"প্রেমান্ধতা"
মিলন পুরকাইত
খুব ইচ্ছা ছিলো প্রেম করার, কিন্তু আজ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি। তা বলে প্রেমে যে পড়িনি তা নয়।সমস্যা টা হচ্ছে,প্রেম টা হতে না হতেই, প্রেমিকারা বিভিন্ন অজুহাতে প্রেমটা কেটে দিয়ে অন্য কোনো প্রেমিকের হাত ধরে চলে যেতো।
একটা প্রেম কিন্তু খানিকটা এগিয়েও ছিলো,কিন্তু সেটাও পরে টিকলো না শুধু মাত্র আমার "ক্রনিক ডিসেন্ট্রির" জন্য। ধরো আমি প্রেমিকার সাথে চুটিয়ে বিকেল বেলায় কোনো নির্জন নদীর উপকূলে বোসে প্রেম করছি,বা প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি, সেই সময় হটাৎ পেটে মোচড় দিয়ে "ইয়ে" পেয়েছে,,তাহলে কি করার আছে?ওই প্রেমিকাকে বসিয়ে রেখে। একটু দূরে গিয়ে সেরে আস্তে হবে।সেটা যদি এক আধ দিন হয় তা মানিয়ে নেওয়া যায়,কিন্তু প্রায়ই যদি এমন হয় তাহলে কি সে প্রেম টিকবে?টিকবে না তো? আমার সেই জন্যই অতটা এগিয়ে আসা প্রেমটাও কেটে গেলো।
এছাড়াও আমার অনেক ত্রুটি ছিলো,,যেমন মাথার চুলের স্টাইল, হাঁটার স্টাইল,ওভার লুকিং স্টাইল। পকেট ভর্তি টাকা,পোশাকের স্মার্টনেস,যা আমি নয় সেটা হয়ে দেখানো ইত্যাদি কিছুই আমার ছিলনা। তাছাড়া বাবাকে ভীষণ ভয় পেতাম,বাবার চোখের দিকে তাকালে প্রেম প্রেম ভাবটাই তো ভয়েতে শুকিয়ে যেতো। তা যাই হোক প্রেম টা আর আমার কোনো দিনই করে ওঠেনি।
আমি দেখেছি,যারা প্রেম টাকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছে, তাদের কতো ধৈর্য,সব কিছু শুনে সয়ে প্রেম কে টিকিয়ে রাখাটা একটা বিশেষ গুণ।
পরেশ প্রেম করে বিয়ে করেছে।এই সেদিন ওর সাথে দেখা হয়েছিলো, আমি প্রথমে তো চিনতেই পারিনি। ওই আমাকে দেখে ডাকলো এই "কমল",? আমি পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, আরে এ তো আমাদের পরেশ।বললাম কিরে কেমন আছিস?
পরেশ:- ভালো নেই রে।
কমল:- কেনো কি অসুবিধা?
পরেশ:- প্রথম কথা আমার দুটো দাঁত সামনের, খুলে একদিন পরে গেলো। নিচের একটা দাঁত নড়ছে, ডান দিকের একটা দাঁতে ভীষণ ব্যথা।
তাছাড়া সুগার,প্রেসার এই সব নিয়ে শরীর টা সায় দিচ্ছে না।
কমল:- ছেলে মেয়ে ক টি?তারা কি করছে?
পরেশ:- আমার ছেলে হয়নিরে।দুটি মেয়ে।দুটিরই বিয়ে দিয়েছি।একটা মেয়ে প্রেম করে বিয়ে করেছে। আজ প্রায় বছর পাঁচেক হলো,ওর ও একটা মেয়ে হয়েছে। জামাই তো কিছুই করেনা।প্রায়ই এখানেই থাকে।আর এটা দাও ওটা দাও,এইসব ব্যাপার।
কমল:- তোর বউয়ের শরীর কেমন আছে?
পরেশ:- ভালো নেই। একটা না একটা লেগেই আছে। আর পারছিনা রে।
দু:শালা,প্রেম মানুষে করে,পর জনমে আর প্রেম ই করবো না।
কথায় কথায় বলে আমি তো তোমার সংসারে উড়ে এসে জুড়ে বসিনি।তুমি প্রেম করে বিয়ে করেছো।আমাকে ঠিক রাখাই তোমার কাজ। কি ভুল যে করেছি কমল। আমি বলছি, তোকে,আর জীবনে প্রেম করবোনা কখনো।
কমল:- দ্যাখ পরেশ এই পঁচাত্তর বছর বয়সে তো এটাই মনে হয় স্বাভাবিক। তুই যখন প্রেম কোরতিস,তখন তোর বয়স খুব বেশী হলে তিরিশ হবে ।
এর মধ্যে একদিন অবন্তিকার সাথে দেখা,অবন্তিকা আমার কলেজ মেট।মেয়েটি খুব শান্ত ,ভদ্র, কোমল স্বভাবের।দেখতেও খারাপ নয়,বর্ধিষ্ণু এবং বুনিয়াদি পরিবারের মেয়ে।
একটাই ছেলে, ওর নাম অবন্তিকা রেখেছে,সহিষ্ণু।
বয়স ছেলেটার বারো কি তেরো হবে। ওকে নিয়ে স্কুলে দিতে যাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করলাম কেমন আছিস? মাসীমা মেসোমশাই কেমন আছে? বর্তমানে শুভেন্দুর পোস্টিং কোথায়?
অবন্তিকা :- শুভেন্দু র খবরটা আমি জানিনা,আমাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেছে প্রায় সাত বছর হলো,ও আবার বিয়ে করেছে।
কমল:- আর তুই,তোর কি খবর?
অবন্তিকা আমার আবার খবর,মা, বাবা মারা গেছেন।তার পরে পরেই,এই শোক সংবরণ না করতে পেরে । আর আমি বাবার চাকরী টা পেয়ে গেছি বলে এই যাত্রায় প্রাণে এবং সম্মানে কিছুটা হলেও বেচেঁ আছি।
কমল: কেনো,শুভেন্দু র সাথে তোর ত বহুদিনের প্রেম ছিলো।
অবন্তিকা :- ছিলো, আমি বুঝতে পারিনি,যে ও এতটা চরিত্রহীন,লম্পট ।আমাকে বিয়ে করার পর ও অন্য একটি মেয়ের সাথে প্রেম করে।আমার সহিষ্ণুর বয়স তখন দুই হবে। তারপর ধীরে ধীরে আমার এবং ছেলেটার প্রতি অত্যাচার করতে। শুরু করলো।এই সব চোখে দেখতে না পেরে আমার মা বাবা সেরিব্রাল হয়ে দুজনেই মারা গেলেন। তারপর একদিন আমরা বিবাহ বিচ্ছেদ করে যে যার মতোই আছি,কমল দা।
কারো কারো এই প্রেম সফল হবার পর বিয়ে করে সংসারও করেছে। কিন্তু পারস্পরিক অবিশ্বাস,অশান্তি কে সংগী করে নিয়েই সাংসারিক জীবন কাটছে। কোথাও বা বিবাহ বিচ্ছেদের মতো ঘটনাও ঘটেছে।অবশ্যই সবার ক্ষেত্রে এটা নয়।
বহুজনের বহু এরকম ঘটনা ঘটেছে,ঘটছে,আবার প্রেম করে বিয়ে হয়ে সুখীও হয়েছে প্রচুর।
সব শুনে দেখে জেনে আমি এই কথাই বলবো,প্রেম হচ্ছে একটা স্বর্গীয় ঐশ্বর্য্য।এর প্রতি বিরূপ মনোভাব,অরুচি,বিতৃষ্ণা অবিশ্বাস,প্রতারণা,ঘৃনা থাকা, মোটেও উচিত নয়।
প্রেম এবং সাংসারিক জীবন সম্পূর্ণ আলাদা। প্রেমে কাল্পনিকতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়।স্বপ্ন দেখার শেষ নেই। তার সাথে বাস্তবের সম্পর্ক খুবই কম।
তাই সেই প্রেমিক বা প্রেমিকাকে বিয়ে করলে বাস্তবের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে অসুবিধা হয় প্রচুর। তখনই নানারকম অপ্রিয় ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়।যেমন মহানায়কের জীবনে প্রেম প্রতিষ্ঠা পায়নি।
নির্মল কুমারের জীবনে প্রেম প্রতিষ্ঠা পায়নি।
এঁরা সাংসারিক জীবন খুব কষ্টেই অতিবাহিত করেছেন।এখানে দোষ গুণের বিচারে আমি আসতে চাইছিনা,কারন এটাতো হবেই।
সর্বশেষে আমার অভিজ্ঞতা বলে,প্রকৃত প্রেম জীবনে একবারই আসে,এক প্রেম জীবনে কখনোই দুবার আসেনা।
একটা কথা অবশ্যই মনে রাখা দরকার,প্রেম জীবনকে দেয় ঐশ্বর্য্য,মৃত্যুতে দেয় মহিমা,আর প্রবঞ্চিত কে দেয় কি? তাকে দেয় দাহ।

