গল্পের নাম - ড্যানিয়েল সাহেবের বাড়ি
লেখক - মিলন পুরকাইত
লেখক - মিলন পুরকাইত
ডিসেম্বর মাসের শেষ। বাংলার সমতল থেকে ততদিনে শীত বিদায় নিলেও পাহাড়ে সে তার আধিপত্য ছাড়তে নারাজ। ফলে কলকাতার ভ্যাপসা গরমে অভ্যস্ত বাঙ্গালীগণদের পক্ষে সেই শীত সহ্য করা বেশ কষ্টকর। সঙ্গী সাথী কেউ সঙ্গ না দেওয়ায় একাই রওনা দিলাম পাহাড়ের পথে। গন্তব্য শিমলা। হ্যাঁ, প্রবল শীত জেনেও যাচ্ছি কারণ পাহাড়ের ঠান্ডাটা উপভোগ করতে চাই।
এবার একটু আমার পরিচয়টা আপনাদের জানাই, আমার নাম নির্মল প্রামাণিক। কলকাতার এক নামকরা সংবাদপত্র অফিসে কাজ করি। এখনো বিয়ে করিনি, আর মা-বাবা থাকেন গ্রামের বাড়িতে, তাই কলকাতার ফ্ল্যাটে একাই থাকি। অফিসে অনেকদিনের ছুটি জমা হয়ে গেছিল, তাই ভাবলাম কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে একবার শিমলাটা ঘুরেই আসি। আগের বছর আমার বন্ধুরা সবাই গেছিল, কিন্ত তখন যেহেতু পৌরসভা ভোট ছিল, তাই অফিসে কাজের খুব চাপ থাকায় যেতে পারিনি, তাই এই বছর আমি একাই বেরিয়ে পড়লাম।
হাওড়া থেকে কালকা মেলে চেপে প্রায় দুদিনের পথ অতিক্রম করে কালকায় এসে অবতীর্ণ হলাম। সেখান থেকে টয় ট্রেনে চেপে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় ও একশোটিরও বেশি টানেল পেরিয়ে শিমলায় এসে পদার্পণ করলাম। হােটেল আগে থেকেই বুক করা ছিল, ফলে থাকার জায়গা পেতে সমস্যা হল না।
এতটা পথ যাত্রা করে শরীর ভয়ানক ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, তাই প্রথম দিন হোটেলেই কাটিয়ে দিলাম। কিন্তু এখানকার বাতাস আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য শরীরে যেন নতুন করে শক্তি জোগায়। তাই দ্বিতীয় দিনের প্রাতঃরাশ সেরে গরম বস্ত্র পরিধান করে সকাল সকাল ম্যালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলাম। ম্যালে গিয়ে 'হিমাচল প্রদেশ টুরিসম' এর অফিস থেকে আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরে দেখবার জন্য বাস বুক করলাম পরেরদিনের জন্য।
যে পথ ধরে ম্যালের দিকে যাচ্ছিলাম সেই পথেই কিছুটা যাওয়ার পর একটা খােলা জায়গা চোখে পড়লাে, যার মাঝখান জুড়ে অবস্থান করছে একটি পােড়াে ভগ্নপ্রায় বাড়ি। দেখে বেশ পুরােনাে বলেই মনে হলাে বাড়িটাকে। বাড়িটার জানলাগুলোর কপাট ভাঙা, সামনের প্রবেশদ্বারটিও দেওয়াল থেকে ঝুলে রয়েছে। বাড়িটার জায়গায় জায়গায় আগাছা গজিয়েছে এবং তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি প্রায় ভেঙে পড়বার উপক্রমও হয়েছে। বাগানটির মাঝখানে রয়েছে একটি ভাঙা ফোয়ারা, আর তারপাশে রয়েছে একটি বেঁকে যাওয়া পাইন গাছ। বাড়িটা এবং তার আশেপাশের পরিবেশটা যে কোনাে ভুতুড়ে সিনেমা শ্যুট করার পক্ষ্যে আদর্শ। বাড়িটির দেওয়ালের এক জায়গায় একটা বোর্ড চোখে পড়লাে। তাতে লেখা, হিমাচলপ্রদেশ সরকারের তরফ থেকে এই বাড়ি এবং তার প্রাঙ্গনে প্রবেশের জন্য নিষেধ করা হচ্ছে।
নোটিশ বোর্ডটা দেখার পর থেকেই নানান প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, যেমন -
বাড়িটার অবস্থা এতটাও খারাপ না, যে সেটা ভেঙে পড়বে, তাহলে বাড়িতে এবং তার প্রাঙ্গনে প্রবেশ নিষেধ কেন? কে থাকে ঐ বাড়িতে? কোন সরকারী অফিস কি? কিন্ত সেটা হলেও তো ঐ রকম কোন নোটিশ থাকার কথা না, তাহলে?
পরের দিন গাড়িতে করে প্রায় পুরাে শিমলা ঘুরতে ফিরতে কেটে গেল। ভ্ৰমনান্তে গাড়িটি যখন তার অন্তিম ঠিকানায় এসে পৌছালাে তখন রাত প্রায় দশটা। পাহাড়ের নিদারুন শীতল পরিবেশে এটা প্রায় গভীর রাত বলা যেতে পারে। ফিরতে হয়তাে এত দেরি হতাে না যদি না মাঝপথে রাস্তায় ধস নামতাে।
হোটেলে যাওয়ার রাস্তাটা প্রায় জনশূন্য। আশপাশের কয়েকটি হোটেল ছাড়া বাকি বাড়িগুলোতে ততক্ষণে আলো নিভে গেছে। রাস্তার ধারে হাতে গোনা দু-একটা দোকান আধখােলা অবস্থায় আছে। আর সাথে আছে হাড় কাঁপানাে শীত। দাঁতে দাঁত লেগে যে কড় কড় শব্দ হচ্ছে তা এই নিঝুম পরিবেশে বেশ ভালাে মতােই বােঝা যাচ্ছে।
হােটেলে ফেরার পথে পুনরায় সেই বাড়িটার সম্মুখীন হলাম। চারিপাশে তাকিয়েও কাউকে খুঁজে পাওয়া গেলাে না। সম্পূর্ণ জনশূন্য স্থান সেটি, তাও স্বাভাবিক ভাবেই বাড়িটি আমার মনের মধ্যে একপ্রকার রােমাঞ্চের সঞ্চার ঘটিয়েছিল। দ্রুতপদে এগিয়ে যাচ্ছিলাম হোটেলের দিকে, আসলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হােটেলে ঢুকে নিজেকে লেপের তলায় আত্মসমর্পণের জন্য। শিমলার ঠান্ডায় হাত পা অবশ হয়ে আসছে। বাড়িটার কাছাকাছি আসতে সেটার দিকে একবার দৃষ্টিপাত করলাম, বাড়িটার যা অবস্থা তাতে সেখানে কারুর থাকার তাে কথা না, কিন্তু তা সত্ত্বেও বাড়িটির দোতলার জানলায় হলুদ আলাের একটা হালকা আভা দেখতে পেলাম এবং সেই আলােয় চোখে পড়লাে একটা মানুষের ছায়া।
ঠাণ্ডা ততক্ষণে আমাকে প্রায় কাবু করে ফেলেছে, তাই কে ওই বাড়িতে এইমুহুর্তে আছে, সেই কৌতূহল প্রকাশ করার ইচ্ছাটা নিজের মধ্যে আর খুঁজে পেলাম না, তাই আরো দ্রুতপদে হোটেলের দিকে পা বাড়ালাম।
পরদিন ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেলাে, তাই ঠিক করলাম যে আজ কেবল পাহাড়ের ওপরের হনুমান মন্দির অর্থাৎ ঝাকু টেম্পল থেকে ঘুরে আসবাে। রেডি হয়ে হোটেলের বাইরে আসলাম সকালের খাবারের জন্য। হাঁটতে হাঁটতে এসে উপস্থিত হলাম সেই পােড়াে বাড়িটার সামনে। দেখলাম বাড়িটার উল্টোদিকের রাস্তায় একটি মােমাের দোকান বসেছে। পাহাড়ে এসে থেকে এখনো মোমো খেয়ে ওঠা হয়নি, তাই ঠিক করলাম ঐ দোকান থেকেই সকালের ব্রেকফাস্ট করে নেব। আর সব থেকে বড় কথা দোকানটা একজন বাঙালির, তাই বাঙালির দোকানে খাওয়ার লোভ আর ছাড়তে পারলাম না।
মােমাে এমনিতেই আমার বেশ প্রিয় খাবার, কিন্তু এখানে বেশিরভাগ মানুষ শাখাহারি হওয়ায় চিকেন মােমাে পাওয়া গেলাে না, ভেজ মোমো দিয়েই কাজ চালাতে হলাে। যদিও এখানকার ভেজ মােমাে কলকাতার মোমো এর তুলনায় অনেক সস্তা, চল্লিশ টাকায় আট পিস, সাথে আবার লাল আর সবুজ চাটনি দেয়।
মােমাের প্লেট হাতে নিয়ে সেই বাড়িটার দিকে তাকালাম। নাঃ, আমারই চোখের কোনাে ভুল হয়েছিল গতকাল রাতে, কারণ এইরকম বাড়িতে কারুর পক্ষ্যে সত্যিই থাকা সম্ভব নয়। হ্যা, হতে পারে কোনাে চোর বা ডাকাত এসে থাকতে পারে গতকাল রাতে। কিন্তু বাইরের দেওয়ালে ঐ বাের্ডটা টাঙানাের কারণ তখনও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তাই খেতে খেতেই দোকানদারকে প্রশ্ন করলাম,
-- ভাই ঐ বাড়িটার ব্যাপারে কিছু জানো? কেউ কি থাকে ঐ বাড়িতে?
প্রশ্নটা শোনা মাত্রই ছেলেটা যেন কেমন চমকে উঠলো, তারপর দোকানের কাজ করতে করতেই জবাব দিল,
-- ওই বাড়িটার ব্যাপারে এখানকার সবাই জানে, এই বাড়িটা ছিল দুই ইংরেজ ভদ্রলােক রবার্ট ও ড্যানিয়েল সাহেবের। তারা দুজনে এই বাড়িটায় থাকতেন। এমনকি স্বাধীনতার পরেও তারা এই বাড়ি ছেড়ে যাননি। দুজনেই বেশ অমায়িক ছিলেন বলে শুনেছি।
-- তা বর্তমানে বাড়িটির এরকম অবস্থা হলাে কি করে?
-- আসলে এর পিছনে একটা গল্প আছে। শােনা যায় রবার্ট ও ড্যানিয়েল সাহেব ছিলেন সমকামী। তারা একে অপরকে খুব ভালােবাসতেন। এক শীতের রাতে রবার্ট কিছু কেনাকাটার উদ্দেশ্য বাইরে যায়, ফিরে এসে দেখে ড্যানিয়েল তার বিছানায় উল্টে পরে আছে, তার পিঠ থেকে একটি ছােড়ার বাট উকি মারছে। ঘরের ভিতরের জিনিসপত্র সব লন্ডভন্ড। বিছানার চাদর রক্তে ভিজে আছে, আর সেই রক্তে ভেজা চাদর থেকে রক্ত গড়িয়ে মেঝেতে পড়ে জমাট বেঁধে আছে। ড্যানিয়েলকে হারানাের শােক সহ্য করতে না পেরে
সেই রাতেই রবার্ট আত্মহত্যা করে। ওই যে হেলে পড়া পাইন গাছটা দেখছেন, ওটার নিচের একটা ডাল থেকে রবার্টের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয় পরেরদিন।
আমি হেলে পড়া পাইন গাছটার দিকে এক ঝলক দেখে নিলাম। এতদিন কোন কিছুই উপলব্ধি হয়নি, কিন্ত আজ ওই গাছটা দেখে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো।
দোকানের ছেলেটি কিছুক্ষণের জন্য বিরতি নিয়ে, আবার বললো,
-- যেহেতু স্বাধীনতার প্রাক্কলেই বেশিরভাগ ইংরেজ স্বদেশে ফিরে গেছিলাে, তাই এই বাড়িটির কোনাে উত্তরাধিকারী ছিল না, ফলে সরকার সেটি অধিগ্রহণ করে নিল। তাই এখন এটি সরকারি সম্পত্তি।
-- তা এতদিন বাড়িটা টিকে আছে কি করে? ভেঙে ফেলেনি কেন সরকার? দেখেও তো কোন সরকারি অফিস বলেও মনে হয়না, তাহলে?
দোকানের ছেলেটা যেন বিদ্রুপের স্বরে বললো,
-- ভেঙে ফেলতে পারলে তাে হয়েই যেত।
-- কেন? না পারার কোনাে কারণ আছে কি?
-- কারণ তো আছে বটেই, তাহলে বলি শুনুন। ওই দুই সাহেবের মৃত্যুর পর বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে, বাড়িটার অবস্থাও ধীরে ধীরে খারাপ হতে শুরু করেছে। সরকার সেটিকে ভেঙে সেখানে একটি সরকারি অফিস গড়ে তােলার উদ্যম নিচ্ছে এমন সময় একটি ঘটনা ঘটে গেল। কয়েকজন ছােকরা নিজেদের মধ্যে শর্ত লাগালাে মাঝরাতে সেই বাড়িতে ঢােকার, ঢুকলােও কিন্তু পরদিন আর বেরিয়ে আসতে পারলাে না। পুলিশ গিয়ে দেখে যে চার চারটে লাশ ঘরের মাঝখানে উপুড় হয়ে পড়ে আছে, সবকটির ঘাড় মটকানাে। এরপর আরো কয়েকজন লুকিয়ে ওই বাড়িতে ঢুকেছিল, কিন্ত কেউ আজ পর্যন্ত বেঁচে ফিরে আসেনি। সেই থেকে একটা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়ে গেছে এখানকার লােকের মনে। সবাই বলে ওই বাড়িতে ড্যানিয়েল ও রবার্টের আত্মা থাকে। লোকের মনে আতঙ্ক এতটাই প্রবল যে, অন্ধকার নামার পর কেউ আর বাড়িটার আশেপাশে ঘেঁষতে চায় না, তাই সরকারও বাড়ির বাইরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বাের্ড টাঙিয়ে দিয়েছে।
দোকানের ছেলের বলা গল্পটা শুনে খুব যে একটা বিশ্বাস হল তা না, আসলে একটা ভূতের বাড়ির সামনে বসে আর যাই হোক কেউ মোমো বিক্রি করতে বসবে না, যদি না সে না জেনে দোকান লাগায়। কিন্ত এই ছেলেটি সব জেনেও এইখানে দোকান দিয়েছে, তার মানে ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। মনের মধ্যেকার কৌতূহল চেপে রাখতে পারলাম না, ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম,
-- তা তুমি যে এখানে বসাে, তােমার ভয় লাগে না?"
-- একদমই না, আজ এক দশক হয়ে গেলাে এখানে মােমাে বেচছি, কিছু হওয়ার হলে কি এতদিনে হয়ে যেত না? আমার মনে হয় ওই বাড়িতে যাই থাকুক না কেন, সে ড্যানিয়েলর আততায়ীকে আজও খুঁজে বেড়াচ্ছে। তাই ওই বাড়ির ভিতরে যে প্রবেশ করে তাকেই ড্যানিয়েলের আততায়ী ভেবে রবার্টের আত্মা খুন করে, তাই আমার মনে হয় ওই বাড়িতে না ঢুকলে কোনাে বিপদই নেই।
আমি আর কথা বাড়ালাম না। মােমাে গুলোও শেষ হয়ে এসেছিল, তাই আমি হাত ধুয়ে দাম মিটিয়ে ম্যালের দিকে পা বাড়ালাম।
মনে মনে ভাবছিলাম একুশ শতকে ভুত? তাও আবার শিমলার মতাে শহরে! বিশ্বাস হলাে না ঠিক। আপনারাই বলুন এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? আমার মনে হয়, এখানকার লােকেরা নিজেদের ও পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্য একরম একটা গল্প ফেদেছে। হয় ওই বাড়িতে কেউ থাকে, নয়ত বা কোন দুষ্কৃতীরা ওই বাড়িটা আশ্রয় বানিয়েছে, নাহলে শুধু শুধু রাতের বেলায় আলাে জ্বলবেই বা কেন? আর কেনই বা একটা মানুষের ছায়া দেখতে পাওয়া যাবে সেখানে। মনে মনে স্থির করলাম একবার বাড়ির ভিতরে গিয়ে দেখবো, সত্যি সত্যিই কেউ থাকে না কি সম্পূর্ণটা আমার চোখের ভুল। আর যদি কেউ ওই বাড়িতে থেকেই থাকে, তাহলে তার থেকে বাড়িটার আরো অজানা ইতিহাস জানা যেতে পারে, যাতে কলকাতায় গিয়েই সংবাদপত্রে এই বাড়িটা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা যায়।
প্রথম থেকেই বাড়িটা মনে এক অজানা কৌতুহল সৃষ্টি করছিল, আর কৌতূহলের মাত্রা যে লেভেলে পৌঁছেছিল, যে সেটাকে আর কোনাে মতেই ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছিল না। কিন্তু মুশকিল হল, সকলের চোখ এড়িয়ে ওই বাড়িতে যেতে হবে, কারণ কেউ দেখে নিলে মুশকিল।
একেতেই পাহাড়ের লোকেরা তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে, আর তারপর আবার শীতের রাত, তাই রাস্তাঘাট আরোই শুনশান। রাত সাড়ে দশটা নাগাদ ডিনার সেরে, হাতে একটা টর্চ নিয়ে হােটেল থেকে বেরােলাম। কনকনে হাড় কাঁপানাে শীত, তাই কান মাথা ভালাে মতাে মুড়ি দিয়ে বেরােতে হয়েছে এই ঠাণ্ডা থেকে নিজেকে বাঁচতে।
বাড়িটার সামনে পৌঁছে একবার আশপাশটা দেখে নিলাম। না, কেউ নেই। গতরাতের সেই জানলাটার দিকে আজ আরো একবার তাকালাম, হ্যা! আজও সেই আবছায়া একটা আলাের আভা সেই জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে। বাড়ির প্রাঙ্গনে প্রবেশের পথটি রুদ্ধ। অগত্যা পাঁচিল টপকেই ঢুকতে হলাে ভিতরে। পাঁচিল টপকে বাগানে প্রবেশ করার পর দেখলাম বাগানের একধারে পাথর দিয়ে উঁচু বেদির মতাে বাঁধানো এক জায়গা। টর্চের আলোটা সেইদিকে ফেলতেই বুঝতে পারলাম সেটি একটি সমাধি। আর সেই প্রথম সমাধিটির পাশে ঐরকম দেখতে আরো একটি সমাধি। বুঝতে পারলাম এই দুটিই হল রবার্ট ও ড্যানিয়েল এর সমাধি। একে তো অন্ধকার, তারউপর কেউ কোথাও নেই, তাই সাময়িক ভয় পেয়ে গেছিলাম ওই সমাধি গুলো দেখে। কিন্ত তখনো যে দেখা বাকি ওই বাড়িতে কে থাকে, তাই একটা ঢােক গিলে নিয়ে, আবারো বাড়িটার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম।
বাগানের রাস্তাটি অনেকদিন পরিষ্কার করা হয়না, তাই আগাছায় পরিপূর্ন। অনেক কষ্টে সব বাধা অতিক্রম করে বাড়ির দুয়ারে এসে উপস্থিত হলাম। দরজার কড়া ধরে নাড়লাম দুবার, কিন্তু কোনাে সাড়া পেলাম না। পুনরায় কড়া নাড়াতে গিয়ে লক্ষ্য করে দেখলাম, দরজাটা ভিতর থেকে লক নেই, অর্থাৎ ভিতরে কেউ আছে। আমি হালকা করে দরজায় ঠেলা দিতেই সেটি শব্দ করে খুলে গেলাে। দরজাটা খোলার সাথে সাথেই ভিতর থেকে একটা ভ্যাপসা গন্ধ আর বাতাস বেরিয়ে আসলো।
ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে কাউকে দেখতে পেলাম না। চারিদিকে নিকষ কালাে অন্ধকার, কেবল সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার পথটাতে একটা হালকা আলাের আভা দেখা যাচ্ছে। শীতের রাত, তবুও অনুভব করলাম যে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠেছে। বাড়িটিতে কেমন একটা আঁশটে, আর স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ। মনেই হচ্ছে অনেক বছর কেউ এই বাড়ির দরজা জানালা খোলে না, তাই এইরকম গন্ধ।
হাতের টর্চটা জ্বালতেই এক ঝাঁক বাদুড় মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল। ঘরটার চারিদিকে ভাঙা আসবাবপত্র ছড়ানাে। বাড়িতে কেউ আছে বলে তাে মনে হচ্ছে না, তবুও একবার হিন্দিতে ডেকেই দেখলাম,
--- কই হ্যায়?
কোনাে উত্তর এলাে না। আবারও একবার ডাকলাম, কিন্ত এবারও কোনাে উত্তর পেলাম না। হঠাৎই কানে এলাে ওপরের ঘরে কেউ পদচারণা করছে, তারমানে ওপরে কেউ নিশ্চই আছে।
সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। প্রতিটা পদক্ষেপে সিড়ির ধাপ গুলি ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে আর্তনাদ করে উঠছিল। কিন্তু ওপরে উঠতেই সেই আবছায়া আলােটা আর দেখতে পেলাম না, যেন ওটা কোন মায়াবী আলো ছিল। এতক্ষণ একটা গা ছমছমে ভাবতাে ছিলােই, কিন্তু এবার যেন ভয়টা একটু বেশিই জাঁকিয়ে বসলাে।
সাথে থাকা টর্চের আলােয় দেখতে পেলাম দোতলার করিডরে চারটে ঘর। তার মধ্যে সিঁড়ির সামনে যে ঘরটা, সেখান থেকেই একটু আগে আলাে দেখা যাচ্ছিল, তারমানে থাকলে এখানেই কেউ থাকবে। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলাম। ঘরের ভিতরে ঢুকে অবাক হতে হলাে, ঘরে কেউ নেই, পুরাে অন্ধকার, কিন্তু কিছুক্ষণ আগেই তাে এখানে আলাে জ্বলতে দেখেছিলাম, তাহলে কি আমি ভুল? তারমানে ওই দোকানদারের তাহলে সত্যি কথাই বলছিল, সত্যিই তাহলে এই বাড়িতে কেউ থাকে না। তবে যে একটা আলো দেখলাম.....
টর্চের আলােয় দেখতে পেলাম ঘরের মাঝেতে একটা ভাঙা বিছানা পরে আছে, আর দেওয়ালে টাঙানো একটা বহু পুরানো তৈল চিত্র। ছবিটিতে ধুলাের এতটাই আস্তরণ পড়েছে যে, মুখ দেখা দায়। কাছে গিয়ে ভালো করে দেখলাম, ছবিটি দুইজন সাহেবের, একে অপরের কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে। মনে মনে ভাবলাম এরাই তাহলে রবার্ট ও ড্যানিয়েল।
মনে মনে ভাবছিলাম যদি দোকানদারের কথা সত্যি হয়, তাহলে তো আর এখানে থাকা যাবে না, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই বাড়ি থেকে বেরােতে হবে। বুকের ভিতরে ইতিমধ্যে নাকারা বাজতে শুরু করে দিয়েছে। তাই আর দেরী না করে বাড়ি থেকে পালানোর চেষ্টা করলাম। টর্চের আলাে ফেলে দ্রুতপদে দরজার কাছে এসে পৌছালাম। দরজা ধরে টান দিলাম, কিন্তু একি! দরজা যে আর খুলতে চায় না। বেশ কয়েকবার জোরে টান মারলাম, লাথি মারলাম কিন্তু কিছুতেই কিছু হলাে না, অগত্যা অন্য পথ খুঁজতে হবে ঠিক করলাম। টর্চ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছি আর কোন জায়গা দিয়ে পালানো যায়, ঠিক এমন সময় টর্চটা নিভে গেল।টর্চের ব্যাটারি তাে নতুন, তাহলে নিভল কি করে? বার কয়েক হাত দিয়ে ঝাঁকা মেরেও টর্চের আলো জ্বালাতে পারলাম না।
এখন কি করি আমি? কিছুই যে দেখতে পাচ্ছি না, কেবল অনুভব করতে পাচ্ছি যে এই শীতেও আমার শরীর ঘামে ভিজে উঠেছে। হঠাৎ কানে এলাে গ্রামােফোন থেকে নির্গত ইংরেজি গানের আওয়াজ। মনে হলাে ওপর থেকেই সেই শব্দ আসছে, আর গানের শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে একটা পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। আর সেই শব্দ যেন ক্রমশ আমার দিকেই এগিয়ে আসছে।
পূর্ণিমার চাঁদ মনে হয় ততক্ষণে মাঝ আকাশে জেগে উঠেছে, তার জোৎস্না আলো সিঁড়ির ঘরের জানলার ছোট একটা ভাঙ্গা অংশ দিয়ে প্রবেশ করছে, আর সেই আলােতে একটি ছায়া মূর্তিকে সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। সাথে সাথেই আমার সারা গায়ে একটা শিহরণ অনুভব করলাম। কখন যে সেই গ্রামোফোনের শব্দ থেমে গেছে খেয়ালই করিনি।
চারিদিকের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে হঠাৎ সেই মূর্তিটি চিৎকার করে বলে উঠলাে,
--- You are a murderer. You killed my friend. Now I will not leave you.
পর মুহূর্তেই দেখলাম সেই মূর্তিটা দ্রুত গতিতে আমার দিকে এগিয়ে আসছে এবং আমি কিছু করে উঠতে যাবার আগেই আমার চারিদিক পুরাে অন্ধকার হয়ে গেল। শুধু শেষ মুহূর্তে এক পলকের জন্য সেই মূর্তির রক্ত চক্ষু আমার দৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল।
দিন পাঁচেক ধরেই বাড়িটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটা পঁচা দুর্গন্ধ পাচ্ছিল স্থানীয় মানুষরা, কিন্তু ভয়ের জন্য কেউ বাড়িটিতে ঢোকার উৎসাহ দেখাচ্ছিল না। মােমােওয়ালাটির অবস্থাও একই। তবুও সে লোকাল পুলিশকে খবর দিলাে। পুলিশ এসে বাড়ির দরজা ভেঙে বাড়িটা থেকে একটা ঘাড় মটকানাে লাশ বার করে নিয়ে আসলো। লাশটিতে ততদিনে পচন ধরেছে, তাও লাশটিকে দেখে মােমােওয়ালাটি চিনতে পারলো। মনে মনে বললাে,
" ঘুরতে এসে অধিক আগ্রহের দাম বেচারাকে নিজের প্রাণ দিয়ে দিতে হলাে"।
লাশটির প্যান্টের পকেটের থেকে মানি ব্যাগ উদ্ধার হল, আর তার সাথেই জানা গেল লাশটির পরিচয়। তার নাম নির্মল প্রামাণিক। কলকাতার এক নামকরা সংবাদপত্র অফিসের সিনিয়র এডিটর।
এবার একটু আমার পরিচয়টা আপনাদের জানাই, আমার নাম নির্মল প্রামাণিক। কলকাতার এক নামকরা সংবাদপত্র অফিসে কাজ করি। এখনো বিয়ে করিনি, আর মা-বাবা থাকেন গ্রামের বাড়িতে, তাই কলকাতার ফ্ল্যাটে একাই থাকি। অফিসে অনেকদিনের ছুটি জমা হয়ে গেছিল, তাই ভাবলাম কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে একবার শিমলাটা ঘুরেই আসি। আগের বছর আমার বন্ধুরা সবাই গেছিল, কিন্ত তখন যেহেতু পৌরসভা ভোট ছিল, তাই অফিসে কাজের খুব চাপ থাকায় যেতে পারিনি, তাই এই বছর আমি একাই বেরিয়ে পড়লাম।
হাওড়া থেকে কালকা মেলে চেপে প্রায় দুদিনের পথ অতিক্রম করে কালকায় এসে অবতীর্ণ হলাম। সেখান থেকে টয় ট্রেনে চেপে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় ও একশোটিরও বেশি টানেল পেরিয়ে শিমলায় এসে পদার্পণ করলাম। হােটেল আগে থেকেই বুক করা ছিল, ফলে থাকার জায়গা পেতে সমস্যা হল না।
এতটা পথ যাত্রা করে শরীর ভয়ানক ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, তাই প্রথম দিন হোটেলেই কাটিয়ে দিলাম। কিন্তু এখানকার বাতাস আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য শরীরে যেন নতুন করে শক্তি জোগায়। তাই দ্বিতীয় দিনের প্রাতঃরাশ সেরে গরম বস্ত্র পরিধান করে সকাল সকাল ম্যালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলাম। ম্যালে গিয়ে 'হিমাচল প্রদেশ টুরিসম' এর অফিস থেকে আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরে দেখবার জন্য বাস বুক করলাম পরেরদিনের জন্য।
যে পথ ধরে ম্যালের দিকে যাচ্ছিলাম সেই পথেই কিছুটা যাওয়ার পর একটা খােলা জায়গা চোখে পড়লাে, যার মাঝখান জুড়ে অবস্থান করছে একটি পােড়াে ভগ্নপ্রায় বাড়ি। দেখে বেশ পুরােনাে বলেই মনে হলাে বাড়িটাকে। বাড়িটার জানলাগুলোর কপাট ভাঙা, সামনের প্রবেশদ্বারটিও দেওয়াল থেকে ঝুলে রয়েছে। বাড়িটার জায়গায় জায়গায় আগাছা গজিয়েছে এবং তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি প্রায় ভেঙে পড়বার উপক্রমও হয়েছে। বাগানটির মাঝখানে রয়েছে একটি ভাঙা ফোয়ারা, আর তারপাশে রয়েছে একটি বেঁকে যাওয়া পাইন গাছ। বাড়িটা এবং তার আশেপাশের পরিবেশটা যে কোনাে ভুতুড়ে সিনেমা শ্যুট করার পক্ষ্যে আদর্শ। বাড়িটির দেওয়ালের এক জায়গায় একটা বোর্ড চোখে পড়লাে। তাতে লেখা, হিমাচলপ্রদেশ সরকারের তরফ থেকে এই বাড়ি এবং তার প্রাঙ্গনে প্রবেশের জন্য নিষেধ করা হচ্ছে।
নোটিশ বোর্ডটা দেখার পর থেকেই নানান প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, যেমন -
বাড়িটার অবস্থা এতটাও খারাপ না, যে সেটা ভেঙে পড়বে, তাহলে বাড়িতে এবং তার প্রাঙ্গনে প্রবেশ নিষেধ কেন? কে থাকে ঐ বাড়িতে? কোন সরকারী অফিস কি? কিন্ত সেটা হলেও তো ঐ রকম কোন নোটিশ থাকার কথা না, তাহলে?
পরের দিন গাড়িতে করে প্রায় পুরাে শিমলা ঘুরতে ফিরতে কেটে গেল। ভ্ৰমনান্তে গাড়িটি যখন তার অন্তিম ঠিকানায় এসে পৌছালাে তখন রাত প্রায় দশটা। পাহাড়ের নিদারুন শীতল পরিবেশে এটা প্রায় গভীর রাত বলা যেতে পারে। ফিরতে হয়তাে এত দেরি হতাে না যদি না মাঝপথে রাস্তায় ধস নামতাে।
হোটেলে যাওয়ার রাস্তাটা প্রায় জনশূন্য। আশপাশের কয়েকটি হোটেল ছাড়া বাকি বাড়িগুলোতে ততক্ষণে আলো নিভে গেছে। রাস্তার ধারে হাতে গোনা দু-একটা দোকান আধখােলা অবস্থায় আছে। আর সাথে আছে হাড় কাঁপানাে শীত। দাঁতে দাঁত লেগে যে কড় কড় শব্দ হচ্ছে তা এই নিঝুম পরিবেশে বেশ ভালাে মতােই বােঝা যাচ্ছে।
হােটেলে ফেরার পথে পুনরায় সেই বাড়িটার সম্মুখীন হলাম। চারিপাশে তাকিয়েও কাউকে খুঁজে পাওয়া গেলাে না। সম্পূর্ণ জনশূন্য স্থান সেটি, তাও স্বাভাবিক ভাবেই বাড়িটি আমার মনের মধ্যে একপ্রকার রােমাঞ্চের সঞ্চার ঘটিয়েছিল। দ্রুতপদে এগিয়ে যাচ্ছিলাম হোটেলের দিকে, আসলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হােটেলে ঢুকে নিজেকে লেপের তলায় আত্মসমর্পণের জন্য। শিমলার ঠান্ডায় হাত পা অবশ হয়ে আসছে। বাড়িটার কাছাকাছি আসতে সেটার দিকে একবার দৃষ্টিপাত করলাম, বাড়িটার যা অবস্থা তাতে সেখানে কারুর থাকার তাে কথা না, কিন্তু তা সত্ত্বেও বাড়িটির দোতলার জানলায় হলুদ আলাের একটা হালকা আভা দেখতে পেলাম এবং সেই আলােয় চোখে পড়লাে একটা মানুষের ছায়া।
ঠাণ্ডা ততক্ষণে আমাকে প্রায় কাবু করে ফেলেছে, তাই কে ওই বাড়িতে এইমুহুর্তে আছে, সেই কৌতূহল প্রকাশ করার ইচ্ছাটা নিজের মধ্যে আর খুঁজে পেলাম না, তাই আরো দ্রুতপদে হোটেলের দিকে পা বাড়ালাম।
পরদিন ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেলাে, তাই ঠিক করলাম যে আজ কেবল পাহাড়ের ওপরের হনুমান মন্দির অর্থাৎ ঝাকু টেম্পল থেকে ঘুরে আসবাে। রেডি হয়ে হোটেলের বাইরে আসলাম সকালের খাবারের জন্য। হাঁটতে হাঁটতে এসে উপস্থিত হলাম সেই পােড়াে বাড়িটার সামনে। দেখলাম বাড়িটার উল্টোদিকের রাস্তায় একটি মােমাের দোকান বসেছে। পাহাড়ে এসে থেকে এখনো মোমো খেয়ে ওঠা হয়নি, তাই ঠিক করলাম ঐ দোকান থেকেই সকালের ব্রেকফাস্ট করে নেব। আর সব থেকে বড় কথা দোকানটা একজন বাঙালির, তাই বাঙালির দোকানে খাওয়ার লোভ আর ছাড়তে পারলাম না।
মােমাে এমনিতেই আমার বেশ প্রিয় খাবার, কিন্তু এখানে বেশিরভাগ মানুষ শাখাহারি হওয়ায় চিকেন মােমাে পাওয়া গেলাে না, ভেজ মোমো দিয়েই কাজ চালাতে হলাে। যদিও এখানকার ভেজ মােমাে কলকাতার মোমো এর তুলনায় অনেক সস্তা, চল্লিশ টাকায় আট পিস, সাথে আবার লাল আর সবুজ চাটনি দেয়।
মােমাের প্লেট হাতে নিয়ে সেই বাড়িটার দিকে তাকালাম। নাঃ, আমারই চোখের কোনাে ভুল হয়েছিল গতকাল রাতে, কারণ এইরকম বাড়িতে কারুর পক্ষ্যে সত্যিই থাকা সম্ভব নয়। হ্যা, হতে পারে কোনাে চোর বা ডাকাত এসে থাকতে পারে গতকাল রাতে। কিন্তু বাইরের দেওয়ালে ঐ বাের্ডটা টাঙানাের কারণ তখনও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তাই খেতে খেতেই দোকানদারকে প্রশ্ন করলাম,
-- ভাই ঐ বাড়িটার ব্যাপারে কিছু জানো? কেউ কি থাকে ঐ বাড়িতে?
প্রশ্নটা শোনা মাত্রই ছেলেটা যেন কেমন চমকে উঠলো, তারপর দোকানের কাজ করতে করতেই জবাব দিল,
-- ওই বাড়িটার ব্যাপারে এখানকার সবাই জানে, এই বাড়িটা ছিল দুই ইংরেজ ভদ্রলােক রবার্ট ও ড্যানিয়েল সাহেবের। তারা দুজনে এই বাড়িটায় থাকতেন। এমনকি স্বাধীনতার পরেও তারা এই বাড়ি ছেড়ে যাননি। দুজনেই বেশ অমায়িক ছিলেন বলে শুনেছি।
-- তা বর্তমানে বাড়িটির এরকম অবস্থা হলাে কি করে?
-- আসলে এর পিছনে একটা গল্প আছে। শােনা যায় রবার্ট ও ড্যানিয়েল সাহেব ছিলেন সমকামী। তারা একে অপরকে খুব ভালােবাসতেন। এক শীতের রাতে রবার্ট কিছু কেনাকাটার উদ্দেশ্য বাইরে যায়, ফিরে এসে দেখে ড্যানিয়েল তার বিছানায় উল্টে পরে আছে, তার পিঠ থেকে একটি ছােড়ার বাট উকি মারছে। ঘরের ভিতরের জিনিসপত্র সব লন্ডভন্ড। বিছানার চাদর রক্তে ভিজে আছে, আর সেই রক্তে ভেজা চাদর থেকে রক্ত গড়িয়ে মেঝেতে পড়ে জমাট বেঁধে আছে। ড্যানিয়েলকে হারানাের শােক সহ্য করতে না পেরে
সেই রাতেই রবার্ট আত্মহত্যা করে। ওই যে হেলে পড়া পাইন গাছটা দেখছেন, ওটার নিচের একটা ডাল থেকে রবার্টের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয় পরেরদিন।
আমি হেলে পড়া পাইন গাছটার দিকে এক ঝলক দেখে নিলাম। এতদিন কোন কিছুই উপলব্ধি হয়নি, কিন্ত আজ ওই গাছটা দেখে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো।
দোকানের ছেলেটি কিছুক্ষণের জন্য বিরতি নিয়ে, আবার বললো,
-- যেহেতু স্বাধীনতার প্রাক্কলেই বেশিরভাগ ইংরেজ স্বদেশে ফিরে গেছিলাে, তাই এই বাড়িটির কোনাে উত্তরাধিকারী ছিল না, ফলে সরকার সেটি অধিগ্রহণ করে নিল। তাই এখন এটি সরকারি সম্পত্তি।
-- তা এতদিন বাড়িটা টিকে আছে কি করে? ভেঙে ফেলেনি কেন সরকার? দেখেও তো কোন সরকারি অফিস বলেও মনে হয়না, তাহলে?
দোকানের ছেলেটা যেন বিদ্রুপের স্বরে বললো,
-- ভেঙে ফেলতে পারলে তাে হয়েই যেত।
-- কেন? না পারার কোনাে কারণ আছে কি?
-- কারণ তো আছে বটেই, তাহলে বলি শুনুন। ওই দুই সাহেবের মৃত্যুর পর বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে, বাড়িটার অবস্থাও ধীরে ধীরে খারাপ হতে শুরু করেছে। সরকার সেটিকে ভেঙে সেখানে একটি সরকারি অফিস গড়ে তােলার উদ্যম নিচ্ছে এমন সময় একটি ঘটনা ঘটে গেল। কয়েকজন ছােকরা নিজেদের মধ্যে শর্ত লাগালাে মাঝরাতে সেই বাড়িতে ঢােকার, ঢুকলােও কিন্তু পরদিন আর বেরিয়ে আসতে পারলাে না। পুলিশ গিয়ে দেখে যে চার চারটে লাশ ঘরের মাঝখানে উপুড় হয়ে পড়ে আছে, সবকটির ঘাড় মটকানাে। এরপর আরো কয়েকজন লুকিয়ে ওই বাড়িতে ঢুকেছিল, কিন্ত কেউ আজ পর্যন্ত বেঁচে ফিরে আসেনি। সেই থেকে একটা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়ে গেছে এখানকার লােকের মনে। সবাই বলে ওই বাড়িতে ড্যানিয়েল ও রবার্টের আত্মা থাকে। লোকের মনে আতঙ্ক এতটাই প্রবল যে, অন্ধকার নামার পর কেউ আর বাড়িটার আশেপাশে ঘেঁষতে চায় না, তাই সরকারও বাড়ির বাইরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বাের্ড টাঙিয়ে দিয়েছে।
দোকানের ছেলের বলা গল্পটা শুনে খুব যে একটা বিশ্বাস হল তা না, আসলে একটা ভূতের বাড়ির সামনে বসে আর যাই হোক কেউ মোমো বিক্রি করতে বসবে না, যদি না সে না জেনে দোকান লাগায়। কিন্ত এই ছেলেটি সব জেনেও এইখানে দোকান দিয়েছে, তার মানে ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। মনের মধ্যেকার কৌতূহল চেপে রাখতে পারলাম না, ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম,
-- তা তুমি যে এখানে বসাে, তােমার ভয় লাগে না?"
-- একদমই না, আজ এক দশক হয়ে গেলাে এখানে মােমাে বেচছি, কিছু হওয়ার হলে কি এতদিনে হয়ে যেত না? আমার মনে হয় ওই বাড়িতে যাই থাকুক না কেন, সে ড্যানিয়েলর আততায়ীকে আজও খুঁজে বেড়াচ্ছে। তাই ওই বাড়ির ভিতরে যে প্রবেশ করে তাকেই ড্যানিয়েলের আততায়ী ভেবে রবার্টের আত্মা খুন করে, তাই আমার মনে হয় ওই বাড়িতে না ঢুকলে কোনাে বিপদই নেই।
আমি আর কথা বাড়ালাম না। মােমাে গুলোও শেষ হয়ে এসেছিল, তাই আমি হাত ধুয়ে দাম মিটিয়ে ম্যালের দিকে পা বাড়ালাম।
মনে মনে ভাবছিলাম একুশ শতকে ভুত? তাও আবার শিমলার মতাে শহরে! বিশ্বাস হলাে না ঠিক। আপনারাই বলুন এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? আমার মনে হয়, এখানকার লােকেরা নিজেদের ও পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্য একরম একটা গল্প ফেদেছে। হয় ওই বাড়িতে কেউ থাকে, নয়ত বা কোন দুষ্কৃতীরা ওই বাড়িটা আশ্রয় বানিয়েছে, নাহলে শুধু শুধু রাতের বেলায় আলাে জ্বলবেই বা কেন? আর কেনই বা একটা মানুষের ছায়া দেখতে পাওয়া যাবে সেখানে। মনে মনে স্থির করলাম একবার বাড়ির ভিতরে গিয়ে দেখবো, সত্যি সত্যিই কেউ থাকে না কি সম্পূর্ণটা আমার চোখের ভুল। আর যদি কেউ ওই বাড়িতে থেকেই থাকে, তাহলে তার থেকে বাড়িটার আরো অজানা ইতিহাস জানা যেতে পারে, যাতে কলকাতায় গিয়েই সংবাদপত্রে এই বাড়িটা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা যায়।
প্রথম থেকেই বাড়িটা মনে এক অজানা কৌতুহল সৃষ্টি করছিল, আর কৌতূহলের মাত্রা যে লেভেলে পৌঁছেছিল, যে সেটাকে আর কোনাে মতেই ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছিল না। কিন্তু মুশকিল হল, সকলের চোখ এড়িয়ে ওই বাড়িতে যেতে হবে, কারণ কেউ দেখে নিলে মুশকিল।
একেতেই পাহাড়ের লোকেরা তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে, আর তারপর আবার শীতের রাত, তাই রাস্তাঘাট আরোই শুনশান। রাত সাড়ে দশটা নাগাদ ডিনার সেরে, হাতে একটা টর্চ নিয়ে হােটেল থেকে বেরােলাম। কনকনে হাড় কাঁপানাে শীত, তাই কান মাথা ভালাে মতাে মুড়ি দিয়ে বেরােতে হয়েছে এই ঠাণ্ডা থেকে নিজেকে বাঁচতে।
বাড়িটার সামনে পৌঁছে একবার আশপাশটা দেখে নিলাম। না, কেউ নেই। গতরাতের সেই জানলাটার দিকে আজ আরো একবার তাকালাম, হ্যা! আজও সেই আবছায়া একটা আলাের আভা সেই জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে। বাড়ির প্রাঙ্গনে প্রবেশের পথটি রুদ্ধ। অগত্যা পাঁচিল টপকেই ঢুকতে হলাে ভিতরে। পাঁচিল টপকে বাগানে প্রবেশ করার পর দেখলাম বাগানের একধারে পাথর দিয়ে উঁচু বেদির মতাে বাঁধানো এক জায়গা। টর্চের আলোটা সেইদিকে ফেলতেই বুঝতে পারলাম সেটি একটি সমাধি। আর সেই প্রথম সমাধিটির পাশে ঐরকম দেখতে আরো একটি সমাধি। বুঝতে পারলাম এই দুটিই হল রবার্ট ও ড্যানিয়েল এর সমাধি। একে তো অন্ধকার, তারউপর কেউ কোথাও নেই, তাই সাময়িক ভয় পেয়ে গেছিলাম ওই সমাধি গুলো দেখে। কিন্ত তখনো যে দেখা বাকি ওই বাড়িতে কে থাকে, তাই একটা ঢােক গিলে নিয়ে, আবারো বাড়িটার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম।
বাগানের রাস্তাটি অনেকদিন পরিষ্কার করা হয়না, তাই আগাছায় পরিপূর্ন। অনেক কষ্টে সব বাধা অতিক্রম করে বাড়ির দুয়ারে এসে উপস্থিত হলাম। দরজার কড়া ধরে নাড়লাম দুবার, কিন্তু কোনাে সাড়া পেলাম না। পুনরায় কড়া নাড়াতে গিয়ে লক্ষ্য করে দেখলাম, দরজাটা ভিতর থেকে লক নেই, অর্থাৎ ভিতরে কেউ আছে। আমি হালকা করে দরজায় ঠেলা দিতেই সেটি শব্দ করে খুলে গেলাে। দরজাটা খোলার সাথে সাথেই ভিতর থেকে একটা ভ্যাপসা গন্ধ আর বাতাস বেরিয়ে আসলো।
ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে কাউকে দেখতে পেলাম না। চারিদিকে নিকষ কালাে অন্ধকার, কেবল সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার পথটাতে একটা হালকা আলাের আভা দেখা যাচ্ছে। শীতের রাত, তবুও অনুভব করলাম যে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠেছে। বাড়িটিতে কেমন একটা আঁশটে, আর স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ। মনেই হচ্ছে অনেক বছর কেউ এই বাড়ির দরজা জানালা খোলে না, তাই এইরকম গন্ধ।
হাতের টর্চটা জ্বালতেই এক ঝাঁক বাদুড় মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল। ঘরটার চারিদিকে ভাঙা আসবাবপত্র ছড়ানাে। বাড়িতে কেউ আছে বলে তাে মনে হচ্ছে না, তবুও একবার হিন্দিতে ডেকেই দেখলাম,
--- কই হ্যায়?
কোনাে উত্তর এলাে না। আবারও একবার ডাকলাম, কিন্ত এবারও কোনাে উত্তর পেলাম না। হঠাৎই কানে এলাে ওপরের ঘরে কেউ পদচারণা করছে, তারমানে ওপরে কেউ নিশ্চই আছে।
সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। প্রতিটা পদক্ষেপে সিড়ির ধাপ গুলি ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে আর্তনাদ করে উঠছিল। কিন্তু ওপরে উঠতেই সেই আবছায়া আলােটা আর দেখতে পেলাম না, যেন ওটা কোন মায়াবী আলো ছিল। এতক্ষণ একটা গা ছমছমে ভাবতাে ছিলােই, কিন্তু এবার যেন ভয়টা একটু বেশিই জাঁকিয়ে বসলাে।
সাথে থাকা টর্চের আলােয় দেখতে পেলাম দোতলার করিডরে চারটে ঘর। তার মধ্যে সিঁড়ির সামনে যে ঘরটা, সেখান থেকেই একটু আগে আলাে দেখা যাচ্ছিল, তারমানে থাকলে এখানেই কেউ থাকবে। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলাম। ঘরের ভিতরে ঢুকে অবাক হতে হলাে, ঘরে কেউ নেই, পুরাে অন্ধকার, কিন্তু কিছুক্ষণ আগেই তাে এখানে আলাে জ্বলতে দেখেছিলাম, তাহলে কি আমি ভুল? তারমানে ওই দোকানদারের তাহলে সত্যি কথাই বলছিল, সত্যিই তাহলে এই বাড়িতে কেউ থাকে না। তবে যে একটা আলো দেখলাম.....
টর্চের আলােয় দেখতে পেলাম ঘরের মাঝেতে একটা ভাঙা বিছানা পরে আছে, আর দেওয়ালে টাঙানো একটা বহু পুরানো তৈল চিত্র। ছবিটিতে ধুলাের এতটাই আস্তরণ পড়েছে যে, মুখ দেখা দায়। কাছে গিয়ে ভালো করে দেখলাম, ছবিটি দুইজন সাহেবের, একে অপরের কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে। মনে মনে ভাবলাম এরাই তাহলে রবার্ট ও ড্যানিয়েল।
মনে মনে ভাবছিলাম যদি দোকানদারের কথা সত্যি হয়, তাহলে তো আর এখানে থাকা যাবে না, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই বাড়ি থেকে বেরােতে হবে। বুকের ভিতরে ইতিমধ্যে নাকারা বাজতে শুরু করে দিয়েছে। তাই আর দেরী না করে বাড়ি থেকে পালানোর চেষ্টা করলাম। টর্চের আলাে ফেলে দ্রুতপদে দরজার কাছে এসে পৌছালাম। দরজা ধরে টান দিলাম, কিন্তু একি! দরজা যে আর খুলতে চায় না। বেশ কয়েকবার জোরে টান মারলাম, লাথি মারলাম কিন্তু কিছুতেই কিছু হলাে না, অগত্যা অন্য পথ খুঁজতে হবে ঠিক করলাম। টর্চ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছি আর কোন জায়গা দিয়ে পালানো যায়, ঠিক এমন সময় টর্চটা নিভে গেল।টর্চের ব্যাটারি তাে নতুন, তাহলে নিভল কি করে? বার কয়েক হাত দিয়ে ঝাঁকা মেরেও টর্চের আলো জ্বালাতে পারলাম না।
এখন কি করি আমি? কিছুই যে দেখতে পাচ্ছি না, কেবল অনুভব করতে পাচ্ছি যে এই শীতেও আমার শরীর ঘামে ভিজে উঠেছে। হঠাৎ কানে এলাে গ্রামােফোন থেকে নির্গত ইংরেজি গানের আওয়াজ। মনে হলাে ওপর থেকেই সেই শব্দ আসছে, আর গানের শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে একটা পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। আর সেই শব্দ যেন ক্রমশ আমার দিকেই এগিয়ে আসছে।
পূর্ণিমার চাঁদ মনে হয় ততক্ষণে মাঝ আকাশে জেগে উঠেছে, তার জোৎস্না আলো সিঁড়ির ঘরের জানলার ছোট একটা ভাঙ্গা অংশ দিয়ে প্রবেশ করছে, আর সেই আলােতে একটি ছায়া মূর্তিকে সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। সাথে সাথেই আমার সারা গায়ে একটা শিহরণ অনুভব করলাম। কখন যে সেই গ্রামোফোনের শব্দ থেমে গেছে খেয়ালই করিনি।
চারিদিকের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে হঠাৎ সেই মূর্তিটি চিৎকার করে বলে উঠলাে,
--- You are a murderer. You killed my friend. Now I will not leave you.
পর মুহূর্তেই দেখলাম সেই মূর্তিটা দ্রুত গতিতে আমার দিকে এগিয়ে আসছে এবং আমি কিছু করে উঠতে যাবার আগেই আমার চারিদিক পুরাে অন্ধকার হয়ে গেল। শুধু শেষ মুহূর্তে এক পলকের জন্য সেই মূর্তির রক্ত চক্ষু আমার দৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল।
দিন পাঁচেক ধরেই বাড়িটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটা পঁচা দুর্গন্ধ পাচ্ছিল স্থানীয় মানুষরা, কিন্তু ভয়ের জন্য কেউ বাড়িটিতে ঢোকার উৎসাহ দেখাচ্ছিল না। মােমােওয়ালাটির অবস্থাও একই। তবুও সে লোকাল পুলিশকে খবর দিলাে। পুলিশ এসে বাড়ির দরজা ভেঙে বাড়িটা থেকে একটা ঘাড় মটকানাে লাশ বার করে নিয়ে আসলো। লাশটিতে ততদিনে পচন ধরেছে, তাও লাশটিকে দেখে মােমােওয়ালাটি চিনতে পারলো। মনে মনে বললাে,
" ঘুরতে এসে অধিক আগ্রহের দাম বেচারাকে নিজের প্রাণ দিয়ে দিতে হলাে"।
লাশটির প্যান্টের পকেটের থেকে মানি ব্যাগ উদ্ধার হল, আর তার সাথেই জানা গেল লাশটির পরিচয়। তার নাম নির্মল প্রামাণিক। কলকাতার এক নামকরা সংবাদপত্র অফিসের সিনিয়র এডিটর।
------ সমাপ্ত -----

