একটা ছ্যাঁকা খাওয়ার গল্প | মিলন পুরকাইত

0


আমার রচিত নতুন গল্প-----

একটা ছ্যাঁকা খাওয়ার গল্প 

 মিলন পুরকাইত

-প্রতিমাসে অন্তত একদিন আমরা অনিমেষের বাড়িতে মদের আসর বসাই। অনিমেষ, পীযূষ, বিনয় আর আমি ত্রিদিব । সবাই আমরা ক্যাপজেমিনিতে চাকরি করি। মাসের এই একটা দিন আমরা পেটে মাল ঢালার পর, আমাদের লাইফের যত ফ্রাস্ট্রেশন রয়েছে সেগুলো নিজেদের মতো করে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করি। আমি, অনিমেষ আর ত্রিদিব এখানকার পুরোনো সদস্য। পীযূষ এই দ্বিতীয়দিন হলো আসছে এখানে।

রাত তখন প্রায় দশটা বাজতে চলেছে। একটু আগেই খাওয়াদাওয়া শেষ করে বসেছি আমরা। প্লাস্টিকের গ্লাসগুলো পাখার হাওয়ায় উড়ে যেতে চায় শুধু। অনিমেষের পকেট থেকে দুটো সিগারেটের প্যাকেট বেরোলো। বিনয় ব্যাগ থেকে বের করলো চানাচুর। মাংসের কড়াই রাখা আছে মাঝখানে। জলজিরা মাখানো শশার প্লেট কড়াই এর পাশে। প্রথম রাউন্ড। চারজন গলায় ঢালার পর একেবারেই সাধারণ অফিস কর্মীদের মতো কথাবার্তা। কাজকর্ম নিয়ে। এরপর দ্বিতীয় রাউন্ড।এক চুমুকে গ্লাস ফাঁকা করার পর অনিমেষ একটা সিগারেট ধরিয়ে বললো -"এই তৃষার কোনো চক্কর চলছে নাকি রে? অনির্বান এর সাথে? "

পীযূষ -" আরে না ভাই ওরা ভালো বন্ধু। "

একথা শুনে বিনয় জিজ্ঞেস করলো -"বন্ধু? ছেলে আর মেয়ে বন্ধুও হয়? বলিস কি? "

আমি চুপ করেই রইলাম।

পীযূষ বললো -" প্রেম ট্রেম নেই ওদের মাঝে। আমি তো শুনেছিলাম, অনির্বানের গার্লফ্রেন্ড আছে ওর এলাকাতে। "

অনিমেষ একটা ব্যঙ্গ মেশানো হাসি হেসে বললো -"প্রেম। হুহ। কথাটার প্রতি বিশ্বাসই উঠে গেছে। " বলে আর এক গ্লাস পেটে চালান করলো। গ্লাস ফাঁকা হতেই আবার সবার গ্লাস ভরতে শুরু করলাম আমি। এরপর পীযূষ -"কি ভাই? ছ্যাঁকা খাওয়া কেস? " বলে নিজের গ্লাসটা মুখের ভিতর উপুড় করলো।

অনিমেষ এবার -"ছাড় ভাই। ওসব কথা তুলে এখন সবার মুড অফ করার কি দরকার। " বলে সিগারেটটায় একটা টান দিয়ে আমার দিকে এগিয়ে দিলো।ওদিক থেকে পীযূষ আর একটা সিগারেট ধরালো। মিউজিকাল চেয়ারের মতো এখানে দুটো সিগারেট ঘুরছে কিন্তু বিনা মিউজিকে। পীযূষ সিগারেটে টান দিয়ে ওটা বিনয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে এক হাতে গ্লাস আর এক হাতে একটুকরো মাংস তুলে নিয়ে বললো -"দাঁড়া ভাই আমার ছ্যাঁকার গল্প শোন তবে। ভাই রে ভাই, এমন ছ্যাঁকা যেনো শত্রুরও না লাগে। " বলে গ্লাসটা আবার উপুড় করলো মুখের ভিতর। তারপর মাংসে কামড় দিয়ে চিবোতে চিবোতে বললো -"তখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি আমি। সেকেন্ড ইয়ার হয়তো। হঠাৎ ফেসবুকে রিকুয়েস্ট আসে ওনার। তো বুঝতেই পারছিস, মেকানিক্যাল পড়া কোনো ছেলেকে কোনো মেয়ে রিকুয়েস্ট পাঠাচ্ছে ব্যপারটা অনেকটা মরুভূমিতে একফোঁটা জল পাওয়ার মতো ব্যপার। কথা শুরু হলো তারপর। যেমন হয়, হাই হ্যালো, বাড়িতে কে আছে কোথায় থাকো, আমি কোথায় থাকি। ধীরে ধীরে কথা বাড়তে থাকলো। আমার প্রিয় নায়িকা কে ওর প্রিয় নায়ক কে থেকে শুরু হয়ে আমার প্রিয় পর্নস্টার ড্যানি ড্যানিয়েল ওর প্রিয় পর্নস্টার জনি সিন্স অব্দিও চলে গিয়েছিলো। হোয়াটসআপ নম্বর দেওয়া নেওয়া, তারপর ফোনে হালকা হালকা কথা বলা থেকে শুরু হয়ে রাত তিনটে পর্যন্ত গভীর কথোপকথনে মগ্ন থাকা। কি না থাকতো সেই কথায়? সিপিএম ভালো না তৃণমূল, বাঙ্গালরা না থাকলে ঘটিরা লংকার ব্যবহার জানতে পারতো কিনা, শুঁটকি যারা খায় তাদেরকে বিয়ার গ্রিলস বলা হবেনা কেনো? ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর একদিন, আমরা দেখা করলাম। ভাই কি বলবো তোকে, ফেসবুক হোয়াটসআপে যেমন দেখেছি তার থেকেও বেশি সুন্দরী। আমি তো রীতিমতো প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি। খোলা চুল, কালো শাড়ি। উফ। ডেডলি একেবারে। তো আমাদের প্রেম শুরু হলো। একদম রাজধানী এক্সপ্রেসের মতো ছুটে চলতে থাকলো। প্রিন্সেপ ঘাটে গিয়ে কোলে মাথা রেখে শোয়া, আশেপাশে লোকজন না থাকলে টুক করে গালে একটা চুমু খেয়ে নেওয়া, একসাথে সিনেমা দেখতে যাওয়া, বিরিয়ানি, মোমো খাওয়া একসাথে। হাত ধরে একসাথে হাঁটতে থাকা। একেবারে মাখো মাখো প্রেম সত্যি বলতে। আমারও তারপর কলেজ ক্যাম্পাসিং থেকে চাকরিটা পাওয়া। সব মিলিয়ে বেশ ভালো সময় চলছিলো। তা তখন প্রায় চাকরির একবছর হয়েছে, একদিন দেখা করলাম প্রিন্সেপ ঘাটে। ও এলো, কিছুক্ষন বসলো আমার পাশে। আমি ওর হাতটা ধরলাম। কিছুক্ষন ধরে বসে রইলাম। ও তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন। তারপর বললো.... " আর বলতে পারলোনা পীযূষ। কেঁদে ফেললো। আমি ওকে শান্ত করানোর জন্য এগিয়ে গেলাম। পিঠে হাত বুলিয়ে বললাম -"কাঁদিস না ভাই কাঁদিস না। আরে ওই মেয়েটা তোর জন্য ছিলোই না ভাই। এখন দেখ তোর কতো সুন্দর সংসার। বৌদি তোকে কতো ভালোবাসে। কাঁদিস না ভাই কাঁদিস না।" পীযূষ হঠাৎ কান্না থামিয়ে আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। কয়েকমুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বললো -" আরে পাগল এটাই ওই মেয়েটা। পুরো কথাটা শুনে নে। সেইদিন বিয়ের প্রপোজাল দিয়েছিলো আমায়। সেইদিন তো আমি খুবই খুশি হয়েছিলাম আনন্দে নাচছিলাম। কিন্তু এখন ওই দিনটার কথা ভাবলেই কেঁদে ফেলি। কেনো যে রাজি হয়েছিলাম।ভাই রে ভাই কি শাসন করে রে ভাই। বলে অফিস থেকে এসে মোজা নাকি এদিক ওদিকে ছুঁড়ে দেওয়া যাবেনা। প্রথমে ধুতে হবে তারপর ওটাকে একজায়গায় শুকোতে দিতে হবে। স্নান করার পর গা মুছে সেই ভেজা গামছা নাকি বিছানাতেও রাখা যাবেনা। ওটা নাকি বাইরে মেলে দিতে হবে। তুই বল ভাই, ভেজা গামছা যদি বিছানার উপর নাই রাখতে পারলে বা মোজা যদি ছুঁড়তেই না পারলে তাহলে ওদের আর কি গুরুত্ব রইলো জীবনে? বলে রাতে শুয়ে শুয়ে ফোন দেখাও যাবেনা। ভাই রে ভাই কতো ক্রাশ ছিলো আমার তাদেরকে একটু দেখতেও দেয়না রে ভাই।এমনকি, এমনকি ভাই শীতকালেও রোজ স্নান করতে পাঠায় জানিস? না করলে বলে খেতে দেবেনা। বাথরুমে গিয়ে এমনি এমনি জল ঢেলে এলেও বুঝে যায়। জানিনা কিভাবে।কার সাথে প্রেম করলাম আর কে বৌ হয়ে এলো। পুরো একদম চেঞ্জড ভাই। এমনকি আমার মা বাবাও ওর সাপোর্টে কথা বলে জানিস? মা বলে, "এতোদিন আমায় জ্বালিয়েছিস। এবার দেখ কতো ধানে কতো চাল।"ভাই রে ভাই জীবনটা তছনছ হয়ে গেলো একেবারে। " বলে আবার ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না শুরু করলো পীযূষ। আমরা একে অপরের দিকে চেয়ে রইলাম। বুঝতে পারছিলাম না কি বলবো। তারপর অনিমেষ বললো -" এই হারামজাদাটাকে এরপর থেকে আর কোনোদিন এই বাড়িতে কেউ আনবিনা। " 

🖋মিলন পুরকাইত 

My Facebook account মিলন পুরকাইত 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)