মিলন পুরকাইত -এর লেখা খামখেয়ালী হেঁয়ালি

0
খামখেয়ালী হেঁয়ালি
মিলন পুরকাইত 

গগন সেন তার গাড়িতেই গোয়েন্দা দীপ্তেন বসুকে নিয়ে এলেন তার জ্যাঠামশাইয়ের খেয়ালপুরের বাড়িতে। বেশ অনেকটা জমির ওপর ছড়ানো বাড়ি। সামনে একটা বাগানও আছে। বাড়ির সামনের গেট খুলে কম্পাউন্ডে ঢুকতে ঢুকতে গগন সেন বললেন, ‘আমার জ্যাঠামশাই মানুষটা যেমন খামখেয়ালী ছিলেন তেমনি বাড়িটা বেছে বেছে করেওছিলেন এই খেয়ালপুরে’।
দীপ্তেন তার পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘তা এখন এই বাড়িতে কে কে আছেন?’
গগন সেন বললেন, ‘জ্যাঠামশাইয়ের সেক্রেটারী রণদীপ রায় আছে আর জ্যাঠামশাইয়ের বহু পুরনো চাকর রঘুদা আছে। রণদীপ আজকালের মধ্যেই চলে যাবে বলে আমাকে জানিয়েছে, আর রঘুদা এত পুরনো লোক, তাকে তো আর ফেলে দিতে পারি না। দেখি রঘুদার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। ভাবছি আমার কাছেই নিয়ে গিয়ে রাখব। আমার পাবলিকেশনের অফিসে ওকে একটা পিওনের কাজ দেব ভাবছি, রঘুদা লিখতে পড়তে জানে, তাই পিওনের কাজ করতে ওর অসুবিধে হবে না’।
দুজনে আরেকটু এগোতেই দীপ্তেন দেখল সামনে একজন প্রায় তারই সমবয়সী ব্যক্তি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদেরকে দেখেই তিনি একগাল হেসে এগিয়ে এলেন। তার সামনে আসামাত্র গগন সেন বললেন, ‘এই হল রণদীপ, জ্যাঠামশাইয়ের সেক্রেটারী’। রণদীপ নমস্কার জানালে দীপ্তেনও প্রতিনমস্কার জানালো।

‘আসুন ভেতরে আসুন’, রণদীপ সবাইকে আপ্যায়ন করে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল। বাড়ির ভেতরে ঢুকলেই সামনেই চেয়ার-সোফা আর একটা টেবিলে সাজানো বসার ঘর। এই ঘরলে ঘিরে তিনদিকে আরও তিনটে ঘর রয়েছে। গগনবাবু রণদীপকে উদ্দেশ্য করে দীপ্তেনকে দেখিয়ে বললেন, ‘ইনি দীপ্তেন বসু, প্রাইভেট ইনভেসটিগেটর, আসলে জ্যাঠামশাইয়ের ঐ হেঁয়ালিটা আমার পক্ষে উদ্ধার করা সম্ভব হল না...তাই দীপ্তেনবাবুর সাহায্য চেয়েছি’।
রণদীপ ‘ও আচ্ছা’ বলেই গগনবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘রঘুদার ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্ত নিলেন?’
গগন সেন বললেন, ‘হ্যাঁ রঘুদাকে আমার কাছেই নিয়ে গিয়ে রাখব, আমার প্রকাশনার অফিসেই ওকে একটা পিওনের কাজ দেব’।
রণদীপ হেসে উঠে বললেন, ‘ভেরি গুড, আমি তাহলে দায়মুক্ত, তাহলে আগামীকালই আমি চলে যাব’।

গগন সেন একটু উদাস হয়ে বললেন, ‘আগামীকালই? আমি ভাবছিলাম তুমিও যদি থেকে যেতে, মানে সবই তো জানো আমার প্রকাশনা সংস্থাটা প্রায় ভরাডুবির জায়গায়, আমি চেষ্টা করছি ওটাকে আবার দাঁড় করাতে, তোমার মত চৌখস কাউকে যদি পেতাম...তাই ভাবছিলাম...’, গগনবাবুর কথার মধ্যে বাধা পড়ল কারণ ঘরে উপস্থিত হয়েছেন আরেকজন। রঘু ভেতরে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনাদের জন্য চা নিয়ে আসি বাবু?’
গগন সেন বাকিদের মুখের দিকে তাকালেন, কারও যে চায়ের প্রস্তাবে আপত্তি নেই সেটা বুঝে নিয়ে তিনি রঘুকে বললেন, ‘ঠিক আছে নিয়ে এস, তিনকাপ দুধ চা, আশা করি চায়ে দুধ-চিনিতে কারও আপত্তি নেই?’
রণদীপ আর দীপ্তেন সম্মতি জানাতেই গগনবাবুর নির্দেশ পেয়ে রঘু চা করতে চলে গেল। দীপ্তেন এবার জিজ্ঞেস করল, ‘এই পাশের ঘরগুলোর কোনটা কার?’
রণদীপ বলল, ‘একদম পুবদিকের ঘরটায় আমি থাকি, পশ্চিমদিকের ঘরটা খালি, গগনদা মাঝে মাঝে আসলে ওটাতে থাকতেন, আর ওই উত্তরদিকের ঘরটায় স্যার মানে গগনদার জ্যাঠামশাই অবিনাশবাবু থাকতেন। ওটাই সবচেয়ে বড় ঘর, ওই ঘরেই ওনার আঁকা সব ছবিগুলো দেওয়ালে টাঙানো আছে আর ওই ঘরের সাথেই লাগোয়া একটা ছোট ঘরে আছে ওনার স্টুডিও’।

দীপ্তেন আবার জিজ্ঞেস করল, ‘অবিনাশবাবু মারা গেলেন কিভাবে?’
গগনবাবু বললেন, ‘জ্যাঠামশাইয়ের শরীরটা এমনিতেই লাস্ট কয়েকবছর সেরকম ভালো যাচ্ছিল না। বয়সও হয়েছিল প্রায় পঁচাশি। আগেই দুটো স্ট্রোক হয়ে গিয়েছিল, ডাক্তার কোনওরকম উত্তেজনা থেকে দূরে থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু হঠাত করেই কোনও কারণে সেদিন তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন আর তারপরেই তার আরেকটা স্ট্রোক হয়ে যায়। এটা ছিল প্রাণঘাতী। রণদীপ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তার এনেছিল, কিন্তু ততক্ষণে আর কিছু করার ছিল না। আমি যখন খবর পেয়ে আসি তখন জ্যাঠামশাইয়ের শ্বাস উঠে গেছে। তখনই উনি আমাকে ওই শেষ কথাগুলো বলেন আর তারপরেই সব শেষ’।
গগনবাবুর কথা শেষ হতেই রঘু ট্রে তে করে সবার জন্য চা-বিস্কুট নিয়ে এসে টেবিলে রেখে গেল। দীপ্তেন ভালো করে রঘুর মুখের দিকে লক্ষ্য করল, কেমন যেন একটা অনুতপ্ত ভাব রঘুর মুখে, কিছুটা যেন আশঙ্কাও দেখা যাচ্ছে। রঘু চা রেখে চলে যেতেই দীপ্তেন জিজ্ঞেস করল, ‘রঘুদাকে কেমন যেন অনুতপ্ত বলে মনে হচ্ছে, অন্তত ওর মুখ দেখে তাই মনে হল’।
গগনবাবু বললেন, ‘আমার তা মনে হয় না, তবে হ্যাঁ ও যে একটু নার্ভাস হয়ে আছে তা আমারও মনে হল। ওকে তো এখনও বলিনি যে আমি ওকে আমার সাথে নিয়ে যাবো, ও তাই হয়ত নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই একটু অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে’।

রণদীপ বাকিদের হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়ে নিজেও চায়ের কাপ হাতে তুলে নিয়ে বলল, ‘আসলে আমি সেসময়ে বাড়িতে ছিলাম না। একটু পোস্ট অফিসে গিয়েছিলাম। অবিনাশবাবুরই একটা চিঠি পোস্ট করতে। রঘুদা সেসময় বাগানে কাজ করছিল, অবিনাশবাবুর শরীর খারাপ লাগায় হয়ত তিনি রঘুদাকে ডেকেওছিলেন। বাগানে থাকায় ও শুনতে পায়নি, কারণ আমি যখন মেইন গেট দিয়ে ঢুকে তখন রঘুদাকে কাজ করতে দেখেছি বাগানে। বাড়ির সামনের দরজা খোলা ছিল আমি ঢুকেই দেখি এই বসার ঘরে আমার ঘরের দরজার সামনে উনি বিস্ফারিত চোখে দাঁড়িয়ে আছেন, আর আমাকে দেখেই থরথর করে কাঁপতে শুরু করেন আর তারপরে ওখানেই উনি পড়ে যান। আমি ছুটে গিয়ে তাড়াতাড়ি ওনাকে ধরি, তারপর ওনাকে ওনার ঘরের বিছানায় শুইয়ে দিয়ে রঘুদাকে ভেতরে ঢুকতে বলি আর গগনদাকে কল করেই ছুটি ডাক্তার শুভেন্দু মান্নাকে খবর দিতে। কিন্তু উনি দ্রুত এসেও কিছু করে উঠতে পারেননি। অবিনাশবাবু ডাকা সত্ত্বেও রঘুদা সাড়া দিতে পারেনি, সেই জন্য হয়ত মনে মনে অনুশোচনা হয়েছে তার’।
কথার মাঝেই চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। দীপ্তেন এবার বলল, ‘চলুন অবিনাশবাবুর ঘরটা একবার দেখি’।
তিনজনে উঠে উত্তরদিকের পাশের ঘরে গেলেন। এঘরের একপাশে একটা ছোট খাট আর একটা চেয়ার। দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা কয়েকটা সাদা ক্যানভাস আর দেয়াল জুড়ে একের পর এক হাতে আঁকা ছবির বাঁধানো ক্যানভাস। দীপ্তেন একবার ঘরের লাগোয়া একটা পর্দা সরিয়ে পাশের ঘরের স্টুডিওটাও দেখে এল। সেখানে একটা ক্যানভাস বোর্ড আর কয়েকটা এলোমেলোভাবে রাখা ছবির ক্যানভাস ছাড়া আর কিছু নেই।
দীপ্তেন ফিরে আসতেই গগন সেন বললেন, ‘বছর পাঁচেক হল জ্যাঠামশাই আঁকা ছেড়ে দিয়েছিলেন। শরীর আর দিচ্ছিল না, হাতও কাঁপত। একবার তো নিজের পুরনো সেক্রেটারি অসিতবাবুকে ছাড়িয়েও দিয়েছিলেন, তারপর আবার কি খেয়াল হল আবার সেক্রেটারির জন্য কাগজে বিজ্ঞাপন দিলেন, তখনই ইন্টারভিউ দিয়ে রণদীপ চাকরিটা পায়’।
দীপ্তেন এবার রণদীপের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি কি কাজ করতেন সেক্রেটারী হিসাবে?’

রণদীপ বলল, ‘স্যারের জন্য আর্ট-এর ওপর বিভিন্ন জার্নাল এনে দিতে হত। উনিই নামগুলো বলতেন, আমি আনানোর ব্যবস্থা করতাম। উনি আঁকা থামিয়ে দিলেও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে আর্টের ওপর বিশেষ করে ইন্ডিয়ান আর্ট টেকনিকের ওপর প্রবন্ধ লিখতেন। নিজে তো আর লিখতে পারতেন না, আমাকে ডিকটেশন দিতেন আমি লিখতাম আর টাইপ করে সেগুলোকে উনি যেখান যেখানে মেইল করতে বলতেন সেখানে মেইল করে দিতাম, ই-মেইল এবং পোস্ট মেইল দুটোই করতাম, এছাড়া ব্যাঙ্কের টুকিটাকি কিছু কাজ করতাম আর ওনার সঙ্গে কেউ দেখা করতে চাইলে তাদের এপয়েন্টমেন্ট ফিক্স করে দেওয়া, এইসব আর কি। মাইনেও ভালোই দিতেন, আমি একাজে খুশিই ছিলাম, এখন আবার সব কেঁচে গণ্ডুষ করে নতুন করে শুরু করতে হবে’।
দীপ্তেন এবারে গগনবাবুর দিকে ফিরে বলল, ‘হ্যাঁ এবারে আপনি আরেকবার বলুন তো শেষ সময়ে অবিনাশবাবু আপনাকে কি বলেছিলেন?’
গগনবাবু বললেন, ‘আমাকে দেখেই উনি কাছে ডাকলেন, তারপর বললেন অদৃশ্যে দৃশ্যমান যা সদৃশ্যে তাই বিসদৃশ, তারপর বলেন কাউকে বঞ্চিত কোরো না, তোমাকে দায়িত্ব......, ব্যস এইটুকুই বলতে পেরেছিলেন আর তারপরেই চোখ বুঁজলেন’।
‘আর এর থেকে আপনার মনে হয় যে আপনার জ্যাঠামশাই এই দেয়ালে টাঙানো ছবিগুলোর মধ্যে কোথাও অর্থ বা ধনসম্পদ লুকিয়ে রেখে তার সাংকেতিক নির্দেশ আপনাকে দিয়ে গেছেন?’ দীপ্তেন জানতে চাইলো।
গগনবাবু বললেন, ‘আমার জ্যাঠামশাই মানুষটাই ছিলেন খামখেয়ালী। কথায় কথায় ধাঁধা বলতেন। আর তার ধাঁধাগুলো বেশিরভাগই হত তার আঁকা ছবির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এদিকা ওনার মৃত্যুর পর আমি ব্যাঙ্ক-পোস্টঅফিসেও খোঁজখবর নিয়েছি, কোথাও খুব বেশী টাকাপয়সা নেই। কিন্তু আমি এটা জানি যে ওনার ছবি এখনও ভালো দামে বিক্রি হয়, এছাড়া বিদেশি জার্নালে প্রবন্ধ লিখেও উনি বেশ ভালো টাকাই পেতেন। নিজে অকৃতদার ছিলেন, সেরকম কোনও খরচপাতিও ছিল না, কোনওরকম নেশা নয়, তাহলে সেসব টাকাপয়সা কোথায় যাবে বলুন?’
দীপ্তেন আবার জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি ছাড়া ওনার আর আত্মীয় পরিজন কেউ নেই?’

গগনবাবু মাথা নেড়ে বললেন, ‘না, রক্তের সম্পর্ক বলতে আর কেউ নেই। আমার বাবা-মাও গত হয়েছেন। দূর সম্পর্কের আত্মীয়রা কে কোথায় আছে জানি না। আর এইমুহুর্তে কেউ নেই। তবে জ্যাঠামশাই বিয়ে না করলেও বহু বছর আগে একটি ছেলেকে দত্তক নিয়েছিলেন। এটাও তার আরেক খামখেয়ালীপনা। তারপর সে ছেলে একদিন বাড়ি থেকে টাকা চুরি করে, জ্যাঠামশাই তাকে রেগে গিয়ে খুব মারধোর করেন, সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়, আর কোনওদিন ফেরেনি। সে কোথায় আছে, আদৌ বেঁচে আছে কি না, এসব আর জানি না’।
রণদীপ দুই ভুরুর মাঝে হাত দিয়ে কিছু ভাবছিলেন, দীপ্তেনের নজর গেল তার দিকে, দীপ্তেন একবার সেটা লক্ষ্য করে দেয়ালের ছবিগুলো দেখতে লাগল। সময় নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সে ছবিগুলো দেখতে লাগল। একটা ছবি ভালো করে দেখে সে সরে যেতে গিয়েই থমকে দাঁড়ালো। ছবিটার দিকে আড়াআড়িভাবে চোখ রাখতেই সে অবাক হল। ছবিটা দুইজন লোকের ছবি। একজন বয়স্ক আর অন্যজন তরুণ। এমনিতে আলাদা করে কিছু বোঝা যায় না, কিন্তু আড়াআড়িভাবে ছবিটার দিকে চাইলে তরুণ লোকটির পেছনে আরেকজন লোককে দেখা যায়, যার পোশাক-আশাক কিছুটা অন্যরকম। সামনের লোকদুটির পোশাক আশাক পাশ্চাত্যের ধরণের কিন্তু আড়ালে থাকা লোকটির পোশাক একেবারে বাঙালি বাবুয়ানি পোশাক। দীপ্তেন নিজের মনে মনেই বলল, ‘অদৃশ্যে দৃশ্যমান যা সদৃশ্যে তাই বিসদৃশ’, মনে মনে কথাগুলো আউড়েই দ্রুত ঘরে রাখা চেয়ারটা টেনে নিয়ে তাতে উঠে দ্রুত দেয়াল থেকে ছবিটা টেনে নামালো দীপ্তেন তারপর ঘরে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দুজনকে ছবিটার বৈশিষ্ট বলে ও দেখিয়ে সেটাকে উল্টো করে ধরে তার পেছনের দিকটা পরীক্ষা করতে শুরু করল সে। ছবিটার বাঁধাইটা বেশ মোটা এবং পেছনের দিকে বেশ একটা মোটা খাপ বা প্রকোষ্ঠ যাতের জায়গা রয়েছে, সেটাকে ঢাকতে দেয়ালে কিছুটা ছবিটার সাইজের খোপ করা ছিল, ছবিটা নামাতে সেটা বোঝা গেল। বাঁধাইয়ের ডানদিকে একটা সরু হাতল মত রয়েছে, সেটা ঘোরাতেই প্রকোষ্ঠটা ঘরঘর শব্দে খুলে গেল, কিন্তু দীপ্তেনসহ সবাই অবাক হয়ে দেখল সেটা একদম খালি, তার মধ্যে কিচ্ছু নেই।
গগন সেন বললেন, ‘এটাই ঠিক ছবি তো?’
দীপ্তেন বলল, ‘আলবাত এটাই সেই ছবি’।
গগনবাবু আবার বললেন, ‘তাহলে কি জ্যাঠামশাই আমার সঙ্গে মজা করলেন?’

দীপ্তেন বলল, ‘না, এখানে যে কিছু ছিল তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এর মধ্যে থাকা ধুলো চারদিকে ছড়িয়ে আছে, মাঝখানটা পরিষ্কার। তার মানে এর মধ্যে কোনও সরু বাক্স জাতীয় কিছু ছিল। সেটা ইতিমধ্যেই কেউ বের করে নিয়েছে’।
গগনবাবু ভুরু কুঁচকিয়ে বললেন, ‘কে বের করে নিয়েছে?’
দীপ্তেন সে কথার সরাসরি জবাব না দিয়ে বলল, ‘অবিনাশবাবু এত হেঁয়ালি করে আপনাকে অর্থের সন্ধান দিতে গেলেন কেন?’
গগন সেন একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘আমি তো আগেই বলেছি যে আমার জ্যাঠামশাই একটু খামখেয়ালি মানুষ ছিলেন, তাছাড়া...তাছাড়া আমি একটা সময় একটু বিপথে চলে গিয়েছিলাম। এমনিতেই জ্যাঠামশাই সবসময় বলতেন যে সহজে কোনও কিছু কেউ পেলে তার মূল্য সে বোঝে না, তাই সবসময় সবকিছু যোগ্যতা দিয়ে অর্জন করে নিতে হয়। মাঝে আমি জুয়ার নেশায় আশক্ত হয়ে পড়েছিলাম, এই ব্যাপারটা আমার বাবার মধ্যেও ছিল, তাই হয়ত জ্যাঠামশাই আমার পরীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন। এমনিতেও ওনাকে এটা বোঝাতে আমার বেশ কিছু সময় লেগেছে যে আমি আর আগের মত নেই, এখন আমি একজন বদলে যাওয়া মানুষ। কিন্তু এই ছবির মধ্যে যা ছিল তা নিয়ে নিল কে?’
‘সেদিন অবিনাশবাবু তার শেষ সময়ে যে কথাগুলো আপনাকে বলেছিলেন সেসময় আর কে কে সেই ঘরে ছিল?’ জানতে চাইল দীপ্তেন।
গগন সেন বললেন, ‘ডাক্তার মান্না, রণদীপ আর রঘুদা, এই কয়জনই তো ছিল, আর তো কেউ ছিল না’।
দীপ্তেন এবার রণদীপের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘টাকাগুলো কোথায় রণদীপবাবু?’
রণদীপ অবাক হয়ে বললেন, ‘কিসের টাকা?’
দীপ্তেন বলে উঠল, ‘যেগুলো আপনি এই ছবির মধ্যে থেকে সরিয়েছেন’।
রণদীপ বেশ রাগত গলায় বলল, ‘কোনও কিছু না জেনেই আপনি অনর্থক আমার ওপর আঙুল তুলছেন’।
‘ডাক্তার মান্না বা রঘুদার পক্ষে ওই ছবির মধ্যে লুকানো টাকা নেওয়া সম্ভব নয়, একমাত্র আপনিই ওগুলো সরিয়ে থাকতে পারেন, দেখুন ভালোয় ভালোয় স্বীকার না করলে, আপনার ঘর কিন্তু পুলিশ দিয়ে সার্চ করানো যেতে পারে রণদীপবাবু। তখন কিন্তু আপনি হাতেনাতে ধরা পড়বেন’। চোয়াল শক্ত করে বলল দীপ্তেন।
হঠাত রঘুদা হাউমাউ করে ঘরে ঢুকে পড়ে বলে উঠল, ‘ও কোনও টাকা নেয়নি বাবু, রণদীপ কোনও টাকা নেয়নি’।
দীপ্তেন রঘুদার চোখের দিকে তাকালো, তারপর চোয়াল আরও শক্ত করে বলে উঠল, ‘যদি রণদীপবাবু ওগুলো সরিয়ে না থাকেন তাহলে অত টাকা এর মধ্যে থেকে গেল কোথায়?’
রণদীপ এবার বলে উঠলেন, ‘ওইটুকু খোপের মধ্যে কি কোনও বিরাট অঙ্কের টাকা থাকতে পারে? আপনার কি কোনও কমন সেন্স নেই?’
দীপ্তেন গলা চড়িয়ে বলল, ‘আমার অভিজ্ঞতাকে চ্যালেঞ্জ করছেন আপনি? আমি বলছি ওর মধ্যে বেশ অনেক টাকাই রাখা সম্ভব’।
রণদীপ বললেন, ‘না সম্ভব নয়, ওর মধ্যে টাকা থাকা সম্ভব নয়, আর ছিলও না’।

দীপ্তেন ক্ষেপে উঠে বলল, ‘এখনও বলছি ভালো চান তো ভালোয় ভালোয় টাকাগুলো বের করুন, নইলে আমরা অন্যপথ নিতে বাধ্য হব’।
রণদীপও এবার অসম্ভব উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘বলছি তো ওর মধ্যে টাকা থাকা সম্ভব নয়’।
দীপ্তেন এবার বলে উঠল, ‘যদি টাকা না থাকে তাহলে কি ছিল ওর মধ্যে? আমি বলছি টাকা, টাকা, টাকারই বান্ডিলই ছিল একটা বাক্সের মধ্যে। আর সেটা আপনিই নিয়েছেন’।
রণদীপ এবার আরও উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘না না না, কোনও টাকা ছিল না, বাক্সের মধ্যে কোনও টাকা ছিল না, ছিল তিনটে এন্টিক কয়েন’। বলেই সে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।
দীপ্তেন এবার হেসে বলে উঠল, ‘ওর মধ্যে যে টাকা রাখা সম্ভব নয় তা আমিও জানি, কিন্তু আমি এটাও বুঝেছিলাম যে ওর মধ্যে যা ছিল তা একমাত্র আপনিই নিয়েছেন, সেটা আপনার মুখ দিয়ে স্বীকার করানোর জন্যই টাকা টাকা বলে আপনাকে উত্তেজিত করলাম, আর আপনি নিজে মুখেই স্বীকার করলেন যে বাক্সের মধ্যে এন্টিক কয়েন ছিল, তার মানে তা আপনার কাছেই আছে’।
রণদীপ মাথা নীচু করে থপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। রঘুদা দুই ভুরুর মাঝখানে হাত রেখে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
দীপ্তেন এবার তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি হঠাত রণদীপবাবুর হয়ে ওকালতি করতে শুরু করলে কেন রঘুদা? শুধু তাই নয় তুমি রণদীপকে ঝোঁকের মাথায় তুমি স্তরে সম্বোধন করলে, এর কারণ কি?’
রঘুদা মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আমতা আমতা করতে থাকল কিন্তু স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারল না। দীপ্তেন তখন গগন সেনকে জিজ্ঞেস করল, ‘রঘুদার পরিবার সম্পর্কে কিছু জানেন?’
গগন সেন বলল, ‘যতদূর জানি রঘুদার মেয়ে আর জামাই একটা দুর্ঘটনায় মারা যায়। রঘুদার এক নাতি ছিল বলে শুনেছি, কিন্তু তার সম্বন্ধে আমি কিছু জানি না’।
দীপ্তেন এবার একবার রণদীপ আর একবার রঘুদার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘রণদীপ আর রঘুদার একটা কমন জিনিস দেখলাম, দুজনেই টেনশনে পড়ে গেলে দুই ভুরুর মাঝখানে হাতের আঙুল রেখে চিন্তা করে। এসব বিষয় অনেকসময় জন্মসূত্রে এক জেনারেশন থেকে অন্য জেনারেশনে চলে যায়। মায়ের দিক থেকেও এসব বৈশিষ্ট সন্তানের মধ্যে চলে আসে অনেকসময়। তাই আমি যদি বলি রণদীপই রঘুদার নাতি তাহলে বোধহয় খুব একটা ভুল বলা হবে না’।

গগনবাবু চমকে উঠে দুজনের মুখের দিকে তাকালেন। দীপ্তেন আবার বলল, ‘শুধু তাই নয় রঘুদার মেয়ে-জামাইয়ের মৃত্যুর পর এই রণদীপকেই সম্ভবত দত্তক নিয়েছিলেন অবিনাশবাবু আর সে চুরির দায়ে ধরা পড়ার পর পালিয়ে গেলেও রঘুদার সঙ্গে তার যোগাযোগ ঠিকই ছিল। তাই শেষ বয়সে অবিনাশবাবু যখন আবার সেক্রেটারি খুঁজছিলেন তখন রঘুদার মারফতে খবর পেয়েই রণদীপ আবার অন্য পরিচয়ে এসে হাজির হয়। আর আমার বিশ্বাস রঘুদাই সেদিন রণদীপের আসল পরিচয় অবিনাশবাবুকে জানিয়েছিলেন আর তাতেই উত্তেজিত হয়ে অবিনাশবাবুর হার্ট এটাক হয়, আর সেইজন্যই রঘুদার চেহারায় এত অনুশোচনা আর এত অনুতাপের প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে’।
রঘুদা কেঁদে উঠে বলল, ‘আমি বুঝিনি বাবু, আমি বুঝিনি যে ওই কথা শোনার পর কত্তাবাবুর অমন কান্ড হয়ে যাবে। ঠিক তার আগের দিন সন্ধ্যেবেলায় উকিলবাবু এসেছিলেন, কত্তাবাবু তাকে বলছিলেন যে উনি উইল করে সবকিছু গগনবাবুকে দিয়ে যাবেন, কারণ উনি বিশ্বাস করেন গগনবাবুর অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আমি তখন ভাবি আমি এতবছর কত্তাবাবুর এত সেবা করলাম আর আমার নাতিটা কিছুই পাবে না। তাকে ত কত্তাবাবু দত্তক নিয়েছিলেন, সে তখন চুরি করেওনি, গগনবাবুর বাবা, ছোটকত্তা ইচ্ছে করে টাকা সরিয়ে তার দায় চাপিয়েছিল আমার নাতিটার ঘাড়ে। পরে সেকথা জানতে পেরে কত্তাবাবুর অনুশোচনাও হয়েছিল, তাই আর উপায়ান্তর না দেখে আমি কত্তাবাবুকে রণদীপের আসল পরিচয় জানিয়ে বলেছিলাম ওই আমাদের সেই রুকু। আমি ভেবেছিলাম এটা জানার পর কত্তাবাবু ওকেও তার সম্পত্তির কিছু অংশ দেবেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে উত্তেজিত হয়ে কত্তাবাবু যে প্রাণ হারাবেন তা আমি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি, জানলে ও কথা আমি কখনও বলতাম না, আমার নাতির পরিচয় আমি তাকা জানাতাম না’।
রণদীপ বলল, ‘আমিও কিছুটা লোভে পড়েই অবিনাশবাবুর বলা ওই সঙ্কেতের মর্মোদ্ধার করে গতকালই ওই ছবির পেছন থেকে বাক্সটা পাই। তারপর ওই খোপটা আব্র বন্ধ করে রেখে দিই। বাক্সটা নিয়ে চলে যাবো ভেবেছিলাম। ওটা আমার ঘরেই আছে, আমি গগনদাকে ফেরত দিচ্ছি, শুধু একটাই অনুরোধ আমাকে আর আমার দাদুকে প্লিজ পুলিশের হাতে তুলে দেবেন না’।
দীপ্তেন কিছু বলার আগেই গগনবাবু বললেন, ‘গ্রেপ্তার তোমাদের দুজনকে হতেই হবে, তবে পুলিশের হাতে নয়, আমার হাতে। আমার বাবা যে অপরাধ করেছিলেন তোমার নামে মিথ্যে চুরির দোষ দিয়ে তার প্রায়শ্চিত্ত আমিই করব। আর জ্যাঠামশাইও আমাকে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন কাউকে যেন আমি বঞ্চিত না করি। জ্যাঠামশাই যখন তার সব রোজগারকে ওই তিনটে এন্টিক কয়েনে পরিণত করেছেন তার মানে ওগুলোর মূল্য অনেক। ওগুলোতে আমাদের দুজনেরই অধিকার রয়েছে। আমি এখন সত্যিই বদলে গেছি। রঘুদাকে তো আমার কাছে নিয়েই যাব বলেছিলাম রুকু তুমিও কোথাও যাবে না, আমরা দুজনে মিলেই প্রকাশনাটা আবার নতুন করে দাঁড় করাই। তুমি আর আমি পার্টনার হিসাবে আবার ব্যবসাটা ভালো করে গড়ে তুলি এস ভাই। আর রঘুদা তুমি ভুল করেছ ঠিকই কিন্তু তাতে তোমার দোষ নেই, তুমি যা বলেছ না বুঝে বলেছ তাই তোমার অনুতাপের কোনও কারণ নেই। আর দীপ্তেনবাবু আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ আমাকে এদের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার জন্য, আপনার পারিশ্রমিকের চেক আমি আজই লিখে দেব, চেকবই আমার পকেটেই আছে’।
রণদীপ ছলছল চোখে উঠে গিয়ে গগনবাবুকে প্রণাম করতেই গগনবাবু তাকে দুহাতে জড়িয়ে বুকে টেনে নিলেন। রঘুদা একটু দূরে দাঁড়িয়ে চোখের জল ফেলতে লাগলেন। তবে এই চোখের জল খুশির অশ্রুধারা। দীপ্তেন পাশ থেকে হেসে বলে উঠল, ‘এরকম মধুরেণ সমাপয়েত দেখলে সবসময়েই মনটা ভালো হয়ে যায়’।
মিলন পুরকাইত -এর লেখা খামখেয়ালী হেঁয়ালি

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)