মিলন পুরকাইত -এর রচিত গল্প "আতঙ্ক"

0

আতঙ্ক
মিলন পুরকাইত 

প্রবল ঝড় বৃষ্টি চলেছে অনেক্ষণ ধরে। তারই মধ্যে অনেক কষ্টে গাড়িটা চালাচ্ছে রঞ্জন। একেবারে রাস্তার মাঝপথে এসে গেছে সে। ফিরে যাওয়ারও কোনও উপায় নেই। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে মাধবপুর থেকে আজ না বেরোলেই ভালো হত। কিন্তু রঞ্জন যখন বেরিয়েছিল তখন এতজোরে ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়নি। পথের মধ্যে ঝড় বৃষ্টি প্রবল রূপ ধারণ করেছে। এত জোরে বৃষ্টি হচ্ছে যে দুহাত দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছে না। গাড়ির সামনের কাঁচের ওয়াইপার চালু থাকা সত্ত্বেও বারবার হাত দিয়ে সামনের কাঁচ পরিষ্কার করতে হচ্ছে। সেইসঙ্গে চলছে প্রবল বিদ্যুতের চমক আর মাঝে মাঝেই বাজ পড়ার শব্দ। এই দুর্যোগের মধ্যে এইভাবে বেশিক্ষণ গাড়ি চালানো যায় না।

রঞ্জন ভালো করে দেখতে লাগল আশে পাশে কোনও লোকালয় আছে কি না। হাইওয়েতে থাকায় এমনিতেই লোকালয় থাকার সম্ভাবনা কম। তার উপর এই বৃষ্টিতে ভালো করে কিছু দেখাও যাচ্ছে না। রঞ্জনের মনে হল সে যে কোথায় যাচ্ছে সে নিজেও ভালো করে বুঝতে পারছে না। রঞ্জন কোনমতে গাড়িটা একদিকে সাইড করে নিজের বর্ষাতিটা চড়িয়ে গাড়ি থেকে নামল।

বৃষ্টিতে ভালো করে কিছু ঠাওর করা যাচ্ছে না। তাও অসহায় অবস্থায় রঞ্জন বাঁদিকে একটু এগিয়ে গিয়ে দেখার চেষ্টা করল কোনও জনবসতি দেখা যায় কি না। হঠাৎ একটা বিদ্যুতের ঝলকানি ঝলসে উঠল। বিদ্যুতের চমকে রঞ্জনের মনে হল সামনে একটা গেট জাতীয় কিছু দেখা গেল। রঞ্জন গাড়ি থেকে নামার সময়েই একটা টর্চ হাতে নিয়ে নেমেছিল। বেশ বড় পাওয়ারের টর্চ। এবার টর্চটা জ্বালাতে সামনে একটু দূরে একটা কিছু দেখা গেল। যদিও বৃষ্টির কারণে সেটা খুব স্পষ্ট নয়। খুব সাবধানে পা ফেলে রঞ্জন সেই দিকে এগিয়ে গেল। জিনিসটার কাছকাছি আসার পর রঞ্জন স্পষ্ট বুঝতে পারল সেটা একটা বড় লোহার গেট। 

গেটের ওপর টর্চের আলো ফেলল রঞ্জন। গেটের ওপর দিকে একটা বোর্ড রয়েছে। বোর্ডে শুধু জমিদারবাড়ি শব্দটা পড়া যাচ্ছে। তার ওপরে কিছু একটা লেখা রয়েছে যেটা পড়া যাচ্ছে না। অক্ষরগুলো মরচেতে ঢেকে গেছে তার ওপর এই বৃষ্টিতে ভালো করে কিছু দেখা যাচ্ছে না। রঞ্জন দেখল গেটটা একটু ভাঙা। তালাটালা কিছু নেই। রঞ্জন নিজের বর্ষাতির টুপিটা আরও ভালোভাবে মাথায় এঁটে নিয়ে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে রঞ্জন তাড়াতাড়ি হাঁটছিল কিন্তু সাবধানে। 

বৃষ্টিতে চারিদিক বেশ পিছল হয়ে রয়েছে তার ওপর আশেপাশে ভালো করে টর্চ ফেলে এগোচ্ছিল রঞ্জন। সাপখোপ থাকতেই পারে। তাই সাবধানে গেটের সামনের রাস্তাটা পেরিয়ে মূল বাড়ি পর্যন্ত পৌছতে কিছুটা সময় লাগল রঞ্জনের। বাড়িটার সামনে একটা বড় গাড়ি বারান্দা জাতীয় চাতাল। রঞ্জন সেই চাতালে ঢুকে বর্ষাতির টুপিটা খুলে ফেলল। তারপর এগিয়ে গেল ভেতরের দরজার দিকে। দরজার পাল্লাটাও নড়বড়ে। একটা পুরনো তালা অবশ্য ঝুলছে কিন্তু সেটাও বেশ পুরনো ঝুরঝুরে। রঞ্জন একটু ইতস্তত করল। অন্যের সম্পত্তিতে এভাবে ঢুকে আসা কতটা আইনসম্মত এটা প্রথমেই মনে হল রঞ্জনের। তারপর ভাবল বাড়িটা সম্ভবত পরিত্যক্ত। তাই এই বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে ভেতরে ঢুকতে অসুবিধা নেই। সে তো চুরি ডাকাতি করছে না। ঝুরঝুরে আর প্রায় ভাঙতে বসা তালাটায় নিজের হাতের শক্ত টর্চ দিয়ে দু’তিনটে বাড়ি মারতেই তালাটা ঠাস করে খসে পড়ে গেল। দরজার পাল্লা দুটো ঠেলতে অবশ্য কিছুটা বেগ পেতে হল রঞ্জনকে কারণ পুরু মাকড়সার জাল দরজাকে নিজের মত করে যেন সিল করে রেখছে। মাকড়সার জাল ছিঁড়ে ভেতরে ঢুকতে কিছুটা সময় লাগল রঞ্জনের।

বাইরেতে যতটা জঞ্জাল, মাকড়সার জাল রয়েছে ভেতরে প্রবেশ করে টর্চের আলোয় রঞ্জন বুঝল ভেতরে ঠিক ততটা জঞ্জাল নেই। যদিও ইতিউতি মাকড়সার জাল রয়েছে, পুরু ধুলোও আছে কিন্তু বৃষ্টি থামা পর্যন্ত বাড়ির মধ্যের এই হলঘরে কিছুটা সময় কাটিয়ে দেওয়া যাবে। পকেট থেকে মোবাইল বের করে টর্চের আলোয় রঞ্জন দেখল মোবাইলে টাওয়ার নেই। অর্থাৎ কল করা যাবে না। বেশী দেরী হয়ে গেলে আবার বাড়ির লোক চিন্তা করবে, ঐদিকে আবার মোবাইলে টাওয়ার নেই তাই বাড়ি থেকে কল করলেও তাকে পাবে না। কিন্তু এই অবস্থায় কিছু করার নেই। বৃষ্টিটা একটু না ধরলে সে কোনওভাবেই গাড়ি চালিয়ে ফিরতে পারবে না।

বাড়িটার এই ঘরটার চারিদিকের দেওয়ালে টর্চের আলো ফেলে দেখতে লাগল রঞ্জন। বেশ কিছু ছবি দেয়ালে টাঙানো রয়েছে। একদিক দিয়ে একটা সিঁড়ি ওপরের দিকে উঠে গেছে। রঞ্জন সেই সিঁড়িটার দিকে এগোলো। সিঁড়িটা আবার কিছুটা উঠে দু’দিকে ভাগ হয়ে ওপরে উঠে গেছে। সিঁড়িটা যেখানে ভাগ হয়েছে ঠিক সেখানেই দেয়াল জুড়ে বিশাল একটা ফটো টাঙানো রয়েছে। রঞ্জন সাবধানে সিঁড়িতে পা ফেলে সেদিকে এগিয়ে গেল। দূর থেকে বাঁধানো ফটো বলে মনে হলেও কাছে গিয়ে টর্চের আলোয় রঞ্জন দেখলো সেটা আসলে হাতে আঁকা একটা বিশাল পোট্রেট। পোট্রেটা জুড়ে প্রচুর ধুলো জমেছে। তাই যার ছবি তার মুখাবয়ব ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। রঞ্জন হাত দিয়ে ধুলো সরাতে শুরু করল ছবিতে থাকা ব্যক্তির মুখ ভালো করে দেখার জন্য। 

রঞ্জনের মনে হল তাকে যেন কোনও অদৃশ্য শক্তির এক প্রবল আকর্ষণ বাধ্য করছে ছবিটার থেকে ধুলো সরিয়ে ছবির ব্যক্তির মুখটা ভালো করে দেখার জন্য। কিছুটা ধুলো সরানোর পরেই ছবির ব্যক্তির মুখাবয়ব পরিষ্কার হতে শুরু করল। আরও একটু ধুলো সরানোর পরই ছবির ব্যক্তির মুখটা স্পষ্ট হয়ে গেল। আর সেই মুখ দেখে রঞ্জন রীতিমতো বিস্মিত হয়ে উঠল। কারণ সে ছবিতে যার মুখ দেখছে তাকে অবিকল রঞ্জনেরই মত দেখতে। রঞ্জন যেন মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে রয়েছে সেই দিকে। যদি সত্যিই কোনওসময় এই লোকটি জীবিত থেকে থাকত তাহলে সেইসময়ে তার চেহারা ছিল অবিকল রঞ্জনের মত।

হঠাৎ রঞ্জনের সারা শরীর যেন কেঁপে উঠল। রঞ্জনের চোখের সামনে অন্ধকার ছেয়ে গেল। রঞ্জনের মনে হল পুরো বাড়িটাই যেন থরথর করে কাঁপছে। এক অজানা আতঙ্ক ভর করে এল রঞ্জনের মনে। রঞ্জন দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থা থেকেই ঠাস করে পড়ে গেল মেঝেতে। চোখের সামনে অন্ধকার ছেয়ে এল রঞ্জনের। তারপর আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো রঞ্জন। রঞ্জন অবাক হয়ে দেখল বাড়িটাতে আলো জ্বলছে। চারিদিক থেকে কারা যেন মশাল জ্বালিয়ে এগিয়ে আসছে। আচমকা রঞ্জনের মনে হল তার গায়ের জামাকাপড় বদলে গেছে। রঞ্জন নিজের দিকে তাকিয়ে দেখল সত্যিই তার প্যান্ট-শার্ট ভিজে বর্ষাতি চলে গিয়ে তার গায়ে উঠে এসেছে দামি জরি বসানো পাঞ্জাবী আর ধুতি। রঞ্জন নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বুঝল তার হাত আরও বলিষ্ঠ আর ফর্সা হয়ে গেছে। নাকের নীচে একটা সরু গোঁফের অস্তিত্ব যেন টের পেল রঞ্জন। দেয়ালের ওই ছবিটার চেহারার সঙ্গে এইটেই শুধু পার্থক্য ছিল রঞ্জনের। রঞ্জন ক্লিন সেভ হলেও দেয়ালের ছবিটারে যে ব্যক্তি রয়েছেন তার একটা সরু কিন্তু রাজকীয় গোঁফ আছে। রঞ্জন শুধু অবাকভাবে এই উপলব্ধি করে চলেছে। হঠাৎ রঞ্জনের মনে হল চারপাশ থেকে যারা মশাল নিয়ে বাড়ির দিকে ধেয়ে আসছে তারা তাকে ধরতেই আসছে। 

বাড়ির দরজা খুলে বেশ কয়েকজন মশালধারী ভেতরে ঢুকে এল। রঞ্জন কিছু বুঝে ওঠের আগেই তারা এসে সদলবলে রঞ্জনকে ধরে ফেলল। রঞ্জন কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলা হল। রঞ্জন কিছুই বুঝতে পারছে না। সে শুধু কঁকিয়ে বলে উঠল, ‘কে আপনারা? আমাকে বাঁধছেন কেন?’ 

মিলন পুরকাইত -এর রচিত গল্প "আতঙ্ক"

কিন্তু কেউ কোনও উত্তর দিল না। কেউ যেন রঞ্জনের কথা শুনতেই পেল না। রঞ্জনের মনে হল সে যা উচ্চারণ করছে তা যেন তার মুখ দিয়ে বেরোচ্ছে না। যা বেরোচ্ছে সেকথা সে বলতে চাইছে না। ইতিমধ্যে আরও বেশ কিছুলোক ঢুকে এসেছে ঘরের দরজা দিয়ে। সবার চোখেই যেন রঞ্জনের জন্য জ্বলন্ত ঘৃণা। এবার দরজা দিয়ে ঢুকে এলেন তিনজন ব্যক্তি। তিনজনই বয়স্ক। তাদের মধ্যে মাঝুখানের জন বেশ বলিষ্ঠ চেহারার। বয়স্ক হলেও তার বেশ তেজী এবং শক্ত চেহারার। মানুষটা পাঁজাকোলা করে বয়ে নিয়ে আসছেন এক সমর্থ তরুণীর নিথর দেহকে। তার পাশের দুজনের হাতে খোলা তরোয়াল। মাঝের সেই বলিষ্ঠ প্রৌঢ়ের দুচোখ শোকে পাথর হয়ে রয়েছে। তার চোয়াল শক্ত। চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে। 

ঘরের মধ্যে ঢুকে প্রৌঢ় নীচু হয়ে খুব ধীরে পরম মমতায় তরুণীর নিথর দেহটি নিজের কোল থেকে আস্তে করে মাটিতে শুইয়ে দিলেন। রঞ্জনের বুক এক অজানা আতঙ্কে কাঁপছে। মেয়েটির দেহটি মাটিতে শুইয়ে রেখে সেই প্রৌঢ় জ্বলন্ত দৃষ্টিতে রঞ্জনের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে এসে মেয়েটির দেহটির দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করে বললেন, ‘কি ক্ষতি করেছিল আমার ওই নিষ্পাপ মেয়েটা? কি ক্ষতি করেছিল ও তোমার, যে তুমি ওকেও তোমার নগ্ন বাসনার হাত থেকে রেহাই দিলে না? কুমারপ্রতাপ সারাজীবন ধরে তোমাদের বংশের পুরোহিত হিসাবে তোমাদের মঙ্গলের জন্য ঈশ্বরের কাছে পূজা-অর্চনা, প্রার্থনা করার এই প্রতিদান আজ দিলে তুমি? এতবছর ধরে এই বংশের সেবা করার পুরষ্কার হিসাবে আমার মেয়ের ইজ্জত নষ্ট করে তার মৃতদেহ আমার কাছে ফিরিয়ে দিলে তুমি? এই গ্রামের কোনও মেয়ে বউরাই আর সুরক্ষিত নয় যতদিন তুমি বেঁচে আছ। এই গ্রামের মেয়েদের সুরক্ষার জন্য তোমার মত লম্পটকে আজ মরতে হবে, মরতে হবেই। মারো একে, শেষ করে ফেল’। 

প্রৌঢ় পুরোহিতের কথা শেষ হওয়ামাত্রই তার সঙ্গে আসা তরোয়ালধারী দুজন খোলা তরোয়াল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল রঞ্জনের ওপর। রঞ্জন বাধা দিতে বলতে গেল যে সে কুমারপ্রতাপ নয় কিন্তু তার আগেই তরোয়ালধারী দুজন তরোয়ালের ঘায়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিল রঞ্জনকে। যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে চিৎকার করে উঠল রঞ্জন। পরমুহুর্তেই আবার সবকিছু চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে গেল রঞ্জনের। সে যখন আবার চোখ খুলল তখন সে দেখল সে সেই ছবির সামনেই টর্চ হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ছবির ভেতর থেকে যেন একটা কন্ঠস্বর ভেসে উঠল, ‘আমাকে এই ছবির পেছনে এই দেওয়ালে ক্ষতবিক্ষত জ্যান্ত অবস্থাতেই পুঁতে দিয়েছিল ওরা। এই ছবি সরালেই দেয়ালের কয়েকটা ইট ফেলে দিলেই আমার কঙ্কাল দেখা যাবে। আমি মরেও খুব কষ্টে আছি। আমাকে মুক্তি দাও। আমাকে মুক্তি দাও’।

একটা মোহান্ধ অবস্থায় ঠিক যেন দম দেওয়া পুতুলের মত রঞ্জন ছবিটা সরানোর জন্য হাত এগিয়ে দিল। ঠিক সেই সময়েই পেছন থেকে কেউ যেন বলে উঠল, ‘দাঁড়াও এই সর্বনাশ করো না। কুমারপ্রতাপের জীবদ্দশার মত তার আত্মাও খল আর দুষ্ট। তুমি ওকে মুক্ত করার ভুল কোরো না’।

চমকে পিছনে তাকিয়ে রঞ্জন দেখল তার সামনে যেন এক মানুষের অবয়বের বায়বীয় প্রতিরূপ দুলছে। ক্রমে সেই রূপ গাঢ় হয়ে মানবাকৃতি ধারণ করল। রঞ্জন দেখল একটু আগে সেই দৃশ্যে সে যে প্রৌঢ় পুরোহিতকে দেখেছে তিনিই এসে দাঁড়িয়েছেন রঞ্জনের সামনে। পুরোহিত এবার রঞ্জনের কাছে একরকম হাওয়ায় ভেসে এসে বললেন, ‘তোমাকে দেখতে হুবহু কুমারপ্রতাপের মত। তোমার শরীর প্রায় তারই মত। তাই নিজের পাপাত্মাকে মুক্ত করে দুষ্কর্ম করার জন্য কুমারপ্রতাপের আত্মা তোমাকে বেছে নিয়েছে। ওকে তুমি মুক্ত করলেই ও তোমার শরীরের ওপর কব্জা করে ওর নির্মম বাসনাগুলোকে আবার চরিতার্থ করার চেষ্টা করবে। তুমি হয়ে উঠবে এক পাষণ্ড নারী শরীর লোভী শয়তানে। সরে এস তুমি ওই ছবির সামনে থেকে। সরে এস’।

পুরোহিতের কথা শোনামাত্রই সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে এল রঞ্জন। রঞ্জন সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতেই বাঁধানো কুমারপ্রতাপের ছবির মধ্যে থেকে যেন একটা ভয়ঙ্কর হাহাকার আর্তনাদ বেরিয়ে এল। পুরোহিত সেদিকে রক্তচক্ষু দিয়ে তাকিয়ে বললেন, ‘ওই ছবির পেছনেই মন্ত্রবদ্ধ হয়ে তুই থাকবি শয়তান। যে পাপ তুই করেছিস তাতে তোর ওই শয়তান আত্মাকে আমি মুক্তি পেতে দেব না। যুগ যুগ ধরে এই মরণোত্তর অশরীরী রূপে তোকে পাহারা দিয়ে যাব আমি। কেউ তোকে মুক্তি দিতে পারবে না’।

আবারও একটা যন্ত্রণাকাতর হাহাকার বেরিয়ে এল কুমারপ্রতাপের ছবির পেছনের দেয়াল থেকে।

‘চলে যাও তুমি। এখনই চলে যাও। আর কখনও এ বাড়িতে আসবে না’। রঞ্জনকে নির্দেশ দিয়ে শূন্যে বিলীন হয়ে গেলেন পুরোহিত। রঞ্জন এক মুহুর্তও সময় নষ্ট না করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। বৃষ্টি পুরোপুরি না থামলেও বেশ ধরে এসেছে। টিপটিপ করে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা। ঝড় থেমে গেছে পুরোপুরি। আতঙ্কগ্রস্ত রঞ্জন টর্চ হাতে ছুটে চলে এল হাইওয়ের ধারে পার্ক করা তার গাড়ির কাছে। গাড়ির লক খুলে দ্রুত গাড়ির মধ্যে ঢুকে ড্রাইভারের আসনে বসে পড়ল রঞ্জন। ঠিক সেইসময় তার মোবাইলটা বেজে ওঠাতে নিজেও আঁতকে উঠল রঞ্জন। তার ভেতরের আতঙ্ক এখনও রয়েছে। রঞ্জন কাঁপা কাঁপা হাতে মোবাইলটা নিয়ে দেখল তার বাড়ি থেকে কল আসছে। একটু আশ্বস্ত হল রঞ্জন। কলটা রিসিভ করে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘হ্যালো, ঝড়বৃষ্টি হচ্ছিল এদিকে প্রবলভাবে। তাই আটকে পড়েছিলাম...একটা বাড়িতে ঢুকেছিলাম...হ্যাঁ টাওয়ার ছিল না। এখন ঝড়বৃষ্টি কমে গেছে...আমি বাড়ি আসছি। দেরি হবে...চিন্তা কোরো না’।

কলটা কেটে দিয়ে মোবাইলটা পাশের সিটে রেখে দিয়ে শেষবারের মত একবার বাড়িটা রাস্তা যেদিকে সেদিকে একবার আতঙ্কিত দৃষ্টি দিয়ে গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট করল রঞ্জন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)