এনে দাঁড় করানো হয়। একে একে সবাইকে একটা কক্ষে নিয়ে গিয়ে খুব ভালোভাবে পরীক্ষা করা হয়। আর তাদের পরীক্ষা করেন রাজবৈদ্য স্বয়ং।
অবশ্য এখানে একটা কথা বলে রাখি, রাজমহলে মহিলাদের চিকিৎসা করার জন্য মহিলা বৈদ্য থাকত। আর পুরুষদের জন্য পুরুষ বৈদ্য। আমি সবাইকে রাজবৈদ্য হিসেবেই সম্বোধন করছি। এবার আবার মূল কাহিনীতে ফিরে যাচ্ছি।
এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময়ে রাজা বৃজেন্দ্র আর রাজবৈদ্য ছাড়া, কেউ জানত না যে ওখানে ঠিক কি পরীক্ষা হচ্ছে। কিন্তু দেখা গেল যে, ওখানে এমন কেউ নেই যার হাত বা হাতের কোন একটা অংশ বিষের ছোঁয়ায় জ্বলে গেছে।
সঙ্গে সঙ্গে রাজা বৃজেন্দ্র বললেন— ‘আপনাদের কিছু ভুল হলো কি...! -নাকি এই উপায়ে কোন কিছু করা সম্ভব নয়। আমাদের অন্য কিছু ভাবতে হবে?’
অমনি রানীর দেখাশোনা করছিলেন যে রাজবৈদ্য, তিনি বললেন— ‘আমি এমন বিষ নিয়ে অনেক চর্চা করেছি। অনেক কিছু জানি এই বিষয়ে, এই ব্যাপারে। তাই আমি জানি, আমি যা বলছি ঠিক বলছি। কারোর হাত জ্বলেনি মানে এই নয় যে, আমি ভুল। আমি প্রথমে বলেছিলাম যে, দস্তানা পরে এই কাজ কেউ করে থাকতে পারে। আবার এটাও হতে পারে বিষের ডিবে থেকে চামচে করে সেই বিষ মেশানো হয়েছে। তবে আপনাদেরকে না বলেই আমি কিন্তু সবার পোশাকের উপরেও নজর রেখেছিলাম। আর আমি একটা জিনিস দেখেলাম। আমি দেখলাম, একজনের পোশাক ওই বিষের ছিটে গিয়ে ছোট ছোট ছিদ্র হয়ে গেছে। এখন সেই পোশাকের একটা ছোট্ট পরীক্ষা করলেই বুঝতে পারব একই বিষ নাকি অন্য কোনও কারণে এই রকম ছোট ছোট ছিদ্র হয়েছে।’
রাজা বৃজেন্দ্র অত্যন্ত অবাক হয়ে বললেন— ‘কে সে?’
‘আপনার সৎ-মা…’
সঙ্গে সঙ্গে রাজা বৃজেন্দ্র চিৎকার করে বললেন— ‘অসম্ভব...! আমার মা কখনোই এ কাজ করতে পারে না। সে আমার সৎ-মা হলেও আমি তাকে সৎ-মা বলে মনে করি না।’
‘আমি খুব ভালো মতোই জানি রাজামশাই, আপনি আপনার সৎ-মাকে ভীষন ভালবাসেন। কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, আমার সন্দেহ যদি ঠিক হয় তাহলে উনিই এই কাজ করেছেন। আমাকে ওনার পরনের শাড়িটা যদি এনে দিতে পারেন, তাহলে পরীক্ষা করে দেখতে পারি। সত্যিটা তখনই সামনে চলে আসবে। তবে আমি প্রায় নিশ্চিত যে, ওনার পোশাকের ওই ছিদ্রগুলো অন্য কোনও কারণে হয়নি।’
এই কথা শুনে রাজা বৃজেন্দ্র বললেন— ‘আচ্ছা বেশ। আমি ওনার পোশাক এনে দেব। কিন্তু যদি আপনার পরীক্ষায় দেখা যায় যে, আপনি ভুল তাহলে কিন্তু আপনাকে গর্দান দেওয়া হবে।’
সঙ্গে সঙ্গে রাজবৈদ্য বললেন— ‘আমি একবারের জন্যও আপনাকে এটা বলিনি যে, নিশ্চিত রূপে আপনার সৎ-মা-ই এই কাজ করেছেন। তবে হ্যাঁ, পরীক্ষার পরে কিন্তু আমি বলে দিতে পারব। তখন যদি দেখেন যে, আমি ভুল কিছু বলেছি, তাহলে আমার গর্দান তখন দেবেন। কিন্তু আগে আমাকে পরীক্ষাটা করতে দিন দয়া করে।’
রাজবৈদ্যের এই কথায় রাজা বৃজেন্দ্র অত্যন্ত চালাকির দ্বারা ওনার সৎ মায়ের সেই পোশাক নিজের দখলে নিয়ে নেন। আর তারপর সেটা তুলে দেন রাজবৈদ্যের হাতে। যথারীতি সেই পোশাক পরীক্ষা করে রাজবৈদ্য জানতে পারেন যে, তিনি যা ভেবেছিলেন সেটাই ঠিক। এদিকে চার প্রহর শেষ হওয়ার আগেই রানী হৈমন্তীর জ্ঞান ফিরে আসে। রাজ পরিবারের সবাই সেখানে ছিলেন। রাজা বৃজেন্দ্র কিন্তু কাউকে তখনও এটা জানাননি যে, তিনি আসল দোষীকে পেয়ে গেছেন। কাউকে কিছু না বলেই ওনার প্রতিজ্ঞা সফল হয়ে যায়। রানীর জ্ঞান ফেরার আগেই অপরাধী ওনার সামনে প্রস্তুত।
এদিকে রাজমাতা ভাবছেন যে, রাজা বৃজেন্দ্র এত বড় একটা কথা সবার সামনে দিয়েছেন। অথচ যে অপরাধী তার কোনও খবর এখনও কারোর কাছে নেই। তাহলে কি রাজা হয়ে ওনার ছেলে কথার দাম রাখতে পারলেন না? রাজমাতার এই ভাবনার মধ্যেই ঘটে পরের ঘটনা।
রানী হৈমন্তী একটু সুস্থ বোধ করতে, ওনার সামনেই রাজা বৃজেন্দ্র নিজের সৎ-মায়ের উদ্দেশ্যে বললেন— ‘আপনি আমার মা নন। কিন্তু আমি কোনদিনও আপনাকে নিজের মায়ের থেকে কম কিছু ভাবেনি। আপনিও আমাকে ছেলের মতোই ভালোবেসেছেন। অন্তত আমার তাই মনে হতো। তাহলে আজকে সেই ছেলেকে এতবার সন্তানহারা করতে আপনার বিবেকে বাঁধল না? কেমন করে এটা করতে পারলেন আপনি? আপনি নিজে তো একজন মা। আর একজন মা হয়ে আর একটা মায়ের কোল খালি করতে আপনার বুকটা কেঁপে উঠল না একবারের জন্যও?’
যথারীতি ওনার সৎ-মা প্রথমে সমস্ত কিছু অস্বীকার করে। কিন্তু রাজা বৃজেন্দ্র ক্রমাগত একই প্রশ্ন করাতে তিনি একসময় নিজের সংযম হারিয়ে ফেলেন। চিৎকার করে বলে ওঠেন— ‘বেশ করেছি... যা করেছি বেশ করেছি। আমি কোনদিনই তোমাকে নিজের ছেলের মতো ভালোবাসিনি। শুধু ভালোবাসার নাটক করে গিয়েছি মাত্র। আমি রাজার প্রথম স্ত্রী ছিলাম। আমাকে তিনি খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু তারপরে হঠাৎ একদিন তিনি তোমার মাকে বিয়ে করে নিয়ে আসেন। ঠিক তখন থেকেই সমস্ত কিছু বদলে যায়। আমাকে ভুলে তিনি তোমার মায়ের সঙ্গে সময় ব্যয় করতে থাকেন। ফল যা হওয়ার তাই হল। আমি ছেলে সন্তানের মা হওয়ার আগে তোমার মা, মা হয়ে গেল। আর তোমার জন্ম হলো। আমার মেয়ে তোমার থেকে বড়। কিন্তু ছেলে ছিল না। আমি অনেকবার রাজামশাইকে বলেছিলাম যে, চিরাচরিত নিয়ম মেনে কেন সবসময় একটা ছেলেকেই রাজ্যের দায়ভার দেওয়া হবে?আমার মেয়ে সবদিক থেকে পারদর্শী। তাহলে কেন সে এই রাজ্যের ভার সামলাতে পারবে না? কিন্তু রাজামশাই আমার একটাও কথা শোনেননি। তোমার মা গর্ভবতী হওয়ার পরে মাঝে মাঝে তিনি আমার ঘরে আসতেন। আর তারই ফলস্বরূপ আমি আবারও গর্ভবতী হই। তখন আমি ছেলে সন্তানের জন্ম দিই ঠিক কথা। কিন্তু তার আগেই তোমার জন্ম হয়ে যায়। আজকে আমার বলতে আর কোন দ্বিধা নেই, আমি তোমাকে মেরে ফেলার অনেক ষড়যন্ত্র করেছি। কিন্তু কখনই সফল হইনি। তোমার মায়ের পেটেও তোমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছি। তাও সম্ভব হয়নি। আমার ছেলের জায়গায় তুমি রাজা হয়ে গেলে। তারপর আমার ছেলেকে তুমি রাজ্য ছাড়াও করলে। যেইদিন তুমি তাকে রাজ্য ছাড়া করলে, সেই দিনই আমি ঠিক করে দিয়েছিলাম তোমাকে মারতে না পারলেও আমার সন্তানদের আমি মারব। মারবই মারব। কিন্তু আমাকে অত কষ্ট করতে হলো না। রানী হৈমন্তীর গর্ভস্থ সন্তানরা এমনি এমনিই মারা যেতে থাকল। খুব আনন্দ পেয়েছিলাম যে, ভগবান হয়তো আমার কথা শুনেছে। কিন্তু নাঃ এবারে দেখলাম ও ওর নিজের গর্ভকে ঠিক বাঁচিয়ে নিয়েছে। বাধ্যগত আমাকে হাত নোংরা করতেই হল। রানীর গর্ভস্থ সন্তানকে আমারই মারতে হল।’
এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে রাজা বৃজেন্দ্র প্রহরীকে হুকুম দিলেন নিজের মাতৃসম সৎ-মাকে বন্দী করতে। প্রহরীরা রাজার হুকুম পালন করার পরে রাজা ভাবলেন, যদি সৎ-মার কথামতো এটা হয় যে, এইবারের বাচ্চাটাকে দিয়ে শুধু মেরেছেন। তাহলে আগের বাকি বাচ্চাগুলোকে মারল কে? প্রশ্ন তো ছিল, কিন্তু কোনও উত্তর ছিল না।
এই ঘটনার পরে একমাস কেটে যায়। রানী হৈমন্তী তখন পুরোটাই সুস্থ। এইদিকে রাজবৈদ্যরা নানা রকম ভাবে পরীক্ষা চালিয়ে রাজাকে কোন আশার বাণী শোনাতে পারেন না। ওনারা সরাসরি জানিয়ে দেন যে, রানী হৈমন্তী কখনই রাজার উত্তরাধিকারীকে জন্ম দিতে পারবেন না। তাহলে এখন একটাই রাস্তা খোলা ছিল। সেটা হল, রাজার দ্বিতীয় বিবাহ। সেই দ্বিতীয় রানী থেকেই তিনি পারবেন উত্তরাধিকারীকে পৃথিবীতে আনতে। কিন্তু রাজা বৃজেন্দ্র সিংহ রায় জানিয়ে দেন যে, তিনি রানী হৈমন্তীকে বড্ড বেশি ভালবাসেন। তাই স্বার্থপরের মতো তিনি আবার একটা বিবাহ করে নিজের ভালোবাসাকে ঠকাতে পারবেন না।
রাজবৈদ্যদের দ্বারা যখন কিছুই করা সম্ভব হল না, তখন তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে নামকরা বৈদ্যদের আমন্ত্রণ জানাতে থাকেন। একে একে সবাই আসে। কিন্তু কেউ আশার বাণী শোনাতে পারেন না। সবার মুখে শুধু একটাই কথা। কোন কিছুর দ্বারাই রানীর মা হওয়া সম্ভব নয়। তবে শেষের জন এরসঙ্গে আরো একটা কথা বলে যায়। সে বলে যে, যদি কোনদিনও রানী গর্ভবতী হন,তাহলে সেটা একমাত্র ভগবানের এক চমৎকার হবে। যদিও সে সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। চারিদিক থেকে শুধু নিরাশাই প্রাপ্ত হয়।
প্রায় বছরখানেক হয়ে যায়।
এবার রানী হৈমন্তীও মনের দিক থেকে একদম ভেঙে পড়েন। মুখে কিছু না বললেও রাজা বৃজেন্দ্র খুব বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন। আসলে তিনি বড্ড বেশি বাচ্চা ভালোবাসতেন। তাই ভাবতেই পারেনি যে, ভাগ্য ওনার সঙ্গে এমন পরিহাস করবে।
রাজমাতা নানা রকম ভাবে ওনাকে বলে থাকেন দ্বিতীয় বিবাহ করার জন্য। তিনি এটাও বলেন যে, দ্বিতীয় বউকে ভালোবাসার দরকার নেই। শুধুমাত্র উত্তরাধিকারী আনার জন্যই বিয়েটা হোক। কিন্তু রাজার মন সায় দেয় না। তিনি যে রানীকে ছাড়া আর কাউকে স্পর্শ করতে পারবেন না।
হাজার চেষ্টা করেও যখন রাজমাতা নিজের ছেলেকে বোঝাতে পারেন না, তখন আবারও স্বার্থপরের মতো তিনি গিয়ে হাজির হন রানী হৈমন্তীর কাছে। সেই একই কথা তিনি রানীকেও বলেন। আর তারপর ওনার উপরেই দায়িত্ব দেন রাজাকে বোঝানোর; যে রাজ্যের উত্তরাধিকারীর জন্ম নেওয়া ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
রাজমাতা ঐখান থেকে চলে গেলেন। রানী হৈমন্তী হতভম্ব হয়ে বসে থাকেন। নিজের ভাগ্যের ওপরে ওনার নিজেরই রাগ হয়। কেন এত কষ্ট ভগবান দিল? নিজের স্বামীর ভালোবাসার ভাগ কেউ ছাড়তে চায় না। কিন্তু রানী হৈমন্তী পারলেন না এতটা স্বার্থপর হতে। আর সেই কারণেই রাজা বৃজেন্দ্র ওনার কক্ষে গেলে উনি রাজাকে অনুরোধ করেন আবার বিয়ে করার জন্য। কিন্তু যথারীতি রাজা বৃজেন্দ্র রাজি হন না।
ফলস্বরূপ দুজনের মধ্যে এই নিয়ে খুবই বাকবিতণ্ডা হয়। একসময় রাগ করে রাজা বৃজ্রন্দ্র ঘোড়া ছুটিয়ে রাজমহল থেকে বেরিয়ে যান। ওনার মুখ দেখে প্রহরীরা ওনাকে আটকানোর সাহস দেখায় না। দূর থেকে সমস্ত কিছু লক্ষ্য করছিলেন রাজমাতা। তিনি সঙ্গে সঙ্গে মহামন্ত্রীকে আদেশ দেন রাজার পিছু করার জন্য। রাজমাতার আদেশমত মহামন্ত্রী একটা ছোট দল নিয়ে রাজার পিছু করতে গিয়ে দেখে, রাজা বৃজেন্দ্র ওদের নাগালের বাইরে। কোথাও দেখা নেই ওনার। কিন্তু তাও ওরা এদিক ওদিক খুঁজতে থাকে।
এদিকে রাজা বৃজেন্দ্র নিজের ঘোড়া ছুটিয়েই চলেছেন, তাও উদ্দেশ্যহীন ভাবে। মনের মধ্যে তখন ওনার ঝড় বইছে। কোনটা বেছে নেবেন তিনি, রাজ্যের ভবিষ্যৎ নাকি নিজের ভালোবাসাকে...!
রাজমাতা রানী হৈমন্তী সবাই একটাই কথা বলছে যে, ওনাকে রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে। তা না হলে নাকি ভীষণ স্বার্থপর দেখাচ্ছে ওনাকে। একজন রাজার এতটা স্বার্থপর হওয়া উচিত নয়। এতদিনে একটা বারের জন্যও কিন্তু ওনার মনে দ্বিতীয় বিবাহ নিয়ে এই রকম কোনও চিন্তাভাবনা আসেনি। বাবা হতে তিনিও চান। কিন্তু ওনার সন্তান অন্য কারোর গর্ভ থেকে জন্ম নেবে, তা তিনি একদমই চান না। অথচ আজকে ওনার রানী ওনাকে সেই একই কথা বললেন।
এই চিন্তা ভাবনার মধ্যেই হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করেন, সামনে আর কোন পথ নেই। বিশাল ঘন জঙ্গল রয়েছে। ঘোড়া দাঁড়িয়ে পড়েছে। তিনি ঘোড়াটাকে ঘুরিয়ে অন্যদিকে না নিয়ে গিয়ে ওইখানেই ঘোড়া থেকে নেমে পড়েন। সামনে একটা জলাশয় দেখে, ওখানে গিয়ে চোখে মুখে জল দিয়ে একটা গাছের তলায় বসে পড়েন। এই প্রথম রাজা হওয়ার জন্য ওনার আফসোস হতে থাকে। এতদিন অনেক শত্রুর মোকাবিলা করেছেন। নিজের আপন ভাইদেরকে ওনার শত্রু হতেও দেখেছেন। কিন্তু কোনও কিছুর বিনিময়েই ওনার মনোবল ভেঙে যায়নি। তবে আজকে তিনি একটা অন্য বিপদে পড়েছেন। আজ যদি তিনি রাজা না হতেন, তাহলে তো ওনাকে দ্বিতীয় বিবাহ করার কথা কেউ বলত না। নানা কথা ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত শরীরে তন্দ্রা নেমে আসে। আচমকা একটা গড়ড়ড়......ড়......ড় আওয়াজে ওনার ঘুম ভেঙে যায়। সামনে একটা বাঘ ওনার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। যেকোনও মুহূর্তে ওনার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করবেন, কি সেই সময় একটা তীর এসে বাঘের গলায় বিঁধে যায়। আর সঙ্গে সঙ্গে সেটা নেতিয়ে পড়ে।
তুমি চট করে মাথা ঘুরিয়ে দেখেন, একটা মেয়ে। অত্যন্ত সাধারণ পোশাক হলেও দেখতে অপরুপ সুন্দরী। মেয়েকে ওনার কাছে এসে ক্ষমা চেয়ে নেয়। সে জানায় তার নাম বৈভবী। এই জঙ্গলের পাশেই তার ছোট্ট কুটির রয়েছে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। সে আরও বলল— ‘এই সময় এই জঙ্গল অতিক্রম করা খুবই বিপদজনক। আপনি আমার সঙ্গে আমার কুটিরে চলুন। কাল না হয়......’
এই কথা শুনে রাজা বৃজেন্দ্র প্রথমে রাজি না হলেও পরে যেতে সম্মত হন। কিন্তু ওই রাজি হওয়াটাই কাল হল।
ওনাকে নিজের কুঠিরে নিয়ে গিয়ে বৈভবী বিড়বিড় করে কিছু একটা বলে ওনাকে এক গ্লাস শরবতের মত কিছু একটা পান করতে দেয়। আর সেটা পান পরে রাজার আর কোনও হুঁশ থাকে না। পরের দিন ঘুম ভেঙে তিনি নিজেকে বিবস্ত্র অবস্থান পান। পাশে তাকিয়ে দেখেন, বৈভবীও বিবস্ত্র অবস্থায় ওনার পাশে শুয়ে রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে উঠে তিনি নিচে পড়ে থাকা নিজের পোশাকটা কোনরকমে পরে ওখান থেকে বেরিয়ে যান।
এইদিকে সারারাত কেউ রাজা বৃজেন্দ্রর খোঁজ পায়নি বলে, রাজমহলের সবাই চিন্তায় ছিল। কিন্তু রাজা বৃজেন্দ্রকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসতে দেখে সবাই নিশ্চিন্তে হয়। আবার আগের মতো সবকিছু চলতে থাকে। কিন্তু রাজার উপরে দ্বিতীয় বিবাহের চাপ উত্তরোত্তর বাড়তেই থাকে। আর এইদিকে হাজার চেষ্টা করেও বৃজেন্দ্র সেই রাতে ঠিক কি হয়েছে সেটা মনে করতে পারেন না। মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত অস্বস্তিভাবের সৃষ্টি হয়। অন্য কারোর সঙ্গে সেই কথাটা বলে নিজের মন হালকা করতে পারছিলেন না। সেই মুহূর্তে ওনাদের দুজনের যেইরকম অবস্থা ছিল, তা থেকে তিনি কিছুটা আন্দাজ করতে পারছেন যে, কি হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু আবার পরমুহূর্তে এটা মনে হচ্ছে যে, যা তিনি ভাবছেন, সেটা তো নাও হতে পারে।
রানী হৈমন্তী কিন্তু নিজের স্বামীকে খুব ভালোমতো চিনতেন। তাই তিনি এটা বুঝতে পারতেন যে, রাজা বৃজেন্দ্র কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু সেটা কি তা বুঝতে পারতেন না। কখনও জিজ্ঞাসাও করেননি। কারণ তিনি অপেক্ষা করছিলেন যে, সময় হলে রাজা বৃজেন্দ্র ঠিক ওনাকে সবটা বলবে।
প্রায় মাস দুই মত এমন করেই কেটে যায়।
তারপর একদিন খবর আসে শত্রুপক্ষ কাঁকিনগর দখল করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে বিপদ একটু বেশি ছিল। তার কারণ, শত্রু পক্ষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ছিল সেই বিশ্বাসঘাতক মন্ত্রী আর রাজার দুই ভাই। এই তিনজন রাজমহলের সমস্ত গোপন রাস্তা জানতো। কোন কারণে তারা যদি একবার রাজমহলের কাছাকাছি পৌঁছে যায়,তাহলে সেই গোপন রাস্তা দিয়ে রাজবাড়ির ভিতর প্রবেশ করে যেতে পারে। সেই কারণেই চারদিকে প্রহরী আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। সমস্ত গোপন রাস্তাগুলোকে আপাত ভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। যুদ্ধের জন্য যখন সাজো সাজো রব, তখন একজন বৃদ্ধ একটা পত্র নিয়ে রাজার কাছে আসে।
ওই পত্রটা পাওয়া মাত্র রাজা বৃজেন্দ্র রাজমহল থেকে ওই বৃদ্ধটির সঙ্গে বেরিয়ে যান। আসলে ওই পত্রটি ছিল বৈভবীর। ওর পত্র অনুসারে বৃদ্ধটি ওর বাবা। বৃদ্ধটি নাকি লেখাপড়া জানে না। তাই ঐখানে কি লেখা আছে সেটা জানতে পারেনি। চিঠিতে লেখা ছিল-------
‘রাজামশাই সেইদিন রাত্রিবেলা আপনি আমার সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। আমিও নিজের ইচ্ছেতেই আপনার সঙ্গে মিলিত হয়েছিলাম। বলতে পারেন সেটাই আমার উদ্দেশ্য ছিল। আমি একটা রাতের জন্য হলেও আপনাকে নিজের করে পেতে চেয়েছিলাম।
এখন আমি গর্ভবতী। আমি আপনার সন্তানের মা হতে চলেছি। আর একটা কথা, ভুলেও আপনি আমাদের সম্পর্ক অস্বীকার করার চেষ্টা করবেন না। যদি করেন, তাহলে আমি কি করতে পারি তার নমুনা আপনি আগেই দেখেছেন। হয়ত এখন বুঝতে পারছেন না। এখানে এলে সমস্ত কিছু দেখলে আপনি বুঝতে পারবেন। পত্রে অত কিছু লেখা সম্ভব নয়। এই আমার বাবা। তার কাছেই পত্রটি পাঠালাম। এটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই এখানে চলে আসবেন। বাবাকে কোনও কথা জিজ্ঞাসা করার চেষ্টাও করবেন না। তার কারণ উনি পড়াশোনা জানেন না। অযথা দেরি করে নিজের বিপদ বাড়াবেন না।’
রাজা বৃজেন্দ্র সেই কারণেই কোনও কথা না বলে বেরিয়ে যান। কিন্তু ওইখানে গিয়ে অবাক হয়ে যান। আগের দিন যা দেখেছিলেন আর ঐদিন যা দেখলেন, তা সম্পূর্ণ আলাদা। এখন বৈভবীর কুটির দেখে মনে হচ্ছে তন্ত্রের আঁতুড়ঘর।
ওনাকে অবাক হতে দেখে বৈভবী বলে— ‘ওহ একটু দাঁড়ান রাজামশাই...’ বলে কি একটা মন্ত্র উচ্চারণ করে কিছুটা ছাই রাজা বৃজেন্দ্রর চোখের সামনে উড়িয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেখেন সেই আগের দিনের মতো কুটির। সেখানে তন্ত্রের নাম ও নিশান নেই। আর যে বৈভবীকে একটু আগে তান্ত্রিক বেশে দেখেছিলেন, সে সেই আগের দিনের মতো শান্ত সুশীল সুন্দরী একটা মেয়ে হয়ে গেছে। মিনিট কয়েক তেমন থেকে আবার বৈভবী কিছুটা ছাই মন্ত্র উচ্চারণের পরে উড়িয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান অবস্থায় আবার ফিরে আসেন রাজা বৃজেন্দ্র। একটা ছোট্ট ঘটনা থেকে উনি বুঝতে পারেন যে, বৈভবী ওনাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসিয়েছে। তন্ত্রের দ্বারা ওনাকে মোহগ্রস্ত করে ওনার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করেছে ও। কিন্তু এখন উপায়? বৈভবী একজন মহিলা তান্ত্রিক। সেইসঙ্গে বেশ শক্তিশালীও। মোহিনী বিদ্যা ও খুব ভালো মতই জানে। কিন্তু এ চায় কি...!
রাজা বৃজেন্দ্র কিছু বলার আগেই বৈভবী বলে—‘আপনার মনে অনেক প্রশ্ন। আর সেটা আপনার চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আমি আপনাকে দু'চারটে কথা বলব। আর সেখান থেকেই আপনি সব জানতে পেরে যাবেন। আপনার রানীর যতবার ওই তিন মাসের গর্ভপাত হয়েছে, সবকিছু হয়েছে আমারই জন্য। আমি এইসব বিদ্যা খুব ভাল মত জানি। কোনও মায়ের গর্ভপাত করানোর জন্য ওই গর্ভবতী মায়ের একটা চুল পেলেই কাজ হয়ে যায়। আর সেই চুল আমি কেমন করে পাই, মানে আপনার রানীর চুল আমি কেমন করে পেয়েছি, সেটা খুঁজে বের করার দায়িত্ব আপনার।
আমি মন্ত্রের দ্বারা সঙ্গে সঙ্গে যে কোনও মানুষকে বশ করে তাকে দিয়ে যা ইচ্ছা করিয়ে নিতে পারি। আবার যা ইচ্ছা বলিয়ে নিতে পারি। এবার আপনি ভেবে দেখুন, আমি ঠিক কেমন করে কি করতে পারি। আর আমার ইচ্ছে পূরণ না করলে আপনাদের কি অবস্থা হতে পারে ভেবে দেখুন। এখন বলুন আপনি কি করবেন?’
রাজা বৃজেন্দ্র বৈভবীর প্রত্যেকটা কথা খুব ভালোমতোই বুঝতে পারলেন। তার কারণ, একটু আগেই তো ও নিজের তন্ত্রের দ্বারা কি করতে পারে, তার নমুনা দেখাল। আর তাছাড়া উনি নিজে রানী হৈমন্তীকে ছেড়ে অন্য কোন নারীকে স্পর্শ করার কথা ভাবতে পর্যন্ত পারেন না। সেখানে বৈভবী মা হতে চলেছে। আর রানী হৈমন্তীর গর্ভপাত যে হয়েছে তাও একদম তিন মাসেই হয়েছে, সেটাও বৈভবী জানে। তার মানে ওর এই কথাগুলো সত্যি। কিন্তু বৈভবী কাকে বশ করে এসব কাজ করেছে? নাকি কেউ ইচ্ছে করেই ওর সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই ঘটনাটা ঘটিয়েছে। সে সমস্ত কিছু না হয় পরে খুঁজে বের করা যাবে। কিন্তু এই মুহূর্তে এই বৈভবী ঠিক কী চায়?
বৈভবী যেন মন পড়তে পারে। বলে উঠল—‘আমি কি চাই সেটা জানতে ইচ্ছে করছে তো? ঠিক আছে আমি বলছি। আমি আপনার রাজমহলে ঠাঁই চাই। অনেক অনেক গয়না চাই। মানে রানীদের যেমন গয়না থাকে ঠিক সেইরকম। তবে হ্যাঁ, আমি যেই ধরনের গয়না পরব, সেই ধরনের গয়না আর কেউ পরতে পারবে না। এটা আমার অনেক দিনের শখ। তবে আমাকে রানীর মর্যাদা দিতে হবে না। কিন্তু আমার সন্তানকে তার যোগ্য অধিকার দিতে হবে।’
যোগ্য অধিকার...! মুখে বললেন— ‘রাজবাড়ির অন্দরমহলে আমি তোমাকে ঠাঁই দিতে পারব না। বাকি শর্ত আমার পক্ষে মানা সম্ভব কিনা সেটা আমি পরে ভেবে দেখব। তাছাড়া তোমার অনেক কথাই আমার কাছে এখনও অস্পষ্ট। এতসব কথা বলার মতো সময় আমার এখন নেই। আমাকে এখন ফিরে যেতে হবে। যুদ্ধের জন্য সমস্ত রকম প্রস্তুতি হয়ে গেছে।’
সেই সব কথায় কান না দিয়ে বৈভবী বলল— ‘অন্দরমহল না পেলে রাজবাড়ির লাগোয়া গোটা চার ঘর করে দিলেও চলবে। সে ক্ষেত্রে ওখানে আমার অনুমতিই চলবে। আপনি আসতে পারেন। কিন্তু হুকুম করতে পারবেন না। ওখানে আমি যা করার তাই করব। আমাকে বাধা দেওয়ার মতো কেউ থাকবে না। আর যদি আমার শর্ত মেনে নেন, তাহলে যুদ্ধজয় কাঁকিনগরেরই হবে।’
রাজা বৃজেন্দ্র একটু রাগের স্বরে বললেন— ‘তোমার সাহায্য লাগবে না। কাঁকিনগরের রাজা একাই একশো। সেখানে তার সঙ্গে তার বিপুল পরিমাণে সৈনিক রয়েছে। যারা দেহের শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও লড়াই করবে আর............’
‘হুম আচ্ছা সব কিছুই বুঝলাম। কিন্তু আর একটা কথা আমার রয়েছে। যদি আমার সাহায্যে রানী হৈমন্তী আপনার সন্তানের মা হতে পারেন, তাহলেও নয় তো? দেখুন আমি এখন আপনাকে এই সব শর্ত দিচ্ছি। কিন্তু আমি চাইলেই আপনাকে বশ করে আপনার অনুমতি নিয়ে রাজমহলের ভিতরে প্রবেশ করতে পারতাম। এই সম্ভাবনার কথাও কিন্তু ভুলে যাবেন না।’
বৈভবীর বাকি কথাগুলো রাজা বৃজেন্দ্রর কানে গেল না। শুধু ওই একটা কথাই শুনতে পেলেন যে, রানী হৈমন্তী আবার মা হতে পারবেন। কিন্তু সত্যিই কি সেটা সম্ভব?সেই সময় বৈভবী আবারও বলে— ‘আর আটকাব না আপনাকে। যুদ্ধে জয়ী হয়ে তারপর চিন্তাভাবনা করে আমার এখানে আসবেন। এখন যান জয় আপনারই হবে।’
এই কথা শুনে রাজা বৃজেন্দ্র ওইখান থেকে বেরিয়ে গেলেন। আর পিছন থেকে বিড়বিড় করে বৈভবী বলল— ‘আপনার সজ্ঞানেই আপনার অনুমতিতেই আমাকে সমস্ত কিছু করতে হবে। তা না হলে আমি যা করতে চাইছি তাতে আমি সফল হব না।’
এরপর দু’দিনের মধ্যে কাঁকিনগর জয়যুক্ত হয়। যেন এক অদ্ভূত মন্ত্রবলে এই সুবিশাল যুদ্ধক্ষেত্র দু’দিনেই শান্ত হয়ে যায়। কেউ না বুঝতে পারলেও রাজা বৃজেন্দ্র আন্দাজ করতে পারলেন যে, নিশ্চয়ই এর পিছনে বৈভবীর কোনও হাত রয়েছে। সেই সঙ্গে তিনি বৈভবীর ক্ষমতা সম্পর্কে আরও একটু ওয়াকিবহাল হয়ে গেলেন।
কিন্তু উনি কিছুতেই এটা বুঝতে পারলেন না যে, তিনি বৈভবীর কথা কেমন করে রানী হৈমন্তীর কাছে বলবেন। আর তাছাড়া বৈভবীর সন্তানকে যোগ্য অধিকার দিতে হবে মানে কি বলতে চাইছে ও?
নিজের মনের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ করে তিনি ঠিক করেন যে, রানী হৈমন্তীকে সবটা তিনি জানাবেন তবে তার আগে তিনি একবার বৈভবীর কাছে যাবেন। এবং জানতে চাইবেন যে, ঠিক কি চায় ও। সেই মতো তিনি যান বৈভবীর কাছে। আর ওনার করা প্রশ্নের জবাবে বৈভবী জানায়— ‘আমি চাই আমার সন্তান হবে এই কাঁকিনগরের ভবিষ্যৎ রাজা। আর মেয়ে হলে সে পাবে আপনার রাজবাড়ির সমস্ত সম্পত্তির অর্ধেক মালিকানা।’
‘অসম্ভব...! আর তাছাড়া রানীর গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তান ছাড়া অন্য কেউ রাজা হতে পারবে না। এটা নিয়মবিরুদ্ধ।’
‘আচ্ছা বেশ তাহলে আমাকে বিয়ে করুন।’
‘না না আমি কিছুতেই তোমাকে করতে পারব না।’
বেশ খানিকক্ষণ হেসে নিয়ে বৈভবী বলে— ‘ভয় পেয়ে গেলেন দেখছি। আমি তো খেলছিলাম আপনার সঙ্গে। আচ্ছা বেশ তাহলে আমি আপনাকে খুলেই বলছি। দেখুন, আমিও কিন্তু আপনাকে বিয়ে করতে চাই না। আমার চাই গয়না। অনেক সুন্দর সুন্দর গয়না। আরও একটা জিনিস চাই। সেটা আপনাকে আমার বলার দরকার নেই।
একটা কথা বলি তাহলে... আমি প্রথমে তন্ত্রবিদ্যা শিখতে চেয়েছিলাম মানুষকে বশ করে তাদের গয়না হাতিয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু তারপরে তন্ত্রটাকে ভালোবেসে অনেক বিদ্যাই নিজের দখলে আনতে পেরেছি। যাই হোক... আমার অনেক গয়না আছে। কিন্তু সেরা গয়নাটা এখনও পাইনি। আসলে এই দুনিয়ার সবথেকে সেরা সেরা গয়না গুলো পরতে চেয়েছিলাম। আমি কোথায় সেটা পাব, তার খোঁজ করতে গিয়ে শুনলাম, গয়না তৈরির মহান কারিগরদের পাওয়া যায় কাঁকিনগরে। এখান থেকে বিভিন্ন রাজারা কারিগর নিজেদের রাজ্যে নিয়ে যায়। তাহলে কাঁকিনগরের রাজার কাছে সেরার সেরা কারিগর থাকবে তা তো একটা বাচ্চাও বলে দিতে পারবে। আর এখানে প্রবেশ করার জন্য আপনাকে ব্যবহার করলাম।’
‘ওহ তার মানে এটা তোমার বাড়ি নয়। তাহলে তোমার বাবা……’
খুব জোরে আরও একবার বৈভবী হেসে উঠল। তারপর বলল— ‘উনি আমার তন্ত্র গুরু। আমি ওনাকে বাবা বলেছি, যাতে আপনার আমাকে বিশ্বাস করে এখানে আসতে কোনও দ্বিধা না হয়। আমি আর আমার তন্ত্রগুরু একে অপরের সঙ্গে একটা বিশেষ তন্ত্রের দ্বারা যুক্ত রয়েছি। আমার সাহায্য লাগলে ওই তন্ত্রের দ্বারাই ওনাকে আমন্ত্রণ জানাই। তারপর সেই মত উনি সাহায্য করতে আমার কাছে আসেন। এবারেও আমার ওনার সাহায্যের দরকার ছিল। তাই ওনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। আর উনি আমাকে সাহায্য করতে এসেছেন। ব্যস এইটুকুই। এর বেশী আর কোনও কথা আমি আপনাকে বলব না। তবে আগের দিনই আপনাকে আমি একটা কথা বলছিলাম যে, আপনি কি আমার শর্তগুলো মেনে নেন বিনিময় আমিও কিছু দেবো। এই বৈভবী তান্ত্রিক দিতেও জানে। তার আগে আমার শর্ত গুলো মেনে রাজ শীলমোহর দেওয়া চুক্তিপত্র আমাকে দিলে আমিও মন্ত্র বলে আপনার রানীকে মা হতে সাহায্য করব। তবে তার মা হতে সময় লাগবে। কিন্তু মা হবেই সেটা বলে দিচ্ছি। আর আমার শর্ত না মানলে ধ্বংস করে দেবে কাঁকিনগর।’
রাজা বৃজেন্দ্র দেখলেন বৈভবীর শর্ত মেনে নেওয়া ছাড়া এই মুহুর্তে আর কোনও উপায় নেই। খুব ভালোমতোই তিনি ফেঁসে গিয়েছেন। আর রানী হৈমন্তী কষ্ট পাবেন জেনেই বৈভবীকে কথা দেন যে, তিনি সেই চুক্তিপত্র দেবেন। সেই সঙ্গে এটাও বলেন যে, আজ থেকে প্রায় একমাস পরে রাজবাড়ির লাগোয়া ওই চার কক্ষের বাড়িতে তিনি বৈভবীকে নিয়ে যাবেন। এই কথা দিয়ে বিষন্ন মনে রাজবাড়িতে ফিরে যান রাজা বৃজেন্দ্র।
রাত্রিবেলা অনেক কষ্টে নিজের ভেতরের সমস্ত শক্তি একত্র করে রাজা বৃজেন্দ্র সমস্ত কিছু খুলে বলেন রানী হৈমন্তীকে। কিন্তু যে ভয়টা তিনি পেয়েছিলেন সেটা হলো না। রানী হৈমন্তী এক মুহূর্তের জন্যও ওনাকে ভুল বুঝলেন না। উল্টে তিনি বলেন যে, রাজা বৃজেন্দ্র এতদিন কেন ওনাকে সবটা বলেননি, কেন সমস্ত কষ্ট নিজে নিজে একা একাই ভোগ করেছেন? কিন্তু মুখে এই সমস্ত কিছু কথা বললেও ওনার মনে আরও একটা কথা চলছিল। সেটা হল, রাজবাড়িতে এমন ভয়ানক তন্ত্রসাধিকা ডেকে এনে রাজা কিছু ভুল করলেন না তো? এইদিকে রাজামশাই কথাও দিয়ে দিয়েছেন। তাই সে কথার খেলাপও করা যাবে না।
কি করবেন বুঝতে না পেরে নিজের সন্দেহ দূর করার জন্যই তিনি তার এক বিশ্বস্ত দাসীকে বলে দিলেন যে, বৈভবী রাজবাড়িতে আসার পর থেকে কখন কি করবে বা কখন কি করছে, তার ওপরে সবসময় যেন নজর রাখে।
একটা মাস অতিক্রান্ত হতে না হতেই রাজবাড়ির লাগোয়া ওই কক্ষের এসে ওঠে বৈভবী। একটা কক্ষে ওর থাকার ব্যবস্থা হয়। আর একটা কক্ষে তার চার দাসীর থাকার ব্যবস্থা হয়। আর একটা কক্ষ রাখে নিজের তন্ত্রসাধনার জন্য। কিন্তু আর একটা কক্ষে সে কি জন্য রেখেছে, তা কেউ জানতে পারে না। তালা বন্ধ অবস্থায় রেখে দেয়। রাজা বৃজেন্দ্রও জানতে পারেন না। জানার চেষ্টাও করতে পারেন না। তার কারণ, বৈভবীর শর্ত অনুযায়ী ওই চার কক্ষের একটা ছোট্ট প্রাসাদে ওর ছাড়া আর কারোর হুকুম চলবে না। কেউ কোনও কিছু জানার চেষ্টাও করবে না।
সমস্ত কিছুর চোখের সামনে থাকলেও ওই যে একটা কক্ষ না খুলেই পরে খুলবে বলে বৈভবী রেখে দিলো, সেটা থেকেই রানী হৈমন্তীর মনের সন্দেহটা আরও বেশি করে বাড়তে শুরু করে। বারবার ভাবতে থাকেন, ওই কক্ষে বৈভবী ঠিক কি করবে?তন্ত্র সাধনা নাকি এর থেকেও বড় কিছু? গয়না পাওয়া কি কোন তন্ত্র সাধিকার প্রধান উদ্দেশ্য হতে পারে?
এর পরের দিন গুলো কেটে যেতে থাকে। সেই দাসী রানী হৈমন্তীকে জানায়, বৈভবীর চারজন দাসী নাকি পুতুলের মত সমস্ত কথা মেনে চলে। একটা বারের জন্যও কোনও কথা বলে না। দেখে মনে হয়, জীবন্ত লাশ। অথচ এই দাসীগুলোই যখন রাজমহলের ভিতরে ছিল, তখন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মতো আচরণ করতো। এই কথাটা শুনে রানী হৈমন্তী বুঝে যান যে, বৈভবী ওই দাসীদেরকে নিজের বশবর্তী করে রেখেছে। তার কারণ, ওইখানে ও কি কর্মকাণ্ড করছে, তা যেন ওই দাসীরা কাউকে বলতে না পারে। আর রানীর মুখে এই কথা শুনে, সেই দাসী জানায়, ওই চারজন ওর বশবর্তী যদি হয়েও থাকে, তবুও কিন্তু ওই একটা নির্দিষ্ট কক্ষে ওদেরও প্রবেশ মানা। সেখানে বৈভবী একাই সারারাত থাকে। সূর্যের আলো ফোটার কিছু আগে বেরিয়ে আসে।
সন্দেহের পর সন্দেহ বেড়েই চলেছে। কিন্তু তার প্রতিকারের কোনও উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না রানী হৈমন্তী।
তারপর একদিন খবর আসে শত্রুপক্ষ কাঁকিনগর দখল করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে বিপদ একটু বেশি ছিল। তার কারণ, শত্রু পক্ষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ছিল সেই বিশ্বাসঘাতক মন্ত্রী আর রাজার দুই ভাই। এই তিনজন রাজমহলের সমস্ত গোপন রাস্তা জানতো। কোন কারণে তারা যদি একবার রাজমহলের কাছাকাছি পৌঁছে যায়,তাহলে সেই গোপন রাস্তা দিয়ে রাজবাড়ির ভিতর প্রবেশ করে যেতে পারে। সেই কারণেই চারদিকে প্রহরী আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। সমস্ত গোপন রাস্তাগুলোকে আপাত ভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। যুদ্ধের জন্য যখন সাজো সাজো রব, তখন একজন বৃদ্ধ একটা পত্র নিয়ে রাজার কাছে আসে।
ওই পত্রটা পাওয়া মাত্র রাজা বৃজেন্দ্র রাজমহল থেকে ওই বৃদ্ধটির সঙ্গে বেরিয়ে যান। আসলে ওই পত্রটি ছিল বৈভবীর। ওর পত্র অনুসারে বৃদ্ধটি ওর বাবা। বৃদ্ধটি নাকি লেখাপড়া জানে না। তাই ঐখানে কি লেখা আছে সেটা জানতে পারেনি। চিঠিতে লেখা ছিল-------
‘রাজামশাই সেইদিন রাত্রিবেলা আপনি আমার সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। আমিও নিজের ইচ্ছেতেই আপনার সঙ্গে মিলিত হয়েছিলাম। বলতে পারেন সেটাই আমার উদ্দেশ্য ছিল। আমি একটা রাতের জন্য হলেও আপনাকে নিজের করে পেতে চেয়েছিলাম।
এখন আমি গর্ভবতী। আমি আপনার সন্তানের মা হতে চলেছি। আর একটা কথা, ভুলেও আপনি আমাদের সম্পর্ক অস্বীকার করার চেষ্টা করবেন না। যদি করেন, তাহলে আমি কি করতে পারি তার নমুনা আপনি আগেই দেখেছেন। হয়ত এখন বুঝতে পারছেন না। এখানে এলে সমস্ত কিছু দেখলে আপনি বুঝতে পারবেন। পত্রে অত কিছু লেখা সম্ভব নয়। এই আমার বাবা। তার কাছেই পত্রটি পাঠালাম। এটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই এখানে চলে আসবেন। বাবাকে কোনও কথা জিজ্ঞাসা করার চেষ্টাও করবেন না। তার কারণ উনি পড়াশোনা জানেন না। অযথা দেরি করে নিজের বিপদ বাড়াবেন না।’
রাজা বৃজেন্দ্র সেই কারণেই কোনও কথা না বলে বেরিয়ে যান। কিন্তু ওইখানে গিয়ে অবাক হয়ে যান। আগের দিন যা দেখেছিলেন আর ঐদিন যা দেখলেন, তা সম্পূর্ণ আলাদা। এখন বৈভবীর কুটির দেখে মনে হচ্ছে তন্ত্রের আঁতুড়ঘর।
ওনাকে অবাক হতে দেখে বৈভবী বলে— ‘ওহ একটু দাঁড়ান রাজামশাই...’ বলে কি একটা মন্ত্র উচ্চারণ করে কিছুটা ছাই রাজা বৃজেন্দ্রর চোখের সামনে উড়িয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেখেন সেই আগের দিনের মতো কুটির। সেখানে তন্ত্রের নাম ও নিশান নেই। আর যে বৈভবীকে একটু আগে তান্ত্রিক বেশে দেখেছিলেন, সে সেই আগের দিনের মতো শান্ত সুশীল সুন্দরী একটা মেয়ে হয়ে গেছে। মিনিট কয়েক তেমন থেকে আবার বৈভবী কিছুটা ছাই মন্ত্র উচ্চারণের পরে উড়িয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান অবস্থায় আবার ফিরে আসেন রাজা বৃজেন্দ্র। একটা ছোট্ট ঘটনা থেকে উনি বুঝতে পারেন যে, বৈভবী ওনাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসিয়েছে। তন্ত্রের দ্বারা ওনাকে মোহগ্রস্ত করে ওনার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করেছে ও। কিন্তু এখন উপায়? বৈভবী একজন মহিলা তান্ত্রিক। সেইসঙ্গে বেশ শক্তিশালীও। মোহিনী বিদ্যা ও খুব ভালো মতই জানে। কিন্তু এ চায় কি...!
রাজা বৃজেন্দ্র কিছু বলার আগেই বৈভবী বলে—‘আপনার মনে অনেক প্রশ্ন। আর সেটা আপনার চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আমি আপনাকে দু'চারটে কথা বলব। আর সেখান থেকেই আপনি সব জানতে পেরে যাবেন। আপনার রানীর যতবার ওই তিন মাসের গর্ভপাত হয়েছে, সবকিছু হয়েছে আমারই জন্য। আমি এইসব বিদ্যা খুব ভাল মত জানি। কোনও মায়ের গর্ভপাত করানোর জন্য ওই গর্ভবতী মায়ের একটা চুল পেলেই কাজ হয়ে যায়। আর সেই চুল আমি কেমন করে পাই, মানে আপনার রানীর চুল আমি কেমন করে পেয়েছি, সেটা খুঁজে বের করার দায়িত্ব আপনার।
আমি মন্ত্রের দ্বারা সঙ্গে সঙ্গে যে কোনও মানুষকে বশ করে তাকে দিয়ে যা ইচ্ছা করিয়ে নিতে পারি। আবার যা ইচ্ছা বলিয়ে নিতে পারি। এবার আপনি ভেবে দেখুন, আমি ঠিক কেমন করে কি করতে পারি। আর আমার ইচ্ছে পূরণ না করলে আপনাদের কি অবস্থা হতে পারে ভেবে দেখুন। এখন বলুন আপনি কি করবেন?’
রাজা বৃজেন্দ্র বৈভবীর প্রত্যেকটা কথা খুব ভালোমতোই বুঝতে পারলেন। তার কারণ, একটু আগেই তো ও নিজের তন্ত্রের দ্বারা কি করতে পারে, তার নমুনা দেখাল। আর তাছাড়া উনি নিজে রানী হৈমন্তীকে ছেড়ে অন্য কোন নারীকে স্পর্শ করার কথা ভাবতে পর্যন্ত পারেন না। সেখানে বৈভবী মা হতে চলেছে। আর রানী হৈমন্তীর গর্ভপাত যে হয়েছে তাও একদম তিন মাসেই হয়েছে, সেটাও বৈভবী জানে। তার মানে ওর এই কথাগুলো সত্যি। কিন্তু বৈভবী কাকে বশ করে এসব কাজ করেছে? নাকি কেউ ইচ্ছে করেই ওর সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই ঘটনাটা ঘটিয়েছে। সে সমস্ত কিছু না হয় পরে খুঁজে বের করা যাবে। কিন্তু এই মুহূর্তে এই বৈভবী ঠিক কী চায়?
বৈভবী যেন মন পড়তে পারে। বলে উঠল—‘আমি কি চাই সেটা জানতে ইচ্ছে করছে তো? ঠিক আছে আমি বলছি। আমি আপনার রাজমহলে ঠাঁই চাই। অনেক অনেক গয়না চাই। মানে রানীদের যেমন গয়না থাকে ঠিক সেইরকম। তবে হ্যাঁ, আমি যেই ধরনের গয়না পরব, সেই ধরনের গয়না আর কেউ পরতে পারবে না। এটা আমার অনেক দিনের শখ। তবে আমাকে রানীর মর্যাদা দিতে হবে না। কিন্তু আমার সন্তানকে তার যোগ্য অধিকার দিতে হবে।’
যোগ্য অধিকার...! মুখে বললেন— ‘রাজবাড়ির অন্দরমহলে আমি তোমাকে ঠাঁই দিতে পারব না। বাকি শর্ত আমার পক্ষে মানা সম্ভব কিনা সেটা আমি পরে ভেবে দেখব। তাছাড়া তোমার অনেক কথাই আমার কাছে এখনও অস্পষ্ট। এতসব কথা বলার মতো সময় আমার এখন নেই। আমাকে এখন ফিরে যেতে হবে। যুদ্ধের জন্য সমস্ত রকম প্রস্তুতি হয়ে গেছে।’
সেই সব কথায় কান না দিয়ে বৈভবী বলল— ‘অন্দরমহল না পেলে রাজবাড়ির লাগোয়া গোটা চার ঘর করে দিলেও চলবে। সে ক্ষেত্রে ওখানে আমার অনুমতিই চলবে। আপনি আসতে পারেন। কিন্তু হুকুম করতে পারবেন না। ওখানে আমি যা করার তাই করব। আমাকে বাধা দেওয়ার মতো কেউ থাকবে না। আর যদি আমার শর্ত মেনে নেন, তাহলে যুদ্ধজয় কাঁকিনগরেরই হবে।’
রাজা বৃজেন্দ্র একটু রাগের স্বরে বললেন— ‘তোমার সাহায্য লাগবে না। কাঁকিনগরের রাজা একাই একশো। সেখানে তার সঙ্গে তার বিপুল পরিমাণে সৈনিক রয়েছে। যারা দেহের শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও লড়াই করবে আর............’
‘হুম আচ্ছা সব কিছুই বুঝলাম। কিন্তু আর একটা কথা আমার রয়েছে। যদি আমার সাহায্যে রানী হৈমন্তী আপনার সন্তানের মা হতে পারেন, তাহলেও নয় তো? দেখুন আমি এখন আপনাকে এই সব শর্ত দিচ্ছি। কিন্তু আমি চাইলেই আপনাকে বশ করে আপনার অনুমতি নিয়ে রাজমহলের ভিতরে প্রবেশ করতে পারতাম। এই সম্ভাবনার কথাও কিন্তু ভুলে যাবেন না।’
বৈভবীর বাকি কথাগুলো রাজা বৃজেন্দ্রর কানে গেল না। শুধু ওই একটা কথাই শুনতে পেলেন যে, রানী হৈমন্তী আবার মা হতে পারবেন। কিন্তু সত্যিই কি সেটা সম্ভব?সেই সময় বৈভবী আবারও বলে— ‘আর আটকাব না আপনাকে। যুদ্ধে জয়ী হয়ে তারপর চিন্তাভাবনা করে আমার এখানে আসবেন। এখন যান জয় আপনারই হবে।’
এই কথা শুনে রাজা বৃজেন্দ্র ওইখান থেকে বেরিয়ে গেলেন। আর পিছন থেকে বিড়বিড় করে বৈভবী বলল— ‘আপনার সজ্ঞানেই আপনার অনুমতিতেই আমাকে সমস্ত কিছু করতে হবে। তা না হলে আমি যা করতে চাইছি তাতে আমি সফল হব না।’
এরপর দু’দিনের মধ্যে কাঁকিনগর জয়যুক্ত হয়। যেন এক অদ্ভূত মন্ত্রবলে এই সুবিশাল যুদ্ধক্ষেত্র দু’দিনেই শান্ত হয়ে যায়। কেউ না বুঝতে পারলেও রাজা বৃজেন্দ্র আন্দাজ করতে পারলেন যে, নিশ্চয়ই এর পিছনে বৈভবীর কোনও হাত রয়েছে। সেই সঙ্গে তিনি বৈভবীর ক্ষমতা সম্পর্কে আরও একটু ওয়াকিবহাল হয়ে গেলেন।
কিন্তু উনি কিছুতেই এটা বুঝতে পারলেন না যে, তিনি বৈভবীর কথা কেমন করে রানী হৈমন্তীর কাছে বলবেন। আর তাছাড়া বৈভবীর সন্তানকে যোগ্য অধিকার দিতে হবে মানে কি বলতে চাইছে ও?
নিজের মনের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ করে তিনি ঠিক করেন যে, রানী হৈমন্তীকে সবটা তিনি জানাবেন তবে তার আগে তিনি একবার বৈভবীর কাছে যাবেন। এবং জানতে চাইবেন যে, ঠিক কি চায় ও। সেই মতো তিনি যান বৈভবীর কাছে। আর ওনার করা প্রশ্নের জবাবে বৈভবী জানায়— ‘আমি চাই আমার সন্তান হবে এই কাঁকিনগরের ভবিষ্যৎ রাজা। আর মেয়ে হলে সে পাবে আপনার রাজবাড়ির সমস্ত সম্পত্তির অর্ধেক মালিকানা।’
‘অসম্ভব...! আর তাছাড়া রানীর গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তান ছাড়া অন্য কেউ রাজা হতে পারবে না। এটা নিয়মবিরুদ্ধ।’
‘আচ্ছা বেশ তাহলে আমাকে বিয়ে করুন।’
‘না না আমি কিছুতেই তোমাকে করতে পারব না।’
বেশ খানিকক্ষণ হেসে নিয়ে বৈভবী বলে— ‘ভয় পেয়ে গেলেন দেখছি। আমি তো খেলছিলাম আপনার সঙ্গে। আচ্ছা বেশ তাহলে আমি আপনাকে খুলেই বলছি। দেখুন, আমিও কিন্তু আপনাকে বিয়ে করতে চাই না। আমার চাই গয়না। অনেক সুন্দর সুন্দর গয়না। আরও একটা জিনিস চাই। সেটা আপনাকে আমার বলার দরকার নেই।
একটা কথা বলি তাহলে... আমি প্রথমে তন্ত্রবিদ্যা শিখতে চেয়েছিলাম মানুষকে বশ করে তাদের গয়না হাতিয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু তারপরে তন্ত্রটাকে ভালোবেসে অনেক বিদ্যাই নিজের দখলে আনতে পেরেছি। যাই হোক... আমার অনেক গয়না আছে। কিন্তু সেরা গয়নাটা এখনও পাইনি। আসলে এই দুনিয়ার সবথেকে সেরা সেরা গয়না গুলো পরতে চেয়েছিলাম। আমি কোথায় সেটা পাব, তার খোঁজ করতে গিয়ে শুনলাম, গয়না তৈরির মহান কারিগরদের পাওয়া যায় কাঁকিনগরে। এখান থেকে বিভিন্ন রাজারা কারিগর নিজেদের রাজ্যে নিয়ে যায়। তাহলে কাঁকিনগরের রাজার কাছে সেরার সেরা কারিগর থাকবে তা তো একটা বাচ্চাও বলে দিতে পারবে। আর এখানে প্রবেশ করার জন্য আপনাকে ব্যবহার করলাম।’
‘ওহ তার মানে এটা তোমার বাড়ি নয়। তাহলে তোমার বাবা……’
খুব জোরে আরও একবার বৈভবী হেসে উঠল। তারপর বলল— ‘উনি আমার তন্ত্র গুরু। আমি ওনাকে বাবা বলেছি, যাতে আপনার আমাকে বিশ্বাস করে এখানে আসতে কোনও দ্বিধা না হয়। আমি আর আমার তন্ত্রগুরু একে অপরের সঙ্গে একটা বিশেষ তন্ত্রের দ্বারা যুক্ত রয়েছি। আমার সাহায্য লাগলে ওই তন্ত্রের দ্বারাই ওনাকে আমন্ত্রণ জানাই। তারপর সেই মত উনি সাহায্য করতে আমার কাছে আসেন। এবারেও আমার ওনার সাহায্যের দরকার ছিল। তাই ওনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। আর উনি আমাকে সাহায্য করতে এসেছেন। ব্যস এইটুকুই। এর বেশী আর কোনও কথা আমি আপনাকে বলব না। তবে আগের দিনই আপনাকে আমি একটা কথা বলছিলাম যে, আপনি কি আমার শর্তগুলো মেনে নেন বিনিময় আমিও কিছু দেবো। এই বৈভবী তান্ত্রিক দিতেও জানে। তার আগে আমার শর্ত গুলো মেনে রাজ শীলমোহর দেওয়া চুক্তিপত্র আমাকে দিলে আমিও মন্ত্র বলে আপনার রানীকে মা হতে সাহায্য করব। তবে তার মা হতে সময় লাগবে। কিন্তু মা হবেই সেটা বলে দিচ্ছি। আর আমার শর্ত না মানলে ধ্বংস করে দেবে কাঁকিনগর।’
রাজা বৃজেন্দ্র দেখলেন বৈভবীর শর্ত মেনে নেওয়া ছাড়া এই মুহুর্তে আর কোনও উপায় নেই। খুব ভালোমতোই তিনি ফেঁসে গিয়েছেন। আর রানী হৈমন্তী কষ্ট পাবেন জেনেই বৈভবীকে কথা দেন যে, তিনি সেই চুক্তিপত্র দেবেন। সেই সঙ্গে এটাও বলেন যে, আজ থেকে প্রায় একমাস পরে রাজবাড়ির লাগোয়া ওই চার কক্ষের বাড়িতে তিনি বৈভবীকে নিয়ে যাবেন। এই কথা দিয়ে বিষন্ন মনে রাজবাড়িতে ফিরে যান রাজা বৃজেন্দ্র।
রাত্রিবেলা অনেক কষ্টে নিজের ভেতরের সমস্ত শক্তি একত্র করে রাজা বৃজেন্দ্র সমস্ত কিছু খুলে বলেন রানী হৈমন্তীকে। কিন্তু যে ভয়টা তিনি পেয়েছিলেন সেটা হলো না। রানী হৈমন্তী এক মুহূর্তের জন্যও ওনাকে ভুল বুঝলেন না। উল্টে তিনি বলেন যে, রাজা বৃজেন্দ্র এতদিন কেন ওনাকে সবটা বলেননি, কেন সমস্ত কষ্ট নিজে নিজে একা একাই ভোগ করেছেন? কিন্তু মুখে এই সমস্ত কিছু কথা বললেও ওনার মনে আরও একটা কথা চলছিল। সেটা হল, রাজবাড়িতে এমন ভয়ানক তন্ত্রসাধিকা ডেকে এনে রাজা কিছু ভুল করলেন না তো? এইদিকে রাজামশাই কথাও দিয়ে দিয়েছেন। তাই সে কথার খেলাপও করা যাবে না।
কি করবেন বুঝতে না পেরে নিজের সন্দেহ দূর করার জন্যই তিনি তার এক বিশ্বস্ত দাসীকে বলে দিলেন যে, বৈভবী রাজবাড়িতে আসার পর থেকে কখন কি করবে বা কখন কি করছে, তার ওপরে সবসময় যেন নজর রাখে।
একটা মাস অতিক্রান্ত হতে না হতেই রাজবাড়ির লাগোয়া ওই কক্ষের এসে ওঠে বৈভবী। একটা কক্ষে ওর থাকার ব্যবস্থা হয়। আর একটা কক্ষে তার চার দাসীর থাকার ব্যবস্থা হয়। আর একটা কক্ষ রাখে নিজের তন্ত্রসাধনার জন্য। কিন্তু আর একটা কক্ষে সে কি জন্য রেখেছে, তা কেউ জানতে পারে না। তালা বন্ধ অবস্থায় রেখে দেয়। রাজা বৃজেন্দ্রও জানতে পারেন না। জানার চেষ্টাও করতে পারেন না। তার কারণ, বৈভবীর শর্ত অনুযায়ী ওই চার কক্ষের একটা ছোট্ট প্রাসাদে ওর ছাড়া আর কারোর হুকুম চলবে না। কেউ কোনও কিছু জানার চেষ্টাও করবে না।
সমস্ত কিছুর চোখের সামনে থাকলেও ওই যে একটা কক্ষ না খুলেই পরে খুলবে বলে বৈভবী রেখে দিলো, সেটা থেকেই রানী হৈমন্তীর মনের সন্দেহটা আরও বেশি করে বাড়তে শুরু করে। বারবার ভাবতে থাকেন, ওই কক্ষে বৈভবী ঠিক কি করবে?তন্ত্র সাধনা নাকি এর থেকেও বড় কিছু? গয়না পাওয়া কি কোন তন্ত্র সাধিকার প্রধান উদ্দেশ্য হতে পারে?
এর পরের দিন গুলো কেটে যেতে থাকে। সেই দাসী রানী হৈমন্তীকে জানায়, বৈভবীর চারজন দাসী নাকি পুতুলের মত সমস্ত কথা মেনে চলে। একটা বারের জন্যও কোনও কথা বলে না। দেখে মনে হয়, জীবন্ত লাশ। অথচ এই দাসীগুলোই যখন রাজমহলের ভিতরে ছিল, তখন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মতো আচরণ করতো। এই কথাটা শুনে রানী হৈমন্তী বুঝে যান যে, বৈভবী ওই দাসীদেরকে নিজের বশবর্তী করে রেখেছে। তার কারণ, ওইখানে ও কি কর্মকাণ্ড করছে, তা যেন ওই দাসীরা কাউকে বলতে না পারে। আর রানীর মুখে এই কথা শুনে, সেই দাসী জানায়, ওই চারজন ওর বশবর্তী যদি হয়েও থাকে, তবুও কিন্তু ওই একটা নির্দিষ্ট কক্ষে ওদেরও প্রবেশ মানা। সেখানে বৈভবী একাই সারারাত থাকে। সূর্যের আলো ফোটার কিছু আগে বেরিয়ে আসে।
সন্দেহের পর সন্দেহ বেড়েই চলেছে। কিন্তু তার প্রতিকারের কোনও উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না রানী হৈমন্তী।
এই ভাবেই দেখতে দেখতে চারটে মাস পেরিয়ে যায়।
সবকিছু আবার আগের মতো হলেও মানে, বৈভবীর সমস্ত ব্যবহার একই রকম থাকলেও আরও একটা জিনিস লক্ষ্য করে ওই দাসী। সেটা হল, অমাবস্যার দু’দিন আগে বৈভবী রাতের অন্ধকারে কোথাও একটা বেরিয়ে যায়। প্রত্যেক অমাবস্যায় ওর বাইরে বেরোনোর কি দরকার পরে ও বুঝতে পারে না।
পরপর চার মাস ওই একই ঘটনা ঘটেছে। এটা শুনে রানী হৈমন্তীর সন্দেহ আরও একটু বাড়ে। কিন্তু ওইটুকুই। তার বাদে তিনি আর কিছু করতে পারেন না। তার কারণ, কোনও প্রমান নেই যে কিছু করবেন বা কিছু বলবেন। শুধুমাত্র ওই দাসীকে বলে দেন, বৈভবীর দিকে আরও ভালো করে নজর রাখতে। আর মনে মনে ঠিক করেন অমাবস্যার দু’দিন আগে ও ঠিক কোথায় যায়, সেটা খুঁজে বের করতে হবে। একটা গর্ভবতী মহিলা অমাবস্যার দু’দিন আগে রাত্রিবেলা কি করতে পারে, তা যথেষ্ট সন্দেহ জনক।
এর পরের দিনই রাজবাড়ির অন্দরমহলে খবর আসে, বৈভবীর পুত্রসন্তান হয়েছে। আর অদ্ভুত ভাবে রানী হৈমন্তী একটা অন্য জিনিস লক্ষ্য করেন। তিনি দেখেন যে, রাজা বৃজেন্দ্র এতে অত্যন্ত খুশি হয়ে যে এই খবর ওনাকে এনে দিল, তাকে নিজের গলার মণিমুক্তা খচিত একটা হার উপহার হিসেবে দিয়ে দিলেন। যে রাজা এই সমস্ত ঘটনায় এতটা ভেঙে পড়েছিলেন, হঠাৎ করে এইরকম কেন করলেন? কিন্তু এই ব্যাপারটা দেখার পরে রানী হৈমন্তী খুবই দুঃখ পেলেন। তিনি নিজেই চেয়েছিলেন রাজা আরও একটা বিয়ে করুন। কিন্তু তখন তো তিনি রাজি হননি। উল্টে বৈভবীর সঙ্গে রাত কাটানোর পরে রাজা হৈমন্তীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। আর হৈমন্তীও ও রাজার বলা প্রত্যেকটা কথা থেকে বুঝতে পেরেছিলেন যে, উনি যা করেছেন তা নিজের থেকে করেননি। ওনার সঙ্গে ছল করা হয়েছে। হৈমন্তী নিজের স্বামীকে ভুল বোঝেননি। উল্টে যোগ্য রানীর মত এই বিপদে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু এখন রাজা বৃজেন্দ্রর হলোটা কি?
বৃজেন্দ্রকে এইভাবে খুশি হতে দেখে হৈমন্তীর বিশ্বাসটা যেন টলে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, সেই দিনের সেই কথাগুলো সত্যি, নাকি আজকে রাজার এই রকম ব্যবহারটা সত্যি? রাজা কোনভাবেই ওনাকে মিথ্যে বলার চেষ্টা করছেন কি? কি মনে হতে গুটি গুটি পায়ে তিনি চলে যান রাজা বৃজেন্দ্রর সামনে।
রানী হৈমন্তী নিজের মনের ভিতরে চলা কথাগুলো রাজা বৃজেন্দ্রকে বলতে যাবেন, তার আগেই তিনি বলে ওঠেন— ‘ও তুমি এসেছো...! জানো, প্রথমে আমি বৈভবীর গর্ভে আমার সন্তান এটা মানতে পারিনি। কিন্তু আজকে বাবা হতে সেই আনন্দটা আমি অনুভব করতে পারছি। সেইদিন এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল যে, বৈভবী আমার সঙ্গে মিথ্যে প্রতারণা করে বলেছে যে, ও আমার সন্তানের মা হতে চলেছে। কিন্তু তবুও সেই মুহূর্তে আমার করার মত কিছুই ছিল না, শুধুমাত্র ওর ওই বশীকরণ ক্ষমতার জন্য। কিন্তু আজকে বাবা হতে যে আনন্দ আমি অনুভব বুঝতে পারছি, তা দেখে বুঝতে পারছি যে না এই সন্তান আমারই।
রানী হৈমন্তী আর পারলেন না এই কথাগুলোকে মেনে নিতে। ওনার মনে কোথাও একটা ছিল, হয়তো বৈভবী রাজা বৃজেন্দ্রকে নিজের বশবর্তী করে রেখেছে। আর তাই তিনি এইরকম অদ্ভুত আচরণ করছেন। কিন্তু এখন ওনার কথা শুনে রানীর এক মুহূর্তের জন্যও মনে হলো না যে, উনি বৈভবীর বশবর্তী। ভিতর থেকে কান্না বেরিয়ে আসতে চায়। আসলে একটা স্ত্রী তার স্বামীর মুখে এমন কথা শুনলে তার মন খারাপ হবে বৈকি। কিন্তু যারা রানী হয়, তাদেরকে তো এই সমস্ত কিছু মেনে নিতেই হয়। তবে এখানে প্রশ্ন হল, এই মুহূর্তে বৈভবীর ওই যে কার্যকলাপ, যা কিনা রানী হৈমন্তীর মনে সন্দেহ বাড়িয়েই চলেছে, সেই কথাগুলো কি রাজাকে বলা উচিত হবে? আরেকটু চিন্তাভাবনা করে তারপরে রাজাকে জানাবেন ভেবে, তিনি নিজের কক্ষে চলে যান।
এর প্রায় তিন-চার দিন পরে রাজসভায় দুটো মেয়ে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার খবর আসে। হঠাৎ করে দুটো মেয়ে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। এর আগে এই রাজ্যে এই ধরনের কোনও ঘটনা ঘটেনি। তাই রাজা বৃজেন্দ্র ঠিক করেন যে, তিনি যথাসম্ভব সেই মেয়ে দুটোকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন। তিনি চান না যে, ওনার রাজ্যে এইরকম কোনও কিছু হোক।
এইদিকে ওই দিন দুপুরের পর থেকে বৈভবী ওর ওই চার কক্ষের ছোট্ট প্রাসাদের সামনে যে জায়গা রয়েছে, ওখানে ছ’টা ছোট ছোট কক্ষ মতো বানানো শুরু করে। মাটি খোঁড়া দেখে তেমনটাই আন্দাজ করতে পারেন রানী হৈমন্তী। আর এইসব দেখে ওনার মনের মধ্যে কোথাও একটা যেন খটকা লাগে। একই দিনে, দুটো মেয়ের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার খবর আসে আর বৈভবীও ওই কি সব বানানো শুরু করে। তাহলে কী কোথাও গিয়ে এই দুটোর ঘটনার মিল রয়েছে? নাকি ও তান্ত্রিক বলেই এমন একটা সন্দেহ হচ্ছে। যাই হোক না কেন এই কথাটা তিনি মনের মধ্যেই রেখে দেন। কারোর সঙ্গে আলোচনা করেন না।
এরপর সাত দিনের মাথায় দেখা যায় রানী হৈমন্তী যেইগুলোকে ছোট ছোট ছ’টা কক্ষ ভেবেছিলেন, সেইগুলো আসলে ছোট ছোট এক একটা মন্দির। একই রকম দেখতে সবগুলো। এখন প্রশ্ন হল, বৈভবী হঠাৎ এমন ছোট ছোট মন্দির বানালো কেন? এই মন্দিরে দু’ তিন জনের বেশি লোক প্রবেশ করতে পারবে না। আর উচ্চতাও মোটামুটি ওই এক মানুষের একটু বেশি।
এরপর দেখতে দেখতে আবার চলে আসে অমাবস্যার দিন। ওই ছ’টা মন্দিরের একদম ধারের মন্দিরটা সুন্দরভাবে সাজানো হয়। রাতভর সেখানে কি সব তন্ত্র সাধনা চলে। বিশাল যজ্ঞের আগুন রাজবাড়ির প্রায় সকলেই দেখেছিল। কিন্তু রাজার অনুমতি ছিল না বলে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। কিন্তু সবার মনেই একটা প্রশ্ন ছিল যে, ওখানে আসলে হচ্ছেটা কি।
কেউ প্রশ্ন করার সাহস না দেখালেও রাজমাতা ঠিক করেন যে, তিনি ঠিক জিজ্ঞাসা করবেনই। কারণ, একটা প্রতিবাদ হওয়া দরকার বলে মনে হয়েছে ওনার। বৈভবী চোখের সামনে রাজবাড়ির পরিসরের মধ্যে ওই ভাবেই নিজের ইচ্ছা খুশিমতো কোনও কাজ করতে পারবে না বলেই রাজমাতার মনে হয়েছে।
রাজবাড়ির অন্দরমহলের মধ্যে না পড়লেও বৈভবীর ওই চারটে কক্ষ কিন্তু রাজবাড়ির পরিসরের মধ্যেই পড়তো। সেই কারণেই রাজমাতার মনে হয়েছে যেকোনও রকম প্রশ্ন করার অধিকার ওনার রয়েছে। আসলে রানী হৈমন্তী ছাড়া আর কেউ বৈভবীর ওখানে আসার আর থাকার আসল কারণটা জানত না। এমনকি বৈভবীর সন্তান যে রাজার সন্তান, তাও কেউ জানে না। এই কথাটা রানী হৈমন্তীর পরামর্শ মতো রাজা বৃজেন্দ্র কাউকে জানাননি। তার কারণ, তিনি চাননি অকারণে কেউ ওনার স্বামীকে ভুল বুঝুক। কিন্তু এখন তো পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। কিন্তু তবুও রানী হৈমন্তীর মনে হয়, এই সমস্ত সত্যিটা সামনে আসার এখনও সময় হয়নি।
রাজমাতা জানতেন যে, তিনি রাজা বৃজেন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করে যদি বৈভবীকে কিছু বলতে চান, তাহলে তিনি অবশ্যই না বলবেন। তাই কাউকে কিছু না বলেই সোজা চলে যান বৈভবীর কাছে। তারপর সরাসরি জিজ্ঞাসা করেন— ‘এই যে তোমার এখানে আসার এবং এমন ভাবে এখানে থেকে তন্ত্র সাধনা করার পিছনে আসল উদ্দেশ্যটা কি?’
রাজমাতার গলায় বেশ রাগ ঝোরে পড়ছিল। ওনার ওই রাগত কণ্ঠস্বর শুনে বৈভবী উগ্র প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে ভীষণ শান্তভাবে বলে— ‘রাজা বৃজেন্দ্র আমাকে কথা দিয়েছেন যে, আমি এখানে কি করব না করব, তা নিয়ে কেউ কখনও কোনও প্রশ্ন করবে না। তাহলে আজ আপনি এখানে কেন? রাজা বৃজেন্দ্র জানেন যে, আপনি এখানে এসেছেন এবং আমাকে এইরকম ভাবে প্রশ্ন করছেন। আপনি এমন ভাবে আমার সঙ্গে কথা বলতে পারেন না।’
রাজমাতাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নন। তাই তিনি বললেন— ‘এত কথা বলার দরকার নেই। আর তুমি কে এমন যে, তুমি আমাকে মানে রাজমাতাকে শেখাবে তার কোনটা করা উচিত আর কোনটা করা উচিত নয়। আমি তোমাকে বলছি, তুমি এখান থেকে চলে যাও। আমি কিছুতেই তোমাকে এখানে তন্ত্র সাধনা করতে দেব না। তোমাদের মত তান্ত্রিককে আমার খুব ভালোমতো চেনা আছে। রাজা বৃজেন্দ্র তোমাকে এখানে এনেছে খুব ভালো কথা। কিন্তু এখন তোমার এই কার্যকলাপ দেখে আমি তোমাকে আর এখানে থাকতে দিতে পারব না। আমার তো মনে হয় আমার ছেলের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের মাথা এখনও ঠিক আছে।’
ওনাদের এই কথোপকথনের মধ্যেই ওই দাসী গিয়ে রানী হৈমন্তীকে রাজমাতার ওখানে যাওয়ার খবরটা দেয়। আর অন্য দিকে বৈভবীর একজন দাসী গিয়ে সেই খবর দেয় রাজা বৃজেন্দ্রকে। সঙ্গে সঙ্গে রানী হৈমন্তী আর রাজা বৃজেন্দ্র ঘটনাস্থলে যান। ওখানে গিয়ে বৃজেন্দ্র বৈভবীর কাছে ক্ষমা চেয়ে রাজমাতাকে মহলে নিয়ে চলে যান। এতে রাজমাতা খুব অপমানিত বোধ করেন। তার কারণ, বৃজেন্দ্র বৈভবীর কাছে ক্ষমা চেয়েছিল রাজমাতার ব্যবহারের জন্য। তারমানে রাজমাতা ভুল। কিন্তু রাজমাতার মনে হয়েছে, তিনি একবারের জন্যও কোন ভুল কাজ করেননি।
রাজা বৃজেন্দ্র খুব ভালোমতোই বুঝতে পারেন যে, রাজমাতা অত্যন্ত রেগে গেছেন। তাই ওনাকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে বললেন যে, বৈভবী আসলে এখানে এসেছে ওনার আর হৈমন্তীর যাতে সন্তান হয় সেইজন্য। তাই ওকে তাড়ানো চলবে না।
রানী হৈমন্তী আবার অবাক হয়ে যান। তিনি ভাবতেই পারেন না যে, ওনার স্বামী অবলীলায় নিজের মাকে এমনভাবে মিথ্যে বলতে পারেন। অবশ্যই তিনিই বারণ করেছিলেন রাজাকে এই কথা কাউকে না বলার জন্য। কিন্তু তবুও মানুষ মিথ্যা কথা বলতে গেলে একটু হোঁচট খায়। কিন্তু রাজা বৃজেন্দ্র অবলীলায় মিথ্যে বলে ফেললেন। রানী হৈমন্তীর ইচ্ছে করছিল সবার সামনে সত্যিটা বলে দিতে। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। তার কারণ, এখন যদি তিনি সত্যিটা সবার সামনে বলে দেন, তাহলে ওনার নিজের স্বামীকে অপমান করা হবে। তাই চুপ করে রইলেন। কিন্তু রাজমাতা ওনাকেই জিজ্ঞাসা করলেন যে, রাজা বৃজেন্দ্র সঠিক কথা বলছেন কিনা।
মনের মধ্যে সত্যিটা বলার ইচ্ছা থাকলেও সবার সামনে রাজার সম্মান রাখতে রানী হৈমন্তী মাথা নেড়ে সম্মতি জানান। আসলে এই কথাটা পুরোপুরি সত্যি না হলেও একদম মিথ্যেও বলা যায় না।
তবে রানী হৈমন্তীর মুখে এই কথা শোনা সত্ত্বেও রাজমাতা শান্ত হলেন না। বললেন— ‘যেখানে এত বড় বৈদ্যরা কোনও আশার আলো দেখাতে পারলেন না, সেখানে এই তন্ত্রসাধিকা কি করবে? আর যদি কিছু করতে পারেও, তাহলেও এই বৈভবী কিছু করতে পারবে না। কারণ, একে তো একদিনের জন্যও দেখলাম না যে, রানী হৈমন্তী যাতে গর্ভবতী হয়, তার জন্য কোনও রকম কোনও চেষ্টা করতে। একে তো দেখলাম নিজের মতই থাকতে। নিজের যা ইচ্ছা খুশি মতো কাজ করতে। যদি হৈমন্তীকে গর্ভবতী করা ওর প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে থাকত, তাহলে এতদিনে সেই উদ্দেশ্য সফল হয়ে যেত। কিন্তু সেইসব কিছুই হলো না। আমি আর কোনও কথা শুনতে চাই না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একে বিদায় করতেই হবে। আর রাজার আদেশের উপরেও আরও একটা ক্ষমতা আছে। আশা করি সেটা তোমরা কেউ ভুলে যাওনি।’
আসলে রাজবাড়িতে অনেক আগে থেকেই একটা নিয়ম ছিল। সেটা হল, রাজমহলের জন্য নেওয়া রাজার কোনও সিদ্ধান্ত যদি সেখানে বসবাসকারী মানুষদের জন্য অস্বস্তিকর হয়, তাহলে রাজমহলের সবাই একসঙ্গে নিজেদের আপত্তি জানাতে পারে। সবাই মানে সবাই। একজনও বাদ যাওয়া চলবে না। এবার সবাই যদি আপত্তি করে, তাহলে রাজার ওই সিদ্ধান্ত রাজবাড়ির অন্দরমহলে চলবে না। অবশ্য রাজ্যের সব মানুষদের জন্য কোনও নিয়ম হলে, রাজার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
কিন্তু রাজা বৃজেন্দ্র রাজমহলের একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, রাজমহলের পাশেই বৈভবী থাকবে। তাই...... সেই ক্ষমতার কথাই রাজমাতা মনে করিয়ে দিলেন ওনাকে। তিনি তখন আর কোনও কথা বললেন না। তখনকার মত সবাই শান্ত হয়ে যায়।
রাতে রাজা বৃজেন্দ্র রানী হৈমন্তীর কক্ষে যান। আজ অনেকদিন পরে নিজের স্বামীকে দেখে হৈমন্তীর চোখে জল চলে আসে। স্বামীকে তার কর্তব্যবোধ বোঝাতে তার ভালোবাসাকে হাতিয়ার করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি বোঝেননি যে, ওইটুকু অবহেলাই ওনার জীবনে এমন একটা পরিস্থিতি হবে যে, তিনি এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়াবেন; যেখানে নিজের স্বামীর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ওনাকে এইরকম ভাবে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়।
ওনার চোখের জল দেখে রাজা বৃজেন্দ্র আদরে আদরে ভরিয়ে দেন রানী হৈমন্তীকে। স্বামীর সোহাগে লজ্জায় লাল হয়ে যান রানী হৈমন্তী। একসময় ওনারা ঘুমের দেশে পাড়ি দেন। সকালবেলা ঘুম ভেঙে চোখের সামনে স্বামীকে দেখে ওনার মনটা একটা অদ্ভূত ভালোলাগায় ভরে যায়। উনি রাজার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, এমন সময় ঘুম থেকে উঠে বসলেন রাজা বৃজেন্দ্র। তিনি হৈমন্তীকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন— ‘হৈম, একটা কথা মানে, অনুরোধ করলে তুমি সেটা রাখবে?’
হৈমন্তীর মাথা নেড়ে সম্মতি জানালে তিনি বলেন— ‘রাজমাতা যদি বৈভবীকে তাড়ানোর জন্য তোমার সম্মতি চায়, তাহলে তুমি তাকে তোমার মত দেবে না। আর একজনও যদি বিরোধিতা করে, তাহলে কিন্তু সেই নিয়ম কার্যকর হবে না। আমি জানি সবাই রাজমাতার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাবে। তার কারণ, বৈভবীর যা কিছু করছে তা কখনোই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আমারও যে ভালো লাগছে তা কিন্তু নয়। কিন্তু দেখো, যতই হোক সে আমার সন্তানকে জন্ম দিয়েছে। তারপর তোমাকে মা হতে সাহায্য করবে। তাই আমি চাইলেও ওকে এখান থেকে বের করে দিতে পারব না। আর আমার এই কথাগুলো তুমি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। সে কারণেই তোমার কাছেই অনুরোধটা করলাম।’
রাজা বৃজেন্দ্রর এই কথা শুনে রানী হৈমন্তীর খুব খারাপ লাগে। না হৈমন্তী মা হবেন কি হবেন না, এতে কিন্তু খারাপ লাগেনি। খারাপ লেগেছে যে, রাজা বলেছেন, তার সন্তানকে জন্ম দিয়েছে বৈভবী। সেই রাজা, যে কিনা বারবার সবাইকে একটা কথাই বলে গেছেন, তিনি দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারবে না। কারণ, তিনি চান না, ওনার সন্তান অন্য কারোর গর্ভ থেকে জন্ম নিক। অথচ আজকে........ মনে মনে কষ্ট পেলেও মুখে বললেন— ‘আচ্ছা বেশ তাই হবে। আমার যতই খারাপ লাগুক না কেনো, আমি আপনার কথা রাখব। আপনি আমার স্বামী আর স্বামীর কথা শোনা মেয়েদের দায়িত্ব কর্তব্য। সেই কর্তব্য থেকেই আমি আপনার কথা শুনব।’
রাজা বৃজেন্দ্র আরও কিছু কথা বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার আগেই একজন দ্বারপাল এসে খবর দেয় যে, গতকাল রাজমাতা যা যা বলেছিলেন, তা কাজে করে দেখানোর জন্য তিনি বেশ কয়েকজনকে কিছু কথা বলছিলেন। ঠিক সেইসময় আচমকাই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাজবৈদ্যকে ডেকে আনা হয়েছে। এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ওনারা রাজমাতার সামনে গিয়ে উপস্থিত হন।
রাজবৈদ্য সমস্ত পরীক্ষা করার পরে জানান, রাজমাতার সঠিক কি অসুখ হয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে আপাতত ওনাকে শয্যাশায়ী হয়ে থাকতে হবে। আর তার থেকেও বড় কথা, রাজমাতা নিজে থেকে সমস্ত কিছু কাজকর্ম করার ক্ষমতা হারিয়েছেন। তিনি সব কিছুই দেখতে পাবেন আর বুঝতেও পারবেন। কিন্তু কিছু করতে পারবেন না।
এই কথা শুনে সবার মন খারাপ হয়ে গেল। আর সেইসঙ্গে বৈভবীকে রাজবাড়ি ত্যাগ করানোর যে প্রচেষ্টা চলছিল, তাও বন্ধ হয়ে গেল। তার কারণ, রাজার ওপর দিয়ে কথা বলার অধিকার একমাত্র রাজমাতার ছিল। আর তো কারোর নেই।
দেখতে দেখতে এরপরে আরও পাঁচটা মাস কেটে যায়।
রাজমাতার সুস্থ হওয়ার কোনও লক্ষণই দেখা যায় না। একইভাবে বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে রয়েছেন। আরও একটা ব্যাপার হয়েছে। রানী হৈমন্তী সত্যি সত্যি গর্ভবতী হয়েছেন। রাজা যতটা সম্ভব রানীর সেবা করেন। আর সেটা দেখে, হৈমন্তীর মনে হয় যে, নিশ্চয়ই রাজা আবার আগের মতো ওনাকে ভালোবাসতে শুরু করেছেন। তাহলে কি এটা বৈভবীর জন্যই হল?
এইদিকে ভগবানের আশীর্বাদ হোক, কি আর যাই হোক না কেন, সেই দিনের সেই বিশাল যুদ্ধের পরে কাঁকিনগরে আর কোন বড় ঝামেলা হয়নি বা শত্রুপক্ষের আক্রমণও হয়নি। কিন্তু তখনও কেউ জানত না যে, ভবিষ্যতে ঠিক কোন বড় ঝড় আসতে চলেছে।
সবকিছু আবার আগের মতো হলেও মানে, বৈভবীর সমস্ত ব্যবহার একই রকম থাকলেও আরও একটা জিনিস লক্ষ্য করে ওই দাসী। সেটা হল, অমাবস্যার দু’দিন আগে বৈভবী রাতের অন্ধকারে কোথাও একটা বেরিয়ে যায়। প্রত্যেক অমাবস্যায় ওর বাইরে বেরোনোর কি দরকার পরে ও বুঝতে পারে না।
পরপর চার মাস ওই একই ঘটনা ঘটেছে। এটা শুনে রানী হৈমন্তীর সন্দেহ আরও একটু বাড়ে। কিন্তু ওইটুকুই। তার বাদে তিনি আর কিছু করতে পারেন না। তার কারণ, কোনও প্রমান নেই যে কিছু করবেন বা কিছু বলবেন। শুধুমাত্র ওই দাসীকে বলে দেন, বৈভবীর দিকে আরও ভালো করে নজর রাখতে। আর মনে মনে ঠিক করেন অমাবস্যার দু’দিন আগে ও ঠিক কোথায় যায়, সেটা খুঁজে বের করতে হবে। একটা গর্ভবতী মহিলা অমাবস্যার দু’দিন আগে রাত্রিবেলা কি করতে পারে, তা যথেষ্ট সন্দেহ জনক।
এর পরের দিনই রাজবাড়ির অন্দরমহলে খবর আসে, বৈভবীর পুত্রসন্তান হয়েছে। আর অদ্ভুত ভাবে রানী হৈমন্তী একটা অন্য জিনিস লক্ষ্য করেন। তিনি দেখেন যে, রাজা বৃজেন্দ্র এতে অত্যন্ত খুশি হয়ে যে এই খবর ওনাকে এনে দিল, তাকে নিজের গলার মণিমুক্তা খচিত একটা হার উপহার হিসেবে দিয়ে দিলেন। যে রাজা এই সমস্ত ঘটনায় এতটা ভেঙে পড়েছিলেন, হঠাৎ করে এইরকম কেন করলেন? কিন্তু এই ব্যাপারটা দেখার পরে রানী হৈমন্তী খুবই দুঃখ পেলেন। তিনি নিজেই চেয়েছিলেন রাজা আরও একটা বিয়ে করুন। কিন্তু তখন তো তিনি রাজি হননি। উল্টে বৈভবীর সঙ্গে রাত কাটানোর পরে রাজা হৈমন্তীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। আর হৈমন্তীও ও রাজার বলা প্রত্যেকটা কথা থেকে বুঝতে পেরেছিলেন যে, উনি যা করেছেন তা নিজের থেকে করেননি। ওনার সঙ্গে ছল করা হয়েছে। হৈমন্তী নিজের স্বামীকে ভুল বোঝেননি। উল্টে যোগ্য রানীর মত এই বিপদে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু এখন রাজা বৃজেন্দ্রর হলোটা কি?
বৃজেন্দ্রকে এইভাবে খুশি হতে দেখে হৈমন্তীর বিশ্বাসটা যেন টলে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, সেই দিনের সেই কথাগুলো সত্যি, নাকি আজকে রাজার এই রকম ব্যবহারটা সত্যি? রাজা কোনভাবেই ওনাকে মিথ্যে বলার চেষ্টা করছেন কি? কি মনে হতে গুটি গুটি পায়ে তিনি চলে যান রাজা বৃজেন্দ্রর সামনে।
রানী হৈমন্তী নিজের মনের ভিতরে চলা কথাগুলো রাজা বৃজেন্দ্রকে বলতে যাবেন, তার আগেই তিনি বলে ওঠেন— ‘ও তুমি এসেছো...! জানো, প্রথমে আমি বৈভবীর গর্ভে আমার সন্তান এটা মানতে পারিনি। কিন্তু আজকে বাবা হতে সেই আনন্দটা আমি অনুভব করতে পারছি। সেইদিন এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল যে, বৈভবী আমার সঙ্গে মিথ্যে প্রতারণা করে বলেছে যে, ও আমার সন্তানের মা হতে চলেছে। কিন্তু তবুও সেই মুহূর্তে আমার করার মত কিছুই ছিল না, শুধুমাত্র ওর ওই বশীকরণ ক্ষমতার জন্য। কিন্তু আজকে বাবা হতে যে আনন্দ আমি অনুভব বুঝতে পারছি, তা দেখে বুঝতে পারছি যে না এই সন্তান আমারই।
রানী হৈমন্তী আর পারলেন না এই কথাগুলোকে মেনে নিতে। ওনার মনে কোথাও একটা ছিল, হয়তো বৈভবী রাজা বৃজেন্দ্রকে নিজের বশবর্তী করে রেখেছে। আর তাই তিনি এইরকম অদ্ভুত আচরণ করছেন। কিন্তু এখন ওনার কথা শুনে রানীর এক মুহূর্তের জন্যও মনে হলো না যে, উনি বৈভবীর বশবর্তী। ভিতর থেকে কান্না বেরিয়ে আসতে চায়। আসলে একটা স্ত্রী তার স্বামীর মুখে এমন কথা শুনলে তার মন খারাপ হবে বৈকি। কিন্তু যারা রানী হয়, তাদেরকে তো এই সমস্ত কিছু মেনে নিতেই হয়। তবে এখানে প্রশ্ন হল, এই মুহূর্তে বৈভবীর ওই যে কার্যকলাপ, যা কিনা রানী হৈমন্তীর মনে সন্দেহ বাড়িয়েই চলেছে, সেই কথাগুলো কি রাজাকে বলা উচিত হবে? আরেকটু চিন্তাভাবনা করে তারপরে রাজাকে জানাবেন ভেবে, তিনি নিজের কক্ষে চলে যান।
এর প্রায় তিন-চার দিন পরে রাজসভায় দুটো মেয়ে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার খবর আসে। হঠাৎ করে দুটো মেয়ে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। এর আগে এই রাজ্যে এই ধরনের কোনও ঘটনা ঘটেনি। তাই রাজা বৃজেন্দ্র ঠিক করেন যে, তিনি যথাসম্ভব সেই মেয়ে দুটোকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন। তিনি চান না যে, ওনার রাজ্যে এইরকম কোনও কিছু হোক।
এইদিকে ওই দিন দুপুরের পর থেকে বৈভবী ওর ওই চার কক্ষের ছোট্ট প্রাসাদের সামনে যে জায়গা রয়েছে, ওখানে ছ’টা ছোট ছোট কক্ষ মতো বানানো শুরু করে। মাটি খোঁড়া দেখে তেমনটাই আন্দাজ করতে পারেন রানী হৈমন্তী। আর এইসব দেখে ওনার মনের মধ্যে কোথাও একটা যেন খটকা লাগে। একই দিনে, দুটো মেয়ের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার খবর আসে আর বৈভবীও ওই কি সব বানানো শুরু করে। তাহলে কী কোথাও গিয়ে এই দুটোর ঘটনার মিল রয়েছে? নাকি ও তান্ত্রিক বলেই এমন একটা সন্দেহ হচ্ছে। যাই হোক না কেন এই কথাটা তিনি মনের মধ্যেই রেখে দেন। কারোর সঙ্গে আলোচনা করেন না।
এরপর সাত দিনের মাথায় দেখা যায় রানী হৈমন্তী যেইগুলোকে ছোট ছোট ছ’টা কক্ষ ভেবেছিলেন, সেইগুলো আসলে ছোট ছোট এক একটা মন্দির। একই রকম দেখতে সবগুলো। এখন প্রশ্ন হল, বৈভবী হঠাৎ এমন ছোট ছোট মন্দির বানালো কেন? এই মন্দিরে দু’ তিন জনের বেশি লোক প্রবেশ করতে পারবে না। আর উচ্চতাও মোটামুটি ওই এক মানুষের একটু বেশি।
এরপর দেখতে দেখতে আবার চলে আসে অমাবস্যার দিন। ওই ছ’টা মন্দিরের একদম ধারের মন্দিরটা সুন্দরভাবে সাজানো হয়। রাতভর সেখানে কি সব তন্ত্র সাধনা চলে। বিশাল যজ্ঞের আগুন রাজবাড়ির প্রায় সকলেই দেখেছিল। কিন্তু রাজার অনুমতি ছিল না বলে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। কিন্তু সবার মনেই একটা প্রশ্ন ছিল যে, ওখানে আসলে হচ্ছেটা কি।
কেউ প্রশ্ন করার সাহস না দেখালেও রাজমাতা ঠিক করেন যে, তিনি ঠিক জিজ্ঞাসা করবেনই। কারণ, একটা প্রতিবাদ হওয়া দরকার বলে মনে হয়েছে ওনার। বৈভবী চোখের সামনে রাজবাড়ির পরিসরের মধ্যে ওই ভাবেই নিজের ইচ্ছা খুশিমতো কোনও কাজ করতে পারবে না বলেই রাজমাতার মনে হয়েছে।
রাজবাড়ির অন্দরমহলের মধ্যে না পড়লেও বৈভবীর ওই চারটে কক্ষ কিন্তু রাজবাড়ির পরিসরের মধ্যেই পড়তো। সেই কারণেই রাজমাতার মনে হয়েছে যেকোনও রকম প্রশ্ন করার অধিকার ওনার রয়েছে। আসলে রানী হৈমন্তী ছাড়া আর কেউ বৈভবীর ওখানে আসার আর থাকার আসল কারণটা জানত না। এমনকি বৈভবীর সন্তান যে রাজার সন্তান, তাও কেউ জানে না। এই কথাটা রানী হৈমন্তীর পরামর্শ মতো রাজা বৃজেন্দ্র কাউকে জানাননি। তার কারণ, তিনি চাননি অকারণে কেউ ওনার স্বামীকে ভুল বুঝুক। কিন্তু এখন তো পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। কিন্তু তবুও রানী হৈমন্তীর মনে হয়, এই সমস্ত সত্যিটা সামনে আসার এখনও সময় হয়নি।
রাজমাতা জানতেন যে, তিনি রাজা বৃজেন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করে যদি বৈভবীকে কিছু বলতে চান, তাহলে তিনি অবশ্যই না বলবেন। তাই কাউকে কিছু না বলেই সোজা চলে যান বৈভবীর কাছে। তারপর সরাসরি জিজ্ঞাসা করেন— ‘এই যে তোমার এখানে আসার এবং এমন ভাবে এখানে থেকে তন্ত্র সাধনা করার পিছনে আসল উদ্দেশ্যটা কি?’
রাজমাতার গলায় বেশ রাগ ঝোরে পড়ছিল। ওনার ওই রাগত কণ্ঠস্বর শুনে বৈভবী উগ্র প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে ভীষণ শান্তভাবে বলে— ‘রাজা বৃজেন্দ্র আমাকে কথা দিয়েছেন যে, আমি এখানে কি করব না করব, তা নিয়ে কেউ কখনও কোনও প্রশ্ন করবে না। তাহলে আজ আপনি এখানে কেন? রাজা বৃজেন্দ্র জানেন যে, আপনি এখানে এসেছেন এবং আমাকে এইরকম ভাবে প্রশ্ন করছেন। আপনি এমন ভাবে আমার সঙ্গে কথা বলতে পারেন না।’
রাজমাতাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নন। তাই তিনি বললেন— ‘এত কথা বলার দরকার নেই। আর তুমি কে এমন যে, তুমি আমাকে মানে রাজমাতাকে শেখাবে তার কোনটা করা উচিত আর কোনটা করা উচিত নয়। আমি তোমাকে বলছি, তুমি এখান থেকে চলে যাও। আমি কিছুতেই তোমাকে এখানে তন্ত্র সাধনা করতে দেব না। তোমাদের মত তান্ত্রিককে আমার খুব ভালোমতো চেনা আছে। রাজা বৃজেন্দ্র তোমাকে এখানে এনেছে খুব ভালো কথা। কিন্তু এখন তোমার এই কার্যকলাপ দেখে আমি তোমাকে আর এখানে থাকতে দিতে পারব না। আমার তো মনে হয় আমার ছেলের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের মাথা এখনও ঠিক আছে।’
ওনাদের এই কথোপকথনের মধ্যেই ওই দাসী গিয়ে রানী হৈমন্তীকে রাজমাতার ওখানে যাওয়ার খবরটা দেয়। আর অন্য দিকে বৈভবীর একজন দাসী গিয়ে সেই খবর দেয় রাজা বৃজেন্দ্রকে। সঙ্গে সঙ্গে রানী হৈমন্তী আর রাজা বৃজেন্দ্র ঘটনাস্থলে যান। ওখানে গিয়ে বৃজেন্দ্র বৈভবীর কাছে ক্ষমা চেয়ে রাজমাতাকে মহলে নিয়ে চলে যান। এতে রাজমাতা খুব অপমানিত বোধ করেন। তার কারণ, বৃজেন্দ্র বৈভবীর কাছে ক্ষমা চেয়েছিল রাজমাতার ব্যবহারের জন্য। তারমানে রাজমাতা ভুল। কিন্তু রাজমাতার মনে হয়েছে, তিনি একবারের জন্যও কোন ভুল কাজ করেননি।
রাজা বৃজেন্দ্র খুব ভালোমতোই বুঝতে পারেন যে, রাজমাতা অত্যন্ত রেগে গেছেন। তাই ওনাকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে বললেন যে, বৈভবী আসলে এখানে এসেছে ওনার আর হৈমন্তীর যাতে সন্তান হয় সেইজন্য। তাই ওকে তাড়ানো চলবে না।
রানী হৈমন্তী আবার অবাক হয়ে যান। তিনি ভাবতেই পারেন না যে, ওনার স্বামী অবলীলায় নিজের মাকে এমনভাবে মিথ্যে বলতে পারেন। অবশ্যই তিনিই বারণ করেছিলেন রাজাকে এই কথা কাউকে না বলার জন্য। কিন্তু তবুও মানুষ মিথ্যা কথা বলতে গেলে একটু হোঁচট খায়। কিন্তু রাজা বৃজেন্দ্র অবলীলায় মিথ্যে বলে ফেললেন। রানী হৈমন্তীর ইচ্ছে করছিল সবার সামনে সত্যিটা বলে দিতে। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। তার কারণ, এখন যদি তিনি সত্যিটা সবার সামনে বলে দেন, তাহলে ওনার নিজের স্বামীকে অপমান করা হবে। তাই চুপ করে রইলেন। কিন্তু রাজমাতা ওনাকেই জিজ্ঞাসা করলেন যে, রাজা বৃজেন্দ্র সঠিক কথা বলছেন কিনা।
মনের মধ্যে সত্যিটা বলার ইচ্ছা থাকলেও সবার সামনে রাজার সম্মান রাখতে রানী হৈমন্তী মাথা নেড়ে সম্মতি জানান। আসলে এই কথাটা পুরোপুরি সত্যি না হলেও একদম মিথ্যেও বলা যায় না।
তবে রানী হৈমন্তীর মুখে এই কথা শোনা সত্ত্বেও রাজমাতা শান্ত হলেন না। বললেন— ‘যেখানে এত বড় বৈদ্যরা কোনও আশার আলো দেখাতে পারলেন না, সেখানে এই তন্ত্রসাধিকা কি করবে? আর যদি কিছু করতে পারেও, তাহলেও এই বৈভবী কিছু করতে পারবে না। কারণ, একে তো একদিনের জন্যও দেখলাম না যে, রানী হৈমন্তী যাতে গর্ভবতী হয়, তার জন্য কোনও রকম কোনও চেষ্টা করতে। একে তো দেখলাম নিজের মতই থাকতে। নিজের যা ইচ্ছা খুশি মতো কাজ করতে। যদি হৈমন্তীকে গর্ভবতী করা ওর প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে থাকত, তাহলে এতদিনে সেই উদ্দেশ্য সফল হয়ে যেত। কিন্তু সেইসব কিছুই হলো না। আমি আর কোনও কথা শুনতে চাই না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একে বিদায় করতেই হবে। আর রাজার আদেশের উপরেও আরও একটা ক্ষমতা আছে। আশা করি সেটা তোমরা কেউ ভুলে যাওনি।’
আসলে রাজবাড়িতে অনেক আগে থেকেই একটা নিয়ম ছিল। সেটা হল, রাজমহলের জন্য নেওয়া রাজার কোনও সিদ্ধান্ত যদি সেখানে বসবাসকারী মানুষদের জন্য অস্বস্তিকর হয়, তাহলে রাজমহলের সবাই একসঙ্গে নিজেদের আপত্তি জানাতে পারে। সবাই মানে সবাই। একজনও বাদ যাওয়া চলবে না। এবার সবাই যদি আপত্তি করে, তাহলে রাজার ওই সিদ্ধান্ত রাজবাড়ির অন্দরমহলে চলবে না। অবশ্য রাজ্যের সব মানুষদের জন্য কোনও নিয়ম হলে, রাজার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
কিন্তু রাজা বৃজেন্দ্র রাজমহলের একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, রাজমহলের পাশেই বৈভবী থাকবে। তাই...... সেই ক্ষমতার কথাই রাজমাতা মনে করিয়ে দিলেন ওনাকে। তিনি তখন আর কোনও কথা বললেন না। তখনকার মত সবাই শান্ত হয়ে যায়।
রাতে রাজা বৃজেন্দ্র রানী হৈমন্তীর কক্ষে যান। আজ অনেকদিন পরে নিজের স্বামীকে দেখে হৈমন্তীর চোখে জল চলে আসে। স্বামীকে তার কর্তব্যবোধ বোঝাতে তার ভালোবাসাকে হাতিয়ার করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি বোঝেননি যে, ওইটুকু অবহেলাই ওনার জীবনে এমন একটা পরিস্থিতি হবে যে, তিনি এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়াবেন; যেখানে নিজের স্বামীর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ওনাকে এইরকম ভাবে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়।
ওনার চোখের জল দেখে রাজা বৃজেন্দ্র আদরে আদরে ভরিয়ে দেন রানী হৈমন্তীকে। স্বামীর সোহাগে লজ্জায় লাল হয়ে যান রানী হৈমন্তী। একসময় ওনারা ঘুমের দেশে পাড়ি দেন। সকালবেলা ঘুম ভেঙে চোখের সামনে স্বামীকে দেখে ওনার মনটা একটা অদ্ভূত ভালোলাগায় ভরে যায়। উনি রাজার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, এমন সময় ঘুম থেকে উঠে বসলেন রাজা বৃজেন্দ্র। তিনি হৈমন্তীকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন— ‘হৈম, একটা কথা মানে, অনুরোধ করলে তুমি সেটা রাখবে?’
হৈমন্তীর মাথা নেড়ে সম্মতি জানালে তিনি বলেন— ‘রাজমাতা যদি বৈভবীকে তাড়ানোর জন্য তোমার সম্মতি চায়, তাহলে তুমি তাকে তোমার মত দেবে না। আর একজনও যদি বিরোধিতা করে, তাহলে কিন্তু সেই নিয়ম কার্যকর হবে না। আমি জানি সবাই রাজমাতার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাবে। তার কারণ, বৈভবীর যা কিছু করছে তা কখনোই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আমারও যে ভালো লাগছে তা কিন্তু নয়। কিন্তু দেখো, যতই হোক সে আমার সন্তানকে জন্ম দিয়েছে। তারপর তোমাকে মা হতে সাহায্য করবে। তাই আমি চাইলেও ওকে এখান থেকে বের করে দিতে পারব না। আর আমার এই কথাগুলো তুমি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। সে কারণেই তোমার কাছেই অনুরোধটা করলাম।’
রাজা বৃজেন্দ্রর এই কথা শুনে রানী হৈমন্তীর খুব খারাপ লাগে। না হৈমন্তী মা হবেন কি হবেন না, এতে কিন্তু খারাপ লাগেনি। খারাপ লেগেছে যে, রাজা বলেছেন, তার সন্তানকে জন্ম দিয়েছে বৈভবী। সেই রাজা, যে কিনা বারবার সবাইকে একটা কথাই বলে গেছেন, তিনি দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারবে না। কারণ, তিনি চান না, ওনার সন্তান অন্য কারোর গর্ভ থেকে জন্ম নিক। অথচ আজকে........ মনে মনে কষ্ট পেলেও মুখে বললেন— ‘আচ্ছা বেশ তাই হবে। আমার যতই খারাপ লাগুক না কেনো, আমি আপনার কথা রাখব। আপনি আমার স্বামী আর স্বামীর কথা শোনা মেয়েদের দায়িত্ব কর্তব্য। সেই কর্তব্য থেকেই আমি আপনার কথা শুনব।’
রাজা বৃজেন্দ্র আরও কিছু কথা বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার আগেই একজন দ্বারপাল এসে খবর দেয় যে, গতকাল রাজমাতা যা যা বলেছিলেন, তা কাজে করে দেখানোর জন্য তিনি বেশ কয়েকজনকে কিছু কথা বলছিলেন। ঠিক সেইসময় আচমকাই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাজবৈদ্যকে ডেকে আনা হয়েছে। এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ওনারা রাজমাতার সামনে গিয়ে উপস্থিত হন।
রাজবৈদ্য সমস্ত পরীক্ষা করার পরে জানান, রাজমাতার সঠিক কি অসুখ হয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে আপাতত ওনাকে শয্যাশায়ী হয়ে থাকতে হবে। আর তার থেকেও বড় কথা, রাজমাতা নিজে থেকে সমস্ত কিছু কাজকর্ম করার ক্ষমতা হারিয়েছেন। তিনি সব কিছুই দেখতে পাবেন আর বুঝতেও পারবেন। কিন্তু কিছু করতে পারবেন না।
এই কথা শুনে সবার মন খারাপ হয়ে গেল। আর সেইসঙ্গে বৈভবীকে রাজবাড়ি ত্যাগ করানোর যে প্রচেষ্টা চলছিল, তাও বন্ধ হয়ে গেল। তার কারণ, রাজার ওপর দিয়ে কথা বলার অধিকার একমাত্র রাজমাতার ছিল। আর তো কারোর নেই।
দেখতে দেখতে এরপরে আরও পাঁচটা মাস কেটে যায়।
রাজমাতার সুস্থ হওয়ার কোনও লক্ষণই দেখা যায় না। একইভাবে বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে রয়েছেন। আরও একটা ব্যাপার হয়েছে। রানী হৈমন্তী সত্যি সত্যি গর্ভবতী হয়েছেন। রাজা যতটা সম্ভব রানীর সেবা করেন। আর সেটা দেখে, হৈমন্তীর মনে হয় যে, নিশ্চয়ই রাজা আবার আগের মতো ওনাকে ভালোবাসতে শুরু করেছেন। তাহলে কি এটা বৈভবীর জন্যই হল?
এইদিকে ভগবানের আশীর্বাদ হোক, কি আর যাই হোক না কেন, সেই দিনের সেই বিশাল যুদ্ধের পরে কাঁকিনগরে আর কোন বড় ঝামেলা হয়নি বা শত্রুপক্ষের আক্রমণও হয়নি। কিন্তু তখনও কেউ জানত না যে, ভবিষ্যতে ঠিক কোন বড় ঝড় আসতে চলেছে।
এই পাঁচ মাসে আরও দশটা সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত মেয়ে গায়েব হয়ে যায়। মানে মোট বারোটা মেয়ে। সবার প্রথমে দুটো মেয়ে নিখোঁজ হয়েছিল। তার পরেই গত পাঁচ মাসে আরও দশজন। এতে করে রাজার উপরে যেমন চাপ বাড়তে থাকে, তেমনই যাদের কন্যা সন্তান রয়েছে তারা রাজ্য ছাড়তে থাকে। যাদের সামর্থ্য ছিল তারা তো অন্যত্র চলে যায়। কিন্তু যাদের সামর্থ ছিল না, তারা কোনও উপায়ান্তর না দেখে রাজবাড়ির সামনে জড়ো হয়, তাদের মেয়েদেরকে নিরাপত্তা দেওয়ার দাবিতে। তাদের সঙ্গে সেই মেয়েদের বাড়ির লোকেরাও আসে, যাদের মেয়েরা নিখোঁজ হয়েছে। তাদের দাবি তাদের মেয়েদেরকে খুঁজে বের করে দিতে হবে। (যারা গল্পটা পড়ছ কিন্তু পেজটাকে লাইক করনি তারা লাইক করে নিও। এতে লেখার উৎসাহটা বারে। প্লীজ...।)
প্রতিবাদ এতই তীব্র ছিল যে, কেউ রাজা বৃজেন্দ্রর কথা শুনতেই চাইছিল না। কিন্তু রাজা যে চুপ করে বসে ছিলেন তেমনটাও নয়। তিনি নানা দিকে নিজের লোক লাগিয়ে দিয়েছিলেন, সেই দিন থেকে যেইদিন ওই প্রথম দুটো মেয়ের হারিয়ে যাওয়ার খবর রাজসভায় এসেছিল। সেই খোঁজ করতে গিয়েই তিনি একটা নির্দিষ্ট বিষয় জানতে পেরেছেন। যে, সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত মেয়েরাই গায়েব হচ্ছে। মানে যাদের বয়স বারো কি তেরো বছর। আর এই কথা প্রজাদের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়তেই এমন বিশৃংখলার সৃষ্টি হয়েছে। প্রজাদের সান্ত্বনা দেবেন কি, রাজা বৃজেন্দ্র নিজেই তো বুঝতে পারছেন না যে, কি হচ্ছে কেন হচ্ছে।
এইদিকে চার মাসের গর্ভবতী হয়েও রানী হৈমন্তী কিন্তু বৈভবীর ওপর থেকে নিজের নজর সরাননি। ওনার দাসী বৈভবীর উপরে সব সময় নজর রাখলেও, নিজের পক্ষ থেকে তিনিও বৈভবীর উপরে নজর রাখা শুরু করেছিলেন। উনি নিজে নজর রাখতে পেরেছিলেন তার কারণ, ওনার কক্ষ থেকে বৈভবীর ওই চার কামরার ছোট্ট প্রাসাদটা দেখা যায়। তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, প্রতি অমাবস্যায় বৈভবীর বানানো ওই মন্দিরগুলোর মধ্যে একটা করে মন্দির সেজে ওঠে। মানে যে মন্দিরে এই অমাবস্যার যজ্ঞ হল, পরের মন্দিরে পরের অমাবস্যায় যজ্ঞ হবে। একই অমাবস্যায় সব মন্দির একসঙ্গে সেজে ওঠে না। একের পর এক সেজে ওঠে। আর যখন যে মন্দির সেজে ওঠে, সেখানে সারারাত যজ্ঞ হয়। সে বিশাল যজ্ঞ। সেইসঙ্গে অমাবস্যার দু’দিন আগে বৈভবীর চুপিসারে নৈশবিহার তো রয়েইছে।
প্রথম দিন থেকে ওই মেয়েগুলো নিখোঁজ হওয়ার জন্য রানী হৈমন্তী কিন্তু বৈভবীকেই সন্দেহ করতেন। ওনার মনে হতো ওই মেয়েগুলো নিখোঁজ হওয়ার আর তারপরেই মন্দির তৈরি, তার পর একটা একটা করে মন্দির সেজে ওঠার মধ্যে কিছু একটা যোগ সূত্র রয়েছে। তিনি রাজা বৃজেন্দ্রকে বলতে চেয়েও বলতে পারেননি। তার কারণ, এই কয়েক মাসে ওনাদের সম্পর্কে আমূল পরিবর্তন এসেছে।
যে রাজা তার রানীর প্রেমে অন্ধ হয়ে রাজপাট জলাঞ্জলি দিতে বসেছিলেন, সেই রাজা এখন রানীর প্রতি কতটা উদাসীন, তা চোখে না দেখলে বোঝা সম্ভব নয়। রানীর সন্তান হবে শুনে রাজা তাঁর খেয়াল রাখেন। কিন্তু সেটা যে শুধুই বাচ্চার কারণে সেটা হৈমন্তী খুব ভালোমতোই বুঝতে পারেন। আগে যে ভালোবাসার তাপ তিনি অনুভব করতে পারতেন, সেই ভালোবাসা এখন আর নেই। তবে আরও একটা কথা রয়েছে। সেটা হল, রাজা দ্বিতীয় বিবাহ করেননি। আর তা দেখে হৈমন্তী ভাবেন যে, নাঃ কোথাও গিয়ে রাজার মনে এখনও তিনি রয়েছেন।
যাইহোক......... তো রানী হৈমন্তী একটু ভেবে ঠিক করেন যে, বৈভবীকে ধরতে হবে হাতেনাতে। প্রমাণ দিলে তবেই রাজামশাই বিশ্বাস করবেন। আর তাও কোনও ভালো তান্ত্রিকের সাহায্য নিয়েই। এই সবকিছু ওনাকে গোপনেই করতে হবে। তার কারণ, বৈভবী যে কতটা শক্তিশালী তারা পুরোটা না হলেও কিছুটা আন্দাজ তো রয়েইছে। ও যদি একবার বুঝিয়ে যায়, ওকে তাড়ানোর চেষ্টা চলছে, তাহলে কিনা কি করে বসবে।
রানী হৈমন্তী গোপনে নিজের বিশ্বস্ত কিছু লোককে কাজে লাগান একজন ভালো তান্ত্রিক খুঁজে বের করার জন্য। এর মাঝেই একদিন ওনার ইচ্ছে হয় মন্দিরে পুজো দিতে। হাজার বারণ সত্ত্বেও তিনি কোনও কথা শুনতে চান না। রাজা বৃজেন্দ্র তখন বাধ্যগত অনেক লোকলস্কর দিয়ে রানীকে মন্দিরে যাওয়ার অনুমতি দেন। ওখানে গিয়ে পুজো দিয়ে বেরোনোর সময় রানী মন্দিরের সামনে বসে থাকা সবাইকে প্রসাদ দিতে দিতে পালকির দিকে পা বাড়ান। কিন্তু তখন শেষের জনকে যখন প্রসাদ দিয়ে গেলেন, তখন সেই ব্যক্তি প্রসাদ না নিয়েই একটা পত্র রানীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে ওখান থেকে তড়িঘড়ি চলে যান। হতভম্ব রানী কোনও কথা না বলে ওই পত্রটা নিয়েই পালকিতে চড়ে বসেন।
রাজমহলে নিজের কক্ষে গিয়ে হৈমন্তী ওই পত্রটি তৎক্ষণাৎ খুলে পড়তে শুরু করে দেন। আর ওই পত্রটা পড়ে তিনি অবাক হয়ে যান। ওতে লেখা--------
‘রানিমা আমি বৈভবীর তন্ত্রগুরু। আমি তন্ত্রের বহুকিছু ওকে শিখিয়েছি। আমি তন্ত্রের দ্বারা ওর সঙ্গে যুক্ত। আমি ইচ্ছে করেই ওর সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। আসলে, ওর মধ্যে একটা অদ্ভুত চাহিদা ছিল তন্ত্রটাকে আয়ত্ত করার। আর সেটাই আমার খুব ভাল লেগেছিল। সেই কারণেই ওকে আমি অনেক বেশি তন্ত্র শিক্ষায় শিক্ষিত করেছি। এবার আসি আসল কথায়।
একদিন ও আমাকে বলে যে, তন্ত্রের দ্বারা আমরা অনেক কিছু করতে পারি। কিন্তু এই তন্ত্রের দ্বারা কি আমরা অমরত্ব লাভ করতে পারি? উত্তরে আমি বলেছিলাম পারি। কিন্তু সেই বেঁচে থাকা বেঁচে থাকার মত হবে না। কারণ, আমাদের মৃত্যু না হলেও শরীরের বয়স হবে। আর সেই বুড়ো হাড়ে বেঁচে থেকে লাভ কি?
আমার এই কথা শুনে, ও বলে যে আমরা এমন কিছু করতে পারি না যা দিয়ে আমাদের বয়সটাকে আটকে রাখতে পারি।
উত্তরে আমি বলেছিলাম এখন অব্দি আমার তো সেইরকম কোনও পদ্ধতি জানা নেই। তবে এইসব করে সৃষ্টির বিরুদ্ধ কাজ করা একদমই উচিত নয়। তাছাড়া আমরা তান্ত্রিক। তন্ত্রের দ্বারা ভালো করাটাই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু ও বায়না ধরল ও শিখবে সেই পদ্ধতি। মানে কি করে হবে। কিন্তু সেইসঙ্গে ও কথা দেয় যে, সেই পদ্ধতি জীবনে কখনও প্রয়োগ করবে না। ওর কথায় বিশ্বাস করে আমি ওকে অমরত্ব হওয়ার পদ্ধতি শেখাই। কিন্তু তা শিখে ও বলে যে, একদিন নাকি ও বয়সটাকে আটকানোর পদ্ধতিও বের করে ফেলবে।
কিন্তু সত্যি বলতে আমি ভাবতেও পারিনি যে, ও আমাকে মানে ওর তন্ত্রগুরুকে দেওয়া কথার খেলাপ এমনভাবে করবে। ও নিজের বয়স আটকানোর উপায় বের করে ফেলেছে।
বাকি আর কিছু পত্রে লেখা সম্ভব নয়। আরও অনেক কথা রয়েছে। যদি আপনার আমার কথা সত্যি বলে মনে হয়, আর এই ব্রহ্মাণ্ডকে শেষ হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে চান, তাহলে কালকে এই একই সময়ে এই মন্দিরেই চলে আসবেন। তবে লুকিয়ে। কারণ, বৈভবী এখন অনেক অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ও যদি একটুও আভাস পায় এই সমস্ত কিছুর, তাহলে শেষ হয়ে যাবে সবকিছু।
পুরো পত্রটা পড়ে রানী হৈমন্তী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে থাকেন বেশ কিছুক্ষণ। এই পত্র পড়ে ওনার শরীর খারাপ করতে শুরু করে। পত্রটিকে তিনি অবিশ্বাস করতেও পারবেন না। তার কারণ, বৈভবীকে যে ওনারও সন্দেহ হয়। কিছু বুঝতে না পেরে নিজের প্রধান দাসী যার সঙ্গে উনি সখির মতোই মেশেন, তাকে সব কথা খুলে বলেন।
কিন্তু সেই দাসী ওনাকে বলে, এমন গর্ভাবস্থায় এত ধকল না নিতে। এমনও তো হতে পারে যে, তন্ত্রগুরু বৈভবীর সঙ্গে মিলে ওনাকে ভুলভাল বোঝাচ্ছেন। বা ওনার কোনও ক্ষতি করতে চাইছেন। যদি এইরকম কিছু হয়, তাহলে রানী হৈমন্তীর জন্য যে সেটা ভালো হবে না, তা তো বলাই বাহুল্য।
কিন্তু রানী হৈমন্তী বললেন অন্য কথা। ওনার বক্তব্য ছিল, যদি তন্ত্রগুরুর কথা সত্যি হয়, তাহলে? মিথ্যে হলে হৈমন্তীর ক্ষতি হবে। কিন্তু যদি সত্যি হয়, তাহলে কিন্তু এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ক্ষতি হবে। যা তিনি কখনোই হতে দিতে পারেন না।
তিনি আবার মন্দিরে যাবেন। সেই কথাটা ভেবেই রাজা বৃজেন্দ্রর কাছে অনুমতি আদায় করার চেষ্টা করেতে থাকেন রানী হৈমন্তী। প্রথমে রাজা রাজি হন না। কিন্তু ওনার জোরাজুরিতেই রাজা অনুমতি দিতে বাধ্য হন। তবে বলে দেন, যে ওনার সন্তানের যেন কোনও ক্ষতি না হয়। অনুমতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রানী হৈমন্তী আবার ঐ একই সময়ে ওই একই মন্দিরে যান। ওখানে গিয়ে পুরোহিতের সরঞ্জাম রাখার ঘরটায় নিজের পোশাক বদলে সাধারণ মানুষের পোশাক পরে মন্দিরের পিছনে তন্ত্রগুরুর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। ওহ আমি বলতে ভুলে গেছি যে, পত্রে এই কথাটাও লেখা ছিল যে, রানী হৈমন্তী ওই মন্দিরে ওই সময়ে দেখা করতে গেলে যেন সাধারণ পোশাকে মন্দিরের পেছনেই তন্ত্রগুরুর সঙ্গে দেখা করেন।
তিনি নিজে সাধারণ পোশাক পরেন। আর রানীর পোশাক পরিয়ে দেন ওনার ঐ দাসীকে। দাসী রানীর পোশাক পরে পুজোয় বসে। আর তাই বাইরে অপেক্ষারত সৈনিকরা বুঝতে পারে না যে, রানী হৈমন্তী গোপনে কোথাও চলে গেছেন।
এইদিকে রানী হৈমন্তী গিয়ে তন্ত্রগুরুর থেকে সরাসরি বৈভবীর আসল উদ্দেশ্যের কথা জানতে চান। সেই সঙ্গে এটাও জানতে চান যে, উনি কেমন করে এত সব কিছু জানতে পারলেন।
রানী হৈমন্তীর উদ্দেশ্যে একটা প্রণাম করে তন্ত্রগুরু বলতে শুরু করেন— ‘একে একে সবই বলছি আপনাকে রানীমা। আসলে নিজের মৃত্যুকে আটকানোর জন্য মানে অমরত্ব লাভ করার জন্য প্রত্যেক অমাবস্যায় একটা করে নরবলি দিতে হবে। তারপর সেই রক্তে স্নান করতে হবে। নরবলি দেওয়ার আগে কিছু মন্ত্র রয়েছে। সেই মন্ত্র অনুসারে একটা ছোট পুজো করতে হবে। এবার সেই নরবলি দেওয়ার জন্য পাশাপাশি ছ’টা একই রকম দেখতে মন্দির বানাতে হবে। তারপর সেই মন্দিরে নরবলি দিতে হবে। তাও আবার অমাবস্যায়। এমনকি যে অমাবস্যায় যে মন্দিরে পুজো হবে, সেই মন্দিরে পুজো করার জন্য যা যা বিধি তা ওকে নিজেকেই করতে হবে। পরপর প্রত্যেক অমাবস্যায় একটা একটা করে সব মন্দিরে বলি দিতে হবে। এমন ভাবে এক বছর এই প্রক্রিয়া চালাতে হবে। মানে সেই হিসেব মতো একটা মন্দিরে দুটো করে মোট বারোটা বলি দিতে হবে।
কিন্তু বৈভবী তা করেনি। ও নিজের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে নিজের বয়সটাকে আটকানোর উপায়ও বের করে ফেলেছে। ও যে আমাকে বলেছিল এই উপায়টা ও বের করবে, সত্যিই ও ওর কথা রেখেছে। উপায় ও পেয়ে গেছে। আর সেই জন্যই তো এই পদ্ধতিটাকে একটু অন্যরকম ভাবে করছে।’
ওনার কথার মাঝখানেই রানী হৈমন্তী বললেন— ‘মানে আপনি কেমন করে এইসব.........!’
‘বলছি... আমার সঙ্গে ও তন্ত্রের দ্বারা যুক্ত রয়েছে। তাই ও কি করতে চাইছে তা আমি বুঝতে পেরেছি। আসলে ওর মতো আমিও বয়সটাকে আটকানোর উপায় খুঁজে বেরিয়েছি। আর শেষ অব্দি আমি তা পেয়েও গেছি। অবশ্য তার জন্য আমাকে অনেক সাধনা অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। আমি বৈভবীকে অনেক বেশি ভালবাসতাম আর বিশ্বাস করতাম। তাই যখন আমি সেই উপায় পেয়েছিলাম, প্রথমেই ওকে জানাতে চেয়েছিলাম। মেয়েটা তন্ত্রটাকে এত ভালবাসত যে আমার মনে হয়েছিল এই উপায়ে ওকে জানানো দরকার। কিন্তু ওর সঙ্গে দেখা করে আমার কেমন যেন একটা মনে হয়েছিল। আমার মন বারবার বলছিল যে, ওকে এই পদ্ধতি জানানো উচিত হবে না। এখন বুঝতে পারছি কেন আমার মন সেইদিন ঐরকম লাগছিল। কিন্তু সেই সময় বুঝতে পারিনি। তারপর থেকে বেশ কিছু বছর আমার সঙ্গে ওর কোন দেখা-সাক্ষাৎ ছিল না। মানে, আমি ওর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টাও করিনি। আর ও-ও আমার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেনি। ও কোথায় গিয়ে চলে গিয়েছিল তা আমি জানতাম না। বলতে পারেন জানার চেষ্টাও করিনি। ওকে ওর মত থাকতে দিয়েছিলাম। ওকে ভীষণ ভালবাসতাম ঠিক কথাই। কিন্তু শেষবার যখন ওর সঙ্গে দেখা করি, তখন ওকে আর আগের মতো মনে হয়নি। বারবার মনটা বলছিল যে, ওকে অমর হওয়ার পদ্ধতি শিখিয়ে ভুল কিছু করেছি কি? আর সেই কারণেই নিজেকে ওর থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিলাম।
তারপর ওই এতগুলো বছর পরে ও তন্ত্রের দ্বারা আমাকে আবার আমন্ত্রণ জানায় সেই পদ্ধতিতে, যেই পদ্ধতিতে আমরা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। আমি ওর কাছে আসলে, ও বলে ও নাকি তন্ত্র সাধনা ছেড়ে সংসারী হতে চায়। তার কারণ, রাজার সন্তান ওর গর্ভে। আর সেই কারণেই ও নিজের সন্তানের ভালোর জন্য রাজাকে বিয়ে করে সংসারী হতে চায়।
সত্যি বলতে রানীমা এই কথা শুনে আমি কিন্তু অত্যন্ত খুশি হই। আগেই বলেছি ওকে আমি মেয়ের মত ভালবাসতাম। তো ওর এই কথা শুনে আমার মনে হয়েছিল যে, আমার মন যেটা বলছিল সেটা সত্যি নয়। ওকে ভুল বোঝার জন্য একটু খারাপ লাগে। কিন্তু সেই সমস্ত কিছুকে পাত্তা না দিয়ে ওকে বলি, কি সাহায্য লাগবে। তখন ও আমাকে বলে, আমাকে নাকি শুধু ওর বাবা সাজতে হবে। তারপর রাজার হাতে ওকে তুলে দিতে হবে। তার কারণ, ওর পরিবার ওর সঙ্গে নেই। আর আমি ওকে তন্ত্র বিদ্যা দান করে নতুন করে জীবন দান করেছিলাম। তাই ও আমাকে বাবা হিসেবে ভাবে। সত্যি কথা বলতে আমিও তো ওকে মেয়ের মতোই ভালবাসতাম। ও যখন আমাকে বাবার মর্যাদা দিতে চেয়েছিল, তখন আমি রাজি হয়ে যা।ই খুশী মনেই রাজী হই। ওর উপরের সন্দেহ করেছিলাম বলে ভেবেছিলাম যে, একটা প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে ওর ভালোর জন্য আমি সবকিছু করব। তারপর আমি ওর বাবা সেজে রাজামশাইকে রাজমহল থেকে বৈভবীর কাছে নিয়ে যাই। আমাকে ও বলেছিল ওইটুকুই করতে হবে।
আমি ভেবেছিলাম, ও বলেছে রাজার হাতে ওকে তুলে দিতে। তার মানে হয়তো আমাকে দিয়ে ও কন্যা সম্প্রদান করাবে। বিয়ে করবে বলেছিল। কিন্তু ও যখন আমাকে হঠাৎ করেই এমনভাবে বিদায় জানায়, তখন আমার মনে আবার সন্দেহ হয়। না না না এটুকুর জন্য ও আমাকে ডেকে পাঠায়নি। কিছু একটা তো রয়েইছে। তার কারণ, রাজাকে আনার আগে আমাকে একটা অন্য কথা বলল। বলল যে, রাজার হাতে ওকে তুলে তবে আমি যাব। আর যখন রাজামশাই আমি নিয়ে এলাম, তখন আমাকে বলল এটুকুই ব্যস... আর কিছু করতে হবে না। বিদায় জানাচ্ছে আমাকে। ওর আসল উদ্দেশ্যটা কী? কী কারণে আমাকে ডেকে আনল?
ওর থেকে বিদায় নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাব ভেবে থাকলেও যেতে পারি না। আড়ালে দাঁড়িয়ে ওর আর রাজামশাই-এর কথোপকথন শুনি। ও রাজাকে যা যা শর্ত দেয়, তা শুনে আমার ওর উদ্দেশ্য সঠিক বলে মনে হয় না। ও আমাকে বলেছিল যে, ও বিয়ে করতে চায়, সংসার করতে চায়। কিন্তু রাজার সঙ্গে ওর কথোপকথনে এমন কোনও কিছুর আভাস তো আমি পাইনি।
কিন্তু তখনও আমার মনে এটা হয়নি যে, ও আমাকে ব্যবহার করতে পারে। ওর উদ্দেশ্যে কিছু একটা খারাপ আছে বুঝে আমি গোপনে কাঁকিনগরে থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করি। আর ঠিক করি, যদি বৈভবী ভালো হয় তো ঠিক আছে। কিন্তু ও যদি খারাপ কিছু করে, তাহলে আমি ওকে আটকাবো। তার জন্য যদি আমাকে ব্যবহার করে থাকে তাহলে আমি ওকে ছাড়ব না।
কিন্তু সেদিন আমি আমার সাধনা করতে গিয়ে দেখি, যে মাথার খুলিটা আমি আমার সাধনার জন্য ব্যবহার করতাম, সেটা নেই। অথচ এই জিনিসটা আমি অত্যন্ত ভালোবেসে সাবধানে আমার কাছে রাখতাম। সেটা নেই দেখে বুঝে গেলাম যে, ওই বৈভবী অমর হতে চায়। শুধু তাই নয়। তার সঙ্গে আরও কিছু একটা করতে চায়। আমি যাতে ওকে আটকাতে না পারি, তাই আমার সাধনার মূল জিনিসটাই ও সরিয়ে দিয়েছে। আসলে ওই খুলিটা আমার তন্ত্রগুরুর ছিল। তিনি মৃত্যুর আগেই আমাকে বলেছিলেন যে, অমর হওয়ার যে পদ্ধতি সেটা করতে গেলে আমাকে জ্বলন্ত চিতায় হাত ঢুকিয়ে মৃতের পোড়া শরীর থেকে তার খুলিটা বের করে নিয়ে আসতে হবে। তারপর নিজের রক্তে সেই খুলির অভিষেক করতে হবে। তবেই সে জাগ্রত হবে। আর আমি চেয়েছিলাম আমার তন্ত্রগুরুকে সব সময় নিজের কাছে রাখতে। তাই অন্য কারোর নয়, আমার তন্ত্রগুরুর মাথার খুলিটাকেই আমি নিয়েছিলাম। আমার বয়স এখন শতবর্ষেরও বেশকিছু বেশি। আমি নিজেও অমরত্ব লাভ করেছি। আমি যদি নিজে থেকে মৃত্যুবরণ করি, তবেই আমি মারা যাব। কিন্তু বয়স আটকাতে পারিনি। তাই আমার বয়স বেড়েছে। আসলে তখন জানতাম না, বয়সটা কেমন করে আটকে রাখতে হয়।
এরপর আরও সাধনা করে আমি দুটো জিনিস শিখেছি। তা হলো, কেউ অসাধু উদ্দেশ্য অমরত্ব লাভ করে থাকলে তাকে কেমন করে শেষ করা যায়। আর একটা হল, অমরত্ব লাভ করে কেমন করে নিজের বয়সটাকে আটকে রাখা যায়। অসাধু উদ্দেশ্য অমরত্ব লাভ করলে তাকে কি রকম ভাবে শেষ করা যায় সেটা শিখেছি একটাই কারণে। তার কারণ, আমি নিজে অমরত্ব লাভ করার পরে আমার ভেতর থেকে মৃত্যু হয় চলে গিয়েছে। তাহলে যদি এমন কোন ব্যক্তি ওই অমরত্ব লাভ করে থাকে, তাহলে সে তো যা খুশি তাই করে বেড়াবে। তখন তাকে শেষ করা অত্যন্ত জরুরি হবে। অসৎ উদ্দেশ্যে যে অমরত্ব লাভ করবে, সে কখনোই নিজে থেকে মৃত্যুবরণ করবে না। যদি তার উদ্দেশ্য সৎ হয় তাহলে সে কখনই খারাপ কিছু করবে না।
আর সবথেকে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল, বৈভবীও জানতে পেরে গেছে যে, অমরত্বের সঙ্গে সঙ্গে ও কেমন করে নিজের বয়স আটকাবে। আর সেটা করার জন্যই ওর রাজবাড়ির আশ্রয় নিয়েছে। ওকে আটকাতে না পারলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। ওর উদ্দেশ্য যে সৎ নয় তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।’
প্রতিবাদ এতই তীব্র ছিল যে, কেউ রাজা বৃজেন্দ্রর কথা শুনতেই চাইছিল না। কিন্তু রাজা যে চুপ করে বসে ছিলেন তেমনটাও নয়। তিনি নানা দিকে নিজের লোক লাগিয়ে দিয়েছিলেন, সেই দিন থেকে যেইদিন ওই প্রথম দুটো মেয়ের হারিয়ে যাওয়ার খবর রাজসভায় এসেছিল। সেই খোঁজ করতে গিয়েই তিনি একটা নির্দিষ্ট বিষয় জানতে পেরেছেন। যে, সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত মেয়েরাই গায়েব হচ্ছে। মানে যাদের বয়স বারো কি তেরো বছর। আর এই কথা প্রজাদের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়তেই এমন বিশৃংখলার সৃষ্টি হয়েছে। প্রজাদের সান্ত্বনা দেবেন কি, রাজা বৃজেন্দ্র নিজেই তো বুঝতে পারছেন না যে, কি হচ্ছে কেন হচ্ছে।
এইদিকে চার মাসের গর্ভবতী হয়েও রানী হৈমন্তী কিন্তু বৈভবীর ওপর থেকে নিজের নজর সরাননি। ওনার দাসী বৈভবীর উপরে সব সময় নজর রাখলেও, নিজের পক্ষ থেকে তিনিও বৈভবীর উপরে নজর রাখা শুরু করেছিলেন। উনি নিজে নজর রাখতে পেরেছিলেন তার কারণ, ওনার কক্ষ থেকে বৈভবীর ওই চার কামরার ছোট্ট প্রাসাদটা দেখা যায়। তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, প্রতি অমাবস্যায় বৈভবীর বানানো ওই মন্দিরগুলোর মধ্যে একটা করে মন্দির সেজে ওঠে। মানে যে মন্দিরে এই অমাবস্যার যজ্ঞ হল, পরের মন্দিরে পরের অমাবস্যায় যজ্ঞ হবে। একই অমাবস্যায় সব মন্দির একসঙ্গে সেজে ওঠে না। একের পর এক সেজে ওঠে। আর যখন যে মন্দির সেজে ওঠে, সেখানে সারারাত যজ্ঞ হয়। সে বিশাল যজ্ঞ। সেইসঙ্গে অমাবস্যার দু’দিন আগে বৈভবীর চুপিসারে নৈশবিহার তো রয়েইছে।
প্রথম দিন থেকে ওই মেয়েগুলো নিখোঁজ হওয়ার জন্য রানী হৈমন্তী কিন্তু বৈভবীকেই সন্দেহ করতেন। ওনার মনে হতো ওই মেয়েগুলো নিখোঁজ হওয়ার আর তারপরেই মন্দির তৈরি, তার পর একটা একটা করে মন্দির সেজে ওঠার মধ্যে কিছু একটা যোগ সূত্র রয়েছে। তিনি রাজা বৃজেন্দ্রকে বলতে চেয়েও বলতে পারেননি। তার কারণ, এই কয়েক মাসে ওনাদের সম্পর্কে আমূল পরিবর্তন এসেছে।
যে রাজা তার রানীর প্রেমে অন্ধ হয়ে রাজপাট জলাঞ্জলি দিতে বসেছিলেন, সেই রাজা এখন রানীর প্রতি কতটা উদাসীন, তা চোখে না দেখলে বোঝা সম্ভব নয়। রানীর সন্তান হবে শুনে রাজা তাঁর খেয়াল রাখেন। কিন্তু সেটা যে শুধুই বাচ্চার কারণে সেটা হৈমন্তী খুব ভালোমতোই বুঝতে পারেন। আগে যে ভালোবাসার তাপ তিনি অনুভব করতে পারতেন, সেই ভালোবাসা এখন আর নেই। তবে আরও একটা কথা রয়েছে। সেটা হল, রাজা দ্বিতীয় বিবাহ করেননি। আর তা দেখে হৈমন্তী ভাবেন যে, নাঃ কোথাও গিয়ে রাজার মনে এখনও তিনি রয়েছেন।
যাইহোক......... তো রানী হৈমন্তী একটু ভেবে ঠিক করেন যে, বৈভবীকে ধরতে হবে হাতেনাতে। প্রমাণ দিলে তবেই রাজামশাই বিশ্বাস করবেন। আর তাও কোনও ভালো তান্ত্রিকের সাহায্য নিয়েই। এই সবকিছু ওনাকে গোপনেই করতে হবে। তার কারণ, বৈভবী যে কতটা শক্তিশালী তারা পুরোটা না হলেও কিছুটা আন্দাজ তো রয়েইছে। ও যদি একবার বুঝিয়ে যায়, ওকে তাড়ানোর চেষ্টা চলছে, তাহলে কিনা কি করে বসবে।
রানী হৈমন্তী গোপনে নিজের বিশ্বস্ত কিছু লোককে কাজে লাগান একজন ভালো তান্ত্রিক খুঁজে বের করার জন্য। এর মাঝেই একদিন ওনার ইচ্ছে হয় মন্দিরে পুজো দিতে। হাজার বারণ সত্ত্বেও তিনি কোনও কথা শুনতে চান না। রাজা বৃজেন্দ্র তখন বাধ্যগত অনেক লোকলস্কর দিয়ে রানীকে মন্দিরে যাওয়ার অনুমতি দেন। ওখানে গিয়ে পুজো দিয়ে বেরোনোর সময় রানী মন্দিরের সামনে বসে থাকা সবাইকে প্রসাদ দিতে দিতে পালকির দিকে পা বাড়ান। কিন্তু তখন শেষের জনকে যখন প্রসাদ দিয়ে গেলেন, তখন সেই ব্যক্তি প্রসাদ না নিয়েই একটা পত্র রানীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে ওখান থেকে তড়িঘড়ি চলে যান। হতভম্ব রানী কোনও কথা না বলে ওই পত্রটা নিয়েই পালকিতে চড়ে বসেন।
রাজমহলে নিজের কক্ষে গিয়ে হৈমন্তী ওই পত্রটি তৎক্ষণাৎ খুলে পড়তে শুরু করে দেন। আর ওই পত্রটা পড়ে তিনি অবাক হয়ে যান। ওতে লেখা--------
‘রানিমা আমি বৈভবীর তন্ত্রগুরু। আমি তন্ত্রের বহুকিছু ওকে শিখিয়েছি। আমি তন্ত্রের দ্বারা ওর সঙ্গে যুক্ত। আমি ইচ্ছে করেই ওর সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। আসলে, ওর মধ্যে একটা অদ্ভুত চাহিদা ছিল তন্ত্রটাকে আয়ত্ত করার। আর সেটাই আমার খুব ভাল লেগেছিল। সেই কারণেই ওকে আমি অনেক বেশি তন্ত্র শিক্ষায় শিক্ষিত করেছি। এবার আসি আসল কথায়।
একদিন ও আমাকে বলে যে, তন্ত্রের দ্বারা আমরা অনেক কিছু করতে পারি। কিন্তু এই তন্ত্রের দ্বারা কি আমরা অমরত্ব লাভ করতে পারি? উত্তরে আমি বলেছিলাম পারি। কিন্তু সেই বেঁচে থাকা বেঁচে থাকার মত হবে না। কারণ, আমাদের মৃত্যু না হলেও শরীরের বয়স হবে। আর সেই বুড়ো হাড়ে বেঁচে থেকে লাভ কি?
আমার এই কথা শুনে, ও বলে যে আমরা এমন কিছু করতে পারি না যা দিয়ে আমাদের বয়সটাকে আটকে রাখতে পারি।
উত্তরে আমি বলেছিলাম এখন অব্দি আমার তো সেইরকম কোনও পদ্ধতি জানা নেই। তবে এইসব করে সৃষ্টির বিরুদ্ধ কাজ করা একদমই উচিত নয়। তাছাড়া আমরা তান্ত্রিক। তন্ত্রের দ্বারা ভালো করাটাই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু ও বায়না ধরল ও শিখবে সেই পদ্ধতি। মানে কি করে হবে। কিন্তু সেইসঙ্গে ও কথা দেয় যে, সেই পদ্ধতি জীবনে কখনও প্রয়োগ করবে না। ওর কথায় বিশ্বাস করে আমি ওকে অমরত্ব হওয়ার পদ্ধতি শেখাই। কিন্তু তা শিখে ও বলে যে, একদিন নাকি ও বয়সটাকে আটকানোর পদ্ধতিও বের করে ফেলবে।
কিন্তু সত্যি বলতে আমি ভাবতেও পারিনি যে, ও আমাকে মানে ওর তন্ত্রগুরুকে দেওয়া কথার খেলাপ এমনভাবে করবে। ও নিজের বয়স আটকানোর উপায় বের করে ফেলেছে।
বাকি আর কিছু পত্রে লেখা সম্ভব নয়। আরও অনেক কথা রয়েছে। যদি আপনার আমার কথা সত্যি বলে মনে হয়, আর এই ব্রহ্মাণ্ডকে শেষ হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে চান, তাহলে কালকে এই একই সময়ে এই মন্দিরেই চলে আসবেন। তবে লুকিয়ে। কারণ, বৈভবী এখন অনেক অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ও যদি একটুও আভাস পায় এই সমস্ত কিছুর, তাহলে শেষ হয়ে যাবে সবকিছু।
পুরো পত্রটা পড়ে রানী হৈমন্তী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে থাকেন বেশ কিছুক্ষণ। এই পত্র পড়ে ওনার শরীর খারাপ করতে শুরু করে। পত্রটিকে তিনি অবিশ্বাস করতেও পারবেন না। তার কারণ, বৈভবীকে যে ওনারও সন্দেহ হয়। কিছু বুঝতে না পেরে নিজের প্রধান দাসী যার সঙ্গে উনি সখির মতোই মেশেন, তাকে সব কথা খুলে বলেন।
কিন্তু সেই দাসী ওনাকে বলে, এমন গর্ভাবস্থায় এত ধকল না নিতে। এমনও তো হতে পারে যে, তন্ত্রগুরু বৈভবীর সঙ্গে মিলে ওনাকে ভুলভাল বোঝাচ্ছেন। বা ওনার কোনও ক্ষতি করতে চাইছেন। যদি এইরকম কিছু হয়, তাহলে রানী হৈমন্তীর জন্য যে সেটা ভালো হবে না, তা তো বলাই বাহুল্য।
কিন্তু রানী হৈমন্তী বললেন অন্য কথা। ওনার বক্তব্য ছিল, যদি তন্ত্রগুরুর কথা সত্যি হয়, তাহলে? মিথ্যে হলে হৈমন্তীর ক্ষতি হবে। কিন্তু যদি সত্যি হয়, তাহলে কিন্তু এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ক্ষতি হবে। যা তিনি কখনোই হতে দিতে পারেন না।
তিনি আবার মন্দিরে যাবেন। সেই কথাটা ভেবেই রাজা বৃজেন্দ্রর কাছে অনুমতি আদায় করার চেষ্টা করেতে থাকেন রানী হৈমন্তী। প্রথমে রাজা রাজি হন না। কিন্তু ওনার জোরাজুরিতেই রাজা অনুমতি দিতে বাধ্য হন। তবে বলে দেন, যে ওনার সন্তানের যেন কোনও ক্ষতি না হয়। অনুমতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রানী হৈমন্তী আবার ঐ একই সময়ে ওই একই মন্দিরে যান। ওখানে গিয়ে পুরোহিতের সরঞ্জাম রাখার ঘরটায় নিজের পোশাক বদলে সাধারণ মানুষের পোশাক পরে মন্দিরের পিছনে তন্ত্রগুরুর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। ওহ আমি বলতে ভুলে গেছি যে, পত্রে এই কথাটাও লেখা ছিল যে, রানী হৈমন্তী ওই মন্দিরে ওই সময়ে দেখা করতে গেলে যেন সাধারণ পোশাকে মন্দিরের পেছনেই তন্ত্রগুরুর সঙ্গে দেখা করেন।
তিনি নিজে সাধারণ পোশাক পরেন। আর রানীর পোশাক পরিয়ে দেন ওনার ঐ দাসীকে। দাসী রানীর পোশাক পরে পুজোয় বসে। আর তাই বাইরে অপেক্ষারত সৈনিকরা বুঝতে পারে না যে, রানী হৈমন্তী গোপনে কোথাও চলে গেছেন।
এইদিকে রানী হৈমন্তী গিয়ে তন্ত্রগুরুর থেকে সরাসরি বৈভবীর আসল উদ্দেশ্যের কথা জানতে চান। সেই সঙ্গে এটাও জানতে চান যে, উনি কেমন করে এত সব কিছু জানতে পারলেন।
রানী হৈমন্তীর উদ্দেশ্যে একটা প্রণাম করে তন্ত্রগুরু বলতে শুরু করেন— ‘একে একে সবই বলছি আপনাকে রানীমা। আসলে নিজের মৃত্যুকে আটকানোর জন্য মানে অমরত্ব লাভ করার জন্য প্রত্যেক অমাবস্যায় একটা করে নরবলি দিতে হবে। তারপর সেই রক্তে স্নান করতে হবে। নরবলি দেওয়ার আগে কিছু মন্ত্র রয়েছে। সেই মন্ত্র অনুসারে একটা ছোট পুজো করতে হবে। এবার সেই নরবলি দেওয়ার জন্য পাশাপাশি ছ’টা একই রকম দেখতে মন্দির বানাতে হবে। তারপর সেই মন্দিরে নরবলি দিতে হবে। তাও আবার অমাবস্যায়। এমনকি যে অমাবস্যায় যে মন্দিরে পুজো হবে, সেই মন্দিরে পুজো করার জন্য যা যা বিধি তা ওকে নিজেকেই করতে হবে। পরপর প্রত্যেক অমাবস্যায় একটা একটা করে সব মন্দিরে বলি দিতে হবে। এমন ভাবে এক বছর এই প্রক্রিয়া চালাতে হবে। মানে সেই হিসেব মতো একটা মন্দিরে দুটো করে মোট বারোটা বলি দিতে হবে।
কিন্তু বৈভবী তা করেনি। ও নিজের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে নিজের বয়সটাকে আটকানোর উপায়ও বের করে ফেলেছে। ও যে আমাকে বলেছিল এই উপায়টা ও বের করবে, সত্যিই ও ওর কথা রেখেছে। উপায় ও পেয়ে গেছে। আর সেই জন্যই তো এই পদ্ধতিটাকে একটু অন্যরকম ভাবে করছে।’
ওনার কথার মাঝখানেই রানী হৈমন্তী বললেন— ‘মানে আপনি কেমন করে এইসব.........!’
‘বলছি... আমার সঙ্গে ও তন্ত্রের দ্বারা যুক্ত রয়েছে। তাই ও কি করতে চাইছে তা আমি বুঝতে পেরেছি। আসলে ওর মতো আমিও বয়সটাকে আটকানোর উপায় খুঁজে বেরিয়েছি। আর শেষ অব্দি আমি তা পেয়েও গেছি। অবশ্য তার জন্য আমাকে অনেক সাধনা অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। আমি বৈভবীকে অনেক বেশি ভালবাসতাম আর বিশ্বাস করতাম। তাই যখন আমি সেই উপায় পেয়েছিলাম, প্রথমেই ওকে জানাতে চেয়েছিলাম। মেয়েটা তন্ত্রটাকে এত ভালবাসত যে আমার মনে হয়েছিল এই উপায়ে ওকে জানানো দরকার। কিন্তু ওর সঙ্গে দেখা করে আমার কেমন যেন একটা মনে হয়েছিল। আমার মন বারবার বলছিল যে, ওকে এই পদ্ধতি জানানো উচিত হবে না। এখন বুঝতে পারছি কেন আমার মন সেইদিন ঐরকম লাগছিল। কিন্তু সেই সময় বুঝতে পারিনি। তারপর থেকে বেশ কিছু বছর আমার সঙ্গে ওর কোন দেখা-সাক্ষাৎ ছিল না। মানে, আমি ওর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টাও করিনি। আর ও-ও আমার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেনি। ও কোথায় গিয়ে চলে গিয়েছিল তা আমি জানতাম না। বলতে পারেন জানার চেষ্টাও করিনি। ওকে ওর মত থাকতে দিয়েছিলাম। ওকে ভীষণ ভালবাসতাম ঠিক কথাই। কিন্তু শেষবার যখন ওর সঙ্গে দেখা করি, তখন ওকে আর আগের মতো মনে হয়নি। বারবার মনটা বলছিল যে, ওকে অমর হওয়ার পদ্ধতি শিখিয়ে ভুল কিছু করেছি কি? আর সেই কারণেই নিজেকে ওর থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিলাম।
তারপর ওই এতগুলো বছর পরে ও তন্ত্রের দ্বারা আমাকে আবার আমন্ত্রণ জানায় সেই পদ্ধতিতে, যেই পদ্ধতিতে আমরা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। আমি ওর কাছে আসলে, ও বলে ও নাকি তন্ত্র সাধনা ছেড়ে সংসারী হতে চায়। তার কারণ, রাজার সন্তান ওর গর্ভে। আর সেই কারণেই ও নিজের সন্তানের ভালোর জন্য রাজাকে বিয়ে করে সংসারী হতে চায়।
সত্যি বলতে রানীমা এই কথা শুনে আমি কিন্তু অত্যন্ত খুশি হই। আগেই বলেছি ওকে আমি মেয়ের মত ভালবাসতাম। তো ওর এই কথা শুনে আমার মনে হয়েছিল যে, আমার মন যেটা বলছিল সেটা সত্যি নয়। ওকে ভুল বোঝার জন্য একটু খারাপ লাগে। কিন্তু সেই সমস্ত কিছুকে পাত্তা না দিয়ে ওকে বলি, কি সাহায্য লাগবে। তখন ও আমাকে বলে, আমাকে নাকি শুধু ওর বাবা সাজতে হবে। তারপর রাজার হাতে ওকে তুলে দিতে হবে। তার কারণ, ওর পরিবার ওর সঙ্গে নেই। আর আমি ওকে তন্ত্র বিদ্যা দান করে নতুন করে জীবন দান করেছিলাম। তাই ও আমাকে বাবা হিসেবে ভাবে। সত্যি কথা বলতে আমিও তো ওকে মেয়ের মতোই ভালবাসতাম। ও যখন আমাকে বাবার মর্যাদা দিতে চেয়েছিল, তখন আমি রাজি হয়ে যা।ই খুশী মনেই রাজী হই। ওর উপরের সন্দেহ করেছিলাম বলে ভেবেছিলাম যে, একটা প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে ওর ভালোর জন্য আমি সবকিছু করব। তারপর আমি ওর বাবা সেজে রাজামশাইকে রাজমহল থেকে বৈভবীর কাছে নিয়ে যাই। আমাকে ও বলেছিল ওইটুকুই করতে হবে।
আমি ভেবেছিলাম, ও বলেছে রাজার হাতে ওকে তুলে দিতে। তার মানে হয়তো আমাকে দিয়ে ও কন্যা সম্প্রদান করাবে। বিয়ে করবে বলেছিল। কিন্তু ও যখন আমাকে হঠাৎ করেই এমনভাবে বিদায় জানায়, তখন আমার মনে আবার সন্দেহ হয়। না না না এটুকুর জন্য ও আমাকে ডেকে পাঠায়নি। কিছু একটা তো রয়েইছে। তার কারণ, রাজাকে আনার আগে আমাকে একটা অন্য কথা বলল। বলল যে, রাজার হাতে ওকে তুলে তবে আমি যাব। আর যখন রাজামশাই আমি নিয়ে এলাম, তখন আমাকে বলল এটুকুই ব্যস... আর কিছু করতে হবে না। বিদায় জানাচ্ছে আমাকে। ওর আসল উদ্দেশ্যটা কী? কী কারণে আমাকে ডেকে আনল?
ওর থেকে বিদায় নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাব ভেবে থাকলেও যেতে পারি না। আড়ালে দাঁড়িয়ে ওর আর রাজামশাই-এর কথোপকথন শুনি। ও রাজাকে যা যা শর্ত দেয়, তা শুনে আমার ওর উদ্দেশ্য সঠিক বলে মনে হয় না। ও আমাকে বলেছিল যে, ও বিয়ে করতে চায়, সংসার করতে চায়। কিন্তু রাজার সঙ্গে ওর কথোপকথনে এমন কোনও কিছুর আভাস তো আমি পাইনি।
কিন্তু তখনও আমার মনে এটা হয়নি যে, ও আমাকে ব্যবহার করতে পারে। ওর উদ্দেশ্যে কিছু একটা খারাপ আছে বুঝে আমি গোপনে কাঁকিনগরে থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করি। আর ঠিক করি, যদি বৈভবী ভালো হয় তো ঠিক আছে। কিন্তু ও যদি খারাপ কিছু করে, তাহলে আমি ওকে আটকাবো। তার জন্য যদি আমাকে ব্যবহার করে থাকে তাহলে আমি ওকে ছাড়ব না।
কিন্তু সেদিন আমি আমার সাধনা করতে গিয়ে দেখি, যে মাথার খুলিটা আমি আমার সাধনার জন্য ব্যবহার করতাম, সেটা নেই। অথচ এই জিনিসটা আমি অত্যন্ত ভালোবেসে সাবধানে আমার কাছে রাখতাম। সেটা নেই দেখে বুঝে গেলাম যে, ওই বৈভবী অমর হতে চায়। শুধু তাই নয়। তার সঙ্গে আরও কিছু একটা করতে চায়। আমি যাতে ওকে আটকাতে না পারি, তাই আমার সাধনার মূল জিনিসটাই ও সরিয়ে দিয়েছে। আসলে ওই খুলিটা আমার তন্ত্রগুরুর ছিল। তিনি মৃত্যুর আগেই আমাকে বলেছিলেন যে, অমর হওয়ার যে পদ্ধতি সেটা করতে গেলে আমাকে জ্বলন্ত চিতায় হাত ঢুকিয়ে মৃতের পোড়া শরীর থেকে তার খুলিটা বের করে নিয়ে আসতে হবে। তারপর নিজের রক্তে সেই খুলির অভিষেক করতে হবে। তবেই সে জাগ্রত হবে। আর আমি চেয়েছিলাম আমার তন্ত্রগুরুকে সব সময় নিজের কাছে রাখতে। তাই অন্য কারোর নয়, আমার তন্ত্রগুরুর মাথার খুলিটাকেই আমি নিয়েছিলাম। আমার বয়স এখন শতবর্ষেরও বেশকিছু বেশি। আমি নিজেও অমরত্ব লাভ করেছি। আমি যদি নিজে থেকে মৃত্যুবরণ করি, তবেই আমি মারা যাব। কিন্তু বয়স আটকাতে পারিনি। তাই আমার বয়স বেড়েছে। আসলে তখন জানতাম না, বয়সটা কেমন করে আটকে রাখতে হয়।
এরপর আরও সাধনা করে আমি দুটো জিনিস শিখেছি। তা হলো, কেউ অসাধু উদ্দেশ্য অমরত্ব লাভ করে থাকলে তাকে কেমন করে শেষ করা যায়। আর একটা হল, অমরত্ব লাভ করে কেমন করে নিজের বয়সটাকে আটকে রাখা যায়। অসাধু উদ্দেশ্য অমরত্ব লাভ করলে তাকে কি রকম ভাবে শেষ করা যায় সেটা শিখেছি একটাই কারণে। তার কারণ, আমি নিজে অমরত্ব লাভ করার পরে আমার ভেতর থেকে মৃত্যু হয় চলে গিয়েছে। তাহলে যদি এমন কোন ব্যক্তি ওই অমরত্ব লাভ করে থাকে, তাহলে সে তো যা খুশি তাই করে বেড়াবে। তখন তাকে শেষ করা অত্যন্ত জরুরি হবে। অসৎ উদ্দেশ্যে যে অমরত্ব লাভ করবে, সে কখনোই নিজে থেকে মৃত্যুবরণ করবে না। যদি তার উদ্দেশ্য সৎ হয় তাহলে সে কখনই খারাপ কিছু করবে না।
আর সবথেকে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল, বৈভবীও জানতে পেরে গেছে যে, অমরত্বের সঙ্গে সঙ্গে ও কেমন করে নিজের বয়স আটকাবে। আর সেটা করার জন্যই ওর রাজবাড়ির আশ্রয় নিয়েছে। ওকে আটকাতে না পারলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। ওর উদ্দেশ্য যে সৎ নয় তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।’
তন্ত্রগুরু একটু চুপ করতেই রানী হৈমন্তী একসঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্ন করে বসেন। প্রথমেই বলেন— ‘আপনি নিজেও তো কম অপরাধী নন। আপনিও মানুষের বলি দিয়ে তবেই অমরত্ব লাভ করেছেন। শুধু তাই নয়, যাকে এই শিক্ষা দিলেন তার আসল উদ্দেশ্য না জেনেই শিক্ষা দান করে ফেললেন? ভালবাসায় অন্ধ হয়ে গেলেন? যখন প্রথম দিন বৈভবী আর রাজামশাইয়ের কথা শুনে আপনার সন্দেহ হয়েছিল, তখন কেন আসলেন না? এতদিন আপনি কিসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন? আপনার সাধনার জন্য ব্যবহৃত খুলি হারিয়ে গেছে। মানে, আপনি বুঝতে পেরেছিলেন বৈভবী ওই খুলিটা সরিয়ে দিয়েছে। তার মানে তো এটাই দাঁড়ায় যে, ওর উদ্দেশ্য সৎ নয়। তাহলে রাজামশাইকে তা জানানোর চেষ্টা করেননি কেন?’
তন্ত্রগুরু যেন এই সমস্ত প্রশ্নের জন্য তৈরি ছিলেন। তাই আগের মতই শান্ত গলায় বললেন— ‘ঠিকই বলেছেন। আমি অপরাধী। নিজে অমরত্ব লাভ করার জন্য অন্য মানুষদের বলি দিয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, তখন আমিও বৈভবীর বয়সেই ছিলাম। তন্ত্রটাকে ইতিমধ্যেই বেশ ভালো মতো আয়ত্ত করে ফেলেছিলাম। ভেবেছিলাম অমরত্ব কি করে লাভ করতে হয় সেটা যখন শিখে নিয়েছি, তখন একবার চেষ্টা করে দেখতে অসুবিধা কোথায়। কিন্তু বয়স বাড়তে বাড়তে বুঝতে শিখেছি, এই সমস্ত করে কোনও লাভ নেই। যতদিন বাঁচব, ততদিন মানুষের সেবা করেই বাঁচব। কিন্তু ততদিনে আমি অমরত্ব লাভ করে ফেলেছিলাম। আর বুঝেছিলাম যে, অন্য কোনও মানুষ যদি এরকম অমরত্ব লাভ করে নিতে পারে যার উদ্দেশ্য সৎ নয়, তাহলে তাকে আটকানোর জন্য কাউকে প্রয়োজন। তাই ঠিক করি সেই অসৎ মানুষগুলোকে আটকাব আমি।
আর আপনার পরের কথাটাও সত্যি। আমি সত্যিই বৈভবীর মনের ইচ্ছা জানতাম না। বা বলা ভাল আমি একজন ভালো শিষ্যা পেয়ে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। তাই ওকে এই বিদ্যা শিখিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু এতসব কিছু সত্ত্বেও একটা ব্যাপারে ওর প্রশংসা করতেই হয়। আমার মত এমন একজন তন্ত্রসাধকের যে সময় লেগেছে ওই বয়স আটকানোর উপায় শিখতে, তার থেকে কম সময়ে ও কিন্তু সবটা জানতে পেরে গেছে। তন্ত্রটাকে কতটা ভালবাসলে, কতটা মন থেকে গ্রহণ করলে, এমনটা সম্ভব, তা আপনি বুঝতে পারবেন না। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি।
কিন্তু আমি যখন বুঝতে পারলাম যে, বৈভবী আসলে কি চায়। তখন আমি রাজামশাইকে জানানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পারিনি। জানি না কেন বারংবার নানারকম বাধা সামনে এসে উপস্থিত হতে থাকে।আর আমি নিশ্চিত আপনিও রাজামশাইকে ওর উপরে যে আপনার সন্দেহ, সেটা বলতে চেয়েছিলেন কিন্তু বলতে পারেননি।’
হৈমন্তী মনে মনে ভাবেন যে, সত্যিই তো তিনিও তো রাজাকে বহুবার বৈভবীর আসল উদ্দেশ্যের কথা বলতে চেয়েছেন। মানে, ওনার সন্দেহটা জানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কোন কিছু কারণেই হোক উনি বলতে পারেননি।
তন্ত্রগুরু তখনও বলে চলেছেন— ‘সেই দিন আপনাকে মন্দিরে দেখে মনে হল যে, আপনাকে একবার বলে দেখা যেতে পারে। তাই তাড়াহুড়ো করে ওই পত্রখানা লিখে আপনাকে দিয়েছিলাম। আপনি যে ভাল নেই তা কিন্তু আপনাকে দেখে আমি খুব ভালোমতোই বুঝতে পেরেছি।’
‘আচ্ছা বেশ... সব কিছুই তো বুঝলাম। কিন্তু আপনি এতদিন কেন অপেক্ষা করেছিলেন?’
‘সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম বলতে পারেন।’
‘হুম… তাহলে এবার বলুন উপায় কি? আর তাছাড়া আরও একটা কথা রয়েছে। আপনি তো ওর সঙ্গে তন্ত্রের দ্বারা যুক্ত। তাহলে ওর ব্যাপারে আপনি যেইরকম সবটা জানতে পারছেন। তাহলে বৈভবীও তো আপনি কিছু করলে সব জানতে পেরে যাবে। তখন…!’
‘বৈভবী অনেক উচ্চমানের তন্ত্রসাধিকা। কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, আমি ওর গুরুদেব। মানে তন্ত্রগুরু। ওর থেকে একটু কিছু বেশি জানব, সেটাই স্বাভাবিক। তাই ও কিছু জানতে পারবে না। আমি এমন একটা উপায় পেয়েছি, যেটা শুনলে............’
কিন্তু তন্ত্রগুরু পুরো কথাটা শেষ করার আগেই রানী হৈমন্তী বুঝতে পারেন যে, তিনি অনেকক্ষণ হলো এখানে চলে এসেছেন। তাই বললেন— ‘বাবা, আজকে আর সময় দিতে পারব না। আমার অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। বাকিটা পরে সময় করে আমি সব জেনে নেব।’
‘সময়ই তো নেই রানীমা।’
‘জানি... আমি তো বিস্তারিত ভাবে কিছুই জানতে পারলাম না যে, বৈভবী আসলে কি করতে চাইছে। তাই আজকে রাত্রে আমার এক দাসী এসে আপনাকে রাজবাড়িতে নিয়ে যাবে। তবে খুবই গোপনে। তখন আমি আপনার থেকে সবকিছু জেনে নেব। আমি এখন তাহলে আসছি।’
রানী হৈমন্তী মহলে ফিরে গেলেও নিজের মনকে কিছুতেই শান্ত করতে পারছিলেন না। বৈভবী অমর হওয়ার জন্য মানুষ খুন করছে। তাও কিনা এই রাজবাড়িতে বসে?
তবে কিছু কথা এই প্রসঙ্গে একটু বলে রাখি। বৈভবী সত্যিই ভীষণ গয়না ভালোবাসত। এই ব্যাপারটা ও সত্যিই বলেছিল। কারিগররা ওর পছন্দমত গয়না বানাতে বানাতে ক্লান্ত হয়ে যেত। আর পায়ে নূপুর পরত যা বেশ জোরে জোরে আওয়াজ করত। হাঁটলেই ঝুম ঝুম আওয়াজে চারিদিক মুখরিত হয়ে উঠত। আর ওই আওয়াজ শুনে সবাই বুঝত যে, বৈভবী আসছে। প্রথম প্রথম ও শুধুমাত্র নিজের ওই চারটে কক্ষের মধ্যেই ঘোরাফেরা করত। আর যখন গয়না বানাতে ইচ্ছে হতো, তখন রাজবাড়ির অন্দরমহলে যেত তাও রাজমাতার অনুমতি নিয়েই। এই কারণে প্রথম প্রথম কেউ কিছু বলতো না। এরপর আস্তে আস্তে অনুমতি না নিয়েই চলে আসত। তখন সবাই ভাবল যে, এবার কিছু বলা দরকার। এমন ভাবে বৈভবী যখন ইচ্ছে খুশি অন্দরমহলে আসতে পারবে না,তখনই কেউ কিছু বলতে পারল না। তার কারণ, ততদিনে বৈভবীর ক্ষমতার কথা প্রায় সবাই বুঝতে পেরে গিয়েছিল। তাই কেউ নিজে থেকে নিজের প্রাণ ঝুঁকিতে ফেলতে চায়নি।
রানী হৈমন্তী আর রাজমাতা, ওনারা তো নিজেদের ক্ষতির কথা ভাববেন না। তাই প্রতিবাদ করতেই পারতেন। কিন্তু রাজার সম্মানের কথা ভেবে কিছু বলতেন না। আর তারপর যেইদিন সেই সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করে রাজমাতা প্রতিবাদ করলেন, সেইদিন ভোরেই ওনার কি অবস্থা হয়, সেটা তো আগেই বলেছি। তবে হ্যাঁ, রানীর এই অসুস্থতা কিন্তু বৈভবীর জন্যই হয়েছিল। তা পরে রানী হৈমন্তী জানতে পেরে যান। কিন্তু কেমন করে সেটা পরে বলছি।
যখন কারোর কাছ থেকে কোনও রকম বাধা ও পায় না, তখন ও রানী মতোই রাজবাড়ির অন্দরমহলের ঘোরাফেরা করত। মনে হয় ও নিজেও বুঝতে পেরে গিয়েছিল যে, কেউ ওকে বাধা দেবে না। রাজা কিন্তু রাজবাড়ির ভিতরের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতেন না। সেখানে কিছু অসুবিধা হলে তা সামলানোর দায়িত্বে ছিলেন রাজমাতা। পরে রাজমাতা নিজেই দায়িত্বটা হৈমন্তীকে দিয়ে দেন।
বৈভবী রাজমহলে গয়নাগাটি পরে পায়ে নূপুর পরে এমন ভাবে ঘুরে বেড়াতো যে, অজানা অচেনা কেউ যদি দেখে, তাহলে ভাববে হৈমন্তী নন বৈভবীই আসল রানী।
এবারে কাহিনীটা বলি। মানে যেখানে আমি থেমে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে।
রানী হৈমন্তী সেইদিন খুবই দুঃখিত হয়ে বসে ছিলেন। তবে দুঃখের থেকেও বেশি ছিল চিন্তা। তখন ওর কথা মতো অনেক বেশি শক্তিশালী মানুষ খুন করছে। তাও এই রাজবাড়িতে বসেই। অথচ এতদিনেও কেউ তা টেরও পায়নি। আবার কেউ কিছু বলতেও পারছেন না। কারণ, এই রাজা রানীকে ভালবাসলেও সেই আগের মতো অন্ধভাবে ভালোবাসেন না। তাই রানী হৈমন্তী কিছু বললেই বিশ্বাস করে নেবেন এমনটা নাও হতে পারে। তাই প্রমাণ দরকার। আর এখন তিনি যা জানতে পেরেছেন, তাতে তো একটু এদিক ওদিক হলেই বৈভবী বিশদে সব জানতে পেরে যাবে। তখন সবাইকে বশীকরণ করে ওর কার্যসিদ্ধি করে নেবে। তখন ওকে আটকানোর আর কোনও উপায় থাকবে না। নানা এমন ভাবে বৈভবীকে কিছু জানতে দেওয়া চলবে না।
ওনার এই চিন্তার মাঝেই বৈভবী ঝুম ঝুম আওয়াজ করে রাজবাড়ির অন্দরমহলে এসে উপস্থিত হয়। আর ওই ঝুম ঝুম আওয়াজে রানী হৈমন্তী প্রচন্ড বিরক্ত বোধ করেন। ওনার মনে হতে থাকে যেন এই আওয়াজ বন্ধ হলেই ভালো। তাও চুপ করেছিলেন। কিন্তু খুব বেশিক্ষণ এমনভাবে চুপ থাকতে পারলেন না। আসলে তখন বৈভবীর প্রতি ওনার ঘৃণাটা প্রচুর পরিমাণে বেড়ে গিয়েছিল। তাই খুব বেশীক্ষণ আর চুপ করে বসে থাকতে পারলেন না। বাইরে বেরিয়ে কিছু বলতে যাবেন, তখনই দেখেন বৈভবী রাজমাতার কক্ষের দিকে যাচ্ছে।
কি মনে হতে রানী হৈমন্তী ওর পিছু পিছু যান এটা দেখার জন্য যে, বৈভবী হঠাৎ করে গয়না তৈরির কারিগরের কাছে না গিয়ে রাজমাতার কক্ষের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? এই মহলে ওর তো এই রকমভাবে যাতায়াত করার অনুমতি নেই। তাহলে…? কিন্তু তিনি মনে স্বপ্নেও এটা ভাবতে পারেননি যে,রাজমাতার ওই অবস্থার জন্য দায়ী বৈভবী।
বৈভবী ওখানে গিয়ে রাজমাতাকে নিজের মুখে বলছে— ‘আমি চাইলেই তোকে বশ করে রাখতে পারতাম। কিন্তু তাতে আমাকে যে তুই অপমান করেছিস,তার বদলা নেওয়া হতো না। এখন তুই সব শুনবি, সব বুঝবি, কিন্তু কিছু করতে পারবি না। কারণ, তুই তো কথাই বলতে পারবি না। আর তোর নিজের শরীর নাড়ানোর ক্ষমতাও নেই। তোকে আমি মারব সবার শেষে। এই গোটা রাজবাড়িকে শ্মশানে পরিণত করব আমি। তবে একটা কথা না বলে পারছি না। রাজা বৃজেন্দ্রকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। তাই না মেরে বশীকরণ করে আমার সাথে রেখে দেবো। আসলে যতই হোক আমি তো একটা মানুষ। আর সেই কারণেই রাজাকে আমার লাগবে আমার কাম চরিতার্থ করার জন্য। তারপর রাজার বয়স হলে ওকেও শেষ করে দেব। নতুন কেউ আসবে। তার কারণ, গোটা ব্রহ্মাণ্ড আর কিছুদিন পরেই আমার কব্জায় চলে আসবে। আমি কিন্তু...............’ আর কিছু বলার আগেই ওখানে সেইসময় রাজমাতার দাসীরা চলে আসে। সেই কারণেই বৈভবী লুকিয়ে ওইখান থেকে বেরিয়ে যায়।
আসলে ও জানতো যে, ওই সময়ে সবাই খেতে যায়। কিন্তু অসুস্থ রাজমাতাকে একা রেখে যে সবাই একসঙ্গে চলে যাবে, সেটা রানী হৈমন্তী ভাবতেই পারেননি। এমন নয় তো যে, বৈভবী ওখানে এসে রাজমাতাকে এইসব কথা শুনিয়ে ভেতরে ভেতরে ওনাকে আরও বেশি করে কষ্ট দেওয়ার জন্যই কোনও রকম কোনও যাদুবিদ্যা করে সব দাসীকে একসঙ্গে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে। যাই হোক... তিনি ওই দাসীদের শাস্তি দেবেন। অবশ্য তার আগে একবার কথা বলে দেখবেন যে, ওই দাসীরা ওইখান থেকে রাজমাতাকে একা রেখে যাওয়া জন্য ঠিক কি বাহানা দেয়। তবে এই মুহূর্তে ওনার আফসোস হচ্ছে এটা ভেবে যে, ওই দাসীদের জন্যই বৈভবী নিজের সমস্ত কথা বলতে গিয়েও বলল না।
সেই রাতেই রানী হৈমন্তীর দাসীর হাত ধরে তন্ত্রগুরু গোপন পথে গিয়ে হাজির হন ওনার কক্ষে। তারপর ওনাকে বসতে বলে রানী হৈমন্তী বললেন— ‘আচ্ছা আপনাকে আমার কক্ষ সংলগ্ন একটা গোপন কক্ষ আছে, ওখানে থাকতে হবে। অসুবিধে হবে জানি। কিন্তু আপনাকে আমার আর বলার দরকার নেই যে,কেন এমন ব্যবস্থা করেছে। এবার বলুন তো, বৈভবী আসলে ঠিক কেমন করে কি করতে চলেছে?’
‘ঠিক বলছেন রানীমা। আপনি আমার জন্য কেন এই ব্যবস্থা করেছেন, সেটা আমি খুব ভালো মতো বুঝতে পারছি। এবার শুনুন ও আসলে কি করতে চাইছে------
ওই যে ছ’টা মন্দির ও বানিয়েছে, ওখানে ও প্রতি অমাবস্যায় বিশেষ পূজা করে, যজ্ঞ করে। সারারাত পূজা করা হলে একদম ভোরবেলায় বলি দেয়। কিন্তু একটা নয় দুটো করে বলি দেয়। মানুষের বলি। কারণ, ও দুটো বিধি একসঙ্গে করছে। অমরত্ব লাভ করার আর চিরকাল নিজের যৌবন ধরে রাখার।
ও টানা একবছর এই সাধনা করবে। তারপর শেষ বলি দেওয়া সম্পূর্ণ করতে পারলে ঘটবে, এমন এক ঘটনা, যা চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। বিশ্বাস করা সম্ভব হবে না। এই বিধি পূর্ণ হলে অমাবস্যার রাতে পূর্ণিমার চাঁদ দেখা যাবে। মানে, সম্পূর্ণ গোল চাঁদ উঠবে। সেই চাঁদের থেকে একটা সাদা রশ্মি বেরিয়ে আসবে। আর ছ’টা মন্দিরের চূড়া থেকে বেরোবে এক ধরনের লাল রশ্মি। তারপর ওই দুটো একসঙ্গে মিশি গিয়ে পড়বে সামনের একটা নির্দিষ্ট বেদীতে। ওই বেদীটা ভৈরবী নিজেই বানিয়ে নেবে। এটাই স্বাভাবিক। কারণ, একটা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই বানাতে হবে। আর সেটা ও পূজা করতে করতেই জানতে পারবে। কিন্তু এখানেও রয়েছে আর একটা ভয়ানক জিনিস। সেটা হলো, ওই বেদীতে ওই দুটো রশ্মি একসঙ্গে মিশিয়ে এসে পড়লে, ওই আলোতে ও ওর ছেলেকে বলি দেবে।’
এই কথা শুনে রানী হৈমন্তী চমকে ওঠেন। এক রত্তি বাচ্চাটাকে বলি দেবে? যাকে কিনা দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করে জন্ম দিয়েছে ও। এও সম্ভব? কিন্তু কেন? ওনার মনের ভাব বুঝতে পেরে তন্ত্রগুরু বললেন— ‘ও সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত দু’জন করে মেয়েকে প্রতি অমাবস্যায় বলি দেবে। একসঙ্গে দুটো ফল লাভ করার জন্য। কিন্তু ও ওর নিজের বাচ্চাকে বলি দেবে শয়তানকে খুশী করতে। তন্ত্র সাধনা কিন্তু শয়তানের সাধনা নয়। আলাদা করে শয়তানকে ও ওই বলি দিয়ে খুশি করবে। কারণ, শয়তান খুশী হয়ে ওকে খুব সহজেই যখন যা ইচ্ছা তাই করার ক্ষমতা দেবে। তার মানে ও যদি ওর এই কাজে সফল হয়, তাহলে ভগবান নয় শয়তান রাজ করবে এই দুনিয়ায়।
আর এই ক্ষেত্রে শয়তান খুশি হবেই হবে। তার কারণ, এই বাচ্চার শরীরে রাজপুত ক্ষত্রিয়ের রক্ত বইছে। রাজার খুন রয়েছে বাচ্চাটার দেহে। তাই তো ও রাজার সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেছে। আর রাজবাড়িতে এসেছে দুটো কারণে। প্রথম কারণ, ওর গয়নার প্রতি চিরকালই প্রচন্ড লোভ ও এই রাজবাড়িতে থেকেই চরিতার্থ করতে পারবে। আর একটা কারণ হল, যেই মেয়েদেরকে ও অপহরণ করছে, তাদেরকে রাজবাড়িতে লুকিয়ে রাখাও ওর জন্য সুবিধাজনক। কেউ এটা সন্দেহ করবে না যে, স্বয়ং রাজার ঘরে তাদের মেয়েরা অপহৃত হয়ে রয়েছে। আর যদি কেউ সন্দেহ করতেও পারে, তাহলেও ওরা রাজার ভয়ে কেউ কিছু বলবে না। সেইসঙ্গে আরও একটা ব্যাপার ছিল। এই সমস্ত কিছু ও করতে পারত না, যদি না রাজামশাই রাজি হতেন। মানে, ও যেখানে এই যে মন্দির বানিয়ে ওর এই সমস্ত কার্য করবে, সেই জায়গাটা যার, তাকে সজ্ঞানে অনুমতি দিতে হবে। সেই জন্য কিন্তু ও রাজামশাইকে বশ করে ওনার কাছ থেকে কোনও অনুমতি আদায় করেনি। যখন রাজামশাই ওকে এই রাজমহলের এসে থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন, তখন কিন্তু রাজামশাই ওর তন্ত্রবিদ্যায় ভয় পেয়ে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু মন্ত্রের দ্বারা বশীভূত হয়ে কিছু করেননি। রাজামশাই সেইদিন ওর তন্ত্রবিদ্যার ভয় পেয়ে ওকে এই রাজবাড়িতে আনার জন্য যদি রাজি না হতেন, তাহলে হয়ত এত কিছু হতো না। যেটা হয়ে গেছে সেটা ভেবে তো আর লাভ নেই। এখন যেটা হতে চলেছে সেটা আমাদেরকে আটকাতে হবে।’
‘হ্যাঁ বাবা আপনি ঠিকই বলেছেন। যা হওয়ার সেটা তো হয়েই গেছে। আমাকে একটা কথা বলুন। ওই মন্দির তৈরির দিনে দুটো মেয়ে নিখোঁজের খবর আসে। তাহলে সেই মেয়েগুলো........’
‘ওই দুটো বলি দিয়ে ও ওর কাজ শুরু করেছিল। মানে এই মন্দির বানানোর কাজ।’
‘তাহলে তো সেই মতো ধরলে, মত পনেরোটা বলি। এর মধ্যে আবার একটা বাচ্চাও রয়েছে।’
‘একদমই ঠিক বলেছেন আপনি।’
‘তাহলে এখন করনীয় কি?’
তন্ত্রগুরু খুব চিন্তিত মুখ করে বললেন— ‘কি করণীয় তা তো আমি নিজেও বুঝতে পারছি না। আসলে বৈভবী জানতো যে, আমার তন্ত্রগুরুর খুলি যদি আমার কাছে না থাকে তাহলে আমার শক্তি অর্ধেক হয়ে যাবে। ওই খুলি আমার এই ধরনের ক্ষমতার প্রধান মাধ্যম। তাই ওটাকে ও সরিয়ে নিয়েছে। আসলে আমি চিরকাল তন্ত্রটাকে লোকের ভালোর জন্য ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম। সেই কারণেই এটা বুঝতে পারিনি যে, বৈভবী আমার এই ভালোর সুযোগ নেবে। আর যেহেতু আমার ক্ষমতার প্রধান উৎসটাই আমার কাছে নেই, তাই আমি কি করতে পারব বা কি কি করতে পারব তা জানতে আমাকে তিন পক্ষ কাল ধরে এক বিশেষ বিধি করতে হবে। আর ঠিক তার পরেই জানতে পারব যে, আদৌ আমার কিছু করার আছে না নেই। আপনাদের গোপন কক্ষে এই সাধনা করার কোনও বাধা নেই তো?’
কিন্তু এই কথার কোন জবাব না দিয়ে রানী হৈমন্তী আঁতকে উঠে বললেন— ‘মানে...! তিন পক্ষকাল? সে তো অনেক সময়। এর মধ্যে তো আরও চারটা নিরীহ মেয়ের বলি হয়ে যাবে। না না অতো দেরী করা যাবে না। আপনি এখনই কিছু একটা করুন।’
‘না রানীমা এতে আমার কিচ্ছু করার নেই। ওই খুলি থাকলে ওর বিনাশ করতে আমার খুব বেশি সময় লাগত না। তাই মানতে খুব কষ্ট হলেও এটাই সত্যি যে, আমাদের চারটে নিরীহ মেয়ের বলি মেনে নিতে হবে।’
‘কিন্তু ওই নির্দিষ্ট বয়সের মেয়েদেরই ওর প্রয়োজন কেন?’
‘কারণ, ও ওদের যৌবনটা নিয়ে নিতে চায়। বলির পরে ওদের রক্ত মানে বলির এক বাটি রক্ত বৈভবী পান করে।’
ঘৃণায় রানী হৈমন্তীর গা গুলিয়ে ওঠে। একে তো তিনি গর্ভবতী, তায় এমন কথা। তাই সব মিলিয়ে আর সহ্য হলো না। কোনরকমে একপাশে সরে গিয়ে বমিটা করেই ফেললেন। তারপর একটু সুস্থ বোধ করলে তন্ত্রগুরুর সামনে আসেন। আর এসে বললেন— ‘আমাকে ক্ষমা করবেন রানীমা। মুহূর্তের জন্য আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে, আপনি গর্ভবতী। তাই তো প্রথমে এই তথ্যটা আপনাকে আমি জানাইনি। কিন্তু আপনি এই প্রশ্নটা করতে আমাকে উত্তর দিতেই হল। এড়িয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু বলে ফেলেছি।’
রানী হৈমন্তী ততক্ষনে নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়েছিলেন। তাই তন্ত্রগুরুর এই কথা শুনে তিনি বললেন— ‘না না ঠিক আছে। আসলে এই সময় মাঝে মাঝে শরীরটা একটু খারাপ লাগে। আর আপনার ওই কথাটা শুনে শরীরটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সেই কথা ছাড়ুন। আমি একটা কথা ভাবছিলাম; আচ্ছা আমরা যদি ওই নির্দিষ্ট বয়সের মেয়েদেরকে কোথাও লুকিয়ে দিই, তাহলে কেমন হয়? মানে, তাহলে তো ও তাদেরকে বলি দিতে পারবে না।’
এই কথা শুনে তন্ত্রগুরু প্রায় আঁতকে উঠে বললেন— ‘একদম নয়। এটা হলে ও খুব সহজেই বুঝে যাবে যে, কেউ ওর উদ্দেশ্য বুঝে ফেলেছে। আর এই ব্যাপারে ও সবথেকে বেশি সন্দেহ করবে আমাকে। আর তখন ও কি করবে কেউ জানে না। তাই সবার মঙ্গলের জন্য আমাদের এই ক্ষতি মেনে নিতেই হবে।’
চুপ করে রইলেন রানী হৈমন্তী। কি করবেন তিনি এখন? কোনটা ঠিক বুঝতে পারছিলেন না। ওনাকে চুপ করে থাকতে দেখে তন্ত্রগুরু বললেন— ‘আপনি যদি রাজি থাকেন রানীমা, তাহলে আমি এবার আমার সেই বিধি শুরু করতে চাই। তাই আমার কক্ষটা কোথায় একটু যদি..........!! আর সেইসঙ্গে আমার কিছু জিনিস লাগবে সেগুলো যদি........!!’
রানী হৈমন্তী এর জবাবে কিছুই বললেন না। শুধু ওনার সেই দাসীর দিকে তাকাতে সে বুঝে যায় যে রানী ওকে নির্দেশ দিলেন তন্ত্রগুরুকে সাহায্য করতে।
তিনি কোনওরকমে তিন পক্ষকাল অপেক্ষা করেন, তন্ত্রগুরুর সাধনা পূরণ হওয়ার জন্য। এই তিন পক্ষকাল মানে, প্রায় দেড় মাস পরে মন্ত্রগুরু হৈমন্তীর সামনে এসে দাঁড়ান। ওনাকে দেখে রানীর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। ওনার বিশ্বাস তন্ত্রগুরু কোনও সমাধান নিশ্চয়ই পেয়ে গিয়েছেন।
বেশ উত্তেজিত হয়েই রানী হৈমন্তী বলে ওঠেন— ‘বাবা উপায় পেয়েছেন কি?’ তন্ত্রগুরুর থেকে সম্মতিসূচক উত্তর পেয়ে ওনার মুখ খুশিতে ভরে যায়। চারটে খুন মানে বৈভবীর ভাষায় চারটে বলি তিনি অনেক কষ্টে মেনে নিলেও শেষে যে, ওনাদের উদ্দেশ্য সফল হতে চলেছে, এটা ভেবেই ওনার মন আনন্দিত হয়ে উঠল।
হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন ওনার এতো আনন্দ হওয়া সত্ত্বেও তন্ত্রগুরু কেমন নিরলিপ্ত হয়ে রয়েছেন। তাই তিনি সরাসরি ওনার এমন থাকার কারণ জানতে চান।
তখন তন্ত্রগুরু বললেন— ‘রানীমা বৈভবীর বিনাশের পথ তো পেয়ে গিয়েছি। কিন্তু......’
‘কিন্তু......!’
‘আসলে আমার মূল শক্তি ওই খুলিটা না থাকার জন্য অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। সেটা আমি আপনাকে আগেই বলেছিলাম। আর ঠিক সেই কারণেই আমাদেরকে বৈভবীর এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়া অব্দি অপেক্ষা করতে হবে। আর তারপরেই কিছু করা সম্ভব।’
‘মানে........! পনেরোটা খুন। অসম্ভব... এটা মানা আমার পক্ষে অসম্ভব। চারটে খুন মেনে নিয়েছি। আর নয়। কিসের গুরু আপনি যে কিনা তাঁর নিজের শিষ্যাকে আটকাতে পারেন না। আমারই ভুল। আমি আপনাকে ভরসা করে এতদিন অপেক্ষা করলাম। আমার রাজামশাই আমার কাছে শুধুমাত্র আমার পেটের এই বাচ্চাটার জন্য আসে। তবুও আমি তাকে নিজের করে পাওয়ার চেষ্টা করিনি। বুঝতে পারি যে, বৈভবী হয়তো কিছু করেছে। কিন্তু যদি ও টের পেয়ে যায়। তাই চুপচাপ মুখ বুজে সব সহ্য করেছি। শুধুমাত্র আপনার উপরে ভরসা করে। কিন্তু আর নয়। আমি আর আপনার কোনও কথা শুনব না। আমি......’
এমন সময় রাজা বৃজেন্দ্রর পাঁচ বোনের মধ্যে চার নম্বর বোন দর্শনা ঘরের ভিতরে ঢুকে এসে বলে— ‘এ আমি কি শুনলাম....!’ তন্ত্রগুরুর দিকে তাকিয়ে বলে— ‘আর আপনিই বা কে?’
রানী হৈমন্তী চমকে ওঠেন। বাইরে তো তিনি ওনার দাসীকে পাহারায় রেখেছিলেন। তাহলে দর্শনা ভেতরে এলো কেমন করে? ওকে কি বাইরে আটকায়নি? কিন্তু একবার যখন ও এসে পড়েছে, আর এই সমস্ত কিছু দেখে ফেলেছে, তখন ওকে বোঝাতে হবে। আর এটা ভেবেই তিনি দর্শনাকে পাশে বসিয়ে সবটা বলেন। সব শুনে ও তো অবাক। কিন্তু ওই পনেরোটা মানুষের বলি দর্শনও যে মানতে পারছে না।
তন্ত্রগুরু তখন ওনাদের উদ্দেশ্যে বললেন— ‘রানীমা আপনাদের দু'জনকেই বলছি, আমার ক্ষমতা সীমিত করার জন্যই বৈভবী আমার সাধনার আমার শক্তির মূল জিনিসটাই চুরি করে নিয়েছে। ও জানত যে, এই খুলিটা যদি আমার কাছে থাকে, তাহলে আমি ওকে ঠিক এই অন্যায় করা থেকে বিরত করতে পারতাম।
যাই হোক...... আমার ক্ষমতা সীমিত হয়ে যাওয়ার জন্যই আমাকেও না চাইতেও ওর সাধনার শেষ দিন অবধি অপেক্ষা করতে হবে। তারপর যখন একদম শেষে অমাবস্যায় পূর্ণিমার চাঁদ উঠবে, আর ওই ছয়টা মন্দির থেকে ওই বিশেষ লাল রশ্মি বেরিয়ে চাঁদ থেকে আসা রশ্মির সঙ্গে মিশবে, এবং ওই বেদীতে এসে পড়বে, আর ঠিক তখন ওর ছেলেকে বলি দেওয়ার জন্য ও যেই উদ্যত হবে, সেই মুহূর্তেই ওকে এক কোপে মেরে ফেলতে হবে। তরোয়ালের এক ঘায়ে ওর ধরা আর মুণ্ড আলাদা করে দিতে হবে। আর এটা করতে হবে কোনও নারীকে।
এবার আজ থেকে সেই দিন অবধি আমাকে বিশেষ বিশেষ কিছু বিধির দ্বারা সেইদিনের সবকিছু যাতে যথাযথ হয়, তা দেখতে হবে। আর তাছাড়া যেকোনও তরোয়াল দিয়ে ওকে শেষ করা সম্ভব হবে না। তার কারণ, আমাদের এটা মনে রাখতে হবে যে, বৈভবী কিন্তু ততক্ষনে ওর অমরত্ব লাভের একধাপ পিছনে থাকবে। তাই সমস্ত কিছু একদম যথাযথ হতেই হবে।
এখন আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া কিছুই করা সম্ভব নয়। সময় যা আছে তাতে আমি শেষ দিনের প্রস্তুতি নিয়ে নিচ্ছি। আর ততদিনে আপনারা এমন একজনকে খোঁজার চেষ্টা করুন যে, আমি যেইদিন বললাম তার আগেই বৈভবীকে শেষ করবে। শুধুমাত্র একটা কথা মাথায় রাখবেন। আপনাদের কোন কাজের দ্বারা বৈভবী যেন এটা না বুঝে ফেলে যে, আমরা ওর কর্মকাণ্ড ধরে ফেলেছি।’
দর্শনা বলল— 'আমার ওই বৈভবীকে সন্দেহ কত বৈকি। কিন্তু এমন ভাবে ওই মানুষটাকে কে মারবে?’
তন্ত্রগুরু সব দেখে নেবেন বলে আর অপেক্ষা না করে সেই গোপন পথ দিয়ে মন্দিরের পিছনে চলে যান। আর বলে জান, মন্দিরের পিছনে গেলেই ওনাকে পাওয়া যাবে। ওই মন্দির চত্বরে তিনি থাকবেন। যখনই ওনাদের মনে হবে যে, তন্ত্রগুরুর সাহায্যের দরকার, তখনই ওই মন্দিরের পিছনে ওনাকে পেয়ে যাবেন। দরকারে যেন ওনারা অবশ্যই ডেকে নিয়ে যান।
রানী হৈমন্তী আর দর্শনা মিলে ঠিক করেন যে, আগে একজন ভালো তান্ত্রিক বা ওই জাতীয় কোনও মানুষকে খুঁজে বের করবেন। তারপর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে, তখন না হয় তাকে সব খুলে বলা যাবে।
কিন্তু বৈভবীর মোকাবিলা করা কি আর যেকোনও তান্ত্রিকের পক্ষে করা সম্ভব? সরাসরি না হলেও মোটামুটি ভাবে ঘটনাগুলো ওনারা যেই যেই তান্ত্রিককে বলেছেন, সেই সেই অস্বীকার করেছে কোনওরকম কোনও সাহায্য করতে। কোন তান্ত্রিক এটাই শোনেনি যে, কোনও তন্ত্রের দ্বারা যে নিজেকে অমর করা সম্ভব।
রানী হৈমন্তী গোপনই এই সমস্ত কাজ করছিলেন। ওনার বিশ্বস্ত কিছু মানুষ অতি সন্তর্পনে এটা তান্ত্রিক খোঁজার কাজ করছিল। স তান্ত্রিকের মুখে একটাই কথা, তন্ত্রের দ্বারা অমরত্ব লাভ করা যায়, তা তারা জানে না। সবদিক থেকে শুধু হতাশা আসতে থাকে। এইদিকে একের পর এক মেয়েরা গায়ের হতে থাকে। আর রাজামশাইয়ের কাছে খবর আসতে থাকে। প্রত্যেক আমাবস্যায় বৈভবীর মন্দির একবার করে সুসজ্জিত হয়ে উঠতে থাকে। কেউ না জানলেও রানী হৈমন্তী আর দর্শনা বুঝতে পারেন যে, একটা করে মন্দির সেজে উঠছে মানে দুটো করে মেয়ের প্রাণ যাচ্ছে। সমস্তটা জানার পরেও ওনারা কিছু করতে পারছেন না।
কোন উপায়ান্তর না পেয়ে রানী হৈমন্তী ঠিক করেন যে, বৈভবী জানতে পারলে জানবে। তবুও তিনি এইভাবে চুপ করে বসে থাকতে পারবেন না। যাদের ঘরে ওই সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত মেয়ে রয়েছে, তাদেরকে তিনি কড়ি দিয়ে সাহায্য করবেন। আর বলবেন, তারা যেন ওই কড়ি নিয়ে কয়েকটা মাসের জন্য অন্য কোথাও চলে যায়।
কিন্তু বলে না যে, শয়তানকে আটকানোর জন্য ভগবানও মনে হয় চেষ্টা করে। আর সেই কারণেই ওনার এই উদ্দেশ্য কিন্তু সফল হয় না। রানী হৈমন্তীর হঠাৎ করে প্রসব বেদনা শুরু হয়ে যায়। আর সন্তানের জন্ম দেওয়ার জন্য ওনাকে অন্য একটা ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাই এইভাবে দর্শনার পক্ষে একা একা সব কিছু করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
রানীর কিন্তু অতো তাড়াতাড়ি প্রসব বেদনা ওঠার কথা ছিল না। ওনার হাতে তখনও মাস খানেক সময় ছিল। ভগবানই হয়তো এই সমস্ত কিছু করে ওনাকে একটা ভুল করা থেকে আটকে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন রানীর কিছুই করার ছিল না। তিনি প্রায় এক মাসের জন্য গৃহবন্দি হয়ে পড়লেন। আর আমার সন্তান সময়ের আগেই পৃথিবীতে এসে পড়েছে। আর সেই সন্তানের ভালোর জন্যই এইরকম নিয়ম। সবার জন্যই নিয়মটা ছিল। এখনও রয়েছে। যেটাকে আমরা আঁতুড়ঘর বলি। এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন রানী হৈমন্তী।
দর্শনা একা কী করবে বুঝে উঠতে না পেরে ওই তন্ত্রগুরুর কাছে যায়। কারণ, আর মাত্র দুটো মাস হাতে আছে। তার মধ্যে একটা মাস রানী হৈমন্তী বের হতে পারবেন না। বাকি আর একটা মাসে তিনি আদৌ কিছু করতে পারবেন কিনা তা দর্শনা না বুঝতে পারছিল না।
তন্ত্রগুরু ওকে দেখে বললেন যে, তিনি নাকি আগে থেকেই জানতেন যে, ওনাদেরকে তন্ত্রগুরুর সাহায্য নিতেই হবে। তার কারণ, বৈভবীর সামনাসামনি হওয়ার জন্য কোনও তান্ত্রিক পাওয়া অত সহজ নয়। তন্ত্রগুরু আরও বললেন— ‘এটা আমার সাধনা করে তৈরি করা সেই তরোয়াল। তবে এতে আরও অনেক বেশি শক্তি স্থাপন করে নিতে হবে। তারপর যে বৈভবীকে শেষ করবে, তার রক্ত দিয়ে এতে প্রাণ সঞ্চার করতে হবে। কিন্তু আমার বাকি বিধিটা করতে হবে এখানে বসেই।’
সেইমতো সমস্ত কথাবার্তা সেরে দর্শনা রাজমহলে ফিরে যায়।
কিন্তু এই কথার কোন জবাব না দিয়ে রানী হৈমন্তী আঁতকে উঠে বললেন— ‘মানে...! তিন পক্ষকাল? সে তো অনেক সময়। এর মধ্যে তো আরও চারটা নিরীহ মেয়ের বলি হয়ে যাবে। না না অতো দেরী করা যাবে না। আপনি এখনই কিছু একটা করুন।’
‘না রানীমা এতে আমার কিচ্ছু করার নেই। ওই খুলি থাকলে ওর বিনাশ করতে আমার খুব বেশি সময় লাগত না। তাই মানতে খুব কষ্ট হলেও এটাই সত্যি যে, আমাদের চারটে নিরীহ মেয়ের বলি মেনে নিতে হবে।’
‘কিন্তু ওই নির্দিষ্ট বয়সের মেয়েদেরই ওর প্রয়োজন কেন?’
‘কারণ, ও ওদের যৌবনটা নিয়ে নিতে চায়। বলির পরে ওদের রক্ত মানে বলির এক বাটি রক্ত বৈভবী পান করে।’
ঘৃণায় রানী হৈমন্তীর গা গুলিয়ে ওঠে। একে তো তিনি গর্ভবতী, তায় এমন কথা। তাই সব মিলিয়ে আর সহ্য হলো না। কোনরকমে একপাশে সরে গিয়ে বমিটা করেই ফেললেন। তারপর একটু সুস্থ বোধ করলে তন্ত্রগুরুর সামনে আসেন। আর এসে বললেন— ‘আমাকে ক্ষমা করবেন রানীমা। মুহূর্তের জন্য আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে, আপনি গর্ভবতী। তাই তো প্রথমে এই তথ্যটা আপনাকে আমি জানাইনি। কিন্তু আপনি এই প্রশ্নটা করতে আমাকে উত্তর দিতেই হল। এড়িয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু বলে ফেলেছি।’
রানী হৈমন্তী ততক্ষনে নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়েছিলেন। তাই তন্ত্রগুরুর এই কথা শুনে তিনি বললেন— ‘না না ঠিক আছে। আসলে এই সময় মাঝে মাঝে শরীরটা একটু খারাপ লাগে। আর আপনার ওই কথাটা শুনে শরীরটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সেই কথা ছাড়ুন। আমি একটা কথা ভাবছিলাম; আচ্ছা আমরা যদি ওই নির্দিষ্ট বয়সের মেয়েদেরকে কোথাও লুকিয়ে দিই, তাহলে কেমন হয়? মানে, তাহলে তো ও তাদেরকে বলি দিতে পারবে না।’
এই কথা শুনে তন্ত্রগুরু প্রায় আঁতকে উঠে বললেন— ‘একদম নয়। এটা হলে ও খুব সহজেই বুঝে যাবে যে, কেউ ওর উদ্দেশ্য বুঝে ফেলেছে। আর এই ব্যাপারে ও সবথেকে বেশি সন্দেহ করবে আমাকে। আর তখন ও কি করবে কেউ জানে না। তাই সবার মঙ্গলের জন্য আমাদের এই ক্ষতি মেনে নিতেই হবে।’
চুপ করে রইলেন রানী হৈমন্তী। কি করবেন তিনি এখন? কোনটা ঠিক বুঝতে পারছিলেন না। ওনাকে চুপ করে থাকতে দেখে তন্ত্রগুরু বললেন— ‘আপনি যদি রাজি থাকেন রানীমা, তাহলে আমি এবার আমার সেই বিধি শুরু করতে চাই। তাই আমার কক্ষটা কোথায় একটু যদি..........!! আর সেইসঙ্গে আমার কিছু জিনিস লাগবে সেগুলো যদি........!!’
রানী হৈমন্তী এর জবাবে কিছুই বললেন না। শুধু ওনার সেই দাসীর দিকে তাকাতে সে বুঝে যায় যে রানী ওকে নির্দেশ দিলেন তন্ত্রগুরুকে সাহায্য করতে।
তিনি কোনওরকমে তিন পক্ষকাল অপেক্ষা করেন, তন্ত্রগুরুর সাধনা পূরণ হওয়ার জন্য। এই তিন পক্ষকাল মানে, প্রায় দেড় মাস পরে মন্ত্রগুরু হৈমন্তীর সামনে এসে দাঁড়ান। ওনাকে দেখে রানীর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। ওনার বিশ্বাস তন্ত্রগুরু কোনও সমাধান নিশ্চয়ই পেয়ে গিয়েছেন।
বেশ উত্তেজিত হয়েই রানী হৈমন্তী বলে ওঠেন— ‘বাবা উপায় পেয়েছেন কি?’ তন্ত্রগুরুর থেকে সম্মতিসূচক উত্তর পেয়ে ওনার মুখ খুশিতে ভরে যায়। চারটে খুন মানে বৈভবীর ভাষায় চারটে বলি তিনি অনেক কষ্টে মেনে নিলেও শেষে যে, ওনাদের উদ্দেশ্য সফল হতে চলেছে, এটা ভেবেই ওনার মন আনন্দিত হয়ে উঠল।
হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন ওনার এতো আনন্দ হওয়া সত্ত্বেও তন্ত্রগুরু কেমন নিরলিপ্ত হয়ে রয়েছেন। তাই তিনি সরাসরি ওনার এমন থাকার কারণ জানতে চান।
তখন তন্ত্রগুরু বললেন— ‘রানীমা বৈভবীর বিনাশের পথ তো পেয়ে গিয়েছি। কিন্তু......’
‘কিন্তু......!’
‘আসলে আমার মূল শক্তি ওই খুলিটা না থাকার জন্য অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। সেটা আমি আপনাকে আগেই বলেছিলাম। আর ঠিক সেই কারণেই আমাদেরকে বৈভবীর এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়া অব্দি অপেক্ষা করতে হবে। আর তারপরেই কিছু করা সম্ভব।’
‘মানে........! পনেরোটা খুন। অসম্ভব... এটা মানা আমার পক্ষে অসম্ভব। চারটে খুন মেনে নিয়েছি। আর নয়। কিসের গুরু আপনি যে কিনা তাঁর নিজের শিষ্যাকে আটকাতে পারেন না। আমারই ভুল। আমি আপনাকে ভরসা করে এতদিন অপেক্ষা করলাম। আমার রাজামশাই আমার কাছে শুধুমাত্র আমার পেটের এই বাচ্চাটার জন্য আসে। তবুও আমি তাকে নিজের করে পাওয়ার চেষ্টা করিনি। বুঝতে পারি যে, বৈভবী হয়তো কিছু করেছে। কিন্তু যদি ও টের পেয়ে যায়। তাই চুপচাপ মুখ বুজে সব সহ্য করেছি। শুধুমাত্র আপনার উপরে ভরসা করে। কিন্তু আর নয়। আমি আর আপনার কোনও কথা শুনব না। আমি......’
এমন সময় রাজা বৃজেন্দ্রর পাঁচ বোনের মধ্যে চার নম্বর বোন দর্শনা ঘরের ভিতরে ঢুকে এসে বলে— ‘এ আমি কি শুনলাম....!’ তন্ত্রগুরুর দিকে তাকিয়ে বলে— ‘আর আপনিই বা কে?’
রানী হৈমন্তী চমকে ওঠেন। বাইরে তো তিনি ওনার দাসীকে পাহারায় রেখেছিলেন। তাহলে দর্শনা ভেতরে এলো কেমন করে? ওকে কি বাইরে আটকায়নি? কিন্তু একবার যখন ও এসে পড়েছে, আর এই সমস্ত কিছু দেখে ফেলেছে, তখন ওকে বোঝাতে হবে। আর এটা ভেবেই তিনি দর্শনাকে পাশে বসিয়ে সবটা বলেন। সব শুনে ও তো অবাক। কিন্তু ওই পনেরোটা মানুষের বলি দর্শনও যে মানতে পারছে না।
তন্ত্রগুরু তখন ওনাদের উদ্দেশ্যে বললেন— ‘রানীমা আপনাদের দু'জনকেই বলছি, আমার ক্ষমতা সীমিত করার জন্যই বৈভবী আমার সাধনার আমার শক্তির মূল জিনিসটাই চুরি করে নিয়েছে। ও জানত যে, এই খুলিটা যদি আমার কাছে থাকে, তাহলে আমি ওকে ঠিক এই অন্যায় করা থেকে বিরত করতে পারতাম।
যাই হোক...... আমার ক্ষমতা সীমিত হয়ে যাওয়ার জন্যই আমাকেও না চাইতেও ওর সাধনার শেষ দিন অবধি অপেক্ষা করতে হবে। তারপর যখন একদম শেষে অমাবস্যায় পূর্ণিমার চাঁদ উঠবে, আর ওই ছয়টা মন্দির থেকে ওই বিশেষ লাল রশ্মি বেরিয়ে চাঁদ থেকে আসা রশ্মির সঙ্গে মিশবে, এবং ওই বেদীতে এসে পড়বে, আর ঠিক তখন ওর ছেলেকে বলি দেওয়ার জন্য ও যেই উদ্যত হবে, সেই মুহূর্তেই ওকে এক কোপে মেরে ফেলতে হবে। তরোয়ালের এক ঘায়ে ওর ধরা আর মুণ্ড আলাদা করে দিতে হবে। আর এটা করতে হবে কোনও নারীকে।
এবার আজ থেকে সেই দিন অবধি আমাকে বিশেষ বিশেষ কিছু বিধির দ্বারা সেইদিনের সবকিছু যাতে যথাযথ হয়, তা দেখতে হবে। আর তাছাড়া যেকোনও তরোয়াল দিয়ে ওকে শেষ করা সম্ভব হবে না। তার কারণ, আমাদের এটা মনে রাখতে হবে যে, বৈভবী কিন্তু ততক্ষনে ওর অমরত্ব লাভের একধাপ পিছনে থাকবে। তাই সমস্ত কিছু একদম যথাযথ হতেই হবে।
এখন আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া কিছুই করা সম্ভব নয়। সময় যা আছে তাতে আমি শেষ দিনের প্রস্তুতি নিয়ে নিচ্ছি। আর ততদিনে আপনারা এমন একজনকে খোঁজার চেষ্টা করুন যে, আমি যেইদিন বললাম তার আগেই বৈভবীকে শেষ করবে। শুধুমাত্র একটা কথা মাথায় রাখবেন। আপনাদের কোন কাজের দ্বারা বৈভবী যেন এটা না বুঝে ফেলে যে, আমরা ওর কর্মকাণ্ড ধরে ফেলেছি।’
দর্শনা বলল— 'আমার ওই বৈভবীকে সন্দেহ কত বৈকি। কিন্তু এমন ভাবে ওই মানুষটাকে কে মারবে?’
তন্ত্রগুরু সব দেখে নেবেন বলে আর অপেক্ষা না করে সেই গোপন পথ দিয়ে মন্দিরের পিছনে চলে যান। আর বলে জান, মন্দিরের পিছনে গেলেই ওনাকে পাওয়া যাবে। ওই মন্দির চত্বরে তিনি থাকবেন। যখনই ওনাদের মনে হবে যে, তন্ত্রগুরুর সাহায্যের দরকার, তখনই ওই মন্দিরের পিছনে ওনাকে পেয়ে যাবেন। দরকারে যেন ওনারা অবশ্যই ডেকে নিয়ে যান।
রানী হৈমন্তী আর দর্শনা মিলে ঠিক করেন যে, আগে একজন ভালো তান্ত্রিক বা ওই জাতীয় কোনও মানুষকে খুঁজে বের করবেন। তারপর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে, তখন না হয় তাকে সব খুলে বলা যাবে।
কিন্তু বৈভবীর মোকাবিলা করা কি আর যেকোনও তান্ত্রিকের পক্ষে করা সম্ভব? সরাসরি না হলেও মোটামুটি ভাবে ঘটনাগুলো ওনারা যেই যেই তান্ত্রিককে বলেছেন, সেই সেই অস্বীকার করেছে কোনওরকম কোনও সাহায্য করতে। কোন তান্ত্রিক এটাই শোনেনি যে, কোনও তন্ত্রের দ্বারা যে নিজেকে অমর করা সম্ভব।
রানী হৈমন্তী গোপনই এই সমস্ত কাজ করছিলেন। ওনার বিশ্বস্ত কিছু মানুষ অতি সন্তর্পনে এটা তান্ত্রিক খোঁজার কাজ করছিল। স তান্ত্রিকের মুখে একটাই কথা, তন্ত্রের দ্বারা অমরত্ব লাভ করা যায়, তা তারা জানে না। সবদিক থেকে শুধু হতাশা আসতে থাকে। এইদিকে একের পর এক মেয়েরা গায়ের হতে থাকে। আর রাজামশাইয়ের কাছে খবর আসতে থাকে। প্রত্যেক আমাবস্যায় বৈভবীর মন্দির একবার করে সুসজ্জিত হয়ে উঠতে থাকে। কেউ না জানলেও রানী হৈমন্তী আর দর্শনা বুঝতে পারেন যে, একটা করে মন্দির সেজে উঠছে মানে দুটো করে মেয়ের প্রাণ যাচ্ছে। সমস্তটা জানার পরেও ওনারা কিছু করতে পারছেন না।
কোন উপায়ান্তর না পেয়ে রানী হৈমন্তী ঠিক করেন যে, বৈভবী জানতে পারলে জানবে। তবুও তিনি এইভাবে চুপ করে বসে থাকতে পারবেন না। যাদের ঘরে ওই সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত মেয়ে রয়েছে, তাদেরকে তিনি কড়ি দিয়ে সাহায্য করবেন। আর বলবেন, তারা যেন ওই কড়ি নিয়ে কয়েকটা মাসের জন্য অন্য কোথাও চলে যায়।
কিন্তু বলে না যে, শয়তানকে আটকানোর জন্য ভগবানও মনে হয় চেষ্টা করে। আর সেই কারণেই ওনার এই উদ্দেশ্য কিন্তু সফল হয় না। রানী হৈমন্তীর হঠাৎ করে প্রসব বেদনা শুরু হয়ে যায়। আর সন্তানের জন্ম দেওয়ার জন্য ওনাকে অন্য একটা ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাই এইভাবে দর্শনার পক্ষে একা একা সব কিছু করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
রানীর কিন্তু অতো তাড়াতাড়ি প্রসব বেদনা ওঠার কথা ছিল না। ওনার হাতে তখনও মাস খানেক সময় ছিল। ভগবানই হয়তো এই সমস্ত কিছু করে ওনাকে একটা ভুল করা থেকে আটকে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন রানীর কিছুই করার ছিল না। তিনি প্রায় এক মাসের জন্য গৃহবন্দি হয়ে পড়লেন। আর আমার সন্তান সময়ের আগেই পৃথিবীতে এসে পড়েছে। আর সেই সন্তানের ভালোর জন্যই এইরকম নিয়ম। সবার জন্যই নিয়মটা ছিল। এখনও রয়েছে। যেটাকে আমরা আঁতুড়ঘর বলি। এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন রানী হৈমন্তী।
দর্শনা একা কী করবে বুঝে উঠতে না পেরে ওই তন্ত্রগুরুর কাছে যায়। কারণ, আর মাত্র দুটো মাস হাতে আছে। তার মধ্যে একটা মাস রানী হৈমন্তী বের হতে পারবেন না। বাকি আর একটা মাসে তিনি আদৌ কিছু করতে পারবেন কিনা তা দর্শনা না বুঝতে পারছিল না।
তন্ত্রগুরু ওকে দেখে বললেন যে, তিনি নাকি আগে থেকেই জানতেন যে, ওনাদেরকে তন্ত্রগুরুর সাহায্য নিতেই হবে। তার কারণ, বৈভবীর সামনাসামনি হওয়ার জন্য কোনও তান্ত্রিক পাওয়া অত সহজ নয়। তন্ত্রগুরু আরও বললেন— ‘এটা আমার সাধনা করে তৈরি করা সেই তরোয়াল। তবে এতে আরও অনেক বেশি শক্তি স্থাপন করে নিতে হবে। তারপর যে বৈভবীকে শেষ করবে, তার রক্ত দিয়ে এতে প্রাণ সঞ্চার করতে হবে। কিন্তু আমার বাকি বিধিটা করতে হবে এখানে বসেই।’
সেইমতো সমস্ত কথাবার্তা সেরে দর্শনা রাজমহলে ফিরে যায়।
একমাস পরে রানী হৈমন্তী ওনার পুত্র সন্তানকে নিয়ে আবার নিজের কক্ষে ফিরে আসেন। আর মাত্র এক পক্ষকাল, তারপরেই বৈভবী অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যাবে। পারলেন না তিনি কিছু করতে। কষ্টে ওনার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। তবুও তিনি নিরুপায়। এমনি সময় হলে এখন তিনি আনন্দে কাটাতেন। কারণ, আজ এতগুলো সন্তানকে গর্ভেই হারানোর পরে শেষ পর্যন্ত তিনি মা হতে পেরেছেন। কিন্তু এখন তো......
ওনার এই চিন্তার মধ্যেই দর্শনা ভিতরে আসে। ওকে দেখেই রানী হৈমন্তী কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। গত একমাস তিনি কোনও খবর পাননি। কিন্তু এখন বাঁচার আর কোনও উপায় নেই দেখে, এমন ভাবে কাঁদছেন।
দর্শনা ওনাকে শান্ত করে বলে— ‘তুমি কেঁদো না বৌরানী। তুমি ভাবছো যে, তুমি একমাস কোন কিছু করতে পারোনি বলে সব শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু না; সব শেষ হয়ে যায়নি। আমি আমার দিক থেকে যতটা করা সম্ভব করেছি। দেখো আমি কাকে আমার সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি।’
সামনে তন্ত্রগুরুকে দেখে রানী হৈমন্তী অবাক হয়ে যান। তখন দর্শনা ওনাকে সবটা খুলে বলে। কিরকম করে ও কি করেছে। সব শুনে তিনি তন্ত্রগুরুকে বললেন— ‘সব দিক থেকে আমরা নিরাশা প্রাপ্ত হয়েছি। একমাত্র আপনিই বলেছেন যে, বৈভবীকে আপনি আটকাতে পারবেন। তাই আমার অনুরোধ যে, যেমন করেই হোক ওকে আটকান। আমরা আপনার সাথে রয়েছি। আর আমার মনে আছে, আপনি বলেছিলেন যে, কোনও নারীকেই হাতে অস্ত্র তুলে দিতে হবে। ওই বৈভবীকে শেষ করতে।
তাই আমি ঠিক করেছি অন্য কোনও নারী নয়, আমি শেষ করব ওকে। আসলে আপনি আমাকে সবকিছু খুলে বলার পরে আপনার কথার সত্যতা যাচাই করার জন্য আমি গোপনে অমাবস্যার রাত্রিতে ওর ওই মন্দির গুলোর কাছে গিয়েছিলাম। আর ওখানে গিয়ে সমস্ত কিছু নিজের চোখে দেখেছি।
কী বীভৎস সেই দৃশ্য। ও মেয়েদুটোকে অবলীলায় বলি দিয়ে দিল। তারপর এক মাটি রক্ত এমনভাবে পান করল, যেন জল পান করল। আর শুধুমাত্র ওই রক্ত পান করেই শান্ত হয়নি। ওই রক্ত নিজের মাথায় ঢেলে এমন অদ্ভুত রকম ব্যবহার করছিল, যেন মনে হচ্ছে ওই রক্তে ও স্নান করছে আর নাচ করছে। ঘৃণায় আমার প্রান যায় যায় অবস্থা। কোনও রকমে নিজের কক্ষে ফিরে আসি।’
এই কথা শুনে তন্ত্রগুরু আঁতকে উঠলেন। বললেন— ‘ভাগ্য ভালো যে ও টের পায়নি। তা না হলে কি যে হতো। হয়তো আপনাকে সেই মুহূর্তে ওইখানেই শেষ করে দিত। কারণ, ও বুঝতে পারত যে এটা জানার পরে আপনি চুপ করে বসে থাকবেন না।’
দর্শনা বলল— ‘আচ্ছা আজকে যেই রকম বৌরানী দেখে ফেলল, সেই রকম করে তো যে কেউ যাবে আর এই কর্মকাণ্ড দেখে ফেলবে। তখন তো ওরই বিপদ বাড়বে। তা জানা সত্ত্বেও সেইসব লুকানোর কোনও চেষ্টাই করেনি।’
তন্ত্রগুরু বললেন— ‘আসলে ও বুঝে গিয়েছে যে, কেউ ওর বিরুদ্ধে মুখ খুলবে না। আর কেউ কিছু বললে বা করলে তার মুখ ও বন্ধ করতে জানে। এমন ভাবে সবটা করবে যা দেখে কেউ সন্দেহ করবে না। আর রাজামশাইকে এখন ও অনেকটাই নিজের মোহগ্রস্ত করে নিয়েছে। নিজে অমর হয়ে গেলে তো সব ওরই হবে। কিন্তু ওইসব কথা এখন এই মুহূর্তে অত গুরুত্বপূর্ণ নয়। ও যাতে সমস্ত কিছুর উপরে নিজের অধিকার জমাতে না পারে, তার জন্য ওকে আটকানো দরকার। আমাদের এই মুহূর্তে মূল লক্ষ্য এটাই। কিন্তু কথা হলো, রানীমা, চাইলেও বৈভবীকে আপনি কিন্তু মারতে পারবেন না।’
সঙ্গে সঙ্গে রানী হৈমন্তীর প্রশ্ন— ‘কেন…?’
‘কারণ ওকে একজন অবিবাহিত মেয়েই মারতে পারবে।’
এই কথা শুনে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে দর্শনা বলল— ‘বেশ তাহলে এই কাজ আমি করব।’
রানী হৈমন্তী সঙ্গে সঙ্গে বললেন— ‘কিন্তু তুমি তো.........!’
‘জানি... আমি তরোয়াল চালাতে পারি না সেটাই ভাবছো তো? কিন্তু যে ক’টা দিন সময় আছে, তাতে আমি তরোয়াল চালানো শিখে নেব। তা না হলে আমাদের কাছে আর অন্য কোনও উপায় নেই’।
সেই মত সবকিছু ঠিকঠাক করেই ওনারা ওই নির্দিষ্ট দিনের অপেক্ষা করতে থাকেন। আর দেখতে দেখতে সেই দিনটা চলে আসে। দর্শনা যতটা সম্ভব নিজেকে পারদর্শী করেছে এই তরোয়াল বিদ্যায়। ওর এই অদ্ভুত ব্যবহার দেখে সবাই অবাক হয়ে যায়। কিন্তু ও সবাইকে বলেছে যে, ও আত্মরক্ষার জন্য এইসব শিখছে। তরোয়ালটা মোটামুটি ভাবে শিখে নেয় ও। কিন্তু তবুও ওর ভীষণ ভয় ভয় করছিল। ওর মনটা কেমন আনচান করছিল।
সকাল থেকেই তন্ত্রগুরু নানারকম বিধি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ওইদিকে বৈভবীও ব্যস্ত। কারণ, ওই দিন যে ওর এত দিনের সাধনার ফল ও পেতে চলেছে।
দুপুরের একটু পরে তন্ত্রগুরু দর্শনাকে বললেন, স্নান সেরে খোলা চুলে একটা নতুন শাড়ি পরে ওনার সামনে যে যজ্ঞকুণ্ড রয়েছে তার পাশে বসতে। রাজপরিবারের সদস্য হলেও ওর শাড়িটা হতে হবে একদম সাধারন। সেইসঙ্গে কোনও অলংকার বা প্রসাধনী ব্যবহার করতে পারবে না।
ওনার নির্দেশ মত সবকিছু করে দর্শনা এসে বসে ওই যজ্ঞকুণ্ডের পাশে। আবার শুরু হয় নানা রকম মন্ত্রোচ্চারণ। ওই বিধি চলাকালীন তন্ত্রগুরু নিজের হাতটা কেটে দর্শনার কপালে একটা রক্ত তিলক এঁকে দেন। তারপর একটা রক্ত-জবার মালা ওনার গলায় পরিয়ে দেন। আবারও চলতে থাকে যজ্ঞ। বেশ কিছুক্ষণ পরে তন্ত্রগুরু আবারও বললেন— ‘রাজকুমারী এবার আপনাকে একটা কঠিন কাজ করতে হবে। নিজের আঙুলটা এই ছুরির ডগায় রেখে একটু কেটে নিয়ে, সেই রক্ত দিয়ে এই তরোয়ালের একটা তিলক এঁকে দেবেন। আর তারপরেই এই তরোয়ালের অভিষেক সম্পন্ন হবে।’
তন্ত্রগুরুর কথা শেষ হতে না হতেই দর্শনা বলে— ‘আর এটা আমাকে ঠিক কখন করতে হবে?’
‘এখনই......’
‘আচ্ছা………’ বলে তন্ত্রগুরুর কথামতো সবটা করলো দর্শনা।
এই দৃশ্য দেখে রানী হৈমন্তীর চোখের জল চলে আসে। আসলে দর্শনা একদম কষ্ট সহ্য করতে পারে না। তাই ছোটবেলায় খেলাধুলা করত না। কোনও রকম কোনও অস্ত্র চালনাও শেখেনি। তাছাড়া ও নিজের রূপ সৌন্দর্যকে বড্ড বেশি ভালোবাসত। তাই এই সমস্ত কিছু করার চিন্তা-ভাবনাও ও করেনি। এইসবই রাজমাতার থেকে তিনি শুনেছিলেন। আর তাছাড়া তিনি নিজেও দেখেছেন যে, দর্শনা ঠিক কতটা ভয় পায় এই রক্তকে। অথচ সেই মেয়ে আজকে অবলীলায় নিজের হাত কেটে রক্ত দিল।
ওনাকে কাঁদতে দেখে দর্শনা একদম মাথা নিচু করে ফেলে। তবে ও বুঝতে পারে যে, এত কষ্ট করেও কেন সৈনিকরা যুদ্ধ করে। কেন রাজারা লড়াই করে। আজ ও বুঝতে পারে যে, কারোর ভালোর জন্য করা কোনও কাজ যতই কষ্টদায়ক হোক না কেন, তা সবসময় আনন্দদায়ক হয়।
এরপর সেই সমস্ত বিধি চলতে চলতে প্রায় মধ্যরাত্রি হয়ে যায়। ওই দিকে যখন বৈভবীর মন্দিরে বিশাল অগ্নিশিখা দেখা যায়, এই দিকে তখন তন্ত্রগুরুর বিধি সম্পন্ন হয়। এবার পালা আসল কাজের। কিন্তু এটাও করতে হবে খুবই গোপনে। কারণ, ছিল অনেকগুলো। তার মধ্যে প্রধান হল, ওরা চারজন ছাড়া এই ব্যাপারটা কেউ জানত না। আর তাছাড়া পাঁচকান হলে যদি বৈভবী সব বুঝতে পেরে যায়, সেই ভয়টাও ছিল।
মধ্যরাতে এইসব হওয়ায় ওনাদের বেশ সুবিধা হয়েছে। প্রহরীরা ছাড়া আর কেউ জেগে নেই। আর প্রহরীর সংখ্যাও খুবই কম। রানী হৈমন্তী খুব সাবধানে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, যাতে প্রহরীদের নজরে না পড়েন। সেই একই ভাবে দর্শনা আর তন্ত্রগুরুও উপস্থিত হন বৈভবীর সেই মন্দিরগুলোর কাছে। ওনারা তিনজন এসেছেন আর রানীর সেই খাস দাসীকে তিনি রেখে এসেছেন ওনার সন্তানের দেখভাল করার দায়িত্ব দিয়ে।
ওখানে গিয়ে ওনারা অপেক্ষা করতে লাগলেন। একসময় মন্দিরের সেই জাঁকজমক থেমে যায়। একটা দাসী ওই আলাদা করে বানানো বেদীতে বৈভবীর বাচ্চাটাকে শুইয়ে দেয়। বাচ্চাটাকে দেখে দর্শনা আর রানী হৈমন্তী দু’জনেই আঁতকে ওঠেন। নিজের ছেলেকে কেউ যে বলির পাঁঠার মত সাজাতে পারে, তা এই দৃশ্য না দেখলে বোঝা যেত না। বাচ্চাটা পুরো খালি গায়ে রয়েছে। গলায় রয়েছে রক্ত জবা ফুলের মালা। আর কপালে লাল সিঁদুরের তিলক। মুহূর্তের অপেক্ষা, তারপরেই ওনারা দেখেন সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় হাতে একটা ধারালো খাঁড়া নিয়ে বৈভবী এগিয়ে আসছে। গা থেকে তখনও টপটপ করে রক্ত বয়ে চলেছে। এমন অবস্থা দেখে দর্শনা ভয়ে কাঁপতে থাকে।
তন্ত্রগুরু বললেন— ‘রাজকুমারী একটু পরেই চাঁদ উঠবে। ঠিক যেমনটা আমি বলেছিলাম... অমাবস্যার রাতে চাঁদ উঠবে। তারপর সেই চাঁদের রশ্মি আর এই ছ’টা মন্দির থেকে নির্গত রশ্মি মিলিত হয়ে পড়বে ওই বাচ্চাটার উপরে। তারপর বেশ কিছুক্ষণ ও একটা মন্ত্র পড়বে। ওই মন্ত্রটা পড়ে ওই বাচ্চাটাকে বলি দিয়ে, ও দাঁড়াবে ওই রশ্মির নিচে। তখন শয়তান ওকে আশীর্বাদ করবে। আর ও হয়ে যাবে মহাশক্তিশালী। কেউ কোনদিনও কিছু করতে পারবে না ওর।'
রানী হৈমন্তী একটু অধৈর্য হয়ে বললেন— ‘বাবা আপনি শুধু বলুন কখন কি করতে হবে।’
‘বুঝেছি রানীমা, আপনার ধৈর্য ধরছে না। কিন্তু আমাদের আরও একটু অপেক্ষা করতেই হবে। আর হ্যাঁ, রাজকুমারী আপনাকে বলছি, ওই যে প্রথমে বৈভবী মন্ত্র পড়বে, তখনই কিন্তু ওকে শেষ করতে হবে। কারণ, ওই সময় ও নিরস্ত্র থাকবে। হাতে কোনও অস্ত্র নিয়ে ওই মন্ত্র পড়া যাবে না। আর ওই মন্ত্র চলাকালীন ও অন্য কোনও মন্ত্র বলতে পারবে না। ও হাত দিয়ে বা অন্য কোনও দিকে সরে গিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু আপনাকে কোনওভাবে কোনও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না। আর আপনি ব্যর্থ হলে চলবে না। যখন ওকে আঘাত করবেন, মনে রাখবেন এক ঘায়ে ওর ধর আর মুণ্ড আলাদা হতে হবে। দ্বিতীয়বারের কোনও সুযোগ নেই। ও কিন্তু আপনার উপরে কোনও রকম কোনও আক্রমণ করবে না। তাই একটু ভালোভাবে ঠান্ডা মাথায় আঘাতটা করবেন। বারবার বলছি মনে রাখবেন, দ্বিতীয়বারের জন্য কিন্তু কোনও সুযোগ নেই। যদি আপনি একবারে মারতে না পারেন, মানে দ্বিতীয়বারে মারেন, তাহলে আমি নিজেও জানি না যে কি হবে। আমি কিছু করতে পারবো কিনা বা এর ফলাফল কি হতে পারে, কিচ্ছু জানি না। মোট কথা অল্প সময়ে সব শেষ করতে হবে।'
এমন সময় এক অদ্ভুত দৃশ্যের সাক্ষী হন ওনারা। অমাবস্যার রাতে আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। আর সেখান থেকে এক তীব্র সাদা রশ্মি এসে ওই বাচ্চাটার উপরে পড়ে। অত আলো একসঙ্গে এসে পড়াতে বাচ্চাটা কেঁদে ওঠে। কিন্তু এইটুকু বাচ্চার হাত-পাও বাঁধা রয়েছে। রানী হৈমন্তীর মনটা আবার কেঁদে ওঠে। মনে হতে থাকে, কখন বাচ্চাটাকে ওই বন্ধন থেকে মুক্ত করে বুকে তুলে নেবেন।
ইতিমধ্যেই ওই ছ’টা মন্দির থেকে লাল রশ্মিগুলো বেরিয়ে আসে। তারপর ওই চাঁদের সাদা আলোর সঙ্গে মিলিত হয়ে বাচ্চাটার উপরে এসে পড়ে। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। এরপরেই উলঙ্গ বৈভবী বাচ্চাটার একদম কাছে চলে যায়। একপাশে রাখা একটা থালায় খাঁড়ার মতো ওই ধারালো জিনিসটা রেখে বিড়বিড় করে মন্ত্র বলতে শুরু করে।
তন্ত্রগুরু সঙ্গে সঙ্গে দর্শনাকে ইশারা করেন। ওনার ইশারা পেয়েই দর্শনা কাঁপা কাঁপা হাতে তরোয়াল নিয়ে এগিয়ে চলে। মনের মধ্যে এত ভয় যে, হঠাৎকোথা থেকে এল তা ও বুঝতে পারছে না। এতদিন তো নিজেকে অনেক বুঝিয়েছে। সমস্ত বিধি করেছে নির্দ্বিধায়। তাহলে আজকে যখন কিছু করে দেখানোর সময় এসেছে, তখন এত ভয় পাচ্ছে কেন? কেন বারবার মনে হচ্ছে যদি একবারে মারতে না পারে, তাহলে...! কিন্তু না, আর কিছু ভাববে না। ওকে পারতেই হবে। না পারলে যে আর কোনও উপায় থাকবে না। এটা ভেবেই ও পৌঁছে যায় বৈভবীর একদম কাছে।
কিন্তু বৈভবীকে আঘাত করার আগেই ও বুঝতে পেরে যায় যে, ওর পিছনে কেউ আছে। আর মন্ত্র পড়তে পড়তে ঘুরে তাকায় দর্শনার দিকে। ওর এইরূপ দেখে দর্শনা এক মুহূর্তের জন্য আবারও ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু ওকে পারতেই হবে। এটা মনে করে ও ওর হাতে ধরে থাকা তরোয়ালটা বৈভবীর গলা লক্ষ্য করে চালিয়ে দেয়। কিন্তু হায়.......... এই আঘাতে বৈভবীর গলায় একটা আঁচড় পড়ে মাত্র। বিরাট বড় ভুল হয়ে গেল। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন রানী হৈমন্তী। কি হবে এই ভুলের পরিণতি…?
ওনার এই চিন্তার মধ্যেই দর্শনা ভিতরে আসে। ওকে দেখেই রানী হৈমন্তী কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। গত একমাস তিনি কোনও খবর পাননি। কিন্তু এখন বাঁচার আর কোনও উপায় নেই দেখে, এমন ভাবে কাঁদছেন।
দর্শনা ওনাকে শান্ত করে বলে— ‘তুমি কেঁদো না বৌরানী। তুমি ভাবছো যে, তুমি একমাস কোন কিছু করতে পারোনি বলে সব শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু না; সব শেষ হয়ে যায়নি। আমি আমার দিক থেকে যতটা করা সম্ভব করেছি। দেখো আমি কাকে আমার সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি।’
সামনে তন্ত্রগুরুকে দেখে রানী হৈমন্তী অবাক হয়ে যান। তখন দর্শনা ওনাকে সবটা খুলে বলে। কিরকম করে ও কি করেছে। সব শুনে তিনি তন্ত্রগুরুকে বললেন— ‘সব দিক থেকে আমরা নিরাশা প্রাপ্ত হয়েছি। একমাত্র আপনিই বলেছেন যে, বৈভবীকে আপনি আটকাতে পারবেন। তাই আমার অনুরোধ যে, যেমন করেই হোক ওকে আটকান। আমরা আপনার সাথে রয়েছি। আর আমার মনে আছে, আপনি বলেছিলেন যে, কোনও নারীকেই হাতে অস্ত্র তুলে দিতে হবে। ওই বৈভবীকে শেষ করতে।
তাই আমি ঠিক করেছি অন্য কোনও নারী নয়, আমি শেষ করব ওকে। আসলে আপনি আমাকে সবকিছু খুলে বলার পরে আপনার কথার সত্যতা যাচাই করার জন্য আমি গোপনে অমাবস্যার রাত্রিতে ওর ওই মন্দির গুলোর কাছে গিয়েছিলাম। আর ওখানে গিয়ে সমস্ত কিছু নিজের চোখে দেখেছি।
কী বীভৎস সেই দৃশ্য। ও মেয়েদুটোকে অবলীলায় বলি দিয়ে দিল। তারপর এক মাটি রক্ত এমনভাবে পান করল, যেন জল পান করল। আর শুধুমাত্র ওই রক্ত পান করেই শান্ত হয়নি। ওই রক্ত নিজের মাথায় ঢেলে এমন অদ্ভুত রকম ব্যবহার করছিল, যেন মনে হচ্ছে ওই রক্তে ও স্নান করছে আর নাচ করছে। ঘৃণায় আমার প্রান যায় যায় অবস্থা। কোনও রকমে নিজের কক্ষে ফিরে আসি।’
এই কথা শুনে তন্ত্রগুরু আঁতকে উঠলেন। বললেন— ‘ভাগ্য ভালো যে ও টের পায়নি। তা না হলে কি যে হতো। হয়তো আপনাকে সেই মুহূর্তে ওইখানেই শেষ করে দিত। কারণ, ও বুঝতে পারত যে এটা জানার পরে আপনি চুপ করে বসে থাকবেন না।’
দর্শনা বলল— ‘আচ্ছা আজকে যেই রকম বৌরানী দেখে ফেলল, সেই রকম করে তো যে কেউ যাবে আর এই কর্মকাণ্ড দেখে ফেলবে। তখন তো ওরই বিপদ বাড়বে। তা জানা সত্ত্বেও সেইসব লুকানোর কোনও চেষ্টাই করেনি।’
তন্ত্রগুরু বললেন— ‘আসলে ও বুঝে গিয়েছে যে, কেউ ওর বিরুদ্ধে মুখ খুলবে না। আর কেউ কিছু বললে বা করলে তার মুখ ও বন্ধ করতে জানে। এমন ভাবে সবটা করবে যা দেখে কেউ সন্দেহ করবে না। আর রাজামশাইকে এখন ও অনেকটাই নিজের মোহগ্রস্ত করে নিয়েছে। নিজে অমর হয়ে গেলে তো সব ওরই হবে। কিন্তু ওইসব কথা এখন এই মুহূর্তে অত গুরুত্বপূর্ণ নয়। ও যাতে সমস্ত কিছুর উপরে নিজের অধিকার জমাতে না পারে, তার জন্য ওকে আটকানো দরকার। আমাদের এই মুহূর্তে মূল লক্ষ্য এটাই। কিন্তু কথা হলো, রানীমা, চাইলেও বৈভবীকে আপনি কিন্তু মারতে পারবেন না।’
সঙ্গে সঙ্গে রানী হৈমন্তীর প্রশ্ন— ‘কেন…?’
‘কারণ ওকে একজন অবিবাহিত মেয়েই মারতে পারবে।’
এই কথা শুনে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে দর্শনা বলল— ‘বেশ তাহলে এই কাজ আমি করব।’
রানী হৈমন্তী সঙ্গে সঙ্গে বললেন— ‘কিন্তু তুমি তো.........!’
‘জানি... আমি তরোয়াল চালাতে পারি না সেটাই ভাবছো তো? কিন্তু যে ক’টা দিন সময় আছে, তাতে আমি তরোয়াল চালানো শিখে নেব। তা না হলে আমাদের কাছে আর অন্য কোনও উপায় নেই’।
সেই মত সবকিছু ঠিকঠাক করেই ওনারা ওই নির্দিষ্ট দিনের অপেক্ষা করতে থাকেন। আর দেখতে দেখতে সেই দিনটা চলে আসে। দর্শনা যতটা সম্ভব নিজেকে পারদর্শী করেছে এই তরোয়াল বিদ্যায়। ওর এই অদ্ভুত ব্যবহার দেখে সবাই অবাক হয়ে যায়। কিন্তু ও সবাইকে বলেছে যে, ও আত্মরক্ষার জন্য এইসব শিখছে। তরোয়ালটা মোটামুটি ভাবে শিখে নেয় ও। কিন্তু তবুও ওর ভীষণ ভয় ভয় করছিল। ওর মনটা কেমন আনচান করছিল।
সকাল থেকেই তন্ত্রগুরু নানারকম বিধি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ওইদিকে বৈভবীও ব্যস্ত। কারণ, ওই দিন যে ওর এত দিনের সাধনার ফল ও পেতে চলেছে।
দুপুরের একটু পরে তন্ত্রগুরু দর্শনাকে বললেন, স্নান সেরে খোলা চুলে একটা নতুন শাড়ি পরে ওনার সামনে যে যজ্ঞকুণ্ড রয়েছে তার পাশে বসতে। রাজপরিবারের সদস্য হলেও ওর শাড়িটা হতে হবে একদম সাধারন। সেইসঙ্গে কোনও অলংকার বা প্রসাধনী ব্যবহার করতে পারবে না।
ওনার নির্দেশ মত সবকিছু করে দর্শনা এসে বসে ওই যজ্ঞকুণ্ডের পাশে। আবার শুরু হয় নানা রকম মন্ত্রোচ্চারণ। ওই বিধি চলাকালীন তন্ত্রগুরু নিজের হাতটা কেটে দর্শনার কপালে একটা রক্ত তিলক এঁকে দেন। তারপর একটা রক্ত-জবার মালা ওনার গলায় পরিয়ে দেন। আবারও চলতে থাকে যজ্ঞ। বেশ কিছুক্ষণ পরে তন্ত্রগুরু আবারও বললেন— ‘রাজকুমারী এবার আপনাকে একটা কঠিন কাজ করতে হবে। নিজের আঙুলটা এই ছুরির ডগায় রেখে একটু কেটে নিয়ে, সেই রক্ত দিয়ে এই তরোয়ালের একটা তিলক এঁকে দেবেন। আর তারপরেই এই তরোয়ালের অভিষেক সম্পন্ন হবে।’
তন্ত্রগুরুর কথা শেষ হতে না হতেই দর্শনা বলে— ‘আর এটা আমাকে ঠিক কখন করতে হবে?’
‘এখনই......’
‘আচ্ছা………’ বলে তন্ত্রগুরুর কথামতো সবটা করলো দর্শনা।
এই দৃশ্য দেখে রানী হৈমন্তীর চোখের জল চলে আসে। আসলে দর্শনা একদম কষ্ট সহ্য করতে পারে না। তাই ছোটবেলায় খেলাধুলা করত না। কোনও রকম কোনও অস্ত্র চালনাও শেখেনি। তাছাড়া ও নিজের রূপ সৌন্দর্যকে বড্ড বেশি ভালোবাসত। তাই এই সমস্ত কিছু করার চিন্তা-ভাবনাও ও করেনি। এইসবই রাজমাতার থেকে তিনি শুনেছিলেন। আর তাছাড়া তিনি নিজেও দেখেছেন যে, দর্শনা ঠিক কতটা ভয় পায় এই রক্তকে। অথচ সেই মেয়ে আজকে অবলীলায় নিজের হাত কেটে রক্ত দিল।
ওনাকে কাঁদতে দেখে দর্শনা একদম মাথা নিচু করে ফেলে। তবে ও বুঝতে পারে যে, এত কষ্ট করেও কেন সৈনিকরা যুদ্ধ করে। কেন রাজারা লড়াই করে। আজ ও বুঝতে পারে যে, কারোর ভালোর জন্য করা কোনও কাজ যতই কষ্টদায়ক হোক না কেন, তা সবসময় আনন্দদায়ক হয়।
এরপর সেই সমস্ত বিধি চলতে চলতে প্রায় মধ্যরাত্রি হয়ে যায়। ওই দিকে যখন বৈভবীর মন্দিরে বিশাল অগ্নিশিখা দেখা যায়, এই দিকে তখন তন্ত্রগুরুর বিধি সম্পন্ন হয়। এবার পালা আসল কাজের। কিন্তু এটাও করতে হবে খুবই গোপনে। কারণ, ছিল অনেকগুলো। তার মধ্যে প্রধান হল, ওরা চারজন ছাড়া এই ব্যাপারটা কেউ জানত না। আর তাছাড়া পাঁচকান হলে যদি বৈভবী সব বুঝতে পেরে যায়, সেই ভয়টাও ছিল।
মধ্যরাতে এইসব হওয়ায় ওনাদের বেশ সুবিধা হয়েছে। প্রহরীরা ছাড়া আর কেউ জেগে নেই। আর প্রহরীর সংখ্যাও খুবই কম। রানী হৈমন্তী খুব সাবধানে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, যাতে প্রহরীদের নজরে না পড়েন। সেই একই ভাবে দর্শনা আর তন্ত্রগুরুও উপস্থিত হন বৈভবীর সেই মন্দিরগুলোর কাছে। ওনারা তিনজন এসেছেন আর রানীর সেই খাস দাসীকে তিনি রেখে এসেছেন ওনার সন্তানের দেখভাল করার দায়িত্ব দিয়ে।
ওখানে গিয়ে ওনারা অপেক্ষা করতে লাগলেন। একসময় মন্দিরের সেই জাঁকজমক থেমে যায়। একটা দাসী ওই আলাদা করে বানানো বেদীতে বৈভবীর বাচ্চাটাকে শুইয়ে দেয়। বাচ্চাটাকে দেখে দর্শনা আর রানী হৈমন্তী দু’জনেই আঁতকে ওঠেন। নিজের ছেলেকে কেউ যে বলির পাঁঠার মত সাজাতে পারে, তা এই দৃশ্য না দেখলে বোঝা যেত না। বাচ্চাটা পুরো খালি গায়ে রয়েছে। গলায় রয়েছে রক্ত জবা ফুলের মালা। আর কপালে লাল সিঁদুরের তিলক। মুহূর্তের অপেক্ষা, তারপরেই ওনারা দেখেন সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় হাতে একটা ধারালো খাঁড়া নিয়ে বৈভবী এগিয়ে আসছে। গা থেকে তখনও টপটপ করে রক্ত বয়ে চলেছে। এমন অবস্থা দেখে দর্শনা ভয়ে কাঁপতে থাকে।
তন্ত্রগুরু বললেন— ‘রাজকুমারী একটু পরেই চাঁদ উঠবে। ঠিক যেমনটা আমি বলেছিলাম... অমাবস্যার রাতে চাঁদ উঠবে। তারপর সেই চাঁদের রশ্মি আর এই ছ’টা মন্দির থেকে নির্গত রশ্মি মিলিত হয়ে পড়বে ওই বাচ্চাটার উপরে। তারপর বেশ কিছুক্ষণ ও একটা মন্ত্র পড়বে। ওই মন্ত্রটা পড়ে ওই বাচ্চাটাকে বলি দিয়ে, ও দাঁড়াবে ওই রশ্মির নিচে। তখন শয়তান ওকে আশীর্বাদ করবে। আর ও হয়ে যাবে মহাশক্তিশালী। কেউ কোনদিনও কিছু করতে পারবে না ওর।'
রানী হৈমন্তী একটু অধৈর্য হয়ে বললেন— ‘বাবা আপনি শুধু বলুন কখন কি করতে হবে।’
‘বুঝেছি রানীমা, আপনার ধৈর্য ধরছে না। কিন্তু আমাদের আরও একটু অপেক্ষা করতেই হবে। আর হ্যাঁ, রাজকুমারী আপনাকে বলছি, ওই যে প্রথমে বৈভবী মন্ত্র পড়বে, তখনই কিন্তু ওকে শেষ করতে হবে। কারণ, ওই সময় ও নিরস্ত্র থাকবে। হাতে কোনও অস্ত্র নিয়ে ওই মন্ত্র পড়া যাবে না। আর ওই মন্ত্র চলাকালীন ও অন্য কোনও মন্ত্র বলতে পারবে না। ও হাত দিয়ে বা অন্য কোনও দিকে সরে গিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু আপনাকে কোনওভাবে কোনও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না। আর আপনি ব্যর্থ হলে চলবে না। যখন ওকে আঘাত করবেন, মনে রাখবেন এক ঘায়ে ওর ধর আর মুণ্ড আলাদা হতে হবে। দ্বিতীয়বারের কোনও সুযোগ নেই। ও কিন্তু আপনার উপরে কোনও রকম কোনও আক্রমণ করবে না। তাই একটু ভালোভাবে ঠান্ডা মাথায় আঘাতটা করবেন। বারবার বলছি মনে রাখবেন, দ্বিতীয়বারের জন্য কিন্তু কোনও সুযোগ নেই। যদি আপনি একবারে মারতে না পারেন, মানে দ্বিতীয়বারে মারেন, তাহলে আমি নিজেও জানি না যে কি হবে। আমি কিছু করতে পারবো কিনা বা এর ফলাফল কি হতে পারে, কিচ্ছু জানি না। মোট কথা অল্প সময়ে সব শেষ করতে হবে।'
এমন সময় এক অদ্ভুত দৃশ্যের সাক্ষী হন ওনারা। অমাবস্যার রাতে আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। আর সেখান থেকে এক তীব্র সাদা রশ্মি এসে ওই বাচ্চাটার উপরে পড়ে। অত আলো একসঙ্গে এসে পড়াতে বাচ্চাটা কেঁদে ওঠে। কিন্তু এইটুকু বাচ্চার হাত-পাও বাঁধা রয়েছে। রানী হৈমন্তীর মনটা আবার কেঁদে ওঠে। মনে হতে থাকে, কখন বাচ্চাটাকে ওই বন্ধন থেকে মুক্ত করে বুকে তুলে নেবেন।
ইতিমধ্যেই ওই ছ’টা মন্দির থেকে লাল রশ্মিগুলো বেরিয়ে আসে। তারপর ওই চাঁদের সাদা আলোর সঙ্গে মিলিত হয়ে বাচ্চাটার উপরে এসে পড়ে। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। এরপরেই উলঙ্গ বৈভবী বাচ্চাটার একদম কাছে চলে যায়। একপাশে রাখা একটা থালায় খাঁড়ার মতো ওই ধারালো জিনিসটা রেখে বিড়বিড় করে মন্ত্র বলতে শুরু করে।
তন্ত্রগুরু সঙ্গে সঙ্গে দর্শনাকে ইশারা করেন। ওনার ইশারা পেয়েই দর্শনা কাঁপা কাঁপা হাতে তরোয়াল নিয়ে এগিয়ে চলে। মনের মধ্যে এত ভয় যে, হঠাৎকোথা থেকে এল তা ও বুঝতে পারছে না। এতদিন তো নিজেকে অনেক বুঝিয়েছে। সমস্ত বিধি করেছে নির্দ্বিধায়। তাহলে আজকে যখন কিছু করে দেখানোর সময় এসেছে, তখন এত ভয় পাচ্ছে কেন? কেন বারবার মনে হচ্ছে যদি একবারে মারতে না পারে, তাহলে...! কিন্তু না, আর কিছু ভাববে না। ওকে পারতেই হবে। না পারলে যে আর কোনও উপায় থাকবে না। এটা ভেবেই ও পৌঁছে যায় বৈভবীর একদম কাছে।
কিন্তু বৈভবীকে আঘাত করার আগেই ও বুঝতে পেরে যায় যে, ওর পিছনে কেউ আছে। আর মন্ত্র পড়তে পড়তে ঘুরে তাকায় দর্শনার দিকে। ওর এইরূপ দেখে দর্শনা এক মুহূর্তের জন্য আবারও ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু ওকে পারতেই হবে। এটা মনে করে ও ওর হাতে ধরে থাকা তরোয়ালটা বৈভবীর গলা লক্ষ্য করে চালিয়ে দেয়। কিন্তু হায়.......... এই আঘাতে বৈভবীর গলায় একটা আঁচড় পড়ে মাত্র। বিরাট বড় ভুল হয়ে গেল। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন রানী হৈমন্তী। কি হবে এই ভুলের পরিণতি…?
এমন দেখে দর্শনা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে হাতের তরোয়ালটা আবারও চালিয়ে দেয়। আর তাতেই বৈভবীর ধর মুণ্ড আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু ওর আত্মা ওর দেহ থেকে বেরিয়েই দর্শনার তরোয়াল দিয়েই ওর-ও ধরা আর মুণ্ড আলাদা করে দেয়। তারপর ওরা আত্মাকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়। বা বলা যায় দর্শনার আত্মাকে নিজের দখলে নিয়ে নেয়। তারপর রক্তের হরফে কিছু লেখা ফুটে ওঠে ওই বেদীতে। মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত কিছু শেষ হয়ে যায়। রানী হৈমন্তী ‘না………আ…………আ…’ করে চিৎকার করে ছুটে আসেন।
তন্ত্রগুরু রানী হৈমন্তীর দিকে কোনও নজর না দিয়ে তিনি তাড়াতাড়ি নিজের পরবর্তী কাজটা করার চেষ্টা করেন। তিনি একটা মন্ত্রোচ্চারণের দ্বারা দর্শনা আর বৈভবীর আত্মাকে আলাদা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু হাতে বেশি সময় নেই। আর ওই মন্ত্রতে যখন ওদেরকে আলাদা করতে পারলেন না, তখন দুটো আত্মাকে একসঙ্গে বোতলে বন্দি করে ফেলেন। তারপর পরবর্তী প্রক্রিয়া করার জন্য দ্রুত ওখান থেকে চলে যান। আর যেতে যেতে বেদীতে লেখা সেই রক্তাক্ষর পড়ে যান।
রানী হৈমন্তীর সেই গগনবিদারী চিৎকারে তখন আকাশ বাতাস কেঁপে ওঠে। রাজমহলের প্রতিটি কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পড়ে সেই কান্না। রাত্রিবেলা হওয়ার জন্য সেই কান্না যেন আরও বেশি করে কম্পনের সৃষ্টি করছিল।
বৈভবী মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওর যে চারজন দাসী ছিল, তাদেরও মোহভঙ্গ হয়ে যায়। তারা তাদের নিজেদের রানীকে ওইভাবে কাঁদতে দেখে ওইখানে ছুটে আসে। একজন এসে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নেয়। রানী হৈমন্তী তখনও দর্শনার পার্থিব শরীরটাকে ধরে চিৎকার করে কেঁদেই চলেছেন। বাকিরা জোর করে রানী হৈমন্তীকে রাজমহলের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। ঠিক সেইসময় যতজনের কানে সেই কান্না গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল, তাদের প্রায় প্রত্যেকেই সেখানে এসে উপস্থিত হয়। রানীর ঐরকম রক্তমাখা আলুথালু বেশে আর সামনে দুটো মৃতদেহ দেখে সবাই হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। রাজা বৃজেন্দ্রকে দেখে ওনার বুকে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে রানী হৈমন্তী একসময় জ্ঞান হারান।
সঙ্গে সঙ্গে ধরাধরি করে ওনাকে ওনার কক্ষের ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয়। একদিকে রানী হৈমন্তীকে রাজবৈদ্য দেখাশোনা করছিল, অন্যদিকে দর্শনার শেষকৃত্যের আয়োজন চলছিল। ওইখানে থাকা প্রত্যেকেই এটা বিশ্বাস করতে পারছিল না যে, এই হাসিখুশি মেয়েটার হঠাৎ করে এইরকম কি করে হল...! আর তার পাশেই বৈভবীর মৃতদেহই বা পড়ে রয়েছে কেন? কি হয়েছিল ওখানে কেউ কিচ্ছু জানে না। আর সেই কারণেই সবাই যেন সেই মুহূর্তেই সবটা জানতে চাইছিল। কিন্তু সবটা জানার একটা মাত্রই উপায় ছিল। আর সেটা হল রানী হৈমন্তী। সবাই অপেক্ষা করছিল রানীর জ্ঞান ফেরার জন্য। রাজা বৃজেন্দ্র ভাবতেই পারছেন না যে, তিনি ওনার স্ত্রীকে সামলাবেন নাকি বোন চলে যাওয়ার শোক পালন করবেন। বৈভবীর মায়াজাল উনার উপরে ছিল বলে উনি রানী হৈমন্তীর থেকে অনেকটা দূরে সরে গিয়েছিলেন। কিন্তু বৈভবীর মৃত্যু হওয়াতে ওনার উপর থেকেও সেই মায়াজালটা সরে যায়। তাই এখন আবার তিনি নিজের স্ত্রীর প্রতি সেই একইরকম আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। কিন্তু বোনকে হারিয়ে ওনার অবস্থাও রানী হৈমন্তীর মতোই হয়ে গেছে।
রাজবৈদ্যের একটু চেষ্টাতেই রানী হৈমন্তীর জ্ঞান ফিরে আসে। আর জ্ঞান ফিরতেই তিনি কপাল কুঁচকে বলে ওঠেন— ‘দর্শনা...... দর্শনা...... তুমি কোথায়? এই দিকে এসো।’ বলতে বলতে কারোর কোনও বাধা না মেনেই কক্ষ থেকে বাইরে সামনে এগিয়ে যেতেই মৃত দর্শনাকে কাপড়ে মোড়া অবস্থায় দেখতে পান।
রাত্রিবেলা হলেও সারা রাজবাড়ি এখন বেশ আলোকিত হয়ে রয়েছে। দর্শনাকে এইরকম ভাবে চোখের সামনে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝতে পারেন যে, নাঃ এতক্ষণ তিনি কোনও স্বপ্ন দেখছিলেন না। সত্যি সত্যি ওনার সখী ওনার বোন ওনার বন্ধু দর্শনা এই দুনিয়া ত্যাগ করেছে। দর্শনা একাধারে ওনার বোন-সখী-ননদ সমস্ত কিছুই ছিল। এখানে আসার পরে সবার প্রথমে যার সঙ্গে সবার প্রথমে ওনার বন্ধুত্ব হয়েছিল, যে ছিল ওনার সুখ-দুঃখের সখী, সেই দর্শনা আজ মৃত। সবাইকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেকে বলি দিল। কোনদিনও মেয়েটা এই সমস্ত কিছু করতে চায়নি। কিন্তু যখন নিজের কানে শুনল যে, একটা সুযোগ আছে যাতে কিনা নিজেকে প্রমাণ করতে পারবে যে, শুধুমাত্র রূপচর্চা করেই ও সময় কাটায় না। ওর মধ্যেও রাজবংশের খুন রয়েছে। কিন্তু সেটাই যে ওর জীবনে কাল ডেকে আনবে, তা কে জানতো? নিজেকে প্রমাণ করার জন্য মেয়েটা এই কয়েকদিনের মধ্যে তরোয়াল চালানো শিখে ওইরকম একটা ভয়ংকর তন্ত্র সাধিকাকে শেষ করল। নিজেকে হঠাৎ করেই বড্ড ছোট মনে হল রানী হৈমন্তীর। বন্ধু বলে মনে করলেও ওনার থেকে বয়সে অনেক ছোট ছিল দর্শনা। আবারও কাঁদতে শুরু করেন। আর কাঁদতে কাঁদতেই মাটিতে ধপ করে বসে পড়েন। একটু পরে ওনার সামনে দিয়েই শেষ কৃত্য করার জন্য দর্শনাকে নিয়ে চলে গেল।
রাজবাড়িতে তখন কান্নার রোল। দর্শনা যে সবার প্রিয় পাত্রী ছিল। তার কারণ, মেয়েটা সব সময় হাসিখুশি থাকত। কারোর মনে দুঃখ হলে তাকে নাম হাসানো পর্যন্ত ও দম ফেলত না। আর সেই মেয়েটাই এইরকম নিরবে চলে গেল। কিন্তু কেন কী ভাবে কী হলো, তা কেউ জানে না। কিন্তু এখন রানী হৈমন্তীর জ্ঞান ফিরেছে। তাই সবাই সবটা জানার জন্য উৎসুক হয়ে রয়েছে।
কিছু দাসী এসে রানী হৈমন্তীকে নিয়ে গিয়ে ওনার কক্ষে বসালে, ওখানে একে একে প্রায় প্রত্যেকেই জড়ো হল। রাজা বৃজেন্দ্র বললেন— ‘আমরা সবাই সবটা জানতে চাই। কি হয়েছিল ওখানে?’
এমন সময় ওখানে তন্ত্রগুরু এসে বললেন— ‘রানীমা, আমার কাজ প্রায় শেষ। আমাকে শুধু এখন বৈভবীর সবথেকে প্রিয় কোনও জিনিস দিন। যাতে আমি ওর আত্মাকে বন্দী বানাব। ওকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হয়নি। বাকি সব কিছু একটু পরে খুলে বলছি। আগে ওর আত্মাকে বন্দী বানাই, তার পরে.........’
তন্ত্রগুরুকে দেখে সবাই আরও বেশী অবাক হয়ে যায়। রাজমহলের ভিতরে এইরকম একটা অজানা অচেনা লোক, যাকে দেখে খুব সহজেই একজন তান্ত্রিক বলে বুঝে নেওয়া যায়, সে কি করছিল? এ কে? কেন এসেছে? কিন্তু সবাই চুপ রইল। যেন অপেক্ষা করছিল রানী হৈমন্তীর কথা বলার জন্য। রাজা বৃজেন্দ্রও কোন প্রশ্ন করলেন না। যেন রানীকে একটু সময় দিতে চাইছিলেন।
এদিকে রানী হৈমন্তীও বুঝতে পারছিলেন না যে, বৈভবীর সব থেকে প্রিয় জিনিস কি হতে পারে। এমন সময় বৈভবীর সেবায় থাকা একজন দাসী বলল— ‘রানীমা, অনুমতি পেলে আমি কিছু বলব?’
রানী হৈমন্তী বললেন— ‘হ্যাঁ কী বলো?’
‘আমার মনে হয় বৈভবীর প্রিয় জিনিস হল গয়নার বাক্স।’
রাজা বৃজেন্দ্র একটু অবাক হয়ে বললেন— ‘গয়নার বাক্স...! গয়না ভালোবাসত জানি। কিন্তু গয়না ছেড়ে হঠাৎ করে গয়নার বাক্স কেন প্রিয়?’
‘আসলে রাজামশাই বৈভবীর গয়নার বাক্স কাঠের হলেও ওতে হীরে মণিমাণিক্য দিয়ে ও নিজের মনের মত করে সাজিয়ে ছিল। আর যত গয়না ওই বাক্সের মধ্যে রাখত।ওই বাক্সটাকে কখনও কাছ ছাড়া করতো না। এমনকি বিছানায় শুতে গেলেও সেই বাক্সটা নিজের সঙ্গে রাখত। আর ওই যে মন্দির গুলো আছে, যেখানে ও কিসব কাণ্ড-কারখানা করেছে, সেই সময়ও বাক্সটা কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে যেত। তাই আমার মনে হয়েছে ওটা নিশ্চয়ই ওর প্রিয় হবে। আর তাই.........’
দাসী পুরো কথাটা শেষ হওয়ার আগেই হাত ধুলে রানী হৈমন্তী তাকে থামিয়ে দেন। তারপর তন্ত্রগুরুর দিকে তাকালে, তিনি বলেন— ‘হ্যাঁ হ্যাঁ ওটাই হবে। কথা শুনেই বোঝা যাচ্ছে যে, ওই বাক্সটাকে বৈভবী খুব ভালোবাসতো।’
এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ওই দাসী দৌড়ে গিয়ে গয়নার বাক্সটা নিয়ে আসে। আর তন্ত্রগুরু সেই বাক্সটা নিয়ে আবার নিজ অবস্থানে ফিরে যান।
রাজা বৃজেন্দ্র বললেন— ‘এবার সবটা খুলে বলো। আমরা সবাই জানি যে, বৈভবী এক ভয়ঙ্কর তন্ত্র সাধিকা। তাই ওর দেহ সৎকারের আমরা কোনও ব্যবস্থা করিনি। সমস্ত কিছু জেনে রাজপুরোহিতের পরামর্শ মতোই সমস্ত কিছু করে তবেই যা করার করব। আর ওকে তোমরা কেন মারলে, সেটা না জেনে...........’ পুরো কথাটা শেষ না করেই রাজামশাই আবারও বললেন— ‘একটা মানুষকে যখন মেরেছ, তখন তার যথাযথ কারণ আছে বলেই আমার মনে হয়। তাছাড়া আমার বোনকে কে মারল? আর ওই বুড়ো মানুষটা কে? একে দেখে তো মনে হচ্ছে, একটা তান্ত্রিক। সে সেখানে এই রাজমহলে কেমন করে এলো? এতদিন কেন আমাদের সবার চোখে পড়েনি?’
রানী হৈমন্তী অত্যন্ত কষ্টের ভিতর ছিলেন। কিন্তু সবাই এত প্রশ্ন করছিল যে, তিনি আর চুপ থাকতে পারলেন না। বললেন— ‘রাজামশাই এখন এই মুহূর্তে যা যা জানতে চাইলেন, আমি জানি তা আপনাদের সবার মনের মধ্যেই রয়েছে। আপনারাও সবটা জানতে চান যে, কেমন করে কি হলো। আমি বলছি, শুরু থেকেই বলছি।’
এরপর রানী হৈমন্তীর সবাইকে সবটা খুলে বলেন। এই কাহিনী শোনার পরে প্রত্যেকে অবাক হয়ে গেলেও রাজা বৃজেন্দ্র বললেন— ‘এটা তুমি ভুল করেছো রানী।’
রাজা বৃজেন্দ্র রেগে গেলে রানী হৈমন্তীকে রানী বলে ডাকতেন। কিন্তু ওনার রাগ ঠিক কি কারণে, তা কেউ বুঝতে পারছিলেন না। রানী নিজেও বুঝতে পারলেন না। আর ওনার চোখ মুখ দেখে বৃজেন্দ্র বলে দিলেন কারণটা। বললেন— ‘বৈভবী দেখে মনে হয়নি যে, ও এতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে। যাইহোক...... তুমি আমাকে কেন একবারও বললে না সেই সব। এত কিছু ঘটে গেল। অথচ আমি রাজা হয়ে কিছু জানতে পারলাম না। আমার বোনকে তুমি তোমার এই কাজে নিযুক্ত করেছ। অথচ আমি জানি না। আজকে তোমার জন্য আমি আমার বোনকেও হারালাম। রানী এর শাস্তি তো তোমাকে পেতেই হবে। তুমি যদি আমাকে জানাতে, হলেও হতে পারে যে এই সমস্ত কিছুই হল না। তুমি আমাদের সবার দোষী। তাই তোমার শাস্তি রাজদরবারে ঠিক হবে। এখন রাত্রিবেলা। তাই সকাল হলেই দরবারে বৈঠক বসবে। আর সেখানেই তোমার শাস্তি নির্ধারিত হবে।’
এই কথা শুনে রানী হৈমন্তী অবাক হলে বললেন— ‘দর্শনা মারা গেছে। কিন্তু এতে আমারও কম কষ্ট হচ্ছে না। তবে এইজন্য আমি কোনও শাস্তি মেনে নেব না যে, আমি আপনাকে কিছু জানায়নি বা জানতে চাইনি। আমি আপনাকে জানাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনি তখন পুত্র প্রেমে মজেছিলেন। আর আমার মনে হয়েছিল, আপনি বৈভবীর বশে ছিলেন। আমাকে তন্ত্রগুরুও তাই বলেছে। আর সেই কারণেই.........’
‘চুপ করো রানী চুপ করো। আমাকে বোকা বানানোর চেষ্টাও করো............’
তিনি যেমন রানী হৈমন্তীকে তাঁর কথা শেষ করতে দেননি, তেমন ওনার কথাও শেষ হওয়ার আগেই একজন বলে ওঠেন— ‘কিন্তু রানী হৈমন্তী যা যা বলছে সবটা সত্যি সবটা।’
অবাক হয়ে ওনারা দেখেন, রাজমাতা নিজের পায়ে হেঁটে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করছেন। রাজমাতাকে নিজের পায়ে হেঁটে আসতে দেখে রানী হৈমন্তী বললেন— ‘রাজমাতা……’ কিন্তু পরক্ষনেই চোখে জল চলে আসে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন— ‘দর্শনা, আমার বোন, আমার সখী……’ আবারও কিছু বলতে পারেন না। সেই একইরকম ভাবে কাঁদতে থাকেন। কান্নায় যেন ওনার গলা বুজে আসে।
রাজমাতা কিন্তু একটুও ভেঙে পড়েন না। সেই আগের মতই কঠিন স্বরে বললেন— ‘তুই কাঁদছিস কেন? শুধুমাত্র রাজা বা কোনও সৈনিক মানে, বলতে পারিস কোনও পুরুষ মানুষ যদি যুদ্ধে বীরগতি প্রাপ্ত হয়, তবেই আমরা গর্ববোধ করব। আর কোনও মেয়ে যদি যুদ্ধে না গিয়েও রাজ্যের ভালোর জন্য গোটা ব্রম্ভান্ডের ভালোর জন্য নিজের প্রাণ এমনভাবে দিয়ে দেয়, তাহলে গর্ববোধ করব না? আমি আমার মেয়ের জন্য গর্বিত। কিন্তু ততোধিক লজ্জিত আমাদের এই রাজামশাই-এর জন্য।’
এই কথা শুনেই রাজা বৃজেন্দ্র চমকে উঠে বললেন— ‘এটা কি বলছেন রাজমাতা? আর আমাকে এখানে রাজামশাই বলার তো কোন দরকার নেই। এখানে তো আমি আপনার ছেলে। তাই আমার নাম ধরেই.........’
‘ক্ষমা করবেন রাজামশাই। আমি এখানে আমার ছেলেকে দেখতে পাচ্ছি না।’
‘কিন্তু রাজমাতা আমি কি এমন করলাম? আমাকে তো কেউ কিছুই জানায়নি। আর আমি যখন কিছুই জানতাম না, তখন আমি কেমন করে কি করব? হৈম বা দর্শনা কেউ তো আমাকে কিছু জানায়নি।’
‘চুপ করুন রাজামশাই। আপনি একজন রাজা আর আপনি এটাই জানেন না যে, আপনার রাজমহলে ঠিক কী চলছে। তাহলে এত বড় রাজ্য আপনি কেমন করে চালাবেন? আসলে কি বলুন তো, আপনি একজন অযোগ্য রাজা। প্রথমে আপনি আপনার রানীর ভালোবাসা পেয়ে রাজ্যকে অবহেলা করলেন। সেই রানীর কথা শুনে সঠিক পথে এলেন। কিন্তু তারপরে এখন আবার পুত্র প্রেমে অন্ধ হয়ে রাজমহলকে অবহেলা করলেন। কিন্তু সেই আবার আপনাকে বাঁচাল কে? না, আপনার রানী আর আপনার ছোট বোন। আপনার থেকে তো রানী হৈমন্তী বেশি যোগ্য ওই রাজ সিংহাসনে বসার জন্য।’
আপনার মা মানে আমি, হঠাৎ করে সেই দিনই কেন এমন গুরুতর অসুস্থ হলাম, যেই দিন আমি বৈভবীকে তাড়ানোর কথা বলেছিলাম। একবারও জানার চেষ্টা করেছিলেন কেন? কিন্তু না, আপনি জানার চেষ্টা করেননি। বা সবথেকে ভালো কথা, আপনার মাথাতেই আসেনি যে, এর পেছনে অন্য কোনও কারণ থাকতে পারে। আপনার মাথায় তো সেই সমস্ত কিছু আসেনি, উল্টে আপনি আরও একটা কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। আপনি জানতেন যে, রাজমহলের সবাই চায় বৈভবীকে তাড়াতে। আমি যে নিয়মের কথা বলেছিলাম, সেই নিয়মের দ্বারা বৈভবী খুব সহজেই রাজমহল থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হবে। তাই আপনি কি করলেন, আপনি রানী হৈমন্তীকে তার দায়িত্ব কর্তব্যের দোহাই দিয়ে এটা বলিয়ে নেন যে, সে যেন আপত্তি করে। তার কারণ, একজনও যদি আপত্তি করত, তাহলে বৈভবীকে তাড়ানো যেত না। কিন্তু কি বলুন তো, আপনার এই চালটার কথা বৈভবী জানতো না। সে যাতে নিজে এই রাজবাড়িতে থাকতে পারে, তাই আমাকেই অকেজো করে দেয়। গোটা রাজমহল যার বিরুদ্ধে, আপনি তার পক্ষে ছিলেন। একবারও আপনার এটা মনে হয়নি যে, আপনি কিছু ভুল করছেন না তো? মানে সবাই ভুল আর আপনি একা ঠিক, সন্দেহ হয়নি আপনার মনে?’
‘কিন্তু আমি বৈভবীকে রাখতে চেয়েছিলাম হৈম যাতে মা হতে পারে তার জন্য। এই ছাড়া আর কিছু না। তবে একথা সত্যি যে, ওই বৈভবীই যে আপনাকে অসুস্থ করেছে তা কিন্তু আমি জানতাম না। আপনার কথামতো আমার মাথাতে আসেনি।’
‘সত্যিই এতটা বোকা রাজা আপনি? যদি হৈমন্তীকে ও মা হতে সাহায্যই করবে, তাহলে ও রানীর আশেপাশেও আসে না, তাকে নিয়ে কোনও রকম কোনও বিধি করায় না, তাকে কোন ঔষধি সেবন করতে দেয় না, তাকে কোন কিছু ধারণ করতে দেয় না, অথচ সে নাকি রানীকে সাহায্য করবে মা হতে। কি বোকা বোকা তাই না?’
রাজা বৃজেন্দ্র চুপ করে রইলেন। এই কথার কোনও জবাব ওনার কাছে নেই। আর এটাও সত্যি যে, নিজের প্রথম সন্তানকে পেয়ে তিনি বাকি সবকিছু ভুলে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাহলে হৈমন্তী মা হলেন কেমন করে? আর সেই কথাটা যেই রাজমাতাকে বললেন, ওমনি রাজমাতা মাথা নেড়ে বললেন— ‘যে বৈদ্যটা একদম শেষে এসেছিলেন, একটা কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, হৈমন্তী একমাত্র ভগবানের দয়াতেই মা হতে পারবে। আর দেখলি সেটাই হয়েছে। আসলে এমন সময় এমনভাবে ও গর্ভবতী হল, যাতে মনে হবে যে, হয়ত বৈভবীই সাহায্য করেছে। কিন্তু বাকি আর পাঁচটা সাধারণ মানুষ যেমন করে ভাববে, একজন রাজাও যদি সেই রকম ভাবেই ভাবে, তাহলে সাধারন মানুষ আর রাজার মধ্যে কি পার্থক্য রইল?’
এই কথাটা শুনে রাজা বৃজেন্দ্রর নিচু মাথাটা যেন আরও নিচু হয়ে গেল। রাজমাতা আরও কিছু বলতে যাবেন, এমন সময় তন্ত্রগুরুর ওখানে এসে বললেন— ‘দয়াকরে আপনারা চুপ করুন। কি হয়েছে তা নিয়ে না ভেবে, কি হতে চলেছে সেটা শুনুন।’
তন্ত্রগুরুর এমন কথা শুনে সবাই থতমত খেয়ে গেল।
তন্ত্রগুরু রানী হৈমন্তীর দিকে কোনও নজর না দিয়ে তিনি তাড়াতাড়ি নিজের পরবর্তী কাজটা করার চেষ্টা করেন। তিনি একটা মন্ত্রোচ্চারণের দ্বারা দর্শনা আর বৈভবীর আত্মাকে আলাদা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু হাতে বেশি সময় নেই। আর ওই মন্ত্রতে যখন ওদেরকে আলাদা করতে পারলেন না, তখন দুটো আত্মাকে একসঙ্গে বোতলে বন্দি করে ফেলেন। তারপর পরবর্তী প্রক্রিয়া করার জন্য দ্রুত ওখান থেকে চলে যান। আর যেতে যেতে বেদীতে লেখা সেই রক্তাক্ষর পড়ে যান।
রানী হৈমন্তীর সেই গগনবিদারী চিৎকারে তখন আকাশ বাতাস কেঁপে ওঠে। রাজমহলের প্রতিটি কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পড়ে সেই কান্না। রাত্রিবেলা হওয়ার জন্য সেই কান্না যেন আরও বেশি করে কম্পনের সৃষ্টি করছিল।
বৈভবী মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওর যে চারজন দাসী ছিল, তাদেরও মোহভঙ্গ হয়ে যায়। তারা তাদের নিজেদের রানীকে ওইভাবে কাঁদতে দেখে ওইখানে ছুটে আসে। একজন এসে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নেয়। রানী হৈমন্তী তখনও দর্শনার পার্থিব শরীরটাকে ধরে চিৎকার করে কেঁদেই চলেছেন। বাকিরা জোর করে রানী হৈমন্তীকে রাজমহলের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। ঠিক সেইসময় যতজনের কানে সেই কান্না গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল, তাদের প্রায় প্রত্যেকেই সেখানে এসে উপস্থিত হয়। রানীর ঐরকম রক্তমাখা আলুথালু বেশে আর সামনে দুটো মৃতদেহ দেখে সবাই হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। রাজা বৃজেন্দ্রকে দেখে ওনার বুকে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে রানী হৈমন্তী একসময় জ্ঞান হারান।
সঙ্গে সঙ্গে ধরাধরি করে ওনাকে ওনার কক্ষের ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয়। একদিকে রানী হৈমন্তীকে রাজবৈদ্য দেখাশোনা করছিল, অন্যদিকে দর্শনার শেষকৃত্যের আয়োজন চলছিল। ওইখানে থাকা প্রত্যেকেই এটা বিশ্বাস করতে পারছিল না যে, এই হাসিখুশি মেয়েটার হঠাৎ করে এইরকম কি করে হল...! আর তার পাশেই বৈভবীর মৃতদেহই বা পড়ে রয়েছে কেন? কি হয়েছিল ওখানে কেউ কিচ্ছু জানে না। আর সেই কারণেই সবাই যেন সেই মুহূর্তেই সবটা জানতে চাইছিল। কিন্তু সবটা জানার একটা মাত্রই উপায় ছিল। আর সেটা হল রানী হৈমন্তী। সবাই অপেক্ষা করছিল রানীর জ্ঞান ফেরার জন্য। রাজা বৃজেন্দ্র ভাবতেই পারছেন না যে, তিনি ওনার স্ত্রীকে সামলাবেন নাকি বোন চলে যাওয়ার শোক পালন করবেন। বৈভবীর মায়াজাল উনার উপরে ছিল বলে উনি রানী হৈমন্তীর থেকে অনেকটা দূরে সরে গিয়েছিলেন। কিন্তু বৈভবীর মৃত্যু হওয়াতে ওনার উপর থেকেও সেই মায়াজালটা সরে যায়। তাই এখন আবার তিনি নিজের স্ত্রীর প্রতি সেই একইরকম আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। কিন্তু বোনকে হারিয়ে ওনার অবস্থাও রানী হৈমন্তীর মতোই হয়ে গেছে।
রাজবৈদ্যের একটু চেষ্টাতেই রানী হৈমন্তীর জ্ঞান ফিরে আসে। আর জ্ঞান ফিরতেই তিনি কপাল কুঁচকে বলে ওঠেন— ‘দর্শনা...... দর্শনা...... তুমি কোথায়? এই দিকে এসো।’ বলতে বলতে কারোর কোনও বাধা না মেনেই কক্ষ থেকে বাইরে সামনে এগিয়ে যেতেই মৃত দর্শনাকে কাপড়ে মোড়া অবস্থায় দেখতে পান।
রাত্রিবেলা হলেও সারা রাজবাড়ি এখন বেশ আলোকিত হয়ে রয়েছে। দর্শনাকে এইরকম ভাবে চোখের সামনে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝতে পারেন যে, নাঃ এতক্ষণ তিনি কোনও স্বপ্ন দেখছিলেন না। সত্যি সত্যি ওনার সখী ওনার বোন ওনার বন্ধু দর্শনা এই দুনিয়া ত্যাগ করেছে। দর্শনা একাধারে ওনার বোন-সখী-ননদ সমস্ত কিছুই ছিল। এখানে আসার পরে সবার প্রথমে যার সঙ্গে সবার প্রথমে ওনার বন্ধুত্ব হয়েছিল, যে ছিল ওনার সুখ-দুঃখের সখী, সেই দর্শনা আজ মৃত। সবাইকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেকে বলি দিল। কোনদিনও মেয়েটা এই সমস্ত কিছু করতে চায়নি। কিন্তু যখন নিজের কানে শুনল যে, একটা সুযোগ আছে যাতে কিনা নিজেকে প্রমাণ করতে পারবে যে, শুধুমাত্র রূপচর্চা করেই ও সময় কাটায় না। ওর মধ্যেও রাজবংশের খুন রয়েছে। কিন্তু সেটাই যে ওর জীবনে কাল ডেকে আনবে, তা কে জানতো? নিজেকে প্রমাণ করার জন্য মেয়েটা এই কয়েকদিনের মধ্যে তরোয়াল চালানো শিখে ওইরকম একটা ভয়ংকর তন্ত্র সাধিকাকে শেষ করল। নিজেকে হঠাৎ করেই বড্ড ছোট মনে হল রানী হৈমন্তীর। বন্ধু বলে মনে করলেও ওনার থেকে বয়সে অনেক ছোট ছিল দর্শনা। আবারও কাঁদতে শুরু করেন। আর কাঁদতে কাঁদতেই মাটিতে ধপ করে বসে পড়েন। একটু পরে ওনার সামনে দিয়েই শেষ কৃত্য করার জন্য দর্শনাকে নিয়ে চলে গেল।
রাজবাড়িতে তখন কান্নার রোল। দর্শনা যে সবার প্রিয় পাত্রী ছিল। তার কারণ, মেয়েটা সব সময় হাসিখুশি থাকত। কারোর মনে দুঃখ হলে তাকে নাম হাসানো পর্যন্ত ও দম ফেলত না। আর সেই মেয়েটাই এইরকম নিরবে চলে গেল। কিন্তু কেন কী ভাবে কী হলো, তা কেউ জানে না। কিন্তু এখন রানী হৈমন্তীর জ্ঞান ফিরেছে। তাই সবাই সবটা জানার জন্য উৎসুক হয়ে রয়েছে।
কিছু দাসী এসে রানী হৈমন্তীকে নিয়ে গিয়ে ওনার কক্ষে বসালে, ওখানে একে একে প্রায় প্রত্যেকেই জড়ো হল। রাজা বৃজেন্দ্র বললেন— ‘আমরা সবাই সবটা জানতে চাই। কি হয়েছিল ওখানে?’
এমন সময় ওখানে তন্ত্রগুরু এসে বললেন— ‘রানীমা, আমার কাজ প্রায় শেষ। আমাকে শুধু এখন বৈভবীর সবথেকে প্রিয় কোনও জিনিস দিন। যাতে আমি ওর আত্মাকে বন্দী বানাব। ওকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হয়নি। বাকি সব কিছু একটু পরে খুলে বলছি। আগে ওর আত্মাকে বন্দী বানাই, তার পরে.........’
তন্ত্রগুরুকে দেখে সবাই আরও বেশী অবাক হয়ে যায়। রাজমহলের ভিতরে এইরকম একটা অজানা অচেনা লোক, যাকে দেখে খুব সহজেই একজন তান্ত্রিক বলে বুঝে নেওয়া যায়, সে কি করছিল? এ কে? কেন এসেছে? কিন্তু সবাই চুপ রইল। যেন অপেক্ষা করছিল রানী হৈমন্তীর কথা বলার জন্য। রাজা বৃজেন্দ্রও কোন প্রশ্ন করলেন না। যেন রানীকে একটু সময় দিতে চাইছিলেন।
এদিকে রানী হৈমন্তীও বুঝতে পারছিলেন না যে, বৈভবীর সব থেকে প্রিয় জিনিস কি হতে পারে। এমন সময় বৈভবীর সেবায় থাকা একজন দাসী বলল— ‘রানীমা, অনুমতি পেলে আমি কিছু বলব?’
রানী হৈমন্তী বললেন— ‘হ্যাঁ কী বলো?’
‘আমার মনে হয় বৈভবীর প্রিয় জিনিস হল গয়নার বাক্স।’
রাজা বৃজেন্দ্র একটু অবাক হয়ে বললেন— ‘গয়নার বাক্স...! গয়না ভালোবাসত জানি। কিন্তু গয়না ছেড়ে হঠাৎ করে গয়নার বাক্স কেন প্রিয়?’
‘আসলে রাজামশাই বৈভবীর গয়নার বাক্স কাঠের হলেও ওতে হীরে মণিমাণিক্য দিয়ে ও নিজের মনের মত করে সাজিয়ে ছিল। আর যত গয়না ওই বাক্সের মধ্যে রাখত।ওই বাক্সটাকে কখনও কাছ ছাড়া করতো না। এমনকি বিছানায় শুতে গেলেও সেই বাক্সটা নিজের সঙ্গে রাখত। আর ওই যে মন্দির গুলো আছে, যেখানে ও কিসব কাণ্ড-কারখানা করেছে, সেই সময়ও বাক্সটা কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে যেত। তাই আমার মনে হয়েছে ওটা নিশ্চয়ই ওর প্রিয় হবে। আর তাই.........’
দাসী পুরো কথাটা শেষ হওয়ার আগেই হাত ধুলে রানী হৈমন্তী তাকে থামিয়ে দেন। তারপর তন্ত্রগুরুর দিকে তাকালে, তিনি বলেন— ‘হ্যাঁ হ্যাঁ ওটাই হবে। কথা শুনেই বোঝা যাচ্ছে যে, ওই বাক্সটাকে বৈভবী খুব ভালোবাসতো।’
এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ওই দাসী দৌড়ে গিয়ে গয়নার বাক্সটা নিয়ে আসে। আর তন্ত্রগুরু সেই বাক্সটা নিয়ে আবার নিজ অবস্থানে ফিরে যান।
রাজা বৃজেন্দ্র বললেন— ‘এবার সবটা খুলে বলো। আমরা সবাই জানি যে, বৈভবী এক ভয়ঙ্কর তন্ত্র সাধিকা। তাই ওর দেহ সৎকারের আমরা কোনও ব্যবস্থা করিনি। সমস্ত কিছু জেনে রাজপুরোহিতের পরামর্শ মতোই সমস্ত কিছু করে তবেই যা করার করব। আর ওকে তোমরা কেন মারলে, সেটা না জেনে...........’ পুরো কথাটা শেষ না করেই রাজামশাই আবারও বললেন— ‘একটা মানুষকে যখন মেরেছ, তখন তার যথাযথ কারণ আছে বলেই আমার মনে হয়। তাছাড়া আমার বোনকে কে মারল? আর ওই বুড়ো মানুষটা কে? একে দেখে তো মনে হচ্ছে, একটা তান্ত্রিক। সে সেখানে এই রাজমহলে কেমন করে এলো? এতদিন কেন আমাদের সবার চোখে পড়েনি?’
রানী হৈমন্তী অত্যন্ত কষ্টের ভিতর ছিলেন। কিন্তু সবাই এত প্রশ্ন করছিল যে, তিনি আর চুপ থাকতে পারলেন না। বললেন— ‘রাজামশাই এখন এই মুহূর্তে যা যা জানতে চাইলেন, আমি জানি তা আপনাদের সবার মনের মধ্যেই রয়েছে। আপনারাও সবটা জানতে চান যে, কেমন করে কি হলো। আমি বলছি, শুরু থেকেই বলছি।’
এরপর রানী হৈমন্তীর সবাইকে সবটা খুলে বলেন। এই কাহিনী শোনার পরে প্রত্যেকে অবাক হয়ে গেলেও রাজা বৃজেন্দ্র বললেন— ‘এটা তুমি ভুল করেছো রানী।’
রাজা বৃজেন্দ্র রেগে গেলে রানী হৈমন্তীকে রানী বলে ডাকতেন। কিন্তু ওনার রাগ ঠিক কি কারণে, তা কেউ বুঝতে পারছিলেন না। রানী নিজেও বুঝতে পারলেন না। আর ওনার চোখ মুখ দেখে বৃজেন্দ্র বলে দিলেন কারণটা। বললেন— ‘বৈভবী দেখে মনে হয়নি যে, ও এতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে। যাইহোক...... তুমি আমাকে কেন একবারও বললে না সেই সব। এত কিছু ঘটে গেল। অথচ আমি রাজা হয়ে কিছু জানতে পারলাম না। আমার বোনকে তুমি তোমার এই কাজে নিযুক্ত করেছ। অথচ আমি জানি না। আজকে তোমার জন্য আমি আমার বোনকেও হারালাম। রানী এর শাস্তি তো তোমাকে পেতেই হবে। তুমি যদি আমাকে জানাতে, হলেও হতে পারে যে এই সমস্ত কিছুই হল না। তুমি আমাদের সবার দোষী। তাই তোমার শাস্তি রাজদরবারে ঠিক হবে। এখন রাত্রিবেলা। তাই সকাল হলেই দরবারে বৈঠক বসবে। আর সেখানেই তোমার শাস্তি নির্ধারিত হবে।’
এই কথা শুনে রানী হৈমন্তী অবাক হলে বললেন— ‘দর্শনা মারা গেছে। কিন্তু এতে আমারও কম কষ্ট হচ্ছে না। তবে এইজন্য আমি কোনও শাস্তি মেনে নেব না যে, আমি আপনাকে কিছু জানায়নি বা জানতে চাইনি। আমি আপনাকে জানাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনি তখন পুত্র প্রেমে মজেছিলেন। আর আমার মনে হয়েছিল, আপনি বৈভবীর বশে ছিলেন। আমাকে তন্ত্রগুরুও তাই বলেছে। আর সেই কারণেই.........’
‘চুপ করো রানী চুপ করো। আমাকে বোকা বানানোর চেষ্টাও করো............’
তিনি যেমন রানী হৈমন্তীকে তাঁর কথা শেষ করতে দেননি, তেমন ওনার কথাও শেষ হওয়ার আগেই একজন বলে ওঠেন— ‘কিন্তু রানী হৈমন্তী যা যা বলছে সবটা সত্যি সবটা।’
অবাক হয়ে ওনারা দেখেন, রাজমাতা নিজের পায়ে হেঁটে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করছেন। রাজমাতাকে নিজের পায়ে হেঁটে আসতে দেখে রানী হৈমন্তী বললেন— ‘রাজমাতা……’ কিন্তু পরক্ষনেই চোখে জল চলে আসে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন— ‘দর্শনা, আমার বোন, আমার সখী……’ আবারও কিছু বলতে পারেন না। সেই একইরকম ভাবে কাঁদতে থাকেন। কান্নায় যেন ওনার গলা বুজে আসে।
রাজমাতা কিন্তু একটুও ভেঙে পড়েন না। সেই আগের মতই কঠিন স্বরে বললেন— ‘তুই কাঁদছিস কেন? শুধুমাত্র রাজা বা কোনও সৈনিক মানে, বলতে পারিস কোনও পুরুষ মানুষ যদি যুদ্ধে বীরগতি প্রাপ্ত হয়, তবেই আমরা গর্ববোধ করব। আর কোনও মেয়ে যদি যুদ্ধে না গিয়েও রাজ্যের ভালোর জন্য গোটা ব্রম্ভান্ডের ভালোর জন্য নিজের প্রাণ এমনভাবে দিয়ে দেয়, তাহলে গর্ববোধ করব না? আমি আমার মেয়ের জন্য গর্বিত। কিন্তু ততোধিক লজ্জিত আমাদের এই রাজামশাই-এর জন্য।’
এই কথা শুনেই রাজা বৃজেন্দ্র চমকে উঠে বললেন— ‘এটা কি বলছেন রাজমাতা? আর আমাকে এখানে রাজামশাই বলার তো কোন দরকার নেই। এখানে তো আমি আপনার ছেলে। তাই আমার নাম ধরেই.........’
‘ক্ষমা করবেন রাজামশাই। আমি এখানে আমার ছেলেকে দেখতে পাচ্ছি না।’
‘কিন্তু রাজমাতা আমি কি এমন করলাম? আমাকে তো কেউ কিছুই জানায়নি। আর আমি যখন কিছুই জানতাম না, তখন আমি কেমন করে কি করব? হৈম বা দর্শনা কেউ তো আমাকে কিছু জানায়নি।’
‘চুপ করুন রাজামশাই। আপনি একজন রাজা আর আপনি এটাই জানেন না যে, আপনার রাজমহলে ঠিক কী চলছে। তাহলে এত বড় রাজ্য আপনি কেমন করে চালাবেন? আসলে কি বলুন তো, আপনি একজন অযোগ্য রাজা। প্রথমে আপনি আপনার রানীর ভালোবাসা পেয়ে রাজ্যকে অবহেলা করলেন। সেই রানীর কথা শুনে সঠিক পথে এলেন। কিন্তু তারপরে এখন আবার পুত্র প্রেমে অন্ধ হয়ে রাজমহলকে অবহেলা করলেন। কিন্তু সেই আবার আপনাকে বাঁচাল কে? না, আপনার রানী আর আপনার ছোট বোন। আপনার থেকে তো রানী হৈমন্তী বেশি যোগ্য ওই রাজ সিংহাসনে বসার জন্য।’
আপনার মা মানে আমি, হঠাৎ করে সেই দিনই কেন এমন গুরুতর অসুস্থ হলাম, যেই দিন আমি বৈভবীকে তাড়ানোর কথা বলেছিলাম। একবারও জানার চেষ্টা করেছিলেন কেন? কিন্তু না, আপনি জানার চেষ্টা করেননি। বা সবথেকে ভালো কথা, আপনার মাথাতেই আসেনি যে, এর পেছনে অন্য কোনও কারণ থাকতে পারে। আপনার মাথায় তো সেই সমস্ত কিছু আসেনি, উল্টে আপনি আরও একটা কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। আপনি জানতেন যে, রাজমহলের সবাই চায় বৈভবীকে তাড়াতে। আমি যে নিয়মের কথা বলেছিলাম, সেই নিয়মের দ্বারা বৈভবী খুব সহজেই রাজমহল থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হবে। তাই আপনি কি করলেন, আপনি রানী হৈমন্তীকে তার দায়িত্ব কর্তব্যের দোহাই দিয়ে এটা বলিয়ে নেন যে, সে যেন আপত্তি করে। তার কারণ, একজনও যদি আপত্তি করত, তাহলে বৈভবীকে তাড়ানো যেত না। কিন্তু কি বলুন তো, আপনার এই চালটার কথা বৈভবী জানতো না। সে যাতে নিজে এই রাজবাড়িতে থাকতে পারে, তাই আমাকেই অকেজো করে দেয়। গোটা রাজমহল যার বিরুদ্ধে, আপনি তার পক্ষে ছিলেন। একবারও আপনার এটা মনে হয়নি যে, আপনি কিছু ভুল করছেন না তো? মানে সবাই ভুল আর আপনি একা ঠিক, সন্দেহ হয়নি আপনার মনে?’
‘কিন্তু আমি বৈভবীকে রাখতে চেয়েছিলাম হৈম যাতে মা হতে পারে তার জন্য। এই ছাড়া আর কিছু না। তবে একথা সত্যি যে, ওই বৈভবীই যে আপনাকে অসুস্থ করেছে তা কিন্তু আমি জানতাম না। আপনার কথামতো আমার মাথাতে আসেনি।’
‘সত্যিই এতটা বোকা রাজা আপনি? যদি হৈমন্তীকে ও মা হতে সাহায্যই করবে, তাহলে ও রানীর আশেপাশেও আসে না, তাকে নিয়ে কোনও রকম কোনও বিধি করায় না, তাকে কোন ঔষধি সেবন করতে দেয় না, তাকে কোন কিছু ধারণ করতে দেয় না, অথচ সে নাকি রানীকে সাহায্য করবে মা হতে। কি বোকা বোকা তাই না?’
রাজা বৃজেন্দ্র চুপ করে রইলেন। এই কথার কোনও জবাব ওনার কাছে নেই। আর এটাও সত্যি যে, নিজের প্রথম সন্তানকে পেয়ে তিনি বাকি সবকিছু ভুলে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাহলে হৈমন্তী মা হলেন কেমন করে? আর সেই কথাটা যেই রাজমাতাকে বললেন, ওমনি রাজমাতা মাথা নেড়ে বললেন— ‘যে বৈদ্যটা একদম শেষে এসেছিলেন, একটা কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, হৈমন্তী একমাত্র ভগবানের দয়াতেই মা হতে পারবে। আর দেখলি সেটাই হয়েছে। আসলে এমন সময় এমনভাবে ও গর্ভবতী হল, যাতে মনে হবে যে, হয়ত বৈভবীই সাহায্য করেছে। কিন্তু বাকি আর পাঁচটা সাধারণ মানুষ যেমন করে ভাববে, একজন রাজাও যদি সেই রকম ভাবেই ভাবে, তাহলে সাধারন মানুষ আর রাজার মধ্যে কি পার্থক্য রইল?’
এই কথাটা শুনে রাজা বৃজেন্দ্রর নিচু মাথাটা যেন আরও নিচু হয়ে গেল। রাজমাতা আরও কিছু বলতে যাবেন, এমন সময় তন্ত্রগুরুর ওখানে এসে বললেন— ‘দয়াকরে আপনারা চুপ করুন। কি হয়েছে তা নিয়ে না ভেবে, কি হতে চলেছে সেটা শুনুন।’
তন্ত্রগুরুর এমন কথা শুনে সবাই থতমত খেয়ে গেল।
দর্শনার মৃত্যুতে সবাই দুঃখিত ছিল। এবার তন্ত্রগুরুর কথায় সবাই ভীত হয়ে গেল। রানী হৈমন্তী বললেন— ‘আপনার কথার মানে বুঝলাম না বাবা।’
তন্ত্রগুরু বললেন— ‘আসলে রাজকুমারী এক আঘাতে বৈভবীকে শেষ করতে পারেননি। তাই ওই চন্দ্রের আলোতে বৈভবীর আত্মা মুক্তি পায়নি। উল্টে ওর আত্মা ওর দেহ ত্যাগ করার পরে, যে তাকে মেরেছে তাকে সঙ্গে সঙ্গে শেষ করে দেয়। আর তারপর রাজকুমারীর আত্মার সঙ্গে মিশে যায়। বৈভবীর আত্মা এক শক্তিশালী তন্ত্র সাধিকার অতৃপ্ত আত্মা আর রাজকুমারীর আত্মা এক শুভ আত্মা। এবার স্বাভাবিক ভাবেই বৈভবীর আত্মাই বেশি শক্তিশালী। আমি দুটো আত্মাকে বোতলে বন্দি করে নিয়ে পরবর্তী বিধি করতে বসি। কিন্তু হাজার রকম ভাবে চেষ্টা করেও আমি ওই দুটো আত্মাকে আলাদা করতে পারিনি। তাই বৈভবীর সঙ্গে সঙ্গে রাজকুমারীর আত্মাও মুক্তি পায়নি। বাধ্যগত দুটো আত্মাকেই আমি বৈভবী গয়নার বাক্সে বন্দী করে ফেলেছি। আর সেটাকে আমি এমন জায়গায় এরপর রেখে দেব, যাতে কেউ কোনদিনও সেই গয়নার বাক্সের খোঁজ না পায়। তবে.........’
এমন সময় রানী হৈমন্তী বললেন— ‘কিন্তু বৈভবীর আত্মাকে আপনি মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করলেন না কেন? তাহলে তো দর্শনার আত্মাও মুক্তি পেয়ে যেত।’
‘না রানিমা, শুভ আর অশুভ দুটো আত্মারই মুক্তির পদ্ধতি আলাদা। তাই একটা বিধির দ্বারা দু'রকমের আত্মাকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব নয়। আমি নিশ্চিত যে, এই কারণটিই জন্যই বৈভবীর আত্মা রাজকুমারীর আত্মাকে নিজের কব্জায় রেখেছে। আজ না হোক হাজার বছর পরে হলেও ও যেন নিজের প্রতিশোধ নিতে পারে।’
‘আপনি এই ব্যাপারে নিশ্চিত কেমন করে বললেন?’
‘বৈভবীর আত্মা আমাকে দেখেই বুঝে গিয়েছিল হয়তো যে, আমি ঠিক কি করতে পারি। যতই হোক আমি তো ওর তন্ত্রগুরু। তাই আমার শক্তি সম্বন্ধে ওর কিছু ধারনা তো থাকবেই। অবশ্য সত্যি কথা বলতে, আমাকে না দেখলেও ও বুঝতে পারত। কারণ ওকে যে, ওই সময়ে মারা যেতে পারে, তা আমার পক্ষেই জানা সম্ভব। যাইহোক...... রাজকুমারী ওকে মারার পরে, ওর আত্মাকে মুক্তি দেওয়ার সময় কিছু মন্ত্র পড়তে হতো। আমি তাই রাজকুমারী ওই বেদীতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সামনের দিকে এগিয়ে যাই। রানীমা এটা আপনি লক্ষ্য করে থাকবেন। কিন্তু ওই যে ভুল হয়ে গেল। তাই আমাদের সব পরিকল্পনা জলে গেল। তখন বৈভবীর আত্মা আমাকে দেখে রক্তের দ্বারা কিছু লিখে যায়। ওই বেদীটাতেই লিখেছিল সেই কথাগুলো।’
‘কি লেখা ছিল…?’ এবারে প্রশ্ন করলেন রাজমাতা।
‘ওতে লেখা ছিল-------
এত সহজ নয় আমাকে মুক্তি দেওয়া। আমি বন্দি অবস্থায় থাকব। আমি আমার বংশের হাত ধরেই আমার অপূর্ণ কাজ শেষ করব। তাতে যদি যুগের পর যুগ অপেক্ষা করতে হয়, তাই করব। আর রাজপরিবারের কোন সদস্যই দেবে আমাকে মুক্তি............।
আরও কিছু লেখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তা খুবই অস্পষ্ট। রাজকুমারীর যা বয়স সেই বয়সের মধ্যেই আপনাদের বংশের সমস্ত মেয়েদেরকে বিয়ে দিতে হবে। যতদিন আপনাদের বংশে কন্যাসন্তান জন্ম নেবে, ততো দিন হয় জন্মের সাথে সাথে তাকে মেরে ফেলবেন, নয়তো এই বয়সের আগেই বিয়ে দিয়ে দেবেন। আর বৈভবীর কথামতো ওর বংশের হাত ধরে ওর অপূর্ণ কাজ শেষ করবে। তাই ওর সন্তানকে............’
তন্ত্রগুরুর কথা শেষ হওয়ার আগেই রাজা বৃজেন্দ্র বললেন— ‘আপনার কথা মত বাচ্চাটাকে এক্ষুনি শেষ করে দেওয়া উচিত। ঠিক আছে তাহলে তাই হবে। ওই সন্তানের জন্ম দেওয়াটাই একটা ভুল ছিল। ওই সন্তানের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই রাজপরিবারের উপরে এত বড় বিপদ নেমে এসেছে। আমার রাজ্যের এতগুলো মানুষের প্রাণ গেছে। তাই ওই বাচ্চাটার বেঁচে থাকার সত্যিই কোনও অধিকার নেই।’
এই কথা শুনেই রানী হৈমন্তী চিৎকার করে বললেন— ‘না……আ………আ, একটা শিশুকে আমি কিছুতেই শেষ হতে দেব না। শিশুহত্যা যে পাপ। মানছি ওর মায়ের জন্য এত বড় সর্বনাশ হয়েছে। কিন্তু তার জন্য বাচ্চাটার কি দোষ?’
তন্ত্রগুরু বললেন— ‘কিন্তু রানীমা ,রাজামশাই ঠিক কথাই বলেছেন। এছাড়া আর কোনও উপায় নেই। এই বাচ্চাটা শেষ হয়ে গেলে যদি বৈভবীর আত্মা ভবিষ্যতে মুক্তি পেয়েও যায়, তাহলেও তেমন ভয়ের কিছু থাকবে না।’
‘না বাবা আপনি আপনার নিজের কথাই ভুলে গেলেন। আপনি বলেছিলেন, দর্শনার যা বয়স, সেই বয়সের মধ্যে যদি রাজপরিবারের সব মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়,তাহলে বৈভবীর আত্মা বাক্স থেকে মুক্তি পাবে না। তাই আমি আমাদের এই রাজবংশে যুগের পর যুগ এই নিয়ম পালন করার হুকুম দিয়ে যাব।’
‘আর যদি এমন একটা সময় আসে, যেখানে এমন কেউ চলে আসে যে, আপনার এই হুকুম মানবে না, নির্দিষ্ট বয়স পেরিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও কোনও মেয়ে যদি অবিবাহিত থেকে যায়?’
‘তাহলে তার জন্য আপনি এমন কিছু ব্যবস্থা করে যান। বৈভবীর মত মহা তান্ত্রিককে তো আপনি জন্ম দিয়েছেন। তাহলে তাকে ধ্বংস করার উপায় আপনাকেই বের করতে হবে। আর যা ইচ্ছা তাই করুন। কিন্তু শিশু হত্যা আমি করতে দেবো না।’
‘আচ্ছা বেশ আমাকে দশটা দিন সময় দিন। কিন্তু আমি আপনাকে কথা দিতে পারছি না যে, আদৌ অন্য কোনও উপায় পাওয়া যাবে কিনা। আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি মাত্র।’
রানী হৈমন্তী হুকুম পেয়ে তন্ত্রগুরু আবার সেই কক্ষে ফিরে যান। রাজা বৃজেন্দ্র কিছু বলার আগেই রাজমাতা বললেন— ‘রাজামশাই এবার থেকে আপনি সিংহাসনে বসলেও রাজ্য চলবে রানী হৈমন্তীর কথাতে।’
সঙ্গে সঙ্গে রাজা বৃজেন্দ্র প্রতিবাদ করে ওঠেন।– ‘অসম্ভব...... আমি একজন নারীর হাতের পুতুল হতে পারব না।’
রানী হৈমন্তী বললেন— ‘আমার সেই ইচ্ছাও নেই যে,আপনাকে আমি আমার হাতের পুতুল করব। যদি ইচ্ছে থাকতো, তাহলে আমার ভালবাসায় যখন আপনি রাজপাট ভুলতে বসেছিলেন, তখন আবার আপনাকে বাধ্য করতাম না সেই আগের মতো পুনরায় একজন ভালো রাজা হওয়ার জন্য। আপনার রাজ্য আপনারই থাকবে। রাজমাতা চাইলেও আমি তার কথার মান রাখতে পারব না। রাজমাতা, আপনার কথা না মানার জন্য আপনি আমাকে যা শাস্তি দেবেন আমি তা মাথা পেতে নেব। শুধু একটা কথা রাজামশাই... ভবিষ্যতে আর কারোর ভালোবাসায় এমন অন্ধ হয়ে যাবেন না, দয়া করে।’
তখনকার মতো সবকিছু শান্ত হয়ে যায়। সবাই যে যার কক্ষে চলে যায়। রাজমাতা মুখে এমন কথা বললেও নিজের সন্তান হারানোর কষ্ট তো ছিলই। রাজা রানীর বাকি আর সমস্ত সদস্যের মনেই কষ্ট ছিল। কিন্তু রাজা বৃজেন্দ্র ঠিক করেন, অনেক হয়েছে। বারবার তিনি এই অপবাদ দিতে পারবেন না যে, আগের মত আর যোগ্য রাজা তিনি নেই। এবার তুমি খুঁজে দেখবেন যে, বৈভবীর কথামতো ও নিজেই কাঁকিনগরে এসেছিল, নাকি অন্য কোন কাহিনী রয়েছে এর পিছনে। হঠাৎ করে এরকম এক ভয়ঙ্কর তন্ত্র সাধিকা এখানে এলো কেমন করে?
দেখতে দেখতে দশটা দিন পেরিয়ে যায়।
রানী হৈমন্তী মনে-প্রাণে চাইছিলেন যে, তন্ত্রগুরু যেন একটা কোনও উপায় পেয়ে যান। তার একটা কারণ তো অবশ্যই ছিল। শিশু হত্যা করা যাবে না। কিন্তু এই দিনে আরও একটা কারণ এসে উপস্থিত হয়েছে। সেটা হল রানী হৈমন্তীর এই বাচ্চাটার উপরে মায়া। এই দশদিন তিনি নিজের সন্তানের মতো করেই ওই বাচ্চাটাকে প্রতিফলন করেছেন। তাই.........
দশ দিনের মধ্যেই রাজা বৃজেন্দ্র খুঁজে পেয়েছেন আসল কারণটা। মানে, বৈভবীর আগমনের পিছনে আসল কারণ কি ছিল। রাজার সঙ্গে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, তারাই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য, কাঁকিনগরের সর্বনাশ করার জন্য, ওই ভৈরবীকে নিযুক্ত করেছিল। মনে আছে নিশ্চয়ই কারা... রাজার সেই মন্ত্রী আর রাজার দুই ভাই। একজন সৎ ভাই আরেকজন খুড়তুতো ভাই। কিন্তু ধরা পড়ার পরে তারা জানায় যে, তারা নাকি বৈভবীর যে এইটা আসল উদ্দেশ্য ছিল, তা তারা বুঝতে পারেনি। তারা শুধুমাত্র চেয়েছিল রাজার উপরে একটু মাত্র প্রতিশোধ নিতে। কিন্তু এত বড় ভয়ঙ্কর ঘটনা যে ঘটে যাবে, তা তারা বুঝতে পারেনি।
কিন্তু রাজা বৃজেন্দ্র আর কোনও সহানুভূতি দেখাননি। তিনি আগেই বলেছিলেন যে, এটাই ওদের কাছে শেষ সুযোগ। আর সেই কারণেই নিজের কথা রাখার জন্য আর নিজেকে একজন যোগ্য রাজা প্রমাণ করার জন্য, তোপের মুখে বসিয়ে ওই তিনজনকে শেষ করার হুকুম দেন। এতটা নির্দয় হওয়ার পিছনে আরও একটা কারন ছিল। সেটা হল, সবাই ওনার নরম ব্যবহারকে এমন কটাক্ষ করেছে যে, এই মাত্র দশ দিনেই তিনি এইরকম একটা মানুষের পরিণত হয়েছেন। আর তিনি যে যেকোন সময় ভয়ঙ্কর হতে পারেন, তা এই তিনজনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া দেখে সবাই বুঝে যায়।
যাইহোক দশ দিনের দিন সন্ধ্যাবেলা তন্ত্রগুরু ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসেন। এই দশদিন তিনি কারও সঙ্গে দেখা করেননি। কোন কিছু খাননি।
রাজমহলের সমস্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের এক জায়গায় জড়ো করে তিনি বলতে শুরু করেন।– ‘রানীমা আর রাজকুমারী অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে বৈভবীর মত একজন মহাশক্তিশালী তান্ত্রিকের বিনাশ ঘটিয়েছেন। ওনাদেরকে ছাড়া আমি কখনোই কিছু করতে পারতাম না। তাই রানীমার আদেশ মতোই শিশুহত্যা না করেও কেমন করে কি করা সম্ভব, তা খোঁজার চেষ্টা করি। উপায় পাই। কিন্তু সে অত্যন্ত কঠিন। কয়েকটা উপায় বলব। এই উপায়ে মানতে না পারলে,ওই শিশুটিকে হত্যা করতেই হবে। সবার ভালোর জন্য এটা করতেই হবে। তা না হলে কিন্তু রাজকুমারীর এই আত্ম বলিদান ব্যর্থ হবে।’
তন্ত্রগুরু চুপ করতেই রানী হৈমন্তী বললেন— ‘যত কঠিনই হোক না কেন,আমরা সব পালন করব। আপনি শুধু বলুন।’
রাজা সহ সবাই বললেন— ‘হ্যাঁ যদি কোনও উপায় থাকে, তাহলে শুধু শুধু বাচ্চাটাকে মেরে কোন কাজ নেই। ওর তো সত্যিই কোনও দোষ নেই।’ আসলে বাইরে থেকে যতই রাজা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করুন না কেন, ওই বাচ্চাটার আসলে ওনারই সন্তান ছিল। তাই সেই মুহূর্তে রাগের মাথায় বাচ্চাটাকে শেষ করে দেওয়ার কথা বললেও, যখন উপায় আছে শুনলেন, তখন তিনিও একটু নরম হয়ে গেলেন।
তন্ত্রগুরু বললেন যে, ‘আপনারা সবাই যখন রাজি হয়েছেন, তখন আমার আর বলতে কোনও আপত্তি নেই। আমি যেমন বলেছিলাম যে, আপনাদের বংশের মেয়েদের রাজকুমারীর বয়সের মধ্যে বিয়ে দিতে হবে, সেই নিয়ম কিন্তু মেনে যেতেই হবে। যতদিন সিংহ রায় রাজপরিবার থাকবে, ততদিন এই নিয়ম চলবে। যদি কেউ অবিবাহিত থেকে যায়, তাহলে যে বাঁধনে আমি বৈভবীর আত্মাকে বেঁধেছি, তা আলগা হয়ে যাবে। এর প্রধান কারণ, ও রাজকুমারী আত্মাকে নিজের কব্জায় রেখেছে। আর রাজকুমারী অবিবাহিত ছিলেন।’
রাজমাতা বললেন— ‘কিন্তু বাবা, আমার মেয়ে অবিবাহিত থাকার সঙ্গে আমাদের বংশের মেয়েদের ওর বয়সের আগেই বিয়ে দিয়ে দেওয়ার কি সম্পর্ক?’
‘সম্পর্ক আছে রাজমাতা। আমি সেইদিন বলিনি। আজকে বলছি। কোনও মানুষ মারা গেলে, তার আত্মা শুভ নাকি অশুভ তা বিচার হয় জীবিত কালে তার করা সমস্ত কাজের দ্বারা। কিন্তু সে অশুভ বা শুভ যে আত্মাই হোক না কেন, যদি সে মনের মধ্যে এমন কোনও আকাঙ্ক্ষা যা কিনা বেঁচে থাকা অবস্থায় তীব্র ছিল, সেই আশা পূর্ণ না করেই এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যায়, তখন সেই মানুষটার মৃত্যুর পরে তার সেই অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে উদ্যত হয়। আর সেই আশা পূর্ণ করার চাহিদাও হয় অত্যন্ত তীব্র। আপনারা জানেন কিনা আমি জানি না। আসলে রাজকুমারীর ভিতরে একটা আশা ছিল। তিনি অনেক ছোট থেকেই চাইতেন একজন রাজকুমারকে বিয়ে করে সুখে ঘর সংসার করতে। তাই তিনি পুতুলের বিয়ে দেওয়ার খেলাই বেশি খেলতেন। নিজেকে সুন্দর রাখার জন্য নানারকম রূপচর্চা করতেন। তিনি যুদ্ধ করার কোনও কলা কৌশল রপ্ত করেনি যাতে, ওনার শরীরে কোনও আঘাতের চিহ্ন থেকে না যায়। ওনার রূপ নষ্ট না হয়ে যায়। সেই জন্য তিনি রোদেও খুব একটা বেরোতেন না। সেই রাজকুমারী বৈভবীকে মারার জন্য রাজি হয়েছিলেন যাতে,নিজেকে সবার সামনে প্রমাণ করতে পারেন যে, তিনি বড় হয়েছেন। এখন বিয়ে দেওয়া যেতে পারে। আর তিনি নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন সেই ক্ষমতা ওনার রয়েছে। কিন্তু মুহূর্তের ভুলের জন্য সমস্ত কিছু উল্টোপাল্টা হয়ে যায়। আর তার সেই অপূর্ণ ইচ্ছাকে মনের মধ্যে নিয়েই এই দুনিয়া ত্যাগ করতে হয়।
রাজকুমারীর মৃত্যুর পরে ওনার সেই চাহিদা আরও বেড়েছে। ওনার বয়সী কোন মেয়ে অবিবাহিত থাকলে ওনার আত্মা কোনও রকম কোনও প্রতিক্রিয়া জানাবে না। কিন্তু যদি ওনার বয়স অতিক্রম করা কোন মেয়ে অবিবাহিত থেকে যায়, তাহলে তার ভিতরে প্রবেশ করে সে নিজের ইচ্ছা পূর্ণ করতে চাইবেন। আর সেই কারণেই আমার বন্ধন ছেড়ে বেরোনোর চেষ্টা করবেন। আর তাতেই হবে বিপত্তি। আমার বন্ধন কেটে রাজকুমারী বেরিয়ে আসতে চাইলেও বেরোতে পারবে না। কারণ ওর সঙ্গে তখন রয়েছে বৈভবীর আত্মা।
কিন্তু ওই যে বন্ধন আলগা হয়ে গেল, সেই আলগা পথ দিয়েই বৈভবীর আত্মা এই রাজবংশের সব থেকে দুর্বল মানুষকে বারবার ওর ওই গয়নার বাক্সের কাছে ডাকবে। কারণ, আমি যে মন্ত্রে ঐ বাক্সকে বন্ধ করেছি, আর ওরা আত্মাকে আটকে রেখেছি, সেই মন্ত্র নষ্ট করতে হলে ওর এই রাজবংশের কোন মানুষকে দরকার। যে শুধু ওই বাক্স খুলবেই না, বাক্সে রাখা সবকটা গয়না নিজের গায়ে পরবে। যদি এমন হয়, তাহলে দুজনের আত্মাই কিন্তু বাইরে বেরিয়ে আসবে।
আর এতদিন একটা অশুভ আত্মা সঙ্গে থেকে রাজকুমারীর আত্মাও অশুভ হয়ে যেতে পারে। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি না যে, অশুভ হবেই। কিন্তু অশুভ হয়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা থেকেই যায়। তখন ওই দুই আত্মা মিলে কি করবে, তা এখন আমি বলতে পারছি না।
এবার ধরুন ভবিষ্যতে যদি এমন হয় যে, আপনাদের বংশের কোনও মেয়ে অবিবাহিত থেকে গেল। আর নানা রকম ছল করে তার হাত ধরেই হোক বা বাড়ির আর অন্য কোনও সদস্যের হাত ধরেই হোক, সে মুক্তি পেয়ে গেল। তখন ও কিন্তু এই অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণ করবে। মানে, আবার শুরু হবে মৃত্যুর খেলা। আর সফল হয়ে গেলে কি হবে তা, আমার আর বলার দরকার নেই। যে বিপদ আটকাতে রাজকুমারী আজ আত্ম বলিদান দিয়েছেন, আপনারা এত বড় একটা বলিদান দিতে চলেছেন, সেই বিপদ তখন হবে। কিন্তু বৈভবীর কথা মত ও ওর নিজের বংশের হাত ধরেই এই অপূর্ব ইচ্ছা পূর্ণ করবে। আর ওর বংশ বলতে শুধুমাত্র এই বাচ্চাটা। কিন্তু এই বাচ্চাটা বড় হলে বিয়ে করবে। তার সন্তান হবে। সেই সন্তান বড় হয়ে বিয়ে করবে। এমন করে অনেক বড় বংশ হয়ে যাবে ওর। আর আত্মা মিথ্যা কথা বলে না। তাই বৈভবী ওর বংশের কাউকে না পেলে, এই প্রক্রিয়া দ্বিতীয়বার করবে না। তখন ওরা আত্মাকে মুক্তি দেওয়া অনেক সহজ হবে।’
তন্ত্রগুরু বললেন— ‘আসলে রাজকুমারী এক আঘাতে বৈভবীকে শেষ করতে পারেননি। তাই ওই চন্দ্রের আলোতে বৈভবীর আত্মা মুক্তি পায়নি। উল্টে ওর আত্মা ওর দেহ ত্যাগ করার পরে, যে তাকে মেরেছে তাকে সঙ্গে সঙ্গে শেষ করে দেয়। আর তারপর রাজকুমারীর আত্মার সঙ্গে মিশে যায়। বৈভবীর আত্মা এক শক্তিশালী তন্ত্র সাধিকার অতৃপ্ত আত্মা আর রাজকুমারীর আত্মা এক শুভ আত্মা। এবার স্বাভাবিক ভাবেই বৈভবীর আত্মাই বেশি শক্তিশালী। আমি দুটো আত্মাকে বোতলে বন্দি করে নিয়ে পরবর্তী বিধি করতে বসি। কিন্তু হাজার রকম ভাবে চেষ্টা করেও আমি ওই দুটো আত্মাকে আলাদা করতে পারিনি। তাই বৈভবীর সঙ্গে সঙ্গে রাজকুমারীর আত্মাও মুক্তি পায়নি। বাধ্যগত দুটো আত্মাকেই আমি বৈভবী গয়নার বাক্সে বন্দী করে ফেলেছি। আর সেটাকে আমি এমন জায়গায় এরপর রেখে দেব, যাতে কেউ কোনদিনও সেই গয়নার বাক্সের খোঁজ না পায়। তবে.........’
এমন সময় রানী হৈমন্তী বললেন— ‘কিন্তু বৈভবীর আত্মাকে আপনি মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করলেন না কেন? তাহলে তো দর্শনার আত্মাও মুক্তি পেয়ে যেত।’
‘না রানিমা, শুভ আর অশুভ দুটো আত্মারই মুক্তির পদ্ধতি আলাদা। তাই একটা বিধির দ্বারা দু'রকমের আত্মাকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব নয়। আমি নিশ্চিত যে, এই কারণটিই জন্যই বৈভবীর আত্মা রাজকুমারীর আত্মাকে নিজের কব্জায় রেখেছে। আজ না হোক হাজার বছর পরে হলেও ও যেন নিজের প্রতিশোধ নিতে পারে।’
‘আপনি এই ব্যাপারে নিশ্চিত কেমন করে বললেন?’
‘বৈভবীর আত্মা আমাকে দেখেই বুঝে গিয়েছিল হয়তো যে, আমি ঠিক কি করতে পারি। যতই হোক আমি তো ওর তন্ত্রগুরু। তাই আমার শক্তি সম্বন্ধে ওর কিছু ধারনা তো থাকবেই। অবশ্য সত্যি কথা বলতে, আমাকে না দেখলেও ও বুঝতে পারত। কারণ ওকে যে, ওই সময়ে মারা যেতে পারে, তা আমার পক্ষেই জানা সম্ভব। যাইহোক...... রাজকুমারী ওকে মারার পরে, ওর আত্মাকে মুক্তি দেওয়ার সময় কিছু মন্ত্র পড়তে হতো। আমি তাই রাজকুমারী ওই বেদীতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সামনের দিকে এগিয়ে যাই। রানীমা এটা আপনি লক্ষ্য করে থাকবেন। কিন্তু ওই যে ভুল হয়ে গেল। তাই আমাদের সব পরিকল্পনা জলে গেল। তখন বৈভবীর আত্মা আমাকে দেখে রক্তের দ্বারা কিছু লিখে যায়। ওই বেদীটাতেই লিখেছিল সেই কথাগুলো।’
‘কি লেখা ছিল…?’ এবারে প্রশ্ন করলেন রাজমাতা।
‘ওতে লেখা ছিল-------
এত সহজ নয় আমাকে মুক্তি দেওয়া। আমি বন্দি অবস্থায় থাকব। আমি আমার বংশের হাত ধরেই আমার অপূর্ণ কাজ শেষ করব। তাতে যদি যুগের পর যুগ অপেক্ষা করতে হয়, তাই করব। আর রাজপরিবারের কোন সদস্যই দেবে আমাকে মুক্তি............।
আরও কিছু লেখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তা খুবই অস্পষ্ট। রাজকুমারীর যা বয়স সেই বয়সের মধ্যেই আপনাদের বংশের সমস্ত মেয়েদেরকে বিয়ে দিতে হবে। যতদিন আপনাদের বংশে কন্যাসন্তান জন্ম নেবে, ততো দিন হয় জন্মের সাথে সাথে তাকে মেরে ফেলবেন, নয়তো এই বয়সের আগেই বিয়ে দিয়ে দেবেন। আর বৈভবীর কথামতো ওর বংশের হাত ধরে ওর অপূর্ণ কাজ শেষ করবে। তাই ওর সন্তানকে............’
তন্ত্রগুরুর কথা শেষ হওয়ার আগেই রাজা বৃজেন্দ্র বললেন— ‘আপনার কথা মত বাচ্চাটাকে এক্ষুনি শেষ করে দেওয়া উচিত। ঠিক আছে তাহলে তাই হবে। ওই সন্তানের জন্ম দেওয়াটাই একটা ভুল ছিল। ওই সন্তানের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই রাজপরিবারের উপরে এত বড় বিপদ নেমে এসেছে। আমার রাজ্যের এতগুলো মানুষের প্রাণ গেছে। তাই ওই বাচ্চাটার বেঁচে থাকার সত্যিই কোনও অধিকার নেই।’
এই কথা শুনেই রানী হৈমন্তী চিৎকার করে বললেন— ‘না……আ………আ, একটা শিশুকে আমি কিছুতেই শেষ হতে দেব না। শিশুহত্যা যে পাপ। মানছি ওর মায়ের জন্য এত বড় সর্বনাশ হয়েছে। কিন্তু তার জন্য বাচ্চাটার কি দোষ?’
তন্ত্রগুরু বললেন— ‘কিন্তু রানীমা ,রাজামশাই ঠিক কথাই বলেছেন। এছাড়া আর কোনও উপায় নেই। এই বাচ্চাটা শেষ হয়ে গেলে যদি বৈভবীর আত্মা ভবিষ্যতে মুক্তি পেয়েও যায়, তাহলেও তেমন ভয়ের কিছু থাকবে না।’
‘না বাবা আপনি আপনার নিজের কথাই ভুলে গেলেন। আপনি বলেছিলেন, দর্শনার যা বয়স, সেই বয়সের মধ্যে যদি রাজপরিবারের সব মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়,তাহলে বৈভবীর আত্মা বাক্স থেকে মুক্তি পাবে না। তাই আমি আমাদের এই রাজবংশে যুগের পর যুগ এই নিয়ম পালন করার হুকুম দিয়ে যাব।’
‘আর যদি এমন একটা সময় আসে, যেখানে এমন কেউ চলে আসে যে, আপনার এই হুকুম মানবে না, নির্দিষ্ট বয়স পেরিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও কোনও মেয়ে যদি অবিবাহিত থেকে যায়?’
‘তাহলে তার জন্য আপনি এমন কিছু ব্যবস্থা করে যান। বৈভবীর মত মহা তান্ত্রিককে তো আপনি জন্ম দিয়েছেন। তাহলে তাকে ধ্বংস করার উপায় আপনাকেই বের করতে হবে। আর যা ইচ্ছা তাই করুন। কিন্তু শিশু হত্যা আমি করতে দেবো না।’
‘আচ্ছা বেশ আমাকে দশটা দিন সময় দিন। কিন্তু আমি আপনাকে কথা দিতে পারছি না যে, আদৌ অন্য কোনও উপায় পাওয়া যাবে কিনা। আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি মাত্র।’
রানী হৈমন্তী হুকুম পেয়ে তন্ত্রগুরু আবার সেই কক্ষে ফিরে যান। রাজা বৃজেন্দ্র কিছু বলার আগেই রাজমাতা বললেন— ‘রাজামশাই এবার থেকে আপনি সিংহাসনে বসলেও রাজ্য চলবে রানী হৈমন্তীর কথাতে।’
সঙ্গে সঙ্গে রাজা বৃজেন্দ্র প্রতিবাদ করে ওঠেন।– ‘অসম্ভব...... আমি একজন নারীর হাতের পুতুল হতে পারব না।’
রানী হৈমন্তী বললেন— ‘আমার সেই ইচ্ছাও নেই যে,আপনাকে আমি আমার হাতের পুতুল করব। যদি ইচ্ছে থাকতো, তাহলে আমার ভালবাসায় যখন আপনি রাজপাট ভুলতে বসেছিলেন, তখন আবার আপনাকে বাধ্য করতাম না সেই আগের মতো পুনরায় একজন ভালো রাজা হওয়ার জন্য। আপনার রাজ্য আপনারই থাকবে। রাজমাতা চাইলেও আমি তার কথার মান রাখতে পারব না। রাজমাতা, আপনার কথা না মানার জন্য আপনি আমাকে যা শাস্তি দেবেন আমি তা মাথা পেতে নেব। শুধু একটা কথা রাজামশাই... ভবিষ্যতে আর কারোর ভালোবাসায় এমন অন্ধ হয়ে যাবেন না, দয়া করে।’
তখনকার মতো সবকিছু শান্ত হয়ে যায়। সবাই যে যার কক্ষে চলে যায়। রাজমাতা মুখে এমন কথা বললেও নিজের সন্তান হারানোর কষ্ট তো ছিলই। রাজা রানীর বাকি আর সমস্ত সদস্যের মনেই কষ্ট ছিল। কিন্তু রাজা বৃজেন্দ্র ঠিক করেন, অনেক হয়েছে। বারবার তিনি এই অপবাদ দিতে পারবেন না যে, আগের মত আর যোগ্য রাজা তিনি নেই। এবার তুমি খুঁজে দেখবেন যে, বৈভবীর কথামতো ও নিজেই কাঁকিনগরে এসেছিল, নাকি অন্য কোন কাহিনী রয়েছে এর পিছনে। হঠাৎ করে এরকম এক ভয়ঙ্কর তন্ত্র সাধিকা এখানে এলো কেমন করে?
দেখতে দেখতে দশটা দিন পেরিয়ে যায়।
রানী হৈমন্তী মনে-প্রাণে চাইছিলেন যে, তন্ত্রগুরু যেন একটা কোনও উপায় পেয়ে যান। তার একটা কারণ তো অবশ্যই ছিল। শিশু হত্যা করা যাবে না। কিন্তু এই দিনে আরও একটা কারণ এসে উপস্থিত হয়েছে। সেটা হল রানী হৈমন্তীর এই বাচ্চাটার উপরে মায়া। এই দশদিন তিনি নিজের সন্তানের মতো করেই ওই বাচ্চাটাকে প্রতিফলন করেছেন। তাই.........
দশ দিনের মধ্যেই রাজা বৃজেন্দ্র খুঁজে পেয়েছেন আসল কারণটা। মানে, বৈভবীর আগমনের পিছনে আসল কারণ কি ছিল। রাজার সঙ্গে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, তারাই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য, কাঁকিনগরের সর্বনাশ করার জন্য, ওই ভৈরবীকে নিযুক্ত করেছিল। মনে আছে নিশ্চয়ই কারা... রাজার সেই মন্ত্রী আর রাজার দুই ভাই। একজন সৎ ভাই আরেকজন খুড়তুতো ভাই। কিন্তু ধরা পড়ার পরে তারা জানায় যে, তারা নাকি বৈভবীর যে এইটা আসল উদ্দেশ্য ছিল, তা তারা বুঝতে পারেনি। তারা শুধুমাত্র চেয়েছিল রাজার উপরে একটু মাত্র প্রতিশোধ নিতে। কিন্তু এত বড় ভয়ঙ্কর ঘটনা যে ঘটে যাবে, তা তারা বুঝতে পারেনি।
কিন্তু রাজা বৃজেন্দ্র আর কোনও সহানুভূতি দেখাননি। তিনি আগেই বলেছিলেন যে, এটাই ওদের কাছে শেষ সুযোগ। আর সেই কারণেই নিজের কথা রাখার জন্য আর নিজেকে একজন যোগ্য রাজা প্রমাণ করার জন্য, তোপের মুখে বসিয়ে ওই তিনজনকে শেষ করার হুকুম দেন। এতটা নির্দয় হওয়ার পিছনে আরও একটা কারন ছিল। সেটা হল, সবাই ওনার নরম ব্যবহারকে এমন কটাক্ষ করেছে যে, এই মাত্র দশ দিনেই তিনি এইরকম একটা মানুষের পরিণত হয়েছেন। আর তিনি যে যেকোন সময় ভয়ঙ্কর হতে পারেন, তা এই তিনজনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া দেখে সবাই বুঝে যায়।
যাইহোক দশ দিনের দিন সন্ধ্যাবেলা তন্ত্রগুরু ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসেন। এই দশদিন তিনি কারও সঙ্গে দেখা করেননি। কোন কিছু খাননি।
রাজমহলের সমস্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের এক জায়গায় জড়ো করে তিনি বলতে শুরু করেন।– ‘রানীমা আর রাজকুমারী অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে বৈভবীর মত একজন মহাশক্তিশালী তান্ত্রিকের বিনাশ ঘটিয়েছেন। ওনাদেরকে ছাড়া আমি কখনোই কিছু করতে পারতাম না। তাই রানীমার আদেশ মতোই শিশুহত্যা না করেও কেমন করে কি করা সম্ভব, তা খোঁজার চেষ্টা করি। উপায় পাই। কিন্তু সে অত্যন্ত কঠিন। কয়েকটা উপায় বলব। এই উপায়ে মানতে না পারলে,ওই শিশুটিকে হত্যা করতেই হবে। সবার ভালোর জন্য এটা করতেই হবে। তা না হলে কিন্তু রাজকুমারীর এই আত্ম বলিদান ব্যর্থ হবে।’
তন্ত্রগুরু চুপ করতেই রানী হৈমন্তী বললেন— ‘যত কঠিনই হোক না কেন,আমরা সব পালন করব। আপনি শুধু বলুন।’
রাজা সহ সবাই বললেন— ‘হ্যাঁ যদি কোনও উপায় থাকে, তাহলে শুধু শুধু বাচ্চাটাকে মেরে কোন কাজ নেই। ওর তো সত্যিই কোনও দোষ নেই।’ আসলে বাইরে থেকে যতই রাজা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করুন না কেন, ওই বাচ্চাটার আসলে ওনারই সন্তান ছিল। তাই সেই মুহূর্তে রাগের মাথায় বাচ্চাটাকে শেষ করে দেওয়ার কথা বললেও, যখন উপায় আছে শুনলেন, তখন তিনিও একটু নরম হয়ে গেলেন।
তন্ত্রগুরু বললেন যে, ‘আপনারা সবাই যখন রাজি হয়েছেন, তখন আমার আর বলতে কোনও আপত্তি নেই। আমি যেমন বলেছিলাম যে, আপনাদের বংশের মেয়েদের রাজকুমারীর বয়সের মধ্যে বিয়ে দিতে হবে, সেই নিয়ম কিন্তু মেনে যেতেই হবে। যতদিন সিংহ রায় রাজপরিবার থাকবে, ততদিন এই নিয়ম চলবে। যদি কেউ অবিবাহিত থেকে যায়, তাহলে যে বাঁধনে আমি বৈভবীর আত্মাকে বেঁধেছি, তা আলগা হয়ে যাবে। এর প্রধান কারণ, ও রাজকুমারী আত্মাকে নিজের কব্জায় রেখেছে। আর রাজকুমারী অবিবাহিত ছিলেন।’
রাজমাতা বললেন— ‘কিন্তু বাবা, আমার মেয়ে অবিবাহিত থাকার সঙ্গে আমাদের বংশের মেয়েদের ওর বয়সের আগেই বিয়ে দিয়ে দেওয়ার কি সম্পর্ক?’
‘সম্পর্ক আছে রাজমাতা। আমি সেইদিন বলিনি। আজকে বলছি। কোনও মানুষ মারা গেলে, তার আত্মা শুভ নাকি অশুভ তা বিচার হয় জীবিত কালে তার করা সমস্ত কাজের দ্বারা। কিন্তু সে অশুভ বা শুভ যে আত্মাই হোক না কেন, যদি সে মনের মধ্যে এমন কোনও আকাঙ্ক্ষা যা কিনা বেঁচে থাকা অবস্থায় তীব্র ছিল, সেই আশা পূর্ণ না করেই এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যায়, তখন সেই মানুষটার মৃত্যুর পরে তার সেই অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে উদ্যত হয়। আর সেই আশা পূর্ণ করার চাহিদাও হয় অত্যন্ত তীব্র। আপনারা জানেন কিনা আমি জানি না। আসলে রাজকুমারীর ভিতরে একটা আশা ছিল। তিনি অনেক ছোট থেকেই চাইতেন একজন রাজকুমারকে বিয়ে করে সুখে ঘর সংসার করতে। তাই তিনি পুতুলের বিয়ে দেওয়ার খেলাই বেশি খেলতেন। নিজেকে সুন্দর রাখার জন্য নানারকম রূপচর্চা করতেন। তিনি যুদ্ধ করার কোনও কলা কৌশল রপ্ত করেনি যাতে, ওনার শরীরে কোনও আঘাতের চিহ্ন থেকে না যায়। ওনার রূপ নষ্ট না হয়ে যায়। সেই জন্য তিনি রোদেও খুব একটা বেরোতেন না। সেই রাজকুমারী বৈভবীকে মারার জন্য রাজি হয়েছিলেন যাতে,নিজেকে সবার সামনে প্রমাণ করতে পারেন যে, তিনি বড় হয়েছেন। এখন বিয়ে দেওয়া যেতে পারে। আর তিনি নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন সেই ক্ষমতা ওনার রয়েছে। কিন্তু মুহূর্তের ভুলের জন্য সমস্ত কিছু উল্টোপাল্টা হয়ে যায়। আর তার সেই অপূর্ণ ইচ্ছাকে মনের মধ্যে নিয়েই এই দুনিয়া ত্যাগ করতে হয়।
রাজকুমারীর মৃত্যুর পরে ওনার সেই চাহিদা আরও বেড়েছে। ওনার বয়সী কোন মেয়ে অবিবাহিত থাকলে ওনার আত্মা কোনও রকম কোনও প্রতিক্রিয়া জানাবে না। কিন্তু যদি ওনার বয়স অতিক্রম করা কোন মেয়ে অবিবাহিত থেকে যায়, তাহলে তার ভিতরে প্রবেশ করে সে নিজের ইচ্ছা পূর্ণ করতে চাইবেন। আর সেই কারণেই আমার বন্ধন ছেড়ে বেরোনোর চেষ্টা করবেন। আর তাতেই হবে বিপত্তি। আমার বন্ধন কেটে রাজকুমারী বেরিয়ে আসতে চাইলেও বেরোতে পারবে না। কারণ ওর সঙ্গে তখন রয়েছে বৈভবীর আত্মা।
কিন্তু ওই যে বন্ধন আলগা হয়ে গেল, সেই আলগা পথ দিয়েই বৈভবীর আত্মা এই রাজবংশের সব থেকে দুর্বল মানুষকে বারবার ওর ওই গয়নার বাক্সের কাছে ডাকবে। কারণ, আমি যে মন্ত্রে ঐ বাক্সকে বন্ধ করেছি, আর ওরা আত্মাকে আটকে রেখেছি, সেই মন্ত্র নষ্ট করতে হলে ওর এই রাজবংশের কোন মানুষকে দরকার। যে শুধু ওই বাক্স খুলবেই না, বাক্সে রাখা সবকটা গয়না নিজের গায়ে পরবে। যদি এমন হয়, তাহলে দুজনের আত্মাই কিন্তু বাইরে বেরিয়ে আসবে।
আর এতদিন একটা অশুভ আত্মা সঙ্গে থেকে রাজকুমারীর আত্মাও অশুভ হয়ে যেতে পারে। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি না যে, অশুভ হবেই। কিন্তু অশুভ হয়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা থেকেই যায়। তখন ওই দুই আত্মা মিলে কি করবে, তা এখন আমি বলতে পারছি না।
এবার ধরুন ভবিষ্যতে যদি এমন হয় যে, আপনাদের বংশের কোনও মেয়ে অবিবাহিত থেকে গেল। আর নানা রকম ছল করে তার হাত ধরেই হোক বা বাড়ির আর অন্য কোনও সদস্যের হাত ধরেই হোক, সে মুক্তি পেয়ে গেল। তখন ও কিন্তু এই অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণ করবে। মানে, আবার শুরু হবে মৃত্যুর খেলা। আর সফল হয়ে গেলে কি হবে তা, আমার আর বলার দরকার নেই। যে বিপদ আটকাতে রাজকুমারী আজ আত্ম বলিদান দিয়েছেন, আপনারা এত বড় একটা বলিদান দিতে চলেছেন, সেই বিপদ তখন হবে। কিন্তু বৈভবীর কথা মত ও ওর নিজের বংশের হাত ধরেই এই অপূর্ব ইচ্ছা পূর্ণ করবে। আর ওর বংশ বলতে শুধুমাত্র এই বাচ্চাটা। কিন্তু এই বাচ্চাটা বড় হলে বিয়ে করবে। তার সন্তান হবে। সেই সন্তান বড় হয়ে বিয়ে করবে। এমন করে অনেক বড় বংশ হয়ে যাবে ওর। আর আত্মা মিথ্যা কথা বলে না। তাই বৈভবী ওর বংশের কাউকে না পেলে, এই প্রক্রিয়া দ্বিতীয়বার করবে না। তখন ওরা আত্মাকে মুক্তি দেওয়া অনেক সহজ হবে।’
তন্ত্রগুরু চুপ করতেই রানী হৈমন্তী বললেন— ‘কিন্তু এই জিনিসটা আগেও তো হচ্ছিল। তাই আপনাকে বলেছিলাম বাচ্চাটাকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে, আমাদের কি করতে হবে। আর ভবিষ্যতে যদি বৈভবীর আত্মা আপনার বন্দি করা জায়গা থেকে মুক্তি পেয়েও যায়, তাহলেও আমাদের বংশধরেরা কেমন করে ওকে আটকাবে, তার উপায় বের করতে বলেছিলাম। তাহলে কি আপনি কোন........’.
‘না না আমি উপায় পেয়েছি রানীমা। সেই জন্যই তো দশ দিন সময় চেয়েছিলাম আপনাদের কাছে। তবে এখন আমি আপনাদের কয়েকটা কথা বলব। বিনা প্রশ্নে তা মেনে নেবেন। মানে, আমি যেই জিনিস গুলো করতে বলব, সেগুলো ছাড়া কিন্তু আর অন্য কোনও উপায় নেই। আমার কথাগুলো অক্ষরে অক্ষরে মানবেন। নয়তো ওই শয়তানী বৈভবীর বাচ্চাটাকে মারবেন। এবার শুনুন----
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই রাজবাড়ি ছেড়ে আপনাদের সবাইকে মানে, পুরো রাজপরিবারকে অন্যত্র চলে যেতে হবে। যাদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে মানে, তাদের গোত্র পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে, তাদের কথা আমি বলছি না। যত দূরে যাওয়া সম্ভব চলে যাবেন। এই রাজবাড়ির কথা, আপনাদের পরিবারের কোনও অবিবাহিত নারীকে জানতে দেবেন না। কারণ, সব তন্ত্রেরই কিছু বিধিনিষেধ থাকে। এটাও সেই রকম...
আপনাদের বংশের সমস্ত নারীকে রাজকুমারীর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে দিতে হবে। সিংহরায় রাজবংশ যতদিন থাকবে, ততদিন যেন এই নিয়ম মানা হয়। এর অন্যথা হলেই............ বাকিটা আর বলছি না।
সব থেকে জরুরি কথা, যদি কোনদিনও এমন দিন আসে যে, আমার বলা দুটো কথাই ভঙ্গ হয়ে গেল বা একটা কথা ভঙ্গ হল। মোটকথা বৈভবীর আত্মা মুক্তি পেয়ে গেল। তখন আপনাদের নতুন মহলে একটা কক্ষ দেখিয়ে দেব। ওইখানে সাহায্যের জন্য যাবেন। ওই কক্ষের সামনে গেলে কিভাবে কি করতে হবে তা আমি পরে বলব। ওই কক্ষ থেকে কিন্তু আপনারা সাহায্য পাবেন। এমনকি সেই বিপদ থেকে রক্ষাও পেয়ে যেতে পারে আপনাদের পরিবার। কিন্তু এখন জানতে চাইবেন না যে, ওই কক্ষে আমি ঠিক কী রেখে যাব। সমস্ত কাজ হয়ে গেলে আমি এখান থেকে চলে যাব। যতদিন না আপনারা নতুন মহলে যাচ্ছেন, ততদিন আমি এখানে থেকে বৈভবীর যে পার্থিব দেহ রাখা রয়েছে, তার যথাযথ সৎকার করব। যত রকম যা যা সুরক্ষা ব্যবস্থা করা যায়, সমস্ত কিছু করে ফেলব।
এখন আমি সেইখানে যাচ্ছি, যেখানে বৈভবী এতদিন ছিল।’
কারোর কোনও উত্তরের অপেক্ষা না করে তন্ত্রগুরু ওখান থেকে চলে যান। ওনার কথামতো মোটামুটি ভাবে সবাই সব কিছু মেনে নিলেও, সত্যি সত্যি রাজবাড়ি ছেড়ে যাওয়া আদৌ সম্ভব কিনা, তা কেউ বুঝতে পারছে না। রানী হৈমন্তী বাচ্চাটাকে মারতে চাইছিলেন না। সন্তান হারানোর কষ্ট ওনার থেকে বেশি মনে হয় আর কেউ বুঝতে পারবে না। কিন্তু তবু কিছু কিছু জন রাজার কাছে আর্জি জানিয়েছিলেন যে, রাজমহল ছেড়ে অন্য কোথাও না গিয়ে বাচ্চাটাকে যেন মেরে ফেলা হয়। তারপর রানী হৈমন্তীকে না হয় বুঝিয়ে বলা যাবে।
ওই কয়েকজন এই কথা বলার সাহস এইজন্যই দেখিয়েছিল, কারণ গত কয়েকদিনে রাজা বৃজেন্দ্রর যে রূপ সবাই দেখেছিল, তাতে রানী সহ বাকি সবার মনে হয়েছিল রাজা বাচ্চাটাকে মেরে ফেলার হুকুম দেবেন। রাজবাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কথা বলবেন না। তবে রানী হৈমন্তী কিন্তু স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, রাজামশাই যদি বাচ্চাটাকে মেরে ফেলার হুকুম দেন, তাহলে তিনি বাচ্চাটাকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবেন। রাজা বৃজেন্দ্রর কাছে কোনও পথ ছিল না। তার কারণ, বৈভবীর বংশধরকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে গেলে, তাতে সমস্যা বাড়বে বৈ কমবে না।
আর এই জন্যই রাজা বৃজেন্দ্র মহামন্ত্রীকে হুকুম দেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা নতুন রাজমহল বানাতে। সবকিছুই যেন একই রকম রাখা হয়। শুধুমাত্র কিছু কিছু নকশা যদি অনুকরণ করা না যায়, তাহলে সেইটুকুই পরিবর্তন হবে। আর অবশ্যই বৈভবীর জন্য বানানো চারটে কক্ষ ওই একই দিকে যেন বানানো হয়। যাতে বংশপরম্পরায় এই কথাগুলো রাজপরিবারের সবাই মেনে চলে। তবে ওই মন্দিরগুলো বানানোর হুকুম তিনি দেননি। অনেকে আপত্তি করেছিল এই রাজবাড়ি ছেড়ে যেতে। তাদের এই কথাটাকে রাজা ফেলতে পারেননি। সেই কারণেই নতুন রাজবাড়িটা একইরকম রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন রাজবাড়ি তৈরি হয়ে যায়। মানে, আমাদের এই বাড়িটা। কিন্তু এই রাজবাড়ির জৌলুস আগের রাজবাড়ির তুলনায় অনেক কম ছিল। তার কারণ, পুরনো রাজবাড়িটায় এমন বহু নকশা ছিল, যা বাইরে থেকে কারিগররা এসে তৈরি করেছিল। অনেক অনেক বছর সময় লেগেছিল সেই সমস্ত নকশা ফুটিয়ে তুলতে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি তো সেই সমস্ত ব্যবস্থা করা যায় না। করা সম্ভবও ছিল না। সেই কারণেই স্বাভাবিক ভাবেই যারা আপত্তি করেছিল যে, আগের রাজবাড়ি তারা ছাড়তে চায় না, তারা আরও একবার আপত্তি করে। কিন্তু তাতে কি হয়েছে। ওই রাজবাড়ি তো ছাড়তেই হতো। কোনও উপায় ছিল না। আমাদের এই রাজবাড়ির বেশ কিছু অংশ ভেঙে গিয়েছে। মেরামত করা হয়নি। আসলে এতো বড় রাজবাড়ি মেরামত করার জন্য প্রচুর টাকা পয়সার প্রয়োজন। এই রাজপরিবারের শুরু থেকে এখন অব্দি যে সব সময় আমাদের আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল, এমন তো নয়। কখনও খারাপ কখনও ভালো, কখনও মোটামুটি। এমনভাবেই চলেছে। তাই এই রাজবাড়ি ঠিকঠাক মেনটেন করা সম্ভব হয়নি। সেই কারণে বেশ কিছু অংশ ভেঙে গিয়েছে। তবে যেটুকু যা ভাল রয়েছে, তা কিন্তু আমাদের রাজপরিবার হওয়ার ঐতিহ্য বেশ ভালই বহন করেছে।
যাই হোক, অনেক টানাপোড়েনের পরে নিজের পুরো রাজবংশ নিয়ে এখানে আসেন রাজা বৃজেন্দ্র সিংহ রায় আর রানী হৈমন্তী। রানীর কোলে সেই সময় ছিল বৈভবী সন্তান কুমার রাজেন্দ্র। যেই সময়ে হৈমন্তী কুমার রাজেন্দ্রকে নিয়ে এই রাজমহলে প্রবেশ করেন, হঠাৎ করেই সেই সময়ে ঝড়-জল-বৃষ্টি হতে থাকে। মেঘও গর্জন করতে থাকে। যেন প্রকৃতিও বাজে কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
আমার মনে হয়, আজকের এই দিনটির ইঙ্গিতই প্রকৃতি সেইদিন ঝড়-জল-বৃষ্টি দিয়ে বুঝিয়েছিল। সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিল। কারণ ,হঠাৎই সেইসব শুরু হয়েছিল। আকাশে কোনও কালো মেঘ ছিল না। রোদ ঝলমলে দিনে এই রকম প্রকৃতির তাণ্ডব...! সেই ঝড় বৃষ্টি থেমে যেতে সবাই যে যার ঘরে ঠিকমতো সব গুছিয়ে নিল। একটু পরে সেখানে এসে উপস্থিত হন তন্ত্রগুরু। কিন্তু ওই মুহূর্তটুকুর জন্যই ঝড় বৃষ্টি হয়েছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সমস্ত কিছু শান্ত হয়ে যায়। আর দেখে এক মুহূর্তের জন্যও মনে হয় না যে, এখানে একটু আগে এত জোরে ঝড় বইছিল। শুধুমাত্র জল পড়ে থাকতে দেখে বোঝা যায় যে, বৃষ্টি হয়েছিল।
তন্ত্রগুরু ওখানে এসেই উত্তর দিকে একদম কোনায় ঘরটায় চলে যান। ওইখান থেকে যাওয়ার সময় একটাই কথা বলে যান। ‘শোণিত স্পর্শন বৈভবী জনন’…
তারপর আর কোনও কথা না বলে সেখান থেকে চলে যান। রাজবাড়ির সদস্যরাও কোনও কথা বলে না। আসলে একে তো ওনাকে দেখে সবাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তার উপরে উনি যে কথাটা বললেন তার মানে তখন কেউ বুঝতে পারেনি।
উনি ছিলেন সম্পূর্ণ উলঙ্গ। গোটা গায়ে ছাই মাখা। গলায় আর হাতে রুদ্রাক্ষের মালা। মাথায় জটা চুল গুলো খোলা। চোখ গুলো লাল। তিনি সারাদিন ওই ঘরেই রইলেন। রাত হতেই সবাই একে একে বিশ্রাম নিতে চলে যায়। শুধু রানী হৈমন্তীর মনটা ছটফট করতে থাকে। তাই তিনি উত্তর দিকের ঘরটার দিকে তাকিয়ে জেগে বসে থাকেন।
আমি এখন যে ঘরটায় থাকি, সেই ঘরটাতে থাকতেন রানী হৈমন্তী। আমাদের ঘরের সব থেকে বয়স জ্যেষ্ঠ মানুষটি ওই ঘরে থাকে। আমি চলে গেলে তারপরে যে এই পরিবারের সব থেকে বড় সদস্য হবে, সে থাকবে।
এবার শোন, রানী হৈমন্তী লক্ষ্য করেন সারা রাতেও তন্ত্রগুরু ওই কক্ষ থেকে বেরোলেন না। আবার দিনের বেলায়ও বেরলেন না। এমন করে আবার রাত্রি হয়ে যায়। কিন্তু না, সেই ঘরের দরজা খোলে না। এইভাবে দেখতে দেখতে সাতটা দিন পেরিয়ে যায়। তখন রানী দু'জন দাসী ঠিক করেন, যারা পাহারা দেবে। কারণ দিনের পর দিন তিনি নজর রাখতে পারবেন না। কিন্তু না, মাস পেরিয়ে গেলেও তন্ত্রগুরু ওই কক্ষ থেকে বের হন না।
সবাই ভাবল, হয়তো রাতের অন্ধকারে তিনি বেরিয়ে গেছেন। কিন্তু হৈমন্তী জানতেন, তিনি ওই ঘরেই রয়েছেন। তবে জীবিত না মৃত সেটা জানতেন না। তিনি অমরত্ব লাভ করেছিলেন। তাই সেই হিসেব মতো জীবিত থাকার কথা। কিন্তু একটা মাস না খেয়ে কেউ কি থাকতে পারে? না খাওয়ার কষ্ট সহ্য করে কেউ কি বেঁচে থাকতে পারবে? তিনি বলেছিলেন, যদি তিনি চান, তাহলেই মৃত্যুবরণ করতে পারবেন। কিন্তু এতদিন না খেয়ে কি............। আর ভাবতে পারেননি তিনি।
আস্তে আস্তে তন্ত্রগুরুর কথা ক্ষীণ হতে শুরু করে। রাজা বৃজেন্দ্র ওইখান থেকেই আবার নিজের রাজ্য চালাতে থাকেন। কোনও রকম কোনও সমস্যা হয় না। শুধুমাত্র তন্ত্রগুরুর বলা কথাগুলো ওনারা মেনে চলতে থাকেন। এরপরে রানীর একটা কন্যা সন্তান হয়েছিল। তার বিয়েও রাজকুমারী দর্শনার বয়সের আগেই দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। রাজা বৃজেন্দ্রর যখন বয়স হয়ে যায়, তখন এই কাঁকিনগরের সিংহাসনে বসেন কুমার নৃপেন্দ্র। রানী হৈমন্তীর গর্ভজাত সন্তান তিনি। কুমার রাজেন্দ্রকে হৈমন্তী নিজের সন্তানের মত বড় করলেও, সত্যিই তো সত্যিই থাকে। রাজেন্দ্র কোনও রানীর গর্ভ থেকে জন্ম নেননি। রানী হৈমন্তী কিন্তু নৃপেন্দ্র রাজা হলেও, রাজেন্দ্রকে বেশি ভালোবাসতেন।
ছোট থেকেই রাজেন্দ্র বেশি ভালবাসা পেলেও, যখন সে দেখল যে তার ছোট ভাই নৃপেন্দ্র রাজা হল, তখন ওনার আসল রূপ সবার সামনে চলে এলো। ওনার করা ব্যবহার দেখে সবাই বলতে শুরু করে, যার শরীরে বৈভবীর মত একটা মানুষের রক্ত বইছে, সে তো একসময় না একসময় এমন ব্যবহার করতই করত।
রানী হৈমন্তী কিন্তু এই ভয়েই রাজেন্দ্রকে বেশি ভালবাসতেন। তিনি চেয়েছিলেন যে, বৈভবীর গর্ভ থেকে জন্ম নিলেও, রাজেন্দ্র যেন নৃপেন্দ্রর মতই ভাল একজন মানুষ হতে পারে। তিনি জোর করে রাজেন্দ্রকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আর তা যেন সঠিক বলে প্রমাণিত হয়। কিন্তু সব চেষ্টা বিফলে গেল। সেই একই রকম হিংসা ক্রোধ সবকিছুই ছিল। অথচ নৃপেন্দ্র মায়ের থেকে কম ভালোবাসা পাওয়া সত্ত্বেও যথেষ্ট শান্ত স্বভাবের ছিলেন। সবার দুঃখে কষ্টে সবার আগে এগিয়ে যেতেন। রাজা হওয়ার সমস্ত গুণই ওনার মধ্যে ছিল।
তারপর আর কি, সময় গড়াতে থাকে। যুগ পালটাতে থাকে। রাজার রাজপাট উঠে যায়। গণতন্ত্র আসে। সাধারণ মানুষের মত সবাই থাকতে শুরু করে। আস্তে আস্তে যুগ পেরিয়ে আমরা আজকে এইখানে এসে দাঁড়িয়েছি। রাজবংশকে কেন এইসব নিয়ম পালন করতে হবে, তা বোঝার জন্য এইটুকু কাহিনী আমার জানানোর প্রয়োজন ছিল। এতগুলো বছর এই সমস্ত কথা মেনে চলার সত্ত্বেও শেষ রক্ষা হল না। সেই ভুল হয়েই গেল। আর মাত্র চারদিন। তারপর কয়েক শত বছরের পুরনো বন্ধন আলগা হয়ে যাবে। বেরিয়ে আসতে পারে, আসতে পারে কেন বলছি, বেরিয়ে আসবেই বৈভবীর আত্মা। এতগুলো বছর পরে সুযোগ এসেছে ওর সামনে। ও কি আর সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করবে না? শুধু একটাই দুঃখ। আমি বেঁচে থাকা অবস্থায় আমার পরিবারের সর্বনাশ আমাকে দেখে যেতে হচ্ছে।
ও হ্যাঁ, এক্ষেত্রে একটা কথা আমার বলা হয়নি। সেটা হল, রাজকুমারী দর্শনার বয়স ছিল আঠারো বছর দশ দিন। অতীতে মেয়েদের এর অনেক আগেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হতো। তাতে কোনও রকম কোনও বাধা ছিল না। কিন্তু যুগ পাল্টায় আর আইন হয় আঠারো বছর বয়স হওয়ার আগে কোন মেয়েকে বিয়ে দেওয়া যাবে না। তাই সবকিছু আগে থেকে ঠিক করে মেয়েদের আঠারো বছর বয়স পেরোলে, ওই দশ দিনের মধ্যে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। কেউ কোনদিনও কোনও আপত্তি করেনি। বিয়ের পরে কাহিনী শুনে সবাই মেনে নিয়েছে যে, বিয়ে করে তারা ভুল কিছু করেনি। কিন্তু এইবারে.........”
মামদিদা চুপ করতেই পরিণীতা বলল— “আচ্ছা ঠাম, যদি রাজকুমারীর বয়স আঠারো বছর না হয়ে তার কম হতো, তাহলে তো আইন অনুসারে বিয়ে দেওয়া সম্ভব হতো না। তখন কি হতো?”
“হুম... এখনও তোর মুখে প্রশ্ন। কিন্তু প্রশ্ন যখন করেছিস, তখন উত্তর তো দেব। তাহলে শোন, তখন বার্থ সার্টিফিকেট বয়সটা আঠারো বছর করতে হতো। মানে বয়স কম হলেও আইনের চোখে তা বাড়িয়ে আঠারো করে নেওয়া হতো। কিন্তু বিয়ে হতে হতো রাজকুমারীর বয়সের মধ্যেই।
তোর মুখে যখন এখনও কথা ফুটছে, তখন তোকে আজ একটা কথা বলছি। না শুধু তোকে নয়, বাকি সবাইকে বলছি। আমার ছোট নাতি মানে নীলাংশু হলো ওই বৈভবীর বংশধর। আর সেই হিসেব মতো মিষ্টি আর ওর ভাইও বৈভবীর বংশধর।”
চমকে ওঠে সবাই। “কি......ই......” আর্তনাদ করে ওঠে পরিণীতা। ওর মেজ জা যেন একটা সুযোগ পেয়ে গেল ওকে ছোট করার। বলল— "এবার বুঝলাম এই ছোট বউ আর তার মেয়ে এমন কেন। ওই শয়তান বৈভবীর বংশধর একজন। আর একজন ওই বংশধরকে গর্ভে ধারণ করেছে। একজন নয় দু’জন। রানী হৈমন্তীর উচিত ছিল রাজবাড়ি ত্যাগ না করে, বৈভবীর বংশকে মূলেই শেষ করে দেওয়া। ওর ছেলেটা এখন একটু ছোট। বড় হলে তোমরা দেখবে, ও-ও সবার পিঠে ছুরি বসাবে। অবশ্য বেঁচে থাকলে হয়।”
কিন্তু এটা শুনে মামদিদা চিৎকার করে বলে ওঠেন— “মেজ নাত বউ, আমি এই সত্যিটা তোমাদের বলে দিলাম মানে এই নয় যে, সেই কথা নিয়ে কেউ এমন মন্তব্য করবে। তোমাদের সবার উচিত আমাদের পূর্বপুরুষরা যা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তার সম্মান করা। কেউ যাতে বৈভবীর বংশধরদের ছোট করতে না পারে, তাই কাউকে জানানো হতো না। শুধুমাত্র যে ওর বংশধর, তাকেই সে কথা জানানো হতো তাও পরিবেশ পরিস্থিতি বিচার করে। পরে বাড়ির বয়স্করা জানতেন। কিন্তু আজকে সবকিছু বলতে বাধ্য হলাম। তবে তার জন্য ছোট নাতি বা বা ছোট নাতবৌ বা মিষ্টিকে বা ওর ভাইকে কেউ কোনও কথা শোনাবে না।”
মামদিদা চুপ করতে পরিণীতার বড় জা বলল— “তুমি যখন আমাকে কাহিনী বলে ছিলে, তখন তো এত বিস্তারিতভাবে বলোনি। আমাকে কেন, যাকেই কাহিনী বলেছো না কেন, তাকে তো এত বিস্তারিত ভাবে বলোনি। তাহলে আজকে এত বিস্তারিতভাবে বলার কি কারণ থাকতে পারে? তুমি এতো কিছু জানলে কেমন করে?”
“আমি জেনেছি রানী হৈমন্তীর লেখা একটা বই থেকে। তিনি সব লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন। বাড়ির বড়ো বউরাই সেটা পায়। তুইও একদিন পাবি। আর আগে আমি এমন ভাবে বলিনি তার কিছু কারণ রয়েছে। তার প্রধান কারণ হল, এর আগে আমরা এমন পরিস্থিতিতে এসে কোনওদিনও দাঁড়াইনি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন যে আমাদের সবারই সবটা বিস্তারিত ভাবে জানার দরকার ছিল। এর আগে কোনদিনও এমন বিস্তারিতভাবে বলতে হয়নি। যেইটুকু যা বলেছিলাম, সেই টুকুতেই কাজ চলে যাচ্ছিল। শুধু শুধু কথা বাড়াইনি।”
এর পরেই পরিণীতা আর কোন কথা না বলে, আস্তে আস্তে নিজের ঘরে চলে যায়।
‘না না আমি উপায় পেয়েছি রানীমা। সেই জন্যই তো দশ দিন সময় চেয়েছিলাম আপনাদের কাছে। তবে এখন আমি আপনাদের কয়েকটা কথা বলব। বিনা প্রশ্নে তা মেনে নেবেন। মানে, আমি যেই জিনিস গুলো করতে বলব, সেগুলো ছাড়া কিন্তু আর অন্য কোনও উপায় নেই। আমার কথাগুলো অক্ষরে অক্ষরে মানবেন। নয়তো ওই শয়তানী বৈভবীর বাচ্চাটাকে মারবেন। এবার শুনুন----
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই রাজবাড়ি ছেড়ে আপনাদের সবাইকে মানে, পুরো রাজপরিবারকে অন্যত্র চলে যেতে হবে। যাদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে মানে, তাদের গোত্র পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে, তাদের কথা আমি বলছি না। যত দূরে যাওয়া সম্ভব চলে যাবেন। এই রাজবাড়ির কথা, আপনাদের পরিবারের কোনও অবিবাহিত নারীকে জানতে দেবেন না। কারণ, সব তন্ত্রেরই কিছু বিধিনিষেধ থাকে। এটাও সেই রকম...
আপনাদের বংশের সমস্ত নারীকে রাজকুমারীর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে দিতে হবে। সিংহরায় রাজবংশ যতদিন থাকবে, ততদিন যেন এই নিয়ম মানা হয়। এর অন্যথা হলেই............ বাকিটা আর বলছি না।
সব থেকে জরুরি কথা, যদি কোনদিনও এমন দিন আসে যে, আমার বলা দুটো কথাই ভঙ্গ হয়ে গেল বা একটা কথা ভঙ্গ হল। মোটকথা বৈভবীর আত্মা মুক্তি পেয়ে গেল। তখন আপনাদের নতুন মহলে একটা কক্ষ দেখিয়ে দেব। ওইখানে সাহায্যের জন্য যাবেন। ওই কক্ষের সামনে গেলে কিভাবে কি করতে হবে তা আমি পরে বলব। ওই কক্ষ থেকে কিন্তু আপনারা সাহায্য পাবেন। এমনকি সেই বিপদ থেকে রক্ষাও পেয়ে যেতে পারে আপনাদের পরিবার। কিন্তু এখন জানতে চাইবেন না যে, ওই কক্ষে আমি ঠিক কী রেখে যাব। সমস্ত কাজ হয়ে গেলে আমি এখান থেকে চলে যাব। যতদিন না আপনারা নতুন মহলে যাচ্ছেন, ততদিন আমি এখানে থেকে বৈভবীর যে পার্থিব দেহ রাখা রয়েছে, তার যথাযথ সৎকার করব। যত রকম যা যা সুরক্ষা ব্যবস্থা করা যায়, সমস্ত কিছু করে ফেলব।
এখন আমি সেইখানে যাচ্ছি, যেখানে বৈভবী এতদিন ছিল।’
কারোর কোনও উত্তরের অপেক্ষা না করে তন্ত্রগুরু ওখান থেকে চলে যান। ওনার কথামতো মোটামুটি ভাবে সবাই সব কিছু মেনে নিলেও, সত্যি সত্যি রাজবাড়ি ছেড়ে যাওয়া আদৌ সম্ভব কিনা, তা কেউ বুঝতে পারছে না। রানী হৈমন্তী বাচ্চাটাকে মারতে চাইছিলেন না। সন্তান হারানোর কষ্ট ওনার থেকে বেশি মনে হয় আর কেউ বুঝতে পারবে না। কিন্তু তবু কিছু কিছু জন রাজার কাছে আর্জি জানিয়েছিলেন যে, রাজমহল ছেড়ে অন্য কোথাও না গিয়ে বাচ্চাটাকে যেন মেরে ফেলা হয়। তারপর রানী হৈমন্তীকে না হয় বুঝিয়ে বলা যাবে।
ওই কয়েকজন এই কথা বলার সাহস এইজন্যই দেখিয়েছিল, কারণ গত কয়েকদিনে রাজা বৃজেন্দ্রর যে রূপ সবাই দেখেছিল, তাতে রানী সহ বাকি সবার মনে হয়েছিল রাজা বাচ্চাটাকে মেরে ফেলার হুকুম দেবেন। রাজবাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কথা বলবেন না। তবে রানী হৈমন্তী কিন্তু স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, রাজামশাই যদি বাচ্চাটাকে মেরে ফেলার হুকুম দেন, তাহলে তিনি বাচ্চাটাকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবেন। রাজা বৃজেন্দ্রর কাছে কোনও পথ ছিল না। তার কারণ, বৈভবীর বংশধরকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে গেলে, তাতে সমস্যা বাড়বে বৈ কমবে না।
আর এই জন্যই রাজা বৃজেন্দ্র মহামন্ত্রীকে হুকুম দেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা নতুন রাজমহল বানাতে। সবকিছুই যেন একই রকম রাখা হয়। শুধুমাত্র কিছু কিছু নকশা যদি অনুকরণ করা না যায়, তাহলে সেইটুকুই পরিবর্তন হবে। আর অবশ্যই বৈভবীর জন্য বানানো চারটে কক্ষ ওই একই দিকে যেন বানানো হয়। যাতে বংশপরম্পরায় এই কথাগুলো রাজপরিবারের সবাই মেনে চলে। তবে ওই মন্দিরগুলো বানানোর হুকুম তিনি দেননি। অনেকে আপত্তি করেছিল এই রাজবাড়ি ছেড়ে যেতে। তাদের এই কথাটাকে রাজা ফেলতে পারেননি। সেই কারণেই নতুন রাজবাড়িটা একইরকম রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন রাজবাড়ি তৈরি হয়ে যায়। মানে, আমাদের এই বাড়িটা। কিন্তু এই রাজবাড়ির জৌলুস আগের রাজবাড়ির তুলনায় অনেক কম ছিল। তার কারণ, পুরনো রাজবাড়িটায় এমন বহু নকশা ছিল, যা বাইরে থেকে কারিগররা এসে তৈরি করেছিল। অনেক অনেক বছর সময় লেগেছিল সেই সমস্ত নকশা ফুটিয়ে তুলতে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি তো সেই সমস্ত ব্যবস্থা করা যায় না। করা সম্ভবও ছিল না। সেই কারণেই স্বাভাবিক ভাবেই যারা আপত্তি করেছিল যে, আগের রাজবাড়ি তারা ছাড়তে চায় না, তারা আরও একবার আপত্তি করে। কিন্তু তাতে কি হয়েছে। ওই রাজবাড়ি তো ছাড়তেই হতো। কোনও উপায় ছিল না। আমাদের এই রাজবাড়ির বেশ কিছু অংশ ভেঙে গিয়েছে। মেরামত করা হয়নি। আসলে এতো বড় রাজবাড়ি মেরামত করার জন্য প্রচুর টাকা পয়সার প্রয়োজন। এই রাজপরিবারের শুরু থেকে এখন অব্দি যে সব সময় আমাদের আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল, এমন তো নয়। কখনও খারাপ কখনও ভালো, কখনও মোটামুটি। এমনভাবেই চলেছে। তাই এই রাজবাড়ি ঠিকঠাক মেনটেন করা সম্ভব হয়নি। সেই কারণে বেশ কিছু অংশ ভেঙে গিয়েছে। তবে যেটুকু যা ভাল রয়েছে, তা কিন্তু আমাদের রাজপরিবার হওয়ার ঐতিহ্য বেশ ভালই বহন করেছে।
যাই হোক, অনেক টানাপোড়েনের পরে নিজের পুরো রাজবংশ নিয়ে এখানে আসেন রাজা বৃজেন্দ্র সিংহ রায় আর রানী হৈমন্তী। রানীর কোলে সেই সময় ছিল বৈভবী সন্তান কুমার রাজেন্দ্র। যেই সময়ে হৈমন্তী কুমার রাজেন্দ্রকে নিয়ে এই রাজমহলে প্রবেশ করেন, হঠাৎ করেই সেই সময়ে ঝড়-জল-বৃষ্টি হতে থাকে। মেঘও গর্জন করতে থাকে। যেন প্রকৃতিও বাজে কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
আমার মনে হয়, আজকের এই দিনটির ইঙ্গিতই প্রকৃতি সেইদিন ঝড়-জল-বৃষ্টি দিয়ে বুঝিয়েছিল। সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিল। কারণ ,হঠাৎই সেইসব শুরু হয়েছিল। আকাশে কোনও কালো মেঘ ছিল না। রোদ ঝলমলে দিনে এই রকম প্রকৃতির তাণ্ডব...! সেই ঝড় বৃষ্টি থেমে যেতে সবাই যে যার ঘরে ঠিকমতো সব গুছিয়ে নিল। একটু পরে সেখানে এসে উপস্থিত হন তন্ত্রগুরু। কিন্তু ওই মুহূর্তটুকুর জন্যই ঝড় বৃষ্টি হয়েছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সমস্ত কিছু শান্ত হয়ে যায়। আর দেখে এক মুহূর্তের জন্যও মনে হয় না যে, এখানে একটু আগে এত জোরে ঝড় বইছিল। শুধুমাত্র জল পড়ে থাকতে দেখে বোঝা যায় যে, বৃষ্টি হয়েছিল।
তন্ত্রগুরু ওখানে এসেই উত্তর দিকে একদম কোনায় ঘরটায় চলে যান। ওইখান থেকে যাওয়ার সময় একটাই কথা বলে যান। ‘শোণিত স্পর্শন বৈভবী জনন’…
তারপর আর কোনও কথা না বলে সেখান থেকে চলে যান। রাজবাড়ির সদস্যরাও কোনও কথা বলে না। আসলে একে তো ওনাকে দেখে সবাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তার উপরে উনি যে কথাটা বললেন তার মানে তখন কেউ বুঝতে পারেনি।
উনি ছিলেন সম্পূর্ণ উলঙ্গ। গোটা গায়ে ছাই মাখা। গলায় আর হাতে রুদ্রাক্ষের মালা। মাথায় জটা চুল গুলো খোলা। চোখ গুলো লাল। তিনি সারাদিন ওই ঘরেই রইলেন। রাত হতেই সবাই একে একে বিশ্রাম নিতে চলে যায়। শুধু রানী হৈমন্তীর মনটা ছটফট করতে থাকে। তাই তিনি উত্তর দিকের ঘরটার দিকে তাকিয়ে জেগে বসে থাকেন।
আমি এখন যে ঘরটায় থাকি, সেই ঘরটাতে থাকতেন রানী হৈমন্তী। আমাদের ঘরের সব থেকে বয়স জ্যেষ্ঠ মানুষটি ওই ঘরে থাকে। আমি চলে গেলে তারপরে যে এই পরিবারের সব থেকে বড় সদস্য হবে, সে থাকবে।
এবার শোন, রানী হৈমন্তী লক্ষ্য করেন সারা রাতেও তন্ত্রগুরু ওই কক্ষ থেকে বেরোলেন না। আবার দিনের বেলায়ও বেরলেন না। এমন করে আবার রাত্রি হয়ে যায়। কিন্তু না, সেই ঘরের দরজা খোলে না। এইভাবে দেখতে দেখতে সাতটা দিন পেরিয়ে যায়। তখন রানী দু'জন দাসী ঠিক করেন, যারা পাহারা দেবে। কারণ দিনের পর দিন তিনি নজর রাখতে পারবেন না। কিন্তু না, মাস পেরিয়ে গেলেও তন্ত্রগুরু ওই কক্ষ থেকে বের হন না।
সবাই ভাবল, হয়তো রাতের অন্ধকারে তিনি বেরিয়ে গেছেন। কিন্তু হৈমন্তী জানতেন, তিনি ওই ঘরেই রয়েছেন। তবে জীবিত না মৃত সেটা জানতেন না। তিনি অমরত্ব লাভ করেছিলেন। তাই সেই হিসেব মতো জীবিত থাকার কথা। কিন্তু একটা মাস না খেয়ে কেউ কি থাকতে পারে? না খাওয়ার কষ্ট সহ্য করে কেউ কি বেঁচে থাকতে পারবে? তিনি বলেছিলেন, যদি তিনি চান, তাহলেই মৃত্যুবরণ করতে পারবেন। কিন্তু এতদিন না খেয়ে কি............। আর ভাবতে পারেননি তিনি।
আস্তে আস্তে তন্ত্রগুরুর কথা ক্ষীণ হতে শুরু করে। রাজা বৃজেন্দ্র ওইখান থেকেই আবার নিজের রাজ্য চালাতে থাকেন। কোনও রকম কোনও সমস্যা হয় না। শুধুমাত্র তন্ত্রগুরুর বলা কথাগুলো ওনারা মেনে চলতে থাকেন। এরপরে রানীর একটা কন্যা সন্তান হয়েছিল। তার বিয়েও রাজকুমারী দর্শনার বয়সের আগেই দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। রাজা বৃজেন্দ্রর যখন বয়স হয়ে যায়, তখন এই কাঁকিনগরের সিংহাসনে বসেন কুমার নৃপেন্দ্র। রানী হৈমন্তীর গর্ভজাত সন্তান তিনি। কুমার রাজেন্দ্রকে হৈমন্তী নিজের সন্তানের মত বড় করলেও, সত্যিই তো সত্যিই থাকে। রাজেন্দ্র কোনও রানীর গর্ভ থেকে জন্ম নেননি। রানী হৈমন্তী কিন্তু নৃপেন্দ্র রাজা হলেও, রাজেন্দ্রকে বেশি ভালোবাসতেন।
ছোট থেকেই রাজেন্দ্র বেশি ভালবাসা পেলেও, যখন সে দেখল যে তার ছোট ভাই নৃপেন্দ্র রাজা হল, তখন ওনার আসল রূপ সবার সামনে চলে এলো। ওনার করা ব্যবহার দেখে সবাই বলতে শুরু করে, যার শরীরে বৈভবীর মত একটা মানুষের রক্ত বইছে, সে তো একসময় না একসময় এমন ব্যবহার করতই করত।
রানী হৈমন্তী কিন্তু এই ভয়েই রাজেন্দ্রকে বেশি ভালবাসতেন। তিনি চেয়েছিলেন যে, বৈভবীর গর্ভ থেকে জন্ম নিলেও, রাজেন্দ্র যেন নৃপেন্দ্রর মতই ভাল একজন মানুষ হতে পারে। তিনি জোর করে রাজেন্দ্রকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আর তা যেন সঠিক বলে প্রমাণিত হয়। কিন্তু সব চেষ্টা বিফলে গেল। সেই একই রকম হিংসা ক্রোধ সবকিছুই ছিল। অথচ নৃপেন্দ্র মায়ের থেকে কম ভালোবাসা পাওয়া সত্ত্বেও যথেষ্ট শান্ত স্বভাবের ছিলেন। সবার দুঃখে কষ্টে সবার আগে এগিয়ে যেতেন। রাজা হওয়ার সমস্ত গুণই ওনার মধ্যে ছিল।
তারপর আর কি, সময় গড়াতে থাকে। যুগ পালটাতে থাকে। রাজার রাজপাট উঠে যায়। গণতন্ত্র আসে। সাধারণ মানুষের মত সবাই থাকতে শুরু করে। আস্তে আস্তে যুগ পেরিয়ে আমরা আজকে এইখানে এসে দাঁড়িয়েছি। রাজবংশকে কেন এইসব নিয়ম পালন করতে হবে, তা বোঝার জন্য এইটুকু কাহিনী আমার জানানোর প্রয়োজন ছিল। এতগুলো বছর এই সমস্ত কথা মেনে চলার সত্ত্বেও শেষ রক্ষা হল না। সেই ভুল হয়েই গেল। আর মাত্র চারদিন। তারপর কয়েক শত বছরের পুরনো বন্ধন আলগা হয়ে যাবে। বেরিয়ে আসতে পারে, আসতে পারে কেন বলছি, বেরিয়ে আসবেই বৈভবীর আত্মা। এতগুলো বছর পরে সুযোগ এসেছে ওর সামনে। ও কি আর সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করবে না? শুধু একটাই দুঃখ। আমি বেঁচে থাকা অবস্থায় আমার পরিবারের সর্বনাশ আমাকে দেখে যেতে হচ্ছে।
ও হ্যাঁ, এক্ষেত্রে একটা কথা আমার বলা হয়নি। সেটা হল, রাজকুমারী দর্শনার বয়স ছিল আঠারো বছর দশ দিন। অতীতে মেয়েদের এর অনেক আগেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হতো। তাতে কোনও রকম কোনও বাধা ছিল না। কিন্তু যুগ পাল্টায় আর আইন হয় আঠারো বছর বয়স হওয়ার আগে কোন মেয়েকে বিয়ে দেওয়া যাবে না। তাই সবকিছু আগে থেকে ঠিক করে মেয়েদের আঠারো বছর বয়স পেরোলে, ওই দশ দিনের মধ্যে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। কেউ কোনদিনও কোনও আপত্তি করেনি। বিয়ের পরে কাহিনী শুনে সবাই মেনে নিয়েছে যে, বিয়ে করে তারা ভুল কিছু করেনি। কিন্তু এইবারে.........”
মামদিদা চুপ করতেই পরিণীতা বলল— “আচ্ছা ঠাম, যদি রাজকুমারীর বয়স আঠারো বছর না হয়ে তার কম হতো, তাহলে তো আইন অনুসারে বিয়ে দেওয়া সম্ভব হতো না। তখন কি হতো?”
“হুম... এখনও তোর মুখে প্রশ্ন। কিন্তু প্রশ্ন যখন করেছিস, তখন উত্তর তো দেব। তাহলে শোন, তখন বার্থ সার্টিফিকেট বয়সটা আঠারো বছর করতে হতো। মানে বয়স কম হলেও আইনের চোখে তা বাড়িয়ে আঠারো করে নেওয়া হতো। কিন্তু বিয়ে হতে হতো রাজকুমারীর বয়সের মধ্যেই।
তোর মুখে যখন এখনও কথা ফুটছে, তখন তোকে আজ একটা কথা বলছি। না শুধু তোকে নয়, বাকি সবাইকে বলছি। আমার ছোট নাতি মানে নীলাংশু হলো ওই বৈভবীর বংশধর। আর সেই হিসেব মতো মিষ্টি আর ওর ভাইও বৈভবীর বংশধর।”
চমকে ওঠে সবাই। “কি......ই......” আর্তনাদ করে ওঠে পরিণীতা। ওর মেজ জা যেন একটা সুযোগ পেয়ে গেল ওকে ছোট করার। বলল— "এবার বুঝলাম এই ছোট বউ আর তার মেয়ে এমন কেন। ওই শয়তান বৈভবীর বংশধর একজন। আর একজন ওই বংশধরকে গর্ভে ধারণ করেছে। একজন নয় দু’জন। রানী হৈমন্তীর উচিত ছিল রাজবাড়ি ত্যাগ না করে, বৈভবীর বংশকে মূলেই শেষ করে দেওয়া। ওর ছেলেটা এখন একটু ছোট। বড় হলে তোমরা দেখবে, ও-ও সবার পিঠে ছুরি বসাবে। অবশ্য বেঁচে থাকলে হয়।”
কিন্তু এটা শুনে মামদিদা চিৎকার করে বলে ওঠেন— “মেজ নাত বউ, আমি এই সত্যিটা তোমাদের বলে দিলাম মানে এই নয় যে, সেই কথা নিয়ে কেউ এমন মন্তব্য করবে। তোমাদের সবার উচিত আমাদের পূর্বপুরুষরা যা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তার সম্মান করা। কেউ যাতে বৈভবীর বংশধরদের ছোট করতে না পারে, তাই কাউকে জানানো হতো না। শুধুমাত্র যে ওর বংশধর, তাকেই সে কথা জানানো হতো তাও পরিবেশ পরিস্থিতি বিচার করে। পরে বাড়ির বয়স্করা জানতেন। কিন্তু আজকে সবকিছু বলতে বাধ্য হলাম। তবে তার জন্য ছোট নাতি বা বা ছোট নাতবৌ বা মিষ্টিকে বা ওর ভাইকে কেউ কোনও কথা শোনাবে না।”
মামদিদা চুপ করতে পরিণীতার বড় জা বলল— “তুমি যখন আমাকে কাহিনী বলে ছিলে, তখন তো এত বিস্তারিতভাবে বলোনি। আমাকে কেন, যাকেই কাহিনী বলেছো না কেন, তাকে তো এত বিস্তারিত ভাবে বলোনি। তাহলে আজকে এত বিস্তারিতভাবে বলার কি কারণ থাকতে পারে? তুমি এতো কিছু জানলে কেমন করে?”
“আমি জেনেছি রানী হৈমন্তীর লেখা একটা বই থেকে। তিনি সব লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন। বাড়ির বড়ো বউরাই সেটা পায়। তুইও একদিন পাবি। আর আগে আমি এমন ভাবে বলিনি তার কিছু কারণ রয়েছে। তার প্রধান কারণ হল, এর আগে আমরা এমন পরিস্থিতিতে এসে কোনওদিনও দাঁড়াইনি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন যে আমাদের সবারই সবটা বিস্তারিত ভাবে জানার দরকার ছিল। এর আগে কোনদিনও এমন বিস্তারিতভাবে বলতে হয়নি। যেইটুকু যা বলেছিলাম, সেই টুকুতেই কাজ চলে যাচ্ছিল। শুধু শুধু কথা বাড়াইনি।”
এর পরেই পরিণীতা আর কোন কথা না বলে, আস্তে আস্তে নিজের ঘরে চলে যায়।
মামদিদা কাহিনী চলাকালীন কাউকে ওখান থেকে উঠে যেতে বারণ করেছিলেন। কিন্তু পরিণীতা যখন উঠে চলে যায়, তখন মামদিদা ওকে আটকায় না। নীলাংশু বুঝতে পারে না, ওর কি করা উচিত। ও বৈভবীর বংশধর এটা জেনেই ও ভিতরে ভিতরে শেষ হয়ে যেতে থাকে। যে বাড়িটাকে ও নিজের বলে দাবি করত, বাকি সবার মত ওরও এটা বাড়ি বলেই জানত, সেই বাড়িটা কোনদিনও ওর বাড়ি ছিলই না। ওর পূর্বপুরুষেরা জোর করে এই রাজপরিবারে নিজের ভাগ বসিয়েছে। এটা ভেবেই ও মনে মনে বলে— “এখনও তো কেউ আমার সিক্রেট জানে না। কিন্তু যদি সেটা সবার সামনে চলে আসে, তাহলে সবাই আমার রক্তেরই দোষ দেবে।”
এমন সময় মামদিদা বললেন— “ভোরের আলো ফুটতে চলল। তোমরা নিজের নিজের ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করো। সকাল হলে দেখা যাক কি করা যায়। আর ছোট দাদুভাই দেখো, তোমার আর কোনও ভাইবোন নেই। তোমার বাবা মা বেঁচে নেই। তাই বৈভবী যদি মুক্তি পেয়ে যায়, তাহলে কিন্তু ও তোমার বা মিষ্টির বা ওর ভাইয়ের দ্বারা নিজের কার্যসিদ্ধি করার চেষ্টা করবে। তবে তোমার ছেলেকে আমি এইসবের বাইরে ধরছি এই জন্যই, তার কারন, ও এখন অনেকটাই ছোট। ওকে দিয়ে আদৌ বৈভবী ওর কার্যসিদ্ধি করাতে পারবে কিনা বলতে পারছি না। তবুও সাবধান থাকতে অসুবিধা কোথায়। এবার শোনো, যদি বাকি তিন দিনের মধ্যে মিষ্টির বিয়ে দিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে আলাদা কথা। যদিও সেটা একপ্রকার অসম্ভব। তবুও...।
আর হ্যাঁ, ঘরের সবাই কিন্তু অত্যন্ত সাবধানে থেকো। কারও সঙ্গে কোনও রকম কোনও অসস্তিকর ঘটনা ঘটলে, কোনও কিছু করার আগে আমাকে এই বাড়ির লোকেদেরকে সবাইকে সবকিছু জানাবে। আমার কাহিনী থেকে তোমরা খুব ভালোমতোই বুঝতে পেরেছ যে, বৈভবী মুক্তি পেয়ে গেলে ও শুধুমাত্র যে কোনও নির্দিষ্ট একজনকে নিজের বশবর্তী করার চেষ্টা করবে, তা না। এই বংশের যাকেই দুর্বল মনের পাবে, তাকেই কিন্তু নিজের বশবর্তী করার চেষ্টা করবে। কিন্তু আমরা কেউ তো আর নিজে থেকে বলতে পারি না যে, কার মন দুর্বল। সেটা একটা আত্মার পক্ষেই বোঝা সম্ভব। এখন যাও সবাই শুতে যাও।” বলে নিজের ঘরে চলে যান মামদিদা।
৪
নিজের ঘরে গিয়ে পরিণীতা চুপচাপ শুয়ে পড়ে। নীলাংশু-ও গিয়ে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে পড়ে। দু’জনে পাশাপাশি শুয়ে থাকলেও ওদের চিন্তা ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। দুজনে দুটো অন্য কথা ভাবছিল। যদিও দুজনেরই চিন্তা ধারা জুড়ে রয়েছে মামদিদার বলা কাহিনী।
পরিণীতার বারবার মনে হচ্ছে, মিষ্টিকে পালাতে সাহায্য করে ও কি কিছু ভুল করল? তাহলে কি ওর মিষ্টিকে ফিরিয়ে নিয়ে এসে বিয়েটা দিয়ে দেওয়া উচিত? এদিকে নীলাংশু তো এটাই মেনে নিতে পারছে না যে, ও বৈভবীর বংশধর। এত বিস্তারিত ভাবে না হলেও এই কাহিনী ও অনেকবার শুনেছে। নতুন কোনও সদস্য ঘরে আসলেই তাকে এই কাহিনী শোনানো হয়। আর বাড়ির মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে তাদেরকেও কাহিনীটা জানানো হয়। বারবার শুনতে শুনতে ওর মুখস্থ হয়ে গিয়েছে সবটা। যতবার এই কাহিনী ও শুনেছে, ততবার বৈভবীর প্রতি ওর ঘৃণাটা বেড়েছে। অথচ আজ ও জানতে পারছে, ও যে বৈভবীকে এতটা ঘৃণা করেছে, সে আসলে ওর পূর্বপুরুষ। সব জানা সত্ত্বেও অতীতের মতো আজও এই পরিবারের লোকেরা ওই বৈভবীর বংশধরদের আপন করে রেখেছে। অথচ ও কি করল, সেই ভালোবাসার দাম দিতে পারল না। নিজের এই গোপন কীর্তি কথা ও কেমন করে সবাইকে বলবে।
শুয়ে শুয়ে বেশ অনেকক্ষণ ধরে চিন্তা-ভাবনা করে পরিণীতা। তারপর ঠিক করে, কালকে ও মিষ্টিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে। আর ঈশানকে রাজী করাবে ওকে বিয়ে করার জন্য। এটাও বলবে যে, পরে না মিল হলে ও নির্দ্বিধায় মিষ্টিকে ছেড়ে দিতে পারে। বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যেতে পারে। কেউ ওকে কিছু বলবে না। কোনও রকম কোনও বাধা মিষ্টির পরিবারের থেকে ওর দিকে যাবে না। দরকার হলে এটা ও কোর্টের কাগজে লিখে দেবে। মিষ্টির বিয়ে দিতেই হবে। হ্যাঁ, এটাই ঠিক হবে। মিষ্টির বিয়ে দিলেই একমাত্র এটা প্রমাণ করা যাবে যে, বৈভবীর বংশধর হলেও সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তীত হয়ে তারা এখন ভাল মানুষে পরিণত হয়েছে। আচ্ছা যদি ঈশান রাজি না হয়, তাহলে…………?
সকাল হতে না হতেই পরিণীতা মিষ্টির ফোনে ফোন করে। কিন্তু ফোনের যান্ত্রিক আওয়াজ জানান দেয় যে, সেটা বন্ধ রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ঈশানের মামার ফোনে ফোন করে। আর বলে, মিষ্টিকে ফোন দিতে। এই কথা শুনে মিষ্টিকে ফোন দিতে গেলে, ওর মামা দেখে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। বেশ কয়েকবার ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে, সেই কথাটা সে পরিণীতাকে জানায়। এই কথাটা শোনার পরে ও বলে যে, ও গিয়ে মিষ্টিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে। দরকার নেই ওখানে আর থাকার। তারপর ঈশানকেও ফোন করে ওর মামা বাড়িতে যেতে বলে। আজকের দিনটা বাদ দিলে, আর মাত্র তিনটে দিন হাতে আছে। পরিণীতা ফোন পাওয়ায় ঈশান কোনও প্রশ্ন না করেই মামাবাড়িতে যেতে রাজি হয়ে যায়। পরিণীতা ভাবে, একবার ঈশান যদি বিয়েতে রাজি হয়ে যায়, তাহলে ওর বাবা মায়ের পায়ে পড়ে যাবে, যাতে ওনারাও এই বিয়েতে রাজি হয়ে যান। দোষ যখন ওর, তখন সেটা ঠিক করতে ও যেকোনও কারোর পায়ে পড়তে রাজি আছে।
ঈশানকে ফোন করার পরে, নিজে তৈরী হয়ে পরিণীতা বেরিয়ে যায়। দোতলার ঘরের জানালা দিয়ে মামদিদা ওকে বেরোতে দেখে একটু হাসলেন। বয়স তো আর কম হলো না। তাই তিনি খুব সহজেই বুঝতে পেরেছেন যে, পরিণীতা কোথায় যাচ্ছে। শুধু মনে মনে ঠাকুরের উদ্দেশ্য হাত জড়ো করে প্রণাম করে বললেন— “তুমি দেখো ঠাকুর, সব যেন আবার আগের মত হয়ে যায়।”
কিন্তু হলো তার উল্টো। পরিণীতা ঈশানের মামা বাড়িতে গিয়ে দেখে, মিষ্টি যেই ঘরে ঘুমিয়ে ছিল, সেই ঘর তখনও ভেতর থেকে বন্ধ রয়েছে। কিন্তু ও তো এমন কোনদিনও করেনা। কি মনে হতে বারবার দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে পরিণীতা। এর মধ্যে ঈশানও চলে আসে। সবাই একসঙ্গে ডাকাডাকি করতে থাকে। কিন্তু মিষ্টির কোনও উত্তর নেই। ভয় পেয়ে ওরা দরজা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু দরজা ভাঙ্গার পরে ওরা দেখে যে, ভয়টা ওরা পাচ্ছিল, তেমন কোনও কিছুই নয়। মিষ্টি তো ঘরের ভিতরেই নেই। বাথরুমটাও ভালো করে দেখে নিয়ে ওরা যায় সামনের ঝুল বারান্দাটায় । গিয়ে দেখে ওখান থেকে শাড়ি ঝুলছে। শাড়িগুলো ঈশানের মামীর। এই দৃশ্য দেখে পরিণীতা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে। ও বুঝতে পারে যে, এই শাড়ির সাহায্যেই মিষ্টি এই বাড়ি থেকে অন্যকোথাও পালিয়েছে। কিন্তু কোথায় গেল মেয়েটা? ফোনটাও তো বন্ধ। ঈশানের সঙ্গে সঙ্গে ওর মামাবাড়ির প্রত্যেকে খুব অবাক হয়ে যায়।
টেবিলের উপরে একটা কাগজ দেখতে পেয়ে পরিণীতা সেটা হাতে তুলে নেয়। দেখে ওতে লেখা রয়েছে,
“আমি এখানে থাকতে পারলাম না। আমি জানি আমার বাড়ির লোকেরা আমার মাকে ঠিক বুঝিয়ে নেবে। আর মাও রাজি হয়ে যাবে, আমাকে এই অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিতে। আমার মা আমাকে বাড়ি থেকে পালাতে সাহায্য করেছিল বলে, আমার বাড়ির লোকেরা মাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে অপরাধী বানিয়ে আমাকে নিতে এখানে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু আমি এই কম বয়সে বিয়ে করতে চাই না। আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। তাই চলে যাচ্ছি এখান থেকে। কোথায় যাচ্ছি বলছি না। চারদিন পরে ঠিক ফিরে আসব। ইতি মিষ্টি।”
এবার কি করবে পরিণীতা? যতজন চেনাজানা ছিল, সবাইকে ফোন করে। ঈশান ওর বন্ধুদেরকে ফোন করে। কিন্তু কেউ কিছু খবর দিতে পারে না। কাছাকাছি হোটেলে খোঁজে। মিষ্টি যেন কর্পূরের মত উবে গিয়েছিল। অনেক বেলা হয়ে যাওয়ায় পরিণীতা বাড়িতে ফোন করে নীলাংশুকে সবটা জানায়। কিন্তু নীলাংশু কোনও রকম কোনও প্রতিক্রিয়া জানায় না। ফোনটা রেখে দেয়। এতে পরিণীতা খুব কষ্ট পায়। কিন্তু কিছু বলে না। ও যে ভুল করেছে সেটা তো ঠিকই। আর এই ভুলটাও যে কত বড় ভুল, তা ও এখন ভালোমতোই বুঝতে পারছে। তাই ঠিক করে, ওকেই যা করার করতে হবে। শেষমেশ বিয়েটা ওকে দিতেই হবে।
পরিণীতা এমন ভাবলেও নীলাংশু কিন্তু সেই কারণে চুপ ছিল না। আসলে ও যেন কথা বলার শক্তিটাই হারিয়ে ফেলেছিল। ও এটাই মানতে পারছিল না যে, ও, ওর ছেলে, মেয়ে, বৈভবীর বংশধর। তার উপরে এমন একটা অন্যায় করে বসে আছে যে.........।
পরিণীতা শেষ পর্যন্ত থানায় গিয়ে একটা মিসিং ডায়েরি করে। সারাদিন ওর কিছু খাওয়া হয়নি। তার উপরে কাল সারারাত জেগে মামদিদার কাছ থেকে কাহিনী শুনেছে। তাইএখন ওকে বেশ বিধ্বস্ত লাগছে। নিজের মেয়েকে খুঁজে পাচ্ছে না। বৈভবী ওদের পূর্বজন্ম হলেও, ওরা যে এতটা বিশ্বাসঘাতক নয়, সেটা প্রমাণ করার সুযোগটাও চলে যাচ্ছে। সব মিলে ওর শরীরটা এত ক্লান্ত হয়ে যায় যে, মাথা ঘুরে যায়।
ঈশান ওকে কোনওরকমে ধরে রাস্তার ধারে একটা গাছের নিচে বসায়। হ্যাঁ, ও যেখানে যেখানে যা যা করেছে, ঈশান সব সময় ওর পাশে ছিল। ছেলেটা এক মুহূর্তের জন্যও ওকে ছেড়ে যায়নি। ওর ব্যবহার দেখে পরিণীতা খুব ভালোমতোই বুঝতে পারে যে, এই ছেলেটা ওর মেয়েকে ভীষণ ভালোবাসে। এদিকে ঈশান ওর দিকে একটা জলের বোতল বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “আন্টি আপনি আমাকে কেন ডেকেছিলেন, সেটা তো বললেন না। মানে, এত ঝামেলার মধ্যে সেটাই জানা হয়নি।”
“আসলে বাবা, তোমাকে আমি একটা অন্য কারণে ডেকেছিলাম। মানে, এই চারদিনের মধ্যে মিষ্টির বিয়ে দেওয়াটা খুব দরকার। তা না হলে বিশাল বড় বিপদ আসতে চলেছে। ওকে খুঁজে পেলে তুমি ওকে বিয়ে করবে? জানি একটা অন্যায় কথা বলছি। কিন্তু যা বলছি তা সত্যি বলছি। যদি তুমি চাও, আমি তোমার বাবা মায়ের কাছেও তোমাকে ভিক্ষা চাইতে পারি এই বিয়েটা হওয়ার জন্য।”
সঙ্গে সঙ্গে ঈশান বলে— “এক মিনিটে আন্টি। আমি নন্দিনীকে ভীষণ ভালোবাসি। ওকে ছাড়া আমি অন্য কাউকে বিয়ে করার কথা ভাবতেও পারিনা। কিন্তু তাই বলে এখন এই মুহূর্তে......।”
ঈশান ওর পুরো কথাটা শেষ হওয়ার আগেই পরিণীতা কেঁদে ফেলে। আর পারছে না ও এইসমস্ত কিছু নিতে। কিন্তু ওকে কাঁদতে দেখে ঈশান বলে— “ঠিক আছে আন্টি আপনি কাঁদবেন না। আগে ওকে খুঁজে পাই। ওকে খুঁজে পাওয়াটা এই মুহূর্তে সব থেকে জরুরি। তারপর যা হওয়ার হবে। এখন চলুন আপনাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি।”
বাড়িতে ফিরে এসে ওর চোখ মুখের অবস্থা দেখে সবাই ভয় পেয়ে যায়। এমনিতেই ওর সঙ্গে ভালো করে কেউ কথা বলছিল না, ওই একটা অন্যায় সবার কাছে যে ক্ষমার অযোগ্য। সত্যিই তাই... সেই কারণে তো সারাদিন বাড়ির বাইরে থাকা সত্ত্বেও কেউ ওর কোন খবর নেয়নি। সব সময় নিজের বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষের খেয়াল রেখেছে ও। ছোট হওয়া সত্ত্বেও একান্নবর্তী পরিবার ভালবাসে বলে সবাইকে আগলে আগলে রাখতে আনন্দ পেত। অথচ আজ ও যে ভুলটা করেছে, তার জন্য কেউ ওকে ক্ষমা করতে পারছ না। ওতো নিজেও নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছে, কিন্তু তবুও.........
ঘরের ভিতরে গিয়ে স্নান করে বাইরে বেরিয়ে আসতেই দেখে মামদিদা ওর ঘরে খাবারের থালা হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আর এটা দেখে পরিণীতা মামদিদার গলা ধরে কেঁদে ফেলে। তারপর বলে— “ঠাম আমি কিছু করতে পারলাম না।”
ওকে এইভাবে কষ্ট পেতে দেখে মামদিদার মনটাও গলে গেল। অন্যায় পরিণীতা করেছে। হয়তো পুরো পরিবারটা শেষ হয়ে যাবে। সেই কারণেই তিনি পারলেন না যে, যে’কটা দিন সময় হাতে আছে, সে’কটা দিন এইরকম ভাবে মান অভিমান করে কাটিয়ে দিতে। তাছাড়া তিনি পরিণীতাকে সত্যিই খুব ভালোবেসে ছিলেন। তাই বললেন— “তুই একটা অন্যায় করেছিস। কিন্তু সেটা ঠিক করার চেষ্টাও তো করেছিস। তবে আমাকে একটা কথা বল, তুই তোর চেষ্টায় সফল হলি না কেন? আজ পর্যন্ত তো তুই যেই চেষ্টা করেছিস, সেটা সফল হয়েইছে। এমন তো কোনোদিনও হয়নি। তাহলে কি হলো এইবারে?”
“আমি ওকে আনতে গিয়েছিলাম ঠাম। কিন্তু ও কোথায় চলে গেছে। আমি ওকে যেখানে থাকতে বলেছিলাম, সেখান থেকে ও অন্য কোথাও চলে গেছেন। দেখো একটা চিঠি লিখে রেখে গেছে।”
মিষ্টির কোনও খবর পাওয়া গেল না। আর হাতে যে চারটে দিন ছিল, এই চারটে দিন পেরিয়ে যায়।
৫
পঞ্চম দিনের দিন মিষ্টি নিজে থেকেই বাড়িতে ফিরে আসে। আর ওকে দেখতে পেয়েই সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়। সময়টা তখন সকাল সাড়ে সাতটা।
পরিণীতা বাইরে বেরিয়ে মিষ্টিকে দেখতে পেয়েই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। সামনে এসে ঠাস ঠাস করে বেশ কয়েকটা চড় বসিয়ে বলে— “নিজেকে খুব বুদ্ধিমতি বলে মনে হয় তাই না? আমি তোকে পালাতে সাহায্য করেছিলাম কারণ, সেই মুহূর্তে আমার সেটাই সঠিক বলে মনে হয়েছিল। আর যদি তোকে আমি ফিরিয়ে আনতে চাই, সেটাও আমার ঠিক মনে হলেই করব। তুই তো আমাকে খুব ভালোমতোই জানিস যে, আমার মন যেটা বলে আমি সবসময় সেটাই করি। আজ অব্দি তোর জন্য আমি যা যা করেছি, সমস্ত কিছু ঠিক হয়েছে। তাহলে আজকে তোকে কে অধিকার দিয়েছে যে, তুই আমার ঠিক করে দেওয়ার জায়গা থেকে অন্য কোথাও চলে গেলি। তুই কিন্তু নিজেও জানিস না, তুই কত বড় একটা ভুল করলি। নিজের মায়ের উপরে কি একটুও বিশ্বাস নেই? নিজের বাবার মাথাটা নত করতে তোর একটু লজ্জা করল না? আমার ওপর দিয়ে যেতে তোকে কে বলেছে? কোথায় গিয়েছিলি বল?”
কিন্তু মিষ্টি কিছু বলার আগেই ওর মেজো জেঠিমা বলে ওঠে— “দেখো গে কোথাও থেকে হয়তো মুখ কালো করে ফিরেছে। এই বংশ তো আমাদের রাজপরিবারে এসেছে সবকিছুর ধ্বংস করতে।”
“মানে...! তুমি কি বলছো মেজ জেম্মা? আমি আমার বন্ধুর দেশের বাড়িতে ছিলাম। টিউশনের একটা বন্ধু। তাকে ঈশান চেনে না। আর তোমাদের বংশ মানে? তোমাদের রাজপরিবার কেন বলছ? আমরাও এই পরিবারেরই। আমরাও তো রাজপরিবার। তাহলে এই কথা কেন বলছ?”
“বাহ বাহ। ঠিক তোর রক্ত কথা বলতে শুরু করেছে না? তোরা এই রাজপরিবারের কেউ না। তোরা তো......”
এই কথাটা শেষ করতে পারেনা কি মামদিদা চিৎকার করে বলে ওঠেন— “মেজ নাত বৌ, মুখের লাগাম দাও। কথা বলতে বলতে তুমি এমন জায়গায় পৌঁছে যাও যে, তার কোনও খেই থাকে না। মিষ্টি একটা বাচ্চা মেয়ে। ওর সঙ্গে এমন ভাবে কথা বলতে তোমার বিবেকে বাঁধছে না? আমি সেই দিনই বলেছি, আমি যে কথাগুলো বলছি, তা নিয়ে আর কেউ কোনো আলোচনা করবে না। তাহলে তোমার সাহস কি করে হয়, এখন এই কথাগুলো বলার। তাও এমন একজনকে বলেছ, যে কিছুই জানে না।
যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। ছোট নাত বৌ শোন, তোকে আমি একটা কথা বলছি। মন দিয়ে শোন। মিষ্টিকে আর বকাবকি করবি না। শুধু ওকে বুঝিয়ে বলে দে যে, ও কি কি করবে, কি কি করবে না। এইবারে মিষ্টি যেন তোর কথার খেলাপ না করে। নিজের বুদ্ধি লাগিয়ে ও যেন কিছু করার চেষ্টা না করে। দেখ, ও অবিবাহিত। তাই ওকে সিড়ি করেই কিন্তু অতীত ফিরে আসবে। ওকে যে কতোটা সাবধানে থাকতে হবে, সেটা ওর মাথায় ভালো করে ঢুকিয়ে দিবি। তবে হ্যাঁ, যেইটুকু সবার ভালোর জন্য বলা দরকার, সেইটুকুই বলবি। সেই সঙ্গে এটাও বলবি যে, ওর যদি কোনও কিছু অস্বাভাবিক বলে মনে হয়, তাহলে যেন সঙ্গে সঙ্গে তোকে জানায়। আর তুই আমাদেরকে।
আর একটা কথা আমি বাড়ির সবার উদ্দেশ্যে বলছি। আজ এখন থেকে যা যা হয়ে গিয়েছে তা নিয়ে আমরা আর কেউ কোন কথা বলব না। মিষ্টিকে বা আমার নাতিকে বা পরিণীতাকে কেউ কিছু বলবে না। আমাদের অবস্থা আগের মত স্বাভাবিক থাকবে। যাতে মিষ্টি যদি এমন কিছু অনুভব করে থাকে, তাহলে তা যেন ও নির্দ্বিধায় আমাদেরকে বলতে পারে। বিশেষ করে মেজ নাত বৌ, তুমি এটা মাথায় রাখবে। তোমার মুখ বড্ড বেশী চলে। আর আজকাল যেন আরও বেশি বেশি চলছে।” এটা বলে মামদিদা নিজের ঘরে চলে যান।
এমন সময় মামদিদা বললেন— “ভোরের আলো ফুটতে চলল। তোমরা নিজের নিজের ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করো। সকাল হলে দেখা যাক কি করা যায়। আর ছোট দাদুভাই দেখো, তোমার আর কোনও ভাইবোন নেই। তোমার বাবা মা বেঁচে নেই। তাই বৈভবী যদি মুক্তি পেয়ে যায়, তাহলে কিন্তু ও তোমার বা মিষ্টির বা ওর ভাইয়ের দ্বারা নিজের কার্যসিদ্ধি করার চেষ্টা করবে। তবে তোমার ছেলেকে আমি এইসবের বাইরে ধরছি এই জন্যই, তার কারন, ও এখন অনেকটাই ছোট। ওকে দিয়ে আদৌ বৈভবী ওর কার্যসিদ্ধি করাতে পারবে কিনা বলতে পারছি না। তবুও সাবধান থাকতে অসুবিধা কোথায়। এবার শোনো, যদি বাকি তিন দিনের মধ্যে মিষ্টির বিয়ে দিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে আলাদা কথা। যদিও সেটা একপ্রকার অসম্ভব। তবুও...।
আর হ্যাঁ, ঘরের সবাই কিন্তু অত্যন্ত সাবধানে থেকো। কারও সঙ্গে কোনও রকম কোনও অসস্তিকর ঘটনা ঘটলে, কোনও কিছু করার আগে আমাকে এই বাড়ির লোকেদেরকে সবাইকে সবকিছু জানাবে। আমার কাহিনী থেকে তোমরা খুব ভালোমতোই বুঝতে পেরেছ যে, বৈভবী মুক্তি পেয়ে গেলে ও শুধুমাত্র যে কোনও নির্দিষ্ট একজনকে নিজের বশবর্তী করার চেষ্টা করবে, তা না। এই বংশের যাকেই দুর্বল মনের পাবে, তাকেই কিন্তু নিজের বশবর্তী করার চেষ্টা করবে। কিন্তু আমরা কেউ তো আর নিজে থেকে বলতে পারি না যে, কার মন দুর্বল। সেটা একটা আত্মার পক্ষেই বোঝা সম্ভব। এখন যাও সবাই শুতে যাও।” বলে নিজের ঘরে চলে যান মামদিদা।
৪
নিজের ঘরে গিয়ে পরিণীতা চুপচাপ শুয়ে পড়ে। নীলাংশু-ও গিয়ে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে পড়ে। দু’জনে পাশাপাশি শুয়ে থাকলেও ওদের চিন্তা ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। দুজনে দুটো অন্য কথা ভাবছিল। যদিও দুজনেরই চিন্তা ধারা জুড়ে রয়েছে মামদিদার বলা কাহিনী।
পরিণীতার বারবার মনে হচ্ছে, মিষ্টিকে পালাতে সাহায্য করে ও কি কিছু ভুল করল? তাহলে কি ওর মিষ্টিকে ফিরিয়ে নিয়ে এসে বিয়েটা দিয়ে দেওয়া উচিত? এদিকে নীলাংশু তো এটাই মেনে নিতে পারছে না যে, ও বৈভবীর বংশধর। এত বিস্তারিত ভাবে না হলেও এই কাহিনী ও অনেকবার শুনেছে। নতুন কোনও সদস্য ঘরে আসলেই তাকে এই কাহিনী শোনানো হয়। আর বাড়ির মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে তাদেরকেও কাহিনীটা জানানো হয়। বারবার শুনতে শুনতে ওর মুখস্থ হয়ে গিয়েছে সবটা। যতবার এই কাহিনী ও শুনেছে, ততবার বৈভবীর প্রতি ওর ঘৃণাটা বেড়েছে। অথচ আজ ও জানতে পারছে, ও যে বৈভবীকে এতটা ঘৃণা করেছে, সে আসলে ওর পূর্বপুরুষ। সব জানা সত্ত্বেও অতীতের মতো আজও এই পরিবারের লোকেরা ওই বৈভবীর বংশধরদের আপন করে রেখেছে। অথচ ও কি করল, সেই ভালোবাসার দাম দিতে পারল না। নিজের এই গোপন কীর্তি কথা ও কেমন করে সবাইকে বলবে।
শুয়ে শুয়ে বেশ অনেকক্ষণ ধরে চিন্তা-ভাবনা করে পরিণীতা। তারপর ঠিক করে, কালকে ও মিষ্টিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে। আর ঈশানকে রাজী করাবে ওকে বিয়ে করার জন্য। এটাও বলবে যে, পরে না মিল হলে ও নির্দ্বিধায় মিষ্টিকে ছেড়ে দিতে পারে। বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যেতে পারে। কেউ ওকে কিছু বলবে না। কোনও রকম কোনও বাধা মিষ্টির পরিবারের থেকে ওর দিকে যাবে না। দরকার হলে এটা ও কোর্টের কাগজে লিখে দেবে। মিষ্টির বিয়ে দিতেই হবে। হ্যাঁ, এটাই ঠিক হবে। মিষ্টির বিয়ে দিলেই একমাত্র এটা প্রমাণ করা যাবে যে, বৈভবীর বংশধর হলেও সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তীত হয়ে তারা এখন ভাল মানুষে পরিণত হয়েছে। আচ্ছা যদি ঈশান রাজি না হয়, তাহলে…………?
সকাল হতে না হতেই পরিণীতা মিষ্টির ফোনে ফোন করে। কিন্তু ফোনের যান্ত্রিক আওয়াজ জানান দেয় যে, সেটা বন্ধ রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ঈশানের মামার ফোনে ফোন করে। আর বলে, মিষ্টিকে ফোন দিতে। এই কথা শুনে মিষ্টিকে ফোন দিতে গেলে, ওর মামা দেখে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। বেশ কয়েকবার ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে, সেই কথাটা সে পরিণীতাকে জানায়। এই কথাটা শোনার পরে ও বলে যে, ও গিয়ে মিষ্টিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে। দরকার নেই ওখানে আর থাকার। তারপর ঈশানকেও ফোন করে ওর মামা বাড়িতে যেতে বলে। আজকের দিনটা বাদ দিলে, আর মাত্র তিনটে দিন হাতে আছে। পরিণীতা ফোন পাওয়ায় ঈশান কোনও প্রশ্ন না করেই মামাবাড়িতে যেতে রাজি হয়ে যায়। পরিণীতা ভাবে, একবার ঈশান যদি বিয়েতে রাজি হয়ে যায়, তাহলে ওর বাবা মায়ের পায়ে পড়ে যাবে, যাতে ওনারাও এই বিয়েতে রাজি হয়ে যান। দোষ যখন ওর, তখন সেটা ঠিক করতে ও যেকোনও কারোর পায়ে পড়তে রাজি আছে।
ঈশানকে ফোন করার পরে, নিজে তৈরী হয়ে পরিণীতা বেরিয়ে যায়। দোতলার ঘরের জানালা দিয়ে মামদিদা ওকে বেরোতে দেখে একটু হাসলেন। বয়স তো আর কম হলো না। তাই তিনি খুব সহজেই বুঝতে পেরেছেন যে, পরিণীতা কোথায় যাচ্ছে। শুধু মনে মনে ঠাকুরের উদ্দেশ্য হাত জড়ো করে প্রণাম করে বললেন— “তুমি দেখো ঠাকুর, সব যেন আবার আগের মত হয়ে যায়।”
কিন্তু হলো তার উল্টো। পরিণীতা ঈশানের মামা বাড়িতে গিয়ে দেখে, মিষ্টি যেই ঘরে ঘুমিয়ে ছিল, সেই ঘর তখনও ভেতর থেকে বন্ধ রয়েছে। কিন্তু ও তো এমন কোনদিনও করেনা। কি মনে হতে বারবার দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে পরিণীতা। এর মধ্যে ঈশানও চলে আসে। সবাই একসঙ্গে ডাকাডাকি করতে থাকে। কিন্তু মিষ্টির কোনও উত্তর নেই। ভয় পেয়ে ওরা দরজা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু দরজা ভাঙ্গার পরে ওরা দেখে যে, ভয়টা ওরা পাচ্ছিল, তেমন কোনও কিছুই নয়। মিষ্টি তো ঘরের ভিতরেই নেই। বাথরুমটাও ভালো করে দেখে নিয়ে ওরা যায় সামনের ঝুল বারান্দাটায় । গিয়ে দেখে ওখান থেকে শাড়ি ঝুলছে। শাড়িগুলো ঈশানের মামীর। এই দৃশ্য দেখে পরিণীতা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে। ও বুঝতে পারে যে, এই শাড়ির সাহায্যেই মিষ্টি এই বাড়ি থেকে অন্যকোথাও পালিয়েছে। কিন্তু কোথায় গেল মেয়েটা? ফোনটাও তো বন্ধ। ঈশানের সঙ্গে সঙ্গে ওর মামাবাড়ির প্রত্যেকে খুব অবাক হয়ে যায়।
টেবিলের উপরে একটা কাগজ দেখতে পেয়ে পরিণীতা সেটা হাতে তুলে নেয়। দেখে ওতে লেখা রয়েছে,
“আমি এখানে থাকতে পারলাম না। আমি জানি আমার বাড়ির লোকেরা আমার মাকে ঠিক বুঝিয়ে নেবে। আর মাও রাজি হয়ে যাবে, আমাকে এই অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিতে। আমার মা আমাকে বাড়ি থেকে পালাতে সাহায্য করেছিল বলে, আমার বাড়ির লোকেরা মাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে অপরাধী বানিয়ে আমাকে নিতে এখানে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু আমি এই কম বয়সে বিয়ে করতে চাই না। আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। তাই চলে যাচ্ছি এখান থেকে। কোথায় যাচ্ছি বলছি না। চারদিন পরে ঠিক ফিরে আসব। ইতি মিষ্টি।”
এবার কি করবে পরিণীতা? যতজন চেনাজানা ছিল, সবাইকে ফোন করে। ঈশান ওর বন্ধুদেরকে ফোন করে। কিন্তু কেউ কিছু খবর দিতে পারে না। কাছাকাছি হোটেলে খোঁজে। মিষ্টি যেন কর্পূরের মত উবে গিয়েছিল। অনেক বেলা হয়ে যাওয়ায় পরিণীতা বাড়িতে ফোন করে নীলাংশুকে সবটা জানায়। কিন্তু নীলাংশু কোনও রকম কোনও প্রতিক্রিয়া জানায় না। ফোনটা রেখে দেয়। এতে পরিণীতা খুব কষ্ট পায়। কিন্তু কিছু বলে না। ও যে ভুল করেছে সেটা তো ঠিকই। আর এই ভুলটাও যে কত বড় ভুল, তা ও এখন ভালোমতোই বুঝতে পারছে। তাই ঠিক করে, ওকেই যা করার করতে হবে। শেষমেশ বিয়েটা ওকে দিতেই হবে।
পরিণীতা এমন ভাবলেও নীলাংশু কিন্তু সেই কারণে চুপ ছিল না। আসলে ও যেন কথা বলার শক্তিটাই হারিয়ে ফেলেছিল। ও এটাই মানতে পারছিল না যে, ও, ওর ছেলে, মেয়ে, বৈভবীর বংশধর। তার উপরে এমন একটা অন্যায় করে বসে আছে যে.........।
পরিণীতা শেষ পর্যন্ত থানায় গিয়ে একটা মিসিং ডায়েরি করে। সারাদিন ওর কিছু খাওয়া হয়নি। তার উপরে কাল সারারাত জেগে মামদিদার কাছ থেকে কাহিনী শুনেছে। তাইএখন ওকে বেশ বিধ্বস্ত লাগছে। নিজের মেয়েকে খুঁজে পাচ্ছে না। বৈভবী ওদের পূর্বজন্ম হলেও, ওরা যে এতটা বিশ্বাসঘাতক নয়, সেটা প্রমাণ করার সুযোগটাও চলে যাচ্ছে। সব মিলে ওর শরীরটা এত ক্লান্ত হয়ে যায় যে, মাথা ঘুরে যায়।
ঈশান ওকে কোনওরকমে ধরে রাস্তার ধারে একটা গাছের নিচে বসায়। হ্যাঁ, ও যেখানে যেখানে যা যা করেছে, ঈশান সব সময় ওর পাশে ছিল। ছেলেটা এক মুহূর্তের জন্যও ওকে ছেড়ে যায়নি। ওর ব্যবহার দেখে পরিণীতা খুব ভালোমতোই বুঝতে পারে যে, এই ছেলেটা ওর মেয়েকে ভীষণ ভালোবাসে। এদিকে ঈশান ওর দিকে একটা জলের বোতল বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “আন্টি আপনি আমাকে কেন ডেকেছিলেন, সেটা তো বললেন না। মানে, এত ঝামেলার মধ্যে সেটাই জানা হয়নি।”
“আসলে বাবা, তোমাকে আমি একটা অন্য কারণে ডেকেছিলাম। মানে, এই চারদিনের মধ্যে মিষ্টির বিয়ে দেওয়াটা খুব দরকার। তা না হলে বিশাল বড় বিপদ আসতে চলেছে। ওকে খুঁজে পেলে তুমি ওকে বিয়ে করবে? জানি একটা অন্যায় কথা বলছি। কিন্তু যা বলছি তা সত্যি বলছি। যদি তুমি চাও, আমি তোমার বাবা মায়ের কাছেও তোমাকে ভিক্ষা চাইতে পারি এই বিয়েটা হওয়ার জন্য।”
সঙ্গে সঙ্গে ঈশান বলে— “এক মিনিটে আন্টি। আমি নন্দিনীকে ভীষণ ভালোবাসি। ওকে ছাড়া আমি অন্য কাউকে বিয়ে করার কথা ভাবতেও পারিনা। কিন্তু তাই বলে এখন এই মুহূর্তে......।”
ঈশান ওর পুরো কথাটা শেষ হওয়ার আগেই পরিণীতা কেঁদে ফেলে। আর পারছে না ও এইসমস্ত কিছু নিতে। কিন্তু ওকে কাঁদতে দেখে ঈশান বলে— “ঠিক আছে আন্টি আপনি কাঁদবেন না। আগে ওকে খুঁজে পাই। ওকে খুঁজে পাওয়াটা এই মুহূর্তে সব থেকে জরুরি। তারপর যা হওয়ার হবে। এখন চলুন আপনাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি।”
বাড়িতে ফিরে এসে ওর চোখ মুখের অবস্থা দেখে সবাই ভয় পেয়ে যায়। এমনিতেই ওর সঙ্গে ভালো করে কেউ কথা বলছিল না, ওই একটা অন্যায় সবার কাছে যে ক্ষমার অযোগ্য। সত্যিই তাই... সেই কারণে তো সারাদিন বাড়ির বাইরে থাকা সত্ত্বেও কেউ ওর কোন খবর নেয়নি। সব সময় নিজের বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষের খেয়াল রেখেছে ও। ছোট হওয়া সত্ত্বেও একান্নবর্তী পরিবার ভালবাসে বলে সবাইকে আগলে আগলে রাখতে আনন্দ পেত। অথচ আজ ও যে ভুলটা করেছে, তার জন্য কেউ ওকে ক্ষমা করতে পারছ না। ওতো নিজেও নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছে, কিন্তু তবুও.........
ঘরের ভিতরে গিয়ে স্নান করে বাইরে বেরিয়ে আসতেই দেখে মামদিদা ওর ঘরে খাবারের থালা হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আর এটা দেখে পরিণীতা মামদিদার গলা ধরে কেঁদে ফেলে। তারপর বলে— “ঠাম আমি কিছু করতে পারলাম না।”
ওকে এইভাবে কষ্ট পেতে দেখে মামদিদার মনটাও গলে গেল। অন্যায় পরিণীতা করেছে। হয়তো পুরো পরিবারটা শেষ হয়ে যাবে। সেই কারণেই তিনি পারলেন না যে, যে’কটা দিন সময় হাতে আছে, সে’কটা দিন এইরকম ভাবে মান অভিমান করে কাটিয়ে দিতে। তাছাড়া তিনি পরিণীতাকে সত্যিই খুব ভালোবেসে ছিলেন। তাই বললেন— “তুই একটা অন্যায় করেছিস। কিন্তু সেটা ঠিক করার চেষ্টাও তো করেছিস। তবে আমাকে একটা কথা বল, তুই তোর চেষ্টায় সফল হলি না কেন? আজ পর্যন্ত তো তুই যেই চেষ্টা করেছিস, সেটা সফল হয়েইছে। এমন তো কোনোদিনও হয়নি। তাহলে কি হলো এইবারে?”
“আমি ওকে আনতে গিয়েছিলাম ঠাম। কিন্তু ও কোথায় চলে গেছে। আমি ওকে যেখানে থাকতে বলেছিলাম, সেখান থেকে ও অন্য কোথাও চলে গেছেন। দেখো একটা চিঠি লিখে রেখে গেছে।”
মিষ্টির কোনও খবর পাওয়া গেল না। আর হাতে যে চারটে দিন ছিল, এই চারটে দিন পেরিয়ে যায়।
৫
পঞ্চম দিনের দিন মিষ্টি নিজে থেকেই বাড়িতে ফিরে আসে। আর ওকে দেখতে পেয়েই সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়। সময়টা তখন সকাল সাড়ে সাতটা।
পরিণীতা বাইরে বেরিয়ে মিষ্টিকে দেখতে পেয়েই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। সামনে এসে ঠাস ঠাস করে বেশ কয়েকটা চড় বসিয়ে বলে— “নিজেকে খুব বুদ্ধিমতি বলে মনে হয় তাই না? আমি তোকে পালাতে সাহায্য করেছিলাম কারণ, সেই মুহূর্তে আমার সেটাই সঠিক বলে মনে হয়েছিল। আর যদি তোকে আমি ফিরিয়ে আনতে চাই, সেটাও আমার ঠিক মনে হলেই করব। তুই তো আমাকে খুব ভালোমতোই জানিস যে, আমার মন যেটা বলে আমি সবসময় সেটাই করি। আজ অব্দি তোর জন্য আমি যা যা করেছি, সমস্ত কিছু ঠিক হয়েছে। তাহলে আজকে তোকে কে অধিকার দিয়েছে যে, তুই আমার ঠিক করে দেওয়ার জায়গা থেকে অন্য কোথাও চলে গেলি। তুই কিন্তু নিজেও জানিস না, তুই কত বড় একটা ভুল করলি। নিজের মায়ের উপরে কি একটুও বিশ্বাস নেই? নিজের বাবার মাথাটা নত করতে তোর একটু লজ্জা করল না? আমার ওপর দিয়ে যেতে তোকে কে বলেছে? কোথায় গিয়েছিলি বল?”
কিন্তু মিষ্টি কিছু বলার আগেই ওর মেজো জেঠিমা বলে ওঠে— “দেখো গে কোথাও থেকে হয়তো মুখ কালো করে ফিরেছে। এই বংশ তো আমাদের রাজপরিবারে এসেছে সবকিছুর ধ্বংস করতে।”
“মানে...! তুমি কি বলছো মেজ জেম্মা? আমি আমার বন্ধুর দেশের বাড়িতে ছিলাম। টিউশনের একটা বন্ধু। তাকে ঈশান চেনে না। আর তোমাদের বংশ মানে? তোমাদের রাজপরিবার কেন বলছ? আমরাও এই পরিবারেরই। আমরাও তো রাজপরিবার। তাহলে এই কথা কেন বলছ?”
“বাহ বাহ। ঠিক তোর রক্ত কথা বলতে শুরু করেছে না? তোরা এই রাজপরিবারের কেউ না। তোরা তো......”
এই কথাটা শেষ করতে পারেনা কি মামদিদা চিৎকার করে বলে ওঠেন— “মেজ নাত বৌ, মুখের লাগাম দাও। কথা বলতে বলতে তুমি এমন জায়গায় পৌঁছে যাও যে, তার কোনও খেই থাকে না। মিষ্টি একটা বাচ্চা মেয়ে। ওর সঙ্গে এমন ভাবে কথা বলতে তোমার বিবেকে বাঁধছে না? আমি সেই দিনই বলেছি, আমি যে কথাগুলো বলছি, তা নিয়ে আর কেউ কোনো আলোচনা করবে না। তাহলে তোমার সাহস কি করে হয়, এখন এই কথাগুলো বলার। তাও এমন একজনকে বলেছ, যে কিছুই জানে না।
যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। ছোট নাত বৌ শোন, তোকে আমি একটা কথা বলছি। মন দিয়ে শোন। মিষ্টিকে আর বকাবকি করবি না। শুধু ওকে বুঝিয়ে বলে দে যে, ও কি কি করবে, কি কি করবে না। এইবারে মিষ্টি যেন তোর কথার খেলাপ না করে। নিজের বুদ্ধি লাগিয়ে ও যেন কিছু করার চেষ্টা না করে। দেখ, ও অবিবাহিত। তাই ওকে সিড়ি করেই কিন্তু অতীত ফিরে আসবে। ওকে যে কতোটা সাবধানে থাকতে হবে, সেটা ওর মাথায় ভালো করে ঢুকিয়ে দিবি। তবে হ্যাঁ, যেইটুকু সবার ভালোর জন্য বলা দরকার, সেইটুকুই বলবি। সেই সঙ্গে এটাও বলবি যে, ওর যদি কোনও কিছু অস্বাভাবিক বলে মনে হয়, তাহলে যেন সঙ্গে সঙ্গে তোকে জানায়। আর তুই আমাদেরকে।
আর একটা কথা আমি বাড়ির সবার উদ্দেশ্যে বলছি। আজ এখন থেকে যা যা হয়ে গিয়েছে তা নিয়ে আমরা আর কেউ কোন কথা বলব না। মিষ্টিকে বা আমার নাতিকে বা পরিণীতাকে কেউ কিছু বলবে না। আমাদের অবস্থা আগের মত স্বাভাবিক থাকবে। যাতে মিষ্টি যদি এমন কিছু অনুভব করে থাকে, তাহলে তা যেন ও নির্দ্বিধায় আমাদেরকে বলতে পারে। বিশেষ করে মেজ নাত বৌ, তুমি এটা মাথায় রাখবে। তোমার মুখ বড্ড বেশী চলে। আর আজকাল যেন আরও বেশি বেশি চলছে।” এটা বলে মামদিদা নিজের ঘরে চলে যান।
মিষ্টি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয় ছাদে চলে যায়। ও জানে যে, মন খারাপ থাকলে ওর বাবা ছাদে আরামকেদারায় বসে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে রাত হোক বা সকাল। ছাদে গিয়ে ওর বাবার পায়ের কাছে বসে ক্ষমা চাইল। নীলাংশু চোখ মেলে তাকালেও একটাও কোন কথা বলে না। মিষ্টি নানা কথা বলে ওকে মানানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তবুও নীলাংশু চুপ করেই থাকে। ওর বাবাকে দিয়ে যখন একটাও কথা বলাতে পারেনা, তখন মিষ্টি বলে— “আমার জন্য বিপদ আসবে তো? আমি সব থেকে বড় ভুলটা করেছি। মা ভুল করলেও সেটা ঠিক করে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাই আমি যখন ভুল করেছি, তখন সেই ভুল শোধরানোর দায়িত্ব আমার। আমি যদি না থাকি, তাহলে কোনও বিপদ আসবে না। হ্যাঁ ঠিক এটাই আমি করব। আমি নিজেই নিজেকে শেষ করে দেব।” বলে ওখান থেকে চলে যেতে উদ্যত হতেই নীলাংশু ওর হাত ধরে টেনে দাঁড় করিয়ে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে। ওর বাবার এইরকম ব্যবহারে মিষ্টি চমকে যায়।
“বাবা কি হল...! তুমি এমনভাবে কাঁদছো কেন?”
“তোকে একটা কথা বলছি। তোর মা তোর মামদিদা যা যা বলবে সব মেনে নিবি। শুধু মানবি না, অক্ষরে অক্ষরে পালনও করবে। আমাদের পূর্বপুরুষ যতই খারাপ হোক না কেন, আমরা যে খারাপ নই সেটা আমাদেরকে প্রমাণ করতেই হবে। বল, আমার এই কথাটা মেনে চলবি তো? আমার সব কথা রাখবি তো?”
“কি বলছ কি বাবা? তুমি আমাদের কোন খারাপ পূর্বপুরুষের কথা বলছ? তুমি আমাদের নিজেদের পরিবারের লোকদেরকে খারাপ বলছো? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি ফেরার পরে মেজ জেম্মা কিছু একটা কথা বলছিল। আমি বুঝতে পারিনি। মামদিদা তখন থামিয়ে দিল। আমাকে একটু খুলে বলবে বাবা কি হচ্ছে কি? চার দিনের মধ্যে কি এমন হয়েছে?”
“না কিছু জানতে হবে না তোকে। শুধু আমার কথাগুলো মেনে চললেই হবে। তোর এখনও সেই বয়স হয়নি। যদি তোর বিয়ে হয়ে যেত, তাহলেও না হয় হতো।” বাকি কথাটা মনে মনে বলে— “তুই ঠিক থাকলে হয়তো আমার অন্যায়টাও ঢেকে যাবে।”
৬
একটানা ঝমঝম করে একটা আওয়াজ ভেসে আসছে। ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আলতা পরা পা দুটো। আর তাতে রয়েছে বেশ মোটা একজোড়া নুপূর। যা প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে ঝনঝন করে বাজে চলেছে। একটু উপর দিকে তাকালে দেখা যায়, লাল রঙের জড়ি দেওয়া শাড়ি। কিন্তু এটা ঠিক কী ধরনের শাড়ি, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। আরও ওপরে উঠলে দেখা যায়, কোমরবন্ধনী রয়েছে। একটা হাত সোজা নামানো আর একটা হাত কোমরে রাখা। গলায় রয়েছে নানা রকমের সোনার গয়না। কি চাকচিক্য তার। নাকের নোলকটা বেশ বড়। চুলটা বিনুনী করে ছাড়া রয়েছে। টিকলিটাও ভীষণ সুন্দর। কানে এত বড় বড় ভুল রয়েছে যে, দেখে মনে হচ্ছে এই বুঝি কানটা ছিঁড়ে যাবে। এইরকম সুন্দর সাজে সজ্জিত হয়ে মেয়েটি হেঁটে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে।
হঠাৎ করেই দৃশ্য বদল।
ওই মেয়েটি উলঙ্গ হয়ে গেল। গায়ে অলংকার ছাড়া আর কিছুই রইল না। এখন দেখা গেল চুলটাও খোলা রয়েছে। কি বিশাল চুল, কোমর ছাড়িয়ে গেছে সেই চুল। হাতে চকচক করা একটা জিনিস দেখা গেল। ভালো করে লক্ষ্য করতে দেখা গেল একটা বাঁকানো তরোয়ালের মতো কিছু একটা। মেয়েটির দৃষ্টি অনুসরন করলে দেখা যায়, সামনে হাড়িকাঠে একটা মেয়ে মাথা দিয়ে বসে আছে। চারিদিক অন্ধকার হলেও মশাল আর সামনে জ্বলতে থাকা অগ্নিকুণ্ডের আগুনে সব কিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মেয়েটির হাতগুলো পিছনে বাধা রয়েছে। সে চিৎকার করে কাঁদছে আর ওকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য আকুতি জানাচ্ছে। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, তার মনে সেই দৃশ্য দেখে একটুও দয়ার সঞ্চার হয়নি। মুহূর্তের অপেক্ষা। তারপর এক কোপে ওই মেয়েটির মাথা ধড় থেকে আলাদা হয়ে যায়।
এবার “না………আ......আ” করে চিৎকার করে বিছানায় উঠে বসল মিষ্টি। দেখে, ওর গলা শুকিয়ে কাঠ। গোটা গা ঘামে ভিজে যাচ্ছে। কি দেখলো এটা ও? এ কেমন ধরনের স্বপ্ন? তাহলে কি এই স্বপ্নের সঙ্গে ওর পরিবারের অতীত জড়িয়ে আছে? কিন্তু সেই ঘটনা হয়েছে দু’মাস মত পেরিয়ে গেছে। কই এতদিন তো কিছুই হয়নি। জল খেতে গিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে, রাত বারোটা বেজে পাঁচ মিনিট। তারমানে ও স্বপ্নটা দেখেছে ওই বারোটার দিক করে। এটা কি শুধুই স্বপ্ন?
আর কিছু ভাববে না, এটা মনে করে ও শুয়ে পড়ে। পাশ বালিশটাকে জড়িয়ে ধরে জোর করে চোখটা বন্ধ করে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে ও রাতের পুরো স্বপ্নটা বেমালুম ভুলে যায়। ঘুম ভেঙ্গে ছিল। কিন্তু কেন সেটা ভুলে গেছে।
সারাদিন সব ঠিকঠাক থাকে। রাত বারোটার সময় একটা চিৎকার চেঁচামেচিতে মিষ্টির ঘুম ভেঙে যায়। বুঝতে পারে, আওয়াজটা ওর বড় দাদুর ঘরের ভেতর থেকে আসছে। মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির সবাই ওখানে গিয়ে জড়ো হয়। কিন্তু দরজাটা কিছুতেই খুলছে না। অনেক ডাকাডাকির পরে ওর দাদু এসেছে দরজাটা খুলে।
ওরা সবাই দেখে যে, ওর বড় ঠাম বেশ ছটপট করছে। কেউ কিছু বুঝতে না পেরে বাড়ির গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চার জন সঙ্গে করে হাসপাতালে যায়। বাকিরা সবাই ঘরেই থাকে। উৎকণ্ঠায় সারারাত না ঘুমিয়েই সবাই কাটিয়ে দেয়। সকালে ফোন আসে ওর বড় ঠাম মারা গেছে। ডেথ সার্টিফিকেটে সঠিক ভাবে মৃত্যুর কারণ লিখতে না পেরে, চিকিৎসকরা এটাই লিখে দিয়েছেন যে, মাথা থেকে ধর নাকি ভিতরে ভিতরে আলাদা হয়ে গেছে। বাইরে চামড়ায় অবশ্য একটা আঁচড়ও দেখা যায়নি। এটা কেমন করে সম্ভব, ধর আর মুণ্ড কেমন করে আলাদা হতে পারে? এমন মৃত্যু এর আগের চিকিৎসকরা দেখেননি।
এই ঘটনার এক মাস পেরিয়ে যায়। মিষ্টি আবার সেই একই স্বপ্ন দেখে। এবারে ও স্বপ্ন দেখেই থেমে থাকে না। একটা ঘোরের মধ্যে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। নিঃশব্দে এগিয়ে যায় বাইরের দরজার দিকে। কিন্তু সেই সময়কে ওর বড় জেম্মা দেখে ফেলে। একটা আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল তার। রান্নাঘরে বিড়াল ঢুকেছে ভেবে, তা দেখতে বাইরে বেরিয়ে মিষ্টিকে দেখতে পায়।
সঙ্গে সঙ্গে বলে— “কিরে কোথায় চললি? যা ঘুমো গিয়ে। এত রাত্রে কেউ বাড়ির বাইরে বেরোয়?” তাও মিষ্টি কিছু না বলে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। তখন ওর বড় জেম্মা ভয় পেয়ে ছুটে গিয়ে ওর হাতটা টেনে ধরে। সঙ্গে সঙ্গে যেন বাস্তবে ফিরে আসে মিষ্টি। নিজেকে বাড়ির বাইরে দেখে অবাক হয়ে ওর জেম্মার দিকে তাকায়। তারপর বলে— “আমি এখানে কেমন করে এলাম?”
“সেটা তো তুই আমাকে বলবি। কেন তোর কি মনে পড়ছে না কেমন করে এখানে এলি?”
“কই না... আমার কিছু মনে পড়ছে না।”
“ঠিক আছে শুতে যা।”
“হুম” বলে মিষ্টি নিজের ঘরে চলে যায়। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ওর মনে করার চেষ্টা করতে থাকে যে, ঠিক কেমন করে ও বাইরে গেল। পরেরদিন আবার সব স্বাভাবিক থাকে। মিষ্টিও সেই আগের বারের মতই সবটা ভুলে যায়। এইদিকে রাত বারোটার দিকে ওর বড় দাদু ছটফট করতে থাকে। কিন্তু রাত্রিবেলা ঘরে কেউ না থাকায়, কেউ জানতেই পারে না সেটা কথা। পরের দিন সকালে অনেক বেলা অব্দি দরজা না খোলায়, ওরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখে, ওর বড় দাদু ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু গায়ে হাত দিতেই দেখে গা বরফের মত ঠান্ডা। সঙ্গে সঙ্গে সবাই ঠিক করে হাসপাতালে নিয়ে যাবে। কিন্তু ওনাকে ধরে একটু উপরে তুলতেই, উনার মাথাটা একদম পিছন দিকে ঝুলে যায়। যেন মাথাটা শরীরের সঙ্গে কোনও রাবারের তৈরি জিনিস দ্বারা জোড়া রয়েছে। হার নেই। ভয় পেয়ে মুহূর্তের মধ্যে সবার দূরে সরে যায়।
একটু পরে বাড়িতে চিকিৎসক আসেন। আর মৃত্যুর সেই একই কারণ লিখে ডেট সার্টিফিকেট দিয়ে দেন। ডাক্তারী পরিভাষায় এমন মৃত্যুর নাকি কোনও নাম নেই। থাকবেই বা কেমন করে। এইরকম মৃত্যু তো আর এর আগে কখনও হয়নি। আর এটা যে, কোন রোগের জন্য হচ্ছে, সেটাও তো চিকিৎসকরা বুঝতে পারছেন না।
এই ঘটনা ঘটার একমাস পরে মিষ্টির ছোট দাদু মানে মামদিদার ছোটছেলেও মারা যায়। আর মৃত্যুর কারণ চামড়ার ভিতরে ধর আর মুণ্ড আলাদা হয়ে গেছে। অথচ বাইরে একটা আচড়ও নেই।
পরপর তিনটি মাসে তিনটি মৃত্যু। তাও একই রকম ভাবে। কেমন করে সম্ভব? অথচ এই মৃত্যু স্বাভাবিক নয়, তা বোঝাই যাচ্ছে। ভৌতিক কিছু কারণ রয়েছে। কিন্তু কী কারণ? গত ছয় মাসে মিষ্টি যেখানে যেখানে গিয়েছে, কেউ না কেউ ওর সঙ্গে গিয়েছে। মুহূর্তের জন্যও কেউ ওকে একা থাকতে দেয়নি। বাড়ির প্রত্যেকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দিনযাপন করেছে। তাহলে অতীত তো কোনওভাবে কারণ হতে পারে না।
এইদিকে এই রকম ঘটনা ঘটায় মামদিদার ইতিমধ্যেই ওনার যত পরিচিতজনরা রয়েছে, সবার কাছে খবর পাঠিয়েছেন। যদি কোনও ভালো তান্ত্রিকের বা তন্ত্রবিদ্যার জ্ঞান ধরেন, এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে যেন যোগাযোগ হয়। বিভিন্ন মন্দিরের পুরোহিতদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। তেমনি এক পুরোহিত, যিনি ওদের বাড়ির কাছের কালী মন্দিরে মা কালীর পুজো করেন, তিনি মামদিদার আমন্ত্রণ পেয়ে সিংহ রায় বাড়িতে আসেন।
পুরোহিত মশাই আসলে মামদিদা ওনাদের বাড়িতে অস্বাভাবিক মৃত্যু গুলোর কথা বলার পরে বলেন যে, বাড়িতে কিছু করতে চান শান্তি যজ্ঞ করাতে চান। ওনারা মনে করছেন যে, ওনাদের বাড়িতে কিছু অশুভ ছায়া রয়েছে, তাও খুলে বলেন পুরোহিত মশাইকে। একটা নির্দিষ্ট দিন ঠিক করে পুরোহিত মশাই জানান যে, ঐদিন যজ্ঞ করা যেতে পারে।
যথাসময়ে ওই নির্দিষ্ট দিনে পুজো করার যজ্ঞ করার সমস্ত আয়োজন করা হয়ে যায়। পুরোহিত মশাই সঠিক সময়ে চলে আসেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটে অন্য জায়গায়। তিনি যজ্ঞ করার জন্য যখন যজ্ঞকুণ্ডে আগুন জ্বালাতে যান, তখন কিছুতেই সেখানে আগুন জ্বলে না। এই ঘটনা দেখে পুরোহিত মশাই অত্যন্ত অবাক হয়ে যান। তবুও তিনি চেষ্টা করতে থাকেন। ভাবেন হয়ত যজ্ঞকুণ্ডে ঘি কম পড়েছে। তাই বেশি করে ঘি দেন। তারপর কর্পূর বেশি ভালো নিয়ে আগুন দিয়ে যেই যজ্ঞকুণ্ডে আগুন জ্বালতে যান, সেই সমস্ত আগুন নিভে যায়। এই বিশাল পরিমাণ আগুন কেমন করে এতো সহজে নিভে যেতে পারে, তা কিছুতেই তিনি বুঝতে পারছিলেন না। কিন্তু এই দৃশ্য দেখে মামদিদারা স্পষ্ট বুঝতে পারেন যে, ওনারা যা সন্দেহ করেছিলেন, তা ঠিক। এখানে কোনও অশুভ ছায়া রয়েছে তা সত্যি।
অনেকবার চেষ্টা করেও যখন পুরোহিত মশাই সফল হতে পারেন না, তখন তিনিও মেনে নেন যে, ঘরে কোনও অশুভ ছায়া রয়েছে। তিনি বাড়ির সকলের উদ্দেশ্যে তখন বলেন— “বাড়িতে তিনটি অস্বাভাবিক মৃত্যু ছাড়া আর কি কিছু হয়েছে? ছোটখাটো যেকোনো কথা হোক, সেটাই আমাকে বলুন। মানে ভাববেন না যে, এটা ছোট কথা তাই বলার দরকার নেই।”
সকলেই মাথা নাড়েন যে, না এইরকম কোনও কিছুই তো হয়নি। ঠিক সেইসময় মিষ্টির বড় জেম্মা বলে— “জানিনা এই কথাটার সঙ্গে কোনও মিল আছে কিনা। তবে একটা ঘটনা আমি বলতে চাই। প্রথমে বলিনি কারণ, ভেবেছি এর সঙ্গে হয়তো এই মৃত্যুগুলোর কোনও যোগাযোগ নেই। কিন্তু যখন পুরোহিত মশাই বলছেন যে, কোন ছোট ঘটনা হলেও সেটা জানাতে। তাই আমি বলছি। আমার শাশুড়ি মা, মানে মামদিদার বড় বউমা যখন মারা যায়, মানে যেদিন মারা যায়, তার আগের দিন রাত্রিবেলা বারোটা সাড়ে বারোটা নাগাদ আমি একটা আওয়াজ পেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি। সেই সময় আমি খেয়াল করি, অন্যমনস্কভাবে মিষ্টি সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পিছন থেকে ডাকি। কিন্তু ও কোনও সাড়া দেয় না। ও বাইরের দরজা খুলে বাড়ির একদম বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলে, আমি ওর হাতটা টেনে ধরি। ভাবভঙ্গি দেখে আমার মনে হল, একটা ঘোরের মধ্যে ছিলো। আর আমি হাতটা ধরে টানায় ওর ঘোরটা কেটে গেল। মিষ্টিও কিন্তু একটু চমকে গিয়েই আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল যে, ও এই জায়গাতে কেমন করে এলো। অন্য কিছুই মনে ছিল না ওর।”
মিষ্টির সঙ্গে এরকম ঘটনা হয়েছে শুনে সবাই চমকে মিষ্টির দিকে তাকায়। কারণ, সত্যি বলতে যাকে বেশি করে আগলে রাখার কথা ছিল সবার। কিন্তু কেউ একবারের জন্য এটা ভাবেনি যে, রাত্রিবেলা ওকে পাহারা দেওয়া দরকার। তাহলে কি রাতে ঘুমের ঘোরে মিষ্টি কোথাও চলে গিয়েছিল? সেই দিন ওর জেম্মা ওকে দেখতে পেয়েছিল বলে, ওকে আটকে দিয়েছিল। কিন্তু কোনদিন কেউ সঙ্গে ছিল না।
মামদিদা সঙ্গে সঙ্গে বললেন— “বড় নাত বৌ, তুমি এটা ঠিক কাজ করোনি। তুমি বাড়ির বড় বউ। তোমার তো আরও সাবধান হওয়া দরকার ছিল। এই কথাটা তুমি আমাদেরকে আগে বলনি কেন? ঠিক আছে যা হওয়ার হয়ে গেছে। পুরোহিত মশাই এর সঙ্গে কি এই মৃত্যুগুলোর যোগাযোগ থাকতে পারে?”
মিষ্টির মেজো জেম্মা সেইসময় বলল— “আমি একটা কথা বলতে চাই। ছোটকা যেদিন মারা যায়, সেই দিন আমি একটা আওয়াজ পেয়েছিলাম। ঘুম চোখে দরজাটা খুলে বাইরে তাকিয়ে দেখি, একটা বিড়াল। সেইসঙ্গে দেখি মিষ্টি নিজের ঘরে ঢুকে যাচ্ছে। সেই সময়টাও কিন্তু ওই বারোটার কাছাকাছি। আর তারপরের দিনই ছোটকা মারা যায়।”
পুরোহিত মশাই মিষ্টির দিকে তাকিয়ে বললেন— “আচ্ছা মিষ্টি মা, তুমি আমাকে একটা কথা বলতো। তোমার বড় ঠাম যেদিন মারা যায়, সেই দিন কি তুমি রাত্রি বেলা ঘুম থেকে উঠে ছিলে? নিজের ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছিলে?”
“না পুরোহিত দাদু আমার কিচ্ছু মনে নেই। আমার দুই জেম্মা যে বলল আমি রাত্রিবেলা ঘরের বাইরে বেরিয়ে ছিলাম, সত্যি বলতে আবার সেই গুলোই শুধু মনে আছে। বাকি কিছু মনে নেই। তাই বড় ঠাম মারা যাওয়ার আগে আমি ঘরের বাইরে বেরিয়ে ছিলাম বলে আমি মনে করতে পারছি না। তবে ওই সময় ঘুম ভেঙ্গেছিল।”
“আচ্ছা বেশ। আমি মিষ্টিকে নিয়ে একটা পুজোয় বসতে চাই। তারপর সেখান থেকে আমি জানতে পেরে যাব যে, আগের দিন রাত্রি বারোটা নাগাদ ওর সঙ্গে কি হয় বা কেন ঘরের মধ্যে ওইভাবে বেরিয়ে আসে। আর তারপরে ওই মৃত্যুগুলো হয় কেন? দেখা যাক, যদি ভয়ঙ্কর কিছু হয়, তখন আমি আমার গুরুদেবকে খবর পাঠাব। উনি আবার তন্ত্রের কিছু জ্ঞান ধরেন। তাই আশা করি ওনার কাছ থেকে কিছু সাহায্য পাওয়া যাবে।” এই কথা বলে যজ্ঞ না করেই পুরোহিত মশাই চলে যান।
ওনার কথামতো পরের দিন আবার নতুন করে সমস্ত আয়োজন করা হয়। সেই পুজো যেটা তিনি মিষ্টির সঙ্গে করবেন বলেছিলেন। পুজো শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চমকে নিজের জায়গায় উঠে দাঁড়িয়ে পড়েন পুরোহিত মশাই।
“বাবা কি হল...! তুমি এমনভাবে কাঁদছো কেন?”
“তোকে একটা কথা বলছি। তোর মা তোর মামদিদা যা যা বলবে সব মেনে নিবি। শুধু মানবি না, অক্ষরে অক্ষরে পালনও করবে। আমাদের পূর্বপুরুষ যতই খারাপ হোক না কেন, আমরা যে খারাপ নই সেটা আমাদেরকে প্রমাণ করতেই হবে। বল, আমার এই কথাটা মেনে চলবি তো? আমার সব কথা রাখবি তো?”
“কি বলছ কি বাবা? তুমি আমাদের কোন খারাপ পূর্বপুরুষের কথা বলছ? তুমি আমাদের নিজেদের পরিবারের লোকদেরকে খারাপ বলছো? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি ফেরার পরে মেজ জেম্মা কিছু একটা কথা বলছিল। আমি বুঝতে পারিনি। মামদিদা তখন থামিয়ে দিল। আমাকে একটু খুলে বলবে বাবা কি হচ্ছে কি? চার দিনের মধ্যে কি এমন হয়েছে?”
“না কিছু জানতে হবে না তোকে। শুধু আমার কথাগুলো মেনে চললেই হবে। তোর এখনও সেই বয়স হয়নি। যদি তোর বিয়ে হয়ে যেত, তাহলেও না হয় হতো।” বাকি কথাটা মনে মনে বলে— “তুই ঠিক থাকলে হয়তো আমার অন্যায়টাও ঢেকে যাবে।”
৬
একটানা ঝমঝম করে একটা আওয়াজ ভেসে আসছে। ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আলতা পরা পা দুটো। আর তাতে রয়েছে বেশ মোটা একজোড়া নুপূর। যা প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে ঝনঝন করে বাজে চলেছে। একটু উপর দিকে তাকালে দেখা যায়, লাল রঙের জড়ি দেওয়া শাড়ি। কিন্তু এটা ঠিক কী ধরনের শাড়ি, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। আরও ওপরে উঠলে দেখা যায়, কোমরবন্ধনী রয়েছে। একটা হাত সোজা নামানো আর একটা হাত কোমরে রাখা। গলায় রয়েছে নানা রকমের সোনার গয়না। কি চাকচিক্য তার। নাকের নোলকটা বেশ বড়। চুলটা বিনুনী করে ছাড়া রয়েছে। টিকলিটাও ভীষণ সুন্দর। কানে এত বড় বড় ভুল রয়েছে যে, দেখে মনে হচ্ছে এই বুঝি কানটা ছিঁড়ে যাবে। এইরকম সুন্দর সাজে সজ্জিত হয়ে মেয়েটি হেঁটে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে।
হঠাৎ করেই দৃশ্য বদল।
ওই মেয়েটি উলঙ্গ হয়ে গেল। গায়ে অলংকার ছাড়া আর কিছুই রইল না। এখন দেখা গেল চুলটাও খোলা রয়েছে। কি বিশাল চুল, কোমর ছাড়িয়ে গেছে সেই চুল। হাতে চকচক করা একটা জিনিস দেখা গেল। ভালো করে লক্ষ্য করতে দেখা গেল একটা বাঁকানো তরোয়ালের মতো কিছু একটা। মেয়েটির দৃষ্টি অনুসরন করলে দেখা যায়, সামনে হাড়িকাঠে একটা মেয়ে মাথা দিয়ে বসে আছে। চারিদিক অন্ধকার হলেও মশাল আর সামনে জ্বলতে থাকা অগ্নিকুণ্ডের আগুনে সব কিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মেয়েটির হাতগুলো পিছনে বাধা রয়েছে। সে চিৎকার করে কাঁদছে আর ওকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য আকুতি জানাচ্ছে। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, তার মনে সেই দৃশ্য দেখে একটুও দয়ার সঞ্চার হয়নি। মুহূর্তের অপেক্ষা। তারপর এক কোপে ওই মেয়েটির মাথা ধড় থেকে আলাদা হয়ে যায়।
এবার “না………আ......আ” করে চিৎকার করে বিছানায় উঠে বসল মিষ্টি। দেখে, ওর গলা শুকিয়ে কাঠ। গোটা গা ঘামে ভিজে যাচ্ছে। কি দেখলো এটা ও? এ কেমন ধরনের স্বপ্ন? তাহলে কি এই স্বপ্নের সঙ্গে ওর পরিবারের অতীত জড়িয়ে আছে? কিন্তু সেই ঘটনা হয়েছে দু’মাস মত পেরিয়ে গেছে। কই এতদিন তো কিছুই হয়নি। জল খেতে গিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে, রাত বারোটা বেজে পাঁচ মিনিট। তারমানে ও স্বপ্নটা দেখেছে ওই বারোটার দিক করে। এটা কি শুধুই স্বপ্ন?
আর কিছু ভাববে না, এটা মনে করে ও শুয়ে পড়ে। পাশ বালিশটাকে জড়িয়ে ধরে জোর করে চোখটা বন্ধ করে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে ও রাতের পুরো স্বপ্নটা বেমালুম ভুলে যায়। ঘুম ভেঙ্গে ছিল। কিন্তু কেন সেটা ভুলে গেছে।
সারাদিন সব ঠিকঠাক থাকে। রাত বারোটার সময় একটা চিৎকার চেঁচামেচিতে মিষ্টির ঘুম ভেঙে যায়। বুঝতে পারে, আওয়াজটা ওর বড় দাদুর ঘরের ভেতর থেকে আসছে। মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির সবাই ওখানে গিয়ে জড়ো হয়। কিন্তু দরজাটা কিছুতেই খুলছে না। অনেক ডাকাডাকির পরে ওর দাদু এসেছে দরজাটা খুলে।
ওরা সবাই দেখে যে, ওর বড় ঠাম বেশ ছটপট করছে। কেউ কিছু বুঝতে না পেরে বাড়ির গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চার জন সঙ্গে করে হাসপাতালে যায়। বাকিরা সবাই ঘরেই থাকে। উৎকণ্ঠায় সারারাত না ঘুমিয়েই সবাই কাটিয়ে দেয়। সকালে ফোন আসে ওর বড় ঠাম মারা গেছে। ডেথ সার্টিফিকেটে সঠিক ভাবে মৃত্যুর কারণ লিখতে না পেরে, চিকিৎসকরা এটাই লিখে দিয়েছেন যে, মাথা থেকে ধর নাকি ভিতরে ভিতরে আলাদা হয়ে গেছে। বাইরে চামড়ায় অবশ্য একটা আঁচড়ও দেখা যায়নি। এটা কেমন করে সম্ভব, ধর আর মুণ্ড কেমন করে আলাদা হতে পারে? এমন মৃত্যু এর আগের চিকিৎসকরা দেখেননি।
এই ঘটনার এক মাস পেরিয়ে যায়। মিষ্টি আবার সেই একই স্বপ্ন দেখে। এবারে ও স্বপ্ন দেখেই থেমে থাকে না। একটা ঘোরের মধ্যে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। নিঃশব্দে এগিয়ে যায় বাইরের দরজার দিকে। কিন্তু সেই সময়কে ওর বড় জেম্মা দেখে ফেলে। একটা আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল তার। রান্নাঘরে বিড়াল ঢুকেছে ভেবে, তা দেখতে বাইরে বেরিয়ে মিষ্টিকে দেখতে পায়।
সঙ্গে সঙ্গে বলে— “কিরে কোথায় চললি? যা ঘুমো গিয়ে। এত রাত্রে কেউ বাড়ির বাইরে বেরোয়?” তাও মিষ্টি কিছু না বলে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। তখন ওর বড় জেম্মা ভয় পেয়ে ছুটে গিয়ে ওর হাতটা টেনে ধরে। সঙ্গে সঙ্গে যেন বাস্তবে ফিরে আসে মিষ্টি। নিজেকে বাড়ির বাইরে দেখে অবাক হয়ে ওর জেম্মার দিকে তাকায়। তারপর বলে— “আমি এখানে কেমন করে এলাম?”
“সেটা তো তুই আমাকে বলবি। কেন তোর কি মনে পড়ছে না কেমন করে এখানে এলি?”
“কই না... আমার কিছু মনে পড়ছে না।”
“ঠিক আছে শুতে যা।”
“হুম” বলে মিষ্টি নিজের ঘরে চলে যায়। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ওর মনে করার চেষ্টা করতে থাকে যে, ঠিক কেমন করে ও বাইরে গেল। পরেরদিন আবার সব স্বাভাবিক থাকে। মিষ্টিও সেই আগের বারের মতই সবটা ভুলে যায়। এইদিকে রাত বারোটার দিকে ওর বড় দাদু ছটফট করতে থাকে। কিন্তু রাত্রিবেলা ঘরে কেউ না থাকায়, কেউ জানতেই পারে না সেটা কথা। পরের দিন সকালে অনেক বেলা অব্দি দরজা না খোলায়, ওরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখে, ওর বড় দাদু ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু গায়ে হাত দিতেই দেখে গা বরফের মত ঠান্ডা। সঙ্গে সঙ্গে সবাই ঠিক করে হাসপাতালে নিয়ে যাবে। কিন্তু ওনাকে ধরে একটু উপরে তুলতেই, উনার মাথাটা একদম পিছন দিকে ঝুলে যায়। যেন মাথাটা শরীরের সঙ্গে কোনও রাবারের তৈরি জিনিস দ্বারা জোড়া রয়েছে। হার নেই। ভয় পেয়ে মুহূর্তের মধ্যে সবার দূরে সরে যায়।
একটু পরে বাড়িতে চিকিৎসক আসেন। আর মৃত্যুর সেই একই কারণ লিখে ডেট সার্টিফিকেট দিয়ে দেন। ডাক্তারী পরিভাষায় এমন মৃত্যুর নাকি কোনও নাম নেই। থাকবেই বা কেমন করে। এইরকম মৃত্যু তো আর এর আগে কখনও হয়নি। আর এটা যে, কোন রোগের জন্য হচ্ছে, সেটাও তো চিকিৎসকরা বুঝতে পারছেন না।
এই ঘটনা ঘটার একমাস পরে মিষ্টির ছোট দাদু মানে মামদিদার ছোটছেলেও মারা যায়। আর মৃত্যুর কারণ চামড়ার ভিতরে ধর আর মুণ্ড আলাদা হয়ে গেছে। অথচ বাইরে একটা আচড়ও নেই।
পরপর তিনটি মাসে তিনটি মৃত্যু। তাও একই রকম ভাবে। কেমন করে সম্ভব? অথচ এই মৃত্যু স্বাভাবিক নয়, তা বোঝাই যাচ্ছে। ভৌতিক কিছু কারণ রয়েছে। কিন্তু কী কারণ? গত ছয় মাসে মিষ্টি যেখানে যেখানে গিয়েছে, কেউ না কেউ ওর সঙ্গে গিয়েছে। মুহূর্তের জন্যও কেউ ওকে একা থাকতে দেয়নি। বাড়ির প্রত্যেকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দিনযাপন করেছে। তাহলে অতীত তো কোনওভাবে কারণ হতে পারে না।
এইদিকে এই রকম ঘটনা ঘটায় মামদিদার ইতিমধ্যেই ওনার যত পরিচিতজনরা রয়েছে, সবার কাছে খবর পাঠিয়েছেন। যদি কোনও ভালো তান্ত্রিকের বা তন্ত্রবিদ্যার জ্ঞান ধরেন, এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে যেন যোগাযোগ হয়। বিভিন্ন মন্দিরের পুরোহিতদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। তেমনি এক পুরোহিত, যিনি ওদের বাড়ির কাছের কালী মন্দিরে মা কালীর পুজো করেন, তিনি মামদিদার আমন্ত্রণ পেয়ে সিংহ রায় বাড়িতে আসেন।
পুরোহিত মশাই আসলে মামদিদা ওনাদের বাড়িতে অস্বাভাবিক মৃত্যু গুলোর কথা বলার পরে বলেন যে, বাড়িতে কিছু করতে চান শান্তি যজ্ঞ করাতে চান। ওনারা মনে করছেন যে, ওনাদের বাড়িতে কিছু অশুভ ছায়া রয়েছে, তাও খুলে বলেন পুরোহিত মশাইকে। একটা নির্দিষ্ট দিন ঠিক করে পুরোহিত মশাই জানান যে, ঐদিন যজ্ঞ করা যেতে পারে।
যথাসময়ে ওই নির্দিষ্ট দিনে পুজো করার যজ্ঞ করার সমস্ত আয়োজন করা হয়ে যায়। পুরোহিত মশাই সঠিক সময়ে চলে আসেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটে অন্য জায়গায়। তিনি যজ্ঞ করার জন্য যখন যজ্ঞকুণ্ডে আগুন জ্বালাতে যান, তখন কিছুতেই সেখানে আগুন জ্বলে না। এই ঘটনা দেখে পুরোহিত মশাই অত্যন্ত অবাক হয়ে যান। তবুও তিনি চেষ্টা করতে থাকেন। ভাবেন হয়ত যজ্ঞকুণ্ডে ঘি কম পড়েছে। তাই বেশি করে ঘি দেন। তারপর কর্পূর বেশি ভালো নিয়ে আগুন দিয়ে যেই যজ্ঞকুণ্ডে আগুন জ্বালতে যান, সেই সমস্ত আগুন নিভে যায়। এই বিশাল পরিমাণ আগুন কেমন করে এতো সহজে নিভে যেতে পারে, তা কিছুতেই তিনি বুঝতে পারছিলেন না। কিন্তু এই দৃশ্য দেখে মামদিদারা স্পষ্ট বুঝতে পারেন যে, ওনারা যা সন্দেহ করেছিলেন, তা ঠিক। এখানে কোনও অশুভ ছায়া রয়েছে তা সত্যি।
অনেকবার চেষ্টা করেও যখন পুরোহিত মশাই সফল হতে পারেন না, তখন তিনিও মেনে নেন যে, ঘরে কোনও অশুভ ছায়া রয়েছে। তিনি বাড়ির সকলের উদ্দেশ্যে তখন বলেন— “বাড়িতে তিনটি অস্বাভাবিক মৃত্যু ছাড়া আর কি কিছু হয়েছে? ছোটখাটো যেকোনো কথা হোক, সেটাই আমাকে বলুন। মানে ভাববেন না যে, এটা ছোট কথা তাই বলার দরকার নেই।”
সকলেই মাথা নাড়েন যে, না এইরকম কোনও কিছুই তো হয়নি। ঠিক সেইসময় মিষ্টির বড় জেম্মা বলে— “জানিনা এই কথাটার সঙ্গে কোনও মিল আছে কিনা। তবে একটা ঘটনা আমি বলতে চাই। প্রথমে বলিনি কারণ, ভেবেছি এর সঙ্গে হয়তো এই মৃত্যুগুলোর কোনও যোগাযোগ নেই। কিন্তু যখন পুরোহিত মশাই বলছেন যে, কোন ছোট ঘটনা হলেও সেটা জানাতে। তাই আমি বলছি। আমার শাশুড়ি মা, মানে মামদিদার বড় বউমা যখন মারা যায়, মানে যেদিন মারা যায়, তার আগের দিন রাত্রিবেলা বারোটা সাড়ে বারোটা নাগাদ আমি একটা আওয়াজ পেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি। সেই সময় আমি খেয়াল করি, অন্যমনস্কভাবে মিষ্টি সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পিছন থেকে ডাকি। কিন্তু ও কোনও সাড়া দেয় না। ও বাইরের দরজা খুলে বাড়ির একদম বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলে, আমি ওর হাতটা টেনে ধরি। ভাবভঙ্গি দেখে আমার মনে হল, একটা ঘোরের মধ্যে ছিলো। আর আমি হাতটা ধরে টানায় ওর ঘোরটা কেটে গেল। মিষ্টিও কিন্তু একটু চমকে গিয়েই আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল যে, ও এই জায়গাতে কেমন করে এলো। অন্য কিছুই মনে ছিল না ওর।”
মিষ্টির সঙ্গে এরকম ঘটনা হয়েছে শুনে সবাই চমকে মিষ্টির দিকে তাকায়। কারণ, সত্যি বলতে যাকে বেশি করে আগলে রাখার কথা ছিল সবার। কিন্তু কেউ একবারের জন্য এটা ভাবেনি যে, রাত্রিবেলা ওকে পাহারা দেওয়া দরকার। তাহলে কি রাতে ঘুমের ঘোরে মিষ্টি কোথাও চলে গিয়েছিল? সেই দিন ওর জেম্মা ওকে দেখতে পেয়েছিল বলে, ওকে আটকে দিয়েছিল। কিন্তু কোনদিন কেউ সঙ্গে ছিল না।
মামদিদা সঙ্গে সঙ্গে বললেন— “বড় নাত বৌ, তুমি এটা ঠিক কাজ করোনি। তুমি বাড়ির বড় বউ। তোমার তো আরও সাবধান হওয়া দরকার ছিল। এই কথাটা তুমি আমাদেরকে আগে বলনি কেন? ঠিক আছে যা হওয়ার হয়ে গেছে। পুরোহিত মশাই এর সঙ্গে কি এই মৃত্যুগুলোর যোগাযোগ থাকতে পারে?”
মিষ্টির মেজো জেম্মা সেইসময় বলল— “আমি একটা কথা বলতে চাই। ছোটকা যেদিন মারা যায়, সেই দিন আমি একটা আওয়াজ পেয়েছিলাম। ঘুম চোখে দরজাটা খুলে বাইরে তাকিয়ে দেখি, একটা বিড়াল। সেইসঙ্গে দেখি মিষ্টি নিজের ঘরে ঢুকে যাচ্ছে। সেই সময়টাও কিন্তু ওই বারোটার কাছাকাছি। আর তারপরের দিনই ছোটকা মারা যায়।”
পুরোহিত মশাই মিষ্টির দিকে তাকিয়ে বললেন— “আচ্ছা মিষ্টি মা, তুমি আমাকে একটা কথা বলতো। তোমার বড় ঠাম যেদিন মারা যায়, সেই দিন কি তুমি রাত্রি বেলা ঘুম থেকে উঠে ছিলে? নিজের ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছিলে?”
“না পুরোহিত দাদু আমার কিচ্ছু মনে নেই। আমার দুই জেম্মা যে বলল আমি রাত্রিবেলা ঘরের বাইরে বেরিয়ে ছিলাম, সত্যি বলতে আবার সেই গুলোই শুধু মনে আছে। বাকি কিছু মনে নেই। তাই বড় ঠাম মারা যাওয়ার আগে আমি ঘরের বাইরে বেরিয়ে ছিলাম বলে আমি মনে করতে পারছি না। তবে ওই সময় ঘুম ভেঙ্গেছিল।”
“আচ্ছা বেশ। আমি মিষ্টিকে নিয়ে একটা পুজোয় বসতে চাই। তারপর সেখান থেকে আমি জানতে পেরে যাব যে, আগের দিন রাত্রি বারোটা নাগাদ ওর সঙ্গে কি হয় বা কেন ঘরের মধ্যে ওইভাবে বেরিয়ে আসে। আর তারপরে ওই মৃত্যুগুলো হয় কেন? দেখা যাক, যদি ভয়ঙ্কর কিছু হয়, তখন আমি আমার গুরুদেবকে খবর পাঠাব। উনি আবার তন্ত্রের কিছু জ্ঞান ধরেন। তাই আশা করি ওনার কাছ থেকে কিছু সাহায্য পাওয়া যাবে।” এই কথা বলে যজ্ঞ না করেই পুরোহিত মশাই চলে যান।
ওনার কথামতো পরের দিন আবার নতুন করে সমস্ত আয়োজন করা হয়। সেই পুজো যেটা তিনি মিষ্টির সঙ্গে করবেন বলেছিলেন। পুজো শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চমকে নিজের জায়গায় উঠে দাঁড়িয়ে পড়েন পুরোহিত মশাই।
আমার লেখা রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনী "চাঁপাগড়ের অভিশপ্ত জমিদার বাড়ি" বই হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে কলেজ স্ট্রিটের বিপনী তে খোয়াই পুটিরামের বিপরীতে। তোমরা চাইলে নিজেদের সংগ্রহে নিতে পারো।
ওনাকে ওই ভাবে চমকে উঠেতে দেখে বাড়ির বাকি সদস্যরা অবাক হয়ে যায়। মামদিদা বললেন— “কি হলো পুরোহিত মশাই, আপনি এমন ভাবে চমকে উঠে দাঁড়ালেন কেন?”
“সর্বনাশ... অনেক বড় সর্বনাশ হতে চলেছে আপনাদের। আমি এই পুজো করে জানতে পেরেছি যে,অমাবস্যার দু’দিন আগে মানে, ত্রয়োদশীর দিন মিষ্টি রাত বারোটার সময় কিছু একটা স্বপ্ন দেখে জেগে যায়। ওই স্বপ্নটা ওকে সম্মোহিত করে দেয়। আর ও সেই ঘোরের মধ্যেই ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে। ওই স্বপ্নের মধ্যে যে থাকে, সে ওকে নির্দিষ্ট একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু ওকে নিতে পারে না। তার কারণ, প্রত্যেকবারই কেউ-না-কেউ ওকে আটকে দিচ্ছে। ও ত্রয়োদশীর দিন স্বপ্ন দেখে আর চতুর্দশীর দিন আপনাদের পরিবারের একজন সদস্য মারা যায়। তাও ঐ রকম এক ভয়ঙ্কর ভাবে। কিন্তু কে এইসব করছে, তা আমার মত স্বল্প জ্ঞান সম্পন্ন মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। এমনকি রাত্রিবেলায় ও স্বপ্নে কি দেখে, সেটাও আমি বুঝতে পারছি না। শুধু এইটুকু বুঝতে পারছি, ত্রয়োদশীর রাত্রিবেলা ও ঘুমোলে, ও স্বপ্ন দেখবেই আর ও স্বপ্ন দেখা মানে পরের দিন আপনাদের বাড়ির কোনও-না-কোনও সদস্যের মৃত্যু হবে। এবার সেই মৃত্যু যে কোনও কারোর হতে পারে।”
সবাই ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। ওনাদেরকে ভয় পেতে দেখি পুরোহিত মশাই বললেন— “আমার গুরুদেব কালকে অথবা পরশুর মধ্যেই চলে আসবেন। আর এই সময়ের মধ্যে তো আর ত্রয়োদশী আসছে না। এখনই এতটা ভয় পাওয়ার দরকার নেই। আমার গুরুদেব এসে কি বলেন আগে শুনি।” এই কথা বলে পুরোহিত মশাই সেখান থেকে বিদায় নিয়ে চলে যান।
সবাই একটা চিন্তাতেই মগ্ন হয়ে যায় যে, সারাদিন মিষ্টিকে অত্যন্ত আগলে আগলে রাখা হয়। ও কোথাও যেতে পারে না। রাত্রিবেলা ওর কোথাও যাওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। তার কারণ, ও স্বপ্ন দেখে আর তার পরেরদিন পরিবারের সদস্যের মৃত্যু হয়। ওকে বাইরে নিয়ে যেতে চাইলেও, পুরোহিত মশাইয়ের কথা অনুযায়ী কেউ-না-কেউ ওকে আটকে দেয়। কিন্তু যদি বৈভবীর আত্মা মুক্তি পেয়ে না থাকে, তাহলে মৃত্যুগুলো ঘটাচ্ছে কে? এইরকম অদ্ভুত ভাবে মৃত্যু কোনও অশরীরী আত্মার পক্ষেই করা সম্ভব। কোন মানুষ এমন ভাবে খুন করতে পারে না। মিষ্টি স্বপ্নের সঙ্গে এই পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর জড়িয়ে আছে। এখন কথা হলো মিষ্টি স্বপ্নে কি দেখে?
মিষ্টির মেজো জেম্মা, যেকিনা সব সময় ওদেরকে ছোট করে এসেছে, সে বলে— “মিষ্টি কি স্বপ্ন দেখে তা জানার একটা উপায় আছে। যদি তোমরা সবাই আমার কথা শোনো, তাহলে আমি বলতে পারি।”
মামদিদার অনুমতি পেয়ে ও বলতে শুরু করে— “হিপনোটাইজ করে যদি মিষ্টি স্বপ্নে কি দেখে, সেটা জানা যেতে পারে। তাহলে কেমন হয়? আমার চেনাশোনা এমন একজন ডাক্তার আছেন যে, খুব ভালো হিপনোটাইজ করতে পারেন। যদি তোমাদের সবার অনুমতি থাকে তাহলে মিষ্টিকে আমি নিয়ে যেতে পারি। আর তোমরা যে যে যেতে চাও যেতে পারো।”
এছাড়া আর কোনও উপায় নেই দেখে, সবাই ওই কথায় রাজি হয়ে যায়। ওর জেম্মার চেনাশোনা ছিল বলে, আগে থেকে কোনও অ্যাপোয়েন্টমেন্ট নিতে হয় না। ওরা সোজা গিয়ে হাজির হয় ওই ডাক্তারের চেম্বারে। পরিণীতা, মিষ্টি আর ওর মেজ জেম্মা, এই তিনজনে মিলে ডাক্তারের যে ঘরে হিপনোটাইজ করা হবে, সেই ঘরে যায়। ঘরের এসিটা এমন ভাবে রাখা করা রয়েছে, যাতে ওদের বেশ ঠান্ডা লাগতে শুরু করে।
পরিণীতা দেখল, ডাক্তার মিষ্টিকে একটা আরাম কেদারায় শুইয়ে দিল। আলো নিভিয়ে দেওয়া হলো। তার সামনে রয়েছে সাদা-কালোর গোল গোল চক্র মত একটা চিত্র। শুধুমাত্র ওই সাদাকালো চক্রের মত ছবিটার উপরেই আলো রয়েছে। বাকি পুরো ঘর অন্ধকার। ঘরের ভিতরে বেশ সুগন্ধি যুক্ত একটা মোমবাতি জ্বেলে দেওয়া হল। একটা গানের মিউজিক চালিয়ে দেওয়া হল। একটানা ওই মিউজিক বেজেই চলেছে। এই রকম পরিস্থিতিতে এমনিই বসে থাকলে, মানুষ শান্ত মাথায় অনেক কিছু মনে করতে পারে।
মিষ্টিকে ডাক্তার বাবু বললেন, গোল গোল চক্রের মতো চিত্রটা রয়েছে, তার ঠিক মাঝখানের বিন্দুতে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে। তারপর যখন মনে হবে যে, ঘুম ঘুম আসছে, তখন যেন ও আস্তে করে চোখটা বন্ধ করে দেয়। সেই কথামতো মিষ্টি ওই নির্দিষ্ট ছবিটার একদম কেন্দ্রবিন্দুতে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ ওইভাবে তাকিয়ে থাকার পরে, ও শুনতে পায় ডাক্তার বাবু একনাগাড়ে একইরকম আওয়াজে একইরকম ভাবে বলে চলেছেন— “মিষ্টি তোমার ঘুম পাচ্ছে, তুমি ঘুমিয়ে পড়ো......”
ওই কথাগুলো শুনতে শুনতে একসময় ওর সত্যি সত্যি মনে হয়, ওর ঘুম পেয়েছে। চোখটা আস্তে করে বন্ধ করে। হাতগুলো আরামকেদারার দু'পাশে ঝুলে পড়ে। দেখে মনে হবে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এইভাবে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরে ডাক্তারবাবু আস্তে আস্তে বললেন— “মিষ্টি, ভালো করে দেখার চেষ্টা করো তো তুমি এখন কোথায়? তোমার চোখের সামনে কি আছে?”
এই প্রশ্ন শুনে মিষ্টি বলে— “একটা মন্দির, খুব ছোট একটা মন্দির দেখতে পাচ্ছি। মন্দিরের ভিতরে সামনেই একটা যজ্ঞ করার বেদী। সেখানে রাখা হাড়িকাঠে মাথা দিয়ে আছে একটা মেয়ে। চুল খোলা অবস্থায় একটা মহিলা হাতে তলোয়ারের মতো ধারালো একটা অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গোটা গায়ে সোনার গয়না ছাড়া আর একটাও জামাকাপড় নেই। মেয়েটা চিৎকার করে বলছে, ‘আমাকে ছেড়ে দাও, আমাকে ছেড়ে দাও’ কিন্তু ওই মহিলা কোনও কথা না শুনে এক কোপে সেই মেয়েটাকে মেরে ফেলে। তার ধর আর মুণ্ড আলাদা করে দেয়। এটা কি করছে ও? না না এ কেমন করে সম্ভব? মহিলাটা, মহিলাটা... সেখান থেকে রক্ত নিয়ে পান করছে। আরও একটা মেয়েকে ওইভাবে মেরে ফেলা হল। কিন্তু কেন এইসব করছে ও? তারও রক্ত কিছুটা পান করার পরে গোটা গায়ে মেখে নিচ্ছে। উফ কী বীভৎস সেই দৃশ্য।” ঘোরের মধ্যেই কাঁদতে থাকে মিষ্টি।
ডাক্তারবাবু আবারও প্রশ্ন করেন— “আচ্ছা মিষ্টি এটা কী তোমার স্বপ্ন? নাকি সত্যি সত্যি এমন দৃশ্য তোমার সামনে ঘটেছে।”
“হুম এমন দৃশ্য আমার স্বপ্নে আসে। প্রথম দিন একটা মেয়ের মৃত্যু হয়েছিল। তারপর আমার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। কিন্তু তার পরের বার যখন এই স্বপ্ন দেখেছি, তখন পুরোটা দেখেছিলাম। কিন্তু এটা এতো সত্যি কেন?”
“আচ্ছা... ওই মহিলা রক্ত দিয়ে স্নান করার পরে, কি করে? আর এই মন্দিরটা কোন জায়গায় আছে?”
“মন্দির ছোট মন্দির... মন্দিরের ভিতরে হাড়িকাঠে হাড়িকাঠে ...... কি ভয়ানক দৃশ্য। পারছি না আমি... আর সহ্য করতে পারছি না... ওই মহিলাটা রক্ত মেখে স্নান করছে। অসম্ভব অসম্ভব.........” বলতে বলতে নিজের জায়গায় উঠে বস পড়ে মিষ্টি।
এইসব ঘটনার কথা ডাক্তার কিছু বুঝতে না পারলেও, কাহিনীটা জানার জন্য পরিণীতা আর ওর মেজো জা খুব ভালোমতো বুঝতে পারে যে, মিষ্টি যে স্বপ্নের বর্ণনা দিল, তা আসলে বৈভবী বলি দিচ্ছে তার স্বপ্ন। ডাক্তার বাবুর সঙ্গে কিছু কথাবার্তার পরে ওরা বাড়িতে ফিরে আসে। তারপর সমস্ত ঘটনা মামদিদাকে খুলে বলে। উনি সমস্ত কিছু শোনার পরে বললেন যে, বাড়ির সবাই অফিস থেকে ফিরে এলে বসার ঘরে একটা বৈঠক হবে তখনই যা কিছু বলার তিনি বলবেন।
সেই হিসেব মতো সন্ধ্যাবেলা সবাই এলে, ছোটদেরকে উপরের তলার একটা ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আর বলা হয়, না ডাকা অব্দি তারা যেন নিচে না আসে। ছোটদের মধ্যে সবথেকে বড় মিষ্টি। তাই এই দায়িত্ব ওর উপরে ছিল।
বাকি সবাই এক জায়গায় জড়ো হলে, মামদিদা বললেন— “মিষ্টির স্বপ্ন কি দেখে, সেটা জানা গেছে। সেখান থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, বৈভবী ওর জায়গা থেকে মুক্তি পেয়েছে। আর আমাদের বাড়িতে যে ঘটনাগুলো ঘটছে,সেটা ওর আত্মা ঘটাচ্ছে। আমাদের পরিবারের উপর প্রতিশোধ নিচ্ছে ও। আস্তে আস্তে সিংহ রায় পরিবারের সমস্ত সদস্যদেরকে ও শেষ করে দেবে। কিন্তু কথা হল, বৈভবীকে ওই নির্দিষ্ট জায়গা থেকে মুক্তি দিলো কে?ও কিন্তু তিন মাস আগেই মুক্তি পেয়ে গিয়েছে। তার কারণ, পরপর তিন মাসে তিনজন মারা গিয়েছে।
আমি তোমাদের সবার কাছে একটা কথা জানতে চাইছি। তোমরা প্রত্যেকেই ঠান্ডা মাথায় এটা ভাবার চেষ্টা করো যে, তোমাদের সঙ্গে এমন কোনও ঘটনা ঘটেছে কিনা, যার দ্বারা বৈভবী মুক্তি পেতে পারে।”
কিন্তু এই কথার উত্তরে প্রত্যেকেই মাথা নেড়ে বলে যে, এমন কোনও ঘটনাই তাদের সঙ্গে ঘটেনি। সেই সময় পরিণীতা বলে— “আচ্ছা মামদিদা এমনও তো হতে পারে, মিষ্টির যেমন স্বপ্ন দেখার পরে কোন কিছু মনে ছিল না, সেই রকম এই বাড়ির সদস্য, যার দ্বারা বৈভবী মুক্তি পেয়েছে, তারও কোন কিছু মনে নেই। মানে এমনটা হলে, আমরা সেটা জানব কেমন করে?”
“হ্যাঁ এই কথাটা যে আমি ভাবিনি তা নয়। সেই কারণেই আমি পুরোহিত মশাইকে ডেকে পাঠিয়েছি। উনি কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবেন। মামদিদার কথা শেষ হওয়ার আগেই পুরোহিত মশাই ওখানে এসে হাজির হন। মামদিদার অনুমতি নিয়ে তিনি ঘরের ভিতরে এলে, মামদিদা বললেন— “পুরোহিত মশাই, আপনাকে তো আমি ফোন করে সমস্ত কথাই বলেছি। এবার আপনি বলুন, এই বাড়ির কোনও সদস্যের দ্বারা এমন কোনও ঘটনা ঘটেছে কিনা, যার দ্বারা বৈভবী মুক্তি পেতে পারে।”
“দেখুন বউ ঠাকুরাণী, আপনি আমাকে আপনাদের বাড়ীর অতীত সম্বন্ধে মোটামুটি একটা ধারণা দিয়েছেন। যেটুকু দিয়েছেন তাতেই চলে যাবে। তো আমি আমার সঙ্গে করে ওঁ লেখা কবজ এনেছি। লাল সুতো দিয়ে ওই কাবজ এই বাড়ির প্রত্যেককে ধারণ করতে হবে। সবাই যে যার নিজের মতো গলায় ধারণ করে নেবেন। তারপর আমি দেখব যে কি হচ্ছে।”
এই কোথা শুনে বাড়ির ছোটদেরকেও ডেকে পাঠানো হয়। প্রত্যেককে একটা করে ওই ওঁ লেখা কবজ দেওয়া হয়। কিন্তু পরিণীতা জন্য কবজ দেওয়ার সময় পুরোহিত মশাই বললেন— “সবাইকে কবজ দিলাম। সেই জন্য আমি তোমাকেও দিলাম। কিন্তু আমার যতদূর ধারণা, তোমাকে দিয়ে কিছু করাবে না। তার কারণ, নীলাংশু এই রাজপরিবারের কেউ নয়। সেই হিসেব মতো তুমিও এই পরিবারের বউ না। যতই ওনারা তোমাদেরকে আপন মনে করুন না কেন, এটা সত্যি। আমি বলছি বলে তোমার খারাপ লাগছে। কিন্তু এটা আমাকে এখন বলতেই হবে। নীলাংশু, মিষ্টি আর তার ভাই, এই তিনজন বৈভবীর বংশধর। তাই এদেরকে প্রয়োজন হতে পারে। আবার এই বাড়ির সদস্যদের উপর রাগ আছে। তাই এনাদেরকে মারার চেষ্টা করবে। কিন্তু তুমি যেহেতু এই বাড়ির কোনও সদস্যের বউ না। আবার বৈভবীর বংশধরও নও। তাই তোমার উপরে বিপদটা কম।”
এই কথাগুলো শোনার পরে পরিণীতার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসে। সত্যিই এই পরিবার ওর নয়।
প্রত্যেকে নিজের নিজের গলায় ওঁ লেখা কবজের মালাটা পরে ফেলে। কেউ একবারের জন্যও কোনও প্রতিবাদ করে না। আর সেটা দেখে পুরোহিত মশাই অবাক হয়ে গেলেন। বললেন— “নাঃ এইবাড়ির কোনও সদস্যের তারা বৈভবী মুক্তি পায়নি। যদি পেয়ে থাকত, তাহলে এই কবজ এত সহজে ধারণ করতে পারত না। আর এই কবজের দ্বারা আপাতত সবাই সুরক্ষিত। বাকি গুরুদেব আসলে দেখা যাক উনি কি করেন। আপনারা এত ভয় পাবেন না। ত্রয়োদশী আসতে এখনও দেরি আছে।”
পুরোহিত মশাই চলে গেলে, বাড়ির ছোটদেরকে আবার সেই ওপরের ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তারপর মামদিদা বেশ কড়া ভাবে বললেন— “আমার কেন বারবার মনে হচ্ছে, কিছু একটা রয়েছে সেটা আমি বুঝতে পারছি না। বৈভবী এমনি এমনি মুক্তি পেতে পারে না।” এমন সময় তিনি দেখেন নীলাংশু কেমন চঞ্চল হয়ে পড়েছে। সেটা দেখতে পেয়েই তিনি আবারও বললেন— “ছোট দাদুভাই, তুমি কিছু বলতে চাও?”
এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে নীলাংশু নিজের জায়গা থেকে উঠে এসে মামদিদার কোলে মাথা রেখে কেঁদে ওঠে। তারপর বলে— “আমাকে ক্ষমা করে দাও। সমস্ত কিছু জানা সত্ত্বেও আমি ভুল করেছি।”
সবাই অবাক হয়ে যায়। সবথেকে বেশি অবাক হয় পরিণীতা। নীলাংশু কি এমন করেছে, যার জন্য এমন ভাবে কাঁদছে আর ক্ষমা চাইছে। আর এই প্রশ্নটাই মামমদা ওকে করেন।
তার উত্তরে নীলাংশু বলে— “আজ থেকে প্রায় ষোল সতেরো বছর আগে, আমি আমাদের আসল রাজবাড়ি দেখার জন্য কেশিয়াপুর যাই। আমাদের অফিসের বেশ কয়েকজনকে আমি আমাদের ওই রাজবাড়ির কথা বলেছিলাম। তাই আমরা পাঁচ ছয় জন মিলে বাড়িতে অফিস ট্যুরের নাম করে ওই রাজবাড়িতে চলে যাই। এত বছরের পুরনো রাজবাড়ি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। অথচ কি সুন্দর। বাইরে থেকেই আমরা রাজবাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকি। কিন্তু রাজমহলের একদম ভিতরে প্রবেশ করিনি। দূর থেকে বৈভবীর বানানো মন্দিরগুলো দেখেছিলাম। এখন ভগ্নপ্রায় জঙ্গলে পরিপূর্ন হয়ে পড়ে রয়েছে বেশিরভাগ জায়গাটা। তাই কেউ চাইলেও ভিতরে প্রবেশ করতে পারবে না। পোকামাকড়ের ভয় রয়েছে। কিন্তু এতটা বড় আর এতো সুন্দর রাজবাড়িটা যে, আমরা একমনে দেখতে দেখতে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলাম। জানো তোমরা ওখানে গেলেই দেখতে পারবে যে,ওই জায়গাটায় মানুষ ঘুরতে যায়। ওখানে থাকার জন্য ছোট-ছোট হোমস্টে রয়েছে। কাছে বেশ কয়েকটা মন্দির রয়েছে। রাজবাড়ির চারিদিকে উঁচু উঁচু মাচা মত করা রয়েছে। সেখানে টিকিট কেটে উঠে দূরবীনের সাহায্যে রাজবাড়ির ভেতরটা দেখা যায়। আমি জানতাম যে, ওই রাজবাড়ির ভিতরে আমার প্রবেশ করা বারণ। তার কারণ, আমি এই পরিবারের সদস্য। কিন্তু পরে জানতে পারি যে,আমি এইবাড়ির কেউ নই।
আমরা ওইখানে একটা হোমস্টে নিয়েছিলাম। শীতকাল ছিল বলে আমরা সবাই মিলে ড্রিঙ্ক করব ভাবি। সেইদিন অধিক পরিমাণে মদ্যপান হয়ে গিয়েছিল। তাই রাত এগারোটার কাছাকাছি আমরা যে যার ঘরে চলে যাই। মিনিট দশেক পরে আমার ঘরে আমার কলিগ শেফালী আসে। ও আমাকে সব দিন পছন্দ করত। বিয়েও করতে চেয়েছিল। কিন্তু পরিবারের মতে আমি পরিণীতাকে বিয়ে করেছিলাম। সেইদিন রাত্রিবেলা ও এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে। বারবার ভালবাসার কথা বলতে থাকে। আমিও যে ওকে পছন্দ করতাম। তাই নয়, শুধুমাত্র পরিবারের জন্যই ওকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু পরে আমি সেই সমস্ত কিছু থেকে দূরে সরে গিয়েছিলাম। পরিণীতাকেই আমি ভালোবেসেছি। এখনও ভালবাসি। কিন্তু সেই রাত্রে মদ্যপান করে থাকার জন্য ওর ওই আবেদনে সাড়া দিয়ে ফেলি। আর আমাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক স্থাপন হয়।
পরের দিন আমরা আমাদের ভুলটা বুঝতে পারি। ও তখনও অবিবাহিত ছিল। তাই ওর থেকেও বেশি অপরাধবোধ আমার ছিল। তার কারণ, আমি বিবাহিত। ওর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে আমি আমার স্ত্রীকে ঠকিয়েছি। ততদিনে মিষ্টিও হয়ে গিয়েছে। সেই হিসেব মতো আমি আমার মেয়েকেও ঠকিয়েছি। তাই আমরা দু’জনে মিলেই ঠিক করি যে, আমাদের এই রাতটার কথা আমরা দুজনেই ভুলে যাব। ও আমার কথা মেনে নিয়েছিল।
চার মাস পরে ওর বিয়ে হয়ে যায়। ছ’ মাসের মাথায় শেফালী একটা কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়। আমরা অফিস থেকে বেশ কয়েকজন দেখতে গিয়েছিলাম। তখন বাচ্চাটাকে দেখে একবারের জন্যও মনে হয়নি যে, ওই বাচ্চাটা ছ’মাসে অপরিণত একটা বাচ্চা। উল্টে তাকে দেখে মনে হয়েছিল যে, সঠিক সময়েই ওর জন্ম হয়েছে।
আমার ভিতরে একটা অপরাধ বোধ ছিলই। তার উপরে এই জিনিসটা দেখে কেন জানি আমার মনে হতে থাকে যে, ওই কন্যাসন্তানটা কোনওভাবে আমার নয় তো? সেই রাত্রের ঘটনা এমন ভাবে আমাদের জীবনে ফিরে আসেনি তো? এইরকম হলে খুব বড় ভুল হয়ে গেছে। তার কারণ, অবশ্যই আমাদের পরিবারের অতীত। আমি শেফালীকে আলাদা করে ডেকে পরিবারের অতীত খুলে বলি। তারপর ওকে জিজ্ঞাসা করি যে, ওর সন্তান কোনওভাবে আমার সন্তান কিনা। আর আমার ভয়টাকে সত্যি করে দিয়ে ও জানায় যে, ওই কন্যা সন্তান আমার। ওর স্বামী সমস্ত কিছু জেনেই ওকে বিয়ে করেছে। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা জানে না। কিন্তু বাপের বাড়ির সবাই জানে। আমি ওকে অনুরোধ করেছি যে, ও যেন আঠারো বছর বয়স হওয়ার আগেই ওর মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেয়। কারণ, ওর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়নি। তাই অবশ্যই ও আমার পরিবারের কেউ নয়। কিন্তু ওর সন্তানের শরীরে আমার রক্ত। তাই ওকে আঠারো বছরের মধ্যেই বিয়ে করতে হবে। কিন্তু ওর বয়স এখনও আঠারো বছর হয়নি। আমি জানি না বৈভবী ওই সন্তানকে দিয়ে কিছু করিয়েছে কিনা।”
এই কথা শুনে বাড়ির সবার পায়ের নিচ থেকে যেন মাটির সরে যায়। পরিণীতার চোখ থেকে যেন জলের ধারা বইতে থাকে। মামদিদা নিজের মনটাকে শক্ত করে এই প্রসঙ্গে একটাও কথা না বলে, নীলাংশুকে বলেন পরের দিন ওর সেই সন্তানকে এই বাড়িতে নিয়ে আসতে বলেন।
ওনাকে ওই ভাবে চমকে উঠেতে দেখে বাড়ির বাকি সদস্যরা অবাক হয়ে যায়। মামদিদা বললেন— “কি হলো পুরোহিত মশাই, আপনি এমন ভাবে চমকে উঠে দাঁড়ালেন কেন?”
“সর্বনাশ... অনেক বড় সর্বনাশ হতে চলেছে আপনাদের। আমি এই পুজো করে জানতে পেরেছি যে,অমাবস্যার দু’দিন আগে মানে, ত্রয়োদশীর দিন মিষ্টি রাত বারোটার সময় কিছু একটা স্বপ্ন দেখে জেগে যায়। ওই স্বপ্নটা ওকে সম্মোহিত করে দেয়। আর ও সেই ঘোরের মধ্যেই ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে। ওই স্বপ্নের মধ্যে যে থাকে, সে ওকে নির্দিষ্ট একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু ওকে নিতে পারে না। তার কারণ, প্রত্যেকবারই কেউ-না-কেউ ওকে আটকে দিচ্ছে। ও ত্রয়োদশীর দিন স্বপ্ন দেখে আর চতুর্দশীর দিন আপনাদের পরিবারের একজন সদস্য মারা যায়। তাও ঐ রকম এক ভয়ঙ্কর ভাবে। কিন্তু কে এইসব করছে, তা আমার মত স্বল্প জ্ঞান সম্পন্ন মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। এমনকি রাত্রিবেলায় ও স্বপ্নে কি দেখে, সেটাও আমি বুঝতে পারছি না। শুধু এইটুকু বুঝতে পারছি, ত্রয়োদশীর রাত্রিবেলা ও ঘুমোলে, ও স্বপ্ন দেখবেই আর ও স্বপ্ন দেখা মানে পরের দিন আপনাদের বাড়ির কোনও-না-কোনও সদস্যের মৃত্যু হবে। এবার সেই মৃত্যু যে কোনও কারোর হতে পারে।”
সবাই ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। ওনাদেরকে ভয় পেতে দেখি পুরোহিত মশাই বললেন— “আমার গুরুদেব কালকে অথবা পরশুর মধ্যেই চলে আসবেন। আর এই সময়ের মধ্যে তো আর ত্রয়োদশী আসছে না। এখনই এতটা ভয় পাওয়ার দরকার নেই। আমার গুরুদেব এসে কি বলেন আগে শুনি।” এই কথা বলে পুরোহিত মশাই সেখান থেকে বিদায় নিয়ে চলে যান।
সবাই একটা চিন্তাতেই মগ্ন হয়ে যায় যে, সারাদিন মিষ্টিকে অত্যন্ত আগলে আগলে রাখা হয়। ও কোথাও যেতে পারে না। রাত্রিবেলা ওর কোথাও যাওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। তার কারণ, ও স্বপ্ন দেখে আর তার পরেরদিন পরিবারের সদস্যের মৃত্যু হয়। ওকে বাইরে নিয়ে যেতে চাইলেও, পুরোহিত মশাইয়ের কথা অনুযায়ী কেউ-না-কেউ ওকে আটকে দেয়। কিন্তু যদি বৈভবীর আত্মা মুক্তি পেয়ে না থাকে, তাহলে মৃত্যুগুলো ঘটাচ্ছে কে? এইরকম অদ্ভুত ভাবে মৃত্যু কোনও অশরীরী আত্মার পক্ষেই করা সম্ভব। কোন মানুষ এমন ভাবে খুন করতে পারে না। মিষ্টি স্বপ্নের সঙ্গে এই পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর জড়িয়ে আছে। এখন কথা হলো মিষ্টি স্বপ্নে কি দেখে?
মিষ্টির মেজো জেম্মা, যেকিনা সব সময় ওদেরকে ছোট করে এসেছে, সে বলে— “মিষ্টি কি স্বপ্ন দেখে তা জানার একটা উপায় আছে। যদি তোমরা সবাই আমার কথা শোনো, তাহলে আমি বলতে পারি।”
মামদিদার অনুমতি পেয়ে ও বলতে শুরু করে— “হিপনোটাইজ করে যদি মিষ্টি স্বপ্নে কি দেখে, সেটা জানা যেতে পারে। তাহলে কেমন হয়? আমার চেনাশোনা এমন একজন ডাক্তার আছেন যে, খুব ভালো হিপনোটাইজ করতে পারেন। যদি তোমাদের সবার অনুমতি থাকে তাহলে মিষ্টিকে আমি নিয়ে যেতে পারি। আর তোমরা যে যে যেতে চাও যেতে পারো।”
এছাড়া আর কোনও উপায় নেই দেখে, সবাই ওই কথায় রাজি হয়ে যায়। ওর জেম্মার চেনাশোনা ছিল বলে, আগে থেকে কোনও অ্যাপোয়েন্টমেন্ট নিতে হয় না। ওরা সোজা গিয়ে হাজির হয় ওই ডাক্তারের চেম্বারে। পরিণীতা, মিষ্টি আর ওর মেজ জেম্মা, এই তিনজনে মিলে ডাক্তারের যে ঘরে হিপনোটাইজ করা হবে, সেই ঘরে যায়। ঘরের এসিটা এমন ভাবে রাখা করা রয়েছে, যাতে ওদের বেশ ঠান্ডা লাগতে শুরু করে।
পরিণীতা দেখল, ডাক্তার মিষ্টিকে একটা আরাম কেদারায় শুইয়ে দিল। আলো নিভিয়ে দেওয়া হলো। তার সামনে রয়েছে সাদা-কালোর গোল গোল চক্র মত একটা চিত্র। শুধুমাত্র ওই সাদাকালো চক্রের মত ছবিটার উপরেই আলো রয়েছে। বাকি পুরো ঘর অন্ধকার। ঘরের ভিতরে বেশ সুগন্ধি যুক্ত একটা মোমবাতি জ্বেলে দেওয়া হল। একটা গানের মিউজিক চালিয়ে দেওয়া হল। একটানা ওই মিউজিক বেজেই চলেছে। এই রকম পরিস্থিতিতে এমনিই বসে থাকলে, মানুষ শান্ত মাথায় অনেক কিছু মনে করতে পারে।
মিষ্টিকে ডাক্তার বাবু বললেন, গোল গোল চক্রের মতো চিত্রটা রয়েছে, তার ঠিক মাঝখানের বিন্দুতে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে। তারপর যখন মনে হবে যে, ঘুম ঘুম আসছে, তখন যেন ও আস্তে করে চোখটা বন্ধ করে দেয়। সেই কথামতো মিষ্টি ওই নির্দিষ্ট ছবিটার একদম কেন্দ্রবিন্দুতে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ ওইভাবে তাকিয়ে থাকার পরে, ও শুনতে পায় ডাক্তার বাবু একনাগাড়ে একইরকম আওয়াজে একইরকম ভাবে বলে চলেছেন— “মিষ্টি তোমার ঘুম পাচ্ছে, তুমি ঘুমিয়ে পড়ো......”
ওই কথাগুলো শুনতে শুনতে একসময় ওর সত্যি সত্যি মনে হয়, ওর ঘুম পেয়েছে। চোখটা আস্তে করে বন্ধ করে। হাতগুলো আরামকেদারার দু'পাশে ঝুলে পড়ে। দেখে মনে হবে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এইভাবে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরে ডাক্তারবাবু আস্তে আস্তে বললেন— “মিষ্টি, ভালো করে দেখার চেষ্টা করো তো তুমি এখন কোথায়? তোমার চোখের সামনে কি আছে?”
এই প্রশ্ন শুনে মিষ্টি বলে— “একটা মন্দির, খুব ছোট একটা মন্দির দেখতে পাচ্ছি। মন্দিরের ভিতরে সামনেই একটা যজ্ঞ করার বেদী। সেখানে রাখা হাড়িকাঠে মাথা দিয়ে আছে একটা মেয়ে। চুল খোলা অবস্থায় একটা মহিলা হাতে তলোয়ারের মতো ধারালো একটা অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গোটা গায়ে সোনার গয়না ছাড়া আর একটাও জামাকাপড় নেই। মেয়েটা চিৎকার করে বলছে, ‘আমাকে ছেড়ে দাও, আমাকে ছেড়ে দাও’ কিন্তু ওই মহিলা কোনও কথা না শুনে এক কোপে সেই মেয়েটাকে মেরে ফেলে। তার ধর আর মুণ্ড আলাদা করে দেয়। এটা কি করছে ও? না না এ কেমন করে সম্ভব? মহিলাটা, মহিলাটা... সেখান থেকে রক্ত নিয়ে পান করছে। আরও একটা মেয়েকে ওইভাবে মেরে ফেলা হল। কিন্তু কেন এইসব করছে ও? তারও রক্ত কিছুটা পান করার পরে গোটা গায়ে মেখে নিচ্ছে। উফ কী বীভৎস সেই দৃশ্য।” ঘোরের মধ্যেই কাঁদতে থাকে মিষ্টি।
ডাক্তারবাবু আবারও প্রশ্ন করেন— “আচ্ছা মিষ্টি এটা কী তোমার স্বপ্ন? নাকি সত্যি সত্যি এমন দৃশ্য তোমার সামনে ঘটেছে।”
“হুম এমন দৃশ্য আমার স্বপ্নে আসে। প্রথম দিন একটা মেয়ের মৃত্যু হয়েছিল। তারপর আমার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। কিন্তু তার পরের বার যখন এই স্বপ্ন দেখেছি, তখন পুরোটা দেখেছিলাম। কিন্তু এটা এতো সত্যি কেন?”
“আচ্ছা... ওই মহিলা রক্ত দিয়ে স্নান করার পরে, কি করে? আর এই মন্দিরটা কোন জায়গায় আছে?”
“মন্দির ছোট মন্দির... মন্দিরের ভিতরে হাড়িকাঠে হাড়িকাঠে ...... কি ভয়ানক দৃশ্য। পারছি না আমি... আর সহ্য করতে পারছি না... ওই মহিলাটা রক্ত মেখে স্নান করছে। অসম্ভব অসম্ভব.........” বলতে বলতে নিজের জায়গায় উঠে বস পড়ে মিষ্টি।
এইসব ঘটনার কথা ডাক্তার কিছু বুঝতে না পারলেও, কাহিনীটা জানার জন্য পরিণীতা আর ওর মেজো জা খুব ভালোমতো বুঝতে পারে যে, মিষ্টি যে স্বপ্নের বর্ণনা দিল, তা আসলে বৈভবী বলি দিচ্ছে তার স্বপ্ন। ডাক্তার বাবুর সঙ্গে কিছু কথাবার্তার পরে ওরা বাড়িতে ফিরে আসে। তারপর সমস্ত ঘটনা মামদিদাকে খুলে বলে। উনি সমস্ত কিছু শোনার পরে বললেন যে, বাড়ির সবাই অফিস থেকে ফিরে এলে বসার ঘরে একটা বৈঠক হবে তখনই যা কিছু বলার তিনি বলবেন।
সেই হিসেব মতো সন্ধ্যাবেলা সবাই এলে, ছোটদেরকে উপরের তলার একটা ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আর বলা হয়, না ডাকা অব্দি তারা যেন নিচে না আসে। ছোটদের মধ্যে সবথেকে বড় মিষ্টি। তাই এই দায়িত্ব ওর উপরে ছিল।
বাকি সবাই এক জায়গায় জড়ো হলে, মামদিদা বললেন— “মিষ্টির স্বপ্ন কি দেখে, সেটা জানা গেছে। সেখান থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, বৈভবী ওর জায়গা থেকে মুক্তি পেয়েছে। আর আমাদের বাড়িতে যে ঘটনাগুলো ঘটছে,সেটা ওর আত্মা ঘটাচ্ছে। আমাদের পরিবারের উপর প্রতিশোধ নিচ্ছে ও। আস্তে আস্তে সিংহ রায় পরিবারের সমস্ত সদস্যদেরকে ও শেষ করে দেবে। কিন্তু কথা হল, বৈভবীকে ওই নির্দিষ্ট জায়গা থেকে মুক্তি দিলো কে?ও কিন্তু তিন মাস আগেই মুক্তি পেয়ে গিয়েছে। তার কারণ, পরপর তিন মাসে তিনজন মারা গিয়েছে।
আমি তোমাদের সবার কাছে একটা কথা জানতে চাইছি। তোমরা প্রত্যেকেই ঠান্ডা মাথায় এটা ভাবার চেষ্টা করো যে, তোমাদের সঙ্গে এমন কোনও ঘটনা ঘটেছে কিনা, যার দ্বারা বৈভবী মুক্তি পেতে পারে।”
কিন্তু এই কথার উত্তরে প্রত্যেকেই মাথা নেড়ে বলে যে, এমন কোনও ঘটনাই তাদের সঙ্গে ঘটেনি। সেই সময় পরিণীতা বলে— “আচ্ছা মামদিদা এমনও তো হতে পারে, মিষ্টির যেমন স্বপ্ন দেখার পরে কোন কিছু মনে ছিল না, সেই রকম এই বাড়ির সদস্য, যার দ্বারা বৈভবী মুক্তি পেয়েছে, তারও কোন কিছু মনে নেই। মানে এমনটা হলে, আমরা সেটা জানব কেমন করে?”
“হ্যাঁ এই কথাটা যে আমি ভাবিনি তা নয়। সেই কারণেই আমি পুরোহিত মশাইকে ডেকে পাঠিয়েছি। উনি কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবেন। মামদিদার কথা শেষ হওয়ার আগেই পুরোহিত মশাই ওখানে এসে হাজির হন। মামদিদার অনুমতি নিয়ে তিনি ঘরের ভিতরে এলে, মামদিদা বললেন— “পুরোহিত মশাই, আপনাকে তো আমি ফোন করে সমস্ত কথাই বলেছি। এবার আপনি বলুন, এই বাড়ির কোনও সদস্যের দ্বারা এমন কোনও ঘটনা ঘটেছে কিনা, যার দ্বারা বৈভবী মুক্তি পেতে পারে।”
“দেখুন বউ ঠাকুরাণী, আপনি আমাকে আপনাদের বাড়ীর অতীত সম্বন্ধে মোটামুটি একটা ধারণা দিয়েছেন। যেটুকু দিয়েছেন তাতেই চলে যাবে। তো আমি আমার সঙ্গে করে ওঁ লেখা কবজ এনেছি। লাল সুতো দিয়ে ওই কাবজ এই বাড়ির প্রত্যেককে ধারণ করতে হবে। সবাই যে যার নিজের মতো গলায় ধারণ করে নেবেন। তারপর আমি দেখব যে কি হচ্ছে।”
এই কোথা শুনে বাড়ির ছোটদেরকেও ডেকে পাঠানো হয়। প্রত্যেককে একটা করে ওই ওঁ লেখা কবজ দেওয়া হয়। কিন্তু পরিণীতা জন্য কবজ দেওয়ার সময় পুরোহিত মশাই বললেন— “সবাইকে কবজ দিলাম। সেই জন্য আমি তোমাকেও দিলাম। কিন্তু আমার যতদূর ধারণা, তোমাকে দিয়ে কিছু করাবে না। তার কারণ, নীলাংশু এই রাজপরিবারের কেউ নয়। সেই হিসেব মতো তুমিও এই পরিবারের বউ না। যতই ওনারা তোমাদেরকে আপন মনে করুন না কেন, এটা সত্যি। আমি বলছি বলে তোমার খারাপ লাগছে। কিন্তু এটা আমাকে এখন বলতেই হবে। নীলাংশু, মিষ্টি আর তার ভাই, এই তিনজন বৈভবীর বংশধর। তাই এদেরকে প্রয়োজন হতে পারে। আবার এই বাড়ির সদস্যদের উপর রাগ আছে। তাই এনাদেরকে মারার চেষ্টা করবে। কিন্তু তুমি যেহেতু এই বাড়ির কোনও সদস্যের বউ না। আবার বৈভবীর বংশধরও নও। তাই তোমার উপরে বিপদটা কম।”
এই কথাগুলো শোনার পরে পরিণীতার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসে। সত্যিই এই পরিবার ওর নয়।
প্রত্যেকে নিজের নিজের গলায় ওঁ লেখা কবজের মালাটা পরে ফেলে। কেউ একবারের জন্যও কোনও প্রতিবাদ করে না। আর সেটা দেখে পুরোহিত মশাই অবাক হয়ে গেলেন। বললেন— “নাঃ এইবাড়ির কোনও সদস্যের তারা বৈভবী মুক্তি পায়নি। যদি পেয়ে থাকত, তাহলে এই কবজ এত সহজে ধারণ করতে পারত না। আর এই কবজের দ্বারা আপাতত সবাই সুরক্ষিত। বাকি গুরুদেব আসলে দেখা যাক উনি কি করেন। আপনারা এত ভয় পাবেন না। ত্রয়োদশী আসতে এখনও দেরি আছে।”
পুরোহিত মশাই চলে গেলে, বাড়ির ছোটদেরকে আবার সেই ওপরের ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তারপর মামদিদা বেশ কড়া ভাবে বললেন— “আমার কেন বারবার মনে হচ্ছে, কিছু একটা রয়েছে সেটা আমি বুঝতে পারছি না। বৈভবী এমনি এমনি মুক্তি পেতে পারে না।” এমন সময় তিনি দেখেন নীলাংশু কেমন চঞ্চল হয়ে পড়েছে। সেটা দেখতে পেয়েই তিনি আবারও বললেন— “ছোট দাদুভাই, তুমি কিছু বলতে চাও?”
এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে নীলাংশু নিজের জায়গা থেকে উঠে এসে মামদিদার কোলে মাথা রেখে কেঁদে ওঠে। তারপর বলে— “আমাকে ক্ষমা করে দাও। সমস্ত কিছু জানা সত্ত্বেও আমি ভুল করেছি।”
সবাই অবাক হয়ে যায়। সবথেকে বেশি অবাক হয় পরিণীতা। নীলাংশু কি এমন করেছে, যার জন্য এমন ভাবে কাঁদছে আর ক্ষমা চাইছে। আর এই প্রশ্নটাই মামমদা ওকে করেন।
তার উত্তরে নীলাংশু বলে— “আজ থেকে প্রায় ষোল সতেরো বছর আগে, আমি আমাদের আসল রাজবাড়ি দেখার জন্য কেশিয়াপুর যাই। আমাদের অফিসের বেশ কয়েকজনকে আমি আমাদের ওই রাজবাড়ির কথা বলেছিলাম। তাই আমরা পাঁচ ছয় জন মিলে বাড়িতে অফিস ট্যুরের নাম করে ওই রাজবাড়িতে চলে যাই। এত বছরের পুরনো রাজবাড়ি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। অথচ কি সুন্দর। বাইরে থেকেই আমরা রাজবাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকি। কিন্তু রাজমহলের একদম ভিতরে প্রবেশ করিনি। দূর থেকে বৈভবীর বানানো মন্দিরগুলো দেখেছিলাম। এখন ভগ্নপ্রায় জঙ্গলে পরিপূর্ন হয়ে পড়ে রয়েছে বেশিরভাগ জায়গাটা। তাই কেউ চাইলেও ভিতরে প্রবেশ করতে পারবে না। পোকামাকড়ের ভয় রয়েছে। কিন্তু এতটা বড় আর এতো সুন্দর রাজবাড়িটা যে, আমরা একমনে দেখতে দেখতে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলাম। জানো তোমরা ওখানে গেলেই দেখতে পারবে যে,ওই জায়গাটায় মানুষ ঘুরতে যায়। ওখানে থাকার জন্য ছোট-ছোট হোমস্টে রয়েছে। কাছে বেশ কয়েকটা মন্দির রয়েছে। রাজবাড়ির চারিদিকে উঁচু উঁচু মাচা মত করা রয়েছে। সেখানে টিকিট কেটে উঠে দূরবীনের সাহায্যে রাজবাড়ির ভেতরটা দেখা যায়। আমি জানতাম যে, ওই রাজবাড়ির ভিতরে আমার প্রবেশ করা বারণ। তার কারণ, আমি এই পরিবারের সদস্য। কিন্তু পরে জানতে পারি যে,আমি এইবাড়ির কেউ নই।
আমরা ওইখানে একটা হোমস্টে নিয়েছিলাম। শীতকাল ছিল বলে আমরা সবাই মিলে ড্রিঙ্ক করব ভাবি। সেইদিন অধিক পরিমাণে মদ্যপান হয়ে গিয়েছিল। তাই রাত এগারোটার কাছাকাছি আমরা যে যার ঘরে চলে যাই। মিনিট দশেক পরে আমার ঘরে আমার কলিগ শেফালী আসে। ও আমাকে সব দিন পছন্দ করত। বিয়েও করতে চেয়েছিল। কিন্তু পরিবারের মতে আমি পরিণীতাকে বিয়ে করেছিলাম। সেইদিন রাত্রিবেলা ও এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে। বারবার ভালবাসার কথা বলতে থাকে। আমিও যে ওকে পছন্দ করতাম। তাই নয়, শুধুমাত্র পরিবারের জন্যই ওকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু পরে আমি সেই সমস্ত কিছু থেকে দূরে সরে গিয়েছিলাম। পরিণীতাকেই আমি ভালোবেসেছি। এখনও ভালবাসি। কিন্তু সেই রাত্রে মদ্যপান করে থাকার জন্য ওর ওই আবেদনে সাড়া দিয়ে ফেলি। আর আমাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক স্থাপন হয়।
পরের দিন আমরা আমাদের ভুলটা বুঝতে পারি। ও তখনও অবিবাহিত ছিল। তাই ওর থেকেও বেশি অপরাধবোধ আমার ছিল। তার কারণ, আমি বিবাহিত। ওর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে আমি আমার স্ত্রীকে ঠকিয়েছি। ততদিনে মিষ্টিও হয়ে গিয়েছে। সেই হিসেব মতো আমি আমার মেয়েকেও ঠকিয়েছি। তাই আমরা দু’জনে মিলেই ঠিক করি যে, আমাদের এই রাতটার কথা আমরা দুজনেই ভুলে যাব। ও আমার কথা মেনে নিয়েছিল।
চার মাস পরে ওর বিয়ে হয়ে যায়। ছ’ মাসের মাথায় শেফালী একটা কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়। আমরা অফিস থেকে বেশ কয়েকজন দেখতে গিয়েছিলাম। তখন বাচ্চাটাকে দেখে একবারের জন্যও মনে হয়নি যে, ওই বাচ্চাটা ছ’মাসে অপরিণত একটা বাচ্চা। উল্টে তাকে দেখে মনে হয়েছিল যে, সঠিক সময়েই ওর জন্ম হয়েছে।
আমার ভিতরে একটা অপরাধ বোধ ছিলই। তার উপরে এই জিনিসটা দেখে কেন জানি আমার মনে হতে থাকে যে, ওই কন্যাসন্তানটা কোনওভাবে আমার নয় তো? সেই রাত্রের ঘটনা এমন ভাবে আমাদের জীবনে ফিরে আসেনি তো? এইরকম হলে খুব বড় ভুল হয়ে গেছে। তার কারণ, অবশ্যই আমাদের পরিবারের অতীত। আমি শেফালীকে আলাদা করে ডেকে পরিবারের অতীত খুলে বলি। তারপর ওকে জিজ্ঞাসা করি যে, ওর সন্তান কোনওভাবে আমার সন্তান কিনা। আর আমার ভয়টাকে সত্যি করে দিয়ে ও জানায় যে, ওই কন্যা সন্তান আমার। ওর স্বামী সমস্ত কিছু জেনেই ওকে বিয়ে করেছে। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা জানে না। কিন্তু বাপের বাড়ির সবাই জানে। আমি ওকে অনুরোধ করেছি যে, ও যেন আঠারো বছর বয়স হওয়ার আগেই ওর মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেয়। কারণ, ওর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়নি। তাই অবশ্যই ও আমার পরিবারের কেউ নয়। কিন্তু ওর সন্তানের শরীরে আমার রক্ত। তাই ওকে আঠারো বছরের মধ্যেই বিয়ে করতে হবে। কিন্তু ওর বয়স এখনও আঠারো বছর হয়নি। আমি জানি না বৈভবী ওই সন্তানকে দিয়ে কিছু করিয়েছে কিনা।”
এই কথা শুনে বাড়ির সবার পায়ের নিচ থেকে যেন মাটির সরে যায়। পরিণীতার চোখ থেকে যেন জলের ধারা বইতে থাকে। মামদিদা নিজের মনটাকে শক্ত করে এই প্রসঙ্গে একটাও কথা না বলে, নীলাংশুকে বলেন পরের দিন ওর সেই সন্তানকে এই বাড়িতে নিয়ে আসতে বলেন।
এই কথা শুনে নীলাংশু আর কোনও কথা না বলে, ওখান থেকে চলে যায়। কিন্তু পরিণীতা বলে— “ঠাম, এর পরে আমাকে আর এইসব বিষয়ে জড়িও না। এমনিতেই তো পুরোহিত মশাই বলেছেন যে, আমার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। তার ওপরে তোমার নাতি এইরকম একটা কাণ্ড করেছে। এতগুলো বছর ধরে ও সবকিছু লুকিয়ে রেখেছে। এরপরে আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়, কোন কিছুতে থাকা।”
ওর কথা শুনে মামদিদা সমস্ত বিষয়টা অনুভব করতে পারলেও মুখে বললেন— “এই মুহূর্তে পরিবারকে একা করে তুই কোথাও যাস না। কিছুদিন অপেক্ষা কর। এই বিপদটা আমরা কাটিয়ে উঠি, তারপর এই নিয়ে আলোচনা করা যাবে। আর এই বিপদ কাটিয়ে উঠতে না পারলে, এইসব মান-অভিমান সবকিছুই জলে যাবে। তাই এখন অভিমানটা আর করিস না।”
পরিণীতা আর কোনও কথা বলে না। বাড়ির আর কোনও সদস্য কোনও কথা বলে না। একে তো সামনে এক ভয়ানক বিপদ রয়েছে। তার উপরে এইরকম একটা কথা জানতে পারে সবাই। ওর মেজ জা চাইলেও কিছু বলতে পারে না। তার কারণ, ও যখনই কথা বলবে বলে ঠিক করেছিল, দেখে মামদিদা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকেই তাকিয়ে আছেন।
৭
পরের দিন নীলাংশু ওর সেই সন্তানকে আর শেফালীকে সিংহরায় বাড়িতে নিয়ে আসে। রাস্তায় আসতে আসতে নীলাংশু সমস্ত কিছুই খুলে বলেছে শেফালীকে। শেফালী নিজেও বুঝতে পারছে না যে, ওর সন্তান কেমনভাবে এইসবের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে? ও তো বাড়িতেই ছিল।
বাড়িতে আসার পরে মামদিদা বললেন, তিনি ওই মেয়েটির সঙ্গে আলাদা করে কথা বলবেন। কিন্তু মেয়েটি কিছুতেই নিজের মাকে ছেড়ে যেতে চায় না। হয়তো এতজন মানুষকে দেখে ভয় পেয়েছে। বাধ্যগত সবার সামনেই কথা বলতে হয় মামদিদাকে।
তিনি প্রথমেই মেয়েটিকে বললেন— “তোমার নাম কি? আমরা কি নামে তোমাকে ডাকব?”
“আমার নাম মিতালী। আমার মা আমাকে মিঠু বলে ডাকে।”
“তাহলে আমরা কি তোমাকে মিঠু বলে ডাকতে পারি?”
“হ্যাঁ পারো...”
“আচ্ছা বেশ... মিঠু, আমি তোমাকে কিছু কথা জিজ্ঞাসা করব। তুমি খুব চিন্তা ভাবনা করে উত্তর দেবে। তার আগে আমাকে বলতো, তোমার বয়স কত?”
“আই এম সিক্সটিন ইয়ার্স ওল্ড।”
“ও তোমার ষোলো বছর বয়স। মানে, তুমি তো এখন বেশ বড় হয়ে গেছো। তুমি আমাকে একটা কথা বলতে পারবে, তুমি কখনও রাজবাড়ি দেখেছো?”
“হ্যাঁ দেখেছি তো। তোমাদের এটাই তো রাজবাড়ি। ওই আঙ্কেলটা আমাকে বলছিল, এই বাড়িটা একটা রাজবাড়ি। এখানে এক সময় রাজা-রানী সবাই থাকতো।”
আমার লেখা বইটি তোমরা পাবে আমাজন আর ফ্লিপকার্ট থেকে। এই গল্পেও রয়েছে তন্ত্র রয়েছে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া একটা নিষ্পাপ মেয়ের অতৃপ্ত আত্মা। তাকে আটকাতে গেলে দিতে হবে বলিদান। কারণ কখনও কখনও ভালো কিছু করতে গেলে তার দাম দিতে হয় অনেক। গল্পের প্রধান চরিত্র কি বলিদান দেবে বা কতটা ভয়ঙ্কর হবে ওদের জীবন? আছে শঙ্করনাথ তান্ত্রিক। যার সঙ্গে তোমাদের পরিচয় হয়েছে আমার লেখা আগের রহস্য গল্পে। সব মিলিয়ে রহস্য রোমাঞ্চে ভরা এই উপন্যাস "চাঁপাগড়ের অভিশপ্ত জমিদার বাড়ি"...
এই কথা শুনে মামদিদা বুঝলেন যে, নীলাংশুকে ও আঙ্কেল বলছে। মুখে বললেন— “হ্যাঁ, তোমার আঙ্কেল একদম ঠিক কথা বলেছে। কিন্তু আমি এই রাজবাড়িটার কথা বলছি না। এই রাজবাড়ি ছাড়া তুমি আর কোনও রাজবাড়ি দেখেছো? মানে, ভেঙে গেছে অনেক পুরনো, কেউ যায় না, এইরকম কোনও রাজবাড়ি।”
“তুমি আমাকে বকবে নাকি?”
“এমা কেন? বকব কেন? কি করেছ তুমি? তোমাকে আমি বকব বললে কেন?”
একটু থেমে থেমে মিঠু বলল— “কয়েকমাস আগে আমাদের স্কুল থেকে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পিকনিকের মতো হয়েছিল। আমি সেই পিকনিকে গিয়েছিলাম। আর আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল একটা নদীর ধারে। ওখানেই রান্না-বান্না সব হয়েছিল। ওই জায়গায় না, একটা ভাঙা রাজবাড়ি আছে। আর জানো, ওই রাজবাড়িটাকে না দেখতে তোমাদেরই রাজবাড়ির মতই। কিন্তু ওটা আমার আরও সুন্দর লেগেছে।”
এই কথা শুনে সবাই চমকে ওঠে। প্রত্যেকে বুঝতে পারে যে, মিঠু ওই জায়গায় গিয়েছে। মামদিদা বললেন— “এবারে তুমি আমাকে বলো, তুমি কি ওই রাজবাড়ির ভিতরে ঢুকেছিলে?”
মিঠু ওর মায়ের দিকে একবার তাকিয়ে বলল— “ঢুকেছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি নিজে থেকে ঢুকতে চাইনি। আমার সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন বন্ধু ছিল। ওরা সবাই মিলে বলল যে, লাঠি দিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করতে করতে একটু ভেতরের দিকে যাবে। এই রকম পুরনো রাজবাড়িতে নাকি ট্রেজার পাওয়া যায়। আমরা ট্রেজার হান্ট করতে পারি। আমার ইতিহাস সবদিন ভালো লাগতো। তাই আমি ওদের কথাতে রাজি হয়ে যাই। তারপরে আমরা নিজেদের হাতে একটা করে মোটাসোটা লাঠি নিয়েনি। আর সেটা দিয়ে পরিষ্কার করতে করতে সামনের দিকে এগিয়ে যাই। বেশ কিছুটা একসঙ্গে যাওয়ার পরে, একটা জায়গা আছে যেখান থেকে রাজবাড়ির ভিতরের বেশ সুন্দর সুন্দর ঘরগুলো দেখা যাচ্ছিল। তখন আমরা প্রত্যেকে ঠিক করি, আমরা একজন একজন করে ওই ঘরগুলোতে ঢুকে দেখব যে, ওখানে কোনও ট্রেজার পাওয়া যায় কিনা। যে সবার আগে ট্রেজার বের করে আনতে পারবে, সে জিতে যাবে।”
“আচ্ছা মিঠু, তুমি ট্রেজার পেয়েছিলে, তাই তো?”
“তুমি কেমন করে জানলে?”
“আমি জানলাম... মানে, ভাবলাম যে তোমার মত একটা মেয়ে তো জিতবেই।”
“হ্যাঁ... সবাই ওই রাজবাড়ির যে ঘরগুলো আমরা দেখতে পেয়েছিলাম, ওইখানে ঢুকলেও, আমি ওই ঘরগুলোর পাশে কিছু ভাঙ্গা মন্দির ছিল, ওইদিকে যাই। ওইখানে একটা বেশ বড় ঘর ছিল। ওই ঘরের মধ্যে তখন বেশ অনেক জিনিসপত্র ছিল। অনেক জামা কাপড় ছিল। সমস্ত কিছুই নষ্ট। কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল। হাত দিয়ে ধরলেই যেন ভেঙে ভেঙে পড়েছিল। হাঁটতে-হাঁটতে খেয়াল করি, ওই দেওয়ালের একটা দিক বেশ পরিষ্কার। এইরকম একটা নোংরা বাড়িতে, একটা দেওয়াল এমন সুন্দর পরিষ্কার কেমন করে থাকতে পারে? সেটা জানার জন্য আমি যেই ওই দেওয়ালটায় হাত দেই, অমনি একটা পর্দার মতো সামনে থেকে সরে যায়। আর ভিতরে আমি ছোট একটা বাক্স দেখতে পাই। বাক্সটা খুলতেই হওয়ার মতো কিছু একটা দেখা গেল। তারপরে দেখলাম, ওখানে কত গয়না রাখা। বাক্সটা নিয়ে আমি বাইরে আসি। সব বন্ধুদেরকে ডাকি। ওরা এসে আমার ঐ বাক্সটা দেখে আমাকে উইনার বলে। তারপর বলে, বাক্সটার গয়নাগুলো আমরা সবাই ভাগ করে নিয়ে নেব। কিন্তু আমি বলি যে, এই রকম জায়গা থেকে গয়না নেওয়া অপরাধ। তাই এটা যেখানে ছিল সেখানেই থাক।
তারপর আমরা তাড়াতাড়ি করে ফিরে আসি আমাদের পিকনিকের বাকিরা যেখানে ছিল, সেখানে। খাওয়া-দাওয়া করার পরে একটু বসে ছিলাম। তার মধ্যে মনে হলো, কে যেন আমাকে ডাকছে। আমি ওদেরকে বসতে বলে সামনের দিকে এগিয়ে যাই। আমার তারপর আর কোনও হুঁশ ছিল না। এইদিকে আমি ফিরছি না বলে, ওরা আমাকে খোঁজাখুঁজি করার চেষ্টা করে। আমার বন্ধুরা তখন ভাবে যে, আমি ইতিহাস ভালোবাসি বলে হয়তো ওই রাজবাড়িতে আবার ফিরে গিয়েছি। ওরা আমাদের স্কুলের ম্যাডামদেরকে কিছু না বলে, ওই রাজবাড়িতে যাই। আর দেখে আমি সমস্ত গয়না গায়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছি।
সঙ্গে সঙ্গে ওরা আমার চোখে মুখে জল দেয়। আমার জ্ঞান ফিরে আসে। তখন আমাদের সবার হাত পা শুকিয়ে যাচ্ছিল। আমাদের মনে হচ্ছিল, ওখানে কিছু একটা ভূতুড়ে ব্যাপার আছে। তা না হলে আমি ওইরকম ডাক শুনে ঘোরের মধ্যে ওখানে গিয়ে কখন গয়না পড়েছি, কিচ্ছু আমার মনে ছিল না। তাড়াতাড়ি করে গায়ের গয়না গুলো খুলে ওই বাক্সের মধ্যে রেখে বাক্সটাকে যথাস্থানে রেখে দিয়ে আবার আমরা ফিরে আসি। তারপর বাড়ি ফিরে আসি।”
“আচ্ছা, তুমি আমাকে একটু মনে করে বলতে পারবে, তারপরে তোমার সঙ্গে কোনও অস্বাভাবিক কান্ড হয়েছে কিনা? তুমি হয়তো কাউকে কিছু বলোনি। কিন্তু আজকে যদি তুমি বলো, খুব ভালো হয়। তুমি বড় হয়েছ। কিন্তু তোমার বিয়ে হয়নি বলে, আমি তোমাকে পুরো ঘটনাটা খুলে বলতে পারছি না। তবে এইটুকু বলতে পারি, যদি তোমার সঙ্গে অস্বাভাবিক কোনও কিছু হয়ে থাকে, আমাদেরকে প্লিজ খুলে বলো। না বললে বিপদ বাড়বে বৈ কমবে না।”
“আমার সঙ্গে কিছু অস্বাভাবিক কান্ড হচ্ছে। যা আমি আগে কাউকে বলিনি। প্রতি অমাবস্যার রাতে আমার সঙ্গে কি হয়, আমি জানি না। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠলে প্রতিদিন আমার হাতে রক্ত লেগে থাকে। তুমি আজকে আমাকে বিপদের কোথা বললে বলে আমি তোমাকে বললাম। সকালবেলা উঠে হাতে ওই রক্ত দেখে, আমি সেটা বেসিনে গিয়ে ধুয়ে ফেলি। আমার মা-বাবা কেউ জানে না এই কথাটা।”
শেফালী উঠে এসে মিঠুকে একটা চড় লাগিয়ে দেয়। তারপর বলে— “এত বড় কান্ড হয়েছে আর তুই আমাকে বলিস নি। কতদিন ধরে হচ্ছে এইসব?”
“আমি ওই পিকনিক থেকে ফিরে আসার পর থেকেই হচ্ছে এইসব।”
এতক্ষণে ব্যাপারটা সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। বৈভবী এই সিংহরায় পরিবার থেকে কাউকে দিয়ে নিজের বাক্স খোলায়নি। সবাই যেহেতু এখানে অত্যন্ত সতর্কতার মধ্যে ছিল, তাই এখানে ও দুর্বল মনের কাউকে পায়নি। ও এই পরিবারের এই গোপন ব্যাপারটাকে কাজে লাগিয়েছে। কেউ জানত না যে, নীলাংশুর একটা কন্যা সন্তান রয়েছে। তাই ওকে পাহারা দেওয়ার কথা কারোর মাথায় আসেনি।
এইবারে ওর মেজো জা আর চুপ করে থাকল না। চিৎকার করে বলে উঠল— “মিষ্টি প্রথমে বিয়ে থেকে পালিয়ে গিয়ে সর্বনাশ ডেকে আনল। আর ওর বাবা তখন মেয়ের বিয়ে দেবো বিয়ে দেবো করে খুব লাফালেও নিজে যে এত বড় একটা কীর্তি করে আছে, সেই কথা একবারও আমাদেরকে বলল না। আমরা যখন প্রত্যেকে নিজে থেকে সাবধান থাকার চেষ্টা করছি, যাতে কোন বিপদ-আপদ কিছু না হয়। সেই সময়েও ও বেমালুম চেপে গেল যে, ওর আরও একটা মেয়ে আছে। ওর উচিত ছিল না, এই মেয়ের কথা আগেই বলে দেওয়া। তাহলে তাকেও আমরা পাহারা দেওয়ার চেষ্টা করতাম।”
এই কথা শুনে মিঠু চমকে ওঠে। বলে— “কি বললে...! আমার বাবা কে?”
মামদিদা শেফালীকে অনুরোধ করেন, মিঠুকে সমস্ত কিছু খুলে বলার জন্য। তার কারণ, এখন যে বিপদ আছে, সেই বিপদ থেকে কিন্তু মিঠুও সুরক্ষিত নয়। এইবার ওই পুরোহিত মশাইকে বলতে হবে যে, মিঠুকে দিয়ে ইতিমধ্যেই বৈভবী ওর ধ্বংসলীলা ওর সেই পুরনো খেলা আবার সেই শুরু করেছে কিনা।
শেফালী মিঠুকে সমস্ত কথা খুলে বলে। তারপর এই বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া অবধি মিঠুকে নিয়ে এই সিংহরায় পরিবারে থাকতে ও রাজি হয়ে যায়।
পুরোহিত মশাইকে খবর দেওয়া হয়। তিনি এসে যখন মিঠুকে ওই ওঁ লেখা তাবিজ পরাতে যান, তখন সে আর কিছুতেই সেটা পড়তে চায় না। চোখ দুটো বীভৎস রকম দেখতে হয়ে যায়। পুরো চোখটা কালো হয়ে যায়। মাথার চুল গুলো উপর দিকে উড়তে থাকে। একটা অদ্ভুত গলার স্বরে বলতে থাকে— “কি ভেবেছিস তোরা? এত সহজে সমস্ত কিছু করে ফেলবি? এই মেয়েটাকে আমি আমার কব্জায় রেখেছি। ও তোদেরকে সমস্ত কথা বলতে পেরেছে তার কারণ, আমি ওকে বলতে দিয়েছি। আমি চেয়েছি যে, তোরা জান কেমন করে আমি মুক্তি পেয়েছি। কি ভেবেছিস, তোদের পূর্বপুরুষ আমাকে বন্দী বানাতে পেরেছিল বলে তোরাও পারবি? অসম্ভব...... আমাকে কেউ বন্দী করতে পারবে না, কেউ না। বুঝেছিস? এখনও অমাবস্যার আসতে দেরি আছে। দেখ যদি কিছু করতে পারিস। আর হ্যাঁ, তোদের বাড়ির আর একটা মেয়ে, যে কিনা এই বন্ধন আলগা হতে সাহায্য করেছে, তাকেও বলিস যে, ত্রয়োদশী আসতে কিছুটা দেরি আছে। ও যেন তৈরি থাকে। আর তোদের পরিবারের আরও একজনের মৃত্যুর জন্যও তোরা তৈরি থাকিস।”
এই কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিঠুর মাটিতে নেতিয়ে পড়ে। মিঠুকে ওইভাবে পড়ে যেতে দেখে, পুরোহিত মশাই বললেন— “এই বাড়িতে মিঠুকে রাখলে বিপদ বাড়বে বৈ কমবে না। আপনারা এক কাজ করুন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে অন্য কোথাও নিয়ে যান।”
এই কোথা শুনে নীলাংশু শেফালীকে ইশারা করতে, শেফালী অজ্ঞান অবস্থায় মিঠুকে সঙ্গে নিয়ে নীলাংশুর সঙ্গে ওদের বাড়িতে ফিরে যায়। ওরা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যেতে, পুরোহিত মশাই বললেন— “বৌ-ঠাকুরাণী ব্যাপারটা এখন জলের মত পরিষ্কার। কিন্তু একটা নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেটা হল, গুরুদেব খবর পাঠিয়েছেন অমাবস্যায় ওনার একটা বিশেষ পূজা আছে। সেটা শেষ না করে উনি আসতে পারবেন না। ওই বিশেষ পূজা হলে, ওনার শক্তি বেশ অনেকটাই বেড়ে যাবে। তাই ওই পুজোটা শেষ করে উনি আসবেন। আর তাছাড়া সেই সঙ্গে তিনি আরও একটা কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, এই যে শক্তি তিনি লাভ করবেন, তার দ্বারা এত বছরের পুরনো এক তন্ত্র সাধিকার আত্মা মুক্তি দিতে তিনি বেশ অনেকটাই সক্ষম হবেন। বাকি পুরোপুরি যা কিছু তিনি এখানে এসে সমস্ত বিচার বিবেচনা করেই বলতে পারবেন।”
এই কথা শুনে বাড়ির সবার মুখ ছোট হয়ে গেল। অমাবস্যা পেরিয়ে গেলে তবে গুরুদেব আসবেন। তার মানে এই বাড়ির আরও এক সদস্যের মৃত্যু হতে চলেছে। কিন্তু সেটা যে কে, তা কেউ জানেনা। নীলাংশু, নীলাংশুর ছেলে, পরিণীতা, মিষ্টি... এদের চার জনকে বাদ দিয়ে, বাকি যে কেউ হতে পারে।
ওদের সবার মুখ দেখে পুরোহিত মশাই বললেন— “আমি একটা কোনও ব্যবস্থা করব, আপনাদের পরিবারকে রক্ষা করার জন্য। আমার উপর এইটুকু ভরসা রাখুন যে, ওই একটা রাত আমি আপনাদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে পারব। কিন্তু সত্যি বলতে, মিঠুর ভিতরে যেহেতু বৈভবীর আত্মা প্রবেশ করে গেছে, তাই মিঠুকে আটকানোর ক্ষমতা কিন্তু আমার নেই। আমি খুবই সাধারন একজন পুরোহিত। আমার বাবা এই তন্ত্রসাধনার সঙ্গে কিছুটা যুক্ত ছিলেন, তাই ওনার কাছ থেকে কিছু বিধি আমি শিখিয়েছিলাম। ব্যাস এইটুকুই... এবার আপনারা আদেশ করলে, আমি বাড়িতে গিয়ে আপনাদেরকে বাঁচানোর সমস্ত বিধি করতে পারি।”
পুরোহিত মশাই সেখান থেকে চলে গেলে, সবার মনে একটা কথাই ঘুরে ফিরে আসতে থাকে। তিনি তন্ত্রসাধনার কিছু জিনিস জানেন। কিন্তু তা দিয়ে কি বৈভবীর মত একজন ভয়ঙ্কর আত্মাকে আটকানো সম্ভব হবে?
ওর কথা শুনে মামদিদা সমস্ত বিষয়টা অনুভব করতে পারলেও মুখে বললেন— “এই মুহূর্তে পরিবারকে একা করে তুই কোথাও যাস না। কিছুদিন অপেক্ষা কর। এই বিপদটা আমরা কাটিয়ে উঠি, তারপর এই নিয়ে আলোচনা করা যাবে। আর এই বিপদ কাটিয়ে উঠতে না পারলে, এইসব মান-অভিমান সবকিছুই জলে যাবে। তাই এখন অভিমানটা আর করিস না।”
পরিণীতা আর কোনও কথা বলে না। বাড়ির আর কোনও সদস্য কোনও কথা বলে না। একে তো সামনে এক ভয়ানক বিপদ রয়েছে। তার উপরে এইরকম একটা কথা জানতে পারে সবাই। ওর মেজ জা চাইলেও কিছু বলতে পারে না। তার কারণ, ও যখনই কথা বলবে বলে ঠিক করেছিল, দেখে মামদিদা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকেই তাকিয়ে আছেন।
৭
পরের দিন নীলাংশু ওর সেই সন্তানকে আর শেফালীকে সিংহরায় বাড়িতে নিয়ে আসে। রাস্তায় আসতে আসতে নীলাংশু সমস্ত কিছুই খুলে বলেছে শেফালীকে। শেফালী নিজেও বুঝতে পারছে না যে, ওর সন্তান কেমনভাবে এইসবের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে? ও তো বাড়িতেই ছিল।
বাড়িতে আসার পরে মামদিদা বললেন, তিনি ওই মেয়েটির সঙ্গে আলাদা করে কথা বলবেন। কিন্তু মেয়েটি কিছুতেই নিজের মাকে ছেড়ে যেতে চায় না। হয়তো এতজন মানুষকে দেখে ভয় পেয়েছে। বাধ্যগত সবার সামনেই কথা বলতে হয় মামদিদাকে।
তিনি প্রথমেই মেয়েটিকে বললেন— “তোমার নাম কি? আমরা কি নামে তোমাকে ডাকব?”
“আমার নাম মিতালী। আমার মা আমাকে মিঠু বলে ডাকে।”
“তাহলে আমরা কি তোমাকে মিঠু বলে ডাকতে পারি?”
“হ্যাঁ পারো...”
“আচ্ছা বেশ... মিঠু, আমি তোমাকে কিছু কথা জিজ্ঞাসা করব। তুমি খুব চিন্তা ভাবনা করে উত্তর দেবে। তার আগে আমাকে বলতো, তোমার বয়স কত?”
“আই এম সিক্সটিন ইয়ার্স ওল্ড।”
“ও তোমার ষোলো বছর বয়স। মানে, তুমি তো এখন বেশ বড় হয়ে গেছো। তুমি আমাকে একটা কথা বলতে পারবে, তুমি কখনও রাজবাড়ি দেখেছো?”
“হ্যাঁ দেখেছি তো। তোমাদের এটাই তো রাজবাড়ি। ওই আঙ্কেলটা আমাকে বলছিল, এই বাড়িটা একটা রাজবাড়ি। এখানে এক সময় রাজা-রানী সবাই থাকতো।”
আমার লেখা বইটি তোমরা পাবে আমাজন আর ফ্লিপকার্ট থেকে। এই গল্পেও রয়েছে তন্ত্র রয়েছে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া একটা নিষ্পাপ মেয়ের অতৃপ্ত আত্মা। তাকে আটকাতে গেলে দিতে হবে বলিদান। কারণ কখনও কখনও ভালো কিছু করতে গেলে তার দাম দিতে হয় অনেক। গল্পের প্রধান চরিত্র কি বলিদান দেবে বা কতটা ভয়ঙ্কর হবে ওদের জীবন? আছে শঙ্করনাথ তান্ত্রিক। যার সঙ্গে তোমাদের পরিচয় হয়েছে আমার লেখা আগের রহস্য গল্পে। সব মিলিয়ে রহস্য রোমাঞ্চে ভরা এই উপন্যাস "চাঁপাগড়ের অভিশপ্ত জমিদার বাড়ি"...
এই কথা শুনে মামদিদা বুঝলেন যে, নীলাংশুকে ও আঙ্কেল বলছে। মুখে বললেন— “হ্যাঁ, তোমার আঙ্কেল একদম ঠিক কথা বলেছে। কিন্তু আমি এই রাজবাড়িটার কথা বলছি না। এই রাজবাড়ি ছাড়া তুমি আর কোনও রাজবাড়ি দেখেছো? মানে, ভেঙে গেছে অনেক পুরনো, কেউ যায় না, এইরকম কোনও রাজবাড়ি।”
“তুমি আমাকে বকবে নাকি?”
“এমা কেন? বকব কেন? কি করেছ তুমি? তোমাকে আমি বকব বললে কেন?”
একটু থেমে থেমে মিঠু বলল— “কয়েকমাস আগে আমাদের স্কুল থেকে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পিকনিকের মতো হয়েছিল। আমি সেই পিকনিকে গিয়েছিলাম। আর আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল একটা নদীর ধারে। ওখানেই রান্না-বান্না সব হয়েছিল। ওই জায়গায় না, একটা ভাঙা রাজবাড়ি আছে। আর জানো, ওই রাজবাড়িটাকে না দেখতে তোমাদেরই রাজবাড়ির মতই। কিন্তু ওটা আমার আরও সুন্দর লেগেছে।”
এই কথা শুনে সবাই চমকে ওঠে। প্রত্যেকে বুঝতে পারে যে, মিঠু ওই জায়গায় গিয়েছে। মামদিদা বললেন— “এবারে তুমি আমাকে বলো, তুমি কি ওই রাজবাড়ির ভিতরে ঢুকেছিলে?”
মিঠু ওর মায়ের দিকে একবার তাকিয়ে বলল— “ঢুকেছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি নিজে থেকে ঢুকতে চাইনি। আমার সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন বন্ধু ছিল। ওরা সবাই মিলে বলল যে, লাঠি দিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করতে করতে একটু ভেতরের দিকে যাবে। এই রকম পুরনো রাজবাড়িতে নাকি ট্রেজার পাওয়া যায়। আমরা ট্রেজার হান্ট করতে পারি। আমার ইতিহাস সবদিন ভালো লাগতো। তাই আমি ওদের কথাতে রাজি হয়ে যাই। তারপরে আমরা নিজেদের হাতে একটা করে মোটাসোটা লাঠি নিয়েনি। আর সেটা দিয়ে পরিষ্কার করতে করতে সামনের দিকে এগিয়ে যাই। বেশ কিছুটা একসঙ্গে যাওয়ার পরে, একটা জায়গা আছে যেখান থেকে রাজবাড়ির ভিতরের বেশ সুন্দর সুন্দর ঘরগুলো দেখা যাচ্ছিল। তখন আমরা প্রত্যেকে ঠিক করি, আমরা একজন একজন করে ওই ঘরগুলোতে ঢুকে দেখব যে, ওখানে কোনও ট্রেজার পাওয়া যায় কিনা। যে সবার আগে ট্রেজার বের করে আনতে পারবে, সে জিতে যাবে।”
“আচ্ছা মিঠু, তুমি ট্রেজার পেয়েছিলে, তাই তো?”
“তুমি কেমন করে জানলে?”
“আমি জানলাম... মানে, ভাবলাম যে তোমার মত একটা মেয়ে তো জিতবেই।”
“হ্যাঁ... সবাই ওই রাজবাড়ির যে ঘরগুলো আমরা দেখতে পেয়েছিলাম, ওইখানে ঢুকলেও, আমি ওই ঘরগুলোর পাশে কিছু ভাঙ্গা মন্দির ছিল, ওইদিকে যাই। ওইখানে একটা বেশ বড় ঘর ছিল। ওই ঘরের মধ্যে তখন বেশ অনেক জিনিসপত্র ছিল। অনেক জামা কাপড় ছিল। সমস্ত কিছুই নষ্ট। কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল। হাত দিয়ে ধরলেই যেন ভেঙে ভেঙে পড়েছিল। হাঁটতে-হাঁটতে খেয়াল করি, ওই দেওয়ালের একটা দিক বেশ পরিষ্কার। এইরকম একটা নোংরা বাড়িতে, একটা দেওয়াল এমন সুন্দর পরিষ্কার কেমন করে থাকতে পারে? সেটা জানার জন্য আমি যেই ওই দেওয়ালটায় হাত দেই, অমনি একটা পর্দার মতো সামনে থেকে সরে যায়। আর ভিতরে আমি ছোট একটা বাক্স দেখতে পাই। বাক্সটা খুলতেই হওয়ার মতো কিছু একটা দেখা গেল। তারপরে দেখলাম, ওখানে কত গয়না রাখা। বাক্সটা নিয়ে আমি বাইরে আসি। সব বন্ধুদেরকে ডাকি। ওরা এসে আমার ঐ বাক্সটা দেখে আমাকে উইনার বলে। তারপর বলে, বাক্সটার গয়নাগুলো আমরা সবাই ভাগ করে নিয়ে নেব। কিন্তু আমি বলি যে, এই রকম জায়গা থেকে গয়না নেওয়া অপরাধ। তাই এটা যেখানে ছিল সেখানেই থাক।
তারপর আমরা তাড়াতাড়ি করে ফিরে আসি আমাদের পিকনিকের বাকিরা যেখানে ছিল, সেখানে। খাওয়া-দাওয়া করার পরে একটু বসে ছিলাম। তার মধ্যে মনে হলো, কে যেন আমাকে ডাকছে। আমি ওদেরকে বসতে বলে সামনের দিকে এগিয়ে যাই। আমার তারপর আর কোনও হুঁশ ছিল না। এইদিকে আমি ফিরছি না বলে, ওরা আমাকে খোঁজাখুঁজি করার চেষ্টা করে। আমার বন্ধুরা তখন ভাবে যে, আমি ইতিহাস ভালোবাসি বলে হয়তো ওই রাজবাড়িতে আবার ফিরে গিয়েছি। ওরা আমাদের স্কুলের ম্যাডামদেরকে কিছু না বলে, ওই রাজবাড়িতে যাই। আর দেখে আমি সমস্ত গয়না গায়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছি।
সঙ্গে সঙ্গে ওরা আমার চোখে মুখে জল দেয়। আমার জ্ঞান ফিরে আসে। তখন আমাদের সবার হাত পা শুকিয়ে যাচ্ছিল। আমাদের মনে হচ্ছিল, ওখানে কিছু একটা ভূতুড়ে ব্যাপার আছে। তা না হলে আমি ওইরকম ডাক শুনে ঘোরের মধ্যে ওখানে গিয়ে কখন গয়না পড়েছি, কিচ্ছু আমার মনে ছিল না। তাড়াতাড়ি করে গায়ের গয়না গুলো খুলে ওই বাক্সের মধ্যে রেখে বাক্সটাকে যথাস্থানে রেখে দিয়ে আবার আমরা ফিরে আসি। তারপর বাড়ি ফিরে আসি।”
“আচ্ছা, তুমি আমাকে একটু মনে করে বলতে পারবে, তারপরে তোমার সঙ্গে কোনও অস্বাভাবিক কান্ড হয়েছে কিনা? তুমি হয়তো কাউকে কিছু বলোনি। কিন্তু আজকে যদি তুমি বলো, খুব ভালো হয়। তুমি বড় হয়েছ। কিন্তু তোমার বিয়ে হয়নি বলে, আমি তোমাকে পুরো ঘটনাটা খুলে বলতে পারছি না। তবে এইটুকু বলতে পারি, যদি তোমার সঙ্গে অস্বাভাবিক কোনও কিছু হয়ে থাকে, আমাদেরকে প্লিজ খুলে বলো। না বললে বিপদ বাড়বে বৈ কমবে না।”
“আমার সঙ্গে কিছু অস্বাভাবিক কান্ড হচ্ছে। যা আমি আগে কাউকে বলিনি। প্রতি অমাবস্যার রাতে আমার সঙ্গে কি হয়, আমি জানি না। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠলে প্রতিদিন আমার হাতে রক্ত লেগে থাকে। তুমি আজকে আমাকে বিপদের কোথা বললে বলে আমি তোমাকে বললাম। সকালবেলা উঠে হাতে ওই রক্ত দেখে, আমি সেটা বেসিনে গিয়ে ধুয়ে ফেলি। আমার মা-বাবা কেউ জানে না এই কথাটা।”
শেফালী উঠে এসে মিঠুকে একটা চড় লাগিয়ে দেয়। তারপর বলে— “এত বড় কান্ড হয়েছে আর তুই আমাকে বলিস নি। কতদিন ধরে হচ্ছে এইসব?”
“আমি ওই পিকনিক থেকে ফিরে আসার পর থেকেই হচ্ছে এইসব।”
এতক্ষণে ব্যাপারটা সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। বৈভবী এই সিংহরায় পরিবার থেকে কাউকে দিয়ে নিজের বাক্স খোলায়নি। সবাই যেহেতু এখানে অত্যন্ত সতর্কতার মধ্যে ছিল, তাই এখানে ও দুর্বল মনের কাউকে পায়নি। ও এই পরিবারের এই গোপন ব্যাপারটাকে কাজে লাগিয়েছে। কেউ জানত না যে, নীলাংশুর একটা কন্যা সন্তান রয়েছে। তাই ওকে পাহারা দেওয়ার কথা কারোর মাথায় আসেনি।
এইবারে ওর মেজো জা আর চুপ করে থাকল না। চিৎকার করে বলে উঠল— “মিষ্টি প্রথমে বিয়ে থেকে পালিয়ে গিয়ে সর্বনাশ ডেকে আনল। আর ওর বাবা তখন মেয়ের বিয়ে দেবো বিয়ে দেবো করে খুব লাফালেও নিজে যে এত বড় একটা কীর্তি করে আছে, সেই কথা একবারও আমাদেরকে বলল না। আমরা যখন প্রত্যেকে নিজে থেকে সাবধান থাকার চেষ্টা করছি, যাতে কোন বিপদ-আপদ কিছু না হয়। সেই সময়েও ও বেমালুম চেপে গেল যে, ওর আরও একটা মেয়ে আছে। ওর উচিত ছিল না, এই মেয়ের কথা আগেই বলে দেওয়া। তাহলে তাকেও আমরা পাহারা দেওয়ার চেষ্টা করতাম।”
এই কথা শুনে মিঠু চমকে ওঠে। বলে— “কি বললে...! আমার বাবা কে?”
মামদিদা শেফালীকে অনুরোধ করেন, মিঠুকে সমস্ত কিছু খুলে বলার জন্য। তার কারণ, এখন যে বিপদ আছে, সেই বিপদ থেকে কিন্তু মিঠুও সুরক্ষিত নয়। এইবার ওই পুরোহিত মশাইকে বলতে হবে যে, মিঠুকে দিয়ে ইতিমধ্যেই বৈভবী ওর ধ্বংসলীলা ওর সেই পুরনো খেলা আবার সেই শুরু করেছে কিনা।
শেফালী মিঠুকে সমস্ত কথা খুলে বলে। তারপর এই বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া অবধি মিঠুকে নিয়ে এই সিংহরায় পরিবারে থাকতে ও রাজি হয়ে যায়।
পুরোহিত মশাইকে খবর দেওয়া হয়। তিনি এসে যখন মিঠুকে ওই ওঁ লেখা তাবিজ পরাতে যান, তখন সে আর কিছুতেই সেটা পড়তে চায় না। চোখ দুটো বীভৎস রকম দেখতে হয়ে যায়। পুরো চোখটা কালো হয়ে যায়। মাথার চুল গুলো উপর দিকে উড়তে থাকে। একটা অদ্ভুত গলার স্বরে বলতে থাকে— “কি ভেবেছিস তোরা? এত সহজে সমস্ত কিছু করে ফেলবি? এই মেয়েটাকে আমি আমার কব্জায় রেখেছি। ও তোদেরকে সমস্ত কথা বলতে পেরেছে তার কারণ, আমি ওকে বলতে দিয়েছি। আমি চেয়েছি যে, তোরা জান কেমন করে আমি মুক্তি পেয়েছি। কি ভেবেছিস, তোদের পূর্বপুরুষ আমাকে বন্দী বানাতে পেরেছিল বলে তোরাও পারবি? অসম্ভব...... আমাকে কেউ বন্দী করতে পারবে না, কেউ না। বুঝেছিস? এখনও অমাবস্যার আসতে দেরি আছে। দেখ যদি কিছু করতে পারিস। আর হ্যাঁ, তোদের বাড়ির আর একটা মেয়ে, যে কিনা এই বন্ধন আলগা হতে সাহায্য করেছে, তাকেও বলিস যে, ত্রয়োদশী আসতে কিছুটা দেরি আছে। ও যেন তৈরি থাকে। আর তোদের পরিবারের আরও একজনের মৃত্যুর জন্যও তোরা তৈরি থাকিস।”
এই কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিঠুর মাটিতে নেতিয়ে পড়ে। মিঠুকে ওইভাবে পড়ে যেতে দেখে, পুরোহিত মশাই বললেন— “এই বাড়িতে মিঠুকে রাখলে বিপদ বাড়বে বৈ কমবে না। আপনারা এক কাজ করুন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে অন্য কোথাও নিয়ে যান।”
এই কোথা শুনে নীলাংশু শেফালীকে ইশারা করতে, শেফালী অজ্ঞান অবস্থায় মিঠুকে সঙ্গে নিয়ে নীলাংশুর সঙ্গে ওদের বাড়িতে ফিরে যায়। ওরা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যেতে, পুরোহিত মশাই বললেন— “বৌ-ঠাকুরাণী ব্যাপারটা এখন জলের মত পরিষ্কার। কিন্তু একটা নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেটা হল, গুরুদেব খবর পাঠিয়েছেন অমাবস্যায় ওনার একটা বিশেষ পূজা আছে। সেটা শেষ না করে উনি আসতে পারবেন না। ওই বিশেষ পূজা হলে, ওনার শক্তি বেশ অনেকটাই বেড়ে যাবে। তাই ওই পুজোটা শেষ করে উনি আসবেন। আর তাছাড়া সেই সঙ্গে তিনি আরও একটা কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, এই যে শক্তি তিনি লাভ করবেন, তার দ্বারা এত বছরের পুরনো এক তন্ত্র সাধিকার আত্মা মুক্তি দিতে তিনি বেশ অনেকটাই সক্ষম হবেন। বাকি পুরোপুরি যা কিছু তিনি এখানে এসে সমস্ত বিচার বিবেচনা করেই বলতে পারবেন।”
এই কথা শুনে বাড়ির সবার মুখ ছোট হয়ে গেল। অমাবস্যা পেরিয়ে গেলে তবে গুরুদেব আসবেন। তার মানে এই বাড়ির আরও এক সদস্যের মৃত্যু হতে চলেছে। কিন্তু সেটা যে কে, তা কেউ জানেনা। নীলাংশু, নীলাংশুর ছেলে, পরিণীতা, মিষ্টি... এদের চার জনকে বাদ দিয়ে, বাকি যে কেউ হতে পারে।
ওদের সবার মুখ দেখে পুরোহিত মশাই বললেন— “আমি একটা কোনও ব্যবস্থা করব, আপনাদের পরিবারকে রক্ষা করার জন্য। আমার উপর এইটুকু ভরসা রাখুন যে, ওই একটা রাত আমি আপনাদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে পারব। কিন্তু সত্যি বলতে, মিঠুর ভিতরে যেহেতু বৈভবীর আত্মা প্রবেশ করে গেছে, তাই মিঠুকে আটকানোর ক্ষমতা কিন্তু আমার নেই। আমি খুবই সাধারন একজন পুরোহিত। আমার বাবা এই তন্ত্রসাধনার সঙ্গে কিছুটা যুক্ত ছিলেন, তাই ওনার কাছ থেকে কিছু বিধি আমি শিখিয়েছিলাম। ব্যাস এইটুকুই... এবার আপনারা আদেশ করলে, আমি বাড়িতে গিয়ে আপনাদেরকে বাঁচানোর সমস্ত বিধি করতে পারি।”
পুরোহিত মশাই সেখান থেকে চলে গেলে, সবার মনে একটা কথাই ঘুরে ফিরে আসতে থাকে। তিনি তন্ত্রসাধনার কিছু জিনিস জানেন। কিন্তু তা দিয়ে কি বৈভবীর মত একজন ভয়ঙ্কর আত্মাকে আটকানো সম্ভব হবে?
আজকে ত্রয়োদশী। আর রাত্রি হলেই মিষ্টি স্বপ্ন দেখবে। সেই নির্দিষ্ট স্বপ্ন। আর তারপরের দিন ওর পরিবারের সদস্যের মৃত্যু হবে। তাই সেইদিন সকালবেলায় পুরোহিত মশাই সিংহরায় রাজবাড়িতে চলে আসেন। তারপর চারিদিকে বেলপাতা সঙ্গে গঙ্গা জল দিয়ে একটা ঘরের চারপাশ ঘিরে দেন। তারপর মাটির মধ্যে একটা গোল চক্র আঁকেন। তার ভিতরে কি সব নকশা করে নানারকম মন্ত্র উচ্চারণ করতে থাকেন। বাড়ির সবাই খাওয়া-দাওয়া সব ভুলে সেখানে ভয়ে তটস্থ হয়ে বসে থাকে। মিষ্টিকে তো কোথাও যাওয়ার অনুমতি কেউই দিচ্ছে না। এমনকি ওয়াসরুমে যেতে চাইলেও ওর সঙ্গে একজন থাকছে। এমনকি ওয়াশ রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করার অনুমতিও ওর নেই। এমন জীবন নিয়ে মিষ্টির বেঁচে থাকতে একদম ইচ্ছে করছে না। কিন্তু এই সমস্ত ও কিছু করছে শুধুমাত্র ওর পরিবারের জন্য। ওর মা এই সমস্ত কিছু বিশ্বাস করত না। ও-ও বিশ্বাস করতো না। কিন্তু যখন দেখল যে, ওর মা এই সমস্ত কিছু বিশ্বাস করছে, নিষ্ঠা মনে সমস্ত নিয়ম পালন করছে, তখন ও ঠিক করে যে, ওর মায়ের বিশ্বাসে আর আঘাত করবে না। এতগুলো মানুষ তো আর এক সঙ্গে মিথ্যে বলতে পারে না। তাছাড়া ওর স্বপ্ন দেখার কথা মনে না থাকলেও, পরপর তিন মাসে চতুর্দশীর দিন ওদের বাড়িতে যে একজন করে মারা যাচ্ছে, সেটা তো ঠিক। আর সেই মৃত্যু গুলো যে স্বাভাবিক নয়, সেটাও ঠিক। নিজের চোখে সমস্ত কিছু দেখেছে ও।
সারাদিন নানারকম কার্যকলাপ করার পরে সন্ধ্যাবেলা সূর্যাস্তের এক মিনিট আগে পুরোহিত মশাই বাড়ির সকল সদস্যদের ওই গোল চক্রের মধ্যে এসে নিজ নিজ অবস্থান গ্রহণ করতে বলেন। সবাই বসে পড়লে তিনি বললেন— “কাল সকালে সূর্যোদয়ের আগে এই চক্রের বাইরে কেউ বেরোবে না। বাইরে থেকে যাই ছলা-কলা হোক না কেন, যা কিছু হয়ে যাক না কেন, কেউ বেরোবে না। যদি কেউ এই চক্রের বাইরে বেরোয়, তাহলে মনে রাখবেন সে তার নিজের মৃত্যু নিজেই ডাকল। আর একটা কথা,মিষ্টিকে কিছুতেই ঘুমোতে দেওয়া চলবে না। ঘুমালে স্বপ্ন দেখবে। আর ও স্বপ্ন দেখা মানে,আপনাদের পরিবারের যেকোনো একজন সদস্যের মৃত্যু অনিবার্য। তাই আপনাদের সবাইকে চেষ্টা করতে হবে যাতে মিষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও দু'চোখের পাতা এক করতে না পারে। আরও একটা কথা, নিজের জায়গা থেকে কেউ একচুলও নড়বেন না। বউ-ঠাকুরানী আপনার অসুবিধা হতে পারে। তার কারণ, আপনার বয়স হয়েছে। কিন্তু একটা রাত কষ্ট করুন। দু’দিন পরে অমাবস্যা। তারপরেই আমার গুরুদেব চলে আসবেন। তখন আর কোনও সমস্যা হবে না। উনি সব সামলে নেবেন, এটাই আমার বিশ্বাস।”
আমার লেখা বইটি তোমরা পাবে আমাজন আর ফ্লিপকার্ট থেকে। এই গল্পেও রয়েছে তন্ত্র রয়েছে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া একটা নিষ্পাপ মেয়ের অতৃপ্ত আত্মা। তাকে আটকাতে গেলে দিতে হবে বলিদান। কারণ কখনও কখনও ভালো কিছু করতে গেলে তার দাম দিতে হয় অনেক। গল্পের প্রধান চরিত্র কি বলিদান দেবে বা কতটা ভয়ঙ্কর হবে ওদের জীবন? আছে শঙ্করনাথ তান্ত্রিক। যার সঙ্গে তোমাদের পরিচয় হয়েছে আমার লেখা আগের রহস্য গল্পে। সব মিলিয়ে রহস্য রোমাঞ্চে ভরা এই উপন্যাস "চাঁপাগড়ের অভিশপ্ত জমিদার বাড়ি...।
ওনার গলার স্বরের মধ্যে এমন একটা গাম্ভীর্য ছিল যে, কেউ ওনার কথা অমান্য করার সাহস দেখাল না। মিষ্টি জানে যে, ওর উপরে অনেক দায়িত্ব আছে। সবাই ওকে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করবে। সে ঠিক আছে। কিন্তু ও নিজেও নিজেকে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করবে। রাতের খাওয়ার জন্য আগে থেকেই ওই চক্রের ভিতরে কিছু খাবার এনে রাখা হয়েছিল। খুব সামান্য কিছু খাবার। তার কারণ, কেউ চায়নি যে পেট ভর্তি খাবার খেয়ে কেউ ঘুমিয়ে পড়ুক। রাত এগারোটা নাগাদ মিষ্টি অনুভব করতে পারে যে, ও কিছুতেই জেগে থাকতে পারছে না। অথচ অন্যান্য দিন ফোন দেখতে দেখতে সুন্দর রাত একটা দুটো বাজিয়ে দেয়। তার পরেও তো ঘুম আসে না। তবে ঘুমোতে হবে, তাই জোর করে চোখটা বন্ধ করে থাকে। আর আজকে এগারোটা বাজতে না বাজতেই ঘুম এসে গেল। দুপুর বেলাও ও টানা ঘুমিয়েছে। যাতে রাত্রেবেলা কিছুতেই ঘুম না আসে। অথচ এখন......... হঠাৎ ওর মনে হল, এটা মায়ার জাল নয়তো? সঙ্গে সঙ্গে ও বাড়ির সমস্ত সদস্যদের বলে— “আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। আমি কিছুতেই আমার চোখ খুলে রাখতে পারছি না। তোমরা কিছু করো। আমি তো মোবাইল দেখছিলাম। যাতে আমার ঘুম না আসে। কিন্তু কী অদ্ভুত, আমি কিছুতেই জেগে থাকতে পারছি না।”
এই কথা শুনে অন্য কেউ কিছু বলার আগেই পুরোহিত মশাই বললেন— “শয়তান তোমাকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছে। ও নিজের কার্যসিদ্ধি করতে চায়। ও যেহেতু নিজের বংশের রক্তের দ্বারা সবকিছু করতে চায়, তাই তোমাকে আর মিঠুকে নিজের কব্জায় করেছে। তোমাকে বেছে নিয়েছে এই বাড়ির সদস্যদেরকে মারার জন্য। আর মিঠুকে দিয়ে ও ওর অপূর্ণ কাজ পূর্ণ করতে চাইছে। আপনারা সবাই ঠিকই শুনেছেন। অপূর্ণ কাজ মানে যেই কাজ সম্পূর্ণ হতে দেননি তৎকালীন রানী আর রাজকুমারী। তিন মাস হলো ও মুক্তি পেয়েছে। বাকি আপনাদের বাড়ির কাহিনী আপনারাই ভালো জানেন। কিন্তু এখন এই মুহূর্তে কিছুতেই মিষ্টিকে ঘুমোতে দেওয়া চলবে না।”
সবাই নানা রকম চেষ্টা করতে থাকে যাতে মিষ্টি কিছুতেই দু'চোখের পাতা এক করতে না পারে। মিষ্টি নিজেও চেষ্টা করে যাচ্ছে। এইভাবে চেষ্টা করতে করতে রাত বারোটা পেরিয়ে যায়। মিষ্টি স্বপ্ন দেখে না। কারণ ওতো ঘুমোইনি। রাত বারোটা বেজে যাওয়ার পরেও যখন মিষ্টির ঘুমায় না, তখন বাড়িতে শুরু হয় এক অদ্ভুত কাণ্ড। সারা বাড়ির জিনিস উথাল-পাথাল হতে থাকে। দেয়ালে টাঙানো ফটোফ্রেম গুলো কেউ যেন আছাড় মেরে ভেঙ্গে ফেলে। রান্নাঘরের বাসনগুলো কেউ যেন ইচ্ছে করে ছুঁড়ে ওদের দিকে মারতে থাকে। ওরা চোখ বন্ধ করে ফেলে। কিন্তু খেয়াল করে সবকিছু ওদের দিকে তেড়ে আসছে ঠিকই কিন্তু সমস্ত কিছু ওই গোল চক্রের বাইরেই রয়ে যাচ্ছে। ওদের গায়ে এসে একটা জিনিস লাগছে না। চোখের সামনে নিজেদের বাড়ির এই ধ্বংসলীলা সবাই দেখতে থাকে। চেয়ার টেবিল সোফা এমনভাবে উল্টে পড়ছে যেন এইগুলো কোনও ভারী আসবাবপত্র নয়। এইগুলো ছোটখাটো কোন খেলনা। ঘন্টা তিনেক চলে এই তাণ্ডব। তারপর হঠাৎ করেই সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়।
পুরোহিত মশাই বললেন— “আপনারা কিন্তু কেউ ভাববেন না যে, সমস্ত কিছু থেমে গেছে মানে আপনারা এই গণ্ডির বাইরে বেরোতে পারবেন। মনে রাখবেন, আমি বলেছি সূর্যোদয়ের আগে এখান থেকে বেরোবেন না।”
সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। মিষ্টি খেয়াল করে সেই মুহূর্তে ওর যে এত ঘুম পাচ্ছিল, এখন তো আর ঘুম পাচ্ছে না। এখন দিব্যি ও মোবাইল দেখে সময় কাটিয়ে দিতে পারছে। তার মানে বৈভবীর তন্ত্রের জন্যই এত ঘুম পাচ্ছিল। বৈভবী চাইছিল মিষ্টি ঘুমোবে আর ও ওর স্বপ্নে আসবে। তারপর এই বাড়ির একজনের প্রাণ নেবে। কিন্তু সেই কাজে সফল হয়নি বলেই হয়তো এই তাণ্ডব চালালো। যাই হোক… সবাই যেন প্রাণ হাতে করে সেই রাতটা ওই চক্রের মধ্যে বসে কাটিয়ে দিল। ভোরবেলা সূর্যের আলো এসে ওদের গায়ে পড়তে সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।
পুরোহিত মশাই নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন— “এখন আপনারা নিজের নিজের কাজে যেতে পারেন। আপনাদের উপর থেকে এইবারের মত বিপদটা সরে গেল। অমাবস্যা পেরোলেই গুরুদেব আসবেন। তারপর তিনি যা করার করবেন। বউ ঠাকুরানী আপনার ফোন নাম্বার আমি আমার গুরুদেবকে দিয়ে দিয়েছি। তিনি আপনাকে ফোন করে নেবেন। চাইলে আপনিও করতে পারেন।”
মামদিদা বললেন— “আপনি কি এটা জানতে পারলেন যে, বৈভবী ওর সেই আগের মতো কম বয়সী মেয়েদের বলি দেওয়া শুরু করেছে কিনা?”
অদ্ভুতভাবে এই প্রশ্নের কোনও জবাব না দিয়েই পুরোহিত মশাই ওখান থেকে চলে যান। মামদিদা বুঝতে পারেন যে, এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয়ই ওনার কাছে নেই। সবাই যে যার কাজে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে। গোটা ঘর লন্ডভন্ড। সেটা গোছানোর চেষ্টা চলতে থাকে।
সকাল থেকে বেলা দশটা হয়ে যায়। তবুও ঘর সেই আগের অবস্থায় ফিরে যায় না। এতজন মিলে কাজ করছে। তবুও যেন কিছুতেই কিছু করা যাচ্ছে না। বেশিরভাগ জিনিসই ভেঙেচুরে নষ্ট হয়ে গেছে। যেটুকু যা আছে, সেই টুকুও করতে হচ্ছে অত্যন্ত সাবধানে। তার কারণ, এখানে বিভিন্ন জায়গায় কাঁচ ছড়িয়ে রয়েছে।
বেলা দশটার একটু পরে পুরোহিত মশাইয়ের ছেলে আর নাতি এসে উপস্থিত হয়। কোন কথা না বলে তারা দুজনেই সোজা চলে যায় মিষ্টির সামনে। তারপর পুরোহিত মশাইয়ের নাতি বলে— “মিষ্টি দিদি তাড়াতাড়ি চলো দাদু তোমাকে ডাকছে।”
এই কথাটা শুনে সবার মত মিষ্টিও অবাক হয়ে যায়। পুরোহিত মশাই এই তো সকাল বেলায় এখান থেকে গেলেন। তারপর যদি ওদের ডেকে পাঠান তাহলেও না হয় একটা কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ মিষ্টিকে কেন ডাকছেন?”
সঙ্গে সঙ্গে ওনার ছেলেও বলে উঠল— “হ্যাঁ হ্যাঁ বাবা তোমাকে ডেকেছে।”
এই কথা শোনার পরে পরিণীতা বলল— “বেশ আপনারা যান। আমি মিষ্টিকে নিয়ে পুরোহিত মশাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। উনি তো এখন মন্দিরে থাকবেন আশা করি।”
পরিণীতার এই কথার কোনও জবাব না দিয়ে ওনার নাতি সেই আগের মতোই বলল— “মিষ্টি দিদি আমার সঙ্গে চলো। দাদু তোমাকে ডেকেছে। আমি তোমাকে নিয়ে যাব।”
ওরা দুজনেই এমনভাবে কথা বলছিল যাতে, মামদিদার একটু সন্দেহ হয়। তিনি চোখের ইশারায় পরিণীতা আর ওর বড় জাকে বললেন, মিষ্টির সঙ্গে যেতে। ওদের সঙ্গে যেন আর কোনও তর্ক না করে। মামদিদার কথামতো ওরা দু’জনে মিলে মিষ্টিকে নিয়ে মন্দিরের কাছে যায়। কিন্তু মন্দিরে প্রবেশ করার আগেই দেখে, মন্দির চত্বরে বেশ অনেক ভিড়। কি হলো হঠাৎ। এইকথা ভেবে সেই ভিড় ঠেলে ওরা সামনের দিকে এগিয়ে যায়। সামনে গিয়ে দেখে, পুরোহিত মশাই নিজের হাত দিয়েই নিজের মাথাটাকে একদম পিছন দিকে ঘুরানোর চেষ্টা করছেন। অদ্ভুত ব্যাপার... কোনও মানুষ নিজের ঘাড় পিছনদিকে ঘোরাবে কিসের জন্য? দেখে মনে হচ্ছে ঘাড়টা এক্ষুনি ভেঙে যাবে। পরিণীতা চিৎকার করে উঠল— “এটা আপনি কি করছেন পুরোহিত মশাই? থামুন দয়া করে।”
কিন্তু ওদের কোনও কথার কোনও উত্তর পুরোহিত মশাইয়ের দিক থেকে আসে না। তিনি সেই একই রকম ভাবে নিজের মাথাটা পিছন দিকে ঘুরানোর চেষ্টা করতে থাকেন। এই দৃশ্য পরিণীতা ওরা কেউই সহ্য করতে পারে না। ওরা ছুটে যায় পুরোহিত মশাইকে থামানোর জন্য। কিন্তু এক অদ্ভুত শক্তি বলে ওরা যেন আর সামনের দিকে এগোতে পারে না। পাশের লোকগুলোকে পুরোহিত মশাইকে ধরার জন্য অনুরোধ করতে, তারা জানায় যে তারাও কেউ সামনের দিকে এগোতে পারছে না। প্রত্যেকেই যেন ওই একটা নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যে আটকা পড়ে গেছে। মিষ্টি ভালো করে লক্ষ্য করল, পুরোহিত মশাই কিন্তু মন্দিরের ভিতরে নেই। এমনকি ওনার শরীর মন্দির স্পর্শ পর্যন্ত করেনি। আরেকটু গেলেই উনি মন্দিরে ওঠার সিড়ি অব্দি পৌঁছে যাবেন। তাই মিষ্টি চিৎকার করে বলে উঠল— “পুরোহিত দাদু, আরেকটু চেষ্টা করো তুমি। আর একটুখানি এগিয়ে গেলেই মন্দিরের সিঁড়ি ছুঁতে পারবে। একটু চেষ্টা করো।”
মিষ্টির কথাটা শেষ হতে পারেনি, তার আগেই পুরোহিত মশাই ওনার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিজের চোখকেই মিষ্টি বিশ্বাস করতে পারছে না। ওর মা এই সমস্ত কিছু মেনে নিলেও, ওর মনে কোথাও একটা সন্দেহ ছিল। কিন্তু আজকের এই দৃশ্য আর গতকাল রাতের ওই রকম তাণ্ডব, সব কিছু দেখার পরে ও বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়। কিন্তু ও পুরো ঘটনাটা জানতো না। তাই কে বৈভবী আর তার আত্মা কেমন করে এলো, কিচ্ছু না জেনেই ভয়ে কুঁকড়ে যায় ও।
মুহুর্তের মধ্যে ওখানে পুলিশ চলে আসে। পরিণীতা মিষ্টি সবাই পুলিশের কাছে পুরোহিত মশাইয়ের কেমন করে মৃত্যু হয়েছে তা বলতে থাকে। সব কিছু শোনার পরে পুলিশের বড় কর্তা বললেন— “আপনারা ঠিক বলছেন। সত্যিই পুরোহিত মশাইও একইরকম ভাবে মারা গেছেন?”
“একই রকম......! মানে?”
“হ্যাঁ ওনার পরিবারের লোকেরাও এরকমভাবে মারা গেছেন। আর সারারাত উনি কোন একটা দরকারে বাইরে ছিলেন। সকালবেলায় ফিরে আসেন। তার পরে স্নান করে মন্দিরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যান। বাড়িতে ওনার স্ত্রী ছেলে ছেলের বউ আর নাকি ছিল। বেশ কিছুক্ষণ পরে পাশের বাড়ির একজন ওনাদের বাড়িতে গেলে, তিনি দেখেন যে,প্রত্যেকে মৃত। আর তাদের মৃত্যু হয়েছে একইরকমভাবে। বডি সামনে দিকে কিন্তু মাথাটা পিছন দিকে ঘোরানো। তারমানে এই খুনগুলো একইরকম ভাবে করা হয়েছে। কিন্তু কি করে একটা পরিবারের সবাই এমন ভাবে মারা যেতে পারে?”
পরিণীতা বলে— “কিন্তু স্যার, আমরা প্রত্যেকে এখানে যারা উপস্থিত রয়েছি, সবাই দেখেছি যে পুরোহিত মশাই নিজেই নিজের মাথাটাকে পিছন দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন। আর এটা একটা ভৌতিক কান্ড ছাড়া আর কিছু নয়। গতকাল রাত্রে উনি আমাদের বাড়িতেই ছিলেন। আমাদেরকে ওই তন্ত্র সাধিকার আত্মার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। কিন্তু আমাদেরকে রক্ষা করতে গিয়ে উনি নিজের নিজের আর নিজের পরিবারেরই এইরকম বিপদ ডেকে আনবেন, তা হয়তো তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি। কিন্তু ওনার বুঝা উচিত ছিল। তিনি সেই মন্ত্র সাধিকার আত্মাকে রাগিয়ে দিয়েছিলেন......”
কিন্তু পুলিশের বড় কর্তা পরিণীতাকে আর কোন কথা বলতে দেন না। ওখানেই চুপ করিয়ে দেন। বলেন— “এই সময়ে এই যুগে এই সমস্ত কথাতে কেউ বিশ্বাস করে না। আমিও করি না। আপনাকে দেখে তো বেশ শিক্ষিত মনে হচ্ছে। তার পরেও আপনার ধ্যান-ধারণা কয়েক’শো বছর আগেকার মত কেন?”
রাগে পরিণীতা আর কোন কথা বলে না। তার কারণ, ও ভালো মতই জানে, এ এমন এক ঘটনা, যা বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। হয়তো দেখলে বিশ্বাস করবে। পুলিশের কাছে নিজেদের বয়ান দিয়ে ওরা তিনজনে বাড়িতে ফিরে আসে। তারপর বাড়ির প্রত্যেকটা সদস্যকে পুরোহিত মশাইয়ের আর সেই সঙ্গে তাঁর পরিবারের এমন আকস্মিক মৃত্যুর কথা জানায়।
মামদিদা উপরের দিকে হাত তুলে ঠাকুরের উদ্দেশ্যে প্রণাম করে বলেন— “তোমার একি খেলা ভগবান। ঐরকম একটা ভালো মানুষকে তুমি রক্ষা করতে পারলে না? যে মানুষটা আমাদের ভালো করতে এসেছিল, এই সংসারে ভালো করতে এসেছিল, সেই মানুষটাকে তুমি এমন ভাবে শেষ করে দিলে? চলে যেতে দিলে তাকে?”
মনে মনে কি একটা কথা ভেবে নিয়ে মামদিদা সোজা চলে যান নিজের ঘরে।
সারাদিন নানারকম কার্যকলাপ করার পরে সন্ধ্যাবেলা সূর্যাস্তের এক মিনিট আগে পুরোহিত মশাই বাড়ির সকল সদস্যদের ওই গোল চক্রের মধ্যে এসে নিজ নিজ অবস্থান গ্রহণ করতে বলেন। সবাই বসে পড়লে তিনি বললেন— “কাল সকালে সূর্যোদয়ের আগে এই চক্রের বাইরে কেউ বেরোবে না। বাইরে থেকে যাই ছলা-কলা হোক না কেন, যা কিছু হয়ে যাক না কেন, কেউ বেরোবে না। যদি কেউ এই চক্রের বাইরে বেরোয়, তাহলে মনে রাখবেন সে তার নিজের মৃত্যু নিজেই ডাকল। আর একটা কথা,মিষ্টিকে কিছুতেই ঘুমোতে দেওয়া চলবে না। ঘুমালে স্বপ্ন দেখবে। আর ও স্বপ্ন দেখা মানে,আপনাদের পরিবারের যেকোনো একজন সদস্যের মৃত্যু অনিবার্য। তাই আপনাদের সবাইকে চেষ্টা করতে হবে যাতে মিষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও দু'চোখের পাতা এক করতে না পারে। আরও একটা কথা, নিজের জায়গা থেকে কেউ একচুলও নড়বেন না। বউ-ঠাকুরানী আপনার অসুবিধা হতে পারে। তার কারণ, আপনার বয়স হয়েছে। কিন্তু একটা রাত কষ্ট করুন। দু’দিন পরে অমাবস্যা। তারপরেই আমার গুরুদেব চলে আসবেন। তখন আর কোনও সমস্যা হবে না। উনি সব সামলে নেবেন, এটাই আমার বিশ্বাস।”
আমার লেখা বইটি তোমরা পাবে আমাজন আর ফ্লিপকার্ট থেকে। এই গল্পেও রয়েছে তন্ত্র রয়েছে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া একটা নিষ্পাপ মেয়ের অতৃপ্ত আত্মা। তাকে আটকাতে গেলে দিতে হবে বলিদান। কারণ কখনও কখনও ভালো কিছু করতে গেলে তার দাম দিতে হয় অনেক। গল্পের প্রধান চরিত্র কি বলিদান দেবে বা কতটা ভয়ঙ্কর হবে ওদের জীবন? আছে শঙ্করনাথ তান্ত্রিক। যার সঙ্গে তোমাদের পরিচয় হয়েছে আমার লেখা আগের রহস্য গল্পে। সব মিলিয়ে রহস্য রোমাঞ্চে ভরা এই উপন্যাস "চাঁপাগড়ের অভিশপ্ত জমিদার বাড়ি...।
ওনার গলার স্বরের মধ্যে এমন একটা গাম্ভীর্য ছিল যে, কেউ ওনার কথা অমান্য করার সাহস দেখাল না। মিষ্টি জানে যে, ওর উপরে অনেক দায়িত্ব আছে। সবাই ওকে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করবে। সে ঠিক আছে। কিন্তু ও নিজেও নিজেকে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করবে। রাতের খাওয়ার জন্য আগে থেকেই ওই চক্রের ভিতরে কিছু খাবার এনে রাখা হয়েছিল। খুব সামান্য কিছু খাবার। তার কারণ, কেউ চায়নি যে পেট ভর্তি খাবার খেয়ে কেউ ঘুমিয়ে পড়ুক। রাত এগারোটা নাগাদ মিষ্টি অনুভব করতে পারে যে, ও কিছুতেই জেগে থাকতে পারছে না। অথচ অন্যান্য দিন ফোন দেখতে দেখতে সুন্দর রাত একটা দুটো বাজিয়ে দেয়। তার পরেও তো ঘুম আসে না। তবে ঘুমোতে হবে, তাই জোর করে চোখটা বন্ধ করে থাকে। আর আজকে এগারোটা বাজতে না বাজতেই ঘুম এসে গেল। দুপুর বেলাও ও টানা ঘুমিয়েছে। যাতে রাত্রেবেলা কিছুতেই ঘুম না আসে। অথচ এখন......... হঠাৎ ওর মনে হল, এটা মায়ার জাল নয়তো? সঙ্গে সঙ্গে ও বাড়ির সমস্ত সদস্যদের বলে— “আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। আমি কিছুতেই আমার চোখ খুলে রাখতে পারছি না। তোমরা কিছু করো। আমি তো মোবাইল দেখছিলাম। যাতে আমার ঘুম না আসে। কিন্তু কী অদ্ভুত, আমি কিছুতেই জেগে থাকতে পারছি না।”
এই কথা শুনে অন্য কেউ কিছু বলার আগেই পুরোহিত মশাই বললেন— “শয়তান তোমাকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছে। ও নিজের কার্যসিদ্ধি করতে চায়। ও যেহেতু নিজের বংশের রক্তের দ্বারা সবকিছু করতে চায়, তাই তোমাকে আর মিঠুকে নিজের কব্জায় করেছে। তোমাকে বেছে নিয়েছে এই বাড়ির সদস্যদেরকে মারার জন্য। আর মিঠুকে দিয়ে ও ওর অপূর্ণ কাজ পূর্ণ করতে চাইছে। আপনারা সবাই ঠিকই শুনেছেন। অপূর্ণ কাজ মানে যেই কাজ সম্পূর্ণ হতে দেননি তৎকালীন রানী আর রাজকুমারী। তিন মাস হলো ও মুক্তি পেয়েছে। বাকি আপনাদের বাড়ির কাহিনী আপনারাই ভালো জানেন। কিন্তু এখন এই মুহূর্তে কিছুতেই মিষ্টিকে ঘুমোতে দেওয়া চলবে না।”
সবাই নানা রকম চেষ্টা করতে থাকে যাতে মিষ্টি কিছুতেই দু'চোখের পাতা এক করতে না পারে। মিষ্টি নিজেও চেষ্টা করে যাচ্ছে। এইভাবে চেষ্টা করতে করতে রাত বারোটা পেরিয়ে যায়। মিষ্টি স্বপ্ন দেখে না। কারণ ওতো ঘুমোইনি। রাত বারোটা বেজে যাওয়ার পরেও যখন মিষ্টির ঘুমায় না, তখন বাড়িতে শুরু হয় এক অদ্ভুত কাণ্ড। সারা বাড়ির জিনিস উথাল-পাথাল হতে থাকে। দেয়ালে টাঙানো ফটোফ্রেম গুলো কেউ যেন আছাড় মেরে ভেঙ্গে ফেলে। রান্নাঘরের বাসনগুলো কেউ যেন ইচ্ছে করে ছুঁড়ে ওদের দিকে মারতে থাকে। ওরা চোখ বন্ধ করে ফেলে। কিন্তু খেয়াল করে সবকিছু ওদের দিকে তেড়ে আসছে ঠিকই কিন্তু সমস্ত কিছু ওই গোল চক্রের বাইরেই রয়ে যাচ্ছে। ওদের গায়ে এসে একটা জিনিস লাগছে না। চোখের সামনে নিজেদের বাড়ির এই ধ্বংসলীলা সবাই দেখতে থাকে। চেয়ার টেবিল সোফা এমনভাবে উল্টে পড়ছে যেন এইগুলো কোনও ভারী আসবাবপত্র নয়। এইগুলো ছোটখাটো কোন খেলনা। ঘন্টা তিনেক চলে এই তাণ্ডব। তারপর হঠাৎ করেই সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়।
পুরোহিত মশাই বললেন— “আপনারা কিন্তু কেউ ভাববেন না যে, সমস্ত কিছু থেমে গেছে মানে আপনারা এই গণ্ডির বাইরে বেরোতে পারবেন। মনে রাখবেন, আমি বলেছি সূর্যোদয়ের আগে এখান থেকে বেরোবেন না।”
সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। মিষ্টি খেয়াল করে সেই মুহূর্তে ওর যে এত ঘুম পাচ্ছিল, এখন তো আর ঘুম পাচ্ছে না। এখন দিব্যি ও মোবাইল দেখে সময় কাটিয়ে দিতে পারছে। তার মানে বৈভবীর তন্ত্রের জন্যই এত ঘুম পাচ্ছিল। বৈভবী চাইছিল মিষ্টি ঘুমোবে আর ও ওর স্বপ্নে আসবে। তারপর এই বাড়ির একজনের প্রাণ নেবে। কিন্তু সেই কাজে সফল হয়নি বলেই হয়তো এই তাণ্ডব চালালো। যাই হোক… সবাই যেন প্রাণ হাতে করে সেই রাতটা ওই চক্রের মধ্যে বসে কাটিয়ে দিল। ভোরবেলা সূর্যের আলো এসে ওদের গায়ে পড়তে সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।
পুরোহিত মশাই নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন— “এখন আপনারা নিজের নিজের কাজে যেতে পারেন। আপনাদের উপর থেকে এইবারের মত বিপদটা সরে গেল। অমাবস্যা পেরোলেই গুরুদেব আসবেন। তারপর তিনি যা করার করবেন। বউ ঠাকুরানী আপনার ফোন নাম্বার আমি আমার গুরুদেবকে দিয়ে দিয়েছি। তিনি আপনাকে ফোন করে নেবেন। চাইলে আপনিও করতে পারেন।”
মামদিদা বললেন— “আপনি কি এটা জানতে পারলেন যে, বৈভবী ওর সেই আগের মতো কম বয়সী মেয়েদের বলি দেওয়া শুরু করেছে কিনা?”
অদ্ভুতভাবে এই প্রশ্নের কোনও জবাব না দিয়েই পুরোহিত মশাই ওখান থেকে চলে যান। মামদিদা বুঝতে পারেন যে, এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয়ই ওনার কাছে নেই। সবাই যে যার কাজে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে। গোটা ঘর লন্ডভন্ড। সেটা গোছানোর চেষ্টা চলতে থাকে।
সকাল থেকে বেলা দশটা হয়ে যায়। তবুও ঘর সেই আগের অবস্থায় ফিরে যায় না। এতজন মিলে কাজ করছে। তবুও যেন কিছুতেই কিছু করা যাচ্ছে না। বেশিরভাগ জিনিসই ভেঙেচুরে নষ্ট হয়ে গেছে। যেটুকু যা আছে, সেই টুকুও করতে হচ্ছে অত্যন্ত সাবধানে। তার কারণ, এখানে বিভিন্ন জায়গায় কাঁচ ছড়িয়ে রয়েছে।
বেলা দশটার একটু পরে পুরোহিত মশাইয়ের ছেলে আর নাতি এসে উপস্থিত হয়। কোন কথা না বলে তারা দুজনেই সোজা চলে যায় মিষ্টির সামনে। তারপর পুরোহিত মশাইয়ের নাতি বলে— “মিষ্টি দিদি তাড়াতাড়ি চলো দাদু তোমাকে ডাকছে।”
এই কথাটা শুনে সবার মত মিষ্টিও অবাক হয়ে যায়। পুরোহিত মশাই এই তো সকাল বেলায় এখান থেকে গেলেন। তারপর যদি ওদের ডেকে পাঠান তাহলেও না হয় একটা কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ মিষ্টিকে কেন ডাকছেন?”
সঙ্গে সঙ্গে ওনার ছেলেও বলে উঠল— “হ্যাঁ হ্যাঁ বাবা তোমাকে ডেকেছে।”
এই কথা শোনার পরে পরিণীতা বলল— “বেশ আপনারা যান। আমি মিষ্টিকে নিয়ে পুরোহিত মশাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। উনি তো এখন মন্দিরে থাকবেন আশা করি।”
পরিণীতার এই কথার কোনও জবাব না দিয়ে ওনার নাতি সেই আগের মতোই বলল— “মিষ্টি দিদি আমার সঙ্গে চলো। দাদু তোমাকে ডেকেছে। আমি তোমাকে নিয়ে যাব।”
ওরা দুজনেই এমনভাবে কথা বলছিল যাতে, মামদিদার একটু সন্দেহ হয়। তিনি চোখের ইশারায় পরিণীতা আর ওর বড় জাকে বললেন, মিষ্টির সঙ্গে যেতে। ওদের সঙ্গে যেন আর কোনও তর্ক না করে। মামদিদার কথামতো ওরা দু’জনে মিলে মিষ্টিকে নিয়ে মন্দিরের কাছে যায়। কিন্তু মন্দিরে প্রবেশ করার আগেই দেখে, মন্দির চত্বরে বেশ অনেক ভিড়। কি হলো হঠাৎ। এইকথা ভেবে সেই ভিড় ঠেলে ওরা সামনের দিকে এগিয়ে যায়। সামনে গিয়ে দেখে, পুরোহিত মশাই নিজের হাত দিয়েই নিজের মাথাটাকে একদম পিছন দিকে ঘুরানোর চেষ্টা করছেন। অদ্ভুত ব্যাপার... কোনও মানুষ নিজের ঘাড় পিছনদিকে ঘোরাবে কিসের জন্য? দেখে মনে হচ্ছে ঘাড়টা এক্ষুনি ভেঙে যাবে। পরিণীতা চিৎকার করে উঠল— “এটা আপনি কি করছেন পুরোহিত মশাই? থামুন দয়া করে।”
কিন্তু ওদের কোনও কথার কোনও উত্তর পুরোহিত মশাইয়ের দিক থেকে আসে না। তিনি সেই একই রকম ভাবে নিজের মাথাটা পিছন দিকে ঘুরানোর চেষ্টা করতে থাকেন। এই দৃশ্য পরিণীতা ওরা কেউই সহ্য করতে পারে না। ওরা ছুটে যায় পুরোহিত মশাইকে থামানোর জন্য। কিন্তু এক অদ্ভুত শক্তি বলে ওরা যেন আর সামনের দিকে এগোতে পারে না। পাশের লোকগুলোকে পুরোহিত মশাইকে ধরার জন্য অনুরোধ করতে, তারা জানায় যে তারাও কেউ সামনের দিকে এগোতে পারছে না। প্রত্যেকেই যেন ওই একটা নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যে আটকা পড়ে গেছে। মিষ্টি ভালো করে লক্ষ্য করল, পুরোহিত মশাই কিন্তু মন্দিরের ভিতরে নেই। এমনকি ওনার শরীর মন্দির স্পর্শ পর্যন্ত করেনি। আরেকটু গেলেই উনি মন্দিরে ওঠার সিড়ি অব্দি পৌঁছে যাবেন। তাই মিষ্টি চিৎকার করে বলে উঠল— “পুরোহিত দাদু, আরেকটু চেষ্টা করো তুমি। আর একটুখানি এগিয়ে গেলেই মন্দিরের সিঁড়ি ছুঁতে পারবে। একটু চেষ্টা করো।”
মিষ্টির কথাটা শেষ হতে পারেনি, তার আগেই পুরোহিত মশাই ওনার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিজের চোখকেই মিষ্টি বিশ্বাস করতে পারছে না। ওর মা এই সমস্ত কিছু মেনে নিলেও, ওর মনে কোথাও একটা সন্দেহ ছিল। কিন্তু আজকের এই দৃশ্য আর গতকাল রাতের ওই রকম তাণ্ডব, সব কিছু দেখার পরে ও বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়। কিন্তু ও পুরো ঘটনাটা জানতো না। তাই কে বৈভবী আর তার আত্মা কেমন করে এলো, কিচ্ছু না জেনেই ভয়ে কুঁকড়ে যায় ও।
মুহুর্তের মধ্যে ওখানে পুলিশ চলে আসে। পরিণীতা মিষ্টি সবাই পুলিশের কাছে পুরোহিত মশাইয়ের কেমন করে মৃত্যু হয়েছে তা বলতে থাকে। সব কিছু শোনার পরে পুলিশের বড় কর্তা বললেন— “আপনারা ঠিক বলছেন। সত্যিই পুরোহিত মশাইও একইরকম ভাবে মারা গেছেন?”
“একই রকম......! মানে?”
“হ্যাঁ ওনার পরিবারের লোকেরাও এরকমভাবে মারা গেছেন। আর সারারাত উনি কোন একটা দরকারে বাইরে ছিলেন। সকালবেলায় ফিরে আসেন। তার পরে স্নান করে মন্দিরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যান। বাড়িতে ওনার স্ত্রী ছেলে ছেলের বউ আর নাকি ছিল। বেশ কিছুক্ষণ পরে পাশের বাড়ির একজন ওনাদের বাড়িতে গেলে, তিনি দেখেন যে,প্রত্যেকে মৃত। আর তাদের মৃত্যু হয়েছে একইরকমভাবে। বডি সামনে দিকে কিন্তু মাথাটা পিছন দিকে ঘোরানো। তারমানে এই খুনগুলো একইরকম ভাবে করা হয়েছে। কিন্তু কি করে একটা পরিবারের সবাই এমন ভাবে মারা যেতে পারে?”
পরিণীতা বলে— “কিন্তু স্যার, আমরা প্রত্যেকে এখানে যারা উপস্থিত রয়েছি, সবাই দেখেছি যে পুরোহিত মশাই নিজেই নিজের মাথাটাকে পিছন দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন। আর এটা একটা ভৌতিক কান্ড ছাড়া আর কিছু নয়। গতকাল রাত্রে উনি আমাদের বাড়িতেই ছিলেন। আমাদেরকে ওই তন্ত্র সাধিকার আত্মার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। কিন্তু আমাদেরকে রক্ষা করতে গিয়ে উনি নিজের নিজের আর নিজের পরিবারেরই এইরকম বিপদ ডেকে আনবেন, তা হয়তো তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি। কিন্তু ওনার বুঝা উচিত ছিল। তিনি সেই মন্ত্র সাধিকার আত্মাকে রাগিয়ে দিয়েছিলেন......”
কিন্তু পুলিশের বড় কর্তা পরিণীতাকে আর কোন কথা বলতে দেন না। ওখানেই চুপ করিয়ে দেন। বলেন— “এই সময়ে এই যুগে এই সমস্ত কথাতে কেউ বিশ্বাস করে না। আমিও করি না। আপনাকে দেখে তো বেশ শিক্ষিত মনে হচ্ছে। তার পরেও আপনার ধ্যান-ধারণা কয়েক’শো বছর আগেকার মত কেন?”
রাগে পরিণীতা আর কোন কথা বলে না। তার কারণ, ও ভালো মতই জানে, এ এমন এক ঘটনা, যা বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। হয়তো দেখলে বিশ্বাস করবে। পুলিশের কাছে নিজেদের বয়ান দিয়ে ওরা তিনজনে বাড়িতে ফিরে আসে। তারপর বাড়ির প্রত্যেকটা সদস্যকে পুরোহিত মশাইয়ের আর সেই সঙ্গে তাঁর পরিবারের এমন আকস্মিক মৃত্যুর কথা জানায়।
মামদিদা উপরের দিকে হাত তুলে ঠাকুরের উদ্দেশ্যে প্রণাম করে বলেন— “তোমার একি খেলা ভগবান। ঐরকম একটা ভালো মানুষকে তুমি রক্ষা করতে পারলে না? যে মানুষটা আমাদের ভালো করতে এসেছিল, এই সংসারে ভালো করতে এসেছিল, সেই মানুষটাকে তুমি এমন ভাবে শেষ করে দিলে? চলে যেতে দিলে তাকে?”
মনে মনে কি একটা কথা ভেবে নিয়ে মামদিদা সোজা চলে যান নিজের ঘরে।
৮
পরের দিন সকাল আটটা নাগাদ মামদিদা ওনার বড় নাতিকে পাঠান গুরুদেবকে বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য। গুরুদেব প্রায় চার কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেখান থেকে তিনি বুঝতে পারছিলেন না যে, কোন দিকে যাবেন। তিনি নিজের গাড়িতে করেই এসেছিলেন। সিংহরায় রাজবাড়ির সামনে গাড়িটা এসে থামলে গুরুদেব গাড়ি থেকে নামেন।
কিন্তু গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে তিনি অনুভব করতে পারেন যে, ওনার সর্বাঙ্গ যেন জ্বলে যাচ্ছে। এটা তখনই হয়, যখন কোনও অশুভ ছায়া আসে-পাশে থাকে। কোনও অশুভ শক্তির সংস্পর্শে এলেই ওনার সঙ্গে এই ব্যাপারটা ঘটে। তিনি আরও দেখেছেন, যেই যেই জায়গায় তিনি এসব অশুভ শক্তিকে বিদায় জানানোর জন্য গিয়েছিলেন, সেই সেই জায়গায় যাওয়ার পরে প্রথমবার ওনার গা এই রকম ভাবেই জ্বলতে থাকে। তিনি মনে মনে ভাবলেন যে, পুরোহিত মশাই যে ওনাকে জানিয়েছিলেন ওইখানে কোনও অশুভ শক্তি রয়েছে, তা সত্যি। কিন্তু এই গায়ের জ্বালা এত পরিমাণে বেশি হচ্ছে যে, এটা থেকেই তিনি বুঝে জান, এই অশুভ শক্তি যে কোনও সাধারণ অশুভ শক্তি নয়, অত্যন্ত শক্তিশালী এক অশুভ শক্তি। নিজের গায়ের ওই জ্বলন নিবারন করার জন্য তিনি ওনার ব্যাগ থেকে গঙ্গা জলের বোতলটা বের করে নিজের গায়ে খানিকটা ছিটিয়ে নেন। তার পরেই দ্রুত পদক্ষেপে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করে যান। বাড়ির ভিতর প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিড়বিড় করে আরও কিছু মন্ত্র উচ্চারণ করেন। যা সবাই দেখতে পায়, কিন্তু শুনতে পায় না।
মামদিদার কথা মতোই ওনাকে বসার ঘরে সোফায় বসতে দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি সেখানে না বসে নিজের সঙ্গে করে আনা কম্বলের আসন পেতে নিচে বসেন। তারপরে বললেন— “এই আধ্যাত্বিক ব্যাপারে নিজের মনোনিবেশ করার পরে থেকে সমস্ত রকম আরাম বিলাস থেকে নিজেকে দূরে রেখেছি। এখন যদি আপনারা বলেন যে, আমি গাড়িতে করে কেন এসেছি। তার উত্তর একটাই... দ্রুত পৌঁছানোর জন্য। আমি যদি আপনাদের এখানে দেরি করে আসতাম, তাহলে আপনাদের জন্য তা বড়োই বিপদজনক হতো। ভয়ানক হতো। আমি আপনাদেরকে ভয় দেখানোর জন্য কিছু বলছি না। শুধু এইটুকুই বলে রাখছি যে, এখানে যে অশুভ শক্তি রয়েছে, সে কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী। আমি পুরো ঘটনাটা মোটামুটি ভাবে শুনেছি। কিন্তু সেই শোনা দিয়ে নয়, আমি আপনাদের কাছে জানতে চাই আসল ঘটনাটা। অবশ্যই আমার বিস্তারিত ভাবে সবকিছু জানার দরকার নেই। আমি শুধু জানতে চাই যে, আপনাদের পরিবারের কেমন করে প্রবেশ করল বৈভবী নামের এক তন্ত্র সাধিকার অশুভ আত্মা। সেই বৈভবী অতীতে ঠিক কি করেছিল। আর আপনাদের পরিবার তাকে কেমন ভাবে আটকে রেখেছিল। কোথায় তাকে এতদিন বন্দি বানিয়ে রাখা হয়েছিল। সে মুক্তি পেল কেমন করে। এই বিষয়গুলো জানলেই আমি আমার পরবর্তী পদক্ষেপ শুরু করতে পারি।”
এই কথার মাঝখানেই ওনাদের জন্য কিছু ফল মিষ্টি আর শরবত নিয়ে আসে পরিণীতা। তারপর বলে— “আপনারা সামান্য খাবারটুকু গ্রহণ করুন। আমি আপনাদেরকে বলছি। আমি তো দায়ী এই সমস্ত কিছু করার জন্য।”
স্বাভাবিকভাবেই গুরুদেব কিছু বুঝতে পারেন না। তিনি অবাক দৃষ্টিতে পরিণীতার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
পরিণীতা নিজের কথা শুরু করতে যাবে, সেইসময় অদ্ভুত রকম ভাবে পুরো রাজবাড়িটা থর্ থর্ করে কাঁপতে থাকে। মনে হতে থাকে যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। সবাই চমকে ওঠে। সেই সময়ে গুরুদেব বললেন— “আপনারা ভয় পাবেন না। আসলে আমি এখানে এসেছি এটা সেই আত্মা জানতে পেরে গেছে। এই বাড়ীতে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে, যাতে আমাকে এখান থেকে তাড়াতে পারে। আর আপনারা সেই কাহিনী যাতে আমাকে বলতে না পারেন। ভয় পাচ্ছে যদি তাকে আমি সমূলে উৎখাত করে দিই, তাই... কিন্তু নিশ্চিন্ত থাকুন, এখানে সে ঢুকতে পারবে না।”
এইবার মামদিদা প্রশ্ন করেন যে, কেন ওই আত্মা প্রবেশ করতে পারবে না। তার উত্তরে গুরুদেব বললেন— “আমি আর আমার এই শিষ্য, যেখানেই যাই না কেন, আমরা আমাদের চারপাশে একটা সুরক্ষা বলয় তৈরি করে যাই। আমরা তো আগে থেকে বুঝতে পারি না যে, কোন অশুভ শক্তি ঠিক কতটা ভয়ঙ্কর। এইখানে এসে যখন আপনাদের বাড়ির সামনে আমি গাড়ি থেকে নামি, তখন আমার সর্বাঙ্গ জ্বলে যেতে থাকে। আর সেই জ্বালা এতটা তীব্র ছিল যে, আমি খুব ভালোমতো বুঝতে পেরে যাই এই অশুভ শক্তি ঠিক কতটা শক্তিশালী। আমাদের চারপাশের সুরক্ষা বলয় থাকার জন্য সে বুঝতে পারেনি যে, আমরা এখানে এসে উপস্থিত হয়েছি। কিন্তু ওই জ্বালা নিবারণ করার জন্য আমি যেই আমার উপরে গঙ্গাজলের ছিটা নিয়েনি, তখন আমার সেই সুরক্ষা বলয় নষ্ট হয়ে যায়। যার দরুন সে বুঝতে পারে যে, আমি এই বাড়িতে এসেছি। কিন্তু সে তখন এই বাড়ির বাইরে নিশ্চয়ই নিজের কোনও অপূর্ণ ইচ্ছে পূরণ করায় ব্যস্ত ছিল। আমার আগমনের আন্দাজ করতে পেরে সে ছুটে আসে। কিন্তু আমি নিজের সুরক্ষা বলয় নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য সঙ্গে সঙ্গে এই রাজবাড়িটাকে একটা সুরক্ষা বলয়ে বন্দি করে দিই।
আপনারা সবাই দেখে থাকবেন যে, এই বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে একটা মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলাম। সেটা আসলে এই বাড়িটা সুরক্ষিত করার জন্যই করেছিলাম। সেই অশুভ শক্তি এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু ভিতরে প্রবেশ করতে পারছে না। সে সেই সুরক্ষা বলয়টাকে নষ্ট করার বারবার চেষ্টা করছে। কিন্তু সফল হচ্ছে না। তার সেই চেষ্টা করার জন্যই বাড়িটা কেঁপে কেঁপে উঠছে।
তবে আপনারা সবাই আমার একটা কথা মন দিয়ে শুনুন। এই বাড়ির বাইরে আমার অনুমতি ছাড়া আপনারা কেউ বেরোবেন না। যদি বেরোতে হয়, তাহলে আমাকে বলবেন। আমি আপনাদের এই বাড়ির বাইরে যাওয়ার ব্যবস্থা করব। তবে আমার মতে, এই বাড়ির বাইরে প্রয়োজন না হলে না বেরোনোই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এই যে আমি সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছি, সেটা পাঁচ দিন পরে নষ্ট হয়ে যাবে। আমাদের যা করার এই পাঁচ দিনের মধ্যে করতে হবে। তাই আপনাদের কাছে অনুরোধ, যদি পাঁচটা দিন ঘরের ভিতরে থাকতে পারেন তাহলে খুব ভালো হয়। আমার কাজের সুবিধা হয়।”
সবাই সম্মতি জানাল।
পরিণীতা সমস্ত কথা গুরুদেবকে খুলে বলে। সবকিছু শোনার পরে গুরুদেব বললেন— “বৈভবীর কথামতো সে তার বংশের দ্বারা তার যে অসম্পূর্ণ কাজ রয়েছে, সেটা সম্পন্ন করবে। তার মানে সে নিজেকে অমর বানাতে পারেনি। তার জন্য সেই প্রক্রিয়া সে আবার শুরু করেছে। মানে করেছে কিনা সেটা বোঝার জন্য আমাকে সেই আসল রাজবাড়িতে যেতে হবে। যদি এখন ধরেনি, ওই প্রক্রিয়া ও শুরু করেছে। তার মানে, এক্ষেত্রে ও অমর হতে পারবে না। তার কারণ, ইতিমধ্যেই ও মৃত। তাহলে অমরত্ব লাভ মানে, এখন ও নিজের আত্মাটাকে যার ভিতরে প্রবেশ করিয়েছে, তাকে অমরত্ব পেতে সাহায্য করবে। আর তার শরীরে নিজে বসবাস করে এই দুনিয়ায় রাজত্ব করবে। ঠিক আছে...... তাহলে আজকে দুপুরের পরেই ওই রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে আমরা রওনা হব। আমার শিষ্যকে আমি এই বাড়িতে রেখে যাব বাড়ির বাকি সদস্যদের সুরক্ষার জন্য। আর আমার সঙ্গে যেকোনও একজন যাবে সেই রাজবাড়িতে। আর সেই একজন হবে বৈভবীর বংশধর। মানে, নীলাংশু সিংহরায়।”
মামদিদা দর্শনার কথা গুলো আর বললেন না। তিনি এটাও বললেন না যে, তিনি জানেন যে, বৈভবী আবার সেই ধ্বংস লীলা শুরু করেছে।
দুপুরের পরে সুরক্ষা বলয়ে আবদ্ধ হয়ে গুরুদেব আর নীলাংশু গিয়ে উপস্থিত হয় সেই পুরনো রাজবাড়িতে। খুব সন্তর্পনে ওনারা যান বৈভবীর তৈরি করা সেই ভাঙ্গা মন্দির গুলোর সামনে। সুরক্ষা বলয় থাকার জন্য বৈভবীর আত্মা বুঝতে পারে না যে, ওইখানে তখন গুরুদেব গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। ওনারা ওখানে দেখেন যে, সত্যিই বৈভবী অতগুলো বছর আগের মতো বলি দেওয়া শুরু করেছে। আটটা মৃতদেহ পড়ে রয়েছে। তার মানে চারটে মাস। হিসেব মতো সব ঠিক আছে। গুরুদেব ওই মন্দির গুলোর ভিতরের যজ্ঞকুণ্ড থেকে কিছুটা করে ছাই নিজের সংগ্রহে নিয়ে নেন। সেই মন্দির গুলো থেকে ছাই নেন, যে মন্দিরের যজ্ঞকুণ্ড নতুন করে জ্বলে উঠেছিল। তাই তিনি চারটে মন্দির থেকে ওই ছাই নেন। আর বাকি মন্দিরগুলোর থেকে কিছুটা করে মাটি নিজের সংগ্রহে নিয়ে নেন। তারপর আবার সিংহরায় রাজবাড়িতে ফিরে আসেন।
ওনারা ফিরে আসলে, বাড়ির সবাই যখন জানতে পারেন যে, বৈভবী সত্যি সত্যি ওর ধ্বংসলীলা শুরু করে দিয়েছে। তখন সবার ভিতরে ভয়টা আবার জেগে ওঠে। মামদিদার বললেন— “আগেরবারে রাজকুমারী দর্শনা নিজের বলি দিয়ে এই গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে বাঁচিয়ে ছিলো। কিন্তু এই জন্মে........”
গুরুদেব বললেন— “তৎকালীন তন্ত্রগুরুর ওই কথাটার মানে আশা করি আপনারা সবাই জানেন। তবুও আপনাদের কে বলে রাখি, ‘শোণিত স্পর্শন বৈভবী জনন’ এটার সহজ মানে বৈভবীর বংশধরের রক্তের স্পর্শ। কিন্তু কথা হল, বৈভবীর বংশধর নীলাংশু। তাহলে নীলাংশুর রক্ত কোথায় স্পর্শ করতে হবে? আর আদৌ এই কথার সত্যি সত্যি কোনও মানে আছে কি?”
সত্যি বলতে এই প্রশ্নের উত্তর ওই বাড়ির কারোর কাছে ছিল না। তন্ত্রগুরু এই কথাটুকু বলেই ওই কক্ষে প্রবেশ করে গিয়েছিলেন। তারপর থেকেই ওনার আর দেখা যাওয়া পাওয়া যায়নি। রানী হৈমন্তীর কথা মতো উনি ওই ঘরেই নিজেকে সমাধিস্থ করেছেন। তাহলে বৈভবীর বংশধরের রক্ত স্পর্শ করতে হবে কোথায়?
৯
সন্ধে হতেই গুরুদেব বিধি করার সমস্ত আয়োজন করতে থাকেন। একটা সাদা চকের মতো কিছু একটা জিনিস হাতে তুলে নেন। যেটা উনি সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছিলেন। তারপর বাড়ির সামনের উঠোনে গোল চক্র করার পরে, বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্ন রকম নকশা আঁকা শুরু করেন। তারপর ওই চক্রের মাঝখানে এসে একটা যজ্ঞকুণ্ড তৈরি করেন। যজ্ঞ করার সমস্ত জিনিস একে একে গুছিয়ে রাখতে থাকেন। রাত্রি বারোটা বাজলে ওই যজ্ঞকুণ্ডে আগুন ধরানো হয়। তারপর নীলাংশু আর মিষ্টিকে পাশাপাশি বসানো হয়। তার উল্টো দিকেই বসেন গুরুদেব। আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে মন্ত্রোচ্চারণ হতে থাকে। সেই সঙ্গে গুরুদেবের সঙ্গে করে নিয়ে আসা বেশ কিছু জিনিস আহুতি হিসেবে যেতে থাকে। এই মন্ত্র উচ্চারণ যত জোরে হতে থাকে, ওনাদের বাড়িও ততো বেশি করে কাঁপতে থাকে। সদ্য অমাবস্যার গিয়েছে। তাই এই মুহূর্তে বৈভবীকে আটকানোর প্রয়োজন নেই। এই বাড়িও পাঁচ দিনের জন্য সুরক্ষিত। সমস্ত বিধি করার পরে, বৈভবীর আত্মাকে তিনি এই বাড়িতে প্রবেশ করাবেন। আর ওর আত্মা এই বাড়িতে প্রবেশ করলেই, তিনি তাকে বন্দী বানাবেন। মিঠু আপাতত সুরক্ষিত ছিল। তার কারণ, ওর ভিতরে বৈভবীর আত্মা প্রবেশ করেছে। সেই কারণে ও কিছুতেই মিঠুকে মারবে না। ওকে শেষ করে দিলে বৈভবীর কোনও অস্তিত্বই থাকবে না।
গুরুদেবের এই বিধি ছিল অনেক বড়ো। তাই এই বিধি চলতে চলতে একদিন দুইদিন তিনদিন চারদিন পেরিয়ে পঞ্চম দিনে এসে পড়ে। টানা চার দিন এই বিধি চলতে থাকে। কখনও গুরুদেব আবার কখনও ওনার শিষ্য এই বিধি চালিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। আবার কখনও নীলাংশু যজ্ঞকুণ্ডের সামনে বসে, কখনও মিষ্টি বসে। কখনও আবার দুজনে একত্রে বসে। মাঝে মাঝে আবার দুজনের কাউকেই বসতে হয় না। কিন্তু ওই যজ্ঞকুণ্ডের আগুন এক মুহূর্তের জন্যও নেভানো চলে না। পঞ্চম দিনের দিন গুরুদেব ওই যজ্ঞকুণ্ডের আগুনে বৈভবীর ওই মন্দির থেকে আনা মাটি আর ছাই আহুতি হিসেবে দিতে থাকেন। একটা সময় পরে ওই যজ্ঞকুণ্ড থেকে একটা গোল চক্রের মত আগুনের গোলা বেরিয়ে আসে।
ওই চক্রের মত আগুনের গোলটা দেখে গুরুদেব বেশ গম্ভীর ভাবে বললেন— “আমি একটা সুরক্ষা চক্র তৈরি করেই রেখেছি। এখন শুধুমাত্র ওইটা আমি জাগ্রত করে দেব। তারপর আপনারা সবাই ওই চক্রের ভিতরে ঢুকে যাবেন। এরপর আমি এই বাড়ির সুরক্ষা বলয় তারপর সরিয়ে নেব। তার কারণ, ওই সুরক্ষা বলয় থাকলে বৈভবীর আত্মা এখানে প্রবেশ করতে পারবে না। মনে রাখবেন, দেখতে মিঠু হলেও, আসলে ওর ভিতরে বৈভবীর আত্মা রয়েছে। তাই কোনও রকম কোনও ছলচাতুরিতে আপনারা পা দেবেন না। এই পুজোতে আমার সঙ্গে বসে আছে নীলাংশু আর মিষ্টি। আমাদের তিনজনের চারপাশে যে সুরক্ষা বলয় রয়েছে, আমার সেটাকেও সরিয়ে নিতে হবে। তবে চিন্তা করবেন না। আমি আছি। নীলাংশু আর মিষ্টিকে দেখার দায়িত্ব আমার। মিঠু এই বাড়িতে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রের দ্বারা আমি ওকে কয়েক মুহূর্তের জন্য নিস্তেজ করে ওর গলায় একটা রুদ্রাক্ষের মালা পরিয়ে দেব। ঐ রুদ্রাক্ষের মালা পরানোর সঙ্গে সঙ্গে মিঠুর শরীর থেকে বৈভবের আত্মা ওই রুদ্রাক্ষের মালার মধ্যে চলে যাবে। আমার শিষ্য তখন ওই রুদ্রাক্ষের মালাটা নিয়ে গিয়ে এই যে যজ্ঞকুণ্ড থেকে অগ্নি চক্রটা বেরিয়েছে, তার ভিতর দিয়ে দেবে। তখন ওই অগ্নি চক্রের আগুনে রুদ্রাক্ষের মালাটা পুড়ে যাবে। আর সেই সঙ্গে বৈভবীর আত্মাকেও নিজের সঙ্গে নিয়ে অন্তহীনে বিলীন হয়ে যাবে।”
গুরুদেবের এই কথাটা শুনে আরও একবার সবার ভিতর ভয়টা যেন চেপে বসে। সিংহরায় পরিবারের প্রত্যেকে প্রত্যেকের হাত শক্ত করে চেপে ধরে। তার কারণ, কেউ জানে না আদৌ গুরুদেবের এই প্রক্রিয়াতে উনি সফল হবেন কিনা। এত সহজে সমস্ত কিছু হবে কিনা।
বেশ কিছু মন্ত্র পড়ার পরে, গুরুদেব নিজের হাতে কিছু একটা গুঁড়ো গুঁড়ো জিনিস নিয়ে একটা কোনায় ছিটিয়ে দেন। সঙ্গে সঙ্গে সবাই লক্ষ্য করে, ওই জায়গায় আগে থেকেই লাল সুতোয় রুদ্রাক্ষ গেঁথে একটা গণ্ডি মত করা রয়েছে। গুরুদেবের ইশারা অনুসরণ করে ওনারা সবাই গিয়ে বসেন ওই চক্রের ভিতরে। সবাইকে আরও একবার সাবধান করে দেন, যাতে কেউ ওই গণ্ডির বাইরে না বেরোয়।
ওনার শিষ্যকে একটা আলাদা সুরক্ষা কবচ করে দেন। তারপর নিজের আর নীলাংশু ও মিষ্টির চারপাশ থেকে সুরক্ষা কবচ সরিয়ে দেন। আবার কিছু একটা মন্ত্র বলেন। তারপর উপরের দিকে কিছু জিনিস ছিটিয়ে দিলে যে রকম হয়, সেইরকম করলেন গুরুদেব। সঙ্গে সঙ্গে আকাশে যেন বিদ্যুতের ঝলক দেখা জেল। শন্ শন্ করে হাওয়া বইতে শুরু করল। যেন প্রকৃতিও এই মূহূর্তটাকে ভয় পাচ্ছে। আর তার ভয় এই তর্জন গর্জনের মাধ্যমে প্রকাশ করছে।
বাড়ির সুরক্ষা বলয় সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের বেগে মিঠু প্রবেশ করে সিংহরায় রাজবাড়িতে। গুরুদেবের কথা সবাই শুনে ছিল। মেনেও নিয়েছিল। কিন্তু সেই কথা এইরকম ভাবে সত্যি হতে দেখে সবাই যেন আরেকবার ভিতরে ভিতরে কুঁকড়ে যায়। গুরুদেব যে মন্ত্র বলে বৈভবীর আত্মাকে একটু নিস্তেজ করবেন ভেবেছিলেন, সেই মন্ত্র উচ্চারণ করা সত্ত্বেও বৈভবীর উপরে তা কোনও রকম কোনও প্রভাব ফেলে না। উল্টে ও পাখির মতো উড়ে এসে গুরুদেবের উপরে বসে ওনার গলাটা চেপে ধরে। এই সময়ে মিঠুর মুখটা একটা হিংস্র জানোয়ারের মতো ভয়ানক দেখতে লাগছিল। এতোটাই ভয়ানক ছিল যে, প্রত্যেকের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। এইরকম একটা নিষ্পাপ দেখতে মেয়ে যে এতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তার চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। পুরোহিত মশাইয়ের সামনে যখন মিঠুর মধ্যে দিয়ে বৈভবী কথা বলছিল, তখনও কিন্তু এতটা ভয়ানক দেখায়নি।
মিষ্টি ভয়ে পাশে বসে থাকা নীলাংশুর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে।
গুরুদেব ওদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সামনে যে ঘি- এর বাটি রাখা রয়েছে, সেইখান থেকে একটা কাঠের চামচে করে একটু একটু করে ঘি যেন ওরা অগ্নিকুন্ডে দিতে থাকে। যাতে সেই আগুন কিছুতেই নিভে না যায়। নীলাংশু মিষ্টির হাতটা শক্ত করে ধরে চোখের ইশারায় ওকে সান্ত্বনা দিয়ে, ওদেরকে দেওয়া সেই কাজটা করতে থাকে। এদিকে গুরুদেব কিছুতেই নিজেকে মিঠুর মধ্যে থাকা বৈভবীর হাত থেকে রক্ষা করতে পারছিলেন না। ওনার যেন দম বেরিয়ে আসতে চাইছিল। মৃত্যুকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলেন গুরুদেব। কিন্তু নিজের আরাধ্য দেবতাকে স্মরণ করে একটা শেষ চেষ্টা করতে হবে ভেবেই, তিনি ওনার গায়ের সমস্ত শক্তি একত্র করে পাশে রাখা রুদ্রাক্ষের মালাটা কোন রকমের তুলেই মিঠুর গলায় পরিয়ে দেন। বিনা মন্ত্রেই এই কাজটা ওনাকে করতে হলো। কিন্তু যেমন করেই হোক না কেন কাজটা করতে তিনি সমর্থ হয়েছেন। ওই রুদ্রাক্ষের মালার মধ্যে বৈভবীর আত্মা প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে নেতিয়ে পড়ে মিঠু। এইবার কাজ ছিল ওনার শিষ্যের।
যেই মিঠু মাটিতে নেতিয়ে পরে, ওমনি ওনার শিষ্য উঠে গিয়ে ওই রুদ্রাক্ষের মালাটা ওই অগ্নি চক্রের মধ্যে ফেলতে যায়। কিন্তু তার আগেই ওর হাত থেকে মালাটা ছিটকে গিয়ে পড়ে মিষ্টির গলায়। সঙ্গে সঙ্গে পাখির মত উড়ে গিয়ে মিষ্টি দেওয়ালের একটা খাঁজে দাঁড়িয়ে পড়ে। আগেকার দিনের বাড়ি বলে দেওয়াল গুলো খুব উঁচু। এমন অদ্ভুত ঘটনা ঘটনায় সবাই আঁতকে ওঠে। মিষ্টির গলায় মালাটা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈভবীর আত্মা ওর মধ্যে প্রবেশ করে যায়।
নীলাংশু কি করবে বুঝতে পারে না। সেই সময় ওর একটা কথা মনে পড়ে। গুরুদেব আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে নীলাংশুকে চুপিচুপি বলেছিলেন যে, ওনার এই যে প্রক্রিয়া করছেন, তার শেষ প্রক্রিয়ায় যদি কিছু এমন গন্ডগোল হয়, এমন কিছু হয় যাতে মনে হয় যে বিপদ বাড়ছে বৈ কমছে না, তখন ও যেন ছুটে গিয়ে উত্তর দিকে যে ঘরটা এতদিন ধরে বন্ধ ছিল, সেইখানে নিজের রক্ত লাগিয়ে দেয়। তার কারণ গুরুদেবের মনে হয়েছে, তৎকালীন তন্ত্রগুরু রানী হৈমন্তীকে জানিয়েছিলেন যে, যখন এইরকম একটা সংকটের মধ্যে এই পরিবার এসে পড়বে, তখন ঐ নির্দিষ্ট ঘরটার দিকে গেলে সাহায্য পাবে। এমনকি এই ভয়ানক বিপদ থেকে মুক্তিও পেয়ে যেতে পারে এই পরিবার। তার মানে ওই ঘরটার সামনে বিপদের সময় যেতে হবে। কিন্তু এতদিন ধরে ওই দরজাটা কেউ খোলেনি। এমনকি ঐ দরজা খোলার কোনও উপায়ও তন্ত্রগুরু কাউকে বলে যাননি। শুধুমাত্র ওই ঘরে প্রবেশ করার আগে তিনি বলেছিলেন— “শোণিত স্পর্শণ বৈভবী জনন”।
আর অনেক ভাবার পরে এই কথাটা থেকে গুরুদেবের মনে হয়েছে যে, এইটাই হচ্ছে ওই দরজা খোলার সংকেত। এই কথাটার মানে বৈভবীর বংশধরের রক্ত ওই দরজায় লাগালে দরজাটা খুলে যাবে। ওই ঘরের ভিতরে যা তন্ত্রগুরু রেখে গিয়েছেন, তা বুঝতে পারবে যে, এই পরিবারের সাহায্যের দরকার। সত্যি বলতে ঘরের ভিতরে কি রয়েছে, এই পরিবার যেমন যানে না, তেমন গুরুদেব নিজেও জানেন না। তিনি শুধুমাত্র তৎকালীন তন্ত্রগুরুর কথামতো এই কাজটা নীলাংশুকে করতে বলে দিলেন।
আর এই কথাটা মনে হতেই ও সামনে রাখা ছুরিটা নিজের হাতে নিয়ে নিজের জায়গা থেকে ছুটে উত্তর দিকের ঘরটার দিকে এগিয়ে যেতে গেলে, মিষ্টির ভেতরে থাকা বৈভবীর আত্মা বুঝে যায় যে, নীলাংশু ঠিক কি করতে চাইছে। তাই সে মিষ্টির ভিতর থেকে বেরিয়ে যেন হাওয়ার গতিতে ছুটে যায় নীলাংশুকে আটকানোর জন্য।
এইদিকে মিষ্টি যে দেওয়ালের ঝুলন্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল, বৈভবীর আত্মা ওর ভেতর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ও আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। সজোরে মাটিতে এসে পড়ে আর সামনে রাখা একটা পাথরে লেগে ওর মাথাটা সঙ্গে সঙ্গে থেঁতলে যায়। ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সবটা। মুহূর্তের মধ্যেই প্রাণ হারায় মিষ্টি। আর চোখের সামনে এই দৃশ্য দেখে গোটা সিংহরায় পরিবার চিৎকার করে ওঠে। “মিষ্টি...ই....ই.....” বলে চিৎকার করে জ্ঞান হারায় পরিণীতা।
পরের দিন সকাল আটটা নাগাদ মামদিদা ওনার বড় নাতিকে পাঠান গুরুদেবকে বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য। গুরুদেব প্রায় চার কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেখান থেকে তিনি বুঝতে পারছিলেন না যে, কোন দিকে যাবেন। তিনি নিজের গাড়িতে করেই এসেছিলেন। সিংহরায় রাজবাড়ির সামনে গাড়িটা এসে থামলে গুরুদেব গাড়ি থেকে নামেন।
কিন্তু গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে তিনি অনুভব করতে পারেন যে, ওনার সর্বাঙ্গ যেন জ্বলে যাচ্ছে। এটা তখনই হয়, যখন কোনও অশুভ ছায়া আসে-পাশে থাকে। কোনও অশুভ শক্তির সংস্পর্শে এলেই ওনার সঙ্গে এই ব্যাপারটা ঘটে। তিনি আরও দেখেছেন, যেই যেই জায়গায় তিনি এসব অশুভ শক্তিকে বিদায় জানানোর জন্য গিয়েছিলেন, সেই সেই জায়গায় যাওয়ার পরে প্রথমবার ওনার গা এই রকম ভাবেই জ্বলতে থাকে। তিনি মনে মনে ভাবলেন যে, পুরোহিত মশাই যে ওনাকে জানিয়েছিলেন ওইখানে কোনও অশুভ শক্তি রয়েছে, তা সত্যি। কিন্তু এই গায়ের জ্বালা এত পরিমাণে বেশি হচ্ছে যে, এটা থেকেই তিনি বুঝে জান, এই অশুভ শক্তি যে কোনও সাধারণ অশুভ শক্তি নয়, অত্যন্ত শক্তিশালী এক অশুভ শক্তি। নিজের গায়ের ওই জ্বলন নিবারন করার জন্য তিনি ওনার ব্যাগ থেকে গঙ্গা জলের বোতলটা বের করে নিজের গায়ে খানিকটা ছিটিয়ে নেন। তার পরেই দ্রুত পদক্ষেপে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করে যান। বাড়ির ভিতর প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিড়বিড় করে আরও কিছু মন্ত্র উচ্চারণ করেন। যা সবাই দেখতে পায়, কিন্তু শুনতে পায় না।
মামদিদার কথা মতোই ওনাকে বসার ঘরে সোফায় বসতে দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি সেখানে না বসে নিজের সঙ্গে করে আনা কম্বলের আসন পেতে নিচে বসেন। তারপরে বললেন— “এই আধ্যাত্বিক ব্যাপারে নিজের মনোনিবেশ করার পরে থেকে সমস্ত রকম আরাম বিলাস থেকে নিজেকে দূরে রেখেছি। এখন যদি আপনারা বলেন যে, আমি গাড়িতে করে কেন এসেছি। তার উত্তর একটাই... দ্রুত পৌঁছানোর জন্য। আমি যদি আপনাদের এখানে দেরি করে আসতাম, তাহলে আপনাদের জন্য তা বড়োই বিপদজনক হতো। ভয়ানক হতো। আমি আপনাদেরকে ভয় দেখানোর জন্য কিছু বলছি না। শুধু এইটুকুই বলে রাখছি যে, এখানে যে অশুভ শক্তি রয়েছে, সে কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী। আমি পুরো ঘটনাটা মোটামুটি ভাবে শুনেছি। কিন্তু সেই শোনা দিয়ে নয়, আমি আপনাদের কাছে জানতে চাই আসল ঘটনাটা। অবশ্যই আমার বিস্তারিত ভাবে সবকিছু জানার দরকার নেই। আমি শুধু জানতে চাই যে, আপনাদের পরিবারের কেমন করে প্রবেশ করল বৈভবী নামের এক তন্ত্র সাধিকার অশুভ আত্মা। সেই বৈভবী অতীতে ঠিক কি করেছিল। আর আপনাদের পরিবার তাকে কেমন ভাবে আটকে রেখেছিল। কোথায় তাকে এতদিন বন্দি বানিয়ে রাখা হয়েছিল। সে মুক্তি পেল কেমন করে। এই বিষয়গুলো জানলেই আমি আমার পরবর্তী পদক্ষেপ শুরু করতে পারি।”
এই কথার মাঝখানেই ওনাদের জন্য কিছু ফল মিষ্টি আর শরবত নিয়ে আসে পরিণীতা। তারপর বলে— “আপনারা সামান্য খাবারটুকু গ্রহণ করুন। আমি আপনাদেরকে বলছি। আমি তো দায়ী এই সমস্ত কিছু করার জন্য।”
স্বাভাবিকভাবেই গুরুদেব কিছু বুঝতে পারেন না। তিনি অবাক দৃষ্টিতে পরিণীতার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
পরিণীতা নিজের কথা শুরু করতে যাবে, সেইসময় অদ্ভুত রকম ভাবে পুরো রাজবাড়িটা থর্ থর্ করে কাঁপতে থাকে। মনে হতে থাকে যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। সবাই চমকে ওঠে। সেই সময়ে গুরুদেব বললেন— “আপনারা ভয় পাবেন না। আসলে আমি এখানে এসেছি এটা সেই আত্মা জানতে পেরে গেছে। এই বাড়ীতে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে, যাতে আমাকে এখান থেকে তাড়াতে পারে। আর আপনারা সেই কাহিনী যাতে আমাকে বলতে না পারেন। ভয় পাচ্ছে যদি তাকে আমি সমূলে উৎখাত করে দিই, তাই... কিন্তু নিশ্চিন্ত থাকুন, এখানে সে ঢুকতে পারবে না।”
এইবার মামদিদা প্রশ্ন করেন যে, কেন ওই আত্মা প্রবেশ করতে পারবে না। তার উত্তরে গুরুদেব বললেন— “আমি আর আমার এই শিষ্য, যেখানেই যাই না কেন, আমরা আমাদের চারপাশে একটা সুরক্ষা বলয় তৈরি করে যাই। আমরা তো আগে থেকে বুঝতে পারি না যে, কোন অশুভ শক্তি ঠিক কতটা ভয়ঙ্কর। এইখানে এসে যখন আপনাদের বাড়ির সামনে আমি গাড়ি থেকে নামি, তখন আমার সর্বাঙ্গ জ্বলে যেতে থাকে। আর সেই জ্বালা এতটা তীব্র ছিল যে, আমি খুব ভালোমতো বুঝতে পেরে যাই এই অশুভ শক্তি ঠিক কতটা শক্তিশালী। আমাদের চারপাশের সুরক্ষা বলয় থাকার জন্য সে বুঝতে পারেনি যে, আমরা এখানে এসে উপস্থিত হয়েছি। কিন্তু ওই জ্বালা নিবারণ করার জন্য আমি যেই আমার উপরে গঙ্গাজলের ছিটা নিয়েনি, তখন আমার সেই সুরক্ষা বলয় নষ্ট হয়ে যায়। যার দরুন সে বুঝতে পারে যে, আমি এই বাড়িতে এসেছি। কিন্তু সে তখন এই বাড়ির বাইরে নিশ্চয়ই নিজের কোনও অপূর্ণ ইচ্ছে পূরণ করায় ব্যস্ত ছিল। আমার আগমনের আন্দাজ করতে পেরে সে ছুটে আসে। কিন্তু আমি নিজের সুরক্ষা বলয় নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য সঙ্গে সঙ্গে এই রাজবাড়িটাকে একটা সুরক্ষা বলয়ে বন্দি করে দিই।
আপনারা সবাই দেখে থাকবেন যে, এই বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে একটা মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলাম। সেটা আসলে এই বাড়িটা সুরক্ষিত করার জন্যই করেছিলাম। সেই অশুভ শক্তি এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু ভিতরে প্রবেশ করতে পারছে না। সে সেই সুরক্ষা বলয়টাকে নষ্ট করার বারবার চেষ্টা করছে। কিন্তু সফল হচ্ছে না। তার সেই চেষ্টা করার জন্যই বাড়িটা কেঁপে কেঁপে উঠছে।
তবে আপনারা সবাই আমার একটা কথা মন দিয়ে শুনুন। এই বাড়ির বাইরে আমার অনুমতি ছাড়া আপনারা কেউ বেরোবেন না। যদি বেরোতে হয়, তাহলে আমাকে বলবেন। আমি আপনাদের এই বাড়ির বাইরে যাওয়ার ব্যবস্থা করব। তবে আমার মতে, এই বাড়ির বাইরে প্রয়োজন না হলে না বেরোনোই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এই যে আমি সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছি, সেটা পাঁচ দিন পরে নষ্ট হয়ে যাবে। আমাদের যা করার এই পাঁচ দিনের মধ্যে করতে হবে। তাই আপনাদের কাছে অনুরোধ, যদি পাঁচটা দিন ঘরের ভিতরে থাকতে পারেন তাহলে খুব ভালো হয়। আমার কাজের সুবিধা হয়।”
সবাই সম্মতি জানাল।
পরিণীতা সমস্ত কথা গুরুদেবকে খুলে বলে। সবকিছু শোনার পরে গুরুদেব বললেন— “বৈভবীর কথামতো সে তার বংশের দ্বারা তার যে অসম্পূর্ণ কাজ রয়েছে, সেটা সম্পন্ন করবে। তার মানে সে নিজেকে অমর বানাতে পারেনি। তার জন্য সেই প্রক্রিয়া সে আবার শুরু করেছে। মানে করেছে কিনা সেটা বোঝার জন্য আমাকে সেই আসল রাজবাড়িতে যেতে হবে। যদি এখন ধরেনি, ওই প্রক্রিয়া ও শুরু করেছে। তার মানে, এক্ষেত্রে ও অমর হতে পারবে না। তার কারণ, ইতিমধ্যেই ও মৃত। তাহলে অমরত্ব লাভ মানে, এখন ও নিজের আত্মাটাকে যার ভিতরে প্রবেশ করিয়েছে, তাকে অমরত্ব পেতে সাহায্য করবে। আর তার শরীরে নিজে বসবাস করে এই দুনিয়ায় রাজত্ব করবে। ঠিক আছে...... তাহলে আজকে দুপুরের পরেই ওই রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে আমরা রওনা হব। আমার শিষ্যকে আমি এই বাড়িতে রেখে যাব বাড়ির বাকি সদস্যদের সুরক্ষার জন্য। আর আমার সঙ্গে যেকোনও একজন যাবে সেই রাজবাড়িতে। আর সেই একজন হবে বৈভবীর বংশধর। মানে, নীলাংশু সিংহরায়।”
মামদিদা দর্শনার কথা গুলো আর বললেন না। তিনি এটাও বললেন না যে, তিনি জানেন যে, বৈভবী আবার সেই ধ্বংস লীলা শুরু করেছে।
দুপুরের পরে সুরক্ষা বলয়ে আবদ্ধ হয়ে গুরুদেব আর নীলাংশু গিয়ে উপস্থিত হয় সেই পুরনো রাজবাড়িতে। খুব সন্তর্পনে ওনারা যান বৈভবীর তৈরি করা সেই ভাঙ্গা মন্দির গুলোর সামনে। সুরক্ষা বলয় থাকার জন্য বৈভবীর আত্মা বুঝতে পারে না যে, ওইখানে তখন গুরুদেব গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। ওনারা ওখানে দেখেন যে, সত্যিই বৈভবী অতগুলো বছর আগের মতো বলি দেওয়া শুরু করেছে। আটটা মৃতদেহ পড়ে রয়েছে। তার মানে চারটে মাস। হিসেব মতো সব ঠিক আছে। গুরুদেব ওই মন্দির গুলোর ভিতরের যজ্ঞকুণ্ড থেকে কিছুটা করে ছাই নিজের সংগ্রহে নিয়ে নেন। সেই মন্দির গুলো থেকে ছাই নেন, যে মন্দিরের যজ্ঞকুণ্ড নতুন করে জ্বলে উঠেছিল। তাই তিনি চারটে মন্দির থেকে ওই ছাই নেন। আর বাকি মন্দিরগুলোর থেকে কিছুটা করে মাটি নিজের সংগ্রহে নিয়ে নেন। তারপর আবার সিংহরায় রাজবাড়িতে ফিরে আসেন।
ওনারা ফিরে আসলে, বাড়ির সবাই যখন জানতে পারেন যে, বৈভবী সত্যি সত্যি ওর ধ্বংসলীলা শুরু করে দিয়েছে। তখন সবার ভিতরে ভয়টা আবার জেগে ওঠে। মামদিদার বললেন— “আগেরবারে রাজকুমারী দর্শনা নিজের বলি দিয়ে এই গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে বাঁচিয়ে ছিলো। কিন্তু এই জন্মে........”
গুরুদেব বললেন— “তৎকালীন তন্ত্রগুরুর ওই কথাটার মানে আশা করি আপনারা সবাই জানেন। তবুও আপনাদের কে বলে রাখি, ‘শোণিত স্পর্শন বৈভবী জনন’ এটার সহজ মানে বৈভবীর বংশধরের রক্তের স্পর্শ। কিন্তু কথা হল, বৈভবীর বংশধর নীলাংশু। তাহলে নীলাংশুর রক্ত কোথায় স্পর্শ করতে হবে? আর আদৌ এই কথার সত্যি সত্যি কোনও মানে আছে কি?”
সত্যি বলতে এই প্রশ্নের উত্তর ওই বাড়ির কারোর কাছে ছিল না। তন্ত্রগুরু এই কথাটুকু বলেই ওই কক্ষে প্রবেশ করে গিয়েছিলেন। তারপর থেকেই ওনার আর দেখা যাওয়া পাওয়া যায়নি। রানী হৈমন্তীর কথা মতো উনি ওই ঘরেই নিজেকে সমাধিস্থ করেছেন। তাহলে বৈভবীর বংশধরের রক্ত স্পর্শ করতে হবে কোথায়?
৯
সন্ধে হতেই গুরুদেব বিধি করার সমস্ত আয়োজন করতে থাকেন। একটা সাদা চকের মতো কিছু একটা জিনিস হাতে তুলে নেন। যেটা উনি সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছিলেন। তারপর বাড়ির সামনের উঠোনে গোল চক্র করার পরে, বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্ন রকম নকশা আঁকা শুরু করেন। তারপর ওই চক্রের মাঝখানে এসে একটা যজ্ঞকুণ্ড তৈরি করেন। যজ্ঞ করার সমস্ত জিনিস একে একে গুছিয়ে রাখতে থাকেন। রাত্রি বারোটা বাজলে ওই যজ্ঞকুণ্ডে আগুন ধরানো হয়। তারপর নীলাংশু আর মিষ্টিকে পাশাপাশি বসানো হয়। তার উল্টো দিকেই বসেন গুরুদেব। আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে মন্ত্রোচ্চারণ হতে থাকে। সেই সঙ্গে গুরুদেবের সঙ্গে করে নিয়ে আসা বেশ কিছু জিনিস আহুতি হিসেবে যেতে থাকে। এই মন্ত্র উচ্চারণ যত জোরে হতে থাকে, ওনাদের বাড়িও ততো বেশি করে কাঁপতে থাকে। সদ্য অমাবস্যার গিয়েছে। তাই এই মুহূর্তে বৈভবীকে আটকানোর প্রয়োজন নেই। এই বাড়িও পাঁচ দিনের জন্য সুরক্ষিত। সমস্ত বিধি করার পরে, বৈভবীর আত্মাকে তিনি এই বাড়িতে প্রবেশ করাবেন। আর ওর আত্মা এই বাড়িতে প্রবেশ করলেই, তিনি তাকে বন্দী বানাবেন। মিঠু আপাতত সুরক্ষিত ছিল। তার কারণ, ওর ভিতরে বৈভবীর আত্মা প্রবেশ করেছে। সেই কারণে ও কিছুতেই মিঠুকে মারবে না। ওকে শেষ করে দিলে বৈভবীর কোনও অস্তিত্বই থাকবে না।
গুরুদেবের এই বিধি ছিল অনেক বড়ো। তাই এই বিধি চলতে চলতে একদিন দুইদিন তিনদিন চারদিন পেরিয়ে পঞ্চম দিনে এসে পড়ে। টানা চার দিন এই বিধি চলতে থাকে। কখনও গুরুদেব আবার কখনও ওনার শিষ্য এই বিধি চালিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। আবার কখনও নীলাংশু যজ্ঞকুণ্ডের সামনে বসে, কখনও মিষ্টি বসে। কখনও আবার দুজনে একত্রে বসে। মাঝে মাঝে আবার দুজনের কাউকেই বসতে হয় না। কিন্তু ওই যজ্ঞকুণ্ডের আগুন এক মুহূর্তের জন্যও নেভানো চলে না। পঞ্চম দিনের দিন গুরুদেব ওই যজ্ঞকুণ্ডের আগুনে বৈভবীর ওই মন্দির থেকে আনা মাটি আর ছাই আহুতি হিসেবে দিতে থাকেন। একটা সময় পরে ওই যজ্ঞকুণ্ড থেকে একটা গোল চক্রের মত আগুনের গোলা বেরিয়ে আসে।
ওই চক্রের মত আগুনের গোলটা দেখে গুরুদেব বেশ গম্ভীর ভাবে বললেন— “আমি একটা সুরক্ষা চক্র তৈরি করেই রেখেছি। এখন শুধুমাত্র ওইটা আমি জাগ্রত করে দেব। তারপর আপনারা সবাই ওই চক্রের ভিতরে ঢুকে যাবেন। এরপর আমি এই বাড়ির সুরক্ষা বলয় তারপর সরিয়ে নেব। তার কারণ, ওই সুরক্ষা বলয় থাকলে বৈভবীর আত্মা এখানে প্রবেশ করতে পারবে না। মনে রাখবেন, দেখতে মিঠু হলেও, আসলে ওর ভিতরে বৈভবীর আত্মা রয়েছে। তাই কোনও রকম কোনও ছলচাতুরিতে আপনারা পা দেবেন না। এই পুজোতে আমার সঙ্গে বসে আছে নীলাংশু আর মিষ্টি। আমাদের তিনজনের চারপাশে যে সুরক্ষা বলয় রয়েছে, আমার সেটাকেও সরিয়ে নিতে হবে। তবে চিন্তা করবেন না। আমি আছি। নীলাংশু আর মিষ্টিকে দেখার দায়িত্ব আমার। মিঠু এই বাড়িতে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রের দ্বারা আমি ওকে কয়েক মুহূর্তের জন্য নিস্তেজ করে ওর গলায় একটা রুদ্রাক্ষের মালা পরিয়ে দেব। ঐ রুদ্রাক্ষের মালা পরানোর সঙ্গে সঙ্গে মিঠুর শরীর থেকে বৈভবের আত্মা ওই রুদ্রাক্ষের মালার মধ্যে চলে যাবে। আমার শিষ্য তখন ওই রুদ্রাক্ষের মালাটা নিয়ে গিয়ে এই যে যজ্ঞকুণ্ড থেকে অগ্নি চক্রটা বেরিয়েছে, তার ভিতর দিয়ে দেবে। তখন ওই অগ্নি চক্রের আগুনে রুদ্রাক্ষের মালাটা পুড়ে যাবে। আর সেই সঙ্গে বৈভবীর আত্মাকেও নিজের সঙ্গে নিয়ে অন্তহীনে বিলীন হয়ে যাবে।”
গুরুদেবের এই কথাটা শুনে আরও একবার সবার ভিতর ভয়টা যেন চেপে বসে। সিংহরায় পরিবারের প্রত্যেকে প্রত্যেকের হাত শক্ত করে চেপে ধরে। তার কারণ, কেউ জানে না আদৌ গুরুদেবের এই প্রক্রিয়াতে উনি সফল হবেন কিনা। এত সহজে সমস্ত কিছু হবে কিনা।
বেশ কিছু মন্ত্র পড়ার পরে, গুরুদেব নিজের হাতে কিছু একটা গুঁড়ো গুঁড়ো জিনিস নিয়ে একটা কোনায় ছিটিয়ে দেন। সঙ্গে সঙ্গে সবাই লক্ষ্য করে, ওই জায়গায় আগে থেকেই লাল সুতোয় রুদ্রাক্ষ গেঁথে একটা গণ্ডি মত করা রয়েছে। গুরুদেবের ইশারা অনুসরণ করে ওনারা সবাই গিয়ে বসেন ওই চক্রের ভিতরে। সবাইকে আরও একবার সাবধান করে দেন, যাতে কেউ ওই গণ্ডির বাইরে না বেরোয়।
ওনার শিষ্যকে একটা আলাদা সুরক্ষা কবচ করে দেন। তারপর নিজের আর নীলাংশু ও মিষ্টির চারপাশ থেকে সুরক্ষা কবচ সরিয়ে দেন। আবার কিছু একটা মন্ত্র বলেন। তারপর উপরের দিকে কিছু জিনিস ছিটিয়ে দিলে যে রকম হয়, সেইরকম করলেন গুরুদেব। সঙ্গে সঙ্গে আকাশে যেন বিদ্যুতের ঝলক দেখা জেল। শন্ শন্ করে হাওয়া বইতে শুরু করল। যেন প্রকৃতিও এই মূহূর্তটাকে ভয় পাচ্ছে। আর তার ভয় এই তর্জন গর্জনের মাধ্যমে প্রকাশ করছে।
বাড়ির সুরক্ষা বলয় সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের বেগে মিঠু প্রবেশ করে সিংহরায় রাজবাড়িতে। গুরুদেবের কথা সবাই শুনে ছিল। মেনেও নিয়েছিল। কিন্তু সেই কথা এইরকম ভাবে সত্যি হতে দেখে সবাই যেন আরেকবার ভিতরে ভিতরে কুঁকড়ে যায়। গুরুদেব যে মন্ত্র বলে বৈভবীর আত্মাকে একটু নিস্তেজ করবেন ভেবেছিলেন, সেই মন্ত্র উচ্চারণ করা সত্ত্বেও বৈভবীর উপরে তা কোনও রকম কোনও প্রভাব ফেলে না। উল্টে ও পাখির মতো উড়ে এসে গুরুদেবের উপরে বসে ওনার গলাটা চেপে ধরে। এই সময়ে মিঠুর মুখটা একটা হিংস্র জানোয়ারের মতো ভয়ানক দেখতে লাগছিল। এতোটাই ভয়ানক ছিল যে, প্রত্যেকের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। এইরকম একটা নিষ্পাপ দেখতে মেয়ে যে এতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তার চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। পুরোহিত মশাইয়ের সামনে যখন মিঠুর মধ্যে দিয়ে বৈভবী কথা বলছিল, তখনও কিন্তু এতটা ভয়ানক দেখায়নি।
মিষ্টি ভয়ে পাশে বসে থাকা নীলাংশুর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে।
গুরুদেব ওদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সামনে যে ঘি- এর বাটি রাখা রয়েছে, সেইখান থেকে একটা কাঠের চামচে করে একটু একটু করে ঘি যেন ওরা অগ্নিকুন্ডে দিতে থাকে। যাতে সেই আগুন কিছুতেই নিভে না যায়। নীলাংশু মিষ্টির হাতটা শক্ত করে ধরে চোখের ইশারায় ওকে সান্ত্বনা দিয়ে, ওদেরকে দেওয়া সেই কাজটা করতে থাকে। এদিকে গুরুদেব কিছুতেই নিজেকে মিঠুর মধ্যে থাকা বৈভবীর হাত থেকে রক্ষা করতে পারছিলেন না। ওনার যেন দম বেরিয়ে আসতে চাইছিল। মৃত্যুকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলেন গুরুদেব। কিন্তু নিজের আরাধ্য দেবতাকে স্মরণ করে একটা শেষ চেষ্টা করতে হবে ভেবেই, তিনি ওনার গায়ের সমস্ত শক্তি একত্র করে পাশে রাখা রুদ্রাক্ষের মালাটা কোন রকমের তুলেই মিঠুর গলায় পরিয়ে দেন। বিনা মন্ত্রেই এই কাজটা ওনাকে করতে হলো। কিন্তু যেমন করেই হোক না কেন কাজটা করতে তিনি সমর্থ হয়েছেন। ওই রুদ্রাক্ষের মালার মধ্যে বৈভবীর আত্মা প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে নেতিয়ে পড়ে মিঠু। এইবার কাজ ছিল ওনার শিষ্যের।
যেই মিঠু মাটিতে নেতিয়ে পরে, ওমনি ওনার শিষ্য উঠে গিয়ে ওই রুদ্রাক্ষের মালাটা ওই অগ্নি চক্রের মধ্যে ফেলতে যায়। কিন্তু তার আগেই ওর হাত থেকে মালাটা ছিটকে গিয়ে পড়ে মিষ্টির গলায়। সঙ্গে সঙ্গে পাখির মত উড়ে গিয়ে মিষ্টি দেওয়ালের একটা খাঁজে দাঁড়িয়ে পড়ে। আগেকার দিনের বাড়ি বলে দেওয়াল গুলো খুব উঁচু। এমন অদ্ভুত ঘটনা ঘটনায় সবাই আঁতকে ওঠে। মিষ্টির গলায় মালাটা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈভবীর আত্মা ওর মধ্যে প্রবেশ করে যায়।
নীলাংশু কি করবে বুঝতে পারে না। সেই সময় ওর একটা কথা মনে পড়ে। গুরুদেব আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে নীলাংশুকে চুপিচুপি বলেছিলেন যে, ওনার এই যে প্রক্রিয়া করছেন, তার শেষ প্রক্রিয়ায় যদি কিছু এমন গন্ডগোল হয়, এমন কিছু হয় যাতে মনে হয় যে বিপদ বাড়ছে বৈ কমছে না, তখন ও যেন ছুটে গিয়ে উত্তর দিকে যে ঘরটা এতদিন ধরে বন্ধ ছিল, সেইখানে নিজের রক্ত লাগিয়ে দেয়। তার কারণ গুরুদেবের মনে হয়েছে, তৎকালীন তন্ত্রগুরু রানী হৈমন্তীকে জানিয়েছিলেন যে, যখন এইরকম একটা সংকটের মধ্যে এই পরিবার এসে পড়বে, তখন ঐ নির্দিষ্ট ঘরটার দিকে গেলে সাহায্য পাবে। এমনকি এই ভয়ানক বিপদ থেকে মুক্তিও পেয়ে যেতে পারে এই পরিবার। তার মানে ওই ঘরটার সামনে বিপদের সময় যেতে হবে। কিন্তু এতদিন ধরে ওই দরজাটা কেউ খোলেনি। এমনকি ঐ দরজা খোলার কোনও উপায়ও তন্ত্রগুরু কাউকে বলে যাননি। শুধুমাত্র ওই ঘরে প্রবেশ করার আগে তিনি বলেছিলেন— “শোণিত স্পর্শণ বৈভবী জনন”।
আর অনেক ভাবার পরে এই কথাটা থেকে গুরুদেবের মনে হয়েছে যে, এইটাই হচ্ছে ওই দরজা খোলার সংকেত। এই কথাটার মানে বৈভবীর বংশধরের রক্ত ওই দরজায় লাগালে দরজাটা খুলে যাবে। ওই ঘরের ভিতরে যা তন্ত্রগুরু রেখে গিয়েছেন, তা বুঝতে পারবে যে, এই পরিবারের সাহায্যের দরকার। সত্যি বলতে ঘরের ভিতরে কি রয়েছে, এই পরিবার যেমন যানে না, তেমন গুরুদেব নিজেও জানেন না। তিনি শুধুমাত্র তৎকালীন তন্ত্রগুরুর কথামতো এই কাজটা নীলাংশুকে করতে বলে দিলেন।
আর এই কথাটা মনে হতেই ও সামনে রাখা ছুরিটা নিজের হাতে নিয়ে নিজের জায়গা থেকে ছুটে উত্তর দিকের ঘরটার দিকে এগিয়ে যেতে গেলে, মিষ্টির ভেতরে থাকা বৈভবীর আত্মা বুঝে যায় যে, নীলাংশু ঠিক কি করতে চাইছে। তাই সে মিষ্টির ভিতর থেকে বেরিয়ে যেন হাওয়ার গতিতে ছুটে যায় নীলাংশুকে আটকানোর জন্য।
এইদিকে মিষ্টি যে দেওয়ালের ঝুলন্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল, বৈভবীর আত্মা ওর ভেতর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ও আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। সজোরে মাটিতে এসে পড়ে আর সামনে রাখা একটা পাথরে লেগে ওর মাথাটা সঙ্গে সঙ্গে থেঁতলে যায়। ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সবটা। মুহূর্তের মধ্যেই প্রাণ হারায় মিষ্টি। আর চোখের সামনে এই দৃশ্য দেখে গোটা সিংহরায় পরিবার চিৎকার করে ওঠে। “মিষ্টি...ই....ই.....” বলে চিৎকার করে জ্ঞান হারায় পরিণীতা।
বৈভবীর আত্মা হাওয়ার বেগে গিয়ে নীলাংশুকে আটকানোর চেষ্টা করে ঠিক কথাই... কিন্তু ততক্ষণে নীলাংশুর হাত দরজায় লেগে গিয়েছে। আর যেহেতু হাতে শক্ত করে ছুরিটা ধরা ছিল, আর সেই ছুরির আঘাতে ওর হাত কেটে গিয়েছিল, তাই ওই রক্তের ছোঁয়াতে দরজাটা হাট হয়ে খুলে যায়। এই মুহূর্তে চোখের সামনে যা যা ঘটনা ঘটল,তাতে গুরুদেব কি করবেন বুঝতে না পেরে চুপ করে নিজের জায়গায় বসে থাকেন। ওনার শিষ্যও কিছু করতে পারে না। ওই দরজাটা খুলে যেতেই একটা কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া বেরিয়ে আসে। নীলাংশুর চারপাশে সেই ধোঁয়াটা ঘুরতে থাকে। ওর চারপাশে ঘুরতে ঘুরতেই ওই ধোঁয়াটা যেন আরও বেশি বড় হয়ে যায়। তারপর সেটা তীরের বেগে এসে ওই গোলাকার অগ্নি চক্রের ভিতরে প্রবেশ করে। সঙ্গে সঙ্গে অগ্নি চক্রটা ওই ধোঁয়াকে সঙ্গে নিয়ে উপর দিকে উঠতে থাকে। একসময় মহাশূন্যে বিলীন হয়ে যায়।
নীলাংশু ওই দরজার কাছেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকে। গুরুদেব আরও কিছু মন্ত্র উচ্চারণ করতে থাকেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওখানে আবারও একটা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যায়। মিনিটখানেক পরে যজ্ঞের আগুন গুরুদেব নিভিয়ে দেন। তারপর চুপচাপ নিজের জায়গায় বসে থাকেন। বাড়ির লোকেরা পরিণীতার জ্ঞান তখনও ফেরাতে পারে না। সবাই কাঁদতে থাকে। যেহেতু ওই চক্রের মধ্যে বাড়ির সব সদস্যদের রাখা হয়েছিল, তাই বাড়ির ছোটরাও আতঙ্কে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। সিংহরায় বাড়িটা যেন একটা শ্মশান ভূমিতে পরিণত হয়ে যায়। শুধু কান্না কান্না আর কান্না......
[ আমার লেখা বইটি তোমরা পাবে #আমাজন আর #ফ্লিপকার্ট থেকে। এই গল্পেও রয়েছে তন্ত্র রয়েছে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া একটা নিষ্পাপ মেয়ের অতৃপ্ত আত্মা। তাকে আটকাতে গেলে দিতে হবে বলিদান। কারণ কখনও কখনও ভালো কিছু করতে গেলে ভালোকে তার দাম দিতে হয় অনেক। গল্পের প্রধান চরিত্র কি বলিদান দেবে বা কতটা ভয়ঙ্কর হবে ওদের জীবন? আছে শঙ্করনাথ তান্ত্রিক। যার সঙ্গে তোমাদের পরিচয় হয়েছে আমার লেখা আগের রহস্য গল্প শোনগড়ের রাজবাড়ি গল্পে। সব মিলিয়ে রহস্য রোমাঞ্চে ভরা এই উপন্যাস "চাঁপাগড়ের অভিশপ্ত জমিদার বাড়ি...। ]
এমন ভাবে বেশ কিছুটা সময় পেরিয়ে যায়। পূর্ব আকাশে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান গুরুদেব। তারপর বাড়ির লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন— “আমার কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। না ভুল বললাম... আমি কিছুই করতে পারিনি। যে ক্ষমতার আমি বড়াই করতাম, যে ক্ষমতার দ্বারা আমি অনেক কঠিন কঠিন সমস্যার সমাধান করেছি, সেই ক্ষমতা আসলে কিছুই না। পারলাম না আমি আপনাদের মেয়েকে বাঁচাতে। আমি বিধিটা ঠিক করেছিলাম। কিন্তু এই বিধিতে হয়তো কোনও সাধারণ আত্মা হলে সহজেই বশ হয়ে যেতো। কিন্তু এই বৈভবীর আত্মা প্রচন্ড শক্তিশালী ছিল। আমার সমস্ত শৃঙ্খল ভেঙে দিয়েছে। শুধুমাত্র আপনাদের কোনও ক্ষতি করতে পারেনি। এই টুকুই যে আমার পাওনা। এই যে সুরক্ষা বলয় আমি তৈরী করেছিলাম, সেটাই শুধুমাত্র সফল হয়েছে। বাকি আমার পুরো প্রক্রিয়া নষ্ট হয়ে গেছে। আর হ্যাঁ, রাজকুমারী দর্শনার আত্মাকে আমি মুক্তি দিয়ে দিয়েছি। ওনার আত্মাকে মুক্তি দেওয়া এমন কোনও কঠিন কাজ ছিল না। আপনাদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার মত মুখ আমার নেই। এক্ষেত্রেও আপনাদেরকে বাঁচালেন তৎকালীন তন্ত্রগুরু।”
এই কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ক্রন্দনরত অবস্থায় মামদিদা বললেন— “তা কেমন করে গুরুদেব?”
কিন্তু এই কথার কোন জবাব না দিয়ে গুরুদেব সেখান থেকে চলে যান।
১০
ওই সুরক্ষা বলয় থেকে বেরিয়ে আসে প্রত্যেকে। ততক্ষণে পরিণীতার জ্ঞান ফিরে এসেছে। কিন্তু ও চোখের সামনে নিজের মেয়ের ঐরকম একটা মৃতদেহ দেখার পরে আবারও জ্ঞান হারায়। সবাই অস্থির হয়ে পড়ে। বুঝতে পারে না কি করবে। এই বয়সে এত কষ্ট আর সহ্য করতে পারছিলেন না মামদিদা। ওনার শরীর অসুস্থ হতে শুরু করে। কোনরকমে উঠে গিয়ে সামনে থাকা একটা চেয়ারে বসে পড়েন। ওনার চোখ দিয়ে জলের ধারা বয়ে চলেছে।
মিষ্টি… এই মেয়েটাকে তিনি খুব ভালবাসতেন খুব। বিয়ে না করে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলে বলে রাগ করেছিলেন। কিন্তু তিনি একবারের জন্য ভাবতে পারেননি রাজকুমারীর মত এই জন্মেও রাজকুমারী মিষ্টিকে নিজের জীবন দিতে হবে। রাজকুমারীই তো। বৈভবীর বংশধরকে তো কেউ কোনও দিনও আলাদা করে কিছু ভাবেনি। তাছাড়া হয়তো রানীর গর্ভ থেকে এই বংশের জন্ম হয়নি। কিন্তু রাজার রক্ত তো রয়েছে শরীরে। এখন রাজা না থাকলেও যেহেতু এটা রাজপরিবার। সেই হিসেব মতো মিষ্টি রাজকুমারী।
এই সমাজ সব সময় মেয়েদেরকে পিছনে সরিয়ে রাখে। কিন্তু অতো বছর আগেও আর আজকেও বারবার মেয়েরা নিজেদেরকে প্রমাণ করে গেছে। রাজকুমারী দর্শনা সেইদিন নিজের প্রাণ দিয়ে সমগ্র বিশ্ববাসীকে রক্ষা করেছিলেন। আর আজকে মিষ্টি নিজের প্রাণ দিল। রাজকুমারী দর্শনার মৃত্যুর সঙ্গে মিষ্টির মৃত্যুর কিছু পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু উপলক্ষ সেই ওই বৈভবী।
মুখের জলের ছিটা দিয়ে নীলাংশুর জ্ঞান ফিরিয়ে আনা হয়। কাঁদতে কাঁদতে সবাই মিষ্টি শেষকৃত্যের আয়োজন করে। আর পরিণীতা সে তো আর নিজের মধ্যেই নেই। যখনই জ্ঞান ফিরছে, তখনই মিষ্টি মিষ্টি করছে। আর সেই মিষ্টি মিষ্টি করতে করতেই জ্ঞান হারাচ্ছে। মুখে তার একটাই কথা, মিষ্টি মিষ্টি আর মিষ্টি...... পরিণীতার বড় জা ওকে সামলাতেই ব্যস্ত। আশাপাশে বেশ কিছু লোকজন জড়ো হয়। কিন্তু তাকে কী বলবেন, কেমন করে কি হয়েছে? তাই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্যই সবার কাছে এইটা বলে দেওয়া হল যে, ছাদ থেকে পা পিছলে মিষ্টি নিচে পড়ে গেছে।
সবাই বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে, মামদিদা ধীরে ধীরে গিয়ে প্রবেশ করেন উত্তর দিকের সেই ঘরটায়। পুরো ফাঁকা ঘরের মাঝখানে একটা যজ্ঞকুণ্ড রয়েছে। আর তার পাশে একটা মানুষের কঙ্কাল পড়ে রয়েছে। যজ্ঞকুণ্ড চারপাশে তন্ত্র সাধনা করলে ঠিক যেইরকম নকশা আঁকা থাকে, বা যেই সব জিনিসপত্র থাকার দরকার, সেই সব কিছু রয়েছে ঘরের ভিতরে। ধুলোবালি ছাড়া আর কিছু নেই। যেখানে আজ একটা জিনিস রেখে দিলে, কাল সেখানে মাকড়সা ফাঁদ পাততে শুরু করে, সেখানে একটা ঘর বছরের পর বছর ধরে বন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে, সেই ঘরে একটা মাকড়সার ফাঁদ পর্যন্ত নেই। কিন্তু এই নিয়ে মামদিদা বেশি মাথা ঘামালেন না। ওনার চোখ দিয়ে তখনও জল গড়িয়ে পড়ছে। তার কারণ, যেই মানুষটাকে তিনি সবথেকে বেশি ভালোবাসতেন, নিজের ছেলে মেয়ে নাতি-নাতনি সবার মধ্যে যাকে তিনি নিজের একদম কাছের করে নিয়েছিলেন, সে তো আর কেউ নয়... সে হলো মিষ্টি।
মিষ্টির সঙ্গে ওনার এতদিন ধরে কাটানো সমস্ত স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে বেড়াতে থাকে। তিনি রয়েছেন ওই নির্দিষ্ট ঘরটায়, কিন্তু ভেবে চলেছেন মিষ্টির কথা। মেয়েটা ওনার কাছ থেকে এই পরিবারের ইতিহাস জানার কত আগ্রহ ছিল। রাজপরিবারের অতীত জানার জন্য কত অনুনয়-বিনয় করত মেয়েটা। আর প্রত্যেকবারেই তিনি একটাই কথা বলছেন “বিয়ে কর সব জানতে পারবি। কেন তুই এরকম করলি মা কেন?” আবারো ডুকরে কেঁদে উঠলেন মামদিদা।
তার শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখটা মুছে ভাল করে তাকাতে দেখলেন, সামনে একটা বই মতো রাখা রয়েছে। দেখেই বোঝা যায় যে এটা অনেক বছরের পুরনো। সামনে গিয়ে ওই বইটা খুললেন। হাত দিতে বোঝা গেল যে, এটা এখনকার বইয়ের কাগজের মত নয়। এটা অনেকটা গাছের পাতার মতো। কিন্তু ওখানে বেশ কিছু কথা লেখা রয়েছে। এই অন্ধকার ঘরটায় সেইসব পড়া সম্ভব নয়। তাই তিনি কোনও রকমে ধুলোটা ঝেড়ে বইটা হাতে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তিনি ঠিক করেন বাড়ির পরিবেশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে, এই বইটা পড়ে দেখবেন।
অপঘাতে মৃত্যু হওয়ার জন্য চার দিনেই মিষ্টির সমস্ত কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়। পাঁচ দিনের মাথায় পরিণীতা বাড়ির সবাইকে বসার ঘরে আসতে অনুরোধ করে। সবাই আসলে ও বলে-------
“তোমাদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ যে, তোমরা আমাকে এত ভালবাসা দিয়েছো। ছোট থেকেই আমি একান্নবর্তী পরিবার পছন্দ করতাম বলে তোমাদের এই পরিবারের এসে আমার খুব আনন্দ হয়েছিল। প্রত্যেকের খেয়াল রাখতে আমার ভালো লাগতো। এতটা শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও কখনো আমার মনে হয়নি যে তোমাদের সবাইকে ছেড়ে আমি বাইরে গিয়ে চাকরি করি। তার কারণ,চাকরি করতে গেলে আমি তোমাদের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে পারতাম না। প্রত্যেকটা মানুষকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। মেজদি আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলেও, আমি তাকেও ভালোবাসি। আমি আমার মেয়েকে খুব ভালোবাসি। হ্যাঁ, এখনো ভালোবাসি। সে নেই জেনেও তাকে আমি ভালোবাসি। সন্তান হারানোর কি কষ্ট সেটা আমি আগেই বুঝেছিলাম। কিন্তু তখন সে বাচ্চাটার আমি মুখ দর্শন পর্যন্ত করিনি। তাই সেই কষ্টটা আমি কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলাম। কিন্তু যে মেয়েটাকে আমি ছোট থেকে এতটা বড় করলাম। সে আমাকে ছেড়ে চলে গেল। এটা আমি মানতে পারছি না। আরো বেশি কষ্ট হচ্ছে আমি তোমাদের সবার কথার অবাধ্য হয়ে ওকে বিয়েটা করতে দেইনি। হয়তো সেইদিন আমি ওকে পালাতে সাহায্য না করলে ওর বিয়েটা হয়ে যেত। যে মেয়েটাকে উচ্চশিক্ষিত করব বলে আমি বিয়ে থেকে পালাতে সাহায্য করেছিলাম, আর সেই মেয়েটাই আজ আমার সঙ্গে নেই। অনেক বড় ভুল করেছি আমি। এই বাড়িতে থাকার কোন যোগ্যতা আমার নেই। অধিকারও নেই। অধিকার নেই এই জন্যই বললাম, তার কারণ যে মানুষটার হাত ধরে এই বাড়িতে আমি প্রবেশ করেছিলাম, সেই মানুষটা আমাকে তো নিজের থেকে বিয়ে করেনি। বাড়ির প্রত্যেকের কথা মত আমাকে বিয়ে করেছিল। যাইহোক, তারপরও সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গিয়েছিল। সে মেনে নিয়েছিল সেই কারণেই মিষ্টির জন্ম হয়েছিল। কিন্তু সে যে আমাকে ধোকা দিয়ে বসে আছে, সেটা আমি আজ এতগুলো বছরের জানতে পারিনি। যদি আমার মেয়েকে আমি সেইদিন পালাতে সাহায্য না করতাম, তাহলে হয়ত ভাবতাম আমার স্বামী আমাকে খুব ভালোবাসে, বিশ্বাস করে। আমিও তো ওকে প্রচন্ড বিশ্বাস করতাম। এইসব পুরোনো কথা তুলে আমি আর কিছু করতে চাই না। তার কারণ দোষ তো আমিও কম করিনি। আজকে আমি বুঝতে পারছি যে, আমি কত বড় ভুল করেছি, তাও নিজের মেয়েকে হারিয়ে। আমি আর বেশি কথায় যেতে চাই না। আমি ভুল করেছি, আবার উল্টোদিকে আমার স্বামী আমাকে ঠকিয়েছে। তাই এই বাড়িতে আমি আর থাকতে চাই না। আমার ছেলেকে নিয়ে আমি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাই। কিন্তু হ্যাঁ, নীলাংশু যদি চায় ওর ছেলেকে ওর কাছে রাখতে পারে। আমি ছেলের দাবিও করব না। তার কারণ, ছেলেটা তো ওরই। কিন্তু আমি এই বাড়িতে আর থাকতে পারব না। তোমাদের কাছে আমার একটাই অনুরোধ। দয়া করে, এই বাড়িতে থাকার জন্য আমাকে আর অনুরোধ করো না।”
নীলাংশু কিছু বলতে যায়, তার আগেই পরিণীতা ওকে বাধা দিয়ে বলে— “তোমাকে আমি দোষ দিচ্ছি না। দোষ দেবও বা কোন মুখে। আমিও তো অন্যায় করেছি। আমি তোমার মেয়েকে শেষ করে দিয়েছি। তাই এই বাড়িতে থাকার অধিকার বা ইচ্ছা কোনটাই নেই আমার। আমি আসছি... তোমরা সবাই ভালো থেকো।”
মামদিদা বললেন— “আমি জানি নীলাংশু অনেক বড় ভুল করেছে। সত্যি কথা বলতে, তোকে আমি এই কথাটাও বলতে পারব না যে, তুই ওকে ক্ষমা করে দে। তুইও ভুল করেছিস। কিন্তু আমরা তোকে ক্ষমা করে দিয়েছি। আর কেউ জানুক বা না জানুক, তুই খুব ভালোমতো জানিস যে আমি তোকে আর মিষ্টিকে কতটা ভালবাসি। মিষ্টি তো আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেলো। তুইও আমাকে ছেড়ে চলে যাবি? না না তা হবে না। আমার মরা অবধি তুই বাড়িতে অপেক্ষা করবি। তুই আমার কাছে থাকবি। আমার সাথে ঘুমাবি। আমার ঘরে থাকবে পারবি না? মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়ানো বৃদ্ধা মানুষটার অনুরোধটুকু রাখবি না?”
এই কথা শোনার পরে পরিণীতা আর নিজেকে আটকাতে পারে না। মামদিদার কোলে মাথা রেখে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। কোনদিকে যাবে ও? নিজের স্বামী ওকে ধোকা দিয়েছে। মেয়েটা এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে। আর আজকে এই মানুষটাকে, যাকে ও এই পরিবারে সবার থেকে বেশি ভালবাসে, সেই মানুষটাও মৃত্যুর কথা বলছে। পারল না নিজেকে সামলাতে। কাঁদতে কাঁদতেই কোনওরকমে বলল— “যাব না ঠাম তোমাকে ছেড়ে আমি যাব না।”
পরিণীতার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে মামদিদা বললেন— “এই তো আমার সোনা নাতনী। আজ থেকে তুই আমার নাতনী। নাত বউ নয়।”
সবাই যে যার ঘরে চলে যায়। নীলাংশুও চুপচাপ নিজের ঘরে চলে যায়। কিন্তু ওর চোখ হাজারও কথা বলে যায় পরিণীতাকে। পরিণীতাও বুঝতে পারে জে নীলাংশু ওকে কি বলতে চায়। কিন্তু ওর আর মন এই সমস্ত কিছু আর শুনতে চায় না। তাই ও উঠে মামদিদার ঘরে চলে যায়।
রাত্রিবেলা বিছানায় শুয়ে মামদিদা পরিণীতার উদ্দেশ্যে বললেন— “একটা কথা বলব শুনবি দিদিভাই?”
“হ্যাঁ ঠাম বলো।”
“আমি ওই উত্তর দিকের ঘরটায় গিয়েছিলাম সেখান থেকে একটা বই নিয়ে এসেছি। একটু আমাকে পড়ে বলবি, ওতে কি লেখা আছে। আমি পড়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পারিনি। তুই যদি একটু সাহায্য করিস, তাহলে সবটা জেনেই আমি এই দুনিয়া ছাড়তে পারব।”
পরিণীতা ওই দুঃখের মধ্যেও একটু কড়া ভাব দেখিয়ে বলল— “আমি পড়তে পারি ঠাম। কিন্তু একটাই কথা, তুমি কোনদিনও আমাকে এইরকমভাবে ছেড়ে যাওয়ার কথা বলবে না। কেউ তো নেই বলো আমার। আমার মেয়েটাও আমাকে ছেড়ে চলে গেল। ছেলেটা আছে। কিন্তু তুমি তো জানো, মিষ্টি আমার কাছে কি ছিল। তাই এভাবে ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলো না।”
“আচ্ছা বেশ তাই হবে। এখন পড়ে শোনা তো।”
পরিণীতা পড়তে শুরু করল---------
“রানীমা আমি এই কাজটা করছি শুধুমাত্র আপনার জন্য আর রাজকুমারী জন্য। আপনাদের আত্মত্যাগ দেখে সত্যিই আমি বলার মতো কোনও ভাষা খুঁজে পাচ্ছিনা। আপনার অনুরোধেই আমি আত্মত্যাগ করছি। আপনাদের দেখেই তো আমি শিখেছি, কেমন করি অন্যের জন্য নিজেকে শেষ করে দিয়েও ভালো থাকা যায়। আমি জানি না। কখনও কাউকে কোনও খারাপ কাজ হওয়া থেকে আটকাতে পারব কিনা জানিনা। কিন্তু আমার কাছে এখন সুযোগ আছে যে, আমি একজনকে হলেও আটকাতে পারব। আর সেটা হল বৈভবী। সেই কারণেই আমি স্বেচ্ছায় দেহ ত্যাগ করে এইখানে আমার আত্মাকে বন্দি বানিয়ে রেখে দেবো। তারপর যেই দিন আপনাদের পরিবারের প্রয়োজন হবে, সেইদিন এই দরজায় যখন বৈভবী বংশধরের রক্তের ছোঁয়া লাগবে খুলে যাবে এই দরজা। তখন আমার আত্মা আপনাদেরকে সাহায্য করবে। একজন আত্মাই পারবে আর একটা আত্মাকে মুক্তি করতে। তার কারণ, জীবিত অবস্থায় বৈভবী ঠিক যতটা ভয়ঙ্কর ছিল, মৃত্যুর পরে তার আত্মা আরও ভয়ংকর হবে। তখন কোনও মানুষের পক্ষে সম্ভব হবে না সেই ভয়ঙ্কর আত্মাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা। সেই মুহূর্তে আরেকটা আত্মার প্রয়োজন হবে ওই অশুভ আত্মাকে আটকানোর জন্য। রাজকুমারী দর্শনার আত্মা ওই দুষ্টু আত্মার সঙ্গে থেকে খারাপ হবে নাকি নিজের ভালোটা বজায় রাখবে, তা আমি জানি না। সেই কারণেই আমি আমার আত্মাকে অত্যন্ত শুদ্ধভাবে এই ঘরে বন্ধ করে রাখব। আপনি অত্যন্ত বিচক্ষণ একজন মানুষ। তাই আমি জানি, আপনার উত্তর পুরুষদেরকে আপনি নির্দেশ দিয়ে যাবেন যে, প্রয়োজন না পড়লে, মানে বৈভবী আত্মা মুক্তি না পেলে, তার বংশধরদের রক্ত যেন এই দরজায় লাগানো না হয়। যদি সেই কাজটা হয়ে যায়, তাহলে আমার আত্মা এমনি মুক্তি পেয়ে যাবে। তখন ভবিষ্যতে বৈভবীর আত্মা মুক্তি পেয়ে গেলে আপনারা কিন্তু আর কোনও সুফল পাবেন না। আমি এই জিনিসগুলো আপনাদেরকে আগে বলতে পারতাম না। তার কারণ, এটাই নিয়ম। যাতে আপনারা মানে আপনার উত্তর পুরুষরা আমাকে ভুল না বোঝে, তাই সমস্ত কিছু আমি লিপিবদ্ধ করে গেলাম। এই ঘর থেকে এই বিধি করতে করতে আমি বেরোতে পারব না। এইদিকে বিধির শেষ হয়ে গেলে, আমাকে মৃত্যুবরণ করতে হবে। তাই এই দরজা যেইদিন খোলা হবে, সেই দিনই সমস্ত সত্যিটা এই লিপিবদ্ধ অক্ষর গুলো থেকে জানতে পারবেন।
আর একটা কথা, যেইদিন বৈভবী আর রাজকুমারী দর্শনার আত্মা মুক্তি পাবে, সেই দিন থেকে ওরা দু’জনে আর একসঙ্গে থাকতে পারবে না। মুক্তি পাওয়ার পরে বৈভবীর আত্মা রাজকুমারী দর্শনার আত্মাকে আর নিজের দখলে রাখতে পারবে না। কেন পারবে না, সেটা লিখতে গেলে এখন অনেক সময়ের প্রয়োজন হবে। বিধি চলাকালীন এতটা সময় আমি বিধি বন্ধ রাখতে পারব না।”
এইটুকুই ছিল। আর কিছুই লেখা ছিল না। পরিণীতা চুপ করতে, মামদিদা বললেন— “তুই আমাকে একটা কথা বল, এখনকার দিনে এমন মানুষ পাওয়া যাবে, যে নিজে অমরত্ব লাভ করার পরে অন্যের ভালোর জন্য তাও আবার এই এত এত বছর পরের মানুষদের জন্য নিজের জীবনটা দিয়ে দেবে। এখন তো বিপদের দিনে মানুষজন কারোর পাশে থাকতে চায় না। সেখানে তন্ত্রগুরু নিজেই জীবনটাই দিয়ে দিলো। আজকে সত্যিই আফসোস হচ্ছে যে, ঐরকম একটা মানুষের সান্নিধ্য আমরা পাইনি। তবে আর একটা দিকটা ভাবলেও ভালো লাগে যে, ঐরকম একটা মানুষ আমাদের জন্য ভেবেছিলেন।
শোন না, আমার শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। একটু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিবি?আজকে আমি তোর কোলে মাথা দিয়ে একটু ঘুমোতে চাই।”
মামদিদার কথামতো পরিণীতা ওনার মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে হাত বোলাতে থাকে। মামদিদা আবারও বললেন— “একটা ঘুম পাড়ানি গান শোনাবি?”
মৃদু কণ্ঠে পরিণীতা একটা ঘুম পাড়ানি গান গাইতে শুরু করে। একসময় নিজেও ঘুমের দেশে চলে যায়। বেশ কিছুক্ষণ একভাবে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিল, তাই হঠাৎ করেই ঘুমটা ভেঙে যায়। তখন ও খেয়াল করে মামদিদার গোটা গা পুরো ঠান্ডা। দু-একবার ডাকে। কিন্তু কোনও সাড়া পায় না। ভয় পেয়ে গিয়ে বাড়ির সমস্ত লোকেদেরকে ডেকে নিয়ে আসে। কিন্তু পরিণীতার ঘুম পাড়ানি গান শুনে মামদিদা সেই যে ঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছেন, সেই ঘুম আর ভাঙ্গে না। সবাইকে কাঁদিয়ে এই বাড়ির পুরো ইতিহাসটা জেনেই বিদায় নিলেন মামদিদা
আবারও একা হয়ে গেল পরিণীতা।
মামদিদার সমস্ত ক্রিয়াকর্ম হয়ে গেলে, পরিণীতা এই সিংহরায় রাজবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাইলে, বাড়ির সবাই মিলে ওর কাছে ক্ষমা চায়। নীলাংশুও ক্ষমা চায়। বলে— “ক্ষমা চাওয়ার মুখ নেই। কিন্তু সত্যি বলছি, আমাদের পরিবারে একের পর এক ঘটনা ঘটে গেছে। এই মুহূর্তে আবার একটা মানুষকে হারানোর মতো অবস্থায় আমরা কেউ নেই।” প্রত্যেকে এমনভাবে কান্নাকাটি শুরু করে যে, তাদের অনুরোধ, এই মায়া ভরা চোখ, সেই কান্নার কাছে হার মানতে বাধ্য হয় পরিণীতা। নীলাংশুকে আবারও নিজের জীবনে গ্রহণ করে। আর নিজের ছেলেকে বুকে টেনে নেয়। কথা দেয় এই বাড়ি ছেড়ে আর কখনও যাবে না।
এইবার আর কোনও ভয় নেই। আর কোনও আত্মার ভয় নিয়ে ওদেরকে বেঁচে থাকতে হবে না। অনেকগুলো প্রাণের বিনিময়ে আজ নিরাপদ হল সিংহরায় রাজপরিবার। বহু বছর ধরে চলে আসা প্রথাগুলোর অবসান হয়। কিন্তু এই সমস্ত কিছু করার জন্য ওদের যে এত বলিদান দিতে হবে, তা হয়তো ওরা স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। ওই গয়নার বাক্সটাকে ওরা রাজবাড়ির ভিতরে একটা গোপন জায়গায় রেখে দেয়। কারণ, ওদের সবার মতে ওটা একটা অভিশপ্ত গয়নার বাক্স। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও বৈভবীর বংশধর জীবিত রইল। সব কিছুর যে শেষ হয়না।
নীলাংশু ওই দরজার কাছেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকে। গুরুদেব আরও কিছু মন্ত্র উচ্চারণ করতে থাকেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওখানে আবারও একটা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যায়। মিনিটখানেক পরে যজ্ঞের আগুন গুরুদেব নিভিয়ে দেন। তারপর চুপচাপ নিজের জায়গায় বসে থাকেন। বাড়ির লোকেরা পরিণীতার জ্ঞান তখনও ফেরাতে পারে না। সবাই কাঁদতে থাকে। যেহেতু ওই চক্রের মধ্যে বাড়ির সব সদস্যদের রাখা হয়েছিল, তাই বাড়ির ছোটরাও আতঙ্কে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। সিংহরায় বাড়িটা যেন একটা শ্মশান ভূমিতে পরিণত হয়ে যায়। শুধু কান্না কান্না আর কান্না......
[ আমার লেখা বইটি তোমরা পাবে #আমাজন আর #ফ্লিপকার্ট থেকে। এই গল্পেও রয়েছে তন্ত্র রয়েছে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া একটা নিষ্পাপ মেয়ের অতৃপ্ত আত্মা। তাকে আটকাতে গেলে দিতে হবে বলিদান। কারণ কখনও কখনও ভালো কিছু করতে গেলে ভালোকে তার দাম দিতে হয় অনেক। গল্পের প্রধান চরিত্র কি বলিদান দেবে বা কতটা ভয়ঙ্কর হবে ওদের জীবন? আছে শঙ্করনাথ তান্ত্রিক। যার সঙ্গে তোমাদের পরিচয় হয়েছে আমার লেখা আগের রহস্য গল্প শোনগড়ের রাজবাড়ি গল্পে। সব মিলিয়ে রহস্য রোমাঞ্চে ভরা এই উপন্যাস "চাঁপাগড়ের অভিশপ্ত জমিদার বাড়ি...। ]
এমন ভাবে বেশ কিছুটা সময় পেরিয়ে যায়। পূর্ব আকাশে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান গুরুদেব। তারপর বাড়ির লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন— “আমার কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। না ভুল বললাম... আমি কিছুই করতে পারিনি। যে ক্ষমতার আমি বড়াই করতাম, যে ক্ষমতার দ্বারা আমি অনেক কঠিন কঠিন সমস্যার সমাধান করেছি, সেই ক্ষমতা আসলে কিছুই না। পারলাম না আমি আপনাদের মেয়েকে বাঁচাতে। আমি বিধিটা ঠিক করেছিলাম। কিন্তু এই বিধিতে হয়তো কোনও সাধারণ আত্মা হলে সহজেই বশ হয়ে যেতো। কিন্তু এই বৈভবীর আত্মা প্রচন্ড শক্তিশালী ছিল। আমার সমস্ত শৃঙ্খল ভেঙে দিয়েছে। শুধুমাত্র আপনাদের কোনও ক্ষতি করতে পারেনি। এই টুকুই যে আমার পাওনা। এই যে সুরক্ষা বলয় আমি তৈরী করেছিলাম, সেটাই শুধুমাত্র সফল হয়েছে। বাকি আমার পুরো প্রক্রিয়া নষ্ট হয়ে গেছে। আর হ্যাঁ, রাজকুমারী দর্শনার আত্মাকে আমি মুক্তি দিয়ে দিয়েছি। ওনার আত্মাকে মুক্তি দেওয়া এমন কোনও কঠিন কাজ ছিল না। আপনাদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার মত মুখ আমার নেই। এক্ষেত্রেও আপনাদেরকে বাঁচালেন তৎকালীন তন্ত্রগুরু।”
এই কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ক্রন্দনরত অবস্থায় মামদিদা বললেন— “তা কেমন করে গুরুদেব?”
কিন্তু এই কথার কোন জবাব না দিয়ে গুরুদেব সেখান থেকে চলে যান।
১০
ওই সুরক্ষা বলয় থেকে বেরিয়ে আসে প্রত্যেকে। ততক্ষণে পরিণীতার জ্ঞান ফিরে এসেছে। কিন্তু ও চোখের সামনে নিজের মেয়ের ঐরকম একটা মৃতদেহ দেখার পরে আবারও জ্ঞান হারায়। সবাই অস্থির হয়ে পড়ে। বুঝতে পারে না কি করবে। এই বয়সে এত কষ্ট আর সহ্য করতে পারছিলেন না মামদিদা। ওনার শরীর অসুস্থ হতে শুরু করে। কোনরকমে উঠে গিয়ে সামনে থাকা একটা চেয়ারে বসে পড়েন। ওনার চোখ দিয়ে জলের ধারা বয়ে চলেছে।
মিষ্টি… এই মেয়েটাকে তিনি খুব ভালবাসতেন খুব। বিয়ে না করে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলে বলে রাগ করেছিলেন। কিন্তু তিনি একবারের জন্য ভাবতে পারেননি রাজকুমারীর মত এই জন্মেও রাজকুমারী মিষ্টিকে নিজের জীবন দিতে হবে। রাজকুমারীই তো। বৈভবীর বংশধরকে তো কেউ কোনও দিনও আলাদা করে কিছু ভাবেনি। তাছাড়া হয়তো রানীর গর্ভ থেকে এই বংশের জন্ম হয়নি। কিন্তু রাজার রক্ত তো রয়েছে শরীরে। এখন রাজা না থাকলেও যেহেতু এটা রাজপরিবার। সেই হিসেব মতো মিষ্টি রাজকুমারী।
এই সমাজ সব সময় মেয়েদেরকে পিছনে সরিয়ে রাখে। কিন্তু অতো বছর আগেও আর আজকেও বারবার মেয়েরা নিজেদেরকে প্রমাণ করে গেছে। রাজকুমারী দর্শনা সেইদিন নিজের প্রাণ দিয়ে সমগ্র বিশ্ববাসীকে রক্ষা করেছিলেন। আর আজকে মিষ্টি নিজের প্রাণ দিল। রাজকুমারী দর্শনার মৃত্যুর সঙ্গে মিষ্টির মৃত্যুর কিছু পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু উপলক্ষ সেই ওই বৈভবী।
মুখের জলের ছিটা দিয়ে নীলাংশুর জ্ঞান ফিরিয়ে আনা হয়। কাঁদতে কাঁদতে সবাই মিষ্টি শেষকৃত্যের আয়োজন করে। আর পরিণীতা সে তো আর নিজের মধ্যেই নেই। যখনই জ্ঞান ফিরছে, তখনই মিষ্টি মিষ্টি করছে। আর সেই মিষ্টি মিষ্টি করতে করতেই জ্ঞান হারাচ্ছে। মুখে তার একটাই কথা, মিষ্টি মিষ্টি আর মিষ্টি...... পরিণীতার বড় জা ওকে সামলাতেই ব্যস্ত। আশাপাশে বেশ কিছু লোকজন জড়ো হয়। কিন্তু তাকে কী বলবেন, কেমন করে কি হয়েছে? তাই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্যই সবার কাছে এইটা বলে দেওয়া হল যে, ছাদ থেকে পা পিছলে মিষ্টি নিচে পড়ে গেছে।
সবাই বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে, মামদিদা ধীরে ধীরে গিয়ে প্রবেশ করেন উত্তর দিকের সেই ঘরটায়। পুরো ফাঁকা ঘরের মাঝখানে একটা যজ্ঞকুণ্ড রয়েছে। আর তার পাশে একটা মানুষের কঙ্কাল পড়ে রয়েছে। যজ্ঞকুণ্ড চারপাশে তন্ত্র সাধনা করলে ঠিক যেইরকম নকশা আঁকা থাকে, বা যেই সব জিনিসপত্র থাকার দরকার, সেই সব কিছু রয়েছে ঘরের ভিতরে। ধুলোবালি ছাড়া আর কিছু নেই। যেখানে আজ একটা জিনিস রেখে দিলে, কাল সেখানে মাকড়সা ফাঁদ পাততে শুরু করে, সেখানে একটা ঘর বছরের পর বছর ধরে বন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে, সেই ঘরে একটা মাকড়সার ফাঁদ পর্যন্ত নেই। কিন্তু এই নিয়ে মামদিদা বেশি মাথা ঘামালেন না। ওনার চোখ দিয়ে তখনও জল গড়িয়ে পড়ছে। তার কারণ, যেই মানুষটাকে তিনি সবথেকে বেশি ভালোবাসতেন, নিজের ছেলে মেয়ে নাতি-নাতনি সবার মধ্যে যাকে তিনি নিজের একদম কাছের করে নিয়েছিলেন, সে তো আর কেউ নয়... সে হলো মিষ্টি।
মিষ্টির সঙ্গে ওনার এতদিন ধরে কাটানো সমস্ত স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে বেড়াতে থাকে। তিনি রয়েছেন ওই নির্দিষ্ট ঘরটায়, কিন্তু ভেবে চলেছেন মিষ্টির কথা। মেয়েটা ওনার কাছ থেকে এই পরিবারের ইতিহাস জানার কত আগ্রহ ছিল। রাজপরিবারের অতীত জানার জন্য কত অনুনয়-বিনয় করত মেয়েটা। আর প্রত্যেকবারেই তিনি একটাই কথা বলছেন “বিয়ে কর সব জানতে পারবি। কেন তুই এরকম করলি মা কেন?” আবারো ডুকরে কেঁদে উঠলেন মামদিদা।
তার শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখটা মুছে ভাল করে তাকাতে দেখলেন, সামনে একটা বই মতো রাখা রয়েছে। দেখেই বোঝা যায় যে এটা অনেক বছরের পুরনো। সামনে গিয়ে ওই বইটা খুললেন। হাত দিতে বোঝা গেল যে, এটা এখনকার বইয়ের কাগজের মত নয়। এটা অনেকটা গাছের পাতার মতো। কিন্তু ওখানে বেশ কিছু কথা লেখা রয়েছে। এই অন্ধকার ঘরটায় সেইসব পড়া সম্ভব নয়। তাই তিনি কোনও রকমে ধুলোটা ঝেড়ে বইটা হাতে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তিনি ঠিক করেন বাড়ির পরিবেশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে, এই বইটা পড়ে দেখবেন।
অপঘাতে মৃত্যু হওয়ার জন্য চার দিনেই মিষ্টির সমস্ত কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়। পাঁচ দিনের মাথায় পরিণীতা বাড়ির সবাইকে বসার ঘরে আসতে অনুরোধ করে। সবাই আসলে ও বলে-------
“তোমাদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ যে, তোমরা আমাকে এত ভালবাসা দিয়েছো। ছোট থেকেই আমি একান্নবর্তী পরিবার পছন্দ করতাম বলে তোমাদের এই পরিবারের এসে আমার খুব আনন্দ হয়েছিল। প্রত্যেকের খেয়াল রাখতে আমার ভালো লাগতো। এতটা শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও কখনো আমার মনে হয়নি যে তোমাদের সবাইকে ছেড়ে আমি বাইরে গিয়ে চাকরি করি। তার কারণ,চাকরি করতে গেলে আমি তোমাদের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে পারতাম না। প্রত্যেকটা মানুষকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। মেজদি আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলেও, আমি তাকেও ভালোবাসি। আমি আমার মেয়েকে খুব ভালোবাসি। হ্যাঁ, এখনো ভালোবাসি। সে নেই জেনেও তাকে আমি ভালোবাসি। সন্তান হারানোর কি কষ্ট সেটা আমি আগেই বুঝেছিলাম। কিন্তু তখন সে বাচ্চাটার আমি মুখ দর্শন পর্যন্ত করিনি। তাই সেই কষ্টটা আমি কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলাম। কিন্তু যে মেয়েটাকে আমি ছোট থেকে এতটা বড় করলাম। সে আমাকে ছেড়ে চলে গেল। এটা আমি মানতে পারছি না। আরো বেশি কষ্ট হচ্ছে আমি তোমাদের সবার কথার অবাধ্য হয়ে ওকে বিয়েটা করতে দেইনি। হয়তো সেইদিন আমি ওকে পালাতে সাহায্য না করলে ওর বিয়েটা হয়ে যেত। যে মেয়েটাকে উচ্চশিক্ষিত করব বলে আমি বিয়ে থেকে পালাতে সাহায্য করেছিলাম, আর সেই মেয়েটাই আজ আমার সঙ্গে নেই। অনেক বড় ভুল করেছি আমি। এই বাড়িতে থাকার কোন যোগ্যতা আমার নেই। অধিকারও নেই। অধিকার নেই এই জন্যই বললাম, তার কারণ যে মানুষটার হাত ধরে এই বাড়িতে আমি প্রবেশ করেছিলাম, সেই মানুষটা আমাকে তো নিজের থেকে বিয়ে করেনি। বাড়ির প্রত্যেকের কথা মত আমাকে বিয়ে করেছিল। যাইহোক, তারপরও সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গিয়েছিল। সে মেনে নিয়েছিল সেই কারণেই মিষ্টির জন্ম হয়েছিল। কিন্তু সে যে আমাকে ধোকা দিয়ে বসে আছে, সেটা আমি আজ এতগুলো বছরের জানতে পারিনি। যদি আমার মেয়েকে আমি সেইদিন পালাতে সাহায্য না করতাম, তাহলে হয়ত ভাবতাম আমার স্বামী আমাকে খুব ভালোবাসে, বিশ্বাস করে। আমিও তো ওকে প্রচন্ড বিশ্বাস করতাম। এইসব পুরোনো কথা তুলে আমি আর কিছু করতে চাই না। তার কারণ দোষ তো আমিও কম করিনি। আজকে আমি বুঝতে পারছি যে, আমি কত বড় ভুল করেছি, তাও নিজের মেয়েকে হারিয়ে। আমি আর বেশি কথায় যেতে চাই না। আমি ভুল করেছি, আবার উল্টোদিকে আমার স্বামী আমাকে ঠকিয়েছে। তাই এই বাড়িতে আমি আর থাকতে চাই না। আমার ছেলেকে নিয়ে আমি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাই। কিন্তু হ্যাঁ, নীলাংশু যদি চায় ওর ছেলেকে ওর কাছে রাখতে পারে। আমি ছেলের দাবিও করব না। তার কারণ, ছেলেটা তো ওরই। কিন্তু আমি এই বাড়িতে আর থাকতে পারব না। তোমাদের কাছে আমার একটাই অনুরোধ। দয়া করে, এই বাড়িতে থাকার জন্য আমাকে আর অনুরোধ করো না।”
নীলাংশু কিছু বলতে যায়, তার আগেই পরিণীতা ওকে বাধা দিয়ে বলে— “তোমাকে আমি দোষ দিচ্ছি না। দোষ দেবও বা কোন মুখে। আমিও তো অন্যায় করেছি। আমি তোমার মেয়েকে শেষ করে দিয়েছি। তাই এই বাড়িতে থাকার অধিকার বা ইচ্ছা কোনটাই নেই আমার। আমি আসছি... তোমরা সবাই ভালো থেকো।”
মামদিদা বললেন— “আমি জানি নীলাংশু অনেক বড় ভুল করেছে। সত্যি কথা বলতে, তোকে আমি এই কথাটাও বলতে পারব না যে, তুই ওকে ক্ষমা করে দে। তুইও ভুল করেছিস। কিন্তু আমরা তোকে ক্ষমা করে দিয়েছি। আর কেউ জানুক বা না জানুক, তুই খুব ভালোমতো জানিস যে আমি তোকে আর মিষ্টিকে কতটা ভালবাসি। মিষ্টি তো আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেলো। তুইও আমাকে ছেড়ে চলে যাবি? না না তা হবে না। আমার মরা অবধি তুই বাড়িতে অপেক্ষা করবি। তুই আমার কাছে থাকবি। আমার সাথে ঘুমাবি। আমার ঘরে থাকবে পারবি না? মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়ানো বৃদ্ধা মানুষটার অনুরোধটুকু রাখবি না?”
এই কথা শোনার পরে পরিণীতা আর নিজেকে আটকাতে পারে না। মামদিদার কোলে মাথা রেখে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। কোনদিকে যাবে ও? নিজের স্বামী ওকে ধোকা দিয়েছে। মেয়েটা এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে। আর আজকে এই মানুষটাকে, যাকে ও এই পরিবারে সবার থেকে বেশি ভালবাসে, সেই মানুষটাও মৃত্যুর কথা বলছে। পারল না নিজেকে সামলাতে। কাঁদতে কাঁদতেই কোনওরকমে বলল— “যাব না ঠাম তোমাকে ছেড়ে আমি যাব না।”
পরিণীতার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে মামদিদা বললেন— “এই তো আমার সোনা নাতনী। আজ থেকে তুই আমার নাতনী। নাত বউ নয়।”
সবাই যে যার ঘরে চলে যায়। নীলাংশুও চুপচাপ নিজের ঘরে চলে যায়। কিন্তু ওর চোখ হাজারও কথা বলে যায় পরিণীতাকে। পরিণীতাও বুঝতে পারে জে নীলাংশু ওকে কি বলতে চায়। কিন্তু ওর আর মন এই সমস্ত কিছু আর শুনতে চায় না। তাই ও উঠে মামদিদার ঘরে চলে যায়।
রাত্রিবেলা বিছানায় শুয়ে মামদিদা পরিণীতার উদ্দেশ্যে বললেন— “একটা কথা বলব শুনবি দিদিভাই?”
“হ্যাঁ ঠাম বলো।”
“আমি ওই উত্তর দিকের ঘরটায় গিয়েছিলাম সেখান থেকে একটা বই নিয়ে এসেছি। একটু আমাকে পড়ে বলবি, ওতে কি লেখা আছে। আমি পড়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পারিনি। তুই যদি একটু সাহায্য করিস, তাহলে সবটা জেনেই আমি এই দুনিয়া ছাড়তে পারব।”
পরিণীতা ওই দুঃখের মধ্যেও একটু কড়া ভাব দেখিয়ে বলল— “আমি পড়তে পারি ঠাম। কিন্তু একটাই কথা, তুমি কোনদিনও আমাকে এইরকমভাবে ছেড়ে যাওয়ার কথা বলবে না। কেউ তো নেই বলো আমার। আমার মেয়েটাও আমাকে ছেড়ে চলে গেল। ছেলেটা আছে। কিন্তু তুমি তো জানো, মিষ্টি আমার কাছে কি ছিল। তাই এভাবে ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলো না।”
“আচ্ছা বেশ তাই হবে। এখন পড়ে শোনা তো।”
পরিণীতা পড়তে শুরু করল---------
“রানীমা আমি এই কাজটা করছি শুধুমাত্র আপনার জন্য আর রাজকুমারী জন্য। আপনাদের আত্মত্যাগ দেখে সত্যিই আমি বলার মতো কোনও ভাষা খুঁজে পাচ্ছিনা। আপনার অনুরোধেই আমি আত্মত্যাগ করছি। আপনাদের দেখেই তো আমি শিখেছি, কেমন করি অন্যের জন্য নিজেকে শেষ করে দিয়েও ভালো থাকা যায়। আমি জানি না। কখনও কাউকে কোনও খারাপ কাজ হওয়া থেকে আটকাতে পারব কিনা জানিনা। কিন্তু আমার কাছে এখন সুযোগ আছে যে, আমি একজনকে হলেও আটকাতে পারব। আর সেটা হল বৈভবী। সেই কারণেই আমি স্বেচ্ছায় দেহ ত্যাগ করে এইখানে আমার আত্মাকে বন্দি বানিয়ে রেখে দেবো। তারপর যেই দিন আপনাদের পরিবারের প্রয়োজন হবে, সেইদিন এই দরজায় যখন বৈভবী বংশধরের রক্তের ছোঁয়া লাগবে খুলে যাবে এই দরজা। তখন আমার আত্মা আপনাদেরকে সাহায্য করবে। একজন আত্মাই পারবে আর একটা আত্মাকে মুক্তি করতে। তার কারণ, জীবিত অবস্থায় বৈভবী ঠিক যতটা ভয়ঙ্কর ছিল, মৃত্যুর পরে তার আত্মা আরও ভয়ংকর হবে। তখন কোনও মানুষের পক্ষে সম্ভব হবে না সেই ভয়ঙ্কর আত্মাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা। সেই মুহূর্তে আরেকটা আত্মার প্রয়োজন হবে ওই অশুভ আত্মাকে আটকানোর জন্য। রাজকুমারী দর্শনার আত্মা ওই দুষ্টু আত্মার সঙ্গে থেকে খারাপ হবে নাকি নিজের ভালোটা বজায় রাখবে, তা আমি জানি না। সেই কারণেই আমি আমার আত্মাকে অত্যন্ত শুদ্ধভাবে এই ঘরে বন্ধ করে রাখব। আপনি অত্যন্ত বিচক্ষণ একজন মানুষ। তাই আমি জানি, আপনার উত্তর পুরুষদেরকে আপনি নির্দেশ দিয়ে যাবেন যে, প্রয়োজন না পড়লে, মানে বৈভবী আত্মা মুক্তি না পেলে, তার বংশধরদের রক্ত যেন এই দরজায় লাগানো না হয়। যদি সেই কাজটা হয়ে যায়, তাহলে আমার আত্মা এমনি মুক্তি পেয়ে যাবে। তখন ভবিষ্যতে বৈভবীর আত্মা মুক্তি পেয়ে গেলে আপনারা কিন্তু আর কোনও সুফল পাবেন না। আমি এই জিনিসগুলো আপনাদেরকে আগে বলতে পারতাম না। তার কারণ, এটাই নিয়ম। যাতে আপনারা মানে আপনার উত্তর পুরুষরা আমাকে ভুল না বোঝে, তাই সমস্ত কিছু আমি লিপিবদ্ধ করে গেলাম। এই ঘর থেকে এই বিধি করতে করতে আমি বেরোতে পারব না। এইদিকে বিধির শেষ হয়ে গেলে, আমাকে মৃত্যুবরণ করতে হবে। তাই এই দরজা যেইদিন খোলা হবে, সেই দিনই সমস্ত সত্যিটা এই লিপিবদ্ধ অক্ষর গুলো থেকে জানতে পারবেন।
আর একটা কথা, যেইদিন বৈভবী আর রাজকুমারী দর্শনার আত্মা মুক্তি পাবে, সেই দিন থেকে ওরা দু’জনে আর একসঙ্গে থাকতে পারবে না। মুক্তি পাওয়ার পরে বৈভবীর আত্মা রাজকুমারী দর্শনার আত্মাকে আর নিজের দখলে রাখতে পারবে না। কেন পারবে না, সেটা লিখতে গেলে এখন অনেক সময়ের প্রয়োজন হবে। বিধি চলাকালীন এতটা সময় আমি বিধি বন্ধ রাখতে পারব না।”
এইটুকুই ছিল। আর কিছুই লেখা ছিল না। পরিণীতা চুপ করতে, মামদিদা বললেন— “তুই আমাকে একটা কথা বল, এখনকার দিনে এমন মানুষ পাওয়া যাবে, যে নিজে অমরত্ব লাভ করার পরে অন্যের ভালোর জন্য তাও আবার এই এত এত বছর পরের মানুষদের জন্য নিজের জীবনটা দিয়ে দেবে। এখন তো বিপদের দিনে মানুষজন কারোর পাশে থাকতে চায় না। সেখানে তন্ত্রগুরু নিজেই জীবনটাই দিয়ে দিলো। আজকে সত্যিই আফসোস হচ্ছে যে, ঐরকম একটা মানুষের সান্নিধ্য আমরা পাইনি। তবে আর একটা দিকটা ভাবলেও ভালো লাগে যে, ঐরকম একটা মানুষ আমাদের জন্য ভেবেছিলেন।
শোন না, আমার শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। একটু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিবি?আজকে আমি তোর কোলে মাথা দিয়ে একটু ঘুমোতে চাই।”
মামদিদার কথামতো পরিণীতা ওনার মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে হাত বোলাতে থাকে। মামদিদা আবারও বললেন— “একটা ঘুম পাড়ানি গান শোনাবি?”
মৃদু কণ্ঠে পরিণীতা একটা ঘুম পাড়ানি গান গাইতে শুরু করে। একসময় নিজেও ঘুমের দেশে চলে যায়। বেশ কিছুক্ষণ একভাবে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিল, তাই হঠাৎ করেই ঘুমটা ভেঙে যায়। তখন ও খেয়াল করে মামদিদার গোটা গা পুরো ঠান্ডা। দু-একবার ডাকে। কিন্তু কোনও সাড়া পায় না। ভয় পেয়ে গিয়ে বাড়ির সমস্ত লোকেদেরকে ডেকে নিয়ে আসে। কিন্তু পরিণীতার ঘুম পাড়ানি গান শুনে মামদিদা সেই যে ঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছেন, সেই ঘুম আর ভাঙ্গে না। সবাইকে কাঁদিয়ে এই বাড়ির পুরো ইতিহাসটা জেনেই বিদায় নিলেন মামদিদা
আবারও একা হয়ে গেল পরিণীতা।
মামদিদার সমস্ত ক্রিয়াকর্ম হয়ে গেলে, পরিণীতা এই সিংহরায় রাজবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাইলে, বাড়ির সবাই মিলে ওর কাছে ক্ষমা চায়। নীলাংশুও ক্ষমা চায়। বলে— “ক্ষমা চাওয়ার মুখ নেই। কিন্তু সত্যি বলছি, আমাদের পরিবারে একের পর এক ঘটনা ঘটে গেছে। এই মুহূর্তে আবার একটা মানুষকে হারানোর মতো অবস্থায় আমরা কেউ নেই।” প্রত্যেকে এমনভাবে কান্নাকাটি শুরু করে যে, তাদের অনুরোধ, এই মায়া ভরা চোখ, সেই কান্নার কাছে হার মানতে বাধ্য হয় পরিণীতা। নীলাংশুকে আবারও নিজের জীবনে গ্রহণ করে। আর নিজের ছেলেকে বুকে টেনে নেয়। কথা দেয় এই বাড়ি ছেড়ে আর কখনও যাবে না।
এইবার আর কোনও ভয় নেই। আর কোনও আত্মার ভয় নিয়ে ওদেরকে বেঁচে থাকতে হবে না। অনেকগুলো প্রাণের বিনিময়ে আজ নিরাপদ হল সিংহরায় রাজপরিবার। বহু বছর ধরে চলে আসা প্রথাগুলোর অবসান হয়। কিন্তু এই সমস্ত কিছু করার জন্য ওদের যে এত বলিদান দিতে হবে, তা হয়তো ওরা স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। ওই গয়নার বাক্সটাকে ওরা রাজবাড়ির ভিতরে একটা গোপন জায়গায় রেখে দেয়। কারণ, ওদের সবার মতে ওটা একটা অভিশপ্ত গয়নার বাক্স। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও বৈভবীর বংশধর জীবিত রইল। সব কিছুর যে শেষ হয়না।
✍মিলন পুরকাইত

